এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
নতুন ইমাম দাঁড়ায়েছে আজ আকাশে তাহার শির

দ্রিম্ দ্রিম্ দ্রিম্ লক্ষ দামামা বাজছে সুগম্ভীর

জড়ীন শড়কে লাখো জনতার ভিড়

জড়ীন শড়কে ভূখা জনতার ভিড়

জড়ীন শড়কে লাখো মজলুম পেয়েছে সুসংবাদ

এ পথেরি শেষে আছে সে ঈদের চাঁদ ।

হ্যাঁ, মজলুম ও ইসলাম প্রেমিক মানুষের কাছে ইমাম খোমেনী (রঃ) ছিলেন ঈদের চাঁদ । পাশ্চাত্যের আধিপত্যের কাছে অবদমিত মুসলিম জাতিগুলোর জন্যে ইরানে সংঘটিত ইসলামী বিপ্লব ছিল মুক্তির এক নতুন পয়গাম এবং অসীম সম্ভাবনার সোনালী দিগন্ত। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সমসাময়িক যুগে এবং গত কয়েকশ বছরের ইতিহাসে ইরানে সংঘটিত ইসলামী বিপ্লব একটি নজীরবিহীন বিপ্লব । অন্যায় ও অবিচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং সাম্যবাদ ও শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে সাম্প্রতিক শতাব্দীগুলোতে ফরাসী বিপ্লব ও সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হলেও এ দুটি বিপ্লব ধর্মীয় আদর্শ কেন্দ্রীক ছিলনা । এ ছাড়াও এ দুটি বিপ্লব তাদের লক্ষ্যে পৌঁছুতে পারেনি । পুঁজিপতি ও ধনিক শ্রেণীর চাপের মুখে ফরাসী বিপ্লব ব্যর্থ হয় এবং শ্রমিক শ্রেণীর অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে নব্য পুঁজিবাদ ও নাস্তিক্যবাদের প্রসার ঘটায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব জনগণের কাছে তাঁর মূল্য হারিয়ে ফেলে । এ অবস্থায় ইরানে ইসলামী বিপ্লব রাজনৈতিক আদর্শের অঙ্গনে মহাশক্তির এক নতুন উৎসে পরিণত হয়। দেশে দেশে ইসলামী পুণর্জাগরণের প্রতীক হয়ে ওঠে এ বিপ্লব । ফিলিস্তিনে শুরু হয় দখলদার বিরোধী আন্দোলন । লেবানন, কাশ্মীর, বসনিয়া, চেচনিয়া, মিন্দানাও , আফগানিস্তান, তুরস্ক, ভারত উপমহাদেশ ও মধ্যপ্রাচ্যেও এ বিপ্লবের প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে এবং জালেম শক্তিগুলোর কাছে মুসলিম সংগ্রামীরা হয়ে ওঠে অপ্রতিরোধ্য । ইরানে ইসলামী বিপ্লব সফল হবার পর সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো বিশেষ করে আমেরিকা ইরান ও ইসলামী পূনর্জাগরণকে তার প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে ধরে নিয়ে এ বিপ্লবের প্রভাব ঠেকানোর জন্যে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা শুরু করে । সামগ্রীকভাবে গোটা পাশ্চাত্য ইসলাম আতংকে ভূগতে থাকে । এ সময় মার্কিন টাইম ম্যাগাজিন এক নিবন্ধে হুঁশিয়ারী উচ্চারণ করে লিখেছিল : ‘‘গোটা মুসলিম উম্মাহ পূণর্জাগরণের দিকে এগোচ্ছে ।'' পশ্চিমা শক্তিগুলোর মধ্যে তখনই এ ধারণা জন্মায় যে কমিউনিজম নয়, ইসলামই তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ এবং তাদের শেষ লড়াইটা হবে ইসলামের সাথে । এ কারণেই পরবর্তীকালে মার্কিন চিন্তাবিদ হান্টিংটন সভ্যতাগুলোর মধ্যে সংঘাতের তত্ত্ব উপস্থাপন করে ইসলামকে আমেরিকার প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে ঘোষণা করেন । ইরানের বিপ্লবের পর পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো মুসলিম জাগরণ ও ইসলামী আন্দোলনগুলোকে মৌলবাদী আন্দোলন বলে অভিহিত করতে থাকে । এ থেকেই বোঝা যায়, মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)'র নেতৃত্বে সূচিত বিশ্ব ইসলামী আন্দোলন বা ইসলামী পুণর্জাগরণ আন্দোলন পশ্চিমা জালেম শক্তিগুলোকে কতোটা শংকিত করেছে । মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) যে কোনো জালেম শক্তির বিরুদ্ধে মজলুম জাতির লড়াই বা আন্দোলনকে সমর্থন দেয়ার ঘোষণা দেন । ইমাম বলেছিলেনঃ "যতদিন পর্যন্ত না ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ''- এ বাণী সমগ্র পৃথিবীতে ধ্বনিত হবে ততদিন পর্যন্ত আমাদের সংগ্রাম চলবে, পৃথিবীর যেখানেই জালেমের বিরুদ্ধে মজলুমের সংগ্রাম সেখানেই আমরা আছি ।" তিনি ইসলামী বিপ্লবকে বহির্বিশ্বে রপ্তানীর প্রতিজ্ঞাও ব্যক্ত করেছিলেন। সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা ও মজলুমের প্রতি সমর্থন ছাড়াও ইমাম খোমেনী (রঃ)'র নেতৃত্বে ইসলামী বিপ্লব টিকে থাকার ও তা জনপ্রিয় হবার আরেকটি বড় কারণ হলো, সাম্রাজ্যবাদকে কোনো রকম প্রশ্রয় না দেয়া এবং তাদের প্রভাব বিস্তারের সমস্ত পথগুলো বন্ধ করে দেয়া ও তাদের সাথে আপোষ না করা। পৃথিবীর অনেক দেশেই, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের অনেক দেশে স্বৈরাচার ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলন সাময়িকভাবে সফল হলেও পরে তাদের স্থানীয় এজেন্টরাই ক্ষমতায় ফিরে এসেছে । এর কারণ হলো, সাম্রাজ্যবাদ সাময়িকভাবে পিছু হটলেও কূটনৈতিক বা বিভিনড়ব সম্পর্কের আড়ালে তারা পূণরায় তাদের অনুচরদের সংঘবদ্ধ করে এবং নতুন আঙ্গিকে তাদের পুরনো নীতি চাপিয়ে দিয়ে পরোক্ষভাবে শোষন অব্যাহত রাখে । ইরানেও মার্কিন দূতাবাসে অবস্থান করে তথাকথিত মার্কিন কূটনীতিকরা যখন নবগঠিত ইসলামী রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিভিনড়ব ধরনের ষড়যন্ত্র করছিল এবং প্রতিবিপ্লব ও সন্ত্রাস সৃষ্টির চেষ্টা করছিল, তখন ইরানের বিপ্লবী ছাত্ররা মার্কিন কূটনীতিক নামধারী গুপ্তচরদের ঐ আস্তানা অবরোধ করে এবং তাদের প্রায় দেড় বছর পর্যন্ত আটক রাখে । ইমাম খোমেনী (রঃ) ছাত্রদের ঐ পদক্ষেপকে দ্বিতীয় বিপ্লব বলে অভিহিত করেছিলেন । মার্কিন গুপ্তচরদের মুক্ত করা এবং ইরানের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দকে অপহরণ বা হত্যার জন্যে তৎকালীন মার্কিন সরকার রাতের অন্ধকারে ইরানে বেশ কয়েকটি জঙ্গী বিমান ও হেলিকপ্টারে করে কমান্ডো সেনা পাঠিয়েছিল । কিন্তু মহান আল্লাহর অসীম অনুগ্রহে ঐ বিমানগুলো ধুলি ঝড়ের কবলে পড়ে ধ্বংস হয়ে যায় । মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) এ ঘটনাকে আল্লাহর পাঠানো আবাবিল পাখীর মাধ্যমে কাবা ঘর ধ্বংসের জন্যে আগত আবরাহা বাদশাহর হস্তী বাহিনী ধ্বংসের সাথে তুলনা করেন । আসলে এ ঘটনার মধ্য দিয়ে আধুনিক যুগেও ইসলামের আধ্যাত্মিক শক্তি এবং ইসলামের প্রতি খোদায়ী সাহায্যের বিষয়টি ফুটে উঠেছে । মূলতঃ এ ঘটনার পরিণতিতেই আমেরিকায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জিমি কার্টার পরাজিত হয়েছিলেন । অন্যদিকে ইমাম খোমেনী (রঃ) লাভ করেন বিশ্ব বিশ্রুত এক অলৌকিক-আধ্যাত্মিক পরিচিতি । গুপ্তচরবৃত্তি বা ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপের জন্যে ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বের যুগে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অনেক কূটনীতিককেও ইরান থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল । আর এ থেকে বোঝা যায়, তিনি পূর্ব ও পশ্চিমের কোনো পরাশক্তিকেই পরোয়া করতেন না । ইমাম খোমেনী (রঃ)'র নেতৃত্বের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তিনি তাঁর জাতিকে নিজের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন এবং সে ঐক্য ধরে রেখেছিলেন । নেতৃত্বের কোন্দলের কারণে বিশ্বের অনেক দেশে অনেক মহৎ পরিবর্তন বা বিপ-ব স্থায়ী হতে পারেনি । আর জাতীয় নেতৃত্বে কোন্দল দেখা দেয়ায় কিংবা নেতৃত্ব গোত্রীয় বা আঞ্চলিক পর্যায়ে বিভক্ত হয়ে পড়ায় আফগানিস্তানের মতো দেশের জনগণ রুশ আগ্রাসীদের বিতাড়িত করা সত্ত্বেও পরে নিজেরাই গৃহযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং এর ফলে সেখানে বিদেশী শক্তিগুলো হস্তক্ষেপের সূযোগ পায় । কোনো জাতির উন্নতি ও অগ্রগতির জন্যে জাতীয় ঐক্য যে জরুরী এবং ইসলামের পথে অটল থাকলে বিশ্বের কোনো শক্তিই কোনো জাতিকে দমিয়ে রাখতে পারেনা, মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) মুসলিম জাতিগুলোকে তা বাস্তবে দেখিয়ে গেছেন ।

মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)'র আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা ও সাফল্যের আরেকটি বড় কারণ হলো, তিনি জনগণের মতামতকে শ্রদ্ধা করতেন এবং জনগণকে নিয়েই তিনি তাঁর মহান বিপ্লবকে সফল করেছিলেন । তিনি জনগণের ওপর জোর করে ইসলামী শাসন বা আইন চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেননি । জনতার রুদ্র রোষ এড়াতে যখন স্বৈরাচারী শাহ পালিয়ে যায় এবং ইরানের সর্বস্তরের জনগণ ইমাম খোমেনী (রঃ)'র প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে তখন তিনি রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে ইসলামী প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরের জন্যে গণভোটের উদ্যোগ নেন এবং দেশের সংবিধান প্রণয়নের জন্যেও গণভোটের ব্যবস্থা করেন । তিনি গণভোটের আগে ঘোষণা করেছিলেন যে, আমরা একটি ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চাই, এর চেয়ে কমও নয় এবং বেশীও নয় । ইরানের শতকরা ৯০ ভাগেরও বেশী নাগরিক ইসলামী প্রজাতন্ত্র ও ইসলামী সংবিধানের পক্ষে রায় দেন । মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) ইরানে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ও সংসদ নির্বাচনেরও ব্যবস্থা করেন । এভাবে তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনে জনগণের অংশীদারিত্বকে প্রতিষ্ঠা করেন । ইমাম খোমেনী (রঃ) যে কত জনপ্রিয় নেতা ছিলেন তাঁর প্রমাণ পাওয়া যায়, স্বৈরাচারী শাহের শাসনামলে তাঁর বিরুদ্ধে মানহানিকর একটি নিবন্ধ প্রকাশিত হবার পর এর প্রতিবাদে ইরানের প্রতিটি শহরে লক্ষ লক্ষ জনতা বিক্ষোভ মিছিলে ফেটে পড়ে। একবার শাহ সরকার তাকে বন্দী করলে লক্ষ লক্ষ জনতা তাঁর মুক্তির দাবীতে মিছিল বের করে শ্লোগান দেয় ‘হয় খোমেনী অথবা মৃত্যু'। ফলে সরকার ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় । ১৫ বছরের নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে প্যারিস থেকে তিনি যখন দেশে ফিরে আসেন তখন তেহরানে তাঁকে প্রায় ৬০ লক্ষ লোক সম্বর্ধনা জানায় এবং তিনি যখন ১৯৮৯ সালে ইন্তিকাল করেন তখনও প্রায় এক কোটি জনতা তেহরানে তাঁর দাফন অনুষ্ঠানে অংশ নেয় ।

মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)'র নেতৃত্বের একটি অনন্য দিক হলো তিনিই ধর্মীয় বিশেষজ্ঞের নেতৃত্বে ইসলামী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার সুস্পষ্ট রূপরেখা তুলে ধরেন । এভাবে মুসলমানদের হারিয়ে যাওয়া নেতৃত্বের ছিন্ন সূত্রকে জোড়া লাগানোর উপায় তিনিই নির্ধারণ করেন । তাঁর মতে ইসলামী আইনে সবচেয়ে পারদর্শী ব্যক্তিরাই মুসলিম রাষ্ট্র তথা ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন জনগণের সম্মতি নিয়ে, আর তাদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে যোগ্য তিনিই হবেন ইসলামী রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নেতা বা প্রধান অভিভাবক। এ ধরনের নেতা আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত ইমামের প্রতিনিধি হবার মর্যাদা পাবেন । কোনো শিশুর পিতা না থাকলেও যিনি শিশুর অভিভাবক তাকেই শিশুটির পিতার দায়িত্ব পালন করতে দেয়া হয়, তেমনি বর্তমান যুগে শ্রেষ্ঠ ইসলামী আইনবিদ আল্লাহর মাধ্যমে সরাসরি মনোনীত না হলেও আল্লাহর মনোনীত ইমামের প্রতিনিধি হিসেবে রাষ্ট্রের প্রধান নেতা বা অভিভাবক হবার মর্যাদা পেতে পারেন বলে ইমাম খোমেনী মত দেন । বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, মিশর, আলজেরিয়া, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মতো অনেক মুসলিম দেশের চিন্তাবিদ ও আলেম সমাজ এ বিষয়ে গবেষণা করলেও তারা এ ব্যাপারে ঐতিহ্যবাহী আলেম সমাজের কাছে কোনো সর্বসম্মত ও বাস্তব দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে পারেননি । আর এ জন্যেই দেখা যায় অনেক মুসলিম দেশের ইসলামী আন্দোলন বিজয়ের কাছাকাছি পৌঁছেও ব্যর্থতা বরণ করে নিয়েছে এবং ইসলামী সরকার রূপায়নের জিয়ন কাঠিটি খুঁজে পায়নি । ইমাম খোমেনীর আহবানে গোটা জাতি জীবন বাজি রেখে স্বৈরাচারী শাহের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে এসেছিল এবং হাজার হাজার জনতা শহীদও হয়েছিল । জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশকে বিভিন্ন সময়ে আন্দোলন, পবিত্র প্রতিরক্ষার জিহাদ বা অন্যান্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কাজে শরীক করানোর মত যোগ্যতা সমসাময়িক যুগে একমাত্র ইমাম খোমেনীই দেখাতে পেরেছিলেন । অর্থাৎ সত্যিকার অর্থেই তিনি জনগণের ইমাম হবার মর্যাদা পেয়েছিলেন এবং জনগণ তাঁর আহবান বা নির্দেশ পালন করাকে তাদের অবশ্য পালনীয় ধর্মীয় কর্তব্য বলেও মনে করতো । #

এতো কোনো শিশু নয় হাজেরার কোলে যেন নতুন ইসমাইল

যেন বনি ইসরাইলের মধ্যে এলেন মূসা

ইমাম, তুমি তাকালে সামনে জালিমের জিন্দান

ভেঙ্গে খান খান নমরুদ আর ফেরাউন ভূপাতিত

ইমাম তুমি দুহাত বাড়ালে ওমনি ফুটলো গোলাপ

 

মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) এমন এক বিশাল ব্যক্তিত্ব বা মহীরুহের নাম যার জীবনের বিভিন্ন মহৎ দিক ও সাফলক্ষ্য তাঁকে ইতিহাসে চিরভাস্বর করেছে । আজ আমরা তাঁর জীবনের আরো কিছু মহৎ দিক ও অবদান নিয়ে আলোচনা করবো ।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডঃহামিদ আলগার বলেছেন ইমাম খোমেনী (রঃ) দর্শন ও অধ্যাত্মবাদকে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রয়োগ করে এটা দেখিয়ে গেছেন যে, দর্শন ও আধ্যাত্মিকতা বা নৈতিক ও আত্মিক গুণাবলীর সাথে রাজনীতির ওতপ্রোত সম্পর্ক রয়েছে ।

নৈতিক ও আত্মিক সংশোধনকে ইমাম খোমেনী (রঃ) যে কত গুরুত্ব দিতেন তা তাঁরই কিছু অমর বাণী থেকে ফুটে উঠে । ইমাম বলেছিলেন, চারিত্রিক অসততাই তৌহিদবাদী ধর্মগুলোকে ধ্বংস করেছে এবং তাদের বিকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে । ইসলামের সবচেয়ে বেশী ক্ষতি হয়েছে তাদের হাতে যারা সুশিক্ষিত অথচ আত্মিক দিক থেকে সংশোধিত হয়নি । ইমাম খোমেনী নৈতিকতা শিক্ষার ক্লাসে তাঁর ছাত্রদের উপদেশ দিয়ে বলতেন - " আমাদের একজন ওস্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী একজন আলেম হয়ে ওঠা তোমাদের জন্যে খুবই সহজ । কিন্তু খুব বেশী কঠিন হচ্ছে একজন সত্যিকার মানুষ হওয়া, আর আমি বলবো আলেম হওয়া বেশ কঠিন, তবে মানুষ হওয়াটা প্রায় অসম্ভব । "

সুইজারল্যান্ডের খ্যাতনামা সাংবাদিক ও নও মুসলিম আহমেদ হুবার ১৯৯০ সালে এক সম্মেলনে বলেছেন, ইমাম খোমেনী আমাকে এবং বিশ্বের কোটি কোটি মুসলমানকে অত্যন্ত প্রত্যক্ষভাবে মানবতার জন্যে আল্লাহর দৃষ্টিভঙ্গী কি তা উপস্থাপন করেছেন । ইমাম খোমেনী যে জাগরণের উদ্যোগ নিয়েছেন গত ১১ বছরে তা সারা বিশ্বকে বদলে দিয়েছে । আজ আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থেও লেখা হচ্ছে যে, ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিশ্বের এক নম্বর পরাশক্তি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে আলোড়ন তুলতে সক্ষম হয়েছে । এমনকি তা ১৯৭৯ সাল থেকে আমেরিকার ক্ষমতাকে ক্ষয়িষ্ণু করে তুলেছে । ইমাম খোমেনীর ইসলামী বিপ্লব এবং ইসলামী মুজাহিদদের ত্যাগ-তিতিক্ষা ১৯৮৩ সালে আমেরিকা, ফ্রান্স ও ইহুদিবাদী ইসরাইলকে লেবানন থেকে বেরিয়ে আসতে বাধ্য করেছে এবং সত্যিকার অর্থে ইসলাম অনুপ্রাণিত ফিলিস্তিনি গণজাগরণ চল্লিশ বছরের মধ্যে এই প্রথম এত মারাত্মকভাবে ইহুদি দখলদার ও আন্তর্জাতিক ইহুদীবাদী চক্রকে সংকটে ফেলেছে । তাই, ইমাম, তাঁর চিন্তাধারা ও তাঁর সংগ্রামী কার্যক্রম চিরকাল জিন্দা থাকবে । মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে জালেম ও স্বৈরশাসকের প্রকৃত চেহারা তুলে ধরতে পারতেন এবং সব ধরনের জুলুম ও বঞ্চনার অবসান ঘটানোর জন্যে ইসলামী শাসনের অপরিহার্যতাও জনগণের কাছে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছিলেন । তিনি ইসলামের শত্রুদের ও বিপ্লব বিরোধীদের সমস্ত প্রচারণার এমন দাঁতভাঙা জবাব দিতেন যে, তারা বল প্রয়োগ করা ছাড়া ইমামের আলোকিত আন্দোলন দমনের আর কোনো পথ খুঁজে পায়নি । কিন্তু ইরানের আপামর জনতাকে তিনি ইসলামের জন্যে ত্যাগ-তিতিক্ষা ও বিশেষ করে সর্বোচ্চ ত্যাগ শাহাদতের চেতনায় এমনভাবে উজ্জীবিত করেছিলেন যে তাঁদের সমস্ত নিষ্ঠুরতা ও দমন নীতিও ব্যর্থ হয়ে যায় । ইমাম খোমেনী (রঃ) তাঁদেরকে যেন অভ্যস্ত করেছিলে এ অমোঘ বাণীতে-

 

জীবনের চেয়ে দৃপ্ত মৃত্যু তখনি জানি

শহীদী রক্তে হেঁসে ওঠে যবে জিন্দেগানী ।

ঈমানের দ্যুতি যদি বুক জুড়ে, কলেমার

কন্ঠ যদি উদাত্ত উদার

সঙ্গী তবে মহান মহিম প্রভু, বিশ্বাসীর

জন্যে তাঁর করূণা অপার ।

 

ইমামের পক্ষে জনতার জোয়ার এতোই সর্বপ্লাবী হয়ে উঠেছিল যে স্বৈরাচারী শাহের শেষ অবলম্বন সেনাবাহিনীর অধিকাংশ সদস্যও ইমামের সমর্থকে পরিণত হন । তাঁর আলোকিত বক্তব্য ও যুক্তিপূর্ণ আহবান দাবানলের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়তো এবং নারীসহ সব শ্রেণীর মুক্তিকামী মানুষের মধ্যে তিনি সমন্বয় বা ঐক্য গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন । ইমাম খোমেনী নারী জাতি সম্পর্কে ইসলামের সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরতেন বলেই ইরানের নারী সমাজও ইসলামী বিপ্লবে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এবং ইরানের নারী সমাজ হিজাবের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত হয়ে এখনও সব ধরনের সামাজিক কর্মকান্ডে ভূমিকা রাখছেন । ইমাম খোমেনী (রঃ) যে শুধু নিজ জাতির সব শ্রেণীর মধ্যে ঐক্য গড়ে তুলেছিলেন তা নয় তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন । তিনি চাইতেন সারা বিশ্বের মুসলমানরা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হোক । এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আলেম মাওলানা সালাউদ্দিন বলছেন, "বিশ্বের সমস্ত মুসলমান একে অপরের ভাই । আল মুসলিম আখুল মুসলিম । ইন্নামাল মুমিনুনা ইখওয়া । যাঁরা কালেমা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ পড়ে- তারা সবাই উম্মতে মোহাম্মদী তথা মুসলিম । কিন্তু ইসলামের শত্রুরা মুসলমানদেরকে দ্বিধা-বিভক্ত করার জন্যে একের থেকে অপরকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য ষড়যন্ত্র করছে । যে কারণে শিয়া-সুন্নী বিভিন্ন ফের্কার তুফান বা ঝড় তুলে তারা ভাই-ভাইয়ের মধ্যে শত্রুতা বাধিয়েছে । যেখানে ভাই ভাইকে ভালোবাসবে, সেখানে শত্রুরা মুসলমানদের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি করে দিয়েছিল । ইমাম খোমেনী (রঃ)'র মনে এটা বড় দুঃখ দিয়েছিল । তাঁর চোখে পানি এসেছিল এ অবস্থা দেখে । এ জন্যে তিনি সারা বিশ্বের মুসলমানদেরকে এক মায়ের সন্তানের মতো এক করার ডাক দিয়েছিলেন এবং এ জন্যে তাঁকে অনেক ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করতে হয়েছে । আমি যখন ইমাম খোমেনী (রঃ)'র চেহারা মোবারক দেখি ও তাঁর জীবনী সম্পর্কে পড়ি ও এসব নিয়ে চিন্তা করি তখন নবী (সঃ)'র কথা আমার মনে পড়ে যে, বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ) যেভাবে নিজে না খেয়ে পেটে পাথর বেঁধে যে চেষ্টাগুলো করেছিলেন, ঠিক তেমনিভাবে ইমাম খোমেনী (রঃ) সারা বিশ্বের মুসলমানদেরকে ইসলামের ঝান্ডার নীচে একতাবদ্ধ করার জন্যে যে চেষ্টা করেছিলেন- সেটা তাঁর অনেক বড় অবদান । তাঁর যে বিপ্লব তা বিশ্বের মুসলমানদেরকে একতাবদ্ধ করার জন্যে যথেষ্ট এবং আমি মনে করি এ ঐক্যের প্রয়োজনও রয়েছে । "

মরহুম ইমাম খোমেনী শুধু একজন যুগস্রষ্টা নেতাই ছিলেন না, তিনি ছিলেন যোগ্য নেতা, সুযোগ্য ফকিহ বা মুজতাহিদ পর্যায়ের আলেম ও অসাধারণ চিন্তাবিদ বা পন্ডিত গড়ে তোলারও দ কারিগর । ইরানের শীর্ষ স্থানীয় আলেম, অন্যান্য চিন্তাবিদ ও সংগঠক হিসেবে খ্যাত শহীদ অধ্যাপক আয়াতুল্লাহ মোতাহারী, আয়াতুল্লাহ বেহেশতী , শহীদ প্রেসিডেন্ট রাজাই, শহীদ হুজ্জাতুল ইসলাম ডঃ বহুনার , আয়াতুল্লাহ সাইয়েদ আলী খামেনী, আয়াতুল্লাহ হাশেমী রাফসানজানী, আয়াতুল্লাহ জান্নাতী, আয়াতুল্লাহ তালেকানী, আয়াতুল্লাহ মিশকিনী, শহীদ ডঃ আলী শরিয়তী প্রমুখ বিপ্লবী চিন্তাবিদ ইমাম খোমেনী (রঃ)'র আদর্শের অনুসারী বা তাঁরই হাতে গড়া ছাত্র । তাঁরা ইরানের শিক্ষিত মহলে মার্কসবাদ ও পুঁজিবাদের মত বিষাক্ত মতবাদের অসরতা ও ইসলামের শ্রেষ্ঠত্বকে তুলে ধরে তাদেরকে ইসলামী সমাজ ব্যবস্থা গড়ার আন্দোলনে শরীক করতেও সম হয়েছিলেন । শাহের ঘাতক সেনাদের হাতে তাঁদের অনেকেই শহীদ হয়েছেন এবং শহীদ হয়েছে অসংখ্য ঈমানদার নারী-পুরুষ ও ছাত্র-যুবক । ইসলাম ধর্মের সম্মান রক্ষা ও রাসূল প্রেম ছিল ইমাম খোমেনী (রঃ)'র চিন্তা- চেতনা ও কাজে মজ্জাগত ।

এ প্রসঙ্গে বলা যায়, মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ)'র নির্ভিকতা ও রাসূল প্রেমের এক বড় নিদর্শন হলো কূখ্যাত ধর্মত্যাগী সালমান রুশদীর বিরুদ্ধে তাঁর ঐতিহাসিক ফতোয়া তথা মৃত্যুদন্ডের নির্দেশ । এ ফতোয়া এখনও কার্যকরী রয়েছে । সালমান রুশীদর বিরুদ্ধে ইমাম খোমেনীর ফতোয়া জারির পর সারা বিশ্বে রুশদীর ফাঁসীর দাবীতে মুসলমানদের গণ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয় এবং এ গণ বিক্ষোভে রুশদীর পৃষ্ঠপোষক আমেরিকা ও বৃটেনের বিরুদ্ধে গণজাগরণে রুপান্তরিত হওয়ায় আমেরিকা ও বৃটেনের সরকারও বিচলিত হয়ে পড়ে । আমেরিকার ২৫০০ দোকান থেকে রুশদীর বইটি প্রত্যাহার করে নেয়া হয় । ইউরোপের বিভিন্ন দেশের প্রকাশকরা রুশদীর বইটি অনুবাদ করেও তা প্রকাশ করতে সাহস পায়নি । ইসলামের বিরুদ্ধে পশ্চিমাদের বেপরোয়া সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের এতো শক্ত জবাব দেয়ার সাহস একমাত্র ইমাম খোমেনীই দেখাতে পেরেছেন । পাশ্চাত্যের গণমাধ্যম যখন ইরানী নেতৃবৃন্দের নামে এ মিথ্যা প্রচার শুরু করে যে রুশদি মা প্রার্থণা করলে তাকে মৃত্যুদন্ডাদেশ থেকে অব্যাহতি দেয়া হবে । তখন ইমাম খোমেনী দ্বিতীয় ফতোয়ায় বলেনঃ রুশদী যদি তওবা করে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ আবেদ বা সাধক পুরুষেও পরিণত হয়, তবুও তার মৃত্যুদন্ডাদেশ রহিত করা হবেনা । সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের শেষ প্রেসিডেন্ট মিখাইল গর্বাচভের কাছে ইসলামের দাওয়াত ও সমাজতন্ত্রবাদ ইতিহাসের যাদুঘরে স্থান নেবে বলে তাঁর ভবিষ্যদ্বানী ইমাম খোমেনীকে ইতিহাসে চিরস্মরণীয় করেছে । #

পুঁজিবাদ ও সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি যখন মানুষকে দারিদ্র ও শোষণ থেকে মুক্তি দিতে ব্যর্থ হয়েছে তখন ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ও ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) মানব জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামী বিধান প্রতিষ্ঠার জন্যে তার চিন্তা, লেখনী ও আন্দোলনকে নিয়োজিত করেছিলেন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও তিনি ইসলামী বিধানের যুগোপযোগী ব্যাখ্যা দিয়েছেন এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাকে ইসলামী নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালনার দিক-নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। আজ আমরা অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইমাম খোমেনী (রঃ) অবদান ও এ বিষয়ে তার চিন্তাধারা তুলে ধরবো ।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী তুলে ধরতে গিয়ে মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) বলেছেন, "যে পুঁজিবাদ অত্যাচারী, বেহিসাবী এবং মজলুম জনগণকে বঞ্চিত করে, ইসলাম সে পুঁজিবাদকে সমর্থন করে না, বরং কোরআন ও সুনড়বাহ এ ধরনের ব্যবস্থার সাংঘাতিক নিন্দা করেছে। ইসলাম এ ধরনের পুঁজিবাদকে ন্যায় বিচারের বিরোধী বলে জানে। একইসাথে ইসলাম কমিউনিজম ও মার্কসবাদী লেনিনবাদী সরকার ও তার অর্থনৈতিক ব্যবস্থারও বিরোধী। কারণ কমিউনিজম ব্যক্তিমালিকানার বিরোধী এবং অভিনড়ব মালিকানার নীতিতে বিশ্বাসী। ইসলাম এ দুয়ের মাঝামাঝি বা ভারসাম্যপূর্ণ পন্থা তথা সীমিত মালিকানাকে সমর্থন করে ।" উপনিবেশবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সম্পর্কে ইমাম খোমেনী (রঃ) বলেছেন, " উপনিবেশবাদীরা মুসলিম দেশগুলোতে যে অন্যায্য অর্থনৈতিক ব্যবস্থা চালু করেছে তাতে জনগণ দুটি অংশে বিভক্ত হয়েছে। এক অংশে রয়েছে জালেম এবং অন্য অংশে রয়েছে মজলুম বা নির্যাতিত শ্রেণী। এ ব্যবস্থার ফলে একদিকে কোটি কোটি মুসলমান ক্ষুধার্ত, স্বাস্থ্যসেবা ও সংস্কৃতি থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং অন্যদিকে মতা ও সম্পদের অধিকারী অল্প সংখ্যক মানুষ বিলাসিতা ও দূর্নীতিতে নিমজ্জিত। ক্ষুধার্ত ও বঞ্চিত মানুষেরা উন্নত জীবন যাপনের আশায় লুটেরা শাসকদের জুলুমের নাগপাশ থেকে মুক্তি পাবার চেষ্টা করছে, কিন্তু অল্পসংখ্যক শাসক শ্রেণী ও তাদের শাসন যন্ত্র তাদেরকে বাধা দিচ্ছে। এ অবস্থায় নির্যাতিত ও বঞ্চিত মানুষের পাশে এসে দাঁড়ানো এবং জালেমদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় আমাদের দায়িত্ব।" ইমাম খোমেনীর দৃষ্টিতে শুধু অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করা ইসলামী অর্থ ব্যবস্থার লক্ষ্য নয়, বরং এর লক্ষ্য হলো সমাজ ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার এবং সাম্য বা সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা করা। ইসলামী অর্থনীতি তৌহিদ ভিত্তিক। ইসলামের দৃষ্টিতে সব কিছুর মালিক হলেন আল্লাহ এবং মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডসহ সব কাজেরই লক্ষ্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। ইসলামের বিধান অনুযায়ী সমাজের যিনি শাসক তার অধিকার ও সুযোগ-সুবিধা সমাজের সবচেয়ে নিচু পর্যায়ের ব্যক্তির চেয়ে বেশী হবেনা বরং সমান হতে হবে ।

ইমাম খোমেনী (রঃ)'র মতে ইসলামী অর্থনীতির লক্ষ্য তথা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার অর্থ হলো ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধান কমিয়ে দেয়া এবং অনাকাঙ্ক্ষিত বৈষম্যগুলো দূর করে প্রত্যেক মানুষকে তার প্রাপ্য অধিকার দেয়া । তাঁর মতে, " বিশ্বনবী হযরত মোঃ (সঃ) সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠার জন্যেই ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মহানবী (সঃ)'র আহলে বাইতভূক্ত পবিত্র ইমামগণও সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিচার প্রতিষ্ঠাকে তাদের প্রধান নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন । ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া শুধু শাসন ক্ষমতা হাতে নেয়ার প্রতি তাদের বিন্দুমাত্রও আকর্ষণ ছিলনা ।"

মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) সুদ প্রথার কঠোর বিরোধিতা করে গেছেন। পবিত্র কোরআন সুদ গ্রহণকে আল্লাহর সাথে যুদ্ধের শামিল বলে উল্লেখ করেছে। এরই আলোকে তিনি বলেছেন, " সুদ কল্যাণকর অর্থনৈতিক তৎপরতায় বাধা সৃষ্টি করে এবং সুদ অর্থনৈতিক তৎপরতাকেই কমিয়ে দেয় । সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে চড়া সুদে ঋণ দিয়ে তাদেরকে এমনভাবে শোষণ করছে যে তারা চক্রবৃদ্ধি হারে সুদ দিতে হিমশিম খাচ্ছে। বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর কাছে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর দেনার পরিমাণ প্রায় দশ হাজার বিলিয়ন ডলার। সুদের অন্য একটি কুফল হলো এর ফলে ধনীরা আরো ধনী এবং গরীবরা আরো গরীব হয়। সুদ গ্রহীতা তেমন কোনো পরিশ্রম না করেই নির্দিষ্ট পরিমাণ লাভ গ্যারান্টি সহকারে পেয়ে থাকে, কিন্তু যে ব্যক্তি ঋণ গ্রহণ করলো সে যে তার ব্যবসা বা কারবারে লাভ করতে পারবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই, এমনকি সুদ পরিশোধ করতে গিয়ে হয়তো তাকে আসল পুঁজিরও কিছু অংশ হারাতে হয়। সুদ মানব সমাজে কল্যাণকামীতার চেতনা কমিয়ে দেয় এবং সুদখোর ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান দিন দিন বেশী স্বার্থপর বা মুনাফাকামী হতে থাকে।" ইমাম খোমেনী (রঃ) ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর ইরানের ব্যাংক ব্যবস্থাকেও ইসলামী আইন অনুযায়ী ঢেলে সাজান। তিনি বলেন, " মানুষকে শোষণ না করা এবং সুদ নিয়ে মানুষকে নিঃস্ব না করা ও ইসলামী নীতি অনুযায়ী ইরানের ব্যাংক পরিচালনা করা উচিত।"

মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) বন্ধু দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য ও পণ্য বিনিময়কে গুরুত্ব দিতেন। তবে যে বিনিময় এক দেশের ওপর অন্য দেশের কর্তৃত্ব বা আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে, তিনি তার বিরোধী ছিলেন । গত কয়েক শতাব্দীতে ইউরোপে শিল্প বিপ্লব ঘটেছিল গরীব দেশগুলো থেকে কাঁচামাল ও খনিজ সম্পদ সস্তায় বা বিনামূল্যে সংগ্রহের মাধ্যমে। শ্রম বিভাজন ও সস্তায় শ্রমিকদের ব্যবহার করা ছিল তাদের শোষনের অন্যতম পদ্ধতি। এভাবে তাদের শিল্প বিপ্লবের ফলে বাণিজ্য ঘাটতির শিকার হয়ে তিগ্রস্থ হয়েছে তৃতীয় বিশ্ব। একইসাথে উপনিবেশবাদীরা তৃতীয় বিশ্বে তাদের পন্য রপ্তানীর পাশাপাশি তাদের সাংস্কৃতিক চিন্তাধারাও প্রচার করে তিগ্রস্থ করেছে তৃতীয় বিশ্বের। তাই ইমাম খোমেনী (রঃ) শুধু ভারসাম্যপূর্ণ পণ্য ও বানিজ্য বিনিময়ের কথা বলতেন যাতে কোনো পই ক্ষক্ষত্রুটি না হয়। মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে কৃষি খাতকে অন্য সব খাতের চেয়ে এমনকি শিল্প খাতের চেয়েও প্রাধান্য দিয়েছেন। কারণ, মানুষের প্রাথমিক চাহিদাগুলো পূরনের জন্যে ইসলাম কৃষি খাতকে খুবই গুরুত্ব দিয়েছে। আর এ জন্যেই ইমাম খোমেনী আগে কৃষি ও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে এবং পরে শিল্প খাতে জোর দেয়ার আহবান জানিয়েছিলেন। শিল্পখাতের তৎপরতা যেন কৃষিখাতের তৎপরতায় বিন্দুমাত্র বাধা সৃষ্টি না করে সে জন্যে তিনি সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। তিনি ইরানী জনগণের জন্যে খাদ্য উৎপাদনে নিয়োজিত কৃষকদের তৎপরতাকে জিহাদ বলে উৎসাহ দিয়েছেন।

মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ ) জানতেন, সাম্রাজ্যবাদীরা বিশ্বে খাদ্য ও কৃষি পণ্যকেও তাদের আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। তাই তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে তিনি খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবার পরামর্শ দিয়ে গেছেন। তিনি এ ক্ষেত্রে উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে বিশেষ করে মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার ওপরও গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন। শাহের শাসনামলে ইরান পাশ্চাত্য থেকে চড়া দামে গমসহ বিভিন্ন নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্য কিনতো। সে সময় তেল রপ্তানী থেকে অর্জিত আয়ের শতকরা প্রায় ৯০ ভাগই ব্যয় করা হতো পাশ্চাত্য থেকে খাদ্য আমদানীর ক্ষেত্রে। কিন্তু এখন ইরান গম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ন হয়েছে এবং অন্যান্য অনেক খাদ্যে স্বনির্ভরতার পর্যায়ে পৌঁছেছে। ইমাম খোমেনী (রঃ) বলতেন, "কোনো জাতি কৃষিতে স্বয়ংসম্পূর্ণ হলে অন্যান্য ক্ষেত্রেও সে জাতির স্বাধীনতা ও স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথ প্রশস্ত হয়।" তিনি আরো বলেছেন, "ইরানে চাষাবাদের সুযোগ সুবিধাকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো হলে আমরা ভবিষ্যতে খাদ্য রপ্তানীও করতে পারবো। ইরানে কৃষি খাতকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার জন্যে গ্রামাঞ্চলে যথেষ্ট রাস্তা ও বাঁধ নির্মাণের কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা হয়েছে।"

ইমাম খোমেনী (রঃ) শিল্প খাতকেও গুরুত্ব দিতেন । তবে তিনি এমন সব মৌলিক শিল্পের বিকাশ ঘটাতে বলতেন যা প্রথমতঃ দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে সত্যিকার অর্থে সহায়তা করবে ও দেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে নিয়ে যাবে; দ্বিতীয়তঃ যন্ত্রাংশের জন্যে বা পরিপূরক পন্যের জন্যে শিল্পন্নোত দেশগুলোর ওপর নির্ভর করতে না হয়, বা নির্ভর করতে হলেও খুব সামান্য মাত্রায় নির্ভর করতে হয় এবং তৃতীয়তঃ ঐসব শিল্প বিষয়ে যেন দেশের ভেতরেই বিশেষজ্ঞ গড়ে তোলা যায়। আসলে ইমাম খোমেনী তাঁর এ নীতির মাধ্যমে আধিপত্যকামী দেশগুলোর অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য চাহিদা পূরণের সস্তা হাতিয়ারে পরিণত না হতে এবং তাদের বৈষম্যমূলক আন্তর্জাতিক শ্রম বিভাজন নীতি ও তাদের পন্যের মাধ্যমে সংক্রমিত সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার না হতে তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। ইমাম এটা ভালো করেই জানতেন যে পশ্চিমা দেশগুলো উন্নয়নশীল বা গরীব দেশগুলোকে তাদের শিল্প পণ্য বা পণ্যের যন্ত্রাংশ দিলেও তারা কোনো উন্নত প্রযুক্তি বা মূল প্রযুক্তি দেয়না, ফলে গরীব দেশগুলোকে ঐসব যন্ত্রাংশ মেরামত বা নতুন যন্ত্রাংশ কেনার জন্যে প্রচুর অর্থ ব্যয় করতে হয়। ইমাম খোমেনী (রঃ) চাইতেন - সব ধরনের যন্ত্র নিজেরাই তৈরি করবো- তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলো যেন এ আত্মবিশ্বাস ও কঠিন প্রতিজ্ঞাকেই তাদের শিল্প নীতিতে পরিণত করে। বিদেশের শিল্প পণ্য আমদানীর ফলে দেশের ঐতিহ্যবাহী শিল্প ক্ষত্রুটি হয় বলে তিনি মনে করতেন। অবহেলিত ও বঞ্চিত এলাকায় শিল্প কারখানা স্থাপন করা ছিল ইমাম খোমেনী (রঃ)'র শিল্প সংক্রান্ত আরো একটি দূরদর্শী নীতি।

এভাবে দেখা যায়,ইমাম খোমেনীর অর্থনৈতিক দিক নির্দেশনার ফলে পশ্চিমা দেশগুলোর অসহযোগিতা, বিশেষ করে আমেরিকার অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও ইরান কৃষিক্ষেত্রে অনেকাংশে স্বনির্ভরতা অর্জনের পাশাপাশি শিল্প ক্ষেত্রেও ব্যাপক অগ্রগতি অর্জন করেছে। ইস্পাত, তামা, তেল, গ্যাস ও পেট্রোকেমিকেল শিল্পসহ ইরানের বড় বড় শিল্প কারখানাগুলো এখন ইরানী কর্মী ও বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমেই পরিচালিত হচ্ছে এবং এসব শিল্পে ইরান প্রায় পুরোপুরি স্বনির্ভরতা অর্জন করা ছাড়াও গুণগত এবং পরিমাণগত ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছে। ইরান এখন যাত্রীবাহী বিমান, মটর গাড়ী, বাস, ট্রাক, ট্রাক্টর, রেল ওয়াগন ও বগি এবং রেডিও, টেলিভিশন, রেফ্রিজেটরসহ বিভিন্ন ধরনের অনেক ইলেকট্রনিক সামগ্রী উৎপাদন ও রপ্তানী করছে। সামরিক শিল্পেও ইরান স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের পথে রয়েছে । ইরান কামান, ট্যাংক ক্ষেপনাস্ত্র, এবং এমনকি সাবমেরিনও নির্মাণ করছে । তাই এটা বলা, যায় ইমাম খোমেনী (রঃ) অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও ইরান ও বিশ্বের বঞ্চিত জাতিগুলোকে গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনা দিয়ে গেছেন এবং এসব দিক থেকে তিনি তৃতীয় বিশ্ব ও ইসলামী ইরানের মুক্তিকামী জনগণের জন্যে আদর্শ হয়ে থাকবেন । #

উন্নয়ন আধুনিক বিশ্বে অতি পরিচিত একটি বিষয়। এর সংজ্ঞা নিয়ে নানা মত থাকলেও সাধারণভাবে উন্নয়ন বলতে এমন কাংখিত অবস্থায় উপনীত হবার প্রক্রিয়াকে বোঝায়, যে অবস্থায় উপনীত হলে উন্নয়ন সাধিত হয়েছে বলে মনে করা হয়। বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রধান ইসলামী চিন্তাবিদ ও ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার হযরত ইমাম খোমেনী (রঃ) উন্নয়ন সম্পর্কেও অত্যন্ত ভারসাম্যমূলক, যৌক্তিক এবং বিপ্লবী ধারণা পোষন করতেন। এবারে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো ।

মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) উন্নয়নকে নিছক একটি অর্থনৈতিক বিষয় মনে না করে একে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়ের আলোকে দেখতেন । অবশ্য তিনি মানুষের জীবনোপকরণ বা দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা মেটানোর সাথে সংশ্লিষ্ট অর্থনীতিকেও গুরুত্ব দিতেন। যেমন- তিনি কৃষিকাজ, শ্রম ও শ্রমিকের গুরুত্ব, জনকল্যাণ, দারিদ্র ও বৈষম্য দূর করা, দরিদ্র শ্রেণীর জন্যে বাসস্থান বা আবাসনের ব্যবস্থা করা, শিল্পে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন - প্রভৃতি অর্থনৈতিক উন্নয়নকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। ইমাম খোমেনী অর্থনৈতিক উন্নয়ন বিষয়ে যে কোনো ধরনের চরম পন্থার বিরোধী ছিলেন। সমাজ বা দেশ তার সব শক্তি যেন শুধু অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জন কিংবা শুধু ভোগ-বিলাসের জন্যে নিয়োজিত না করে, সে ব্যাপারে তিনি সবাইকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন । তিনি মনে করতেন পরাশক্তিগুলোর হাতে কুগিত নতুন প্রযুক্তির মাধ্যমে গরীব দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরাশক্তির ওপর নির্ভরশীলতা সৃষ্টি করে।

অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কে ইমাম খোমেনী (রঃ) আরো বলেছেন, "ইসলাম সীমিত মালিকানার প্রতি শ্রদ্ধাশীল । মালিকানা ও ব্যয় সম্পর্কে ভারসাম্যপূর্ণ নীতি মেনে চলা হলে সুস্থ অর্থনীতির চাকাগুলো সচল হয়ে উঠবে এবং একটি সুস্থ রাষ্ট্রের জন্যে জরুরী বলে বিবেচিত সামাজিক ন্যায় বিচারও প্রতিষ্ঠিত হবে।"

ইসলামী ইরানের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) সার্বিক উন্নয়ন তথা সর্বাত্মক উন্নয়নের কথা বলতেন, তবে তিনি সবচেয়ে বেশী গুরুত্ব দিয়েছেন সাংস্কৃতিক উন্নয়নের ওপর । তিনি বলতেন সাংস্কৃতিক উন্নয়ন অর্জিত না হলে উন্নয়ন হবে ভারসাম্যহীন এবং ত্রুটিপূর্ণ । সাংস্কৃতিক উন্নয়ন ছাড়া সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব নয় বলেও তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন; কারণ, তাঁর মতে সংস্কৃতি হলো মানব সমাজের মূল প্রাণশক্তি। মানব সম্পদের উন্নয়নও নির্ভর করে সাংস্কৃতিক উনড়বয়নের ওপর । এ সব কিছুর আলোকে উন্নয়নের লক্ষ্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) বলেছেন, "অবকাঠামোগত অর্থনৈতিক উন্নয়ন জরুরী হলেও এসবই উন্নয়নের একমাত্র লক্ষ্য নয়, বরং বাহ্যিক অর্থনৈতিক দিকগুলো মানুষ ও সমাজের আধ্যাত্মিক উন্নতির ক্ষেত্রে তৈরির উপাদান এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে সারা বিশ্বে শান্তি, ন্যায়বিচার, নিরাপত্তা ও আধ্যাত্মিকতা প্রতিষ্ঠার ভূমিকা মাত্র । ইমাম খোমেনী (রঃ) সমাজের জনগণকে সব বিষয়ে সচেতন ও সুশিতি করে তোলাকে মানব সম্পদ উন্নয়ন তথা উন্নয়ন জোরদারের প্রধান পন্থা বলে মনে করতেন । তিনি বলতেন, রাষ্ট্রের কল্যাণ ও পরিচালনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শিক্ষিত করে তোলার ওপর নির্ভর করে । পুঁজি ও পুঁজি বিনিয়োগ সম্পর্কেও ইমাম খোমেনী ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গী অত্যন্ত স্বচ্ছভাবে তুলে ধরেছেন । ইসলামী রাষ্ট্রের পুঁজি বিনিয়োগ বৃটেন ও আমেরিকার পুঁজিবাদী ব্যবস্থার মতো শুধু মুনাফাকামী বা অন্যদের ওপর শোষণের মাধ্যম হওয়া উচিত নয় বলে তিনি মনে করতেন । কারণ, এ ধরনের পুঁজিবাদীরা দিন দিন মানুষের প্রতি নির্দয় হতে থাকে এবং তাদের চরিত্রও কলুষিত হতে থাকে। একইসাথে ইসলামের পুঁজি ব্যবস্থা কমিউনিজমের অনুরুপ নয় বলেও তিনি ঘোষণা করেছেন। কারণ, কমিউনিজম ব্যক্তি মালিকানাকে মোটেই স্বীকার করেনা। ইসলাম শুধু মানুষের কল্যাণের উদ্দেশ্যে এবং দারিদ্র্যও বঞ্চনা দূর করার লক্ষ্যে পুঁজি বিনিয়োগকে সমর্থন করে এবং সে পুঁজিও হতে হবে সৎ বা হালাল উপায়ে অর্জিত । এ ধরনের পুঁজি বিনিয়োগ মানুষের আধ্যাত্মিকতা, নৈতিকতা ও সংস্কৃতিকে উন্নত করে । ইসলাম যে কোনো বিশেষ শ্রেণী বা পরিবারের হাতে সম্পদ পুঞ্জিভূত হবার বিরোধী সেটাও তিনি স্মরণ করিয়ে দেন । ইসলাম যাকাত, খোমস,সদকা ও বিভিন্ন কর প্রদানের মাধ্যমে বিশেষ শ্রেণীর পুঁজি ও সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে । পুঁজি বা সম্পদের অধিকারী ব্যক্তিরা যেন ইসলামী রাষ্ট্রের কাঠামো এবং নীতি নির্ধারণে কোন প্রভাব ফেলতে না পারে সে বিষয়েও ইমাম খোমেনী(রাঃ) সতর্ক করে দিয়েছিলেন । কারণ, সম্পদের অধিকারী লোকেরা যদি ইসলামী রাষ্ট্রের নীতিমালাকে প্রভাবিত করতে সম হয়, তাহলে ইসলামী রাষ্ট্রের মহান আদর্শ ও লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়িত হবে না ।

পুঁজির সঠিক ব্যবহার সম্পর্কিত ইমাম খোমেনী (রঃ)'র নীতিমালা বিশ্বনবী হযরত মোহাম্মদ (সঃ)'র নীতিমালারই প্রতিচ্ছবি । মহানবী (সঃ) বলেছেন, "সৎ উপায়ে অর্জিত অর্থ বা সম্পদই সৎ মানুষের জন্যে মানানসই বা গ্রহণযোগ্য । পানি ছাড়া নৌকা বা জাহাজ চলেনা, আবার পানির অপপ্রয়োগ নৌকা বা জাহাজকে ডুবিয়ে দিতে পারে, ঠিক তেমনি পুঁজির বৈধ ও সঠিক ব্যবহার মানুষের জন্যে কল্যাণকর এবং পুঁজির অনৈতিক ব্যবহার মানুষের জন্যে ধ্বংসাত্মক ।"

ইমাম খোমেনী (রঃ)'র মতে ইসলামী রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে জনগণ ও সরকার -এ দুইয়ের ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ । এ ছাড়াও মুনাফাকামী পুঁজিবাদী দেশের মতো ইসলামী রাষ্ট্রের অর্থনীতি মূলত বড় বড় কিছু কোম্পানীর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হবে না, বরং ইসলামী রাষ্ট্রের কৃষক, শ্রমিক, ব্যবসায়ী, কর্মচারী ও অন্যান্য পেশার সব মানুষই দেশের অর্থনীতিতে মৌলিক ভূমিকা রাখবে । ইমাম খোমেনী (রঃ) বলেছেন, " সরকার যদি অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে জনগণকে শরীক করতে না পারে এবং দেশের ব্যক্তি মালিকানার খাতগুলো দরিদ্র ও বঞ্চিত শ্রেণীসহ সব শ্রেণীর মানুষের স্বতঃস্ফুর্ত সহযোগিতা না পায়, তাহলে সে সরকার ব্যর্থ হবে । ইসলামী রাষ্ট্রে যদি কোনোভাবে এক শ্রেণীর মানুষ তাদের অর্থ ও যোগ্যতার বলে বেশী সম্পদের অধিকারী হয়ে যায় এবং বঞ্চিত শ্রেণীর লোকেরা কোনো কারণে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ে তাহলে সমাজকে ধনী ও দরিদ্রের দ্বিমুখী মেরুকরণ থেকে রার জন্যে ইসলামী সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হবে বলেও ইমাম খোমেনী (রঃ) দিক নির্দেশনা দিয়ে গেছেন ।

অর্থনৈতিক দিক থেকে ইরান যাতে বিশ্বের মুক্তিকামী জাতিগুলোর কাছে আদর্শে পরিণত হতে না পারে সে জন্যে ইসলামী বিপ্লবের পর আমেরিকা ইরানের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ আরোপ করে । কিন্তু ইমাম খোমেনীর নেতৃত্বাধীন ইসলামী ইরান আমেরিকার এ চাপের কাছে বিন্দুমাত্র নতি স্বীকার করেনি, বরং আমেরিকার এ শত্র"তার ফলে ইরান স্বনির্ভর হবার পথে আরো দৃঢ়-সংকল্প হয় । ইরানের বিরুদ্ধে আমেরিকার অর্থনৈতিক অবরোধ সম্পর্কে মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) বলেছিলেন, "আমেরিকার মতো দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করে আমাদের কি লাভ হবে-যারা আমাদের দেশে লুটপাট করতে চায়? আমাদের সাথে ওদের সম্পর্ক কি লুটেরা বা শোষকের সাথে শোষিতের সম্পর্ক ছাড়া অন্য কিছু? কেন আমরা আমেরিকার সাথে সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে যাব, যে আমেরিকা সমস্ত দরজাগুলো বন্ধ করে আমাদের ওপর অর্থনৈতিক অবরোধ চাপিয়ে দিয়েছে?

মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) দরিদ্র ও বঞ্চিত শ্রেণীর অর্থনৈতিক কল্যাণের জন্যে কাজ করাকে বড় ইবাদত বলে মনে করতেন এবং দরিদ্রদের সুদবিহীন ঋণ দিয়ে ও বিভিন্নভাবে তাদের মেধার বিকাশ ঘটিয়ে এই শ্রেণীকে স্বনির্ভর করতে জোর দিয়েছেন। তিনি পৃথিবী থেকে দারিদ্রকে নির্মূল করার জন্যে গোটা বিশ্বের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের কথা বলতেন । এ জন্যে তিনি দরিদ্র জাতিগুলোকে হতাশা ভুলে আত্মবিশ্বাসী হবার পরামর্শ দিয়েছেন । ইমাম খোমেনী(রঃ) অর্থনৈতিক উন্নয়নসহ সব ধরণের উন্নয়নের জন্য গবেষণা ও নব-উদ্ভাবনের উপরও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। উন্নয়ন ও সামাজিক ন্যায় বিচারও যে পরস্পরের সাথে অবিচ্ছেদ্য সূত্রে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত এবং এ দুইয়ের একটিকে অপরটির জন্যে বিসর্জন দেয়া উচিত নয়-ইমামের এ দৃষ্টিভঙ্গীকে ইসলামী অর্থনীতির প্রধান সূত্র বলা যায়। সমাজ দরিদ্র থেকে গেলে, সেখানে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা বা সম্পদ ও সুযোগের সমবন্টনের কথা বলা অর্থহীন। অর্থাৎ দরিদ্র সমাজে অর্থনৈতিক ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার অর্থ দারিদ্রের সুষম বন্টন ছাড়া অন্য কিছু বোঝায় না। মরহুম ইমাম খোমেনী(রঃ)এর এসব বিপ্লবী দৃষ্টিভঙ্গীর আলোকে বলা যায়, তিনি ছিলেন সমকালীন বিশ্বে অর্থনৈতিক মুক্তি, সংস্কার ও শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার এক মহান দিশারী এবং অর্থনৈতিক জিহাদের অন্যতম প্রধান পথিকৃৎ। #