এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 22 অক্টোবার 2012 19:20

কাবার পথিক, নাওনা আমায় সঙ্গে

 

“কাফেলাতে কে যাও তুমি, কে যাও বেয়ে তরী

আমায় যাও না ও ভাই সঙ্গে লয়ে খানিক কৃপা করি”

 

কাবাঘর পৃথিবীর প্রথম ইবাদত-কেন্দ্র। মহান আল্লাহ সমুদ্রে ডুবে-থাকা পৃথিবীর স্থল-ভাগের মধ্যে প্রথমেই যে অংশটিকে জাগিয়ে তুলেছিলেন তা ছিল পবিত্র কাবা-ঘর সংলগ্ন কিছু জমি। এর পর ধীরে ধীরে জাগিয়েছেন অন্যান্য শুষ্ক জমি। যুগে যুগে একত্ববাদে বিশ্বাসী মানুষের বার্ষিক মিলন-মেলার স্থল এই পুণ্যভূমি। খোদাপ্রেমে দগ্ধ হওয়ার এই স্থান মানুষের সব ধরনের আত্মকেন্দ্রীকতা ও কৃত্রিম সব নির্ভরতা থেকে মুক্ত হয়ে এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহর দিকে হিজরতের স্থান।  

 

ইসলামের অনন্য ইবাদত পবিত্র হজ্ব আসন্ন। জিলহজ্ব মাসের পবিত্র এই দিনগুলোয় লাখ লাখ মানুষ সমবেত হয়েছেন পুণ্যভূমি মক্কায়। একত্ববাদী জনতার সমুদ্রগুলো মিলিত হচ্ছে তৌহিদি বিশ্বাসের প্রতীক তথা কাবা নামক অভিন্ন মোহনায়। হ্জ্ব উতসব ও ইবাদত হযরত ইব্রাহিম (আ.)’র দোয়ার ফসল। হজ্ব আমাদের সেই দিনটির কথা মনে করিয়ে দেয় যেদিন মুসলিম জাতির পিতা হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর স্ত্রী  বিবি হাজরা (সা.)-কে শিশুপুত্র ইসমাইল (আ.)সহ পর্বতবেষ্টিত পবিত্র মক্কার নির্জন মরুতে নিয়ে এসেছিলেন। সেদিন তিনি তাঁর দোয়ায় বলেছিলেন: “হে আমাদের প্রভু! আমি আমার বংশধরদের মধ্য হতে একজনকে তোমার পবিত্র ঘরের কাছে পানিহীন ও ঘাসহীন অনুর্বর উপত্যকায় বসবাসের জন্য রাখলাম । হে প্রভু! এটা এ জন্য যে, তারা যেনো নিয়মিত নামাজ কায়েম করে। সুতরাং মানুষের মধ্যে কিছু লোকের হৃদয়কে তাদের প্রতি ভালোবাসাতে পূর্ণ করে দাও এবং ফলমূল দিয়ে তাদের জীবিকার ব্যবস্থা কর যেনো তারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে পারে।”(১৪:৩৭)

 

সেই থেকে শুরু হয় পবিত্র হজ্বের প্রচলন। মহাবরকতময় ও মহতী এই উতসবের  রয়েছে তাতপর্যে ভরপুর প্রতীকি নানা দিক। এ উতসবের নানা আনুষ্ঠানিকতার রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন দর্শন ও হিকমত বা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম নানা লক্ষ্য এবং শিক্ষা। হজ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি হল আল্লাহর প্রকৃত বান্দা বা দাস হতে আগ্রহী হওয়ার প্রমাণ দেয়া।

ইসলামী শিক্ষা মানুষের প্রকৃতিগত বলেই তা বিশ্বজনীন। তাই ইসলামের বিধান সব যুগের ও সব জাতির মানুষের জন্য মানানসই। ইসলামের অন্যতম বিধান হজ্বও এর ব্যতিক্রম নয়।  সব যুগে এবং সব দেশেই মানুষের সব ধরনের আত্মিক, দৈহিক, মানসিক ও সামাজিক চাহিদাগুলো মেটায় ইসলামী বিধান। হজ্বের তাতপর্যময় ও প্রতীকী আনুষ্ঠানিকতাগুলো বর্ণাঢ্য ও বৈচিত্র্যময়।

 

হজ্বযাত্রীরা বহু দূর থেকে বিপুল অংকের অর্থ ব্যয় করে মক্কার উপকণ্ঠে কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থানে এসে নিত্যদিনকার পোশাক ত্যাগ করে  ওমরাহ হজ্ব পালনের উদ্দেশ্যে সাদা পোশাক পরে ইহরাম বাঁধেন। এরপর তারা কাবা ঘরের চারদিক সাতবার তাওয়াফ বা প্রদক্ষিণ করেন।

এরপর সাফা ও মারওয়া নামক পাহাড়ের মধ্যে সাত বার আসা-যাওয়া করা, এই আসা-যাওয়ার পথে কখনও ধীরে ও কখনও দ্রুত গতিতে প্রায় দৌড়ানোর গতিতে চলা এবং সবশেষে চুলের বা নখের কিছু অংশ ছোট করার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয় ওমরাহ হজ্ব।

 

ওমরাহ হজ্বের পর শুরু করতে হয় মূল হজ্বের আনুষ্ঠানিকতা।  বড় হজ্বের ক্ষেত্রে তাওয়াফ পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকতাগুলো ওমরাহ হজ্বের মতই অভিন্ন।  শুধু জীবনের প্রথম হজ্বের ক্ষেত্রে হজ্বযাত্রীদেরকে মাথার সব চুল কামাতে হয় সাফা-মারওয়ার মধ্যে‘সাই’ করা বা আসা-যাওয়ার পর।  যারা এর আগেও হজ্ব করেছেন তাদের জন্য এক্ষেত্রে চুল কামানো বাধ্যতামূলক নয়, এক্ষেত্রে চুলের একাংশ ছোট করলেই চলে। মূল বা বড় হজ্বের ক্ষেত্রে চুল কামানো বা খাটো করার পর যেতে হয় আরাফাতের ময়দানে। সেখানে অর্ধ দিন থাকার পর যেতে হয় ‘মাশআরুল হারাম বা মুজদালাফা’ নামক স্থানে। সেখানে কয়েক ঘণ্টা অবস্থানের পর সূর্য ওঠার সময় রওনা দিতে হয় মিনার দিকে। মিনার একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের কয়েকটি স্থানে শয়তানের দিকে পাথরের টুকরো নিক্ষেপের পর কুরবানি করেন হজ্বযাত্রীরা।

 

কুরবানির পর আবারও কাবার চারদিকে সাতবার তাওয়াফ এবং সাফা মারওয়ার মধ্যে সাত বার যাওয়া আসা করেন হজ্বযাত্রীরা। (অবশ্য মুসলমানদের একটি মাজহাব তাওয়াফুননিসা নামে পরিচিত  কাবা ঘরের চারদিকে এই দ্বিতীয়  তাওয়াফ করেন না।)  আর এর মধ্য দিয়েই শেষ হয় পবিত্র হজ্ব পালন। যারা মক্কায় আসার আগে মদীনায় যাননি তারা মদীনায় রাসূলের (সা.) রওজা জিয়ারত করে ও এই পবিত্র শহরের  মধ্যে এবং আশপাশে অবস্থিত ইসলামের ইতিহাসের নানা নিদর্শন দেখে নিজ নিজ দেশে ফিরে যান। আর যারা আগেই মদীনায় থেকে এইসব দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন ও রাসূল (সা.)’র রওজা জিয়ারত সম্পন্ন  করেছেন তারা মক্কা থেকেই  হজ্বের সুখময় অনুভূতি নিয়ে ফিরে যান নিজ নিজ শহর বা দেশে।

 

জীবনে একবার হজ্ব পালন করা ফরজ বা অবশ্য পালনীয় ইবাদত। অবশ্য অনেকে জীবনে একবারের বেশি হজ্ব করার সুযোগও পান না। হজ্ব একজন হাজীর জীবনে কি বড় ধরনের পরিবর্তন আনে?  হজ্ব যাত্রীদের এতসব কষ্ট ও পরিশ্রম-সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল আমলগুলোর উদ্দেশ্য ও অর্থই বা কী?

 

একবার ইসলাম ধর্ম-বিদ্বেষী এক উদ্ধত কাফের বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র নিষ্পাপ বংশধর বা আহলে বাইতের সদস্য হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-কে  প্রশ্ন করেন, “ এই কালো পাথরের আশ্রয়ে আর কতকাল থাকবেন? পাথর ও মাটি দিয়ে তৈরি এই ঘরের পূজা আর কতকাল করবেন?  আর কেনই বা সাফা মাওয়ার মধ্যে ওইভাবে আসা-যাওয়া করছেন?”

উত্তরে হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.) বলেন, “এই কাবা ঘরের মাধ্যমে আল্লাহ নিজের বান্দা বা দাসদের তাঁর ইবাদতে লিপ্ত করেন ও তাঁর প্রতি বান্দাদের আনুগত্যের মাত্রা পরীক্ষা করেন। আর তাই আল্লাহ এ ঘরের প্রতি সম্মান জানাতে ও এই ঘর পরিদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন তাঁর বান্দাদের প্রতি এবং এ ঘরকেই নামাজের কিবলা বা আল্লাহ অভিমুখী হওয়ার প্রতীকী দিক হিসেবে নির্ধারণ করেছেন। কাবা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের কেন্দ্র বা মাধ্যম এবং আল্লাহর ক্ষমা লাভের মাধ্যম। তাই মানুষের জন্য নানা নির্দেশ দেয়ার ও নানা বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপের সবচেয়ে উপযুক্ত সত্তা  বা কর্তৃপক্ষ হলেন মহান আল্লাহ। তিনিই বিভিন্ন চেহারা বা আকৃতি ও প্রাণ সৃষ্টি করেছেন।” 

 

তাই এটা স্পষ্ট, হজ্বের রয়েছে বাহ্যিক ও আধ্যাত্মিক দিক। হজ্ব মানুষকে কুপ্রবৃত্তি, শয়তানের প্ররোচনা এবং জালিম ও তাগুতি শক্তিগুলোকে অস্বীকার করতে শেখায় যাতে তারা কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকেই সব কিছুর উর্ধ্বে স্থান দেয়। আর এটা যে সহজ নয় তা স্পষ্ট। কিন্তু হযরত ইব্রাহিম (আ.)’র মত মহাপুরুষ এবং তাঁর সন্তান ও স্ত্রী এই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।

হজ্বযাত্রী যখন বলেন, লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক তখন তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সব ধরনের ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত বলেই ঘোষণা করেন। তাই হজ্বের প্রকৃত লক্ষ্য অর্জনের জন্য দরকার উদ্দেশ্য বা নিয়্যতের পবিত্রতা ও আন্তরিকতা। হজ্ব সব ধরনের পাপ বর্জন করতে ও মনকে আল্লাহ ছাড়া অন্য সব কিছুর কর্তৃত্ব থেকে মুক্ত করতে শেখায়। অন্যকথায় সব ধরনের পাপ বর্জনের  দৃঢ় অঙ্গীকার হজ্ব কবুল হওয়ার অন্যতম শর্ত। #

 

 ২য় পর্ব

পবিত্র কাবাঘরের দিকে একবার অন্তর্চক্ষু মেলে ধরে দেখুন তো। কেমন চমৎকার দৃশ্য তাই না! সবকিছুই গতিময় বৃত্তে আবর্তিত হচ্ছে। সবাই ঐক্যবদ্ধ, ভেদাভেদহীন প্রাণময়। ঐশী এই বিশেষ ভূখণ্ডে মহান দ্বীন ইসলামের অভূতপূর্ব শক্তির বার্তাই যেন পুনরায় ঘোষিত হচ্ছে। নূরানী এই কেবলার পথিকেরা সবাই একাত্ম, কাবার পাশে সবাই অভিন্ন ধ্বনি তুলে মহান সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর মহত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষ্য দিচ্ছে। চলুন আমরাও তাঁদের সাথে সুর মিলিয়ে তাঁদের কাতারে শামিল হয়ে উচ্চারণ করিঃ  

‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক, লাব্বাইক লা শারিকা লাকা লাব্বাইক, ইন্নাল হামদা ওয়ান্নি’মাতা লাকা ওয়াল মুল্‌ক, লা শারিকা লাকা লাব্বাইক।”

 

হজ্ব মানে সুর, হজ্ব মানে লক্ষ্য। যাদের লক্ষ্য হচ্ছে কাবা ঘর তাদের উচিত হলো এই সফর সম্পর্কে সচেতন হওয়া। এখানকার যতোগুলো অবশ্য করণীয় হুকুম আহকাম রয়েছে অর্থাৎ যেসব কাজ করতে হয় হজ্ব করতে গেলে, সেগুলো যেন না জেনে করা না হয়। কেননা সঠিকভাবে করণীয় কাজগুলোর সাথে পরিচিত হওয়া এবং যথার্থ দৃষ্টিতে সেগুলোকে দেখা খোদার ঘরের যিয়ারতকারীদেরকে সত্যের দিকে, সঠিক পথের দিকে পরিচালিত করবে। আর তা হলে আল্লাহর প্রতি প্রেম ও ভালোবাসা এবং তাঁর প্রতি অনুরক্তি বেড়ে যাবে। সবচেয়ে বড়ো কথা হলো হজ্বের করণীয় আমলগুলো পালনের মজা কয়েকগুণ বেড়ে যাবে। প্রেমের গলিপথের পথিকেরাশুধুমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই নিজেদের নিয়্যত স্থির করেছেন। পৃথিবীর অন্য সকল লেনাদেনা থেকে, সকল প্রকার সম্পৃক্তি থেকে নিজেদেরকে মুক্ত রেখেছেন।লক্ষ লক্ষ মানুষ এক টুকরো সাদা কাপড় পরে মানব সমুদ্রের একটি বিন্দুর মতো ছুটে যাচ্ছেন কাবার দিকে। তাঁরা যাচ্ছেন আল্লাহর আমন্ত্রণে সাড়া দিতে। পবিত্র কুরআনে এসেছেঃ

“.........................মানুষের মধ্য থেকে যারা সেখানে পৌঁছার সামর্থ রাখে, তারা যেন এই গৃহের হজ্ব সম্পন্নকরে....................।”

 

এহরামের শুরুটা হয় গোসল করার মধ্য দিয়ে। এই গোসলের অর্থ হলো পবিত্র হওয়া। আর এহরামের হেকমত হলো যিয়ারতকারীগণ যখন এহরাম বাঁধার স্থান বা মিকাতে  গিয়ে উপস্থিত হয়,তখন তাঁদের চিন্তায় কেবল এ বিষয়গুলোই কাজ করে তা হলোঃ কীভাবে ঐশী হেরেম বা পবিত্র স্থানে প্রবেশ করবে এবং সেখানকার পবিত্রতা, মর্যাদা ও সম্মান রক্ষা করবে, কীভাবে আল্লাহর আদেশ নিষেধগুলো মেনে চলবে, কীভাবে সচেতনভাবে অভীষ্ট্য লক্ষ্যে পৌঁছার জন্যে এখানকার করণীয় আমলগুলো পালন করবে। ইমাম সাদেক (আ) বলেছেনঃ“আল্লাহর স্মরণ এবং তাঁর ইবাদাত করা থেকে যা কিছু তোমাকে দূরে সরিয়ে রাখে সেসব পরিহার করে চলো।” মিকাত নামক স্থান থেকেইহজ্বের এহরাম বাঁধতে হয়। মিকাত মোট পাঁচটি।হজ্বের অনেক আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে। এইসব আনুষ্ঠানিকতা দুনিয়া এবং আখেরাতের মাঝে আন্তরিক এক যোগাযোগের সেতুবন্ধন রচনা করে। কিয়ামতে হাশর-নশর, পুনরুত্থান ইত্যাদি বিষয়কে মেনে নেওয়ার মতো মন মানসিকতা তৈরি করে।

 

হজ্ব করার জন্যে আপন ঘর ছেড়ে, পরিবার পরিজনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বহু শহর-নগর, দেশ, সাগর-নদী, প্রান্তর অতিক্রম করার মানসিকতা নিয়ে আধ্যাত্মিক এই সফর শুরু করতে হয়। মনে হয় যেন এই সফর হচ্ছে পরকালীন বিশ্বে যাবার সফর। এহরাম বেঁধে হজ্বের আনুষ্ঠানিকতাগুলো পালন করার মধ্য দিয়ে সেই হাশরের দৃশ্যই যেন ফুটে ওঠে। এটা এমন এক পোশাক যে পোশাক পরলে কারো মনেই আর অহংকার কাজ করার সুযোগ থাকে না। নিজেকে ছোট্ট মনে হয়। নিজেকে আরেকজনের উপরে শ্রেষ্ঠ বলে মনে হয় না কিংবা এমনটি ভাববারও অবকাশ থাকে না। এই অনুভূতিটা একজন হজ্বযাত্রীর মনে গভীর প্রভাব ফেলে। পোশাকের বাহ্যিক জাঁকজমক মানুষের মনে অহমিকা জাগায়, এই পোশাক সেই অহমবোধ থেকে হজ্বযাত্রীদের দূরে রাখে। ইমাম সাদেক (আ) শিবলি নামের একজন হজ্বযাত্রীকে এ বিষয়ে জিজ্ঞেস করেছিলেন এভাবেঃ

-তুমি হজ্ব করেছো?

শিবলিঃ  জ্বি।

-মিকাতে পৌঁছে নিজের সেলাই করা জামাকাপড় খুলে গোসল করে পবিত্র হয়েছো?

শিবলিঃ  জ্বি।

-মিকাতে কি এই মর্মে নিয়্যত করেছো যে অহংকার আর ঔদ্ধত্যের পোশাক ঝেড়ে ফেলে বিনয় এবং আল্লাহর আনুগত্যের পোশাক পরবে?

শিবলিঃ  জ্বি না!

-রিয়া, দোদুল্যমানতাকে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার করে ফেলার নিয়্যত করো নি?

শিবলিঃ  জ্বি না!

-হজ্বের নিয়্যত করার সময় এই চিন্তা করেছো যে আল্লাহর আদেশ ছাড়া অন্য সকল বিধি নিষেধ প্রত্যাখ্যান করবে?

 

শিবলি নেতিবাচক জবাব দিলো। ইমাম বললেনঃ তুমি না এহরাম বেঁধেছো, না পবিত্রতা অর্জন করেছো, না তুমি হজ্বের নিয়্যত করেছো।

এহরাম বাঁধা অবস্থায় যেসব কাজ করা হারাম বলে ঘোষিত হয়েছে,তা মেনে চললে মনের কামনা বাসনা প্রতিরোধ করার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, শক্তিশালী হয়। যেমন শিকার করা, কোনো প্রাণীকে হয়রানী না করা, মিথ্যা বলা পরিহার করা, গালিগালাজ কিংবা অশ্লীল কথাবার্তা না বলা, কারো সাথে ঝগড়াঝাটি না করা ইত্যাদি। এসব নিষেধাজ্ঞা হজ্বের নির্ধারিত কিছু সময়ের জন্যে দেওয়া হলেও এগুলো আসলে সারা জীবনের জন্যে প্রশিক্ষণ। তার মানে হলো হজ্বের সময়কার এই শিক্ষাগুলো একজন হজ্বযাত্রীকে সারাজীবন ধরে পালন করে যেতে হবে কেননা এইসব শিক্ষা হলো মানবীয় পূর্ণতায় পৌঁছার সরল পথ। এইসব নিষেধাজ্ঞার দর্শন নিয়ে চিন্তা করলে দেখা যাবে উদ্ভিদ এবং পশু বা প্রাণীজগতের পরিবেশ রক্ষা করার পাশাপাশি সৃষ্টিজতেরছোটো বড়ো সবার অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানোই হচ্ছে এসব আহকামের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য।

 

সুতরাং কেউ যদি প্রশিক্ষণের এ ধরনের আমলগুলো না করে তার মানে হলো তাকওয়া অর্জনের একটি সিঁড়ি থেকে নিজেকে দূরে রাখলো। অথচ এই কাজগুলো একজন হাজীকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেয় যে এর ফলে বহুরকমের কামনা বাসনার প্ররোচনা থেকে হজ্বযাত্রীকে মুক্ত রাখে। আর এটাই তাকওয়া অর্জনেরক্ষেত্র সৃষ্টি করে।তাই হজ্ব বা ওমরার এহরাম থেকে মুক্ত হবার পর একজন হাজী যখন নিজের শহরে বা বাড়িতে ফিরে আসে, তখন হজ্বের সেই নিষেধাজ্ঞার প্রশিক্ষণকে স্মরণে রেখে এমনভাবে চলতে হবে যাতে তার আচরণে অন্যরা কষ্ট না পায়। নিজের ভেতরটাকে অর্থাৎ চিন্তাভাবনা, কথাবার্তা, আচার আচরণকে এমনভাবেনিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষা করতে হবে যেন তা ঐশী পথ ছাড়া অন্য কোনো দিকে ধাবিত না হয়।

 

এহরামের পোশাক পবিত্র হওয়া ছাড়াও সেলাইবিহীন হওয়া উচিত। তবে নারীদের পোশাকের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম রয়েছে। এহরামের পরবর্তী পর্যায়ের কাজটি হলো দুই রাকাত নামায আদায় করা। নামাযের পর সর্বশেষ কাজটি হলো তালবিয়া পড়া। তালবিয়া সম্পর্কে নবীজী বলেছিলেনঃ “কেউ যখন আল্লাহর কাছ থেকে পুরস্কার লাভের আশায় ইমান ও আশাবাদী মন নিয়ে সত্তরবার তালবিয়া পড়ে, আল্লাহ তখন হাজার হাজার ফেরেশতাকে সাক্ষী হিসেবে পাঠান যাতে তারা সাক্ষী থাকে যে তালবিয়া পাঠককে দোযখ থেকে মুক্তি দেওয়া হলো।” এই তালবিয়া পাঠের মাধ্যমে আল্লাহর সাথে ধীরে ধীরে বান্দার সম্পর্ক দৃঢ় থেকে দৃঢ়তরো হতে থাকে।

 

তিন

হজ্বযাত্রী যখন কাবা ঘরের চারদিক প্রদক্ষিণ করেন তখন তিনি যেন নিজেকে একত্ববাদের কক্ষপথে স্থাপন করেন। পতঙ্গ যেমন প্রদীপের দিকে আকৃষ্ট হয়ে পুড়ে যেতে প্রস্তুত থাকেতেমনি কাবা প্রদক্ষিণও খোদা-প্রেমের সর্বোচ্চ আকর্ষণের প্রতীক।  এ প্রেম ধুয়ে মুছে ফেলে শির্ক তথা আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করার মত নানা পাপসব ধরনের পাপ-পঙ্কিলতা। তাওয়াফ শেষে হজ্বযাত্রী মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে দু-রাকাত নামাজ আদায় করেন। এরপর দয়াময় এক আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য বিশেষ সিজদা বা শোকরানা-সিজদা আদায় করেন।

 

হজ্বের নানা আমলের মধ্যে রয়েছে  নানা ধরনের উন্নত গুণ, আচার-আচরণ ও উচ্চতর আদর্শের প্রদীপ্ত শিক্ষা। এইসব শিক্ষা মানুষকে আত্মসংশোধনে ও মহত গুণ অর্জনে উদ্বুদ্ধ করে। এভাবে হজ্ব  মানুষকেউচ্চতর আধ্যাত্মিক পর্যায়ে উন্নীত করার সুযোগ এনে দেয়। হজ্ব  মহান আল্লাহর জন্য দাসত্ব তথা ইবাদতের ও নম্রতা প্রকাশের সুন্দরতম ক্ষেত্র।

বিখ্যাত আধ্যাত্মিক সাধক ও আলেম মির্যা জাওয়াদ মালিকি তাবরিজি এ প্রসঙ্গে লিখেছেন: “হজ্বসহ অন্যান্য ইবাদতগুলোর অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হল আধ্যাত্মিকতাকে জোরদার করা যাতে মানুষ দেহের জগত থেকে আধ্যাত্মিক জগতে উন্নীত হয় এবং আল্লাহর পরিচয়, বন্ধুত্ব ইত্যাদি অর্জনের মাধ্যমে সম্মানের আলয়ে আল্লাহর ওলিদের সঙ্গে থাকার সুযোগ পায়।”

একজন মানুষ আল্লাহর কতটা অনুগত তা বোঝার মাধ্যম হল হজ্ব। অন্য কথায় এই ইবাদত মানুষের খোদাভীরুতা প্রমাণের অন্যতম মাধ্যম।

 

হজ্ব সব ধরনের আত্মকেন্দ্রীকতা ও আল্লাহ ছাড়া অন্য সব কিছুর নির্ভরতা থেকে মুক্ত হওয়ার শিক্ষা দেয়। বলা হয় মুমিনের হৃদয় আল্লাহর বাসস্থান। এঘরে যদি সামান্যতম পাপ-পঙ্কিলতা থাকে তাহলে সে খাঁটি মুমিন হতে পারবে না। তাই হজ্ব পালনের সময় মুমিন বিভিন্ন অবস্থায় কেবল আল্লাহকেই স্মরণ করেন। কখনও একাকী বা নির্জনে, কখনও বা প্রশান্ত অবস্থায় এবং কখনওবা অস্থির ও  ব্যাকুল হৃদয়ে এদিক-সেদিকে ছুটে গিয়ে খোদা-প্রেমের আকুলতা প্রকাশ করেন।

 

পাহাড়ে, মরু-প্রান্তরে, সমতলে, জলে-স্থলে ও দিন বা রাতে প্রভুর প্রেম ছাড়া হজ্বযাত্রীর মনে কোনা শান্তি ও সুখ নেই। খোদা-প্রেমিক সব খানেই দেখেন আল্লাহর অপার মহিমার নিদর্শন। এভাবে খোদা-প্রেমিক হজ্বযাত্রী অন্য-সব কিছুর আকর্ষণ থেকে নিজেকে মুক্ত করে সবচেয়ে খাঁটি ও প্রকৃত প্রেমের জগতে বিচরণ করেন হজ্ব নামক মহাপ্রেমের মিলন-মেলায়।

পুণ্যভূমি মক্কায় পদধূলি পড়েছে হাজারো নবী-রাসূলের। এখানেই একদিন বিশ্বনবী  হযরত মুহাম্মাদ(সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত এবং ন্যায়পরায়ণ অনেক সাহাবা একত্ববাদের ঝাণ্ডা তুলে ধরেছিলেন অকল্পনীয় ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে।

 

এই মক্কাতেই একদিন বিশ্বনবী (সা.)’র পূর্বপুরুষ হযরত ইব্রাহিম (আ.) ও তাঁর  সন্তান হযরত ইসমাইল (আ.) খোদা-প্রেমের এক অতি-উচ্চ এবং কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।  এখানেই পবিত্র হজ্বের প্রাক্কালে আরাফাতের ময়দানে নয়ই জ্বিলহজ্ব বা  আরাফাত দিবসেশহীদদের সর্দার হযরত ইমাম হোসাইন (আ.) জীবনে শেষবারের মত মক্কায় অবস্থানকালে উপহার দিয়েছিলেন খোদাপ্রেমের অমর বাণীতে সিক্ত অনন্যমুনাজাতদোয়ায়ে আরাফাহ। ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় আত্মত্যাগের  রেকর্ড গড়ার প্রস্তুতি নেয়ার প্রাক্কালে উচ্চারিত ইমামের অশ্রু-ভেজা অনন্য সেই দোয়া হজ্বযাত্রীদের অন্তরকে আজো বেদনা-বিধুর করে।

 কাবা ঘরকে বলা হয় মসজিদুল হারাম। এর অর্থ  মহান আল্লাহর সংরক্ষিত এই স্থানেসবাই নিরাপদ । এখানে মানুষ, পশু-পাখি,  মশা-মাছি, গাছপালা, ফুল ও  এমনকি ঘাসও সব ধরনের অনিষ্টতা থেকে মুক্ত। 

 

কাবা ঘর নির্মিত হয়েছিল হযরত আদম (আ.)’র জীবদ্দশায়। পৃথিবীর প্রথম ইবাদত গৃহ কাবা নির্মাণ শেষে তিনি তার চারদিকে প্রদক্ষিণ করেছিলেন।হযরত ইব্রাহিম (আ.) এ ঘর পুনর্নির্মাণ করেছিলেন যাতে তার পরিবার ও বিশ্বের মুসলমানরা এখানে নামাজ আদায় করতে পারেন। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি এক দিন সন্ধ্যা পর্যন্ত লাব্বাইক বলবে তার সব গোনাহ মাফ হয়ে যাবে ও সে হয়ে পড়বে নবজাতক শিশুর মত নিষ্পাপ।

 

পবিত্র কাবা ঘরের উচ্চতা ১৫ মিটার। এর দৈর্ঘ্য ১২ মিটার ও প্রস্থ ১০ মিটার। একটি সমতল ক্ষেত্রের মাঝখানে অবস্থিত এ ঘরের চারদিকে রয়েছে মসজিদুল হারাম। এই ঘর খুবই সাদামাটা ও জাঁকজমকহীন হওয়া সত্ত্বেও দেখতে খুবই আকর্ষণীয় এবং ঔজ্জ্বল্যে ভরপুর।  কাবা ঘরের সাদামাটা সৌন্দর্য ও অনাড়ম্বরতাই একে দিয়েছে অনন্যতা এবং শ্রেষ্ঠত্ব।

আজকাল কাবা ঘরের কাছাকাছি এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে বহুতল বিশিষ্ট অভিজাত নানা ভবন, হোটেল ও বাণিজ্য কেন্দ্র। এটা এই পবিত্র স্থানের আধ্যাত্মিক পরিবেশের পরিপন্থী।

 

আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.) কাবা ঘরের  গুরুত্ব ও মহত্ত্ব তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, “মহান আল্লাহ কাবাঘরের স্থান নির্ধারণ করেছেন পাথুরে পাহাড়ও স্বল্প পানিযুক্ত একটি কম জনবসতিপূর্ণ এলাকায় তাদের জাগরণের ও দৃঢ়তার মাধ্যম হিসেবে। তিনি চেয়েছেন আদম ও তাঁর সন্তানরা যেন এ ঘরমুখি হয় এবং তাদের মনকে এদিকে কেন্দ্রীভূত করে ও এ ঘরের চারদিকে ‘লা-ইলাহ ইল্লাল্লাহ’ বা আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই-একথা বলে। আল্লাহ যদি চাইতেন তাহলে নিজের ঘরকে পৃথিবীর সবচেয়ে ভাল ও সুন্দরতম স্থানে প্রতিষ্ঠা করতে পারতেন। তিনি এ ঘরের পাথরগুলোকে সবুজ মর্মর বা লাল চুনি পাথরের করতে পারতেন। কিন্তু আল্লাহ তাঁর বান্দাদেরকে নানা বিপদ-আপদের মধ্যে পরীক্ষা করেন। তিনি চান তারা নানা অভাব-অনটনের মধ্যেও তাঁর ইবাদত করুক। তাই তিনি তাদেরকে দুঃখ-দুর্দশায় নিপতিত করেন। এসব কিছুই দেয়া হয়েছে তাদের মন থেকে সব ধরনের অহংকার ও গরিমা দূর করার জন্য এবং তাদেরকে বিনয়ী করে তোলার জন্য এবং তাঁর দয়া ও ক্ষমা সহজতর করার উপায় হিসেবে।”

 

বিখ্যাত ইরানি আলেম মোল্লা মুহাম্মাদ নারাকীর মতে, মহান আল্লাহ কাবা ঘরকে নিজের সঙ্গে সম্পর্কিত করে এ ঘরকে মহিমান্বিত করেছেন এবং এ ঘরকে বান্দাদের জন্য ইবাদতের স্থান হিসেবে নির্ধারণ করেছেন ও এ ঘরের চারদিকে শিকারসহ গাছ উপড়ানো নিষিদ্ধ করে মক্কাকে মানুষের জন্য  নিরাপদ অঞ্চল করেছেন। আল্লাহ এ ঘরের মর্যাদা রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তিনি দূর-দূরান্ত থেকে মানুষকে এ ঘরের কাছে আসতে বলেছেন যাতে তারা এ ঘরের মালিকের প্রতি বিনম্রতা দেখাতে পারে এবং তাঁর  মহাসম্মানিত আলয়ে মানুষ হয় সুবিনীত।

 

কাবা ঘর এমন স্থান যার চারদিকে প্রদক্ষিণ করেছেন মহান নবী-রাসূলরা।  ফেরেশেতারাও তাওয়াফ করে এই পবিত্র ঘর। কাবা ঘর তৌহিদ তথা একত্ববাদী চিন্তাধারা রক্ষার ও সব ধরনের শির্ক নির্মূলের দায়িত্বকে স্মরণ করিয়ে দেয় প্রত্যেক মানুষকে।

কাবা মুসলমানদের ইবাদতের মূল অক্ষ এবং মুসলমানদের সামাজিক জীবনের প্রাণকেন্দ্র। মুসলমানরা প্রতিদিন কাবামুখি হয়ে ৫ বার নামাজ আদায় করেন। আর এই জ্বিলহজ্ব মাসে বিশ্বের বিশ থেকে ৪০ লাখ মুসলমান কাবাকে ঘিরে গড়ে তোলেন ঐক্য, সহমর্মিতা ও ভালবাসার মিলন-মেলা। এভাবে কাবাকে ঘিরে মুসলমানদের তথা আল্লাহর কাছে আত্ম-সমর্পিত মানুষদের তৌহিদি চেতনার সবচেয়ে সুন্দরতম ও সম্মিলিত শক্তির প্রকাশ ঘটছে।

মহানবী (সা.) বলেছেন,  যে কেউ সাত বার আল্লাহর ঘর প্রদক্ষিণ করবে তার প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য  সতকর্মের সওয়াব লেখা হয় ও একটি করে গোনাহ মাফ করা হয় এবং তার মর্যাদাও এক স্তর বাড়িয়ে দেয়া হয়।

 

চার.


সুদূর মক্কা মদিনার পথে আমি রাহি মুসাফির,

বিরাজে রওজা মোবারক যথা মোর প্রিয় নবীজীর।

বাতাসে যেখানে বাজে অবিরাম তৌহিদ বাণী খোদার কালাম,

জিয়ারতে যথা আসে ফেরেশতা শত আউলিয়া পীর।

মা ফাতেমা আর হাসান হোসেন খেলেছেন পথে যার

 কদমের ধূলি পড়েছে যথায় হাজার আম্বিয়ার।

সুরমা করিয়া কবে সেই ধূলি মাখিব নয়নে দুই হাতে তুলি

কবে এ দুনিয়া হতে যাবার আগেতে কাবাতে লুটাব শির। (কাজী নজরুল ইসলাম)

 

 

গত আলোচনায় আমরা বলেছিলাম,  ওমরাহ বা বড় হজ্বের তাওয়াফ শেষে হজ্বযাত্রী মাকামে ইব্রাহিমের পেছনে দু-রাকাত নামাজ আদায় করেন। এরপর দয়াময় এক আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য বিশেষ সিজদা বা শোকরানা-সিজদা আদায় করেন।

এবারে সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মধ্যে সাত বার ‘সাই’ করা বা আসা-যাওয়ার পালা। মসজিদুল হারামের উত্তর ও দক্ষিণ-পূর্ব পাশে অবস্থিত এ দুটি পাহাড়ের মধ্যে দূরত্ব ৪২০ মিটার।

এই আমল বা আনুষ্ঠানিকতার উদ্দেশ্য হল আল্লাহর ওপর ভরসা করার ও আশাবাদী হওয়ার অনুশীলন করা।

 

হযরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহর নির্দেশে নিজের স্ত্রী বিবি হাজরা (সা.) ও শিশু সন্তান ইসমাইলকে মক্কার কাবাঘর সংলগ্ন পানিশূন্য নির্জন এলাকায় রেখে এসেছিলেন। এমন একটি কঠিন নির্দেশ পালন করা ছিল প্রায় অসম্ভব ও অকল্পনীয় ব্যাপার। কিন্তু তাঁরা অসহনীয় কষ্ট মেনে নিয়ে ব্যাপক ধৈর্য, অধ্যবসায় ও আল্লাহর ওপর নির্ভরতার পথ ধরেছিলেন  বলে আল্লাহর সহায়তায় এ কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন।

খাদ্য ও পানীয় ফুরিয়ে যাওয়ার পর কাবা ঘর সংলগ্ন নির্জন এলাকায় হযরত ইব্রাহিম (আ.)’র স্ত্রী বিবি হাজরা (সা.) তাঁর তৃষ্ণার্ত সন্তানের জন্য পানির খোঁজে উদ্বিগ্ন চিত্তে সাফা ও মারওয়ার মধ্যে যাওয়া-আসা করেছিলেন সাত বার। আরবীতে সাই শব্দের অর্থ প্রচেষ্টা। হাজরা (সা.)’র এই যাওয়া-আসার মধ্যে ছিল আন্তরিক অধ্যবসায় বা কষ্ট-সহিষ্ণু প্রচেষ্টার পাশাপাশি আল্লাহর ওপর ভরসা। তাই মহান আল্লাহ’র ইচ্ছায় তাঁর প্রচেষ্টা সফল হয়। সত প্রচেষ্টার কারণে আল্লাহকবুল করেছিলেন তাঁর দোয়া এবং এই সুন্দর ও সত কাজটিকে কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের  জন্য এক পছন্দনীয় ইবাদতের প্রতীকে পরিণত করলেন।

 

সাফা-মারওয়ার মধ্যে যাওয়া-আসার এক পর্যায়ে কিছুটা স্থানে প্রায় দৌড়ানোর মত গতিতে এগুতে হয় হজ্ব যাত্রীদেরকে। এর কারণ, বিবি হাজরা(সা.) ওই নিচু এলাকা থেকে শিশু সন্তানকে দেখতে পেতেন না বলে উদ্বিগ্ন হয়ে দ্রুত উঁচু স্থানের দিকে উঠে আসার চেষ্টা করেছিলেন।  সাফা ও মারওয়ার উঁচু স্থানে পৌঁছার পর তিনি তাঁর শিশু সন্তান ইসমাইলকে দেখতে পেতেন।  এই দুই পাহাড়ের মধ্যে সাত বার যাওয়া-আসার পর বিবি হাজরা (সা.) লক্ষ্য করেন যে শিশু ইসমাইলের পায়ের নীচ থেকেই স্বচ্ছ পানিরউচ্ছল ধারা বের হয়েছে। এ ঝর্ণাই হল বিখ্যাত জমজম কুয়া। এই জমজমের সুবাদে মক্কা হয়েছে সমৃদ্ধ এবং সেখানে জনবসতির বিস্তার ঘটে। মক্কা ও এর আশপাশের গোত্রগুলো জমজমের সুপেয় ও স্বর্গীয় পানি ব্যবহারের সুযোগ পায়। এই পানি অন্য যে কোনো সুপেয় পানির চেয়ে হাজার গুণ উন্নত ও স্বাস্থ্যকর এবং রোগ-মুক্তির মাধ্যম ও রোগ-প্রতিরোধক।

 

বিবি হাজরা (সা.)‘জম জম’বা থামো থামো শব্দ উচ্চারণ করে পানির ওই ধারাকে থামতে বলেছিলেন বলে কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে।  এই ঝর্ণার চারদিকে পাথর ও মাটি বসিয়ে তা সবার জন্য ব্যবহারের উপযোগী করেছিলেন তিনি।

‘সাফা’ শব্দের অর্থ স্বচ্ছ। আবার শক্ত পাথরকেও সাফা বলা হয়। মারওয়া শব্দটির মূল অর্থ ছিল সাদা পাথর। আবার শক্ত ও খসখসে বা এবড়োথেবড়ো পাথরকেও বলা হয় মারওয়া। সাই শুরু হয় সাফায় এবং শেষ হয় মারওয়ায়।

 

হজ্ব আল্লাহর নৈকট্য লাভের দর্শনে ভরপুর। যা কিছু আল্লাহর নৈকট্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় হজ্ব সেসব থেকে দূরে থাকতে শেখায়। আর এ জন্যইহজ্ব কিছু দিনের জন্য মানুষকে বস্তুগত পরিবেশ থেকে দূরে রাখে। এ সময় মানুষ নিজেই তার অতীত জীবনের ভাল-মন্দ কাজের মূল্যায়ন করে ভবিষ্যতের জন্য এবং আত্ম-সংশোধনের ও আত্ম-উন্নয়নের জন্য পরিকল্পনা বা কর্মসূচি প্রণয়ন করতে পারে।

মহান আল্লাহ সাফা ও মারওয়াকে তাঁর অন্যতম নিদর্শন বলে উল্লেখ করেছেন সুরা বাকারার ১৫৮ নম্বর আয়াতে।

 

বিশ্বনবী (সা.)’রআহলে বাইতের সদস্য ইমাম সাজ্জাদ ইবনে হোসাইন (আ.) শিবলি নামের একজন হজ্বযাত্রীকে প্রশ্ন করেছিলেনঃ

তুমি কি সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সাই করেছ?

শিবলি বললেন: জি

ইমাম বললেন: তুমি কি এ নিয়ত করেছ যে ভয় ও আশার মধ্যে রয়েছ?

শিবলি বললেন: না

ইমাম বললেন: তাহলে তুমি সাই করোনি এবং সাফা ও মারওয়ার মধ্যে যাওয়া-আসাও করনি।

 

ইমাম সাজ্জাদ (আ.) এর মাধ্যমে যা বলতে চেয়েছেন তা হল, মানুষের উচিত এ পৃথিবীতে নানা গোনাহ ও নিজের অন্যান্য ততপরতার ব্যাপারে ভীত থাকা, তা না হলে অহংকারী হয়ে পড়বে মানুষ। আবার একইসঙ্গে আল্লাহর রহমত ও ক্ষমার ব্যাপারেও আশাবাদী হতে হবে যা মানুষকে উন্নতি ও পূর্ণতার দিকে নিয়ে যায়। ‘সাই’-এর অন্যতম আধ্যাত্মিক তাতপর্য হল গোনাহ-বিমোচন।

বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, “ হজ্বযাত্রী যখন সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সাই করে তখন সে তার সব গোনাহ থেকে পবিত্র হয়।”

 

সাই সম্পর্কে বিশ্বনবী (সা.)’রআহলেবাইতেরসদস্যইমামজা’ফর সাদিক (আ.) বলেছেন, “তোমরা সাফা পাহাড়ে দাঁড়িয়ে তোমাদের আত্মা ও অন্তরকে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের দিনটির জন্য পরিশুদ্ধ ও আলোকিত কর এবং মারওয়া পাহাড়ে দয়া ও উন্নত গুণের অধিকারী হও। আর  তোমাদের হজ্বের এইসব অবস্থা ও আল্লাহর সঙ্গে অঙ্গীকার  এবং যা তোমার জন্য অপরিহার্য করেছ সেসবের ওপর কিয়ামত পর্যন্ত অনুগত অবিচল থাক।”

তিনি আরো বলেছেন, “ সাফা ও মারওয়ার মধ্যে সাই হল প্রবৃত্তির খেয়ালিপনা থেকে মুক্তি এবং মানুষের অহংকার ও ক্ষমতাকে পদদলিত করা।”

সাফা ও মারওয়াতে সাই করার পর হজ্বযাত্রী চুল ছোট করেন অথবা চুল কামিয়ে ফেলেন ও নখ কাটেন। এরপর হজ্বযাত্রী হজ্বের অন্য আধ্যাত্মিক যাত্রার জন্য প্রস্তুত হন। নখ কাটা ও চুল কাটার দর্শন হল আত্মসংশোধন করা যাতে গোনাহ হ্রাস পায় বা গোনাহ থেকে মুক্ত হওয়া যায়।

 

রেডিও তেহরান/এএইচ/এআর/২২

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন