এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 05 মার্চ 2008 17:25

ইসলামী ঐক্য সপ্তা ও মনীষীদের অবদান

ইসলাম ঐক্যের ধর্ম ৷ ইসলাম শান্তির ধর্ম ৷ ইসলাম সর্বশেষ ঐশী ধর্ম হিসেবে সর্ব যুগেই মানুষের জন্যে বয়ে এনেছে তৌহিদের বিশ্বজনীন বার্তা এবং স্বাগত জানিয়েছে আলাপ-আলোচনা, অভিন্ন চিন্তা এবং আন্তরিক অভিন্নতার দিকে ৷ সেইযুগে ইসলামের বার্তাবাহী এবং ঐক্যের রাসূল হযরত মুহাম্মাদ ( সা ) তৌহিদের ছন্দময় শ্লোগান দিয়েছিলেন এবং জাহেলিয়াতের অন্ধকারাচ্ছন্ন শীতল বা অনুর্বর ভূমিতে ইসলামের সূর্যালোক বিকিরণ করেছিলেন৷ সেই আলোর বরকতে অন্তরগুলোতে জেগে উঠেছিল আশার আলো এবং মুক্তির উদ্ভাস৷ বিচ্ছিন্ন গোত্র ও বংশের মধ্যে ঐক্য গড়ে উঠলো এবং পরস্পরে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হলো ৷ শতাব্দীর পর শতাব্দী পেরিয়ে আজো সেই মোহনীয় সুর মুমিনদের মন ও মননকে পরস্পরের দিকে টানছে এবং তাঁদেরকে সর্বোন্নত পথের দিকে আহ্বান জানাচ্ছে ৷
রাসূলে কারিম ( সা ) এর শুভ জন্মের পবিত্র লগ্নে ঐক্য সপ্তাহ পালনের ঐতিহ্যও মুসলমানদের মাঝে ঐক্য সৃষ্টিরই প্রচেষ্টামাত্র ৷ ঐক্যের মতো গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়ে আজকাল যদিও বিচিত্রমাত্রিক তত্‍পরতা লক্ষ্য করা যায় ঠিকই , তবু এই অগ্রগতির পেছনে যে যুগে যুগে বড়ো বড়ো মনীষীদের চিন্তা-চেতনা ও আবেগ-অনুভূতি কাজ করেছিল ,তা বলাই বাহুল্য৷ আমরা সেইসব মনীষীদের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তা-চেতনার প্রতি সংক্ষিপ্ত নজর দেওয়ার চেষ্টা করবো ৷

ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে যে,মুসলিম মনীষীগণ মুসলমানদের ঐক্যের জন্যে যুগে যুগে ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন এবং তাঁরা এক্ষেত্রে যেসব মূল্যবান অবদান রেখে গেছেন , তা আজো ইতিহাসের পাতায় স্মৃতিময় হয়ে আছে ৷ এই মহামনীষীদের একজন হলেন সাইয়্যেদ জামালুদ্দীন আসাদাবাদী ৷ ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে তিনি দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন৷ তিনি মনে করতেন যে , পশ্চিমা উপনিবেশবাদীদের অনুপ্রবেশই মুসলমানদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির মূল কারণ,নৈলে ইসলামী ফেকরাগুলোর মাঝে মৌলিক কোনো পার্থক্য নেই ৷ জামালুদ্দিন আসাদাবাদী ছিলেন মুসলমানদের মাঝে ঐক্যের আহ্বানকারীদের একজন ৷ তিনি সেইযুগে ঐক্যের নতুন নতুন পরিকল্পনা ও উপায় বাতলে দিয়েছেন ৷

শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে সকল মুসলমানের মাঝে ঐক্যের আহ্বানকারীদের আরেকজন মনীষী হলেন মরহুম শেখ শালতুত৷ তিনি সুন্নি আলেম ছিলেন এবং মিশরের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের ভি.সি. ছিলেন ৷ শেখ শালতুত বলেছেন-'মুসলিম ফকীহদের উচিত সকল প্রকার গোঁড়ামির উর্ধ্বে উঠে ইসলামের ভিত্তিকে মজবুত ও দৃঢ় করার জন্যে পারস্পরিক মতামতকে সম্মান দেখানো এবং তা গ্রহণ করা ৷ হানাফি-মালেকি-শাফেঈ এবং হাম্বলী মাযহাবের অনুসারীগণ তাঁদের শিয়া ভাইদের পাশে দাঁড়িয়ে একটি ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ও বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেন৷'

মরহুম শেখ শালতুতের সাথে শিয়া বিশ্বের অন্যতম ব্যক্তিত্ব আয়াতুল্লাহ বুরুজার্দির বন্ধুত্বপূর্ণ যোগাযোগ ছিল এবং মুসলমানদের মাঝে ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে জনাব শালতুত আয়াতুল্লাহ বুরুজার্দির সাথে মত বিনিময় করতেন ৷ কারণ আয়াতুল্লাহ বুরুজার্দি নিজেও মুসলমানদের মাঝে কলেমার ঐক্য প্রতিষ্ঠায় ব্যাপক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন ৷ তিনিও বিশ্বাস করতেন যে মৌলিক বিষয়ে মুসলমানদের মাঝে কোনো বিরোধ বা মতপার্থক্য নেই ৷ তিনি বলেছেন-শিয়া এবং সুন্নিদের মাঝে যদি ঐক্য সৃষ্টি হয় , তাহলে ষড়যন্ত্রকারীদের হাত সঙ্কুচিত হয়ে যাবে৷ উপযুক্ত পরিবেশে শিয়াদের পরিচয়টাও ফুটে উঠবে ৷ আর তাই যদি হয় , তাহলে মুসলমানদের মাঝ থেকে সকল প্রকার হিংসা-বিদ্বেষ দুরীভূত হয়ে যাবে ৷

বর্তমানে বিশেষ করে ইসলামী বিপ্লব বিজয়ের পর ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর নেতৃত্বের সময় মুসলমানদের মাঝে ঐক্যের বিষয়টি আরো বেশি করে অনুভূত হয়েছিল ৷ ইমাম খোমেনী ( রহ ) বর্তমান যুগের বুদ্ধিজীবী মহলের সামনে অত্যন্ত বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে মুসলমানদের ঐক্যের উপায় বা পন্থাগুলোকে স্পষ্ট করে তুলে ধরেছেন ৷ সেইসব পন্থার একটি হলো সম্মেলন ৷ ইরানে প্রতি বছরই ইসলামী ঐক্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে৷ আর এই ঐক্য বাস্তবায়নের জন্যে ইমাম খোমেনী ( রহ ) দুটি কৌশলের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ৷ একটি পদক্ষেপ হলো চিন্তাদর্শগত ও সাংস্কৃতিক ,অপরটি হলো ব্যবহারিক ও রাজনৈতিক ৷ ইমাম খোমেনী ( রহ ) বলেছেন-শিয়া এবং সুন্নি ভাইদের যতোবেশি সম্ভব ঐক্য বজায় রাখা উচিত৷ শিয়া এবং সুন্নি বলে বিভেদ সৃষ্টি করা ইসলাম বিরোধী কাজ৷ কারণ এই দুইয়ের মাঝে কোনোরকম পার্থক্য নেই৷ আমাদের মধ্যকার মতপার্থক্য তাদেরই স্বার্থ রক্ষা করে যারা না শিয়া মাযহাবের অনুসারী না সুন্নি মাযহাবের৷ বরং তারা চায় কোনো মাযহাবেরই অস্তিত্ব না থাকুক৷ আমাদের ভাবতে হবে যে আমরা সবাই মুসলমান , সবাই কোরআনের অনুসারী৷ আমরা সবাই এক আল্লাহ অর্থাত্‍ তৌহিদে বিশ্বাসী ৷ আমাদের উচিত তৌহিদ ও কোরআনের খেদমতে সাধ্যমতো শ্রম দেওয়া ৷
ইমাম খোমেনী ( রহ ) সবসময় চেয়েছেন যে মুসলমানদের নিজেদের ভেতরে গৌণ বা ছোটখাট বিষয়ে মতপার্থক্য সৃষ্টি করে ইসলাম বিরোধী সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোকে যেন নাক গলাবার সুযোগ তৈরি করে দেওয়া না হয় ৷
আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য শিক্ষক এবং বিশিষ্ট চিন্তাবিদ প্রফেসর হামিদ মৌলানা ইসলামী ঐক্য সম্মেলনে মুসলমানদের ঐক্যের একটি সুন্দর পন্থার কথা বাতলে দিয়েছেন ৷ তিনি বলেছেন, "যে সময় আন্তর্জাতিক সকল রীতিনীতি প্রায় ধ্বংস হয়ে যাবার পথে , তখন মুসলমানদের উচিত এমন একটি লীগ বা ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠা করা , যেই ইউনিয়নে ব্যক্তি-গোষ্ঠি এবং সমাজ মিলেমিশে একাকার হয়ে যাবে ৷ আর সেই ইউনিয়ন বিশ্বকে ইসলামী রীতিনীতি অনুযায়ী পরিচালিত করবে ৷"


হামিদ মৌলানা বলেন , গ্লোবালাইজেশন বা বিশ্বায়ন পরিভাষাটি আসলে পশ্চিমাদের অনুকূল একটি রাজনৈতিক তত্ত্বমাত্র ৷ নিরাপত্তা পরিষদ , বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এমনকি বিশ্বজনমতকে উপেক্ষা করে একটা মুসলিম দেশের ওপর পাশ্চাত্যের বিশেষ করে আমেরিকার দখলদারিত্ব আরোপ করার মধ্য দিয়ে সে কথাই প্রমাণিত হয়েছে ৷ মুসলমানদের উচিত পশ্চিমা দেশগুলোর মতানৈক্যকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের ভেতরে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা করা ৷

আমেরিকার ইসলামী অধিকার ও ফিকাহ সংস্থার প্রধান ডঃ জাবের আল আলাভানীও বর্তমান সময়ের একজন বিখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ৷ তিনি মুসলিম দেশগুলোর বর্তমান পরিস্থিতিকে অপ্রত্যাশিত বলে উল্লেখ করে বলেন,মুসলিম দেশগুলোর বহু নেতা তাদের পারস্পরিক ঐক্যের চেয়ে নিজেদের অবস্থানের বিষয়টিকেই বেশী গুরুত্ব দিচ্ছে ৷ কিন্তু আমার মতে এক্ষেত্রে আমাদের প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত মুসলমানদেরকে ঐক্যের গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলা ৷ মুসলমানদেরকে পারস্পরিক নৈকট্য লাভ করা এবং একে-অপরের কাছে এসে জীবনযাপন করতে শেখা উচিত ৷ নিজেদের প্রয়োজনীয়তাগুলোর সমাধানকল্পেও পরস্পরের দিকে এগিয়ে আসা উচিত ৷ ডঃ জাবের আলাভানী অন্যত্র বলেছেনঃ আমাদের উচিত শিক্ষাব্যবস্থা , গণমাধ্যম , রাজনীতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে ইসলামের নীতিমালাগুলোর প্রয়োগ করা এবং মুসলিম দেশগুলোর মাঝে পারস্পরিক সহযোগিতা আরো বেশি জোরদার করা ৷ যেমন মুসলিম দেশগুলোতে মুসলমানদের আসা-যাওয়ার বিষয়টি সহজতরো হওয়া উচিত ৷ এ ব্যাপারে ইসলামের যে ভ্রাতৃত্বের অনুভূতি তা মুসলমানদের মাঝে জাগিয়ে তোলা উচিত ৷ সবোর্পরি মুসলিম দেশগুলোতে পরস্পরের মুদ্রার প্রচলন ঘটানো উচিত ৷
বর্তমান সময়ে ইরানের ইসলামী বিপ্লব ঐক্যের সর্ববৃহত্‍ পতাকা উড্ডীন রেখেছে ৷ ইমাম খোমেনী ( রহ ) এর মৃত্যুর পর তাঁরি যোগ্য উত্তরসূরী আয়াতুল্লাহিল উযমা খামেনেয়ী ঐক্যের সেই পতাকা উড্ডীন রেখেছেন ৷ সেইসাথে তিনি মুসলমানদেরকে সতর্ক করে যাচ্ছেন ৷ তাদেরকে জেগে ওঠার আহ্বান জানাচ্ছেন ৷ আল্লাহর দরবারে মুসলমানদের ঐক্য কামনার পাশাপাশি তাদের চিন্তা এবং আন্তরিক অভিন্নতাও কামনা করছেন ৷ তিনি বলেছেনঃ "পৃথিবীবাসী যদি ইসলামের অস্তিত্বের মহিমা বুঝতে পারতো ,তারা যদি নবীজীর শিক্ষার গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পারতো এবং ঐক্যের সুফল সম্পর্কে যদি সচেতন হতো তাহলে মানব জীবনের বৃহত্‍ সমস্যাগুলো দূর হয়ে যেত৷ সংখ্যাগত দিক থেকে বিশ্বে মুসলমান সমপ্রদায়ের অবস্থানটা বেশ উল্লেখযোগ্য ৷ ইসলামের শত্রুরা তাই মুসলমানদের মাঝে বিভেদের বীজ ছড়াচ্ছে ৷ শিয়া-সুন্নির ধুয়া তুলে তারা এই বিভাজন সৃষ্টির চেষ্টা চালাচ্ছে৷ কিন্তু ইরান ইসলামের শত্রুদের, বিভেদ সৃষ্টিকারী এই ষড়যন্ত্রের পরিবর্তে চেষ্টা করছে শিয়া-সুন্নি নির্বিশেষে সকল মুসলমানকে এক কলেমার পতাকাতলে ফিরিয়ে আনতে ৷"


--------------------------------------------------------------------------------

 

শত্রুদের ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় ঐক্যের যে কোন বিকল্প নেই

 

মানুষের স্বাভাবিক জীবন যাত্রা প্রায় স্তব্ধ ৷ জুলুম-নির্যাতন, খুন-রাহাজানি, হিংসা-বিদ্বেষ আর বৈষম্যের দাপটে সমাজ কাঠামো ক্রমেই ভেঙ্গে পড়ছে ৷ জাহেলিয়াতের অন্ধকারের প্রভাবে বর্ণিল আকাশও যেন বিবর্ণ রুপ ধারণ করছে ৷ মানুষের পাশাপাশি আকাশ-বাতাস সহ সকল সৃষ্টিই কোন এক ত্রাণকর্তার আগমনবার্তা শুনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান ৷ সমাজ কাঠামোকে পুণরুজ্জীবিত করার জন্য এছাড়া আর কোন উপায় নেই ৷ গোটা বিশ্বই এমন এক স্বচ্ছ, নির্মল ও পবিত্র ঝর্নাধারা ও আলোকের উন্মেষের জন্য অপেক্ষা করছে-যার অস্তিত্ব পৃথিবীকে নতুন করে বেঁচে থাকার প্রেরণা দেবে,মানুষ খোঁজে পাবে তাঁর আপন ঠিকানা৷ এমনি এক দুর্বিষহ সময়ে জোতির্বিদরা,মানব সমাজকে অতি উজ্জল এক তারকার আবির্ভাবের সুখবর জানালেন ৷ আর এ সময়ই জন্ম হলো-বিশ্ব মানবতার মুক্তির দিশারী হযরত মোহাম্মদ (সা:)-র ৷ আকাশের অত্যুজ্জ্বল তারকার মাধ্যমে যে বিশ্বনবীর আগমনবার্তাই দেয়া হয়েছিল, বিজ্ঞজন ও চিন্তাশীলদের তা বুঝতে কোন হয় নি ৷ সেটি ছিল রবিউল আউয়াল মাস ৷ নবীজীর আগমনে সে সময় প্রকৃতিও উত্‍ফুল্ল হয়ে ওঠেছিল ৷ ইতিহাসে আছে, তিনি যে বছর জন্মগ্রহণ করেন, সে বছর মক্কার শুস্ক ভূমি সঞ্জীবীত হয়ে ওঠেছিল৷ শুস্ক বৃক্ষও সজীব ও ফলবন্ত হয়ে ওঠেছিল ৷ এসব কারণেই নবীজীর জন্মের বছরকে বিজয় ও আনন্দের বছরও বলা হয়৷

হযরত মোহাম্মদ (সা:) হলেন-সৃষ্টিজগতের সর্বোত্তম সৃষ্টি৷ হযরত আলী (আ:) বলেছেন,' আল্লাহতায়ালা, রাসূলে খোদা(সা:)-র চেয়ে শ্রেষ্ঠতর আর কিছুই সৃষ্টি করেন নি ৷'
রাসূলের আগমনে অন্ধকারাচ্ছন্ন পৃথিবীতে আলোর উত্তরণ ঘটে ৷ তাওহিদ ও রিসালাতের আলোকরশ্মি দিক দিগন্তে বিচ্ছুরিত হয় ৷ সৃষ্টিকর্তার সর্বোত্তম সৃষ্টি হযরত মোহাম্মদ (সা:)-রই উম্মত হলো মুসলমানরা ৷ মুসলিম উম্মাহ গঠন-রাসূলের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান ৷ রাসূলের দিক নির্দেশনাতেই মুসলমানরা ইরান ও রোমের পরাক্রমশালী সম্রাটদের পতন ঘটিয়ে সেখানকার মানুষকে আলোর দিশা দিতে সক্ষম হয়েছিল ৷ এভাবেই মহানবীর ঐশী শিক্ষা ও আদর্শকে কেন্দ্র করে ইসলামী সভ্যতা গড়ে ওঠে এবং চিন্তা ও গবেষণার পরিধি ও মাত্রা বৃদ্ধি পায় ৷ অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীন ভূমিকার কারণে মুসলমানদের বিরুদ্ধে শত্রুরা সব সময়ই ষড়যন্ত্র করেছে ৷ এরই অংশ হিসেবে ক্রুসেডার ও মংগোলীয়রা মুসলমানদের উপর হামলা চালিয়েছে ৷ তবে ব্যাপক চড়াই-উত্‍ড়াইরে পরও মুসলমানরা সব সময় একত্ববাদের রশ্মিকে আকড়ে থেকে জুলুম-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে ৷
বর্তমান যুগের মুসলমানরাও এর ব্যতিক্রম নয় ৷ অধিকাংশ চিন্তাবিদ ও গবেষকের মতে, মুসলমানদের মধ্যে নতুন করে জাগরণ সূচিত হয়েছে ৷ মুসলিম বিশ্বে এখন পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে ৷ মুসলীম সমাজ আবারও স্বমহিমায় আবির্ভূত হবার জন্য সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে ৷ মুসলমানরা পুণরায় বিশ্বের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গন এমনকি অর্থনীতির নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় ফিরে যাবে বলে বহু গবেষক ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন ৷ নানা সম্ভাবনার পাশাপাশি মুসলিম বিশ্বে যে নানা ধরনের সংকটও বিরাজ করছে-তা অস্বীকার করা যাবে না৷ জাতি, বর্ণ ও ভাষার বৈচিত্র এবং ভৌগোলিক অবস্থান-মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে নানা ধরনের বিভেদ ও সমস্যার জন্ম দিয়েছে ৷ যদিও পাশ্চাত্যের সমাজ বিজ্ঞানী বার্ক মনে করেন, ' গৌন বিভক্তি কখনোই মৌলিকত্বের প্রতি টান বা ভালোবাসাকে নিসপ্রাণ করতে পারে না ৷' একারণেই হয়তো মুসলমানরাও যে কোন সংকটময় মুহুর্তে নিজেদের মধ্যকার ছোটখাট মতপ্রার্থক্য ভুলে অভিন্ন ধর্মের পতাকাতলে একত্রিত হয়ে সমস্যার মোকাবেলা করেছে ৷

মুসলমানদের মাঝে যে নতুন করে জাগরণ সৃষ্টি হচ্ছে এবং তারা যে তাদের হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পেতে শুরু করেছে, তার একটি বড় প্রমাণ হলো, ধর্মের প্রতি তাদের আকর্ষণ বৃদ্ধি ৷ রাসূল (সা:)-র শিক্ষা ও আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইরানে যে ইসলামী বিপ্লব সংঘটিত হয়েছে, বিশ্বব্যাপী তার প্রভাব পড়ছে ৷ লেবানন, ফিলিস্তিন ও তুরস্কসহ মুসলিম দেশগুলোতে ইসলামী আদর্শভিত্তিক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন জোরদার হয়েছে৷ মুসলমানরা এখন এমন এক সভ্যতাকে পুণরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করছে, যেখানে আধ্যাত্বিকতার সাথে বিবেক ও যুক্তি এবং রাজনীতির সাথে নৈতিকতার সমন্বয় সাধিত হয়েছে ৷ এই আদর্শ ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় রাসূল হলেন, পথ প্রদর্শক-যিনি মানুষকে জ্ঞান, বিজ্ঞান, নৈতিকতা, মমত্ববোধ, সম্মান-মর্যাদা ও প্রতিরোধের শিক্ষা দিয়েছেন ৷ আর সর্বশেষ রাসূল হযরত মোহাম্মদ (সা:)-র পথ অনুসরণ করা হলে অতি পরাক্রমশালী শত্রুও পরাজয় মেনে নিতে বাধ্য হবে ৷ তবে এজন্য মুসলমানদেরকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে ৷

শত্রুদের ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় ঐক্যের যে কোন বিকল্প নেই-তা বিশ্বনবীরই শিক্ষা ৷ রাসূল (সা:) বলেছেন,' একজন মুমিন অপর মুমিনের জন্য এমন এক ভিত্তির মতো-যার একটি অংশ অপর অংশকে শক্তিশালী করে৷' তিনি তার উম্মতদের উদ্দেশ্য করে আরো বলেছেন, 'তোমরা একে অপর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ো না ও মুখ ফিরিয়ে নিও না এবং একে অপরের প্রতি বিদ্বেষ পোষন করো না বরং তোমরা নিজেদের মধ্যে ভ্রাতৃসুলভ সম্পর্ক বজায় রাখবে এবং ঐক্যবদ্ধ থাকবে৷' কোরআন ও হাদীসের আলোকেই ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান, মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি জোরদারকে সব সময় গুরুত্ব দিয়েছে৷ এরই আলোকে রাসূলের শিক্ষাকে বাস্তব রুপ দেয়ার জন্য ইরানে প্রতি বছর ইসলামী এক্য সপ্তা উদযাপিত হয়৷ এ সময় বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের আয়োজন করা হয় ৷ রাজধানী তেহরানে যে আন্তর্জাতিক ইসলামী ঐক্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়,তাতে বাংলাদেশ,ভারত ও পাকিস্তানসহ বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে বিশিষ্ট ইসলামী মনীষী ও নেতারা অংশ নেন ৷ এবারও এর ব্যতিক্রম ঘটে নি ৷
এছাড়া, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী, ফার্সি ১৩৮৬ সালকে জাতীয় ঐক্য ও ইসলামী সংহতি বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছেন ৷ তবে এক্ষেত্রে শুধু একটি দেশকে উদ্যোগী হলেই চলবে না, এ জন্য অন্যান্য মুসলিম দেশকেও এগিয়ে আসতে হবে ৷
সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মোহাম্মদ (সা:) শ্রেনী বৈষম্যের বিরুদ্ধে আজীবন লড়েছেন ৷ ফলে বিভিন্ন শ্রেনী ও পেশার মানুষ রাসূলের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন এবং মুসলিম কাফেলায় সম মর্যাদার ভাগি হয়েছেন ৷ ইসলাম গ্রহণের পরপরই একে অপরের ভাই হিসেবে গণ্য হয়েছেন ৷ বর্তমান যুগের মুসলমানদের জন্যেও যে রাসূলের প্রদর্শিত পথই সর্বোত্তম, তা মনে রাখতে হবে ৷ মুসলমান সে যে প্রান্তেরই বাসিন্দা হোক না কেন তারা যে পরস্পরের ভাই-তা ভুলে গেলে চলবে না ৷ বর্তমান বিশ্বে মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃসুলভ সম্পর্কের প্রয়োজনীতা অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে ৷ কারণ শত্রুরা এখন অনেক বেশি শক্তি অর্জন করছে এবং স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে তারাও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে ৷ এ অবস্থায় মুসলমানরা পিছিয়ে থাকলে চলবে না ৷ শুধু মুসলমানদের মধ্যেই নয় অন্যান্য ঐশী ধর্মের অনুসারীদের মধ্যেও ঐক্য জোরদারেরও প্রয়োজনীয়তা এখন সর্বাধিক৷ কারণ আধ্যাতি্নক ও নৈতিক অবক্ষয় মানব সভ্যতাকে হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে ৷ এ অবস্থায় বিশ্বকে কলুষতামুক্ত করতে ঐশী ধর্মের সকল অনুসারীকে ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপ নিতে হবে৷

মুসলিম বিশ্বে মাযহাবগত যে বিদ্বেষ ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে,তা একটি পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ৷ এর মাধ্যমে শত্রুরা একদিকে সমাজে ধর্মের প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্বহীন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে এবং অন্যদিকে, সমগ্র বিশ্বে চীরস্থায়ী আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে চাচ্ছে ৷ মুসলিম বিশ্বকে দ্বিধা-বিভক্ত করার জন্য শত্রুরা এখন শিয়া-সুন্নি প্রসঙ্গকে সামনে এনেছে ৷ যদিও এই দুই মাজহাবের মধ্যে মৌলিক কোন পার্থক্য নেই বললেই চলে ৷ আল্লাহ, রাসূল, কোরআন, কেবলা, কিয়ামত, রোজা-এসব ক্ষেত্রে এই দুই মাজহাবের মধ্যে কোন ধরনের মতপার্থক্য নেই ৷ খুবই ছোটখাট বিষয়ে দুই একটি যে পার্থক্য রয়েছে,শত্রুরা তাকেই বড় করে তুলে ধরে মুসলিম উম্মাহর মধ্যে নানা ধরনের বিভেদ রেখা টানার চেষ্টা করছে৷ কিন্তু শত্রুরা এটা ভুলে গেছে যে, মুসলমানরা সব সময়ই ধর্মের শত্রুদের মোকাবেলায় ঐক্যবদ্ধ ছিল এবং ভবিষ্যতেও এর ব্যতিক্রম হবে না ৷


--------------------------------------------------------------------------------


বর্তমান সময়ে ইসলামী ঐক্যের গুরুত্ব ও ঐক্যের নানা দিক

বছর ঘুরে আবারো ফিরে এসেছে আলোকোজ্জ্বল রবিউল আউয়াল মাস ৷ এই পবিত্র মাসের ১২ তারিখে বা মতান্তরে ১৭ তারিখে পৃথিবীতে এসেছিলেন মানবজাতির জন্যে মহান আল্লাহর সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ, এসেছিলেন মানবতার মুক্তি, কল্যাণ ও সৌভাগ্যের সর্বোত্তম দিশারী তথা সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) ৷ তাঁর পবিত্র জন্ম বার্ষিকী বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে জাগিয়ে তোলে বেহেশতী আনন্দের অনাবিল উচ্ছাস এবং ক্ষুধার্ত, বঞ্চিত ও শোষিত মানবতার বুকে জাগায় মুক্তির স্পন্দন ও তাদের চোখে ভেসে ওঠে সোনালী দিনের স্বপ্নিল হাতছানি ৷ কিন্তু কিছু আনুষ্ঠানিক ও মুখস্ত- বিবৃতি বা জৌলুষপূর্ণ সভা-সেমিনারের কোলাহলের নীচে চাপা-পড়া তিক্ত বাস্তবতা হলো অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মুসলমানরা আজ নিজের ও বঞ্চিত জাতিগুলোর মুক্তির জন্যে সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে পারছে না ৷ যদিও বিশ্বে এটাই ছিল তাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব ৷
আসলে মুসলমানরা বঞ্চিত জাতিগুলোর মুক্তি আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার মতো যোগ্যতা অর্জন করার জন্যে যা যা করা উচিত তা করছে না, বা যথেষ্ট মাত্রায় করছে না ৷ বরং তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে নিজেই পথ-হারা ও শতধা-বিভক্ত ৷ এর কারণ আজ অধিকাংশ মুসলিম সরকার ও মুসলমানদের শিক্ষিত বা প্রভাবশালী শ্রেণীগুলো নামকা-ওয়াস্তে মুসলমান মাত্র ৷ তারা ইসলামের শত্রুদের সর্বাত্মক ষড়যন্ত্রের সর্বনাশা ফাঁদে পা দিয়ে আত্মকেন্দ্রীকতা বা ক্ষুদ্র স্বার্থের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়ে ক্ষনিকের আত্মপ্রসাদে নিদ্রামগ্ন হয়ে আছেন ৷ তারা সামান্য নগদ-স্বার্থের জন্যে মুসলিম উম্মাহর দীর্ঘস্থায়ী স্বার্থকে বিকিয়ে দিতে কুণ্ঠিত নন৷ রাসূল (সাঃ)'র প্রতি তাদের ভালবাসা থাকলে তাঁর উম্মতকেও তারা ভালবাসতো৷ ফলে আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, ইরাক, কাশ্মীর ও অন্যান্য স্থানে ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠাসহ মুসলমানদের মুক্তির জন্যে যথাসাধ্য চেষ্টা করতো ৷ এ অবস্থায় হতভাগ্য মুসলমানদেরকে নিজের অতীত গৌরব ও সম্মান হারানোর জন্যে শুধু অশ্রু ফেলে শক্তি সঞ্চয় করার কথা ভাবতে হতো না ৷
অবশ্য ব্যতিক্রমও আছে ৷ ফিলিস্তিন, লেবানন ও ইরাকের মতো কোনো কোনো মুসলিম জনপদের দেয়ালে-পিঠ-ঠেকা মুসলমানরা আজ জেগে উঠেছে ৷ তাদের সামনে আধুনিক যুগেও সাফল্যের জ্বলন্ত বা জীবন্ত আদর্শ হলো ইরানের ইসলামী সরকার বা সেখানে সংঘটিত ইসলামী বিপ্লব ৷ ইরানের তৌহিদী জনতার সাফল্যের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল দেশটির ইসলামী সরকার ও সর্বস্তরের জনগণের ইস্পাত-কঠিন ঐক্য৷ অন্যান্য দেশের মুসলমানরাও যদি সীসা ঢালা প্রাচীরের মত ঐক্যবদ্ধ হয় এবং গোটা মুসলিম উম্মাহ যদি ঐক্যবদ্ধ হতে পারে তাহলে বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদীদের কর্তৃত্বের অবসান ঘটবে ৷ আর এ জন্যেই ইরানের ইসলামী প্রজাতন্ত্রের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) বিশ্বের মুসলমানদেরকে একতাবদ্ধ করার লক্ষ্যে পবিত্র রবিউল আউয়াল মাসের ১২ থেকে ১৭ তারিখকে ইসলামী ঐক্য সপ্তাহ হিসেবে ঘোষণা করেছেন ৷

কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী মহলও বসে নেই ৷ তারা মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ ও শাসন করার সেই চিরাচরিত অপকৌশল কাজে লাগানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে, বরং অতীতের চেয়েও তাদের এ ষড়যন্ত্র সর্বাত্মক ও জোরদার হয়ে উঠেছে ৷ ইসলামী পুনর্জাগরণ আন্দোলন জোরদার হওয়াতেই মুসলিম দেশগুলোতে লুটপাট বন্ধ হয়ে যাবার আশঙ্কায় শঙ্কিত সাম্রাজ্যবাদীরা এখন মুসলমানদের মধ্যে বিভেদের আগুন প্রজ্জ্বলিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ৷ বিশেষ করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের প্রভাব ঠেকানো এবং মধ্যপ্রাচ্যের তেল সম্পদ লুণ্ঠনের জন্যে সাম্রাজ্যবাদীরা ইরানে সংঘটিত ইসলামী বিপ্লবকে প্রথম থেকেই শিয়া বিপ্লব বলে অভিহিত করেছে৷ সামপ্রতিক সময়ে ইরাক ও আফগানিস্তানে দখলদারিত্ব বজায় রাখার জন্যে এবং এ দুটি দেশসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে ইরানের ও ইসলামের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকানোর জন্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র শিয়া-সুন্নীর বিরোধকে রক্তাক্ত দাঙ্গা বা সশস্ত্র সংঘাতে পরিণত করার চেষ্টা করছে ৷
মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির জন্যে সাম্রাজ্যবাদীরা সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করছে ৷ তারাই ইরাকসহ বিভিন্ন দেশে শিয়ার লেবেল লাগানো সন্ত্রাসীদেরকে দিয়ে সুন্নীদের ওপর হামলা চালাচ্ছে এবং সুন্নীর বেশ ধরে শিয়া মুসলমানদের ওপর হত্যাকান্ড ঘটাচ্ছে যাতে শিয়া ও সুন্নীরা রক্তপাতের ধ্বংসাত্মক সংঘাতে মেতে থাকে ৷ মার্কিন সরকারসহ ইহুদিবাদ-নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলো বলছে, আরব বিশ্বের ওপর অনারব ইরানের প্রভাব বৃদ্ধি আরবদের জন্যে ক্ষতিকর হবে এবং ইরান ইরাক ও লেবাননের ওপর প্রভাব বিস্তার করে সুন্নী-বিদ্বেষী একটি শিয়া প্রভাব-বলয় সৃষ্টির চেষ্টা করছে৷ কিন্তু এ ধরণের মিথ্যা প্রচার মোটেই ধোপে টিকছে না৷ কারণ, সবাই এটা জানে যে ইরানের ইসলামী বিপ্লব ইসলাম ও মুসলমানদেরকে ভালবাসে বলেই সুন্নী মুসলমান অধ্যুষিত ফিলিস্তিনকে অন্য সবার চেয়ে বেশী সাহায্য সহযোগীতা দিয়ে আসছে৷ একই কারণে ইরান আফগানিস্তান ও বসনিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মুসলমানদের স্বাধীকার আন্দোলনগুলোকে সর্বাত্মক সহায়তা দিয়ে এসেছে ৷


মুসলমানদের অনৈক্যের সুযোগ নিয়ে ইসলামের বিরুদ্ধে পাশ্চাত্যের শক্তিগুলো শুধু রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দিক থেকে ক্রুসেড শুরু করেছে তা নয়, তারা ইসলাম ও মুসলমানদের চেহারাকে কালিমালিপ্ত করার জন্যে সাংস্কৃতিক আগ্রাসনও জোরদার করছে৷ সাম্রাজ্যবাদীদের পৃষ্ঠপোষক গণমাধ্যমগুলো ইসলামী সন্ত্রাস নামে একটি শব্দ ব্যাপকভাবে ব্যবহার করছে৷ কোথাও কোনো বোমা হামলা হলে তা কাদের কাজ সে বিষয়ে কোনো কিছু প্রমাণিত হবার আগেই তারা প্রচার করে যে সম্ভবতঃ ইসলামী উগ্রবাদী বা ইসলামী সন্ত্রাসীরা এ কাজ করেছে৷ অথচ একই ধরনের হামলা যদি খৃষ্টানদের মাধ্যমে বা অন্য কোনো ধর্মের অনুসারীদের মাধ্যমে হয়ে থাকে তখন তারা খৃষ্টীয় সন্ত্রাসী বা এ ধরণের কোনো শব্দ ব্যবহার করে না৷ এই গণমাধ্যমগুলো কখনও এটা স্বীকার করতে চায় না যে সন্ত্রাসীদের কোনো জাত ধর্ম নেই৷

পাশ্চাত্যের কোনো কোনো গণমাধ্যম বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ)কে এবং তাঁর প্রচারিত ধর্ম ইসলামকেও সন্ত্রাসের হোতা বলে প্রচারের চেষ্টা করছে ৷ ডেনমার্কসহ ইউরোপের বেশ কিছু দেশের গণমাধ্যমে বিশ্বনবী (সাঃ)'র ব্যাঙ্গ ছবি প্রকাশ করা হয়েছে ৷ মুসলমনারা প্রতিবাদ জানাতে গেলে তারা বলে এটা নাকি বাক-স্বাধীনতার চর্চা ৷ ফ্রান্সসহ ইউরোপের কোনো কোনো দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মুসলিম মহিলাদের হিজাব বা পর্দার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে৷ তারা বলছে, ইসলামী পোশাক নাকি সামপ্রদায়িকতা ও বৈষম্যের চেতনা ছড়িয়ে দিচ্ছে! অথচ তারা শিখদের পাগড়ী বা খৃষ্টান নান তথা গীর্যার মহিলা কর্মীদের মাথার টুপিতে সামপ্রদায়িকতা দেখতে পান না ৷ তাই এসব চতুর্মুখী হামলা মোকাবেলার জন্যে মুসলমানদেরকে রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে ৷

মুসলমানদের ঐক্যের পথে কার্যতঃ কোনো বাধা নেই ৷ খৃষ্টানদের মধ্যে যদি বিভিন্ন মত ও পথ থাকা সত্ত্বেও তারা ঐক্যবদ্ধ হতে পারে এবং এমনকি ইসলামের মোকাবেলায় বিভিন্ন ধর্মের কথিত অনুসারীসহ কথিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরাও ঐক্যবদ্ধ হতে পারে, তাহলে কেন মুসলমানরা তাদের পবিত্র ও সর্বোত্তম জীবনাদর্শের মর্যাদা রক্ষার জন্যে ঐক্যবদ্ধ হবে না? মুসলমানদের রাসূল, ধর্মগ্রন্থ, কেবলা ও মূল নীতিগুলো অভিন্ন ৷ তাই তাদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়- এটা কেবল অর্বাচীন বা ইসলামের ঘোর শত্রুরাই ভাবতে পারে ৷ যারা ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মধ্যে শিয়া আধিপত্যের বা সুন্নী মাজহাবগুলোর ক্ষতির আশঙ্কা দেখতে পাচ্ছেন তারাও বোকার স্বর্গে বাস করছেন ৷ কারণ, ইরানের ইসলামী বিপ্লব যদি মুসলিম বিশ্বের জন্যে কল্যাণকামী না হতো বা ফিলিস্তিনসহ বিশ্বের অন্যান্য নিপীড়িত মুসলমানদের সহায়তায় এগিয়ে না আসতো তাহলে সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন সরকারসহ পাশ্চাত্যের সরকারগুলো ইরানের ইসলামী সরকারের বিরুদ্ধে প্রাণপন শত্রুতায় অবতীর্ণ হতো না ৷
মুসলিম দেশগুলো যদি অর্থনৈতিকভাবে ঐক্যবদ্ধ হতো তাহলে তাদের দরিদ্রতম দেশটিকেও পাশ্চাত্যের দয়ার ওপর নির্ভরশীল হতে হতো না এবং এর ফলে দরিদ্র মুসলিম দেশগুলো পাশ্চাত্যের অর্থ সাহায্যের জালে বন্দী হয়ে তাদের অর্থনৈতিক শোষণ ও রাজনৈতিক নিপীড়নের শিকার হতো না ৷ মুসলিম দেশগুলোর পারস্পরিক বাণিজ্যের পরিমাণ তাদের মোট বাণিজ্যের পাঁচ শতাংশের বেশী নয় ৷ মুসলিম দেশগুলোর কোনো কমন মার্কেট বা অভিন্ন মুদ্রাও নেই৷ যেসব পণ্য ও বিশেষ করে ভোগ্য পণ্য মুসলিম দেশগুলো পরস্পরের কাছ থেকে আমদানী করতে পারতো তা পাশ্চাত্যের বহুজাতিক ও ইহুদিবাদের পৃষ্ঠপোষক কোম্পানীগুলোর কাছ থেকে আমদানী করে মুসলমানরা ফিলিস্তিন দখলদার ইসরাইলের পকেট ভারী করে চলেছে ৷ আরব দেশগুলোর জ্বালানী তেল বিক্রির একটা বড় অংশ এভাবেই পাশ্চাত্যের বহুজাতীক কোম্পানীর হাত হয়ে ইসরাইলের অস্ত্র সম্ভারকে সমৃদ্ধ করছে ৷ আর ঐ অস্ত্রের আঘাতে শহীদ হচ্ছে নিরীহ ফিলিস্তিনী ও আরব মুসলমান ৷
একই কথা বলা যায় সামরিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও ৷ মুসলিম সরকারগুলো যদি ঐক্যবদ্ধ হয় তাহলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে তাদের জন্যে ভেটোর অধিকার আদায় করা সম্ভব ৷ ফলে কোনো মুসলিম দেশকে বিনা অপরাধে অবরোধের সম্মুখীন করা বা শান্তিপূর্ণ পরমাণু প্রযুক্তি অর্জনের ক্ষেত্রে বাধার সম্মুখীন করা সম্ভব হবে না ৷ মুসলিম দেশগুলো যদি ন্যাটো জোটের মত সামরিক জোট গড়ে তুলতে পারতো তাহলে বসনিয়ার সেব্রেনিত্‍সায় কিংবা লেবাননের শাবরা শাতিলায় মুসলিম নারী ও শিশুদেরকে এবং ইরাক ও আফগানিস্তানের বেসামরিক নাগরিকদেরকে গণহত্যার শিকার হতে হতো না ৷ ইসলামী ঐক্যের গুরুত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনী (রঃ) বলেছিলেন, আরব দেশগুলোর জনগণ যদি এক বালতি করে পানি ঢেলে দিত, তাহলে দখলদার ইসরাইলীরা ভেসে যেত ৷

মুসলিম দেশগুলো যদি চলচ্চিত্র ও সংবাদ মাধ্যমসহ অন্যান্য সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে স্বনির্ভর ও ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্ম গড়ে তুলতে পারে তাহলে এসব ক্ষেতে মুসলমানরা পাশ্চাত্যের গণমাধ্যমগুলোর ওপর নির্ভরশীল থাকবে না , বরং এর ফলে তারা পাশ্চাত্যের ইসলাম বিদ্বেষী প্রচারণাসহ পাশ্চাত্যের অপসংস্কৃতি ও তথ্য সাম্রাজ্যবাদের মোকাবেলা করতে পারবে৷ তাই মুসলিম জাতি ওসরকারগুলোর মধ্যে সর্বাত্মক ঐক্য প্রতিষ্ঠা আজ মুসলমানদের জন্যে সবচেয়ে জরুরী কাজে পরিণত হয়েছে৷ আর এজন্যে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে মুসলিম সমাজের প্রভাবশালী সব মহলকে এগিয়ে আসতে হবে৷

 


--------------------------------------------------------------------------------

 

ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠায় আলেম সমাজ ও গণমাধ্যমের ভূমিকা

 

সুদীর্ঘকাল ধরে মানুষের কাছে ঐক্য ও সংহতি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে ৷ কারণ, ঐক্য ও সংহতির মাধ্যমে যে কোন কাজ সহজে সম্পাদন করা যায় ৷ এছাড়া কোন কোন সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা ঐক্যবদ্ধ অবস্থান গ্রহনের মাধ্যমে সমাধান করা যায় ৷
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, বড় বড় সভ্যতাগুলো বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠির মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গড়ে উঠেছে এবং পূর্ণতা পেয়েছে ৷ নিজেদের মধ্যে ঐক্য ভেঙ্গে যাওয়ার পর ঐসব সভ্যতা ধ্বংসের দিকে এগিয়ে গেছে ৷ ইসলাম নিজেদের উন্নতি ও অগ্রগতির চাবিকাঠি হিসেবে মুসলমানদেরকে সব সময় ঐক্য ও সংহতি বজায় রাখার আহবান জানিয়েছে ৷ পবিত্র কোরআন মুসলমানদেরকে আল্লাহর রজ্জুকে শক্ত করে ধরে পরস্পর বিচ্ছিন্ন হতে নিষেধ করেছে ৷ মুসলমানরা যতদিন পবিত্র কোরআনের এ নির্দেশনা মেনে চলেছে ততদিন জ্ঞানবিজ্ঞান, শক্তি ও শৌর্যবীর্যে তারা ছিল সবচেয়ে উন্নত ও অগ্রগামী ৷ কিন্তু নিজেদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির পর মুসলমানদের পতন শুরু হয় এবং তারা সবদিক থেকে অন্যান্য জাতির চেয়ে পিছিয়ে পড়ে ৷

মুসলিম সভ্যতার গৌরবোজ্জ্বল যুগে মুসলমানদের উন্নতি ও অগ্রগতির প্রধান উপকরণ ছিল ঐক্য ও সংহতি ৷ পরবর্তীতে বিভেদ ও বিসংবাদের কারণে মুসলিম সভ্যতার পতন শুরু হয় ৷ ইসলামের বিভিন্ন মাযহাবের মধ্যে ছোটখাটো কিছু পার্থক্য থাকলেও মৌলিক বিশ্বাসসহ অধিকাংশ ক্ষেত্রে অভিন্ন উপাদান রয়েছে ৷ মহান আল্লাহ, মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এবং পবিত্র কোরআন শরীফের প্রতি সকল মাযহাবের মুসলমাদের বিশ্বাস রয়েছে ৷ এছাড়া তারা একই ক্বেবলার দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করেন ৷ সেই সাথে নামাজ, রোজা, হজ্জ্ব, যাকাতের মত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত পালনের দিক থেকেও তাদের মধ্যে মতৈক্য রয়েছে ৷ কাজেই বর্তমানে মুসলমানদের মধ্যে যে বিভেদ ও মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে তার সঠিক কারণ খুঁজে বের করা সত্যিই কঠিন ৷ তারা যদি নিজেদের মধ্যকার অভিন্ন বিষয়গুলোকে বড় করে দেখতে পারেন, তবে মুসলমানদের মধ্যে আবারো ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠিত হতে পারে ৷

মুসলিম বিশ্বে আজ যে বিভেদ ও মতবিরোধ চলছে, তার কারণ অণুসন্ধান করলে আমরা অভ্যন্তরীণ ও বাইরে থেকে চাপিয়ে দেয়া দুই ধরণের উপাদান খুঁজে পাবো ৷ পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো মুসলমানদের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টির ক্ষেত্রে ধ্বংসাত্মক উপকরণ হিসেবে কাজ করছে ৷ উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো মুসলমানদের সম্পদ লুণ্ঠন করার জন্য যখন মুসলিম দেশগুলোতে প্রবেশ করে, তখনই তারা বুঝতে পারে এসব দেশের ধর্ম ও সংস্কৃতি তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান অন্তরায় ৷ কারণ, ইসলাম প্রকৃতিগতভাবেই যে কোন অত্যাচার ও আধিপত্যকামিতার বিরোধী ৷ এ কারণে অতীতে উপনিবেশবাদী সরকারগুলো বিশেষ করে বৃটিশ সরকার মুসলমানদের মধ্যে সংঘাত ও সংঘর্ষ বাঁধিয়ে দেয়াকে তার প্রধান কাজ হিসেবে বেছে নেয় ৷ বৃটিশ উপনিবেশবাদী শক্তি মুসলমানদের মধ্যকার ছোটখাটো মতপার্থক্যকে খুঁজে বের করে সেগুলোকে তাদের সামনে বড় করে তুলে ধরতে থাকে ৷

দুঃখজনকভাবে উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো তাদের এ ষড়যন্ত্রে অনেকটা সফল হয়েছিল ৷ অবশ্য মুসলমানদের অজ্ঞতা, কুসংস্কার, গোঁড়ামি ও উগ্র মানসিকতার মত কিছু বিষয় এ কাজে উপনিবেশবাদীদের সহায়তা করেছিল ৷ সেই সাথে বৃটিশরা মুসলিম দেশগুলোতে ইসলামের মূলধারা থেকে বিচ্চূত কিছু গোষ্ঠি তৈরি করতে পেরেছিল ৷ বাহ্যতঃ এসব গোষ্ঠি নিজেদের মুসলমান বলে দাবি করলেও তারা নিজেদের অজ্ঞাতসারে বৃটিশদের হাতের পুতুলে পরিণত হয়েছিল ৷ উপনিবেশবাদীরা এসব গোষ্ঠিকে মুসলমানদের মধ্যে মতবিরোধ উস্কে দেয়ার কাজে ব্যবহার করতো ৷ ফলে দেখা গেল, রহমত ও ঐক্যের নবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর অণুসারী মুসলমানরা নিজেদের মধ্যে এতবেশী ঐক্যের উপাদান থাকা সত্ত্বেও দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়েছে ৷ তারা অভিন্ন বিষয়গুলোকে ভুলে গিয়ে ছোটখাটো মতপার্থক্যকে বড় করে দেখতে শুরু করে এবং উপনিবেশবাদীরা এসব ছোটখাটো বিষয়কে তাদের সামনে মৌলিক বিষয়ের মত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে তুলে ধরে ৷ এভাবেই মুসলমানরা তাদের বিজাতীয় শত্রুদের বিরুদ্ধে লড়াই করার পরিবর্তে ভাইয়ে ভাইয়ে খুনাখুনিতে লিপ্ত হয় ৷
অবশ্য কোন কোন সংস্কারপন্থী মুসলমান নেতা এই মতভেদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন ৷ তারা মুসলমানদেরকে শত্রুদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে অবহিত করে তাদের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টির চেষ্টা করেছেন ৷ সাইয়েদ জামালুদ্দিন আফগানি থেকে শুরু করে শেখ মোহাম্মাদ আব্দুহ এবং অবশেষে ইমাম খোমেনি (রহঃ), এরা সবাই অজ্ঞতা, কুসংস্কার ও গোঁড়ামির ব্যাপারে মুসলমানদের সচেতন করেছেন এবং সম্মিলিত শত্রুর ব্যাপারে তাদেরকে সতর্ক করে দিয়েছেন ৷ কিন্তু মুসলমানদের হিতাকাঙ্খি এসব সংস্কারক একদিকে উগ্র ও গোঁড়া মুসলমান এবং অন্যদিকে বিদেশী উপনিবেশবাদীদের বিরোধিতা ও ক্রোধের শিকার হয়েছেন ৷
বর্তমানে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় বেশী জরুরী হয়ে পড়েছে ৷ কারণ, ঐক্যের বিরুদ্ধে হুমকি আগের তুলনায় বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি মুসলমানদের বিরুদ্ধে শত্রুতার ধরনও পাল্টে গেছে ৷ বর্তমানে তিনটি মুসলিম দেশ তথা ইরাক, আফগানিস্তান ও ফিলিস্তিনে বিদেশী দখলদারিত্ব চলছে এবং যুদ্ধকামী দেশগুলো বিশেষ করে মার্কিন ও বৃটিশ সরকার আরো কিছু মুসলিম দেশকে হুমকি ধমকি দিচ্ছে ৷ অন্যদিকে মুসলমানদের প্রাকৃতিক সম্পদ বিভিন্ন উপায়ে পশ্চিমা পূঁজিবাদী দেশগুলো লুণ্ঠন করে চলেছে ৷ পশ্চিমা গণমাধ্যম মুসলমানদের ধর্মীয় বিশ্বাসগুলো নিয়ে ব্যাঙ্গবিদ্রুপ করছে এবং ইসলাম অবমাননার মত ধৃষ্টতাপূর্ণ কাজে হাত দিয়েছে ৷ মুসলমানদেরকে তাদের ধর্ম সম্পর্কে উদাসিন করে তাদের উপর পশ্চিমা অপসংস্কৃতি চাপিয়ে দেয়ার লক্ষ্যে পশ্চিমা গণমাধ্যম এ সব কাজ করছে ৷ এ অবস্থায় মুসলমানদেরকে তাদের ধর্ম ও দেশ রক্ষার জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়া ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই ৷
আশার কথা হচ্ছে, মুসলিম বিশ্বের কোন কোন স্থানে জাগরণের ধারা সূচিত হয়েছে এবং মুসলমানদের শত্রুরা তাদের কূটকৌশলগুলো বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছে ৷ মার্কিনীরা ইরাক ও আফগানিস্তানে প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন ৷ ইহুদীবাদী ইসরাইল লেবানন ও ফিলিস্তিনে সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে একের পর এক মার খাচ্ছে ৷ পাশাপাশি এখনো অনেক মুসলিম দেশ গোঁড়ামি ও কুসংস্কারের নাগপাশ থেকে বেরিয়ে আসতে পারে নি ৷ লেবাননের হিযবুল্লাহ গত বছর ইহুদীবাদী ইসরাইলকে ৩৩ দিনের যুদ্ধে শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে আরব ও মুসলিম বিশ্বের কাছে বীরের ভূমিকায় অবতীর্ন হলেও সংগঠনটি শিয়া মুসলমানদের সংগঠন হওয়ার কারণে উগ্রবাদীদের সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছে ৷ কোন কোন আরব দেশ ও তাদের গণমাধ্যম দখলদার শক্তিগুলোর সাথে সুর মিলিয়ে তাদের ভাষায় মধ্যপ্রাচ্যে শিয়া শক্তির আবির্ভাব প্রতিহত করার আহবান জানিয়েছে ৷
ইরাকে কিছু সন্দেহভাজন ও উগ্রবাদী গোষ্ঠি মুসলমানদের রক্ত নিয়ে হোলিখেলায় মেতে উঠেছে ৷ ইরাকের বাইরে থেকে আগত এসব গোষ্ঠি শিয়া মুসলমানদের কাফের আখ্যায়িত করে তাদের রক্ত ঝরানোকে হালাল এবং সওয়াব বা পুণ্যের কাজ বলে মনে করছে ৷ অথচ ইসলামে সব ধরনের জুলুম ও অত্যাচার নিষিদ্ধ করা হয়েছে ৷ এমনকি এ ধর্ম অমুসলিমদেরও শান্তি ও সংলাপের দিকে আহবান জানিয়েছে ৷ কাজেই কোন মুসলমান অপর কোন মুসলমানকে তার ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে হত্যা করতে পারে না ৷ কারণ, সেক্ষেত্রে হত্যাকারী একজন মানুষকে হত্যা করার গুরুতর অপরাধে অপরাধী হবে ৷ তবে মুসলিম চিন্তাবিদরা মনে করেন, মুসলমানদের মধ্যে এসব সংঘর্ষ ও সংঘাতের পেছনে নিঃসন্দেহে বিজাতীয় শত্রুদের হাত রয়েছে ৷
তবে মুসলমানদের বিভিন্ন মাযহাবের মধ্যে ধর্মীয় কোন বিষয়ে মতপার্থক্য দেখা দিলে সে ব্যাপারেও ইসলামের নির্দেশনা অত্যন্ত স্পষ্ট ৷ বিভিন্ন মাযহাবের আলেম ও বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিরা উপযুক্ত দলিল প্রমাণ নিয়ে মতপার্থক্য সৃষ্টিকারী বিষয়গুলো নিয়ে সংলাপে বসতে পারেন ৷ তবে তাদের সংলাপের উদ্দেশ্য হতে হবে মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি জোরদারের চেষ্টা করা, মতবিরোধকে উস্কে দেয়া নয় ৷ আলেমদের পাশাপাশি মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্য মুসলিম গণমাধ্যমগুলোরও ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে ৷ পশ্চিমা গণমাধ্যম যেমন মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির কাজে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে, তেমনি মুসলিম গণমাধ্যমগুলোর দায়িত্ব হচ্ছে, মুসলমানদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তাদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা ৷ এসব গণমাধ্যম বিশিষ্ট মুসলিম আলেম ও বিশেষজ্ঞের সাক্ষাতকার নিয়ে শত্রুদের ষড়যন্ত্র সম্পর্কে মুসলমানদের সচেতন করে তুলতে পারে ৷ আর মুসলমানদের এ কথা মনে প্রাণে বিশ্বাস করতে হবে যে, তারা ছোটখাটো মতপার্থক্যকে ঝেড়ে ফেলে মুসলিম উম্মাহ'র বৃহত্‍ স্বার্থে নিজেদের মধ্যে ইস্পাতকঠিন ঐক্য গড়ে তুলতে পারে ৷ আর তা করতে পারলেই বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সাঃ) এর মহান শিক্ষা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে ৷

 

আন্তর্জাতিক ইসলামী ঐক্য সম্মেলন

সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মোহাম্মদ (সা:)-র পবিত্র জন্ম বার্ষিকী বা ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষ্যে ইরানের রাজধানী তেহরানে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ইসলামী ঐক্য সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে গেলো ৷ সম্মেলনে ইরান,সিরিয়া, ওমান, সৌদি আরব, তিওনিসিয়া, সুদান, মিশর, মরক্কো, পাকিস্তান, লেবানন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, ইয়েমেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, জর্ডান, আযারবাইজান, রাশিয়া, ফ্রান্স, বৃটেন, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনসহ বিশ্বের ৪৬ টি দেশের বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, মনীষী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরা অংশ নিয়েছেন ৷


আন্তর্জাতিক ইসলামী ঐক্য সম্মেলনের বক্তারা, ঐশী ধর্ম ও ইসলামের বিভিন্ন মাযহাবের অনুসারীদের মধ্যে ঘনিষ্ট সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা, সাংস্কৃতিক ঐক্য জোরদার, আধ্যাত্বিকতা, নৈতিকতা,ন্যায়বিচার ও শানত্মিপূর্ণ সহাবস্থানের মতো বিষয়াদি নিয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন৷
সম্মেলনের সভাপতি ও মাযহাবগত ঐক্য বিষয়ক সংস্থার মহাসচিব আয়াতুল্লাহ তাসখিরি, দেশী-বিদেশী অতিথিদের সামনে আন্তর্জাতিক ইসলামী ঐক্য সম্মেলনের ইতিহাস ও ভবিষ্যত পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন ৷ এছাড়া, তিনি বিশ্বনবীর পথ অনুসরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন ৷ ইরানের ফার্সি ১৩৮৬ সালের নামকরণের প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেছেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ি চলতি বছরকে জাতীয় ঐক্য ও ইসলামী সংহতি বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করেছেন এবং তা মুসলিম বিশ্বে ঐক্য,সংহতি ও সমৃদ্ধির সুবাতাস বয়ে আনবে ।
সম্মেলনের উদ্বোধনী দিনে ইরানের নীতি নির্ধারণী পরিষদের প্রধান ও সাবেক প্রেসিডেন্ট হুজ্জাতুল ইসলাম হাশেমী রাফসানিও উপস্থিত ছিলেন ৷ তিনি বলেছেন, শত্রুরা সব ধরনের শক্তি নিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে উপস্থিত হয়েছে এবং ধৃষ্টতার সাথে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোকে হুমকি দিচ্ছে ৷ তিনি বলেন, ইসলামের ঐতিহাসিক বাস্তবতা এখন সকল মুসলমানের কাছেই স্পষ্ট ৷ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, মুসলমানদের মধ্যে যখনই মতপার্থক্য ও ফাটল সৃষ্টি হয়েছে, তখনই তাঁরা শত্রুদের মাধ্যমে আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে এবং শত্রুরা এই অবস্থাকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগিয়ে তাঁদের লক্ষ্য হাসিল করেছে ৷ জনাব রাফসানজানি আরও বলেন, নি:সন্দেহে সাম্রাজ্যবাদীরা বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টির পথ বেছে নিয়েছে এবং এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যসহ গোটা মুসলিম বিশ্বে তাদের অশুভ লক্ষ্য বাস্তবায়ন করতে চাইছে ৷ এ অবস্থায় আমাদের মাঝে যেসব বিষয়ে কোন মতবিরোধ নেই, সেই সব বিষয়ের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে এবং হযরত মোহাম্মদ (সা:) মক্কায় যে মহাঐক্যের নিদর্শন রেখে গেছেন,তা থেকে শিক্ষা নিতে হবে ৷

সিরিয়ার গ্রান্ড মুফতি ড: আহমেদ বদর উদ্দিন হাসুনও ঐক্য সম্মেলনে বক্তব্য রেখেছেন ৷ তিনি বলেছেন, মুসলিম উম্মাহ এই সম্মেলনের সাফল্যের দিকে তাকিয়ে আছে ৷ ইরাকের মুসলিম জনগণ এখন মাযহাবগত দ্বন্দ্ব-সংঘাতের কারণে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে,তারাও ইসলামী ঐক্য সম্মেলনের সাফল্য কামনা করছে ৷ তিনি সম্মেলনে উপস্থিত সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনারা যে মাযহাবের অনুসারিই হোন না কেন, পারস্পরিক ঐক্য বজায় রাখুন যাতে সাম্রাজ্যবাদীদেরকে রুখে দেয়া সম্ভব হয় ৷ সিরিয়ার গ্রান্ড মুফতি, বিশ্বের আলেম ও মুসলিম চিন্তাবিদদেরকে ঐক্য জোরদারে একযোগে কাজ করার আহ্বান জানান৷
সম্মেলনে মিশর থেকে আগত বিশিষ্ট চিন্তাবিদ জনাব আল আকালি বলেছেন, মুসলিম বিশ্বে প্রতিরোধের শিক্ষাকে কার্যকরী করে তুলতে এ ধরনের সম্মেলনের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য ৷ তিনি বলেন, ঐক্য ও সংহতি শুধু মুসলমানদের জন্যেই জরুরী নয় বরং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরোধী ও মানবাধিকারের সমর্থক সকল মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে৷ মিশরীয় এই চিন্তাবিদ আরও বলেছেন, সবচেয়ে বড় শয়তান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ছোট শয়তানগুলো, মুসলিম উম্মাহর মধ্যে অনৈক্য কামনা করে, কারণ এ ধরনের অনৈক্য তাঁদের স্বার্থকেই সংরক্ষণ করে ৷ সাম্রাজ্যবাদীরা মুসলমানদেরকে একে অপরের বিরুদ্ধে উস্কে দেয়ার চেষ্টা করছে ৷ ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে হিজবুল্লাহর বিজয়ে ইসলামের বিভিন্ন মাযহাবের অনুসারিদের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকার প্রতি ইঙ্গিত করে তিনি বলেছেন, হিজবুল্লাহ, মুসলিম উম্মাহকে রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছে ৷

ইরানের ধমীর্য় নগরী কোমে অবস্থিত, বিশ্ব ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্রের বিশিষ্ট গবেষক মোহাম্মদ এহসানি,রাসুল (সা:)-র শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাকে, মুসলিম ঐক্যের সবচেয়ে উপযুক্ত ৰেত্র হিসেবে বর্ণনা করেছেন ৷ তিনি বলেন, রাসুলের শিক্ষা ও আদর্শের ব্যাপারে মুসলমানদের মধ্যে কোন মতপার্থক্য নেই ৷ আল্লাহ ও কোরানের প্রতি যাদের বিশ্বাস আছে,তাদের সবাই রাসুলের শিক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল এবং এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ৷ ফলে এর মাধ্যমে স্বল্প সময়ে মুসলিম সমাজ থেকে অনৈক্যের মূল উত্‍পাটন করা সম্ভব ৷ মোহাম্মদ এহসানি, ইসলামি ঐক্য প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে বেশ কিছু প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন ৷ তার মতে, কোরআন ও হাদিসে, ঐক্য ও সংহতির উপর অত্যন্ত গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে, তাই কোরআন ও হাদিসকে সঠিকভাবে অনুসরণ করতে হবে ৷ পরমত সহিষ্ণুতা অর্থাত্‍ ভিন্ন মাযহাবের অনুসারিদের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখতে হবে, সাম্প্রদায়িক ও গোষ্ঠীগত গোড়ামি পরিহার করতে হবে, শিয়া ও সুন্নি মুসলমানদেরকে পরস্পরের দৃষ্টিভঙ্গী ও মতামত সম্পর্কে জানতে হবে, মতপার্থক্য সৃষ্টির লৰ্যে শত্রুদের ষড়যন্ত্র উপলব্ধি করতে হবে এবং অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গীর উপর গুরুত্ব দিতে হবে ৷
আন্তর্জাতিক ইসলামী ঐক্য সম্মেলনের অবকাশে আমরা সিরিয়ার বিশিষ্ট গবেষক প্রফেসর মোহাম্মদ খেইর কাব্বানির সাথে কথা বলেছি ৷ তিনি ইসলামী ঐক্যের উপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেছেন, আমাদেরকে পারস্পারিক বিদ্বেষ ও সংঘাত থেকে দূরে থাকতে হবে ৷ তিনি রাসুলে পথ অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়ে বলেন, বর্তমানে যে সমস্যা রয়েছে, তার বেশির ভাগই রাজনৈতিক, এক্ষেত্রে ধর্মের খুব একটা সম্পর্ক নেই ৷ মুসলমানদের মধ্যে সামান্য মতপ্রার্থক্য অতীতেও ছিল, কিন্তু তা যাতে বড় ধরনের অনৈক্যের কারণ হয়ে না দাড়ায় সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে ৷

সৌদি আরব থেকে আগত বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী মেহেদি আহমাদ তাহার সাথেও সম্মেলনের অবকাশে আমাদের কথা হয়েছে ৷ তিনি বলেছেন, মুসলমানদের নিজেদের মধ্যে বুদ্ধিবৃত্তিক ও জ্ঞানগত আলোচনা বৃদ্ধি করতে হবে এবং এর মাধ্যমে আমরা গোড়ামি থেকে দূরে থাকতে পারব ৷ গোঁড়ামি, যুক্তি ও ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশকে নষ্ট করে ৷ তিনি চিন্তা ও সংলাপকে, ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠার সবচেয়ে উপযুক্ত পন্থা হিসেবে বর্ণনা করেন ৷ সম্মেলন স্থলে ইরানে অধ্যয়নরত দুই জন তুর্কি ছাত্রীর সাথেও আমাদের কথা হয় ৷ এদের একজন হলেন, মিজ বাতুফিফা ৷ তিনি, এ ধরনের ইসলামী ঐক্য সম্মেলন বছরে দুই বার অনুষ্ঠানের দাবি জানান ৷ বাতুফিফা বলেন, উচ্চ শিক্ষার জন্য ইরানে আসার আগে আমি ভাবতাম শিয়া মাযহাব, সুন্নি মাযহাবের পরিপন্থী ৷ কিন্তু ইরানে আসার পর বুঝতে পারলাম যে, শিয়া ও সুন্নি মাযহাবের মধ্যে যে মতপার্থক্য রয়েছে, তা অত্যন্ত গৌণ এবং পাশ্চাত্যের প্রচারণার কারণে দুই মাযহাবের মধ্যে পারস্পারিক ভুল বুঝাবুঝির সৃষ্টি হয়েছে ৷ তুরস্কের এই ছাত্রী বলেছেন, আমাদের কোরআন এক, রাসূল এক; ফলে অভিন্ন বিষয়গুলোর উপর ভিত্তি করে পারস্পরিক ঐক্য জোরদার করতে হবে ৷

আমাদের সাথে কথোপকথনে অংশগ্রহণকারী তুরস্কের অপর ছাত্রির নাম রাবেয়া আরমিশ ৷ তিনি বললেন, ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহহিল উজমা খামেনেয়ী, মুসলমানদের ঐক্যের জন্য একটি অভিন্ন ঘোষণা তৈরী করার কথা বলেছেন ৷ আর আমার দৃষ্টিতে, আয়াতুল্লাহ খামেনেয়ীর বক্তব্যই হলো সর্বশ্রেষ্ঠ ঘোষণা৷ এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, আন্তর্জাতিক ইসলামী সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা সম্মেলনের উদ্বোধনের আগে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনির সাথে সাক্ষাত্‍ করেন ৷ তিনি মুসলমানদের সকল সমস্যা সমাধানে ইসলামী ঐক্য ও সংহতি জোরদারের উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন ৷ একই সাথে তিনি ইসলামী ঐক্য ঘোষণা প্রস্তুত করার জন্য মুসলিম বিশ্বের আলেম সমাজ ও চিন্তাবিদদের প্রতি আহ্বান জানান ৷

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন