এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 31 জানুয়ারী 2013 16:00

ইসলামী বিপ্লব: আধিপত্যবাদের মোকাবিলা

সত্য ও মিথ্যার লড়াই চিরন্তন। সব যুগেই কোনো কোনো জাতি বা জনগোষ্ঠী অন্যায়-অবিচার ও উপনিবেশবাদী বা সাম্রাজ্যবাদী এবং আধিপত্যকামী শক্তিগুলো ও তাদের স্থানীয় অনুচর কিংবা তাদের স্বার্থ রক্ষাকারী শাসকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছে। ইরানের ইসলামী বিপ্লব এই দিক থেকে গত হাজার বছরের বিপ্লবগুলোর ইতিহাসে এক অনন্য শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদায় সমাসীন হয়েছে।

 

ইরানিদের জাতীয় ও ধর্মীয় সংগ্রামগুলো তাদের রাজনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। তবে এই সংগ্রামগুলোর মধ্যে ইসলামী বিপ্লব সবচেয়ে বড় ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তন এনেছে এবং প্রভাব ফেলেছে গোটা বিশ্বে। এ বিপ্লবের প্রথম স্ফুলিঙ্গ উত্থিত হয়েছিল ১৯৬৩ সালের জুন মাসে বা ফার্সি ১৩৪২ সনের ১৫ ই খোরদাদ। বিজাতীয় শক্তিগুলোর শোষণ ও হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে ইরানি জাতির সংগ্রামের ঐতিহ্য ইসলামী বিপ্লবের চূড়ান্ত বিজয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

 

ইরানের সমকালীন ইতিহাস ব্রিটেন ও আমেরিকার  নির্লজ্জ হস্তক্ষেপের বহু দৃষ্টান্তে ভরপুর। ১৯৫৩ সালে  সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনপ্রিয় মোসাদ্দেক সরকার উতখাতের ঘটনায় ইঙ্গ-মার্কিন ষড়যন্ত্র এমনই এক দৃষ্টান্ত। এরপর থেকে ইরানের শাহ সরকারের ওপর মার্কিন কর্তৃত্ব আরো জোরদার হয়েছে দিনকে দিন।

 

অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রেও মার্কিন কর্তৃত্ব ইরানকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলেছিল।  ওয়াশিংটন সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও ইরানের ওপর মার্কিন কর্তৃত্ব জোরদার করছিল সেবাদাস প্রকৃতির রাজা শাহের মাধ্যমে। এ অবস্থায় মরহুম ইমাম খোমেনী (র.)'র ডাকে জেগে ওঠে গোটা ইরানি জাতি এবং রাজপথে নেমে আসে প্রতিবাদী আপামর জনতা।  স্বৈরশাসন ও বিদেশী শোষণের বিরুদ্ধে শুরু হয় ইসলামী গণ-বিপ্লব।

 

ইরানে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পরও দেশটির বিরুদ্ধে মার্কিন সরকারের শত্রুতা অব্যাহত থেকেছে। কারণ, ওয়াশিংটন ইসলামী এই দেশটির স্বাধীনচেতা নীতিকে কখনও সহ্য করতে পারেনি এবং এখনও পারছে না।  তাই ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পরও তেহরানে অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস ইরানের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্রের ঘাঁটিতে ও মার্কিন গুপ্তচরদের আস্তানায় পরিণত হয়। ফলে ইমাম খোমেনী (র.)এর অনুসারী বিপ্লবী ছাত্ররা এ দূতাবাস দখল করে নেয় এবং কূটনীতিকের ছদ্মবেশে সক্রিয় মার্কিন গুপ্তচরদের ৪৪৪ দিন আটক করে রেখেছিল।

 

এ ঘটনার পর মার্কিন সরকার  ইরানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক শত্রুতা আগের চেয়েও কঠোর করেছে। আটক মার্কিন গুপ্তচরদের উদ্ধারের নামে হোয়াইট হাউজ ১৯৮১ সালের এপ্রিল মাসে কয়েকটি হেলিকপ্টার ও সামরিক বিমান নিয়ে ইরানে হামলা চালানোর উদ্যোগ নেয়। এইসব বিমান ও হেলিকপ্টারে চড়ে ৯০ জন মার্কিন কমান্ডো সেনা ইরানে অনুপ্রবেশ করে। তারা ইরানের তাবাস মরুভূমিতে অবস্থান নেয়।  মার্কিন সরকার এ ব্যাপারে ইরানের ভেতরে অবস্থানরত মুনাফিক ও বিপ্লব-বিরোধীদের সঙ্গে সমন্বয় সাধন করেছিল।

 

 

ইরানের ইসলামী বিপ্লবীরা যে দুটি কেন্দ্রে মার্কিন গুপ্তচরদের আটকিয়ে রেখেছিল সেখানে একই সময়ে হামলা চালিয়ে তাদের মুক্ত করা এবং এরপর ইরানের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোতে প্রবল বোমা বর্ষণ করা ছিল এই সন্ত্রাসী মার্কিন অভিযানের লক্ষ্য।

 

 

 

কিন্তু এইসব মার্কিন ষড়যন্ত্র লজ্জাজনকভাবে ভেস্তে যায়। হঠাত তাবাস মরুভূমিতে প্রবল ঝড় দেখা দেয় এবং একের পর এক কয়েকটি হেলিকপ্টার বিকল হয়ে পড়ে। ঝড়ের মধ্যে মার্কিন সামরিক বা জঙ্গি বিমানের সঙ্গে সংঘর্ষ ঘটে হেলিকপ্টারের। ফলে পুরো পরিকল্পনাই ব্যর্থ হয়। তাবাস মরুতে পড়ে থাকে ৯ মার্কিন কমান্ডো সেনার পুড়ে যাওয়া লাশ এবং বিধ্বস্ত জঙ্গি বিমান ও হেলিকপ্টারগুলোর ধ্বংসাবশেষ। বাদবাকি মার্কিন সেনা ও বিমানগুলো ইরান থেকে পালিয়ে যায়। এ ঘটনা নির্লজ্জ মার্কিন হস্তক্ষেপের চরম ব্যর্থতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

 

সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও ১৯৫৩ সনে ইরানের জনপ্রিয় মোসাদ্দেক সরকার উতখাতের ষড়যন্ত্রে জড়িত মার্কিন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের সহযোগী মাইলস কাপল্যান্ড তাবাসের ঘটনা প্রসঙ্গে বলেছেন, কেবল পণবন্দীদের মুক্ত করাই তাবাস-অভিযানের লক্ষ্য ছিল না, বরং ইরানের ইসলামী সরকার উতখাত করাই ছিল  এ অভিযানের মূল লক্ষ্য।

 

 

এরপর ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে ব্যর্থ করার জন্য ইসলামী এই দেশটির বিরুদ্ধে ইরাকের সাদ্দামকে ব্যবহার করেছে মার্কিন সরকার। ইরানের বিরুদ্ধে আরব দেশগুলোর সামরিক শক্তি ব্যবহারের নীতি গ্রহণ করেছিল ওয়াশিংটন। আর এ জন্য ইরাক ও সৌদি আরবকে উসকে দিয়েছিল হোয়াইট হাউজ। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা ব্রেজনস্কি এ কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, মার্কিন সরকারের উতসাহ পেয়েই রাজতান্ত্রিক আরব দেশগুলো ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে ইরাকের সাদ্দাম সরকারকে অর্থ সাহায্য দিত। মার্কিন সরকারের উস্কানি বা উতসাহ পেয়েই সৌদি সরকার তেলের দাম কমিয়ে দিত যাতে ইরানের তেলের দামও কমে যায় এবং এর ফলে তেহরান যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হয়। ব্রেজনস্কি আরো বলেছেন, বর্তমানে ইরানের তেল ও গ্যাস বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আমেরিকা সেই একই নীতি অনুসরণ করছে।

 

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ইরাকের প্রতি মার্কিন ও আরব দেশগুলোর এবং এমনকি প্রাচ্য ও প্রাচ্যের প্রায় সব শক্তির সর্বাত্মক সহায়তা সত্ত্বেও বিপ্লবী ইরানি জাতির প্রতিরোধের ফলে ইরানের ইসলামী বিপ্লবকে ধ্বংস করার বা দুর্বল করার মার্কিন ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়।

 

ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর থেকেই মার্কিন সরকার ইরানের ইসলামী সরকারকে বিপজ্জনক সরকার বলে প্রচার করে আসছিল।  আর এই প্রচারণায় ও ইরান-আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়ার প্রক্রিয়ায় প্রভাবিত হয়েছে বেশ কিছু আরব সরকার। মার্কিন সরকার এইসব আরব সরকারের কাছে প্রায় প্রতি বছরই হাজার হাজার কোটি ডলার মূল্যের অস্ত্র বিক্রি করছে।

 

ইরানকে চারদিক থেকে ঘেরাও করা ছিল ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন দখলদারিত্ব প্রতিষ্ঠার অন্যতম লক্ষ্য। আর এইসব পদক্ষেপ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী মার্কিন সরকারের অব্যাহত শত্রুতাই ফুটে উঠছে।

 

ইরানের শান্তিপূর্ণ পরমাণু কর্মসূচীর বিরুদ্ধে মার্কিন শত্রুতাও লক্ষণীয়। এ ছাড়াও মার্কিন সরকার ইরানের ভেতরে সরকার-বিরোধী আন্দোলনে মদদ দেয়ার চেষ্টা চালিয়ে এসেছে। গত কয়েক বছর আগে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরকার বিরোধী সহিংসতায় জড়িতদের  প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়েছে ওবামা সরকার। ইরানে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির জন্য মার্কিন কংগ্রেস প্রকাশ্যে ৪০ কোটি ডলার বাজেট বরাদ্দের কথাও ঘোষণা করেছে। ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে বিকল বা অচল করার জন্য  দেশটির ওপর স্টুক্সনেট নামক ইন্টারনেট ভাইরাসের হামলা চালিয়েছে মার্কিন সরকার।

 

আসলে ইরানের বিরুদ্ধে গত ৫০ বছরে সংঘটিত মার্কিন অপরাধযজ্ঞের ফিরিস্তি এত লম্বা যে তা স্বল্প সময়ে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করাও সম্ভব নয়।

 

কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ইরানের বিপ্লবী জাতি ও সরকার ইসলামী বিপ্লবের পর মার্কিন সরকারসহ তার পশ্চিমা মিত্রদের নানা চাপ ও নিষেধাজ্ঞার মুখে বিন্দুমাত্রও নতজানু হয়নি, বরং সবক্ষেত্রে বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধ অব্যাহত রেখেছে। ফলে ব্যর্থ হচ্ছে এইসব চাপ ও নিষেধাজ্ঞা। জ্ঞান-বিজ্ঞান, নারী-উন্নয়ন, সামরিক শিল্প, পরমাণু প্রযুক্তি ও চিকিতসা খাতসহ নানা খাতে ইসলামী এই দেশটি অসাধারণ সাফল্য অর্জন অব্যাহত রেখেছে। অথচ এ ধরনের চাপের মুখে বিশ্বের যে কোনো সরকার বহু আগেই নতজানু হয়ে পড়তে বাধ্য হত।

 

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরব বিশ্বে যে ইসলামী গণ-জাগরণ শুরু হয়েছে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের বীরত্বপূর্ণ প্রতিরোধের প্রভাব তার ওপর স্পষ্ট বলে বিশ্বের অনেক চিন্তাবিদ এবং বিশ্লেষকরা মনে করছেন ।#

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন