এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সোমবার, 01 সেপ্টেম্বর 2008 21:52

ঐশী আতিথ্যের মাস-রমজান : ২০০৮

১ম পর্ব


ফামান শাহিদা মিনকুমুশ্‌ শাহরা ফাল্‌ইয়াসুমহু
" কাজেই তোমাদের মাঝে যে মাসটি পাবে, সে যেন রোযা রাখে।"


সূরা বাকারার ১৮৫ নম্বর আয়াত এটি। এই একটি মাত্র আয়াত থেকেই প্রমাণিত হয় যে, সাওম বা রোযা সবার জন্যেই অবশ্য পালনীয় একটি ইসলামী বিধান। ইসলামের মৌলিক পাঁচটি বিধানের একটি হলো রোযা। তবে এই বিধানটি কেবল আমাদের জন্যেই নয় বরং আমাদের পূর্ববর্তী নবী রাসূলগণের উম্মাতদের জন্যেও অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসেবে বিধিবদ্ধ করা হয়েছিল। যেমনটি কোরআনেই বলা হয়েছে, ‘কামা কুতিবা আলাল লাজিনা মিন ক্বাবলিকুম' অর্থাৎ 'যেমনটি তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপরও সিয়ামকে ফরয করা হয়েছিল।'

অশোধিত তেলকে যেমন পরিশোধন করেই জ্বালাতে হয়, ব্যবহার করতে হয়, তেমনি মানুষের মন ও আত্মাকেও যথার্থভাবে কাজে লাগানো বা ব্যবহার করার জন্যে বছরে একবার তাকে পরিশোধন করে নিতে হয়। নইলে অশোধিত তেলের মতো ময়লাযুক্ত আত্মা কিংবা মনে খোদায়ী নূর জ্বলবে না। পবিত্র রমযান মাস হলো অন্তরাত্মাকে পরিশোধন করার শ্রেষ্ঠ সময়। ব্যক্তিগত বিচিত্র ভুলের কারণে শয়তানীর যতো আচ্ছাদন পড়েছে মানুষের অন্তরের আয়নায়, যতো মরিচা ধরেছে তাতে অন্যায় আচরণ আর অনৈতিকতার চর্চার কারণে, সেগুলোকে ধুয়ে মুছে পূত-পবিত্র করে মনের ঘরে আধ্যাত্মিকতার প্রদীপ জ্বালানোর সর্বোত্তম সময় রমযান। পবিত্র কোরআনের সূরা যুমারে আল্লাহ বলে দিয়েছেন, ‘ইন্নামা ইউয়াফফাস সাবিরুনা আজরাহুম বিগাইরি হিসাব' অর্থাৎ যারা প্রবৃত্তির রিপুগুলোকে দমন করে সঠিক পথে অটল থাকবে, তাদেরকে অগণিত সওয়াব প্রদান করা হবে। আর রমযান মাসটিই হলো তার অনুশীলনের শ্রেষ্ঠ ও যথার্থ সময়।

এই মাসটি যেন রোযাদারের জন্যে মেহমানীর মাস। রোযাদার হলেন আল্লাহর মেহমান আর মেহমানের সামনে যে দস্তরখান আল্লাহ বিছিয়ে দিয়েছেন তাতে রয়েছে রহমত, তাতে রয়েছে বরকত এবং তাতে রয়েছে মাগফেরাতের বিচিত্র ভোজের রেসিপি। এখন যারা এইসব ঐশী ভোজে নিজেকে তৃপ্ত-পরিতৃপ্ত করতে চান তারা কোনোরকম কার্পণ্য না করে, কোনোরকম অবহেলা কিংবা কালক্ষেপন না করে নিজেকে সমৃদ্ধ করবেন-এটাই স্বাভাবিক। ইবাদাত আর আধ্যাত্মিকতার সুগন্ধি দিয়ে নিজেদের অন্তরাত্মাকে মৌ মৌ করে তুলবেন-সেই সুবর্ণ সময় এসেছে আজ। মৌলাভি যেমনটি বলেছেন,

সত্যের সুগন্ধি শীতল সমীর
এ সময় নিয়ে আসে ঐশী পাঠ
অপূর্ব এ উপহার থেকে সন্তর্পনে
যতো পারো করে যাও লুটপাট।

রহমতের সমীরণ এসে আবার চলে যায়
যাকে ইচ্ছে তাকে সে প্রাণবায়ু দিয়ে যায়

আবার এসেছে আজ সেই মাহেন্দ্রক্ষণ
প্রস্তুতি নাও হে গোলাম, করো অবগাহন।

হিজরী পঞ্জিকার বারোটি মাসের মধ্যে একটি মাসের নাম হলো রমযান। অথচ মজার ব্যাপার হলো পবিত্র কোরআনে কেবলমাত্র এই রমযান মাসেরই নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকেই বিশ্লেষকমহল মনে করছেন যে, আল্লাহর কাছে এ মাসটির অসামান্য মর্যাদা রয়েছে। যেমনটি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজেই বলেছেন, ‘আস সাওমু লি, অ-আনা আজযি বিহী' অর্থাৎ ‘রোযা আমার জন্যে রাখা হয এবং আমিই তার প্রতিদান দেবো।' পরকালে যে তিনি কী পুরস্কার দেবেন তার কিছুটা ইঙ্গিত নবী কারিম (সাঃ) আমাদের দিয়েছেন। সে থেকে রোযাদারগণ নিশ্চয়ই পরিতৃপ্ত হবার আনন্দ পাবেন। রাসূলে খোদা বলেছেন, ‘রমযান এমন একটি মাস যে মাসে আল্লাহ তোমাদের জন্যে রোযা রাখাকে ফরজ করে দিয়েছে। অতএব যে ব্যক্তি ঈমান সহকারে আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় রোযা রাখবে, তার জন্যে রোযার সেই দিনটি হবে এমন যেন সবেমাত্র সে মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম নিয়েছে, অর্থাৎ রোযাদার তার সকল গুণাহ থেকে মুক্তি পেয়ে নিষ্পাপ শিশুটির মতো হয়ে যাবে।

আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর বান্দাদের প্রতি এ যে কতো বড়ো রহমত, কতো বড় বিশাল এক অনুগ্রহ তা বোঝানো সম্ভব নয়। কেবল অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করার বিষয় এটি। নবী কারিম (সাঃ) বলেছেন, যখনই রমযানের শুভাগমন ঘটে, তখনি আল্লাহর রহমতের দরোজাগুলো খুলে যায় আর জাহান্নামের দরোজাগুলো বন্ধ হয়ে যায়। সেইসাথে শয়তানকে লোহার জিঞ্জীর বা শেকলে আবদ্ধ করা হয়। এই হাদিস থেকে যে বিষয়টি আমাদের উপলব্ধি করতে হবে তাহলো, রমযান ব্যতীত এগারোটি মাসেও আমরা আল্লাহর ইবাদাত-বন্দেগী করার চেষ্টা করে থাকি। কিন্তু শয়তানের প্ররোচনার কারণে অনেক সময় ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও ইবাদাত করা হয়ে ওঠে না। এই মাসে যেহেতু শয়তানকে আটকে রাখা হয়, তাই তার মাধ্যমে প্ররোচিত হবার কোনো আশঙ্কা নেই ফলে যতো খুশি ইবাদাত করার সুযোগ রয়েছে এই মাসে। সুবর্ণ এই সুযোগকে আমরা যেন কোনোভাবেই কাজে লাগাতে ব্যর্থ না হই-সেদিকে অবশ্যই লক্ষ্য রাখতে হবে। কিন্তু কী কর্মসূচি থাকতে পারে এই মাসে, এবার সেই প্রসঙ্গে অলী-আওলিয়াদের সংক্ষিপ্ত দিক-নির্দেশনা তুলে ধরা যাক। আহলে বাইতের মহান ইমামগণ রমযানের দৈনন্দিন করণীয় সম্পর্কে চমৎকার দিক-নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। এমনকি কীভাবে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা চাইতে হবে-তারও নির্দেশন রেখে গেছেন তাঁরা।

বেহেশত হলো আল্লাহর ইবাদাত বা আনুগত্যকারীদের পুরস্কার। রোযাও আল্লাহর দেয়া অবশ্য পালনীয় দায়িত্বগুলোরই একটি। রমযান মাসের এই দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আরো কিছু ইবাদাত অন্তর্ভূক্ত রয়েছে। যেমন- কোরআন তেলাওয়াত করা, এহসান বা দয়াপরবশ হওয়া, দান-খয়রাত করা, তওবা এস্তেগফার করা এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার লাভে যোগ্য সকল গঠনমূলক ইবাদাত এ মাসের অবশ্য করণীয় কিছু দায়িত্ব। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর সন্তুটিষ্ট অর্জন করার এবং নৈতিক চরিত্র গঠন করার সৌভাগ্য দিন। যেমনটি হযরত আলী (আঃ) বলেছেন, ‘ আল্লাহ আমাদের ওপর রোযা ফরজ করেছেন, নৈতিক চরিত্র গঠনে শিক্ষা দেয়ার জন্যে। সেই শিক্ষা যাতে আমরা পেতে পারি এবং তা কাজে লাগাতে পারি সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। #

২য় পর্ব

রমযান মাস হলো আল্লাহর রহমত ও দয়ার হিমেল বায়ুপ্রবাহের মাস। মানুষের মন এবং আত্মার ওপর দিয়ে বিশেষ করে যাঁরা আল্লাহর রহমতের কাঙ্গাল তাদেঁর দেহ-মন-আত্মার উপর দিয়েই রহমতের এ বায়ু প্রবাহিত হয়। এখন মানুষ কতোটা ধারণ করবে বা করতে চেষ্টা চালানো উচিত তা নির্ভর করছে বরকতপূর্ণ এই মাসের মর্যাদা কে কতটুকু উপলব্ধি করতে পেরেছে-তার ওপর। আল্লাহ আমাদেরকে এই মহান মাসটির মর্যাদা ও গুরুত্ব উপলব্ধি করার তৌফিক দিন-এই কামনায় শুরু করছি রহমতের অতিথির আজকের আয়োজন।

রাসুলে খোদার একটি হাদিস দিয়ে শুরু করবো আজকের আলোচনা। রাসূল ( সা ) বলেছেন,"তুমি যদি চাও তোমার বুকের ভেতরের অশান্তি কমে যাক তাহলে রমযানের রোযা এবং প্রতিমাসে তিনটি করে রোযা রাখো।"হযরত আলী ( আ ) ও বলেছেন,"প্রতিমাসে তিনটি রোযা এবং রমযান মাসের রোযা বুকের ভেতরকার জটিলতা এবং পেরেশানীগুলো দূর করে দেয়।" প্রতিমাসের রোযার দিনগুলোরও উল্লেখ করেছেন তিনি। দিনগুলো হলো মাসের প্রথম এবং শেষ বৃহস্পতিবার এবং মাসের মধ্যবর্তী বুধবার। দেহ এবং আত্মার ওপরে এই যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে-এটাও রোযার অন্যতম একটা ফযীলত,বড়ো ধরনের বৈশিষ্ট্য।
আসলে রমযানের এই বাহ্যিক উপকারিতার কথা আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান বহু আগেই প্রমাণ করেছে। এ বিষয়টি এখন সর্বজনগ্রাহ্য একটি বাস্তবতা। আল্লাহ যেহেতু আমাদের জন্যে এই বিধানটি দিয়েছেন,ফলে এতে যে অবশ্যই কল্যাণ নিহিত থাকবে-তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশই নেই। কী কী বাহ্যিক কল্যাণ রয়েছে রোযার মধ্যে-সেসব আবিষ্কারের বিষয়। আবিষ্কৃত হলে ভালো,আর আবিষ্কৃত না হলে বিশ্বাসে কোনোরকম কমতি হওয়াটা দুর্বল ঈমানের পরিচায়ক। আমরা তাই সেদিকে না গিয়ে রোযার আধ্যাত্মিকতার দিকেই অগ্রসর হবার চেষ্টা করবো।

রমযান মাসে আল্লাহর রহমতের দ্বার অবারিত হয়ে যায়। রহমত মানে আল্লাহর অনুগ্রহ। অনুগ্রহ ছোট্ট একটি শব্দ। কিন্তু এর তাৎপর্য ব্যাপক। আল্লাহ আমাদের যতো কাজের যোগ্যতা দিয়েছেন,শারীরিক সুস্থতা দিয়েছেন,ভাববার মতো চেতনা দিয়েছেন,উদ্ভাবন করার শক্তি দিয়েছেন,কথা বলা,কাজ করা,চিন্তা-ভাবনা করার সামর্থ দিয়েছেন,মেধা দিয়েছেন মনন দিয়েছেন,আত্মা দিয়েছেন,সেগুলোকে ব্যবহার করে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির মর্যাদায় উন্নীত হবার সুযোগ দিয়েছেন-এ সবই আল্লাহর অনুগ্রহ। আবার অনুগ্রহ মানে ক্ষমা। এগারো মাসব্যাপী যতোরকম অন্যায়-অমূলক-অসঙ্গত আর অসমীচীন কাজ করে আল্লাহর দরবারে আসামী হয়েছি,সেই আসামীকে আল্লাহ যে মাফ করে দেবেন বলে কথা দিয়েছেন-এটা তো বিশাল এক অনুগ্রহ। আর সেই মাফ করে দেওয়ার ঘটনাটি ঘটবে এই রমযান মাসে।

এ জন্যেই রোযাকে বলা হয়েছে জুন্নাহ বা ঢালস্বরূপ। কারণ রোযার মাধ্যমে আল্লাহর বান্দারা দোযখের আগুন থেকে রক্ষা পায়,মুক্তিও পায়। রাসূলে খোদা বলেছেন এ মাসের প্রতি রাতে আল্লাহ তায়ালা জাহান্নাম থেকে বহু মানুষকে মুক্তি দান করেন। তাহলে রোযা যেমন জাহান্নামে যাবার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে,তেমনি জাহান্নামে যাবার পরও সেখান থেকে মুক্তি লাভ করার সুযোগ সৃষ্টি করে। আল্লাহর এতো বড়ো রহমতের বিষয়টিকে যে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হবে-তারচেয়ে হতভাগ্য আর কে থাকতে পারে!আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদের সবাইকে রমযানের তাৎপর্য উপলব্ধি করার তৌফিক দিন।

একটি হাদীসে এসেছে,রাসূল ( সা ) বলেছেন-রোযা এবং কোরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্যে সুপারিশ করবে। রোযা বলবে-হে রব!আমি তাকে পানাহার ও কুপ্রবৃত্তি থেকে বিরত রেখেছি। সুতরাং তুমি তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করো।এটা যে কতো বিশাল প্রাপ্তি-তা কল্পনাই করা যায় না। কেননা আপনারা জানেন যে,কিয়ামতের দিন গুনাহগার বান্দারা আল্লাহর দরবারে তার জন্যে সুপারিশ করার লক্ষ্যে নবীরাসূলদের শরণাপন্ন হবে। কিন্তু তাদেঁর অনেকেই বিনয়বশত কিংবা আল্লাহর সামনে নিজেদেরকে তুচ্ছ বলে প্রমাণ করার জন্যে কারো পক্ষে সুপারিশ করতে অপারগতা প্রকাশ করবেন। কঠিন সেই মুহূর্তে রোযা এবং কোরআন যদি সুপারিশ করার জন্যে এগিয়ে আসে-সেটা যে কতো বড়ো প্রাপ্তি হবে তা একবার কল্পনা করে দেখুন তো। কিন্তু রোযা এবং কোরআন কখন আপনার জন্যে সুপারিশ করবে? যখন আপনি তাদের সুপারিশ পাবার যোগ্যতা অর্জন করবেন,তখন।

দুঃখজনক হলেও সত্য যে,রমযান মাস আসলেই কেবল কোরআনের মাহাত্ম্য বা মর্যাদা নিয়ে আমরা কথা বলি,কিংবা কোরআন পাঠ বা চর্চা করি। বাকি মাসগুলোতে কোরআনকে ভুলে যাই।আর রমযান আসলে আমরা নিজেদেরকে সংযত রাখার চেষ্টা করি,রমযান চলে গেলেই আমরা পুনরায় উদ্ধত হয়ে পড়ি।ফলে এগারো মাস কাউকে ভুলে থেকে একটিমাত্র মাসে তার সেবা খেদমত করলে সে যে কতোটা তুষ্ট হবে-তা কিন্তু ভেবে দেখার বিষয়। তবুও চেষ্টা করতে হবে রমযানের মাসটিকে সবোর্চ্চ গুরুত্ব দিয়ে সর্বাধিক অর্জন করার এবং রমযানের সময়কার ইবাদাত চর্চাকে অন্যান্য মাসেও অব্যাহত রাখার। তবে রমযান মাসকে যেহেতু আল্লাহ নিজের বলে ঘোষণা দিয়েছেন,সেহেতু আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে এ মাসকে যথার্থভাবে কাজ লাগাতে হবে। আল্লাহ যেহেতু রাহমান এবং রাহীম,সেহেতু তিনি সন্তুষ্ট হলে তাঁর রহমতের বারি দিয়ে জাহান্নামের আগুনকে আপনার জন্যে নিভিয়ে দিলেও দিতে পারেন। এই সুযোগটাও কিন্তু আল্লাহর পক্ষ থেকে বিরাট একটা রহমত।

আমাদের মাঝে নববর্ষ সংস্কৃতির একটা প্রচলন আছে। সাধারণত মনে করা হয় যে বছরের শুরুটা যেভাবে আনন্দ-আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপন করা হয়,বাকি মাসগুলোতে তার প্রভাব পড়ে। এটা একান্তই লোকবিশ্বাস। এর সাথে দ্বীন বা বিজ্ঞানের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু এই বিশ্বাসটাকে ইতিবাচক অর্থে ধরে নিয়ে বলা যায় ইবাদাতের জন্যে,আত্মশুদ্ধির জন্যে,পরকালীন মুক্তির জন্যে রমযান হলো আধ্যাত্মিকতা চর্চার নববর্ষ। তাই রমযান মাসটিকে আমরা যেভাবে ইবাদাত-বন্দেগীর মধ্য দিয়ে কাটাই,সেভাবে রমযানকে ইবাদাত বর্ষের সূচনা বলে ধরে নিয়ে যেন বাকি মাসগুলোতে রমযানের কর্মসূচিগুলোকে অব্যাহত রাখার চেষ্টা করি।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন নিঃসন্দেহে মুমিনরা পরস্পরে ভাই-ভাই। সুতরাং তোমাদের ভাইদের মধ্যে তোমরা শান্তিস্থাপন করবে। আর তোমরা পরহেজগার হবে অর্থাৎ আল্লাহকে ভয়-ভক্তি করবে,যাতে আল্লাহ তোমাদের ওপর তাঁর রহমত বা অনুগ্রহ বর্ষণ করেন। প্রকৃতপক্ষে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ এই পরিবেশটা কেবলমাত্র রমযান মাসেই কিছুটা অনুভব করা যায়। বলাবাহুল্য,পৃথিবী জুড়ে বর্তমানে যতো অরাজকতা আর জুলুম-নির্যাতন দেখা যাচ্ছে,তার মূলে রয়েছে মানুষের সাথে মানুষের ভ্রাতৃসুলভ সম্পর্কের অভাব। তাই রমযান মাসের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ পরিবেশটাকে যদি সারা বছর ধরে বজায় রাখা যায়,তাহলে পৃথিবীটা হয়ে উঠবে ইহজাগতিক বেহেশত। রমযান এদিকে থেকেও আল্লাহর বান্দাদের জন্যে তাঁর এক অসাধারণ রহমত বা অনুগ্রহ।

৩য় পর্ব

রাসূলে কারিম ( সা ) বলেছেন, আমার অনুসারীদের মধ্যে যারা বেহেশতে যাবে তাদের মধ্যে বেশিরভাগই যাবে দুটি কারণে,একটি হলো আল্লাহকে ভয় করা এবং অপরটি হলো সদাচার বা সদ্ব্যবহার করা।আল্লাহকে ভয় করার মানেই হলো তাকওয়াবান হওয়া। আর তাকওয়াবান তারাই যাদের বিবেক-বুদ্ধি,মেধা-বিচক্ষণতার ক্ষেত্রে পূর্ণতা রয়েছে। আর যাদের মধ্যে এই গুণাবলীগুলো রয়েছে তারা অন্যান্যদের তুলনায় অনেক বেশি সংযত,সুসংহত এবং পরিশীলীত আচার-আচরণ করবেন-এটাই স্বাভাবিক।রমযান এলেই মানুষের মাঝে এই গুণাবলীগুলো অন্য সময়ের তুলনায় একটু বেশিই লক্ষ্য করা যায়। কেননা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নিজেই ঘোষণা করেছেন, তোমাদের ওপর এবং তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর রোযা ফরয করার উদ্দেশ্য হলো তোমাদের মাঝে তাকওয়া সৃষ্টি করা। হযরত আলী ( আ ) এর একটি বাণী এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। তিনি বলেছেন,সদাচার এবং প্রশস্ত ও উদার দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের আয়-উপার্জন বাড়িয়ে দেয়। দারিদ্র্যক্লিষ্ট জনগোষ্ঠির জন্যে হযরত আলী ( আ ) এর এই বাণীটি অনুশীলনযোগ্য।

ব্রিটিশ মনীষী প্রখ্যাত স্যামুয়েল স্মাইলস বলেছেন,পৃথিবীকে গতিময়তার দিকে পরিচালিত করার মতো যতো শক্তি রয়েছে তার মধ্যে উন্নত আচার-আচরণ একটি।প্রকৃতপক্ষে আদব-কায়দা হচ্ছে মানুষের স্বভাবেরই চূড়ান্ত বহিপ্র্রকাশ। কিন্তু এইসব চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য জন্মগত নয়,বরং এইসব গুণাবলী অর্জন করতে হয়। আর তা অর্জন করার শ্রেষ্ঠ সময় হলো রমযান মাস। কারণ রোযা নষ্ট হয়ে যায়-এই ভয়ে রোযাদারকে বহু ধরনের প্রবৃত্তি তাড়িত কাজকর্ম থেকে বিরত থাকতে হয়।কেননা মিথ্যাকথা বলা,পরনিন্দা করা,কুটনামি করা,মিথ্যা শপথ করা,কামভাবের সাথে কারো দিকে তাকানো-এগুলো রোযা নষ্ট করে দেয়।তাই সংযমী হতে হয় রোযাদারকে।আর এই যে সংযম-তা একান্তই আল্লাহর জন্যে। কেননা হাদীসে এসেছে,আল্লাহ নিজেই বলেছেন 'ইয়াদুড়্ শাহওয়াতাহু ওয়া ত্বোড়ামাহু মিন আজলি'অর্থাৎ রোযাদার আমারই কারণে,আমারই নির্দেশ পালনে এবং আমারই সন্তোষ বিধানের উদ্দেশ্যে তার প্রবৃত্তিকে দমন করে,পানাহার পরিহার করে।রমযান তাই মানুষকে সংযম এবং সদাচার শিক্ষা দেয়।

আর এই সংযম যদি পালন করা না হয়,তাহলে রোযাদার কেবল উপোসই করবে শুধু,ক্ষুধা-তৃষ্ণায় কষ্টই পাবে শুধু,তার রোযা তার জন্যে কোনো ফল বয়ে আনবে না। কেননা হাদীসে পাকে বলা হয়েছে অনেক রোযাদার আছে,ক্ষুধা-তৃষ্ণার কষ্ট ছাড়া তাদের রোযা থেকে আর কোনো ফল লাভ হয় না। সুতরাং রোযাকে অযথা অসংযমের কারণে নষ্ট হতে দেওয়া যাবে না। তাই আচার-আচরণ সুন্দর করতে হবে। মিথ্যাবাদিতার চর্চা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। বিশেষ করে ছেলেমেয়েদের সামনে মিথ্যা বলা বা সত্যের বিরোধী আচরণ পরিহার করা অথ্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কারণ ছেলেমেয়েরা তাদের পরিবার এবং চারদিকের লোকজনের কাছ থেকেই আচার-আচরণ,কথাবার্তা,কাজকর্ম ইত্যাদি শেখে। এই শিক্ষা এবং এই উপলব্ধি আমরা রমযান মাসে পেয়ে থাকি। তবে এই গুণাবলীগুলো আমাদের শিক্ষা দেয় আল-কোরআন। তাই রোযা রাখার পাশাপাশি বেশি বেশি করে কোরআন পড়া খুবই জরুরী। কোরআন বুক শেল্ফ থেকে জায়নামাযের রেহেলে পঠিত হোক-এই কামনা করছি।

আলোচনার এ পর্যায়ে রোযাদারদের জন্যে কিছু খুশির খবর দিচ্ছি। এমনিতেই রমযান মাস এলে প্রকৃত রোযাদারগণ বা মুসলমানেরা আনন্দ প্রকাশ করে থাকেন। এ আনন্দ অনাবিল,স্বতস্ফূর্ত এবং প্রকাশ্য। রমযানের সূচনাতেই খুশির একটা আমেজ সর্বত্র লক্ষ্য করা যায়। এটা আল্লাহর একটা বিশেষ রহমত। পবিত্র কোরআনের সূরা ইউনূসের ৫৮ নম্বরে আয়াতে যেমনটি আল্লাহ বলেছেন,বল!এটা আল্লাহর অনুগ্রহ এবং তাঁর দয়ায়। সুতরাং এতে তারা আনন্দিত হোক। তারা যা সঞ্চয় করে,এটা তার চেয়েও উত্তম। পার্থিব কোনো সম্পদের সাথে তো আল্লাহর রহমতের তুলনা চলে না। রাসূল বলেছেন,যে ব্যক্তি রমযান মাসের কল্যাণ ও রহমত থেকে বঞ্চিত হলো,সেমূলত সকল কল্যাণ থেকেই বঞ্চিত হলো। সুখরটি হলো-

রাসূলে খোদা বলেছেন,রাইয়্যান নামে বেহেশতের একটি দরোজা আছে। কিয়ামতের দিন ঐ দরোজা দিয়ে কেবলমাত্র রোযাদাররাই প্রবেশ করবে। রোযাদারদেরকে ডেকে ডেকে বেহেশতে প্রবেশ করানোর পর ঐ দরোজাটি বন্ধ হয়ে যাবে। অন্যত্র বলা হয়েছে যে লোকই সেই দ্বারপথে প্রবেশ করবে,সে-ই পান করবে। আর যে-ই পান করবে,সে আর কোনোদিন পিপাসার্ত হবে না। এই হাদীসে উল্লেখিত রাইয়্যান শব্দটির অর্থই হলো সদাপ্রবহমান প্রস্রবণ। অতএব রোযাদার বন্ধুরা!ক্ষুধা-তৃষ্ণাকে উপেক্ষা করে সিয়াম সাধনায় আত্মনিয়োগ করুন-আর পরকালে ব্যতিক্রমধর্মী পুরস্কার ও মর্যাদা লাভের সৌভাগ্য অর্জন করুন।

সবশেষে হযরত সালমান ফারসি ( আ ) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসের অংশ বিশেষ উদ্ধৃত করছি। রাসূলে খোদা বলেছেন.... রমযান সবর,ধৈর্য ও তিতীক্ষার মাস।আর সবরের প্রতিফল হলো আল্লাহর কাছ থেকে জান্নাত প্রাপ্তি।এটা পারস্পরিক হৃদ্যতা এবং সৌজন্য প্রদর্শনের মহিমা। এ মাসে মুমিনের রেযক বাড়িয়ে দেওয়া হয়। যে ব্যক্তি রোযাদারকে ইফতার করাবে আল্লাহ তার গুনাহ মাফ করে দেবেন এবং জাহান্নাম থেকে নিষ্কৃতি দেবেন।তাকে আসল রোযার সওয়াব দেওয়া হবে কিন্তু সেজন্যে রোযাদারের সওয়াব কমানো হবে না।........... আর যে ব্যক্তি এই মাসে নিজের অধীন লোকদের শ্রম-মেহনত হাল্কা বা হ্রাস করে দেবে,আল্লাহ তায়ালা তাকেঁ ক্ষমা করে দেবেন এবং তাকে দোযখ থেকে মুক্তি দেবেন। এই সুসংবাদ কেবল রোযাদারদের জন্যে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে এই সুসংবাদের অধিকারী করে তুলুন। সবশেষে আসুন মোনাজাত করি,আল্লাহর দরবারে দোয়া করি।

৪র্থ পর্ব


( লক্ষ্যস্থির ও দৈনন্দিন কর্মসূচি )

রমযান মাস হলো সকল পাপ-পঙ্কিলতাকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ছাইভস্ম করে ফেলার মাস। রমযান মাস শেষে একজন রোযাদার সম্পূর্ণ নিষ্পাপ শিশুর মতো নতুন জীবনের অধিকারী হয়ে উঠবেন-এটাই এ মাসের দাবী। রমযান শব্দটির মূল ধাতু বিশ্লেষণ করলেও তাই দাঁড়াবে। রমযান একটি আরবি শব্দ। এর শব্দমূল হলো রা-মিম-দোয়াদ বা রাময।আরবি ভাষায় এর অর্থ হচ্ছে অতিরিক্ত গরম,কঠোর সূর্যতাপ,দহন,জ্বলন,তৃষ্ণা এবং গলে যাওয়া।রমযান মাসে যেহেতু নেক আমলের কারণে বিগত গুনাহ বা পাপগুলো বিমোচিত হয়ে যায় কিংবা গলে গলে নিঃশেষ হয়ে যায় সেজন্যেই এ মাসের নাম হলো রমযান।

এ-ও বলা হয় যে রোযা রাখার কারণে ক্ষুৎ-পিপাসার তীব্রতায় রোযাদারের পেট জ্বলতে থাকে। এ অবস্থা বোঝাবার জন্যেও আরবি ভাষায় বলা হয় আসসায়েমু ইউরমাযু অর্থাৎ রোযাদার দগ্ধ হয়।রমযান তার শব্দমূলের দাবী অনুযায়ী আমাদের জীবনের সকল গুনাহ-খাতা জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে-গলিয়ে নিঃশেষ করে দিক, নিষ্পাপ এক নতুন জীবনের সতেজতা নিয়ে আসুক প্রতিটি রোযাদারের জন্যে-এই প্রত্যাশায় শুরু করছি আজকের আলোচনা।

আমরা রমযানের রহমত পর্ব অতিক্রম করছি এখন। রহমত মানে হলো আল্লাহর অনুগ্রহ। পুরো রমযান মাসই আল্লাহর একটা বিশেষ অনুগ্রহ তাঁর বান্দাদের ওপর। সারা রমযান জুড়ে আমরা যেন গুনাহের কালিমাগুলো মুছে ফেলার চেষ্টা করি। কম্পিউটার যারা ব্যবহার করেন তারা নিশ্চয়ই জানেন যে, কোনো একটা প্রোগ্রাম বা সফটওয়্যার ইনস্টল করতে গেলে বেশ কিছুটা সময় লেগে যায়। যিনি ইনস্টল করবেন তাকেঁ ধৈর্যের সাথে অপেক্ষা করতে হয় কখোন শেষ হবার জন্যে। মাঝপথে কিংবা শেষ দিকে এসে যদি কেউ অধৈর্য হয়ে ইনস্টল করার চলমান প্রক্রিয়াটি বন্ধ করে দেন অর্থাৎ ইনস্টলেশান যদি ক্যানসেল করে দেন তাহলে কিন্তু কোনো লাভ হবে না। অযথা সময় নষ্ট হবে, এবং আপনার কম্পিউটারও পূর্বাবস্থাতেই থেকে যাবে। তাই রমযানের অর্জনগুলোকে কার্যকর করার জন্যে এ মাসের কাজগুলোকে রমযানের পরেও অব্যাহতভাবে চালিয়ে যেতে হবে।

রহমতের মাস রমযান আসলে আল্লাহর বান্দাদের জন্যে বিশেষ একটি কর্মশালার মাস। একমাস ব্যাপী এই কর্মশালায় রোযাদারকে বহু বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। সারা বছর জুড়ে বাস্তব জীবনের ব্যবহারিক কার্যক্রমগুলো কীভাবে করতে হবে,কীভাবে আল্লাহর প্রতি আস্থা ও ঈমান রাখতে হবে,কীভাবে নিজেকে সংশোধন করতে হবে,ঘুষ খাওয়া,অপরের হক নষ্ট না করা,ব্যক্তিগত অসৎ গুণাবলী থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা এবং সৎ গুণাবলী অর্জন বিশেষ করে কীভাবে চরিত্র গঠন করতে হবে হবে-সেসব শিক্ষা এ মাসে পাওয়া যায়।তাই রমযান মাস হলো আত্মগঠনের মাস ব্যাপী কর্মশালা।

জীবনের লক্ষ্য স্থির করার মাসও রমযান। সারা বছর ধরে আপনি হয়তো শরীয়ত পরিপন্থী অনেক কাজ করেছেন। এখন এই রমযান মাসে এসে চিন্তা করছেন আপনি কি আপনার আগের ভূমিকাতেই অটল থাকবেন,নাকি আল্লাহর দরবারে তওবা করে তাঁর সাথে অঙ্গীকারে আবদ্ধ হবেন যে কখনো আর শরীয়ত পরিপন্থী কাজে নিজেকে লিপ্ত করবেন না। যদি আপনি আপনার ভুল স্বীকার করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চেয়ে নতুন জীবনের লক্ষ্যে আত্মশুদ্ধির পথ বেছে নেন,তাহলে আল্লাহও আপনাকে সাহায্য করবে,আত্মোন্নয়নে সহযোগিতা করবে। এই মাসে আপনাকে সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আত্মশুদ্ধির পথ বেছে নেওয়াই হলো ভবিষ্যত জীবনের লক্ষ্য স্থির করে নেওয়া। আপনি যদি ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেন তাহলে আপনাকে আরো বেশি তৎপর হতে হবে। আল্লাহকে প্রতিশ্রুতি দিয়ে রমযান মাস চলে যাবার পর পুনরায় পূর্বের কর্মকাণ্ডে ফিরে যাওয়াটা হবে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা। আর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করা ঈমানের পরিচায়ক নয়।

আপনি যদি মুমিন হয়ে থাকেন তাহলে আল্লাহকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালনার্থে আপনাকে অনেক বেশি কর্মতৎপর হতে হবে। কেননা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ঘোষণা করেছেন ইন্নাল্লাহা লা ইউগায়্যিরু মা বি কাউমিন হাত্তা ইউগায়্যিরু মা বিআংফুসিহিম অর্থাৎ আল্লাহ নিশ্চয়ই ততক্ষণ পর্যন্ত কোনো জাতির পরিবর্তন করেন না,যতোক্ষণ না তারা নিজেরা নিজেদেরকে পরিবর্তন করে নেয়।তার মানে হলো আত্মসংশোধনের ঘোষণা দিলেই চলবে না,বরং আত্মসংশোধনের জন্যে সকল প্রকার চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এই চেষ্টা চালানোর প্রক্রিয়াটির কোনো সময়সীমা নেই। মৃত্যুর পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত তা চালিয়ে যেতে হবে। কেননা আল্লাহ নিজেই বলেছেন ওয়াবুদ রাব্বাকা হাত্তা ইয়া'তিকাল ইয়াকীন অর্থাৎ মৃত্যু পর্যন্ত তোমার রবের ইবাদাত করো। এ প্রসঙ্গে নবী করীম ( সা ) বলেছেন কুল আ-মানতু বিল্লাহি ছুম্মাসতাকাম অর্থাৎ বলো,ঈমান আনলাম আল্লাহর ওপর,তারপর অবিচল থাকো। অতএব রমযান মাস হলো আল্লাহর ওপর অবিচল থাকা এবং ব্যক্তিজীবনের লক্ষ্য নির্ধারণের মাস।

রমযান মাসের শুরুতেই তাই আপনাকে পুরো মাসের একটা কর্মসূচি তৈরী করে ফেলতে হবে। এই কর্মসূচিতে দিনের এবং রাতের ইবাদাতের সময় ঠিক করে নিতে হবে। কর্মসূচিগুলোর মধ্যে যা যা থাকা জরুরী তার একটা সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা দেওয়া যাক। প্রথমেই আপনাকে সাহরি এবং ইফতারের সুনির্দিষ্ট সশয় নির্ধারণ করে নিতে হবে। অর্থসহ বেশি বেশি কোরআন তিলাওয়াত করতে হবে। সেইসাথে ইসলামী সাহিত্য বেশি বেশি পড়তে হবে।বেশি বেশি ইবাদাতের স্বার্থে কম খাওয়ার চেষ্টা করতে হবে এবং কম ঘুমানোর চেষ্টা করতে হবে।

রাত জেগে ইবাদাত করার চেষ্টা করতে হবে।গরীব-দুখি-অসহায়দের খোজ-খবর নিতে হবে এবং তাদের প্রতি যথাসম্ভব উদার-সহানুভূতিশীল ও দয়াবান হতে হবে। দুনিয়াবি ব্যস্ততা কমিয়ে আখেরাতের চিন্তা বেশি করতে হবে। রোযাদারকে ইফতার করানোর চেষ্টা করতে হবে। দোয়া-দরুদ,জিকির-আজকার বেশি বেশি করে আল্লাহর দরবারে তওবা-ইস্তেগফার করতে হবে। আল্লাহর কাছে গুনাহ মাফ চেয়ে বেশি বেশি মোনাজাত দিতে হবে।দৈনন্দিন এই কর্মসূচিগুলো যথার্থভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।

৫ম পর্ব

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উযমা খামেনেয়ী বলেছেন,রমযান মাস প্রতি বছরই আসে বেহেশতের আমেজ নিয়ে।  আমাদেরকে সুযোগ দেয় এ মাসের ঐশীভোজে নিজেদেরকে তৃপ্ত করার মধ্য দিয়ে যেন বেহেশতে প্রবেশ করি। কেউ কেউ সেই ত্রিশ দিন বেহেশতের ঐশী আমেজ উপভোগ করেন,কেউ আবার ঐ ত্রিশ দিনের বরকতে পুরো বছর জুড়েই,যেন বেহেশতের মধ্যেই কাটান কেউবা কাটান সারাজীবন। তারি পাশে আবার কেউ কেউ'রোযার ব্যাপারে উদাসীন থেকে অপূরণীয় ক্ষতির মধ্যে নিজেদেরকে নিমজ্জিত করেন,যা একেবারেই দুঃখজনক একটি ঘটনা।'

আয়াতুল্লাহিল উযমা খামেনেয়ী রহমত ও বরকতপূর্ণ এই মাসের প্রাণসঞ্চারী কিছু আধ্যাত্মিক বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন,এই মাস রোযার মাস,কোরআন অবতীর্ণ হবার মাস, ইবাদাতের মাস, ইবাদাতের আত্মা বা প্রাণ-দোয়ার মাস,মুনাজাতের মাস, তওবা-এস্তেগফারের মাস,অপছন্দনীয় পথ থেকে ফিরে আসার মাস এবং খোদাভীতি অর্জন বা তাকওয়ার মাস..... নফস বা প্রবৃত্তির সাথে জেহাদ করার মাস,শয়তানের সাথে এবং আল্লাহর শত্রুদের সাথে সংগ্রাম করার মাস, আত্মীয়-স্বজন এবং দ্বীনী ভাইদের সাথে সম্পর্ক রক্ষা করার মাস, তাকওয়া সঞ্চয় করার জন্যে প্রস্তুতি গ্রহণের মাস। একইভাবে এই মাস ইসলামের সাথে সুপরিচিত হবার সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। পুরো বছর জুড়ে দ্বীনী কাজকর্ম আঞ্জাম দেওয়ার জন্যে যে শক্তি-সামর্থের প্রয়োজন,তার জন্যে যথাযথ বিনিয়োগ করার মহাসুযোগ এনে দেয় রমযান। আমরা যেন অবহেলা করে এই সুযোগ নষ্ট না করি।

রোযা সম্পর্কে গত কদিন ধরে আমরা যতো আলোচনা করলাম,তা থেকে একটি বিষয় অন্তত স্পষ্ট হয়েছে যে, রহমতের এই বসন্তের মাসে রোযা রাখতে পারাটা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের জন্যে এক অপরিশোধ্য করুণা। আমরা যদিও আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব বলেই রোযা রাখি,আসলে এই দায়িত্ব পালনের মধ্যে লুকিয়ে আছে খোদায়ী নেয়ামত। তাই যিনি এ মাসে রোযা রাখতে পারছেন,তাঁর জন্যে মাসটি আল্লাহর পক্ষ থেকে মহামূল্যবান এবং সুবর্ণ এক সুযোগ। অবশ্য রোযা রাখার মধ্যে কষ্ট যে নেই তা নয়। বেশ কষ্ট আছে। উত্তম এবং পুণ্যের যতো কাজ আছে,সকল কাজই কষ্টের। কষ্টবিহীন কোনো পুণ্যের কাজ নেই। কেননা মানুষ কষ্ট না করে কোনো একটি পর্যায়ে উপনীত হতে পারে না। রোযা রাখার মধ্যেও যে কষ্টটুকু রয়েছে,তা রোযা থেকে অর্জিত মুনাফার মোকাবেলায় খুবই সামান্য। রোযার কষ্টটা হলো স্বল্প পুঁজি বিনিয়োগ করে বেশি মুনাফা লাভ করার মতো একটি বিষয়।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা রমযান মাসের রোযাকে খোদায়ী তৌফিক বলে মনে করেন। তাঁর ভাষায়-রোযা ফরয করে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমার , আপনার , সবার জন্যে এ মাসে আত্মগঠন করার উপযুক্ত একটা ক্ষেত্র তৈরী করে দিয়েছেন। আসলে রমযান মাসের সবচে বড়ো যে শিক্ষা তাহলো আত্মগঠন করা। আর এই আত্মগঠন করার পথে সর্বপ্রথম যে পদক্ষেপ তা হলো মানুষ তার নিজের আচার-ব্যবহার,নীতি-নৈতিকতা ইত্যাদি সবকিছুকেই নিজস্ব দৃষ্টি দিয়ে দেখবে এবং ঐ আত্মদৃষ্টিটি হবে সমালোচনামূলক। অর্থাৎ মানুষ নিজেই নিজের ভুল-ত্রুটি দেখবে,সেগুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাববে এবং সেগুলোকে কীভাবে দূর করা যায় সেই চেষ্টায় নিয়োজিত হবে। পরের সমালোচনা না করে এইরকম আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে মানুষ আত্মগঠন করতে পারে। রমযান মাস আমাদের জন্যে আত্মগঠন করার মহাসুযোগ এনে দেয়। এই সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো উচিত।

যে কেউই নিজের সমালোচনা নিজে করতে বসবে,সে ই নিজেকে গঠন করতে পারবে। কেননা নিজের ভুল-ত্রুটিগুলো নিজেই যখন দেখতে পাবে, তখনই সে বুঝতে পারবে,উপলব্ধি করতে পারবে যে,তার ভেতরে কতো অপূর্ণতা রয়েছে,কতো ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে। এইসব অপূর্ণতা,এইসব ত্রুটি-বিচ্যুতি কাটিয়ে ওঠার জন্যে তাই সে বিনয়ী হয়ে উঠবে। উদ্ধত আচার-আচরণ আর তার মধ্যে থাকবে না। অপরের সামনে নিজেকে বড়ো করে তুলে ধরার মতো অহংকার দেখাবে না। রমযান মাস হলো এইসব সৎগুণাবলী চর্চার উপযুক্ত সময়। কেননা এ মাসে মানুষ আল্লাহর রহমতে যতোই পুণ্যকাজ করতে চাইবে,করতে পারবে। শয়তান তার নেক আমলের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার সুযোগ পাবে না।

তবে হ্যাঁ,আল্লাহর দরবারে নিজেকে তুচ্ছ হিসেবে তুলে ধরার ক্ষেত্রে সবিনয় হতে হবে। অর্থাৎ তওবা-এস্তেগফার করে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে। মনে রাখতে হবে এই পথ থেকে বিচ্যুত হলেই কিন্তু অহমবোধ চলে আসবে মনে। আর অহমিকা হলো নিজেকে ধ্বংস করার শ্রেষ্ঠ মাধ্যম। অহমিকা প্রবণ মানুষেরা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করার চেষ্টার পরিবর্তে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টায় লিপ্ত থাকে সারাক্ষণ। তারা কেবল পার্থিব জগতের অপূরণীয় চাহিদা পূরণের চেষ্টায় মগ্ন থাকেন। এরা বস্তুতান্ত্রিক পৃথিবীর বেহেশতেই নিজস্ব চাহিদা চরিতার্থ করে আত্মতৃপ্তি লাভ করেন। তাদের আচার-আচরণ তাই পাশবিক হয়ে ওঠে। পবিত্র কুরআনের সূরা মুহাম্মাদে বলা হয়েছে,নিঃসন্দেহে যারা ঈমান এনেছে,সৎকাজ করেছে,আল্লাহ তাদের প্রবেশ করাবেন এমন জান্নাতে যার নীচে রয়েছে প্রবহমান ঝর্ণাধারা। আর যারা অবিশ্বাস পোষণ করে তারাজন্তু জানোয়ারের মতো খায়দায় ভোগ-বিলাস করে,আগুনই তাদের বাসস্থান। আল্লাহ আমাদেরকে অবিশ্বাসী,উদ্ধত,ভোগ-বিলাসীদের কাতার থেকে নিরাপদ দূরত্বে রাখুন,বিনয়ীদের কাতারে শামিল করুন,আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকারীদের সমাবেশে যুক্ত করুন। #

৬ষ্ঠ পর্ব

রহমতের মাস রমযান। এই মাস তাই সবার কাছেই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সবাই চায় কীভাবে এ মাস থেকে বেশি বেশি ফায়দা হাসিল করা যায়। সবাই আন্তরিকভাবে কামনা করে নিজেকে সকল প্রকার পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত করে পবিত্র একটি জীবন শুরু করতে। কিন্তু শত চাওয়া সত্ত্বেও অনেক সময় তা হয়ে ওঠে না। ওঠেনা কেননা, রহমত লাভের পথ সে নিজেই হয়তো রুদ্ধ করে রেখেছে। হয়তো জানেও না কেন রুদ্ধ হয়ে গেল। এ বিষয়টি নিয়ে আমরা আজকের আসরে কথা বলবো ইনশাআল্লাহ।

মানুষ সাধারণত ভুল করে থাকে। ভুলের উর্ধ্বে নয় মানুষ। তবে এই ভুল করার মাধ্যম বিচিত্র। অনেক সময় মানুষ হয়তো জানেও না যে সে ভুল করছে। যেমন আমরা অনেক সময় হাসতে হাসতে অপরের প্রসঙ্গে কথা বলি,কূশল জিজ্ঞাসা করি। খারাপ কথা নয়,ভালো কথাই। কিন্তু বলতে বলতে দেখা যায় এমন এক প্রসঙ্গ চলে আসলো,যা নিয়ে কথা বলাটা গীবত বা পরনিন্দার পর্যায়ে দাঁড়িয়ে যায়। যা কিনা মারাত্মক একটি গুনাহের কাজ। এই গুনাহের চিন্তাটাও মাথায় আসে না,অথচ আমরা দিব্যি পরনিন্দা করে যাই। পরনিন্দার সূচনাটা হয়তো অন্যভাবে শুরু হয়েছে। সেজন্যে এটাকে আর গীবত বলে মনেই হয় নি। এরকমটা যদি হয়েই থাকে তাহলে সে রহমত প্রাপ্তির পথে বাধার সৃষ্টি করবে।

পরনিন্দা খুবই বাজে একটি প্রবণতা। যারা সঙ্কীর্ণমনা,অপরের ভালো যাদের সহ্য হয় না,যারা হিংসুক কিংবা যারা অপরের মুখোমুখি হবার সাহস রাখে না তারাই মূলত পরনিন্দুক হয়ে থাকে। ইসলামকে ভালোভাবে বা যথার্থভাবে চর্চা না করার কারণেই এইসব মৌলিক মানবীয় দুর্বলতাগুলো মানুষের মাঝে বাসা বাঁধে। কেননা ইসলাম তার অনুসারীদের জন্যে চমৎকার একটি জীবন বিধান দিয়েছে। দিয়েছে একটি সুন্দর আচরণ-বিধিও। কী করা উচিত আর কী করা উচিত নয় তার একটি ভারসাম্যমূলক নীতি ইসলাম দিয়ে দিয়েছে। তা যদি আমরা যথার্থভাবে অনুসরণ করি তাহলে আর কোনো সমস্যা থাকে না। মানবীয় যে অসৎ গুণাবলীর কথা বললাম সেগুলো যদি আমরা চর্চা করি তাহলে আমাদের পুণ্যকর্মগুলোও কোনোরকম সার্থকতা খুঁজে পাবে না। রমযান মাসেও এসব প্রবণতা আমাদের রহমত অর্জনের অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।

পরনিন্দা চর্চার এক পর্যায়ে মানুষ মিথ্যা কলঙ্ক বা অপবাদ রটাতে শুরু করে। এমন কোনো কথা নেই যে পৃথিবীতে সকল মানুষই সবাইকে পছন্দ করবে। একজন আরেকজনকে পছন্দ না-ও করতে পারে। ভালো না লাগা থেকেই তা হয়। অবশ্য ভালো না লাগার কারণ তো একটা থাকেই। তো কেউ যখন কাউকে পছন্দ না করে,তখন তার কোনো কিছুই ভালো লাগে না। এককথায় তাকে চোখের সামনে না দেখলেই তার ভালো লাগে। কিন্তু এ ধরণের মানুষ যখন চোখের সামনে ঘুরে বেড়ায় তখন চলন বাঁকা বলে মনে হয়। এটা এক ধরণের মানসিক সমস্যা। এই সমস্যা থেকেই ছিদ্রান্বেষী চিন্তার উদ্ভব ঘটে। ছিদ্র অন্বেষণ করে কিছু পাওয়া না গেলেই মিথ্যা অপবাদ রটানোর পালা শুরু হয়ে যায়। এরফলে দেখা দেয় সন্দেহ প্রবণতা, অবিশ্বাস এবং আস্থাহীনতা।

ঈমানের দুর্বলতা থেকেই নীচু মানের এইসব আচরণ বা প্রবণতার সৃষ্টি হয়। সাধারণত যারা নিজেদের বা অন্যদের মান-সম্মানের প্রতি খেয়াল রাখে না,তারাই এইসব দুর্বলতায় ভোগে। প্রকৃত ঈমানদার মানুষ এগুলো চর্চা করবে না। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপারটি হলো দুর্বল চিত্তের এইসব ব্যক্তিরা তাদের ভুল স্বীকার করে না কখনোই। যারফলে তাদের মনের বা চিন্তার এই ত্রুটিগুলো থেকেই যায় এবং আল্লাহর সমূহ রহমত থেকে তারা বঞ্চিত হয়। এইসব প্রবণতা দূর করার জন্যে চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের পরামর্শ হলো প্রথমেই এই অসৎ গুণাবলীর কুফল সম্পর্কে অবহিত হতে হবে। নিজের ভেতরে যে তার অস্তিত্ব রয়েছে তা মেনে নিতে হবে। আর অবাঞ্চিত বদঅভ্যাসের মূলোৎপাটন করার মধ্যে সফলতার যে আনন্দানুভূতি রয়েছে,মানসিক প্রশান্তির যে সূক্ষ্ম উপাদান ও প্রফুল্লতা রয়েছে,তা দিয়েই কু-প্ররোচনা বা কু-মন্ত্রণা প্রদানকারী অনুভূতিগুলোর ওপর বিজয় লাভ করা যাবে।

পবিত্র কোরআনে অপবাদ রটানোর বাস্তবতাকে ছোট্ট অথচ খুবই তীক্ষ্ণ একটি আয়াত দিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে। আয়াতটির বঙ্গানুবাদ দাঁড়াবে এ রকমঃ "তোমাদের মধ্যে কি কেউ তার মৃত ভাইয়ের মাংস খেতে পছন্দ করবে? কিন্তু এটা তোমরা ঘৃণা করবে।" গীবত করাকে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন মৃত ভাইয়ের মাংস খাওয়ার মতো জঘন্য অপরাধ বলে উল্লেখ করেছেন। এটা নৈতিকতার সীমা লঙ্ঘনকারী একটি অপকর্ম। ইসলাম সবসময়ই এ ধরণের অপরাধকে নিন্দনীয় বলে গণ্য করেছে। না কেবল গণ্য করেই ক্ষান্ত হয় নি বরং প্রতিটি মুসলমানের জন্যে মিথ্যা অপবাদের দায়ে আক্রান্ত ব্যক্তির সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করতে বলেছে। নাহজুল ফাসাহায় বলা হয়েছে "তোমার উপস্থিতিতে যদি কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটানো হয় তাহলে তুমি অপবাদগ্রস্ত লোকটির সাহায্যকারী হও এবং অপবাদ রটনাকারীকে ঘৃণা করো,আর ঐ দলটিকে পরিত্যাগ করো।"
বিশেষ করে রমযান মাসে কারো বিরুদ্ধে অপবাদ রটানো বা কারো গীবত করা আত্মবিধ্বংসী একটি মারাত্মক অপরাধ হিসেবে গণ্য। অপবাদ রটানো একটা শয়তানী প্রবণতা। শয়তান যেহেতু এ মাসে দুর্বল হয়ে পড়ে সেহেতু এ মাসে গীবত করার মানে হলো ঐ গীবতকারী শয়তানের পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। নবী কারিম ( সা ) তাই বলেছেন,"যে ব্যক্তি রমযান মাসে কোনো মুসলমানের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ রটাবে,সে তার রোযার জন্যে আল্লাহর কাছ থেকে কোনো পুরস্কার পাবে না।" অপর একটি হাদিসে বলা হয়েছে "মুসলমান হলো ঐ ব্যক্তি যার হাত এবং মুখ থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ।" আল্লাহ আমাদেরকে কথা বলার সময় সংযত হবার সৌভাগ্য দান করুন। আমাদের বাহ্যিক হাত আর লেখার হাত দিয়ে অপরকে অপবাদদুষ্ট করা থেকে রক্ষা করুন।

সাধারণত সময় কাটানোর অবসর আড্ডাতেই এইসব বাজে প্রবণতা বেশি চর্চা হয়। রমযান মাসে তাই অযথা আড্ডাবাজিতে যোগ না দেওয়াই উত্তম। তবে হ্যাঁ,যদি সমবেত কোনো পুণ্যকাজের লক্ষ্যে একত্রিত হবার প্রসঙ্গ আসে,তাহলে ভিন্ন কথা। মোটকথা হলো, প্রথমত রমযান মাসে সময় অপচয় করা যাবে না। পরিকল্পিতভাবে সময়গুলোকে ইবাদাতের জন্যে সূচি বিন্যস্ত করতে হবে যাতে অলস সময়ের সুযোগে শয়তানী প্রবণতা চর্চার মওকা না মেলে। মনে রাখতে হবে পরনিন্দা হচ্ছে একটি আত্মিক ব্যাধি। এই ব্যাধিতে আক্রান্ত ব্যক্তিরা আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত থাকবে। রহমতপূর্ণ রমযানে আমাদেরকে যেন আল্লাহর নেয়ামত থেকে বঞ্চিত হতে না হয়,সেদিকে খেয়াল রেখে অসৎ গুণাবলী চর্চা থেকে বিরত থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদেরকে সেই তৌফিক দিন।

৭ম পর্ব

শুভাকাঙ্খী হওয়া একটা ভালো গুণ,সৎগুণ। কল্যাণকামিতা ইসলামের একটি অন্যতম শিক্ষা। এটা পরনিন্দার ঠিক বিপরীত। পরনিন্দা চর্চা যে রহমত প্রাপ্তির অন্তরায়, সে বিষয়ে গত আসরে আমরা খানিকটা কথা বলার চেষ্টা করেছিলাম। এ ব্যাপারে সামান্য সচেতনতাও যদি এসে থাকে আপনাদের মনে তাহলেই আমাদের লক্ষ্য অর্জিত হবে। আজকের আসরে আমরা আরো কিছু অসৎ প্রবণতার কথা বলার চেষ্টা করবো,যেসব প্রবণতার মধ্যে রমযান মাসের অসামান্য রহমত থেকে আমাদের বঞ্চিত হবার শঙ্কা রয়েছে।
পরনিন্দার মতো আত্মঘাতী প্রবণতার পথ ধরে হিংসা এবং পরশ্রীকাতরতার অশুভ প্রবণতাটি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে অপরের সম্পর্কে জানার এক অদম্য কৌতূহল জেগে ওঠে মনের গভীরে। ছিদ্রান্বেষী হয়ে ওঠে মন। পেছনে লেগে থেকে থেকে কিংবা কাউকে পেছনে লাগিয়ে রেখে কোনো ত্রুটি খুঁজে পেলে তো যুদ্ধ জয় হয়েই গেল,কিন্তু যদি কিছুই খুঁজে পাওয়া না যায়-তবেই দাঁড়ায় মহাবিপদ। ভাবখানা এমন যেন ত্রুটি না থাকাটাই মস্ত বড়ো একটা ত্রুটি। এখন তাই ত্রুটি বানাতে হবে। মিষ্টির দোকানের গ্লাসে গুড় লাগানোর গল্পের মতো গল্প তৈরী করার কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে ছিদ্রান্বেষী দুষ্ট লোকটি। ছিদ্রান্বেষী মনের এই আগুন বড়ো সাংঘাতিক। এই আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যায় জীবনের সকল অর্জিত সম্পদ। ছিদ্রান্বেষী মন নিজেকে যেমন জ্বালায় তেমনি জ্বালায় পরিপার্শ্বকেও। মনের ভেতরে ক্ষোভ,হিংসা, পরশ্রীকাতরতা জন্ম দেয় এই ছিদ্রান্বেষী প্রবণতা।
ইসলাম এই প্রবণতার প্রচণ্ড বিরোধী। ইসলাম অপরের দোষত্রুটি খুঁজে না বেড়িয়ে গুণগুলো দেখতে বলেছে। শুধু তাই নয় একমাত্র যুদ্ধ ছাড়া কারো বিরুদ্ধে গোয়েন্দাগিরি করাকে ভীষণভাবে নিষিদ্ধ করেছে। আমাদের মানবীয় দুর্বলতার কারণে এসব জেনেও আমরা অনেক সময় না জানার মতো কাজ করে বসি-যা কেবল আল্লাহর রহমত প্রাপ্তিরই অন্তরায় নয়,বরং আল্লাহর রোষানলে পড়ার শামিল। মানুষ যে পরচর্চা করে,তার পেছনেও রয়েছে হিংসা বা পরশ্রীকাতরতা। হিংসা হলো এক ধরণের আগুন,তুষের আগুন। মনের ভেতরে তুষের আগুনের মতো হিংসা জ্বলতে থাকে নিরবে নিভৃতে। কিছুতেই তা নিভতে চায় না। যে কারণে আগুন জ্বলে,সেই কারণটার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তা নেভে না। কেন জ্বলে এই আগুন ?
হ্যাঁ! এটা এমনিতেই মনের একটা কু-প্রবণতা। পার্থিব জগতের শান-শওকত চিন্তা থেকে এবং পরকালীন চিন্তার অভাব থেকেই তার জন্ম হয়। মানুষ যদি ভাবতো এই পৃথিবীর কোনো কিছুই পরকালীন জীবনে কাজে আসবে না একমাত্র পুণ্যকাজগুলো ছাড়া,তাহলে আর অপরের ধন-সম্পদ দেখে কাতর হতো না। যেহেতু পরকালীন চিন্তা নেই সেহেতু অপরের ভালো,অপরের সুখ-শান্তি,অপরের বিত্ত-বৈভব দেখে সহ্য হয় না। কেবলই ভাবতে থাকে কীভাবে অপরের সেই সুখ-শান্তি নষ্ট করা যায়,কীভাবে তার বিত্ত-বৈভব ধ্বংস করে দেওয়া যায়। এই চিন্তাতেই তার দিন কাটে,রাত কাটে। ঘুম হয় না। হিংসুকের চোখ থেকে আল্লাহ ঘুম কেড়ে নেন। হিংসুকের মন থেকে আল্লাহ শান্তি কেড়ে নেন। হিংসুকের অন্তর থেকে শুভ বোধগুলো দূর হয়ে যায়। মুখ থেকে চলে যায় আস্বাদ-স্পৃহা,অরুচি কিংবা রুচিহীনতা দেখা দেয়। সম্পদ থাকতেও খাবার তৌফিক থাকে না। আর অশুভ চিন্তা, অন্যায় পরিকল্পনা মাথার ভেতর খেলতে থাকে সবসময়। মিথ্যাচার প্রবণতা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তখন। যার পরিণতি হয় ভয়াবহ।

হিংসা মানুষের সকল সদগুণ ধীরে ধীরে নষ্ট করে দেয়, যেভাবে আগুন পুড়িয়ে ছাই করে দেয় আস্ত চেলাকাঠ। হিংসা যে কতো ভয়ঙ্কর একটি প্রবণতা তা বোঝা যাবে বাংলা একটি প্রবাদ থেকে। প্রবাদটি হলো "নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গ করা।" একবার একটু গভীরভাবে ভেবে দেখুন তো,ঘটনাটা কী ভয়াবহ! নিজের লাভে নয় বরং অপরের ক্ষতি করার জন্যে নিজের জীবন দেওয়ার মতো ঘটনার কথাও শোনা যায়। কিন্তু কেন! কেন আমরা অপরের সুখে কষ্ট পাবো? কেন আমরা উদার হবো না ? ইসলাম তাই হিংসা বা পরশ্রীকাতরতাকে তীব্র ঘৃণার চোখে দেখে। মনের ভেতর হিংসা পুষে রেখে রমযান মাসে রোযা রাখলে তা কেবল উপোস করাই হবে,তা থেকে কোনোরকম রহমত প্রাপ্তির সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে হয় না। মহান আল্লাহ পবিত্র কোরআনে বলেছেনঃ যারা আমার বান্দার নেয়ামত দেখে হিংসা করে তারা আমার বন্টন ব্যবস্থাকে অপছন্দ করছে।
কোরআনের এ আয়াত থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে যে,আল্লাহ যাকে যেরকম বিত্ত-বৈভব দিয়েছেন,তার ওপর সন্তুষ্ট থাকতে হবে। আল্লাহর সৃষ্টিরহস্য আমাদের পক্ষে বোঝা কোনোদিনই সম্ভব নয়। তিনি সমাজে ধনী-গরীব সৃষ্টি করেছেন। কাউকে শারীরিক পূর্ণতা দিয়েছেন কাউকে অপূর্ণতা দিয়ে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। এ সবের ওপর মানুষের কোনোরকম হাত নেই। একইভাবে আল্লাহ মানুষদেরকে পরস্পর নির্ভরশীল করে সৃষ্টি করেছেন। কাউকে যদিও বিত্তশালী করেছেন,দেখা যায় সে-ই আবার অন্য কোনো বিষয়ে অপরের ওপর নির্ভরশীল। বিত্ত-বৈভবগত এই শ্রেণীবিন্যাসের রহস্য আল্লাহই ভালো জানেন। আমাদের উচিত সর্বাবস্থায় তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা। এই বোধ যদি মনের গভীরে লালন করা যায় তাহলে মনের ভেতরকার হিংসা নামক অনন্ত আগুনের গোলাটি নিভে যাবে। প্রশান্ত হয়ে উঠবে মন। শান্তিতে ভরে উঠবে জীবন। তাই হিংসা নয়,আল্লাহর বণ্টন ব্যবস্থার ওপর সন্তুষ্ট থাকাই আমাদের কর্তব্য।

এখানে আরেকটি কথা বলে রাখা উচিত,তাহলো আল্লাহ কিন্তু বলেন নি যে ধন-সম্পদের মালিক হওয়া যাবে না। মানুষ তার নিজের শ্রম দিয়ে পরিশ্রম দিয়ে নিজের ভাগ্য নিজে গড়তে পারে। বরং যারাই নিজের ভাগ্য গড়ার কাজে আত্মনিয়োজিত হবে,সচেষ্ট হবে আল্লাহ তাদের সাহায্য করবেন।তাই পরিশ্রমের মাধ্যমে সম্পদশালী হবার মধ্যে কোনোরকম দোষ নেই,বাধানিষেধও নেই। মনে রাখতে হবে নানা কারণে মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে। বহু ধনী মানুষ নানা কারণে গরীব হয়ে পড়ে। আবার গরীব মানুষও চেষ্টার মাধ্যমে ধনসম্পদের মালিক হয়। তাই অপরের ধন-সম্পদ দেখে হিংসায় জ্বলেপুড়ে না মরে নিজের উন্নতির জন্যে চেষ্টা চালানোই সঙ্গত। তাতে আল্লাহও খুশি হন। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী পরিশ্রমী লোকের শ্রমটাও ইবাদাততূল্য।

যেখানে রমযান মাসের রোযা বিগত দিনের পাপগুলোকে মুছে ফেলে, সেখানে যদি হিংসা বা পরশ্রীকাতরতার মতো একটা অসৎ গুণ পাপের পরিবর্তে পুণ্যগুলোকেই নষ্ট করে দেয় তাহলে এর চেয়ে আর দুর্ভাগ্য কী হতে পারে! তাই মনটাকে কলুষমুক্ত করতে হবে। মনের ভেতর হিংসা-বিদ্বেষ পুষে রাখা ঠিক নয়। রমযানে তো নয়ই,রমযান মাসের বাইরেও এইসব নিকৃষ্ট বিষয়ের চর্চা করা থেকে বিরত থাকতে হবে। তবেই রমযান হয়ে উঠবে আমাদের জন্যে রহমতের বসন্ত ঋতু। আল্লাহ আমাদেরকে এই ঋতু অর্থাৎ রমযানের ঐশী কল্যাণগুলো থেকে উপকৃত হবার তৌফিক দিন। সবশেষে সপ্তম রোযার দোয়া দিয়ে শেষ করবো আজকের আসর।

৮ম পর্ব

রমযানের পবিত্রতা রক্ষা করা আমাদের সবার নৈতিক দায়িত্ব। রমযানের পবিত্রতা কীভাবে নষ্ট হয় ? হ্যাঁ! যেসব কাজ ইসলাম বিরোধী,সেসব কাজ করলেই রমযানের পবিত্রতা নষ্ট হবে। আজকাল ইসলাম বিরোধী কাজের সমন্বিত চর্চার অত্যাধুনিক মাধ্যম হলো স্যাটেলাইট এবং ইন্টারনেট। এ মাধ্যমগুলো শুভ কাজের জন্যে যেমন ব্যবহারযোগ্য,তেমনি অশুভ কাজের জন্যেও। যাদের ঘরে এগুলোর চর্চা হয় তারা খুব সহজেই বিষয়টা উপলব্ধি করতে পারবেন। তাই এ বিষয়টি রমযানের রহমতের সুবাতাসকে যেমন প্রবাহিত করতে পারে তেমনি দূষিতও করে দিতে পারে। যদি দূষিতই করে তাহলে তা অবশ্যই ব্যাহত করবে রমযানের মূল উদ্দেশ্যকে। গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়টি নিয়ে আজকের আসরে আমরা খানিকটা কথা বলার চেষ্টা করবো।

স্যাটেলাইট এবং ইন্টারনেট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অন্যতম একটি উপহার। পৃথিবীর দূরত্বকে একেবারেই কমিয়ে দিয়েছে এই প্রযুক্তি। ঘরে বসেই আপনি সমগ্র পৃথিবীর খোঁজখবর পেতে পারেন। ইন্টারনেটে বা স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলে যেমন ইসলাম চর্চার সুযোগ আছে তেমনি তার সম্পূর্ণ বিপরীত অর্থাৎ শয়তানী চর্চারও মহাসুযোগ আছে। বিশেষ করে পশ্চিমা কিছু ওয়েব-সাইট এবং স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেল এমন কিছু অনুষ্ঠান প্রচার করছে যা আমাদের নীতি-নৈতিকতার স্খলন ঘটানোর জন্যে যথেষ্ট। উলঙ্গপনা,বেহায়াপনা,অবাধ যৌনতা চর্চার নির্লজ্জতা দেখানো হয় বেশ কিছু চ্যানেলে। যুবক যুবতীরা বিশেষ করে অবিবাহিতরা এইসব চ্যানেলের প্রতি সহজেই আকৃষ্ট হয়ে পড়বে-এটাই স্বাভাবিক। একমাত্র ইসলাম চর্চার মধ্য দিয়েই চরিত্র নষ্ট করার মাধ্যম এইসব চ্যানেলকে বর্জন করা যেতে পারে। পশ্চিমারা অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবেই এইসব চ্যানেল চালু করেছে। ভাবতেও অবাক লাগে নগ্নতা চর্চা ছাড়া যেন অর্থ উপার্জনের আর কোনো উপায় নেই!

ঘরের ড্রয়িং রুমে রিমোর্টের বোতাম টিপলেই উপভোগ করা যায় বিকৃত মনোরঞ্জনের সমূহ আয়োজন। রমযান মাসে তাই রোযা ভঙ্গ হওয়াটা খুবই সহজ। যিনি রোযা রাখবেন,তাঁকে তাই অত্যন্ত সচেতন হতে হবে। কেবল রমযান মাসেই নয়,রমযানের বাইরেও যাতে এইসব চর্চা না হয়,সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে মুসলমান আর অমুসলমানদের মাঝে ইবাদাত ছাড়াও নৈতিক চরিত্রের দিক থেকে বড়ো ধরণের পার্থক্য রয়েছে। বিশেষ করে পশ্চিমা সমাজ যেসব সংস্কৃতি চর্চা হয়,সেগুলো মুসলমানদের জন্যে সর্বাংশে পরিহার্য। পশ্চিমা সমাজে নারীদের মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ। সেই সমাজের তথাকথিত আধুনিকতা ইসলামের দৃষ্টিতে নগ্নতার পর্যায়ের পড়ে। পশ্চিমা সমাজে নারীরা হিজাবমুক্ত জীবন চর্চায় অভ্যস্ত,কিন্তু মুসলমানদেরকে হিজাবের মানদণ্ড মেনেই সকল কার্যক্রম চালাতে হয়।

এই যে পার্থক্যগুলো,এগুলো যদি আমরা অন্তর দিয়ে উপলব্ধি করতে না পারি,তাহলে কিন্তু পশ্চিমা সংস্কৃতির অবাধ স্রোতে আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতিও ভেসে যাবার আশঙ্কা রয়েছে। আমাদেরকে তাই সচেতন হতে হবে। আমাদের মুসলমানদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শ্রদ্ধা-সম্মান ও স্নেহের ভারসাম্যপূর্ণ যে সুন্দর একটি সম্পর্ক রয়েছে,সে সম্পর্কটি পাশ্চাত্য সমাজে নেই। সেজন্যেই পাশ্চাত্য সমাজে বলতে গেলে পারিবারিক সমাজ ব্যবস্থাটাই এখন নেই। তো যেখানে এই পারিবারিক কিংবা সামাজিক শৃঙ্খলাপূর্ণ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাপূর্ণ ব্যবস্থাই নেই সেখানে যে পাশবিকতা এসে স্থান জুড়ে নেবে-তাতে আর সন্দেহ কী! আর এই বিশৃঙ্খল সমাজের চিত্রগুলো স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলোর মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বব্যাপী। ছড়িয়ে পড়ছে পাশবিকতার অবাধ চর্চার চিত্র। তাই অভিভাবকদের রয়েছে এ ব্যাপারে অনেক বড়ো দায়িত্ব।

সন্তানদের প্রতি খেয়াল রাখা এবং তাদেরকে সঠিক সংস্কৃতি চর্চার ব্যাপারে আগ্রহী করে তোলা অভিভাবকদের প্রধান দায়িত্ব। বিশেষ করে স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলোকে সচেতনভাবে এবং সুকৌশলে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আজকাল মোবাইল ফোনও কিন্তু চারিত্রিক স্খলনের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে। কীভাবে তা রোধ করা যাবে ? আপনার সন্তানকে মোবাইল ব্যবহার করতে না দিয়ে? না তা মোটেও ঠিক হবে না। তাহলে কি তাকে নিম্নমানের মোবাইল সেট কিনে দেবেন? তা করলে সুকৌশল অবলম্বন করতে হবে। তা নাহলে আপনার প্রতি তার এক ধরণের অবিশ্বাস,অনাগ্রহ এবং বিরক্তিই বাড়বে। তারচেয়ে বরং ছোটোবেলা থেকেই আপনার সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করুন। তাকে ভালো-মন্দ,উচিত-অনুচিত,ইহকাল-পরকাল,বেহেশ্ত দোযখ ইত্যাদির ধারণা দিন। তাকে সুস্থ সংস্কৃতির প্রতি উদ্বুদ্ধ করুন। পশ্চিমা সংস্কৃতি যে খারাপ, যুক্তির মাধ্যমে তাকে তা বুঝিয়ে দিন। ইসলাম সম্পর্কে বুঝতে দিন।

সন্তানের মনে যখন ডিশ-কালচার সম্পর্কে ধারণা জন্মাবে,তখন পশ্চিমা সংস্কৃতির বাজে দিক সম্পর্কে তার মনের ভেতর সুস্থ চিন্তা জাগিয়ে দিন। রমযান মাস হতে পারে এই প্রশিক্ষণের শুভ সূচনাকাল। সন্তান যদি ছাত্র বা ছাত্রী হয়ে থাকে,তাহলে রমযান মাসের জন্যে তাকে নতুন একটি রুটিন করে নেওয়ার জন্যে বলুন। সেই রুটিনটি আপনি দেখেশুনে দিন এবং রুটিন অনুযায়ী তার কার্যক্রম লক্ষ্য করুন। মনে রাখবেন রুটিনে এমন শক্ত কোনো কর্মপরিকল্পনা রাখা ঠিক হবে না, যার ফলে আপনাদের সন্তানের ওপর চাপ পড়ে। বরং নীতি-নৈতিকতা, ধর্মীয় করণীয়সহ নিজের পড়ালেখার পাশাপাশি সুষ্ঠু একটি কর্মসূচি দিন। যেখানে পড়ালেখার বিষয়টিও থাকবে, নামায, কোরআন তেলাওয়াত, ইসলামী সাহিত্য পাঠসহ টিভির শালীন ও শিক্ষণীয় অনুষ্ঠানগুলো দেখারও সুযোগ থাকবে।

আজকাল নেট ক্যাফে , সাইবার ক্যাফে , কফি নেট ইত্যাদি বিচিত্র নামে ইন্টারনেট ব্রাউজিং-এর জন্যে ব্যবসায়িক বহু প্রতিষ্ঠান দেখতে পাওয়া যায়। আপনার সন্তানকে যাতে সেখানে সময় কাটাতে না হয় সে ব্যবস্থা সম্ভব হলে আপনি বাসাতেই করে দিতে পারেন। তাহলে সে কী করছে না করছে তা পর্যবেক্ষণ করার সুযোগ থাকবে। তবে রমযান মাসে ব্রাউজিং এর ব্যাপারে কৌশলে নিরুৎসাহিত করা যেতে পারে। মনে রাখতে হবে,ইন্টারনেট ব্রাউজিং এ অভ্যস্ত যারা তারা খুব সহজেই অশালীন সাইটগুলোতে প্রবেশ করতে জানে। এরফলে রমযানের পবিত্রতা যেমন নষ্ট হবে তেমনি নৈতিক চরিত্রও স্খলিত হবে। ব্যাহত হবে রহমত লাভের মহান উদ্দেশ্য। তবে ইন্টারনেটের সুস্থ ও সঠিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাধ সাধতে গেলে হিতে বিপরীত হবার আশঙ্কা থেকে যাবে।

সর্বোপরি নৈতিক শিক্ষাই হলো সন্তানদেরকে অনৈতিকতা চর্চা থেকে বিরত রাখার সর্বোত্তম উপায়। রমযান কী,কেন,কীভাবে এলো, এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য,এর তাৎপর্য কী ইত্যাদি বিষয়ে আপনার সন্তানকে পড়ার সুযোগ দিন,তাকে বলারও সুযোগ দিন,বলার জন্যে তাকে বাহ্বা দিন,উৎসাহিত করুন। এতে করে তাকে ভিন্ন জায়গায় সময় নষ্ট করার বাজে অভ্যাস থেকে যেমন বিরত রাখা সহজ হবে,তেমনি নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার পথও সুগম হবে। সন্তানদের বই পড়ার ক্ষেত্রেও লক্ষ্য রাখতে হবে, বাজে কোনো বই কিংবা পর্ণ ম্যাগাজিন বা চরিত্র হনন কারী কোনো ম্যাগাজিন পড়ছে কী না! রমযান মাস এইসব শিক্ষা ও কর্মসূচি গ্রহণ করার জন্যে উপযুক্ত একটি সময়। এ সময়টাকে আমরা যেন সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারি আল্লাহর দরবারে সেই তৌফিক কামনা করছি।

৯ম পর্ব

আত্ম-গর্ব বা আত্মম্ভরিতা বা হামবড়াই নিয়ে আজ আমরা আলোচনা করব। আলোচনার শুরুতেই পবিত্র কোরআনের সুরা কাহফের ১০৩ এবং ১০৪ আয়াতের দিকে একবার নজর দেই । এই দুই আয়াতে বলা হয়েছে, "বলুন! আমি কি তোমাদেরকে সেসব লোকের সংবাদ দেব, যারা কর্মের দিক দিয়ে খুবই ক্ষতিগ্রস্ত। তারাই সে লোক, যাদের প্রচেষ্টা পার্থিব জীবনে বিভ্রান্ত হয়, অথচ তারা মনে করে যে, তারা সৎকর্ম করেছে।"
অন্যদিকে হজরত আলী (আ) বলেছেন, যার হৃদয়ে একবার আত্মম্ভরিতা বা আত্মগর্ব প্রবেশ করেছে তার ধ্বংস অনিবার্য।

মনোজগতের মারাত্মক এক ব্যাধি আত্মম্ভরিতা বা হামবড়াই বা আত্মগর্বের বিপদের কথা আমরা জানতে পারলাম। অন্য অনেক উপসর্গের মত এরও নানা প্রকারভেদ আছে। এবার এর প্রকারভেদের দিকে নজর দেই। ইমাম মূসা আল কাজেম (আ) বলেছেন, আত্মম্ভরিতা কয়েক প্রকারের। এর মধ্যে একটি হলো, কারো কাছে নিজের বদ বা খারাপ কাজগুলোও সৎ কর্ম হিসেবে প্রতিভাত হতে থাকে এবংg তিনি সে সব কাজকে সৎ কর্ম হিসেবে মনে করতে থাকেন, এবং নিজে ভাল কাজ বা সৎ-কর্ম করছেন বলে ধরে নেন। এ ছাড়া আত্মগর্বের আরেকটি প্রকার হলো, কেউ কেউ মনে করেন ঈমান এনে আল্লাহর প্রতিvv আনুকুল্য দেখান হয়েছে। নাউজুবিল্লাহ। অথচ বাস্তব সত্য হলো, অন্ত:করণে ঈমান আনার শক্তি এবং সামর্থ যুগিয়ে আল্লাহই প্রকৃতপক্ষে তাকে অপরিসীম দয়া করেছেন।

আত্মগর্ব বা আত্মম্ভরিতার আরেকটি প্রতিশব্দ হলো হামবড়াই । আত্মগর্বী ব্যক্তির কাছে নিজের সৎ গুণাবলী বড় হয়ে ভেসে উঠে। তিনি নিজেই নিজেকে বড় করে তোলেন। অর্থাৎ হামবড়াই করতে থাকেন। তিনি তার এই গুণাবলীর জন্য যারপরনাই সন্তোষ প্রকাশ করেন। একইভাবে তিনি নিজেকে সকল ধরণের ভুল-ত্রুটি থেকে মুক্ত বলে ভাবতে শিখেন, নিজের সৎগুণের ব্যাপারে বেশ উৎফুল্লবোধ করেন এবং,প্রফুল্ল চিত্তে ভাবেন যে সৎকর্মে লিপ্ত রয়েছেন। নিজের মধ্যে আত্মগর্ব বা আত্মম্ভরিতা নেই তার বদলে সৎগুণরাজি আছে মনে করে তিনি বিনীত চিত্তে খোদার কাছে শোকরিয়াও জ্ঞাপন করেন। কারো কারো মনো জগতের এহেন পরিস্থিতি প্রতিই হয়ত ইঙ্গিত করে হজরত আলী (আ) বলেছেন, যে ব্যক্তি নিজেকে খোদার দরবারে বড় বলে মনে করেন প্রকৃতপক্ষে তিনি একেবারেই মূল্যহীন ব্যক্তি মাত্র।

ইমাম জাফর আস সাদেক (আ) আত্মম্ভরিতা প্রসঙ্গে একটি হাদিস বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন, শয়তান বলে, আদম সন্তানদের যদি তিনটি ক্ষেত্রে পরাভূত করতে পারি তবে তারা যতই সৎ কর্ম করুক না কেনো তা নিয়ে আর আমি মাথা ঘামাই না, কারণ আমি নিশ্চিত ভাবে জানি তার ওই সব সৎ কর্ম আর গ্রহণ করা হবে না। এই তিনটি ক্ষেত্র হলো, ১. কেউ যদি নিজের সৎ কর্মকে বাড়িয়ে দেখতে শুরু করে, ২. কেউ যদি তার পাপ-তাপ, ভুল-ভ্রান্তির কথা ভুলে যায়, ৩. কারো মনে যদি আত্মগর্ব, আত্মম্ভরিতা বা হামবড়াই চেপে বসে।

একজন জ্ঞানী বা নিষ্ঠাবান মানুষের মনোজগতের গঠন কি রকম হওয়া বাঞ্চনীয়? বিশ্ব জগতের জন্য রহমত স্বরূপ হজরত মুহাম্মদ মোস্তফা (সা) এ প্রসঙ্গে বলেছেন, একজন জ্ঞানী ব্যক্তি অন্যের গুটিকয়েক ভাল কাজকে অফুরন্তর সৎকর্ম হিসেবে বিবেচনা করেন এবং নিজের অন্তহীন সুকর্মকে হাতে গোণা অল্প কয়েকটি সৎ কর্ম হিসেবে ধরে নেন।

আত্মম্ভরিতা একজন অতিশয় সাধারণ মানুষের সৎ গুণ এবং সৎ কর্মকে যেমন বিনষ্ট করতে পারে ঠিক একইভাবে একজন ধার্মিকের সৎ গুণ এবং সৎ কর্মকে সমভাবে বিনাশ করতে পারে। মানব আত্মাকে বিনাশ করার মতো যে সব বদ বা খারাপ গুণ দেখতে পাওয়া যায় তার মধ্যে আত্মগর্ব বা আত্মম্ভরিতার স্থান রয়েছে। মৃত্যুর পর এবং আলমে বারজাখে অবস্থান কালে আত্মম্ভর ব্যক্তিকে দুঃসহ একাকিত্বের মধ্যে কাটাতে হবে। আত্মম্ভরিতার কাঁধে ভর করে আরো মারাত্মক গুনাহের সূচনা হতে পারে, হতে পারে মারাত্মক কোনো পাপাচারে লিপ্ত হয়ে পড়ার মতো দুর্ভাগ্য জনক ঘটনা। কারো হৃদয়ে যদি একবার আত্মম্ভরিতার বীজ প্রবেশ করতে পারে তবে সাথে সাথেই তার সৎ কর্মের ইতি ঘটে। শেষ পর্যন্ত তেমন ব্যক্তির শেরেকের মতো মারাত্মক অপরাধে লিপ্ত হওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটতে পারে।

'বুঝলেই পাগল সারে' বলে একটা কথা অনেকেই বলে থাকেন। এ কথার মর্মাথ হলো পাগল যদি বুঝতে পারে যে পাগলামী করছে তা হলে সাথে সাথেই পাগলামী বন্ধ করে দেবে। আত্মম্ভরিতার ক্ষেত্রে একই কথা প্রযোজ্য। কারণ আত্মম্ভর ব্যক্তি কখনোই বুঝতে পারেন না যে তিনি আত্মম্ভরিতা করছেন। কাজেই তিনি নিজেকে শোধরানোর প্রয়োজন আছে বলেই মনে করেন না। তিনি তার অপরাধ বা গোনাহকে ছোট বলে হিসেব করতে থাকেন আর এ ভাবেই তিনি ধ্বংসের পথে ধাবিত হতে থাকেন। আত্মম্ভরিতার কৃষ্ণ পর্দায় তার অন্ত:করণ, তার জ্ঞান-বুদ্ধি, মেধা এবং মনন আগাগোড়া আবৃত হয়ে পড়ে। তিনি আর নিজের কোনো নিচতা বা ক্ষুদ্রতা কিংবা পাপাচার দেখতে পান না। আর এভাবে তিনি কামেল হওয়ার পথ থেকে হারিয়ে যান। তিনি আর পূর্ণতা অর্জন করতে পারেন না।

আত্মম্ভরিতার রাস্তা ধরেই আসে রিয়া বা প্রদর্শন বাতিকতা, নিফাক বা কপটতা। একই সাথে গর্ব উদ্ধত করে তুলে আত্মম্ভর ব্যক্তিকে। এই যখন হয় মনোজগতের অবস্থা তখন অন্যের প্রতি তিনি ঘৃণা প্রদর্শন করেন। অন্যকে তুচ্ছ বলে মনে করতে থাকেন। তিনি মানবিক মূল্যবোধের পথ থেকে সরে যেতে থাকেন ধীরে ধীরে, নিষ্ঠুর হয়ে উঠেন, হয়ে উঠেন হৃদয়হীন এবং তিনি ভয়াবহ ভাবে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন, তার ঠিকানা হয়ে দাঁড়ায় ধ্বংস। হজরত আলী (আ) বলেছেন, আত্মম্ভরিতা থেকে যে একাকিত্বের সৃষ্টি হয় তার মত ভয়াবহ আর কিছু নেই। তিনি আরো বলেছেন, আত্মম্ভর ব্যক্তির মেধা বা মনন বলে কিছুই নেই। আত্মম্ভরিতাকে তিনি মুর্খতার ভিত্তিফলক বলে অভিহিত করেছেন।

আত্মম্ভরিতা থেকে বাঁচতে বা রক্ষা পেতে হলে কি করতে হবে? হ্যাঁ, এবার আমরা সে প্রশ্নের জবাব দেয়ার চেষ্টা করব। প্রথমেই নিজেকে চমৎকার আত্ম বিশ্লেষক হতে হবে। নিজের প্রতি পক্ষপাতহীনভাবে অর্থাৎ নির্মোহ দৃষ্টিপাত করতে হবে। নিজ কর্ম-তৎপরতা,উদ্দেশ্য সহ সব কিছু আবেগবিহীন ভাবে ভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। একই সাথে খোদার দয়া চাইতে হবে। খোদা যেনো তাকে নিজ দুর্বলতা সর্ম্পকে অবহিত হওয়ার সুযোগ দান করেন তা একান্ত ভাবে কামনা করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, খোদা যখন কেউকে তার অপার রহমতের ধারায় পূর্ণ করে দিতে চান তখন তাকে নিজ দুর্বলতা, ভুল এবং ভ্রান্তি বোঝার ক্ষমতা দান করেন।

এ কথা আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, যে জীবন, ক্ষমতা,জ্ঞান বা সাফল্য সবই হচ্ছে আল্লাহর অপরিসীম দয়ার কারণে। তার দয়া ও করুণার কারণেই সকল সৎকর্ম, নেক তৎপরতা, এবাদত বা উপাসনা সম্ভব হয়ে উঠছে। জীবনে নানা সুযোগ লাভ ঘটছে। তার ইঙ্গিত ছাড়া আমাদের কারো পক্ষেই কোনো ভাল কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে যে পৃথিবীর কোনো মানুষই তার প্রতি অর্পিত ইবাদতের দায়িত্ব পালন করতে পারবে না। নবী-রসুল-ইমাম-আউলিয়াদের মর্মস্পর্শী দোয়া এবং আল্লাহর দরবারে পানা ও মাগফেরাত কামনা করে কান্নাকাটি এ কথার স্বাক্ষ্য বহন করে। তারা জানতেন জীবনের প্রতিটি মুর্হুত এবাদতের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত করলেও আল্লাহর সীমাহীন দয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে শেষ করা যাবে না। কাজেই তারা বিনম্র চিত্তে এবং সিক্ত হৃদয়ে আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করতেন কাজেই তাদের রাস্তা ধরে আমাদের সবাইকে পরম বিনম্র চিত্তে তার ক্ষমা ও মাগফেরাত কামনা করতে হবে।
আল্লাহর সীমাহীন বরকত, রহমত এবং মাগফেরাত লাভের মাস এই রমজান। আসুন আমরা আত্মগর্ব, হামবড়াই বা আত্মম্ভরিতার কৃষ্ণব্যাধি থেকে রেহাই পাওয়ার জন্য আজ থেকে তার দরবারে নতজানু হই। কান্নায় ভেংগে পড়ি আমাদের পাপ মোচনের জন্য। ইমাম বাকের (আ) বলেছেন, আত্মগর্বের পথ আধ্যাত্মিকতা দ্বারা রুদ্ধ করে দিতে হবে।

১০ম পর্ব

বান্দার প্রতি খোদার আমন্ত্রণ বা জিয়াফতের এই মাসে রহমত বরকত এবং মাগফেরাতের ঝর্ণাধারা প্রবাহিত হয়েছে। আর আমরা আমাদের সাধ্যমত এই অপরিসীম দয়ার উৎস ধারাকে নিজেদের মধ্যে ধারণের চেষ্টা করব। সত্যের পথে চলার এই পরম পাথেয় নিজের মধ্যে ধারণের জন্য আমাদের মনের অন্ধকার গহ্বরে যে কয়েকটি প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তার অন্যতম হলো রিয়া বা প্রদর্শনবাতিকতা। আজ এ বিষয়ে আমরা আলোচনা করর।

পবিত্র কোরআনে মজিদের সূরা নিসার ১৪২ আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, "অবশ্যই মুনাফেকরা প্রতারণা করছে আল্লাহ সাথে, অথচ তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতারিত করে। বস্তুতঃ তারা যখন নামাযে দাঁড়ায় তখন দাঁড়ায়, একান্ত শিথিলভাবে লোক দেখানোর জন্য। আর তারা আল্লাহকে অল্পই স্মরণ করে।"
ইমাম জাফর সাদেক (আ) বলেছেন, যে কোনো ধরণের রিয়া বা প্রদশর্ন বাতিকতাই হলো শিরিক। তিনি আরো বলেন, অবশ্যই যারা জনগণের জন্য কাজ করে তাদের পুরস্কার জনগণের কাছে এবং যারা আল্লাহর জন্য কাজ করেন তাদের পুরস্কার আল্লাহর কাছে রয়েছে। ইমাম জাফর সাদেক (আ) আরো বলেছেন, হজরত আলী (আ) বলেছেন, রিয়া বা প্রদর্শন বাতিকতার প্রধান তিনটি উপসর্গ রয়েছে, প্রথমটি হলো, জনগণ তাকে স্বাগত জানালে তিনি আনন্দে উদ্বেল হয়ে উঠেন, একা থাকলে তিনি বিষন্ন এবং হতাশ হয়ে পড়েন এবং তিনি চান যে প্রতিটি কাজের জন্য তার প্রশংসা করা হোক।

রিয়া বা প্রদর্শন বাতিকতা বলতে কি বোঝায় এবার সে দিকে একবার নজর দেই। মানুষের শ্রদ্ধা বা সম্মান আদায় করার জন্য অনেকেই নিজেকে সৎ, ধার্মিক এবং মোমেন হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা অনেকেই করে থাকেন। তার মধ্যে যে গুণ নেই বা যে কাজ তিনি করেন না তাই প্রকাশ করার এই অসৎ চেষ্টার নাম হলো রিয়া বা প্রদর্শন বাতিকতা। তবে নিফাকির সাথে রিয়ার গুণগত পার্থক্য রয়েছে। মোনাফেক নিজেকে সৎ ধার্মিকভাবে ফুটিয়ে তুলতে চায় ঠিকই তবে তার মধ্যে এসব গুণ থাকে না বা এ জাতীয় গুণ অর্জনের কোনো চেষ্টা তার মধ্যে দেখা যায় না। অন্যদিকে রিয়াকার বা প্রদর্শনবাতিকগ্রস্থ ব্যক্তি হয়ত এ সব গুণ যর্থাথই অর্জন করেছিলেন কিন্তু এখন এসব গুণ খোদার ইবাদতে ব্যয় করার বদলে তা মানুষের শ্রদ্ধা-ভক্তি অর্জনের কাজে ব্যয় করছেন।

চট করে কোনো রোগ জটিল আকার ধারণ করে না। রিয়া নামের আত্মার রোগটিও একই ভাবে চট করে জটিল হয়ে দাড়ায় না। মানুষ যখন প্রদর্শন বাতিকগ্রস্থ হতে শুরু করে তখন তিনি ধর্মের প্রতি তার অগাধ বিশ্বাসকে তুলে ধরার চেষ্টা করেন, তার ধর্ম-জ্ঞানের গভীরতা প্রমাণ করতে চান, আর এসবই তিনি করে থাকেন মানুষের কাছে সৎ হিসেবে প্রতিভাত হওয়ার জন্য, মানুষের আস্থা ও সম্মান অর্জনের জন্য। সৎকর্মের মধ্য দিয়ে যারা নিজ আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতে তুলতে পেরেছেন তাদের অনেকের মধ্যেই আত্মার রোগ বিয়ার এ পর্যায়ের উপসর্গ দেখা যেতে পারে। এ পর্যায়ে তার চিত্ত ও আত্মার শুদ্ধতার বাহ্যিক প্রকাশ ঘটিয়ে তিনি মানুষের শ্রদ্ধা, ভক্তি এবং সম্মান অর্জনের কাজে ব্যয় করেন। যেমন- যখন তিনি নেফাক বা কপটতা সম্পর্কে কথা বলেন, তখন তার বাচনভঙ্গী, উচ্চারণ এবং দৃঢ়তা দেখে সহজেই মনে হবে তিনি এসবের উর্দ্ধে অবস্থান করছেন।

আত্মার রোগ রিয়াতে আক্রান্ত ব্যক্তির মধ্যে এরপর যে উপসর্গ দেখতে পাওয়া যায় তা হলো তিনি তার সৎ কর্মকে বড় করে তুলে ধরতে থাকেন। তিনি সে সময় এমন এক ভাব দেখান যে সকল ধরণের গুনাহ বা পাপ প্রবণতা, পাপ কর্ম এবং পাপাচার থেকে তিনি মুক্ত হতে পেরেছেন। মানুষের আস্থা কুড়ানোর জন্য তিনি এমন কাজগুলো করে থাকেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মানুষের নজরকাড়ার জন্য বা সম্মান ও শ্রদ্ধা কুড়ানোর অভিলাষে কেউ ব্যাপকভাবে দান করতে পারেন বা নিজের আধ্যাত্মিক মহিমার কথা প্রচার করতে পারেন।

রিয়া বা প্রদর্শন বাতিকতার তৃতীয় স্তরে এসে এই আত্মিক রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিটি লোক দেখানো ইবাদত এবং সৎ কর্ম বেশ জোরেশোরে করতে থাকেন। তিনি যে খারাপ কাজ থেকে বিরত রয়েছেন এবং কঠোরভাবে ধর্মের অনুশাসন, বিধি বিধান মেনে চলেছেন তাই মানুষের কাছে ফুটিয়ে তোলার আকুল আগ্রহে তিনি এ কাজ করতে থাকেন। আর এহেন কর্মটি তিনি ধর্মের নাম ভাঙ্গিয়েই করে থাকেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কেউ সঠিক সময়ে নামাজ আদায় করার অনুশাসন কঠোরভাবে মানেন কেবল বন্ধু-বান্ধব বা ঘনিষ্ঠ জনের কাছে নিজেকে ধর্মের আকীদা-বিশ্বাস যথাযথভাবে পালনকারী হিসেবে ফুটিয়ে তোলার জন্য।

রিয়াকারী ব্যক্তি কল্পনাও করতে পারেন না যে তিনি পার্থিব ক্ষেত্রে যতই সাফল্য অর্জন করুন, মানুষের মধ্যে খ্যাতিমান হয়ে উঠুন, জ্ঞানী ও মনীষীরা তার প্রতি অনুরাগ প্রকাশ করুক তারপরও মহান শক্তিধর আল্লাহর দরবারে তিনি ক্ষমা পাবেন না। সেখানে তাকে আসামীর কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। আর রিয়াকারীর স্থান হবে সর্বনিকৃষ্ট দোজখ, সিজজিনে। সাধারণ ভাবে রিয়া একা আসে না, আত্মার এই রোগের পথ ধরে আত্মপ্রচারের মতো ভয়াবহ এক বদগুণ এসে ভর করে। রিয়াকার ব্যক্তি অন্যদের অবমাননা করতে চান, অন্য কারো অনুভূতিতে আঘাত করতে তার বিন্দুমাত্র বাধে না। নিজেকে অধিকতরও ধার্মিক প্রমাণ করার জন্য তিনি যর্থাথ ধার্মিক ব্যক্তিকে আঘাত করেন, তার প্রতি কঠোর আচরণ করেন এবং দম্ভভরে কথা বলেন। রিয়ার বিষবৃক্ষ যদি কারো মনে দীর্ঘ দিন ধরে শিকড় বিস্তার করতে পারে তবে তা তাকে মুনাফিকে পরিণত করতে পারে।

সুরা কাহাফের ১১০ আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে, " যে ব্যক্তি তার পালনকর্তার সাক্ষাৎ কামনা করে, সে যেন সৎকর্ম সম্পাদন করে এবং তার পালনকর্তার এবাদতে কাউকে শরীক না করে। "
আর এই আয়াতের ব্যাখ্যা ইমাম জাফর সাদেক (আ) এর কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেছিলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর করুণা লাভের জন্য সৎ কর্ম করেন না বরং মানুষের কাছে ধার্মিক হয়ে উঠার মনোভিলাষে এমন কাজ করেন। সে ব্যক্তির এমন সব কর্মই শিরক হিসেবে বিবেচিত হবে। ইমাম জাফর সাদেক (আ) এখানেই থেমে গেলেন না, তারপর তিনি বললেন, এমন কেউ নেই যিনি আল্লাহর করুণা লাভের জন্য সৎ কাজ করেছেন অথচ আল্লাহ তা প্রকাশ করেন নি। অন্যদিকে এমন কেউ নেই যিনি তার অসৎ কর্মকে স্থায়ীভাবে লুকিয়ে রাখতে পারবেন কারণ তিনি দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়ার আগেই আল্লাহ তা উন্মোচিত করে দেবেন।

রিয়া সম্পর্কে আমরা জানলাম। এবার এই আত্ম বিনাশক ব্যধির প্রকোপ থেকে কি ভাবে আমরা রক্ষা পেতে পারি এবার সেদিকে নজর দেই। মানুষকে শয়তান সুনিপূণ চাতুর্যের সাথে কু-মন্ত্রণা বা ওয়াসওয়াসা যোগায় বা মানুষের জন্য প্রলোভনের সৃষ্টি করে। সব সময় মানুষ বুঝেও উঠতে পারেন না যে তিনি কুমন্ত্রণা বা প্রলোভনের প্রভাবে পড়েছেন। এ অবস্থায় মনে করতে পারেন তিনি খোদার পথে চলেছেন অথচ প্রকৃত সত্য হলো তিনি খোদার ইবাদত নয় বরং নিজ স্বার্থকে প্রাধান্য দিচ্ছেন। তাই প্রথমেই আত্মার রোগ থেকে বাচতে হলে নিজের প্রতি কঠোর সমালোচনার দৃষ্টিতে নজর দিতে হবে।

একজন চিকিৎসকের দৃষ্টি নিয়ে খতিয়ে দেখতে হবে নিজের কর্ম-তৎপরতা, ইবাদত এবং সৎকর্মের পেছনে কী মনোভাব কাজ করছে। দেখতে হবে তিনি আত্ম-প্রশংসার জন্য লালায়িত কিনা, নিজ সুকর্মের প্রশংসা তার কাছে ভাল লাগে কিনা, তার অহম বোধ বা আত্ম-অহংকার তৃপ্ত হয় কিনা। কোনো ভাল কাজের জন্য কেউ প্রশংসা করল না তখন তার কেমন লাগে তাও তাকে ভেবে দেখতে হবে। বন্ধু-বান্ধবের বা লোকজনের মধ্যে থাকলে ভাল কাজের ইচ্ছা জোরদার হয়ে উঠে কিনা তা চুলচেরা বিশ্লেষণ করে দেখতে হবে। যদি দেখেন জবাব হ্যাঁ সুচক হচ্ছে তা হলে বুঝতে হবে রিয়া বা প্রদর্শন বাতিকতার রোগে ধরেছে।

এ রোগ থেকে মুক্তি পেতে হলে, ইবাদত বন্দেগীর সহ সকল সৎ কর্ম যতোটা সম্ভব লোক চক্ষুর অগোচরে করতে হবে। নিজের প্রতি কঠোর হতে হবে, প্রশংসা লাভের ইচ্ছা থেকে দূরে থাকতে হবে, আল্লাহর দরবারে বার বার ক্ষমা চাইতে হবে এবং তার করুণা কামনা করতে হবে।

আল্লাহ আমাদের সহায় হোন এবং রিয়ার মতো ভয়াবহ গুনাহর হাত থেকে তিনি আমাদের রক্ষা করুন। এই রমজানে আমরা যেনো তার অপর দয়া লাভ করতে পারি সে চেষ্টায় সবাই তৎপর হই।

১১ তম পর্ব

রমযান পৃথিবীর বুকে ইসলামী হুকুমাতের চিত্র নিয়ে আসে। ইসলামী শাসন ব্যবস্থায় প্রতিটি মুসলমানকেই কোনো কোনো বিষয়ে দায়িত্ববান হতে হয়। বিশেষ করে আপনার প্রতিবেশী যারা রয়েছেন তাদের ব্যাপারে আপনার কিন্তু বড়ো ধরনের দায়িত্ব রয়েছে। এই দায়িত্ব পালন করা আজকাল সামাজিক রূপ নিলেও এর ধর্মীয় গুরুত্ব অবশ্যই উপলব্ধি করতে হবে। প্রতিবেশীর অধিকার এবং তাঁদের ব্যাপারে আপনার আমার করণীয় সম্পর্কে আজকের আসরে আমরা কথা বলার চেষ্টা করবো। কারণ এইসব দায়িত্ব পালন না করার কারণে রমযানের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ব্যাহত না হয়ে পড়ে।

পবিত্র কোরআনের সূরা নিসায় বলা হয়েছে আর আল্লাহর ইবাদাত করো,তাঁর সাথে কাউকে শরিক করো না,পিতা-মাতার প্রতি সদয় আচরণ করো। নিকটাত্মীয়,এতিম-মিসকিন,নিকট সম্পর্কের প্রতিবেশী, দূরের প্রতিবেশী,পার্শ্ববর্তী সাথী,পথচারী এবং তোমাদের ডান হাত যাকে ধরে রেখেছে তাদের সাথেও সদয় আচরণ করো।কিন্তু প্রতিবেশীর সংজ্ঞা কী ? হাদিসে পাকে এসেছে চারপাশের চল্লিশটি ঘর প্রতিবেশী। সামনের ৪০ টি, পেছনের ৪০টি, ডানের ৪০টি এবং বামদিকের ৪০টি ঘর পর্যন্ত প্রতিবেশী হিসেবে পরিগণিত। রাসূলে খোদার এই বক্তব্যের অর্থ এই নয় যে,৪১তম বাসাটি প্রতিবেশিত্বের অন্তর্ভুক্ত নয়,কেননা দূরের প্রতিবেশীর কথাও কোরআনে বলা হয়েছে। রাসূলে খোদার বক্তব্যের মানে হলো কোনো একটি এলাকায় সাধারনত যাদেরকে প্রতিবেশীর অন্তর্ভুক্ত করা হয় তাদের সবাই প্রতিবেশী। যেমন কোনো একটি এলাকায় হয়তো নদী পড়েছে, কিংবা বড়ো একটা খাল পড়েছে। সেক্ষেত্রে খালের এপাড়ে যারা রয়েছেন তাদেরকে হয়তো স্থানীয় অধিবাসীরা নিজেদের প্রতিবেশী হিসেবে ধরেন। রাসূলে খোদার দৃষ্টিতে তারা তো প্রতিবেশীই এমনকি যারা দূরে রয়েছে অর্থাৎ খালের ওপারে রয়েছে তারাও দূরের প্রতিবেশী হিসেবে পরিগণিত। এখানে যেমন সীমারেখা টানা হয় নি তেমনি মুসলমান-অমুসলমানের মাঝেও বিভেদ রেখা টানা হয় নি। কেননা আপনার প্রতিবেশী হতেই পারে ভিন্ন ধর্মাবলম্বী। ফলে তাদের ব্যাপারেও আপনার দায়িত্ব রয়েছে। তাছাড়া এমন বহু শহর আছে যেখানে ৪০ টি ঘর চারদিকে গুণতে গেলে দেখবেন পুরো শহরটাই আপনার প্রতিবেশী। আল্লাহর রাসূল সামাজিক একটা সুসম্পর্কের লক্ষ্যেই আনুমানিক একটা বি¯তৃতির কথা বলেছেন,সেইসাথে আবার দূরের প্রতিবেশী বলে অন্য সবাইকেই শামিল করে মোটামুটি সকল মানুষের ব্যাপারেই আপনার একটা দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।

প্রতিবেশির এই সংজ্ঞা দেওয়ার পর রাসূলে খোদা (দঃ) বলেছেন, যারাই আল্লাহ এবং কিয়ামতের দিনের ওপর ঈমান এনেছে,তাদের উচিত হলো তার প্রতিবেশীদের ব্যাপারে সদয় হওয়া। তিনি আরো বলেছেন,যারাই নিজেদের প্রতিবেশীদেরকে জ্বালাতন করবে, আল্লাহ তাদের জন্যে বেহেশতের সুগন্ধিকে হারাম করে দেবেন এবং এ ধরনের ব্যক্তিদের স্থান হবে জাহান্নামের মতো বাজে জায়গা। আর যারা প্রতিবেশীর অধিকার নষ্ট করবে তারা আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়। রাসূল (সা) আরো বলেছেন, জিব্রাঈল (আ) প্রতিবেশীদের ব্যাপারে আমাকে এতো বেশি বেশি তাকিদ করেছেন যে, মনে করেছিলাম প্রতিবেশীকেও হয়তো ওয়ারিশ হিসেবে পরিগণিত করতে হতে পারে।


একদিন রাসূলে খোদা (সা) তাঁর সাহাবীদের জিজ্ঞেস করলেন, তোমরা কি জানো প্রতিবেশীর অধিকার কী ? উপস্থিত সবাই নেতিবাচক জবাব দিলো। তখন রাসূল (সা) বললেন-প্রতিবেশীর সর্বনিম্ন অধিকার হলো, প্রতিবেশী যদি ঋণ চায়, তাকে ঋণ দিতে হবে। যদি সাহায্য চায় সাহায্য করতে হবে। যদি কোনো জিনিসপত্র ধার চায় ধার দিতে হবে। যদি তাকে দান করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়, তাহলে তাদেরকে দান করতে হবে। প্রতিবেশী যদি দাওয়াত দেয়, দাওয়াত গ্রহণ করতে হবে। প্রতিবেশী অসুস্থ হলে তার সেবায় এগিয়ে যেতে হবে। কেউ মারা গেলে তার জানাযায় হাজির হতে হবে। প্রতিবেশীর সুসংবাদে অভিনন্দন জানাতে হবে আবার কোনো বিপদের সম্মুখীন হলে তার সমব্যথী হতে হবে।

একই হাদিসের ধারাবাহিকতায় তিনি আরো বলেন, নিজের বাড়িটাকে বেশি উঁচু অর্থাৎ বহুতল বিশিষ্টও করা ঠিক নয়,কেননা তাতে প্রতিবেশী আলো-বাতাস থেকে বঞ্চিত হতে পারে কিংবা বহির্দৃশ্য অবলোকনের পথে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। যদি ফল-পাকড়া কিনে বাসায় ফেরেন, তাহলে ঐ ফল-পাকড়া থেকে প্রতিবেশীদের দিতে হবে। তবে হ্যাঁ,যদি প্রতিবেশী জানতে না পারে যে আপনি ফল-ফলাদি কিনেছেন,তাহলে ভিন্ন কথা। কিন্তু সেক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে আপনার শিশু সন্তানটি যেন ঐ ফল হাতে নিয়ে বাইরে গিয়ে প্রতিবেশীর সন্তানকে না দেখিয়ে বেড়ায়। এমনটি হলে প্রতিবেশীর সন্তানটি তার অভিভাবককে ঐ ফল কিনে দিতে জ্বালাতন করবে। এভাবে প্রতিবেশীকে জ্বালাতন করার কোনো অধিকার কারো নেই। অপর একটি হাদীসে বলা হয়েছে-প্রতিবেশীকে শ্রদ্ধা-সম্মান করা মাকে সম্মান করার মতোই অবশ্য কর্তব্য।

ইসলাম কতো বেশি গুরুত্ব দিয়েছে প্রতিবেশীর ব্যাপারে তা নিশ্চয়ই খানিকটা হলেও আমরা উপলব্ধি করতে পারছি। আমাদের রোযা কোনো কাজেই আসবে না যদি প্রতিবেশীর অধিকারের ব্যাপারে সচেতন না হই। একটি হাদিসে আছে, রাসূলে খোদার কাছে এমন একজন মহিলার কথা বলা হলো,যে সবসময় রোযা রাখে কেবলমাত্র হারাম দিনগুলো ছাড়া এবং সারারাত জেগে নামায আর মুনাজাতে কাটায়,কিন্তু তার মুখের ভাষা দিয়ে প্রতিবেশীকে জ্বালাতন করে। রাসূল ( সা ) বললেন-তার এই রোযা,তার এই ইবাদাত কিংবা রাতজাগার কোনো মূল্য নেই,সে জাহান্নামের অধিবাসী।
অপর এক মহিলার বর্ণনা দেওয়া হলো, যিনি কেবল ফরয নামাযগুলো আর রমযান মাসের রোযাই রাখেন কিন্তু প্রতিবেশীকে জ্বালাতন করেন না। রাসূলে খোদা বললেন,হিয়া মিন আহলিল জান্নাহ অর্থাৎ তিনি বেহেশতের অধিবাসী। এই হাদিস থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। কেবল রোযা রাখলেই চলবে না,প্রতিবেশীর ব্যাপারেও লক্ষ্য রাখতে হবে। একটি হাদিসে এসেছে,যে ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে অভুক্ত রেখে ভরপেটে ঘুমালো,সে মুমিন নয়। ছোট্ট একটি হাদিস কিন্তু এর দাবি অনেক। আমার বাসার রান্নার ঘ্রাণে প্রতিবেশীদের ঘর পর্যন্ত মৌ মৌ করে,অথচ সেই প্রতিবেশী না খেয়ে ঘুমাচ্ছে,এটা ইসলামের দৃষ্টিতে অনৈতিক কাজ। আমরা তো আজকাল পাশের বাসায় কে আছে,তাদের কী হাল-অবস্থা,কী সমস্যা-ইত্যাদি কোনো খবরই রাখি না। এমতাবস্থায় আমাদের রোযা হাদিস অনুযায়ী কতোটা যথার্থ হবে-তা নিশ্চয়ই প্রশ্নসাপেক্ষ একটি বিষয়। অতএব পারস্পরিক খোজখবর নিয়ে,সহাবস্থান করে রমযানের রহমতের দ্বার উন্মুক্ত রাখবো-এই হোক আমাদের সক্রিয় প্রচেষ্টা।

১২ তম পর্ব

রমযান মাস সাম্য প্রতিষ্ঠার মাস,মানবিক বোধ সৃষ্টির মাস। ধনী-গরীব নির্বিশেষে সবাই এ মাসে রোযা রাখেন। জীবনে যাদের প্রতিটি দিনই কাটে রোযার মতো করে,তাদের কাছে এই রমযান হয়তো নতুন কোনো উপলব্ধির ব্যাপার নয়। কিন্তু যারা সম্পদশালী,তাদের অনেকেরই জীবনের দিনগুলো বিলাস-বৈভবে কাটে। তাই রমযান মাস এলে তাঁরা অভুক্ত থাকার কষ্ট উপলব্ধি করতে পারেন। আর যদি তিনি ঈমানদার হয়ে থাকেন তাহলে এই অভুক্ত থাকার যন্ত্রণা উপলব্ধি করার কারণে গরীবদের প্রতি তাঁর মমত্ববোধ অবশ্যই জেগে উঠবে সেইসাথে তাদের ব্যাপারে দায়িত্ববোধও জাগবে। রমযান এই দায়িত্বশীলতার শিক্ষা দিক সকল রোযাদারকে-এই প্রত্যাশায় শুরু করছি আজকের আলোচনা।

পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেনঃ সৎকর্ম শুধু এই নয় যে, পূর্ব কিংবা পশ্চিমদিকে মুখ করবে,বরং বড় সৎকাজ হলো এই যে,ঈমান আনবে আল্লাহর ওপর,কিয়ামত দিবসের ওপর,ফেরেশতাদের ওপর এবং সমস্ত নবী-রাসূলগণের ওপর। আর সম্পদ ব্যয় করবে তাঁরই মহব্বতে আত্মীয়-স্বজন,এতিম-মিসকিন,মুসাফির-ভিক্ষুক ও মুক্তিকামী ক্রীতদাসদের জন্যে।
পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠিকে দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর কষাঘাত থেকে উদ্ধার করার জন্যে কোরআনে এভাবে সরাসরি অসংখ্য আয়াত নাযিল করা হয়েছে। এইসব আয়াত মানব সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ,যারা সম্পদশালী,এই রমযানে তাঁদের উচিত আয়াতগুলোর দাবী বাস্তবায়নে এগিয়ে আসা।

মনে রাখতে হবে,যাকাতের বিধানের বাইরেও নিঃস্বদের ওপর আপনার যে সাহায্য সহায়তা করার একটা দায়িত্ব রয়েছে,আল-কোরআন সে সম্পর্কেই আপনার দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। বলা হয়েছেঃ নিজেদের প্রয়োজনীয় ব্যয়ের পর যা বাঁচে তাই খরচ করবে। এভাবেই আল্লাহ তোমাদের জণ্যে নির্দেশ সুস্পষ্টরূপে বর্ণনা করেন,যাতে তোমরা চিন্তা করতে পার। আরো বলা হয়েছে ‘যারা স্বীয় ধন-সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করে,এরপর সে অনুগ্রহের কথা প্রকাশ করে না এবং কষ্টও দেয় না,তাদেরই জণ্যে তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে পুরস্কার এবং তাদের কোনো আশংকা নেই,তারা চিন্তিতও হবে না'।

এই দুটি আয়াতে আমাদের জন্যে সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। প্রথম নির্দেশনাটি হলো নিজের প্রয়োজনীয় ব্যয়ের পর যা বাঁচে,তা-ই খরচ করতে হবে অসহায়দের জন্যে। ফলে আমরা যাকে দান-খয়রাত বলে অভিহিত করে থাকি,সেটা আসলে দান বা অনুগ্রহ নয়,বরং আমাদের ওপর আল্লাহ প্রদত্ত এক মহান দায়িত্ব। আমরা এই দায়িত্ব পালনকে যেন অবশ্য করণীয় বলে মনে করি,কোনোভাবেই যেন তাকে দয়া-দাক্ষিণ্য বলে নিজেকে উদার দাতা হিসেবে প্রকাশের সুযোগ গ্রহণ না করি। দুঃখের বিষয়টি হলো,আল্লাহ যেখানে রমযানে আমাদেরকে গরীব-দঃখিদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার শিক্ষা দিচ্ছেন, সেখানে কিছু কিছু অসৎ ব্যবসায়ী ঠিক বিপরীত কাজটাই করছে। খাদ্য-পণ্যের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে কিংবা খাদ্যে ভেজাল দিয়ে রমযান মাসকে ব্যবসায়িক সাফল্য লাভের মোক্ষম সময় ধরে নিয়ে কোরআন বিরোধী র্কাকলাপ করছে। আল্লাহ তাদের প্রকৃত হিদায়েত দান করুন।

কোরআনের উল্লেখিত আয়াতে দ্বিতীয় যে নির্দেশনাটি দেওয়া হয়েছে তা হলো, কারো প্রতি সাহায্য সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়ে তা প্রচার করে বেড়ানো যাবে না। কিংবা খোঁটা মারা বলতে যা বোঝায়,তা করা যাবে না। ‘মনে রেখো এক ফোঁটা দিলেম শিশির'-এই ধরনের মানসিকতা পোষণ করা যাবে না। হাদীসে পাকে উল্লেখ করা হয়েছে, দান করতে হবে এমনভাবে,যাতে ডান হাতে কাউকে কিছু দিলে বামহাত টের না পায়। এর কারণ হলো সমাজে এমন বহু মানুষ আছেন, যাঁরা তাঁদের দারিদ্র্যের কথা,অভাব-অনটনের কথা অন্যকে বলতে লজ্জাবোধ করেন। অথচ জীবন চলার মাঝপথে এসে এমনভাবে আটকে রয়েছেন যে,ভদ্রতার খাতিরে,আভিজাত্যের খাতিরে কিংবা রাসূলে খোদার প্রতি ভালোবাসার খাতিরে তা প্রকাশ করেন না। এই ধরনের লোকদের প্রতি আমাদের পরম দায়িত্ব রয়েছে। তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে,এবং তা কোনোভাবেই প্রকাশ করা যাবে না।

অন্যদের ব্যাপারে ইসলাম আমাদের ওপর যে দায়িত্ব দিয়েছে, তাতে সমাজে কোনো গরীব লোক থাকার কথা নয়। সমাজে বিরাজমান দারিদ্র্যের কারণ তাই সম্পদশালীদের দায়িত্বে অবহেলা। সমাজে আমরা বহু মানুষকে ভিক্ষা করতে দেখি। তাদের প্রতি একধরনের ঘৃণাও বোধ করি আমরা। অথচ এই ঘৃণাটি আরোপিত হওয়া উচিত সমাজের বিত্তবানদের ওপর। ইসলাম বিত্তবানদের ওপর যে দায়িত্ব দিয়েছে,তা যদি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হতো,তাহলে সমাজে ভিক্ষুক খুঁজে পাওয়া যেত না। ভিক্ষাবৃত্তি ইসলামে খুবই ঘৃণিত একটি কাজ। ভিক্ষাবৃত্তি মানবতার অবমাননামূলক একটি কাজ। তাই বিত্তবানদের উচিত নিজের দান-খয়রাতের কাহিনী প্রচারের ব্যবস্থা না করে গরীবদের প্রতি যথার্থ দৃষ্টি দেওয়া। তাদেরকে একবেলা খাওয়ার ব্যবস্থা না করে স্থায়ীভাবে পুনর্বাসনের কর্মসূচি গ্রহণ করা। রমযান মাস হলো এই কর্মসূচি গ্রহণ করার জন্যে সবচে উপযুক্ত সময়।

আল্লাহ তাদেরকে নিজের অনুগ্রহে যা দান করেছেন তাতে যারা কৃপণতা করে এই কার্পণ্য তাদের জন্যে মঙ্গলকর হবে বলে তারা যেন ধারণা না করে। বরং এটা তাদের পক্ষে একান্তই ক্ষতিকর প্রতিপন্ন হবে। যাতে তারা কার্পণ্য করে সে সমস্ত ধন-সম্পদকে কিয়ামতের দিন তাদের গলায় বেড়ি বানিয়ে পরানো হবে। আর আল্লাহ হচ্ছেন আসমান যমিনের পরম সত্ত্বাধিকারী। আর যা কিছু তোমরা কর; আল্লাহ সে সম্পর্কে জানেন।
এ আয়াতের শিক্ষা অনুযায়ী ধন সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ। কেননা আল্লাহই এই ধন-সম্পদ দান করেছেন। তাই তাঁর দেওয়া সম্পদ তাঁর রাস্তায় অর্থাৎ তাঁরই প্রদর্শিত বা নির্দেশিত পন্থায় ব্যয় করার ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র কার্পণ্য করা যাবে না। দেরিও করা যাবে না। কেননা আল্লাহ বলেছেন মৃত্যুর আগেভাগেই ব্যয় করতে হবে। মৃত্যু এসে গেলে আর সুযোগ থাকবে না।

আল্লাহ বলেছেন, আমি তোমাদেরকে যা দিয়েছি তা থেকে মৃত্যু আসার আগেই ব্যয় কর। অন্যথায় সে বলবে, হে আমার পালনকর্তা! আমাকে আরো কিছুকাল অবকাশ দিলে না কেন ? তাহলে আমি সদকা করতাম এবং সৎকর্মীদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের সবাইকে যথাসময়ে যথার্থ কাজ করার তৌফিক দিন।

১৩ তম পর্ব

রমযান মাসটা আসলে কেমন যেন উৎসবমুখর একটা মাস। যাদের ঘরে ছোট ছোট শিশু আছে,তারা সবসময় একবুক বিশ্বাস আর প্রত্যাশা নিয়ে অপেক্ষা করে কখন বাবা আসবে,ইফতারি নিয়ে আসবে,তার জন্যে নিয়ে আসবে কত্তোকিছু। বাবা আসার খবর পেয়ে শিশুটি সবার আগে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে কোলে ওঠার জন্যে ছোট্ট দুটি নিষ্পাপ হাত বাড়িয়ে দেয় ওপরের দিকে। বাবা বাধ্য হয়ে হাতের বোঝা নীচে রেখে কোলে তুলে নেয় শিশুকে। শিশুটি সৌজন্যবোধের মাথা খেয়ে প্রথমেই জিজ্ঞেস করে আমার জন্যে কী এনেছো ? কত চাওয়া, কতশত প্রত্যাশা বাবার কাছে। কিন্তু একবার একটু ভাবুন তো, একই বয়সের যেসব শিশু যাদের এ রকম চাওয়ার বা প্রত্যাশা করে অপেক্ষায় থাকার সুযোগ নেই,তাদের মুখগুলো কী রকম! কতোটা ম্লান! কতোটা অসহায়ত্বপূর্ণ। আমরা পিতৃহীন ইয়াতিম শিশুদের কথা বলছি। কিন্তু যাদের বাবাও নেই,মা-ও নেই তাদের অবস্থা যে আরো কতো করুণতম ভাবতেও কান্না পায়। তাদের কথা আমাদের কতোটা মনে পড়ে ? তাদের স্মরণে আমরা আজ কথা বলার চেষ্টা করবো।

ইয়াতিমদের প্রতি প্রতিটি মানুষের নৈতিক এবং ধর্মীয় দায়িত্ব রয়েছে। পবিত্র কোরআনে ইঙ্গিত করা হয়েছে ইয়াতিমদের ব্যাপারে মনোযোগ -হীনতা বা দায়িত্ববোধহীনতা কুফুরি বা মোনাফেকির পর্যায়ভুক্ত। যেমনটি কোরআনের সূরা মাউনে বলা হয়েছে-আপনি কি তাকে দেখেছেন যে কিয়ামত দিবসকে মিথ্যা বলে মনে করে ? সে তো সেই ব্যক্তি যে কিনা ইয়াতিমকে ধাক্কা দিয়ে তাড়িয়ে দেয় এবং গরীব-মিসকিনদের খাওয়ানোর ব্যাপারে উৎসাহিত করে না।
এখানে বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে মুমিনব্যক্তি কখনো বিচার দিবসকে অস্বীকার করতে পারে না। তার মানে যারা ইয়াতিমকে গলা ধাক্কা দিয়ে নিজের কাছ থেকে সরিয়ে দেয় তারাই কিয়ামত দিবস অস্বীকারকারী অর্থাৎ কাফিরদের অন্তর্ভুক্ত।

কী সাংঘাতিক কথা! ইবাদাত যথার্থ হবার একটা শর্তই যেন ইয়াতিমকে সম্মান দেখানো। পবিত্র কোরআনে অবশ্য সরাসরি বলাও হয়েছে কাল্লা বাল লা..তুকরিমুনাল ইয়াতিম অলা তাহাদ্দু..না আলা ত্বআমিল মিসকীন..অর্থাৎ তোমরা তো আসলে ইয়াতিমদেরকে সম্মান করো না এবং নিঃস্বদেরকে খাবার দিতে পরস্পরকে উৎসাহিত করো না। তার মানে অনেক সময় লোক দেখানোর জন্যে কাঙ্গালী ভোজ দেওয়া হলেও প্রকৃতপক্ষে ইয়াতিমদের সম্মানে তা করা হয় না। কেননা ইয়াতিমকে সম্মান করতে হবে ভালোবাসতে হবে নিজের সন্তানের মতো। একটি হাদিসে বলা হয়েছে আল্লাহর কাছে সবচে প্রিয় বাড়ি সেটি,যেখানে ইয়াতিমরা সম্মানিত হিসেবে পরিগণিত।

একটি ইয়াতিম শিশুর সবচে বেশি প্রয়োজন ভালোবাসা-স্নেহ-আদর। কারণ বাবা-মা'কে হারানোর ফলে সে হারিয়েছে বাবার ভালোবাসা,মায়ের আদর। একটি শিশুকে যখন তার বাবা খেলার মাঠে নিয়ে যায়,কিংবা নিয়ে যায় শিশু পার্কে,তখন ইয়াতিম শিশুটির মন কাঁদে। তারও তো ইচ্ছে করে খেলে বেড়াতে,ঘুরে বেড়াতে। তাই আপনার শিশুটিকে যেভাবে আদর-যত্ন করছেন, ইয়াতিম শিশুটির প্রতিও সেভাবে খেয়াল রাখার চেষ্টা করুন। লোক দেখানোর জন্যে একবেলা খাইয়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি ঘর থেকে বের করে দিয়ে ভাববেন না যে আপনি আপনার দায়িত্ব পালন করে ফেলেছেন। রমযান মাস বরকতের মাস। এ মাসে যতো বেশি আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করবেন অন্য সময়ের তুলনায় অনেক বেশি গুণ সওয়াব পাবেন।

আল্লাহর পছন্দের ঘর হলো সেই ঘর যে ঘরে ইয়াতিম সুখে শান্তিতে বাস করে। আর সর্বনিকৃষ্ট ঘর হলো সেই ঘর যে ঘরে ইয়াতিম তার মর্যাদা পায় না। আজকাল অবশ্য ইয়াতিমখানা গড়ে উঠেছে। সেখানে একবার গিয়ে দেখে আসুন কীভাবে আছে নিরীহ অসহায় শিশুরা। কীভাবে কাটাচ্ছে তারা,কী খাচ্ছে। আপনি যেমন সেহরি করার জন্যে সুন্দর সুন্দর খাবারের আয়োজন করেন তাদেরও তেমন ভালো খাবার খেতে মন চায় তা উপলব্ধি করার চেষ্টা করুন। ইফতারির বেলায়ও একই কথা প্রযোজ্য। তাদের কথা মনে রাখুন। ইফতারির একটা অংশ তাদের জন্যে বরাদ্ধ করুন। কোরআনে বলা হয়েছে ইয়াতিম মিসকিনদের খাওয়ানো-পরানোর ব্যাপারে উৎসাহিত করতে। তাই আপনার বন্ধু-বান্ধব,পাড়া-প্রতিবেশী,আত্মীয়-স্বজনদেরকেও ইয়াতিম- দের ব্যাপারে উৎসাহিত করুন। কোনো একটি এলাকায় যতো ইয়াতিম আছে,তারচেয়ে স্বচ্ছল মানুষ অনেক বেশি আছে। ফলে সামষ্টিকভাবে যদি এই দায়িত্বটি পালন করা যায় তাহলে তাদের অবস্থার পরিবর্তন না হয়ে পারে না।

বলা বাহুল্য, আজকাল ইয়াতিমের হক,ইয়াতিমের জন্যে বিচিত্র সাহায্য পর্যন্ত মেরে খেতে দেখা যায়। বিশ্বের বহু দাতা সংস্থা আছে যারা ইয়াতিমদের পুনর্বাসনের জন্যে বিভিন্ন দেশে সাহায্য পাঠিয়ে থাকে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সেইসব সাহায্যের তেমন কিছুই অসহায় শিশুর ভাগ্যে জোটে না। অথচ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কঠোর ভাষায় বলেছেন, যারা ইয়াতিমদের অর্থ-সম্পদ অন্যায়ভাবে খায়,তারা নিজেদের পেটে আগুনই ভর্তি করেছে এবং শীঘ্রই তারা আগুনে প্রবেশ করবে। আয়াতটিতে অর্থের পাশাপাশি সম্পদের কথাও বলা হয়েছে। ফলে ইয়াতিমদের সম্পদের ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে। কোরআনে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে-ইয়াতিমদেরকে তাদের সম্পদ বুঝিয়ে দাও।...তাদের সম্পদ নিজেদের সম্পদের সাথে সংমিশ্রিত করে গ্রাস করো না। নিশ্চয়ই এটা বড়ো মন্দ কাজ। তাই ইয়াতিমের সম্পদ ভোগ করে যতোই রোযা রাখা হোক না কেন তাতে কোনো লাভ নেই। ইয়াতিমকে অধিকার বঞ্চিত করে বরকত লাভের আশাটাই বৃথা। বরং আমাদের উচিত ইয়াতিমদের দায়িত্ব গ্রহণ করা। রাসূলে খোদা ( সা ) বলেছেন, যে ব্যক্তি ইয়াতিমের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করে,তার ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করে,আমি এবং সেই ব্যক্তি বেহেশতে পরস্পরের নকটবর্তী থাকবো। তারপর হাতের তর্জনি এবং মধ্যমা আঙ্গুল দুটিকে পাশাপাশি স্থাপন করে দেখিয়ে বলেন-ঠিক এরকম যেমন আঙ্গুল দুটি পাশাপাশি রয়েছে।
ইমাম সাদেক ( আ ) থেকে বর্ণিত অপর একটি হাদিসে বলা হয়েছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর রহমতের অন্তর্ভুক্ত হতে চায় এবং বেহেশতে প্রবেশ করতে চায়....তার উচিত ইয়াতিমদের ব্যাপারে সহানুভূতিশীল এবং সদয় হওয়া। আল্লাহ আমাদেরকে কোরআন-হাদিস অনুযায়ী আমল করার তৌফিক দিন।

১৪ তম পর্ব

মানুষ সামাজিক জীব। একাকী মানুষ জীবন যাপন করতে পারে না। তাই মানুষ পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল। ইসলামও তাই তার সকল বিধিবিধানই একাকী নয় বরং সামষ্টিকভাবে পালন করার কথা বলেছে। সেইসাথে সবাই ইসলামের অনুশাসন ঠিকঠাকমতো পালন করছে কী না তা-ও দেখভাল করার একটা পারস্পরিক দায়িত্ব দিয়েছে ইসলাম। এ বিষয়গুলো নিয়ে আমরা আজকের আসরে কথা বলার চেষ্টা করবো।

সৎ কাজের আদেশ দেওয়া এবং অসৎ কাজ বা অন্যায় কাজ করতে বারণ করা প্রতিটি মুসলমানের ঈমানী দায়িত্ব। সৎ কাজ হলো পবিত্র কোরআনে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর বান্দাদেরকে যেসব কাজ করার আদেশ দিয়েছেন,সেগুলো। আর আল্লাহ যেসব করতে নিষেধ করেছেন সেসব কাজই হলো অসৎ কাজ। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে যারা এই দুটি কাজ যথাযথভাবে করবে অর্থাৎ সৎ কাজ করার জন্যে অন্যকে বলবে এবং অন্যায় কাজ করা থেকে অন্যকে বিরত রাখবে-তারাই মুফলিহুন অর্থাৎ সফলকাম হলো।
এখন কথা হলো আপনি দেখছেন যে রোযার দিনে এক লোক রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে,তার মুখ থেকে বেরুচ্ছে ধোঁয়ার কুণ্ডলি,কিন্তু আপনি তাকে চেনেন না। এমতাবস্থায় আপনি যদি ধমকের সুরে তাকে গিয়ে বলেন-এই মিয়া রোযার দিনে সিগ্রেট টানছো,তোমার কি লজ্জা-শরম বলতে কিছু নেই? এভাবে ধমকের সুরে কথা বললে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। কোনো নির্বোধ ছাড়া যে এ কাজ করতে পারে না,তা প্রথমেই বোঝা উচিত ছিল। তাই তাকে যদি আপনার হেদায়াত করার ইচ্ছে থাকে তাহলে আপনার উচিত তাকে অত্যন্ত নম্র সুরে ডেকে জিজ্ঞেস করা-তুমি কে ভাই, তোমাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না। আপনার এই বিনীত কণ্ঠস্বর তাকেও বিনম্র করে তুলবে। সেই বিনম্র সুরের মাঝে আপনি সহাস্য ভঙ্গিতে বলতে পারেন,ভাই! কিছু মনে করো না,তুমি যদি মুসলমানই হয়ে থাকো,তাহলে কি কাজটা ঠিক হলো! ছেলেটি হয়তো জবাব না দিয়েই চলে যাবে।

অসৎ কাজের ব্যাপারে বারণ করার দায়িত্বটা পালিত হলেও এটা কিন্তু যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কারণ লোকটা ছিল অচেনা। অচেনা লোক আপনাকে ভালোভাবে গ্রহণ না-ও করতে পারতো। সেজন্যে উচিত হলো চেনা বলয়ের মাঝে এই দায়িত্বটি পালনের চেষ্টা করা। আর এ কাজ করতে গেলে নিজস্ব সততার বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। নিজে যদি কোনো অন্যায় কাজ করেন বলে সমাজের লোকজন জানে,তাহলে আপনার উপদেশ লোকজন কেন শুনবে। তাই আপনাকে আগে সৎ হতে হবে। তারপর কোরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী ভদ্র ভাষায় এবং সুকৌশলে কাজটি করতে হবে। কোরআনের নির্দেশনা হলো-উদ্উ ইলা সাবিলি রাব্বিকা বিল হিকমাতি ওয়াল মাওইজাতিল হাসানাহ অর্থাৎ আপনি মানুষকে প্রতিপালকের পথে ডাকুন কৌশল ও মিষ্টি বাচনভঙ্গি বা সদুপদেশের মাধ্যমে।

সূরা আল-ইমরানে রাসূলে খোদার উদ্দেশ্যে আল্লাহ বলেছেন-অলাও কুনতা ফাজ্জা গালিজাল কালবি লাংফাদ্দু মিন হাওলিকা-অর্থাৎ আপনি যদি কঠোর হৃদয় হতেন বা রূঢ় হতেন তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে দূরে সরে যেত। এটা যে কতো বাস্তব,একটি উদাহরণ দিয়ে বলা যাক। ধরা যাক আপনি বাজারে গেছেন কেনা কাটা করতে। সেখানে এক দোকানদারকে পেলেন যার বয়স আপনার বয়সের দ্বিগুণ। আপনি রোযাদার। কিন্তু বিক্রেতার মুখে সস্তা মূল্যের দুর্গন্ধময় বিড়ি। এ অবস্থায় আপনি যদি তার সাথে রুক্ষ আচরণ করেন,তাহলে আপনার উপদেশ তার মনে খুব বেশি প্রভাব ফেলতে পারবে না।

এটা না করে আপনি কোরআনের ভাষ্য অনুযায়ী কৌশল অবলম্বন করতে পারেন। যেমন প্রথমেই আপনি শ্রদ্ধা-সম্মান দেখিয়ে তার বাড়ি-ঘর,ছেলে-পুলে আয়-ব্যয়ের খোঁজখবর নিতে পারতেন। তাঁর সমব্যথী হওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। স্বাস্থ্যের খোঁজখবর নেয়ার ফাঁকে বলতে পারেন রোযা রাখতে নিশ্চয়ই কষ্ট হয়! আপনি তখন আপনার নিজের কোনো মুরব্বির প্রসঙ্গ টেনে বলতে পারেন,তিনিও আপনারই বয়সী। আগে আপনার মতোই শারীরিক সমস্যা ছিল। পরে ডাক্তারের পরামর্শে বা কোনো বড়ো আলেমের পরামর্শে রোযা রাখতে শুরু করেন। প্রথম প্রথম একটু কষ্ট হয়েছে,এখন আল্লাহর রহমতে ভালোই আছেন,রোযাও রাখতে পারছেন। আসলে জীবন ক'দিনের। হায়াত-মওতের তো ঠিক নাই। তাই যদ্দুর সম্ভব আল্লাহর সামনে দাঁড়াবার জন্যে আমাদের প্রস্তুত হওয়া উচিত,কী বলেন! এই চিত্রটি হলো কৌশল এবং সৎ কাজের দিকে আহ্বানের সঠিক পন্থা। আসলে হাসি-আনন্দ বা বিনয়-নম্রতার মাধ্যমে যদি কোনো কাজ হয় তাহলে সেখানে রূঢ় বা কঠোরতার কী প্রয়োজন? যেমনটি কবি বলেছেন-

چو كاري بر آيد به لطف و خوشي
چه حاجت به كبر است و گردنكشي
অর্থাৎ কোনো একটি কাজ যদি বিনয়ের মাধ্যমে হয়ে যায়,তাহলে সেখানে অহংকার দেখানোর প্রয়োজনটা কি? এ টা যেন কোরআনেরই সেই নির্দেশনার কাব্যিক অভিব্যক্তি। আমাদের সমাজে বহু লোককেই ঘুষ খেতে দেখা যায়,সুদ নিতে দেখা যায়। অফিস-আদালতে এগুলো রীতিমতো একটা সাংস্কৃতিক রূপ নিয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এসব কাজ যেন অন্যায়ই নয়। এর বাইরেও বহুরকম অন্যায় কাজ আমাদের সমাজে প্রচলিত। তাই সুন্দরভাবে সেসব কাজের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা প্রতিটি মুসলমানের দায়িত্ব।

সেইসাথে ভালো কাজের জন্যে উদ্বুদ্ধও করতে হবে। যেমন স্কুলের টিফিন ব্রেকের ফাঁকে যেসব ছাত্রছাত্রী নামায পড়ে,তাদেরকে ভালো বলে অন্যদের সামনে তুলে ধরে অন্যান্য ছাত্রকে উৎসাহিত করা যেতে পারে। বুড়ো এক ভিক্ষুক হয়তো রোযার কষ্টে পথ পার হবার সময় পড়ে গেছে। আর এক ছাত্র দ্রুত বুড়োকে তুলে নিয়ে রাস্তা পার করে দিলো। সম্ভব হলে পকেটে ক'টা টাকা ভরে দিয়ে বললো বাসায় চলে যান। আজ আর বাইরে ঘোরার দরকার নেই। ছাত্রটির এই ভালো গুণটি প্রচারের মাধ্যমে কিন্তু অপরাপর ছাত্রকে ভালো কাজে উৎসাহিত করা হলো। একটা কথা মনে রাখতে হবে যারা সৎ কাজের আদেশ দেবেন তাঁরা অবশ্যই অপরের দোষ-ত্রুটিগুলো গোপন রাখবেন। কোনাভাবেই অন্যদের সামনে কারো দোষের কথা প্রচার করা যাবে না। তবে নিরিবিলি কোনো সময়ে সুযোগমতো তাকে তার দোষগুলোর ব্যাপারে সচেতন করে দিয়ে শুধরানোর পরামর্শ দেওয়া যেতে পারে। দোষের কথা বলে বেড়ালে আপনার কোনো কথাই সে আর শুনবে না। #

১৫ তম পর্ব

বান্দার প্রতি খোদার আমন্ত্রণ বা জিয়াফতের এই মাসে রহমত বরকত এবং মাগফেরাতের সদর দরজা উন্মোচিত করে দেয়া হয়, এ মাসে দোজখের দ্বার রুদ্ধ হয়ে যায় আর বেহেশতের সিংহ দ্বার খুলে রাখা হয়। আমাদের মত পাপী গুনাহগার বান্দাদের প্রার্থণা আল্লাহর দরবারে কবুল করার সুযোগ সৃষ্টি করে এই মাস। আমাদের আত্মাকে শক্তিশালী করার মহা উপলক্ষ তৈরি হয় এ মাসে। রিপুর উপর আত্মাকে জয়ী করার অনবদ্য সুযোগ সৃষ্টি করে এই মাস। খোদায়ী অনুশাসন মেনে সঠিক ভাবে জীবনাচার করা গেলে এ মাস আমাদেরকে জুটিয়ে দিতে পারবে আখেরাতের পাথেয়। সৎ কাজের প্রতি উৎসাহিত করা এবং অসৎ বা মন্দ কাজের প্রতি নিরুৎসাহিত করা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। গত আসরে আমরা এ বিষয়ে কথা বলেছি। বিষয়টির গুরুত্বের কারণে আজকের আসরেও এ বিষয়ে আলোচনা করবো। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সুরা আল ইমরানের ১০৪ আয়াতে বলেছেন, " তোমাদের মধ্যে এমন একটা দল থাকা উচিত যারা আহবান জানাবে সৎকর্মের প্রতি, নির্দেশ দেবে ভাল কাজের এবং বারণ করবে অন্যায় কাজ থেকে, আর তারাই হলো সফলকাম। "
একই সুরার ১১০ আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন, "তোমরাই হলে সর্বোত্তম উম্মত, মানবজাতির কল্যাণের জন্যেই তোমাদের উদ্ভব ঘটানো হয়েছে। তোমরা সৎকাজের নির্দেশ দান করবে ও অন্যায় কাজে বাধা দেবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। আর আহলে-কিতাবরা যদি ঈমান আনতো, তাহলে তা তাদের জন্য মঙ্গলকর হতো। তাদের মধ্যে কিছু তো রয়েছে ঈমানদার আর অধিকাংশই হলো পাপাচারী।" অন্যদিকে সুরা আত তাওবাহর ৭১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন, " ঈমানদার পুরুষ ও ঈমানদার নারী একে অপরের সহায়ক। তারা ভাল কথার শিক্ষা দেয় এবং মন্দ থেকে বিরত রাখে। নামায প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ অনুযায়ী জীবন যাপন করে। এদেরই উপর আল্লাহ্ তা'আলা দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ পরাক্রমশীল, সুকৌশলী।"
একইভাবে মহাগ্রস্থ কোরআনের সুরা লোকমানের ১৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তার বান্দাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন "হে বৎস, নামায কায়েম কর, সৎকাজে আদেশ দাও, মন্দকাজে নিষেধ কর এবং বিপদাপদে ধৈর্য্য ধারণ কর। নিশ্চয় এটা সাহসিকতার কাজ।"

বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ (সা আ) বলেছেন, পৃথিবী হলো একটি জাহাজের ন্যায় আর মানুষ হলো তার যাত্রী। প্রতিটি যাত্রীর সৎ কর্মের উপর এই জাহাজের সমগ্র যাত্রীর কল্যাণ নির্ভর করছে। কাজেই কাউকে যদি এ জাহাজে ছিদ্র করতে দেখা যায় তবে তাকে অবশ্যই সে কাজ থেকে বিরত রাখতে হবে। কোরআনের এসব পবিত্র এবং অবশ্য পালনীয় আয়াত এবং হাদিস থেকে একটি কথা আজ সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে ইসলামের অনুশাসনের বিরুদ্ধাচারণ যে বা যারা করবেন তাদের প্রতিহত করার উপর সমগ্র মানব জাতির কল্যাণ নিহিত রয়েছে। সমগ্র মানব জাতির এ কল্যাণ প্রচেষ্টায় আমাদের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। কারো পক্ষেই এ কাজে অমনোযোগ হওয়া উচিত হবে না। মুসলমানদের ধর্মীয় এবং সামাজিক দায়িত্বের সাথে বিষয়টি জড়িত। এ কাজে অবহেলা মানে সমগ্র সমাজকে দূষণের পথ খুলে দেয়া বা এ ধরণের কাজে সহায়তা প্রদান করা। এ কারণেই অনিবার্য ভাবে সবাইকে আমর বিল মারুফ ওয়া আনিল নেহী মুনকার বা সৎকাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নির্দেশের পথ বেছে নিতেই হবে।

ইমাম মুহাম্মদ বাকের এ প্রসঙ্গে বলেছেন, আমর বিল মারুফ ওয়া নেহী আনিল মুনকার হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুশাসন। কারণ অন্যান্য অনুশাসন পালনের ব্যাপারটি সঠিক ভাবে এই অনুশাসন পালনের উপর নির্ভর করছে। যদি এই অনুশাসন যথাযথভাবে পালন করা হয় তা হলে এ বিশ্ব নিরাপদ আবাস হয়ে উঠবে, শত্রুরা অবদমিত থাকবে এবং অন্যান্য কাজ সন্তোষের সাথে সম্পন্ন করা সম্ভবপর হয়ে উঠবে। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেন, যিনি আমর বিল মারুফ এবং নাহী আনিল মুনকার অর্থাৎ সৎকাজের আদেশ এবং মন্দ কাজে নিষেধ করার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন তিনি পৃথিবীতে আল্লাহ, আল্লাহর নবী এবং তার মহাগ্রন্থের প্রতিনিধিত্ব করবেন।

কারবালার পথে রওনা হওয়ার আগে ইমাম হোসেইন (আ) মদীনাবাসীদের নিয়ে যে হতাশা ব্যক্ত করেছিলেন সেখানে তিনি আমর বিল মারুফ এবং নাহি আনিল মুনকার পালন না করার কথা বলেছিলেন। বেহেশতের সুসংবাদ প্রাপ্ত যুবক হওয়া সত্ত্বেও তিনি কেন ইয়াজিদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিলেন তারও কারণ আমরা ইমাম হোসেইনের ঐ বক্তব্য থেকে সহজেই বুঝতে পারি । ইমাম হোসেইনের মত ব্যক্তিত্ব যেখানে এভাবে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়তে পিছপা হননি সেখানে আমাদেরকে একই পথ অনুসরণ করা ছাড়া আর কিইবা করার থাকতে পারে। সমাজে ও ব্যক্তিগত জীবনে আমরা নিজ নিজ পরিধির মধ্যে থেকে নিজেরা সৎকাজ করব, সৎকাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করব এবং অসৎ কাজের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করব। অসৎকাজে যিনি লিপ্ত হয়েছেন তাকে দোজখের ওই পথ থেকে সরে আসার আহবান জানাবো। তবে এই পথ অনুসরণ করতে যেয়ে আমরা যেনো সমাজে ফেতনা ও বিশৃংখলার কারণ না হয়ে দাঁড়াই সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।

আমর বিল মারুফ এবং নহী আনিল মুনকারের পথ অবলম্বন করতে যেয়ে আমরা কাউকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে আঘাত হানবো না। এই ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে আমাদের একান্তভাবে মনে রাখতে হবে যে, আল্লাহতায়ালা তার বান্দাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা বজায় রাখার উপর গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি সুরা আল হুজরাতের ১২ নম্বর আয়াতে বলেছেন, "মুমিনগণ! তোমরা সন্দেহ এড়িয়ে চল। নিশ্চয়ই কিছু ক্ষেত্রে সন্দেহ করা গোনাহ এবং গোপনীয় বিষয় সন্ধান করো না। তোমাদের কেউ যেন কারও পশ্চাতে নিন্দা না করে। তোমাদের কেউ কি তারা মৃত ভ্রাতার মাংস খাওয়া পছন্দ করবে? বস্তুতঃ তোমরা তো একে ঘৃণাই কর। আল্লাহকে ভয় কর। নিশ্চয় আল্লাহ্ তওবা কবুলকারী, পরম দয়ালু।"
তাহলে আমরা কিভাবে আমর বিল মারুফ এবং নাহী আনিল মুনকারের পথ ধরে এগোবো। হ্যা এ ক্ষেত্রে যাকে আমরা সৎকাজের দিকে আহবান জানাবো তার সাথে সরাসরি কথা বলব। তাকে নরম গলায়, ভদ্রতা এবং শিষ্টাচার রক্ষা করে আলোচনার মাধ্যমে সৎ কাজের প্রতি আহবান জানাবো। তবে আলোচনার মাধ্যমে কোনো সুফল পাওয়া না গেলে এবার ধীরে ধীরে তাকে সামাজিকভাবে এড়িয়ে চলতে হবে। তার সাথে কোনো বন্ধুত্ব থাকলে তা হ্রাস করতে হবে, তার সঙ্গ যতোটা সম্ভব এড়িয়ে যেতে হবে। এরপর তার বিষয়টি নিয়ে ধর্মীয় নেতাদের দৃষ্টি আকষর্ণ করতে হবে।

পাঠক! এতক্ষণের আলোচনা থেকে এ কথা সবাই উপলব্দি করতে পেরেছেন যে, আমর বিল মারূফ এবং নাহী আনিল মুনকার ইসলামের একটি অত্যবশ্যকীয় দায়িত্ব। একে কোনভাবেই খাটো করে দেখার কোন উপায় নেই বা পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোন অবকাশ নেই। এটি হচ্ছে একটি মৌলিক স্তম্ভ এবং এ ধর্মের অনন্য বৈশিষ্ট্য, সমাজ সংস্কার ও সংশোধনের বিশাল মাধ্যম। এই পথ অনুসরণের মাধ্যমে সত্যের জয় হয় এবং মিথ্যা ও বাতিল পরাভূত হয়। এই পথ পরিক্রমার মাধ্যমে শান্তি ও সমৃদ্ধির বিস্তার ঘটে। কল্যাণ ও ঈমান বিস্তৃতি লাভ করে। যিনি আন্তরিকতা ও সততার সাথে এ দায়িত্ব পালন করেন তার জন্য রয়েছে মহা পুরস্কার ও মর্যাদাপূর্ণ পারিতোষিক। #

১৬তম পর্ব

আমরা সাধারণত ফকির-মিসকিনদের বাড়িয়ে দেওয়া হাতকে খালি ফেরত দিতে চাই না। এটা উচিতও নয়। তবে খেয়াল রাখতে হবে ভিক্ষাবৃত্তি আবার কারো পেশা হয়ে না দাঁড়ায়। প্রকৃতই যারা কর্মতৎপর,কিন্তু স্বচ্ছল নয়। অভাব-অনটন লেগেই থাকে সংসারে অর্থাৎ নুন আনতে পানতা ফুরায় মতো অবস্থা। তবু লজ্জায় কারো কাছে হাত বাড়ায় না,কিংবা কাউকে বলেও না নিজের অসুবিধার কথা। এরা না যাকাত নেয়,না সাহায্য চায়। সাধারণত বিচিত্র দুর্যোগে পড়লেই নিুবিত্তদের মাঝে এই সমস্যা দেখা দেয়। এদেরকে যাকাত নয়,সদকা নয় দু'হাতে সাহায্য করতে হবে গোপনে এবং কৌশলে। ইতোপূর্বে আমরা দান-সদকা নিয়ে কথা বলেছি,আজকের আসরে এই মানব সেবা সম্পর্কে আরও কিছু কথা বলার চেষ্টা করবো।

পবিত্র কোরআনের সূরা বাকারার ২৭৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে দান-খয়রাত ঐ সকল গরিব লোকের জন্যে যারা আল্লাহর পথে পড়ে থাকার কারণে জীবিকার সন্ধানে অন্যত্র ঘোরাফেরা করতে পারছে না। কিন্তু তাদের অবস্থা সম্পর্কে যারা খোজ-খবর রাখে না তারা মনে করে এইসব লোকের বুঝি কোনো অভাব-অনটন নেই। তোমরা তাদেরকে তাদের লক্ষণ দ্বারা চিনবে। তারা মানুষের কাছে কাকুতি-মিনতি করে ভিক্ষা চায় না। তোমরা যে অর্থ ব্যয় করবে,আল্লাহ তায়ালা অবশ্যই সে সম্পর্কে জানেন। কোরআনে বর্ণিত লোকদেরকে অবশ্যই সাহায্য সহযোগিতা করতে হবে। কীভাবে করতে হবে তা-ও বলে দেওয়া হয়েছে এই সূরারই ২৭১ নম্বর আয়াতে। যদি তোমরা প্রকাশ্যে দান-খয়রাত করো,তবে তা কতোই না উত্তম। আর যদি খয়রাত গোপনে করো এবং অভাবগ্রস্তদের দিয়ে দাও,তবে তা তোমাদের জন্যে আরো উত্তম। আল্লাহ তায়ালা তোমাদের কিছু গুনাহ দূর করে দেবেন। আল্লাহ তোমাদের কাজকর্মের খুব খবর রাখেন।

কোরআনের এই নির্দেশনা অনুযায়ী অভাবগ্রস্তদেরকে খুঁজে বের করতে হবে। তাদের সাহায্য করতে হবে। রোযা রাখার জন্যে নিত্যদিনের সেহরি-ইফতারের ব্যবস্থা আছে কিনা;খেয়াল করতে হবে। মনে রাখবেন অভাবগ্রস্তদেরকে সাহায্য করা বা দান করা আল্লাহকে ধার দেওয়ার সাথে তুলনা করা হয়েছে কোরআনে। ধার মানে হলো কাউকে কিছু দেওয়া হলে তা পরে ফেরত দেওয়া। তার মানে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পরকালে এই দানের প্রতিদান দেবেন। কোরআনে বলা হয়েছে যদি তোমরা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান করো,তিনি তোমাদের জন্যে তা দ্বিগুণ করে দেবেন এবং তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন। আল্লাহ গুণগ্রাহী,ক্ষমাশীল।

দেড় হাজার বছর আগে ইসলাম মানব সেবার এই বিধান দিয়ে গেছেন। যাকাতের বিধানকে অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হিসেবে বিধিবদ্ধ করেছে। ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে প্রতিবেশীর ব্যাপারে দায়িত্ব অর্পন করেছে। বিশ্বব্যাপী আজ তথাকথিত আধুনিকতার ধ্বজাধারীরা মানবতাবাদের আবিষ্কর্তা বলে নিজেদের দাবি করছে। অবশ্য তাদের মানবতার চেহারাটা যে কী রকম তা ফিলিস্তিনের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। হিরোশিমা-নাগাসাকির ইতিহাস পড়লেই বোঝা যায়।

নবী হযরত মুহাম্মাদ ( সা ) বলে গেছেন, ''আল্লাহু ফি আওনিল আবদি মাল আবদু ফি আওনি আখি''...''হে, অর্থাৎ আল্লাহর যে বান্দা তার ভাইকে সাহায্য করবে আল্লাহও তাঁর সেই বান্দাকে সাহায্য করবেন। আর ইসলামে প্রতিটি মুমিন-মুসলমানই পরস্পরে ভাই ভাই। তাদের সুখ-দুঃখের খোঁজখবর রাখা সবারই ঈমানী দায়িত্ব। হযরত আলী ( আ ) এর একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করাটা প্রাসঙ্গিক বলে মনে করছি। ঘটনাটা হলো-আলী ( আ ) একদিন পথিমধ্যে বুঝতে পেরেছিলেন যে, একজন গরীব মহিলার সন্তানেরা ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদছে আর মহিলা তাদেরকে শান্ত করার জন্যে চুলায় পানিভর্তি পাতিল রেখে বাচ্চাদেরকে বোঝাচ্ছে যে,তাদের জন্যে খাবার রান্না হচ্ছে। মহিলা এভাবেই বাচ্চাদেরকে ক্ষুধার্ত অবস্থাতেই ঘুম পাড়ালো।

আলী ( আ ) এই দৃশ্য দেখে তাড়াতাড়ি করে বাসায় গেলেন এবং একটা পাত্র ভর্তি করে খুরমা,কিছুটা আটা,তেল এবং চাল কাঁধে করে নিয়ে এসে সেই মহিলার বাসায় অনুমতি নিয়ে প্রবেশ করলেন। তারপর তাদের জন্যে খাবার রান্না করলেন এবং বাচ্চাদেরকে ঘুম থেকে তুলে নিজ হাতে খাওয়ালেন। তারপর বাচ্চাদের সাথে শিশুসুলভ খেলাধুলা করে তাদেরকে বিনোদিত করলেন।

হযরত আলী ( আ ) এর এই কাহিনীটা আমাদের জন্যে একটি মহান শিক্ষা। আমাদের সমাজেই বহু আত্মসম্মানবোধ সম্পন্ন মানুষ আছেন যাঁরা ভেতরে ভেতরে বিভিন্ন রকম সমস্যায় আছেন। যেমন কেউ হয়তো মেয়ে বিয়ে দিতে পারছেন না প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে। কারো সন্তান স্কুলে যেতে পারছে না বইয়ের অভাবে। কেউ পরীক্ষায় অংশ নিতে পারছে না ফি জোগানোর অভাবে। কেউ অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে বাসায়,মৃত্যুর প্রহর গুণছে,উপযুক্ত চিকিৎসা করাতে পারছে না টাকা পয়সার অভাবে। এদেরকে সাহায্য না করলে রমযানের রোযা কতোটা কবুল হবে আল্লাহর দরবারে,তিনিই ভালো জানেন।

হযরত আলী ( আ ) আরো বলেছেন যদি প্রকৃত তৌহিদের পথ পেতে চাও,তাহলে আল্লাহর সৃষ্টিকে দয়া করো। তৌহিদের বোঝা খুবই ভারী এবং ভয়াবহ। এই ভার বহন করার শক্তি বা সামর্থ সবার নেই,তবে আল্লাহর সৃষ্টি মানুষের প্রতি দয়া করলে ঐ ভার সহজ হয়ে যায়। ইমাম সাদেক ( আ ) বলেছেন সদকা দেওয়ার মতো ভয়াবহ কষ্টকর এবং ভারি জিনিস শয়তানের জন্যে আর দ্বিতীয়টি নেই। এর কারণ হলো আল্লাহর বান্দার হাতে সদকা পৌঁছানোর আগেই তা আল্লাহর হাতে চলে যায়। শয়তান তাই সেখানে সুবিধা করতে পারে না। হযরত আলী ( আ ) আরো বলেছেন,মহান আল্লাহর পথে তোমাদের ধন-সম্পদ,বক্তব্য ও জীবন দিয়ে ত্যাগ-তিতীক্ষা করো।

আল্লাহর পথ বলতে তিনি যা করতে বলেছেন তা-ই। একটি চিত্র কল্পনা করুন তো। দুটি নৌকা পার হবার লক্ষ্যে কর-কর্মকর্তাদের সামনে গেল। প্রথম নৌকাটিতে শুল্ক কর্মকর্তা কিছুই দেখতে না পেয়ে ছেড়ে দিল। দ্বিতীয়টিতে নজর দিয়ে দেখলো নৌকাটি মালামালপূর্ণ। করকর্মকর্তা তাকে আটকে রাখতে বললো। মানেটা দাঁড়ায় এই, দান-খয়রাত না করে আপনি যদি আপনার মালামাল জমিয়ে রাখেন,তাহলে পরকালে সহজে পার হওয়া যাবে না। তাই যতোটা আপনার সামর্থে কুলায়,দান করুন,অপরের সাহায্যে এগিয়ে যান,মানবসেবায় আত্মনিয়োগ করুন। বর্ণনায় এসেছে চারটি জিনিস স্বল্প পরিমাণটাও অনেক।একটা হলো আগুন,অন্যটা শত্রুতা, তৃতীয়টি হলো অভাব আর সর্বশেষটা হলো রোগ-ব্যাধি।তাই অপরের অভাব দূর করে পরকালের তরী পার হবার পথ সুগম করুন। এখনই তার শ্রেষ্ঠ সময়।

১৭ তম পর্ব

আমরা ইতোপূর্বে অভাবগ্রস্তদেরকে সাহায্য করার কথা বলেছি। প্রতিবেশীদের খোঁজখবর নেওয়ার কথা বলেছি,অসহায়-দুস্থদের দিকে মানবিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়ার কথা বলেছি। এসবই কিন্তু ঐচ্ছিক ইবাদাত। আর যাকাত ইসলামের এমন একটি বিধান যা আপনার ওপর অবশ্য পালনীয় করা হয়েছে। অর্থাৎ এটি একটি ফরয ইবাদাত। দিলে দিলাম,না দিলে নাই-এরকম ঐচ্ছিক কোনো ব্যাপার নয়। অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করে সুখ-শান্তিপূর্ণ,অভাব ও দারিদ্রমুক্ত একটি সুন্দর সমাজ গড়ার অন্যতম একটি বিধান হলো যাকাত এবং খুমস। গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টি নিয়ে আজ আমরা কথা বলার চেষ্টা করবো।

যাকাত একটি আরবি শব্দ। এর অর্থগত বৈচিত্র্য রয়েছে। কোরআনে পাকের যেখানেই যাকাতের প্রসঙ্গ এসেছে সেখানেই যাকাতের আগের শব্দটি ‘অ-আতু' বা এর অভিন্ন শব্দমূল ব্যবহার করা হয়েছে। এই শব্দটির অর্থ কেবল পরিশোধ করাই নয় বরং প্রথম পর্যায়ে আসা,পৌঁছা এবং তারপর আনা অর্থ বোঝাতেও এই শব্দটির ব্যবহার রয়েছে। আর যাকাত শব্দটিরও দুটি অর্থ রয়েছে। একটি অর্থ হলো পবিত্রতা অপরটি প্রবৃদ্ধি। তার মানে দাঁড়ায় যাকাত পরিশোধ করার মাধ্যমে সম্পদ পবিত্রতা অর্জন করে। আর আল্লাহ এই পবিত্রতার কারণে সম্পদে বরকত বাড়িয়ে দেন যার ফলে সম্পদও বৃদ্ধি পায়,কমে না। আবার পবিত্রতা অর্থে অনেকে মনের পবিত্রতা, নফসের পবিত্রতাকেও বুঝিয়েছেন। কেননা যাকাত দেওয়ার সাথে সম্পদের প্রতি নির্মোহের বিষয়টিও প্রমাণিত হয়। সেইসাথে আল্লাহর সন্তুষ্টির কথাটি অন্তরে স্থান জুড়ে নেয়। এভাবে অন্তর পবিত্রতায় ভরে ওঠে।

প্রচলিত অর্থেও কিন্তু পবিত্রতার বিষয়টি ভিন্ন পরিভাষা বা শব্দযোগে বলা হয়। যেমন বৈধভাবে অর্জিত সম্পদেরও আয়কর দেওয়া না হলে সেই সম্পদ প্রচলিত আইনে বৈধ হয় না। আয়কর দেওয়া হলেই কেবল তা বৈধতা পায় অর্থাৎ পবিত্রতা অর্জন করে। তবে এখানে মনে রাখতে হবে প্রচলিত আয়কর এবং যাকাতের মধ্যে মৌলিক কিছু পার্থক্য রয়েছে। দুটোকে এক করে দেখা ঠিক নয়। আয়করের টাকা যে-কোনো দেশের সরকার যে-কোনো কাজে ব্যবহার করতে পারে,কিন্তু যাকাতের টাকা কোরআন-নির্দিষ্ট খাতগুলো ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না। আয়করের পরিমাণ সরকার প্রত্যেক বাজেটের সময় নির্ধারণ করতে পারে,কিন্তু যাকাতের পরিমাণ সুনির্দিষ্ট ইত্যাদি।

যাকাতের কথা পবিত্র কোরআনের অন্তত ২৯টি আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ থেকেই অনুমিত হয় যে ইসলামের মৌলিক বিধানগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি হলো এই যাকাত। যাকাতের উদ্দেশ্যটা কী ? যাকাতের উদ্দেশ্য হলো সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূর করা। সমাজে অনাথদের মানবাধিকার সুপ্রতিষ্ঠিত করা। অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা। দারিদ্রসীমার নীচে যারা বসবাস করছে তাদেরকে স্বাবলম্বী করে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা। বিভিন্ন কারণে ঋণগ্রস্ত হয়ে যারা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না,তাদেরকে দাঁড়াতে সহযোগিতা করা ইত্যাদি। এরকম বেশ কিছু খাতের কথা সূরা তাওবায় সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্য বিমোচনের কথাই বলা হয়েছে। এখন প্রশ্ন জাগে যাকাত প্রদানকারী বিত্তশালীদের সংখ্যা তো সমাজে কম নয়। তাহলে সমাজ থেকে দারিদ্র্য বিমোচিত হচ্ছে না কেন ?

এই প্রশ্নের সর্বপ্রথম উত্তরটি হলো যাকাত গ্রহণ করার পদ্ধতিটা যেমন সুষ্ঠু নয় তেমনি তার বিলি-বণ্টন বা প্রয়োগও সঠিক নয়। বহু বিত্তশালী লোকই যাকাত দেয় না। তাদেরকে যাকাত দিতে বাধ্য করার মতো কোনো অবস্থাও রাষ্ট্রব্যবস্থায় নেই। এরা আয়করও ঠিকমতো দেয় না। ঘুষ দিয়ে সেরে নেয় সব। ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে যাকাত প্রথা চালু হবার পর জাযিরাতুল আরব বা আরব উপদ্বীপে যাকাত গ্রহণ করার মতো লোক খুঁজে পাওয়া যায় নি। কিন্তু এখন সেই চিত্র দেখা না যাবার কারণ হলো যেটুকু যাকাত আদায় হয়,তা-ও ঠিকমতো প্রয়োগ হয় না।

আবার যাকাত প্রদানকারী এমন অনেক ব্যক্তিবর্গ রয়েছেন যাঁরা নিজেদের যাকাত নিজেরাই দেন। ঘটা করে জনসমক্ষে দেন। এলাকার গরিব মানুষেরা যাকাত নেওয়ার জন্যে ভিড় করে। ভিড়ের চাপে বহু মানুষ মারাও যায় অনেক সময়। যাকাত বলতে এরা কাপড়-চোপড় ইত্যাদি পণ্য দান করে। এভাবে যাকাত প্রদানকারীরা সবাইকে বোঝায় যে সে অনেক বড়লোক এবং দানশীল। তাদের যাকাত দেওয়ার উদ্দেশ্য আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন নয় বরং জনসমর্থন এবং আত্মপ্রদর্শন। এভাবে বিচ্ছিন্নভাবে এবং অপরিকল্পিতভাবে যাকাত দেওয়া হলে সমাজ থেকে দারিদ্র্য দূর হবার কোনো সম্ভাবনাই নেই।

তা না করে যদি সামষ্টিভাবে এবং সুপরিকল্পিতভাবে সমাজের দরিদ্র শ্রেণীর লোকগুলোকে চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে তাদেরকে নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো,তাহলে অল্প সময়ের মধ্যেই দেখা যেত আরব উপদ্বীপের সেই মহান ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি-যাকাত নেওয়ার মতো লোক খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। আমাদের সমাজে দারিদ্র্য বিমোচনের নামে বিদেশী বহু এন.জি.ও. মূলত দারিদ্র্য জিইয়ে রাখার পাকাপোক্ত ব্যবস্থা করেছে। এইসব এন.জি.ও. গরীব লোকজনকে চড়া সুদে ঋণ দিয়ে থাকে। গরিব মানুষ অভাবের তাড়নায় নিজেদের শেষ সম্বল জমাজমি বা অন্যান্য জিনিসপত্র বন্ধক রেখে সুদে ঋণ নেয়। তাদের ঐ ঋণ আর পরিশোধ করা শেষ হয় না। চিরঋণী হয়ে পড়ে তারা। অনেক সময় হয়তো যাকাতের টাকা দিয়েও ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে হয় তাদেরকে। অথচ যাকাত ব্যবস্থার সুষ্ঠু বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে এইসব সমস্যা চিরতরে দূর হয়ে যেত। আল্লাহ আমাদেরকে সঠিক জ্ঞান দিন,যথার্থ উপলব্ধি দিন।

মাওলানা জালালুদ্দিন মোহাম্মাদ রুমি লিখেছেন-
آب در كشتي هلاك كشتي است
آب در بيرون كشتي، پشتي است
নৌকার ভেতরে জমানো পানি ডেকে আনে সর্বনাশ
নৌকার বাইরের অতলান্ত পানি দেয় মুক্তির আশ্বাস

মাওলানা রুমি এখানে মানুষ এবং তার ধন-সম্পদকে পানি এবং নৌকার সাথে তুলনা দিয়ে বোঝাতে চেয়েছেন, সমুদ্রের জল নৌকার ভেতরে থাকলে তা নৌকাকে ছিদ্র করে দেয় যার ফলে নৌকা ডুবে যাবার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়।আবার নৌকা যদি অল্প পানিতে গিয়ে ভিড়ে,তাহলে কাদায় আটকে গিয়ে চলাচল বন্ধ হয়ে যাবার আশঙ্কা দেখা দেয়। তার মানে যাকাত পরিশোধ না করে সম্পদ নিজের ভেতর কুক্ষিগত করে রাখাটা বিপজ্জনক।

আপনাদের মধ্যে যাদের ওপর যাকাত ফরজ হয়েছে তাঁরা অবশ্যই যাকাত দিতে ভুল করবেন না। কারণ আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আপনার সম্পদে গরীবের হক রেখে দিয়েছেন। সেই হক গরীবকে বুঝিয়ে দেওয়া আপনারই দায়িত্ব। একাজে অবহেলা করা হলে রমযানের এই বরকতময় রোযা কোনো ফলই বয়ে আনবে না।

১৮ তম পর্ব

রহমত-বরকতপূর্ণ,মুক্তির সুসংবাদপূর্ণ দিন এবং রাত্রিগুলো অতিক্রম করছি আমরা। রমযানের পবিত্র দিনগুলোতে চোখের স্বচ্ছ অশ্রুধারা গলিয়ে আল্লাহর দরবারে নিজস্ব চাওয়া-পাওয়া আর অভাব-অভিযোগের কথা বলার মোক্ষম সুযোগ সৃষ্টি হয়। নামায,রোযা, জিকির-আজকার,দোয়া-দরুদ ইত্যাদি পূত-পবিত্রময় রমযান মাসে আরো বেশি আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হয়। আসলে রমযান মাসের আগমনটাই যেন মুসলমানদের জন্যে এক বৃহৎ ঈদোৎসব। এই ঈদ বিচিত্র পুণ্য অর্জনের ঈদ। পাপমোচনের আনন্দের ঈদ। ইবাদাতের প্রাচুর্যের ঈদ। সবাই সবাইকে এই আনন্দ যথাসাধ্য উপভোগ করার জন্যে উৎসাহিত করবেন-এই প্রত্যাশায় শুরু করছি আজকের আলোচনা।

রোযা হলো দোয়া কবুলের মাস। আর দোয়া হলো ইবাদাতের আত্মা বা প্রাণ। বিশেষ করে রমযান মাসে যখন মানুষের অন্তরাত্মা আল্লাহর দিকে রুজু হয়ে থাকে,তখন দোয়ার প্রভাব অন্যসময়ের তুলনায় অনেক বেড়ে যায়,এ সময় দোয়ার ফলে মানুষের অন্তরও অনেক বেশি পবিত্রতা অর্জন করে। জার্মানীর প্রখ্যাত ইসলাম বিশেষজ্ঞ প্রফেসর মিসেস আনা ম্যরি শিমাল, সহিফায়ে সাজ্জাদিয়ায় ইমাম সাজ্জাদ (আ) এর মোনাজাতগুলোকে আল্লাহর সাথে আন্তরিক কথোপকথনের উন্নত,ছন্দময় এবং প্রভাবশালী প্রকাশ মাধ্যম বলে মন্তব্য করেছেন।

ইমাম সাজ্জাদ ( আ ) রমযানের আগমন উপলক্ষ্যে আল্লাহর প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতেন এবং রমযানকে স্বাগত জানিয়ে প্রাণসঞ্চারী ও আবেগঘন মোনাজাত দিতেন। শুরুতেই তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতেন এজন্যে যে রমযানের মতো একটি মাস আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্যে অনুগ্রহস্বরূপ দান করেছেন-যেই মাসকে আল্লাহ তাঁর নিজের মাস বলে ঘোষণা দিয়েছেন,যেই মাস রোযার মাস,ইসলামের মাস,পবিত্রতার মাস। যেই মাসে নাযিল হয়েছিল মহাগ্রন্থ আল-কোরআন। যেই কোরআন মানুষের পথের দিশারী এবং সত্য ও মিথ্যার মাঝে পার্থক্য সৃষ্টিকারী। এরপর অন্যান্য মাসের তুলনায় এ মাসের ফযিলত,পবিত্রতা ও সম্মানের কথা উল্লেখ করেন এবং মহানবী ( সা ) ও তাঁর আহলে বাইতের ওপর দরুদ ও সালাম পাঠান। অবশেষে আল্লাহ যা নিষিদ্ধ করেছেন এবং যা কিছু হারাম বলে ঘোষণা দিয়েছেন সেসব থেকে দূরে থাকার জন্যে আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করেছেন,সকল প্রকার গুনাহ থেকে মুক্ত থাকার তৌফিক চেয়েছেন এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত হবার জন্যে তাঁরই দরবারে সাহায্য কামনা করেছেন।

মানুষের জীবন সবসময়ই সমান্তরাল দুটি মহাসড়কের ওপর ধাবমান। একটি মহাসড়ক হলো ক্রমশ উন্নয়নমুখি,অপরটি হলো ক্রমশ অবনয়নমুখি। দুটি সড়কেরই অবস্থান পাশাপাশি। কিন্তু যখনই কেউ নূরের দিকে অর্থাৎ ক্রমশ উন্নয়নের দিকে ধাবিত হয়,তখনই অপরটির সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হয়। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী এ প্রসঙ্গে বলেছেনঃ আল্লাহর পথ কাছের একটি পথ। কেউ চাইলেই বিচ্যুতির পথ থেকে সরে গিয়ে সরল-সঠিক সেই পথে চলে আসতে পারে। যে-কোনো মুহূর্তেই সেটা সম্ভব। যেভাবে বর্ণনায় এসেছে-যে তোমার দিকে আসতে চায়, তার পথ নিকটবর্তী। এক পা ফেললেই অধোগামীর সাথে দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে যায় এবং সেই পথে প্রবিষ্ট হওয়া যায় যেই পথের পথিকগণ সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি তথা নূরের পথে দ্রুতবেগে ধাবমান। আমরা আমাদের প্রবৃত্তির দিকে তাকালে দেখবো যে প্রবৃত্তির তাড়না মেটাতে গেলেই সেই প্রবৃত্তি মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে বিচ্যুতির পথে ফেলে দেয়। আর যখনই আমরা সিদ্ধান্ত নেই যে প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে আমরা চলবো তখনই আমরা উন্নতির পথে অগ্রসর হবো। পথ পরিবর্তনের জন্যে এই রমযান মাসই হলো সবচে সহজ এবং উপযুক্ত একটি সময়।

রমযান মাসকে অনেকেই বসন্তের সাথে তুলনা দেন। এজন্যে যে,বসন্ত আসলে প্রকৃতি রাজ্যে সবুজের সমারোহ ঘটে, জেগে ওঠে মৃত ডাল-পালা,ফুলে ফুলে প্রকৃতিরাজ্যে দেখা দেয় প্রাণের জোয়ার। তেমনি রমযান মাস এলে প্রাণহীন অলস মানুষগুলোও পবিত্র চিন্তার মাধ্যমে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। রোযা রাখার মধ্যে যে কতোশতো কল্যাণ নিহিত রয়েছে,বিগত অনুষ্ঠানগুলোতে আপনারা তা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করতে পেরেছেন। রোযার এই মাহাত্ম্যের কারণেই সকল নবী-রাসূলের শরীয়তে আমরা তার বিধান দেখতে পাই। বর্ণনায় এসেছে,আল্লাহ রাব্বুল আলামিন মূসা ( আ ) কে ওহীর মাধ্যমে জিজ্ঞেস করলেন-"কোন বস্তু তোমাকে আমার কাছে মুনাজাত করা থেকে বিরত রাখলো ?" মূসা ( আ ) সে সময় রোজাদার ছিলেন। বললেন, হে খোদা! এ অবস্থায় তোমার দরবারে মোনাজাত করাটাকে সমীচীন মনে করছি না, কেননা এই রোযাদারের মুখের দুর্গন্ধ খুবই বিরক্তিকর। আল্লাহ সেই মুহূর্তে তাঁর প্রতি ওহি নাযিল করে বললেন-"হে মূসা ! রোযাদারের মুখের দুর্গন্ধ আমার কাছে মেশক মৃগনাভির সুগন্ধির চেয়েও উত্তম।"

রোযার কল্যাণের দিক চিন্তা করে পূর্ববর্তী নবীগণ প্রায় সারাবছর ধরেই রোযার অভ্যাস চালু রেখেছেন। হযরত দাউদ (আ) ছিলেন ইবাদাত বন্দেগীর দিক থেকে অনেক বেশি অগ্রসর। তিনি একদিন রোযা রাখতেন তো পরের দিন ইফতার করতেন। তাঁর ছেলে সুলাইমান (আ) প্রতি মাসের প্রথম ৩ দিন,মাঝখানের ৩ দিন এবং শেষের ৩ দিন রোযা রাখতেন। ঈসা (আ) তো প্রায় সারাজীবনই রোযাদার ছিলেন। পশুর পশম দিয়ে বোণা বস্ত্র পরতেন তিনি। তাঁর মা মারিয়াম (সা) ২ দিন রোযা রাখতেন কিন্তু ইফতার করতেন ১ দিন। আর সর্বশেষ নবী (সা) প্রতি মাসেই ৩ দিন রোযা রাখতেন এবং বলতেন এই ৩ দিন রোযা রাখা সারা জীবন রোযা রাখার সমতুল্য।

১৯ তম পর্ব

বান্দার প্রতি খোদার আমন্ত্রণ বা জিয়াফতের এই মাসে রহমত বরকত এবং মাগফেরাতের সদর দরজা উন্মোচিত করে দেয়া হয়, এ মাসে দোজখের দ্বার রুদ্ধ হয়ে যায় আর বেহেশতের সিংহ দ্বার খুলে রাখা হয়। আমাদের মত পাপী গুনাহগার বান্দাদের প্রার্থণা আল্লাহর দরবারে কবুল করার সুযোগ সৃষ্টি করেন এই মাস। আমাদের আত্মাকে শক্তিশালী করার মহা উপলক্ষ তৈরি হয় এ মাসে। রিপুর উপর আত্মাকে জয়ী করার অনবদ্য সুযোগ সৃষ্টি করে এই মাস। রিপুর উপর আত্মাকে শক্তিশালী করতে হলে যে সব গুণ অর্জনের প্রয়োজন তার একটি হলো সবর বা ধৈর্য। আজকের আসরে আমরা সবর বা ধৈর্য নিয়ে আলোচনা করব।

মহাগ্রন্থ কোরানের সূরা আল-আনফালের ৪৬ নম্বর আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, " আর আল্লাহ তা'আলার নির্দেশ মান্য কর এবং তাঁর রসূলের। তাছাড়া তোমরা পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হইও না। যদি তা কর, তাহলে তোমরা সাহস হারাবে এবং তোমাদের চিত্তের দৃঢ়তা বিলুপ্ত হবে। আর তোমরা ধৈর্যধারণ কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা'আলা রয়েছেন ধৈর্যশীলদের সাথে।"

ইমাম জাফর সাদেক (আ) ধৈর্য্যকে স্পষ্ট ভাষায় মাথার সাথে তুলনা করেছেন। তিনি বলেছেন, দেহের ক্ষেত্রে মাথার যে ভূমিকা বিশ্বাসের ক্ষেত্রে সবর বা ধৈর্যের ভূমিকা একই। মাথা না থাকলে দেহ পচে যায় একইভাবে সবর যখন বিদায় নেয় তার সাথে সাথে বিশ্বাসও বিলীন হয়ে যায়। অন্যদিকে হযরত আলী (আ)কে বিশ্বাস বা ইমান সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি জবাবে বলেছিলেন, ইমানের কাঠামো চারটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এগুলো হলো ধৈর্য বা সহিষ্ণুতা, অকাট্য বিশ্বাস বা ইয়াকিন, ন্যায় পরায়নতা বা আদল এবং সংগ্রাম বা জ্বিহাদ। এরপর তিনি আরো বলেন, ধৈর্যর চারটি উপাদান রয়েছে। এগুলো হলো, ব্যগ্রতা বা ঔৎসুক্য, ভয়, ধর্মভীরুতা এবং মৃত্যুর প্রত্যাশা। কাজেই যিনি বেহেশত বা স্বর্গ লাভের জন্য উদগ্রীব তিনি লোভকে সংবরণ করবে। যিনি দোজখ বা নরকের আগুনকে ভয় পান তিনি গুনাহ বা পাপ কর্ম থেকে বিরত থাকবেন। ধর্মভীরুতার অনুশীলন যিনি করবেন তিনি সহজেই এই পার্থিব জীবনের সকল দুঃখ-কষ্ঠ-বেদনাকে ধারণ করতে পারবেন। যিনি মৃত্যুর প্রত্যাশা করবেন তিনি ভাল কাজ দ্রুততার সাথে করবেন।

ইমাম জাফর সাদেক (আ) সবর বা ধৈর্যের ব্যাখা দিতে যেয়ে বলেছেন, যখন কোনো ইমানদার বান্দা তার উপর আপতিত যন্ত্রণা, দুঃখ বা কষ্টকে ধৈর্যের সাথে সহ্য করে তখন তাকে হাজার শহীদের সমতুল্য পুরস্কার দেয়া হবে।
ইমাম জাফর সাদেক (আ) আরো বলেছেন, যখন কোনো ইমানদার ব্যক্তি কবরে প্রবেশ করেন তখন নামাজ তার ডানে, জাকাত তার বামে, সৎ কর্ম তার মুখোমুখি অবস্থান নেয়। আর ধৈর্য্য ও সহিষ্ণুতা তাকে নিজ আশ্রয়ে টেনে নেয়। যখন দুই ফেরেশতা তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য কবরে প্রবেশ করে তখন নামাজ, যাকাত এবং সৎ কর্মকে উদ্দেশ্য করে ধৈর্য্য বলতে থাকে, তোমরা তোমার সাথীকে রক্ষা করো, যদি তোমরা এ কাজটি করতে না পারো তবে আমিই এ কাজটি করব।

সবর বা ধৈর্যের সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে যেয়ে বিখ্যাত জ্ঞান সাধক নাসির উদ্দিন তুসি বলেছেন, ধৈর্যের মানে হলো অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতির মুখে আত্ম সংবরণ করা। অন্যদিকে বিখ্যাত আরেফ খাজা আবদুল্লাহ আল আনসারী বলেছেন, গোপন ক্লেশের ব্যাপারে অভিযোগ জানানো থেকে বিরত থাকার নামই হলো সবর। এছাড়া সবর বা ধৈর্যের প্রকার ভেদের কথা বলতে যেয়ে হযরত আলী (আ) বলেছেন, আল্লাহর নবী বলেছেন, ধৈর্য্য তিন প্রকারের। মানসিক ক্লেশ বা কষ্টের সময় ধৈর্য ধারণ, খোদার প্রতি আনুগত্যের সময় ধৈর্য ধারণ এবং আল্লাহর অবাধ্যদের প্রতি ধৈর্য ধারণ । প্রথম দুইটির চেয়ে তৃতীয়টি শ্রেষ্ঠ।

ধৈর্যে বা সবরের কথা বলতে গেলে খুব স্বাভাবিক ভাবে আমাদের মনে হবে ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ)এর কথা। তিনি কারবালার মর্ম বিদারী হত্যাকান্ড প্রত্যক্ষ করেছেন। দেখেছেন ইয়াজিদের বাহিনী কি ভাবে কারবালার ময়দানে তার পিতা ইমাম হাসান (আ)কে হত্যা করেছে, তার ভাই, বন্ধু এবং স্বজনদের হত্যা করা হয়েছে ।আহলে বাইতের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের এবং আহলে বাইতের অনুগতদের। শুধু তাই না ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ)কেও নির্মম আচরণ সহ্য করতে হয়েছে। ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ)কে কুফা থেকে দামেস্কে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো শিকল পরিয়ে। সাতশ মাইলের এই মরু-পথ তাকে এভাবেই বন্দি অবস্থায় অতিক্রম করতে হয়েছিলো। কিন্তু তরুণ ইমাম যয়নুল আবেদীন এমন নির্মমতায় মোটেও মুষড়ে পড়েন নি।

তিনি ধৈর্যের মূর্ত প্রতীক হয়ে ঐ পরিস্থিতির মোকাবেলা করেছিলেন। উমাইয়া তথা ইয়াজিদ বাহিনী কারবালায় তাদের নৃশংসতার সকল চিহ্ন মুছে ফেলতে চেয়েছিলো। কিন্তু তাদের সে প্রচেষ্টা নস্যাৎ হয়ে যায় ইমাম যয়নুল আবেদীন (আ)র প্রচেষ্টায়। ইয়াজিদের রাজদরবারে যারা সমবেত হয়েছিলো তাদের কাছে তুলে ধরেন কারবালার মর্মান্তিক ঘটনাবলী। মদীনায় প্রত্যাবর্তনের পর ইমাম একটি বছর কাটিয়েছেন নিঃসঙ্গতার মাধ্যমে। তিনি সেজদায় অধিকাংশ সময় কাটাতে বলে তার নাম হয়েছিলো, আস সাজ্জাদ বা সিজদাকারী। অন্যদিকে আল আবিদ শব্দের অর্থ হলো উপাসনা মনস্ক এবং যয়নুল আবেদিন মানে হলো যিনি এবাদত বা উপাসনার ক্ষেত্রে সকলকে অতিক্রম করে গেছেন। খোদার প্রতি তার দোয়া বা প্রর্থনাগুলো অনবদ্য হয়ে উঠেছে। সৎ পথের দিশারী তার এ সব দোয়া গ্রন্থিত হয়েছে, 'সহিফায়ে সাজ্জাদিয়া' নামে। তার অসাধারণ এসব দোয়ার মধ্যে একটি হলো,

হে প্রভু!
তুমি আমাকে যে অপার বদ্যানতা দান করেছো তা ফিরিয়ে নিও না।
তুমি আমাকে যে অপার উদারতা দেখিয়েছো তা ফিরিয়ে নিও না।
তুমি আমাকে তোমার দয়া দিয়ে আবৃত করে দাও এবং তা ছিন্ন করো না।
তুমি আমার খারাপ কাজ সম্পর্কে অবহিত আছো তা ক্ষমা করে দাও।
হে আমার প্রভু তোমার দরবারে তুমি আমার পক্ষে থাক।
এবং আমি তোমার শাস্তি থেকে তোমার কাছে আশ্রয় চাই
আমি তোমার দরবারে হাজির হয়েছি তোমার বদ্যানতা, তোমার দয়া কামনা করে,
আমাকে ক্ষমা করে দাও, যা শুধু তোমাকেই শোভা পায়
আমার কৃতকর্মের জন্য আমার প্রাপ্য শাস্তি আমাকে দিও না
হে ক্ষমাশীল আমাকে ক্ষমা করে দাও!

সবর বা ধৈর্য একটি অসাধারণ আত্মার শক্তি। আধ্যাত্মিক এই শক্তি একদিকে আমাদের পৃথিবীর পথ পরিক্রমাকে সহজ করে তোলে অন্যদিকে আখেরাতে আমাদের বিশ্বস্ত সংগী হয়ে আমাদেরকে রক্ষা করতে এগিয়ে আসে। রাতারাতি কারো পক্ষেই এই গুণ অর্জন করা সম্ভব নয়, এই গুণ অর্জনের জন্য আমাদের প্রত্যেকে অবশ্যই চেষ্টা করতে হবে। হযরত আলী (আ) বলেছেন, যিনি সবর করেন তিনি কখনোই সাফল্য লাভ করা থেকে বঞ্চিত হবেন না, তবে তার সাফল্য লাভ করতে হয়ত দেরি হতে পারে। আল্লাহ আমাদেরকে সবর করার ক্ষমতা দান করুন।

২০ তম পর্ব

বরকতময় মাসের শেষ প্রান্তে এসে আমরা দাঁড়িয়েছে। আত্মশুদ্ধি করব বলে যে চেতনা নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করেছিলাম তার কতোটা আমরা অর্জন করতে পেরেছি আজ তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন । এ কথা আমরা সবাই জানি আত্মশুদ্ধির সাথে তওবা বা কৃত-কর্মের জন্য গভীর অনুতাপের একটি সর্ম্পক রয়েছে। পবিত্র এই রমজানের দিনগুলোতে তাই আমরা কতোটা নিষ্ঠার সাথে তওবা বা অনুতাপ করতে পেরেছি তা দেখতে হবে। এখনো রমজানের আর মাত্র কয়েকটি দিন বাকি আছে। এ সময়ের মধ্যে যদি আমরা আন্তরিকতার সাথে তওবা করতে পারি তবে মহান আল্লাহ তা গ্রহণ করবেন এবং রমজানের প্রতিশ্রুত পুরস্কারে আমাদের তিনি ভূষিত করবেন।

মহাগ্রন্থ কোরআনের সূরা আত তাহরীমের ৮ নম্বর আয়াতের প্রথম অংশে আল্লাহতা'লা বলেছেন, মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ্ তা'আলার কাছে তওবা কর-বিশুদ্ধ তওবা। আশা করা যায়, তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মন্দ কাজগুলি মোচন করে দেবেন...।
মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা) বলেছেন, অনুতপ্ত হওয়ার লক্ষণ চারটি। অনুতপ্ত ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি তার কর্মের ক্ষেত্রে আন্তরিক হবেন । তিনি মিথ্যাকে এড়িয়ে যাবেন। তিনি দৃঢ়তার সাথে সত্যের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকবেন । এবং তিনি ভাল কাজ করার জন্য সব সময় আগ্রহী থাকবেন। ইমাম জাফর সাদেক (আ) বলেছেন, আন্তরিক ভাবে অনুতপ্ত হয়ে বা তওবাতুন নাসুহের মাধ্যমে কোনো বান্দা যখন আল্লাহর দিকে ফিরে আসেন তখন আল্লাহ তাকে ভালবাসেন এবং দুনিয়া ও আখেরাতে তার পাপকর্মকে আবৃত করে দেন। আল্লাহ কি করে বান্দার পাপকর্ম আবৃত করে দেন- এমন প্রশ্নের জবাবে ইমাম জাফর সাদেক (আ) বললেন, মানুষের পাপ-পূন্যের তালিকা প্রস্তুতকারী দুই ফেরেশতা নির্দিষ্ট ব্যক্তির পাপের যে কথা লিখেছিলেন আল্লাহ তা তাদেরকে সে পাপের কথা ভুলিয়ে দেন। এরপর মহান আল্লাহতা'লা ওই ব্যক্তির অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে বলেন, তোমরা তার পাপকে ঢেকে দাও। যে স্থানে এই পাপকর্ম সংগঠিত হয়েছিলো পৃথিবীর সে এলাকাকে আল্লাহ পাপ কর্ম ঢেকে দেয়ার নির্দেশ প্রদান করেন। আন্তরিক ভাবে বা বিশুদ্ধ চিত্তে অনুতপ্ত ব্যক্তি এরপর এমন ভাবে আল্লাহর দরবারে হাজির হন যে তার পাপকর্ম সর্ম্পকে তখন আর কোনো আলামত বা স্বাক্ষী কিছুই আর অবশিষ্ট থাকে না।
তওবার মানে হলো আধ্যাত্মিকতার প্রথম ধাপে প্রত্যাবর্তন। মানব প্রকৃতি বা ফিতরত এবং মানবের আধ্যাত্মিকতা বোধ পাপ ও অবাধ্যতার অন্ধকারে ঢেকে যাওয়ার পর তওবা বা অনুতাপের মাধ্যমে এই প্রত্যাবর্তন ঘটে। প্রাথমিক ভাবে মানবাত্মার ভালো বা খারাপ কোনো গুণই থাকে না। কিন্তু চেষ্টার দ্বারা বা নিজ কর্মের মাধ্যমে সে ভালো বা খারাপের যে কোনো দিকের চুড়ান্ত পর্যায়ে যেতে পারে। তবে প্রথমে আমাদের আত্মা থাকে নিষ্পাপ, বিশুদ্ধ এবং তার নিজস্ব একটি দ্যুতি থাকে। পাপ কর্মের দ্বারা আমাদের হৃদয় কলুষিত হতে থাকে, আত্মার প্রাকৃতিক দ্যুতি নিভে যায় এবং সেখানে অন্ধকার জড়ো হতে থাকে। কিন্তু আত্মায় অন্ধকারের রাজত্ব পুরো মাত্রায় এটে বসার আগ মুর্হুতেও যদি কেউ দায়িত্বহীনতার দীর্ঘ নিদ্রা থেকে সচেতন হয়ে উঠেন, তাহলে আত্মার অন্ধকার ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করে, আত্মা আবার আলোর দিকে ফিরে আসতে থাকে। ফিতরত বা স্বাভাবিক প্রকৃতির দিকে প্রত্যাগমন করতে থাকে। প্রত্যাবর্তন করতে থাকে আধ্যাত্মিকতার দিকে।

এবার তওবার প্রসংগে মুল আলোচনায় ফিরে আসি। তওবার মাধ্যমে আত্মার জাগরণ ঘটে থাকে। আর আত্মার এই জাগরণের প্রতি ইংগিত করে ইমাম বাকির (আ) বলেছেন, নিজ পাপ কর্মের জন্য যিনি তওবা বা আন্তরিক ভাবে অনুতাপ করেন, তিনি তারই মতো হয়ে যান যিনি কখনোই কোন পাপকর্ম করেন নি।
তওবার মাধ্যমে এ ভাবেই আমরা পরিশুদ্ধ হয়ে উঠি। তবে তার মানে এই নয় যে আমি কেবল মুখে বললাম তওবা করলাম আর অম্নি তা তওবা হয়ে গেল। মহান আল্লাহর দরবারে তওবা গৃহিত হওয়ার জন্য বেশ কিছু শর্ত পালন করতে হবে।
হজরত আলী(আ) বলেছেন, তওবা গৃহিত হওয়ার জন্য ছয়টি শর্ত পুরণ করতে হবে। প্রথমতঃ অতীতের পাপ কাজের জন্য অনুতাপ করতে হবে। দ্বিতীয়তঃ এই পাপ কর্মে আর কখনো লিপ্ত না হওয়ার প্রতিজ্ঞা করতে হবে। তৃতীয়তঃ পাপাচারের মাধ্যমে যাদের অধিকার বিনষ্ট করা হয়েছে তাদেরকে তা ফিরিয়ে দিতে হবে যেনো আল্লাহর দরবারে এমন ভাবে হাজির হতে পারি যে কেউ তার অধিকার নষ্ট করেছি বলে অভিযোগ করতে না পারে। চর্তুথতঃ পাপাচার করতে যেয়ে যে সব দায়িত্ব পালন করতে পারেনি এবারে সেগুলোর প্রতিটি পূর্ণ ভাবে পালন করতে হবে। পঞ্চম: অনুতাপ ও তওবা এমন ভাবে করতে হবে, পাপের মাধ্যমে দেহে যে গোশত সঞ্চিত হয়েছে তা যেনো বিদায় নেয়, দেহে কেবল হাড়-চামড়া ছাড়া আর কিছু অবশিষ্ট না থাকে। তারপর সে স্থানে নতুন গোশত যেনো জমা হতে থাকে। ষষ্ট: পাপাচারের সময় যে আনন্দলাভ করেছি এবার একই ভাবে দেহ যেনো এবাদত বা আনুগত্যের বেদনা অনুভব করে। আর যখন এই ছয়টি শর্ত সঠিক ভাবে পালন করা হবে কেবল তখনই বলতে পারবে আস্তাগেফেরুল্লাহ বা আমি আল্লাহর ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

একটু খেয়াল করলেই আমরা দেখতে পাবো এখানে তওবার জন্য দুইটি শর্ত অর্থাৎ অনুতাপ ও পাপ কাজে পুনরায় লিপ্ত না হওয়ার প্রতিজ্ঞা করা কথা বলা হয়েছে, একই ভাবে তওবা গৃহিত হওয়ার জন্য দুইটি শর্ত অর্থাৎ সৃস্টি এবং স্রষ্টার অধিকার ফিরিয়ে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। এরপর তওবা যেনো নিখুঁত হয় সে জন্য দু্ইটি শর্তারোপ করা হয়েছে। সব মিলিয়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে তওবা করা মোটেও সহজ নয়। বরং এটাকে এক হিসেবে আমরা বেশ খানিকটা কঠিন বলে মনে করতে পারি। বড় বা মারাত্মক পাপে জড়িয়ে পড়ার কারণে মানুষ তওবার কথা বেমালুম ভুলে যায়। আর এ ভাবে মানবাত্মার সুসজ্জিত বাগানে যদি পাপের বিষ বৃক্ষ লাগামহীন ভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে, তবে তার শেকড় অনেক গভীরে চলে যায়। সে সময় মারাত্মক পরিণতি দেখা দেয়। মানুষ ধীরে ধীরে নিজের অজান্তেই তওবার রাস্তা থেকে অনেক দূরে সরে যায়। তওবার কথা কখনো তার মনে ছায়াপাত করলেও তাতে আর সাড়া দেয়ার অবকাশ থাকে না। আজ নয় আগামিকাল বা বয়স হলে তওবা করব বলে যারা ভেবে থাকেন তারা আর তওবার অবকাশ পান না।

কাজেই যত দ্রুত তওবা করা যায় ততই মঙ্গল। এ জন্য যৌবন হচ্ছে তওবার শ্রেষ্ঠ সময়। সে সময় দেহের তারুণ্যের তেজ থাকে, পাপের সংখ্যা কম থাকে এবং আত্মা ঘন-ঘোর অন্ধকারে তলিয়ে যায় না বা আবৃত হয়ে পড়ে না। আর এ সময় তওবার সকল শর্ত পূরণ করা সম্ভব হয়। অন্যদিকে কোনো পাপাচার করার পরপরই তওবা করতে হবে। তওবা বান্দার প্রতি খোদার দেয়া এক অনবদ্য সুযোগ। যে কোনো মুল্যে এই সুযোগ ব্যবহার করা উচিত। এবং শয়তানের গোপন মন্ত্রণা বা ওয়াসওয়াসা থেকে দূরে সরে আসা উচিত।

ইমাম জয়নাল আবেদীন বলেছেন, হে আল্লাহ তুমি ক্ষমা করার জন্য একটি দরজা উন্মুক্ত করে দিয়েছো এবং এটাকে অনুতাপ হিসেবে আখ্যায়িত করে তুমিই বলেছো
'তোমরা আল্লাহ্ তা'আলার কাছে তওবা কর-আন্তরিক তওবা। আশা করা যায়, তোমাদের পালনকর্তা তোমাদের মন্দ কর্মসমূহ মোচন করে দেবেন...' আর এই দরজা খুলে দেয়ার পরও যে তাতে প্রবেশ করার আহবান সাড়া দিল না, তার জন্য বলার আর কিইবা বলার আছে ?
রমজানের শেষ প্রান্তে দাড়িয়ে তওবা নিয়ে যে আলোচনা হলো বুঝতে পারলাম যে পাপ-তাপে পরিপূর্ণ এই জীবনে তওবার বিকল্প কিছু নেই। মাগফেরাত অর্জন করতে চাইলে তাই আমাদের তওবা করতেই হবে। আমরা প্রত্যেকেই নিজেদের পাপাচারের জন্য তওবা করব, পাপাচারের পথ আর মাড়াব না, পাপাচারের মাধ্যমে সৃষ্টি ও স্রষ্টার যে অধিকার নষ্ট করেছি তা ফিরিয়ে দেব ।#

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন