এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শনিবার, 20 জুন 2015 10:48

রমজান: খোদা-প্রেমের অসীম সাগর (১-৩০)

রমজান: খোদা-প্রেমের অসীম সাগর (১-৩০)

(১)

আবারও ঘুরে এসেছে বছরের সেরা মাস রমজান। মহান আল্লাহর কাছে অশেষ কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি যে তিনি আমাদেরকে আরও একবার পবিত্র রমজান নামক তাঁর মহান রহমত, বরকত ও ক্ষমা তথা মাগফিরাতের এক অসীম মহাসাগরের তীরে উপস্থিত হওয়ার সৌভাগ্য দান করেছেন। পবিত্র রমজানের প্রেমময় এই মহাসাগরে ভ্রমণ এবং এই মহাসাগরের মনি-মুক্তা ও অন্য সব দামী সম্পদ আহরণের জন্য যোগ্যতা অর্জন জরুরি। ইহলোক ও পরলোক মিলে যে অসীম জীবন- রমজানেই তার পাথেয় সংগ্রহ করে নেয়ার এমন মহাসুযোগকে যাতে যথাযথভাবে কাজে লাগানো যায় সে জন্য জরুরি জ্ঞান ও সচেতনতা অর্জনে মহান আল্লাহর কাছেই তৌফিক কামনা করছি। 

 

রমজান ও চরম সৌভাগ্য সংক্রান্ত ইসলামী নানা বর্ণনা আর সেসবের ব্যাখ্যা থেকে আমরা যেন প্রকৃত শিক্ষা নিয়ে আত্ম-সংশোধন, আত্ম-গঠন, ও আত্ম-উন্নয়নের মাধ্যমে মহান আল্লাহর প্রিয়পাত্রে পরিণত হতে পারি সেটাই যেন হয় রমজানে আমাদের এ আলোচনাসহ অন্য সব তৎপরতার পরিণতি- হে পরম করুণাময়, এটাই আমাদের সব সময়ের ও বিশেষ করে এ সময়ের আকুল মিনতি।
পবিত্র রমজান মহান আল্লাহর প্রেমে বিভোর হওয়ার প্রশিক্ষণের মাস। প্রকৃত খোদা-প্রেমিক তার অন্তর থেকে দ্বিন-দুনিয়ার সব আশা ছেড়ে দিয়ে কেবলই আল্লাহর দিদার বা সাক্ষাতের জন্য ব্যাকুল হয়ে থাকেন। তাই প্রকৃত খোদা-প্রেমিকরা বেহেশতের আশায় বা দোযখের ভয়ে ইবাদত করেন না। রোজার প্রকৃত উদ্দেশ্যই হল এরকম গভীর খোদাপ্রেম অর্জন করা। যে প্রতিটি মুহূর্তে খোদার দিদার বা সাক্ষাত নিয়ে ব্যাকুল থাকে তার মনে কোনো ধরণের পার্থিব আশা ও পরকালীন সুখের লোভ তো দূরের কথা মহান আল্লাহর চিন্তা ছাড়া অন্য কোনো স্বার্থ বা শক্তির চিন্তাও মাথায় আসে না বলে তাদের মনে কোনো ভয়ও থাকে না।


রোজার বাহ্যিক লাভ হল, এর ফলে মানুষ গরীব-দুঃখী ও নিঃস্বদের দুঃখ-ব্যথা ভালোভাবে বুঝতে পারে। দরিদ্র ও ক্ষুধার্ত মানুষের বেদনা যখন মানুষ বুঝতে পারে তখন সে তার প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। 


রমজানের রমজ শব্দটির অর্থ হল দাহন। মানব জীবনে কুপ্রবৃত্তির বিনাশ বা দাহন জরুরি। আর এর ফলেই মানব সমাজে সংহতি, প্রেম ও একতা সৃষ্টি হয়। অন্যদিকে কুপ্রবৃত্তিগুলো মানুষকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন ও অসহায় করে মানব জীবনকে অন্ধকারের অতল তলে তলিয়ে দেয় এবং মানব জীবনের মহৎ উদ্দেশ্য সাধনকে অসম্ভব করে তুলে। কামপ্রবৃত্তির অসংযত চর্চা মানুষকে পশুত্বের স্তরে নামিয়ে দেয়। ক্রোধ মানুষকে করে জ্ঞানশূন্য। লোভ, মোহ, মদ ও মাৎসর্য সামাজিক জীবনে বিশৃঙ্খলা বয়ে আনে। এসবের চর্চা মানুষের আত্মাকে করে কলুষিত ও আত্মিক উন্নতিকে করে ব্যাহত। সোনা যেমন আগুনে পুড়ে খাঁটি হয় তেমনি রোজাও কুপ্রবৃত্তিগুলোকে পুড়িয়ে মানুষকে করে খাঁটি মানুষ। ফলে সে হতে পারে আল্লাহর প্রতিনিধি এবং মহান আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার যোগ্য বান্দা। আর আত্মিক উন্নতির মাধ্যমে সে পেতে পারে মহান আল্লাহর সাক্ষাত বা নৈকট্য।


রোজা বা সওম-এর অর্থ হল কোনো কিছু থেকে বিরত থাকা বা সংযম সাধনা। কুরআনের সুরা বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে সিয়াম (সওমের বহুবচন) সম্পর্কে বলা হয়েছে:
'হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরয করা হয়েছে, যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর, যেন তোমরা খোদাভীতি বা তাকওয়া অর্জন করতে পার।' (২:১৮৩)


পরের দুই আয়াতে এসেছে:
'রোজা কয়েকটি নির্দিষ্ট দিনের জন্য। অতঃপর তোমাদের মধ্যে যে, অসুস্থ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তার পক্ষে অন্য সময়ে সে রোজা পূরণ করে নিতে হবে। আর এটি যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্ট দায়ক হয়, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকিনকে খাদ্যদান করবে। যে ব্যক্তি খুশি-মনে সৎকর্ম করে, তা তার জন্য বেশি কল্যাণকর হয়। আর যদি রোজা রাখ, তবে তা-ই তোমাদের জন্যে বিশেষ কল্যাণকর, যদি তোমরা বুঝতে পার। রমযান মাসই হল সে মাস, যাতে নাযিল করা হয়েছে কোরআন, যা মানুষের জন্য হেদায়েত এবং সত্যপথ যাত্রীদের জন্য সুস্পষ্ট পথ নির্দেশ আর ন্যায় ও অন্যায়ের মাঝে পার্থক্য বিধানকারী। কাজেই তোমাদের মধ্যে যে লোক এ মাসটি পাবে, সে এ মাসের রোজা রাখবে। আর যে লোক অসুস্থ কিংবা মুসাফির অবস্থায় থাকবে সে অন্য দিনে গণনা পূরণ করবে। আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান; তোমাদের জন্য জটিলতা কামনা করেন না যাতে তোমরা গণনা পূরণ কর এবং তোমাদের হেদায়েত দান করার দরুন আল্লাহ তা’আলার মহত্ত্ব বর্ণনা কর, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর।'

 

সুরা বাকারার ১৮৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ রোজা প্রসঙ্গে আরও বলেছেন:
'রোজার রাতে তোমাদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস করা তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে। তারা তোমাদের পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের পরিচ্ছদ। আল্লাহ জানেন যে, তোমরা আত্নপ্রতারণা করছিলে, সুতরাং তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করেছেন এবং তোমাদের অব্যাহতি দিয়েছেন। অতঃপর তোমরা নিজেদের স্ত্রীদের সাথে সহবাস কর এবং যা কিছু তোমাদের জন্য আল্লাহ দান করেছেন, তা আহরণ কর। আর পানাহার কর যতক্ষণ না কাল রেখা থেকে ভোরের শুভ্র রেখা পরিষ্কার দেখা যায়। অতঃপর রোজা পূর্ণ কর রাত পর্যন্ত। আর যতক্ষণ তোমরা এতেকাফ অবস্থায় মসজিদে অবস্থান কর, ততক্ষণ পর্যন্ত স্ত্রীদের সাথে মিশো না। এই হলো আল্লাহর বেঁধে দেয়া সীমানা। অতএব, এর কাছেও যেও না। এমনিভাবে বর্ণনা করেন আল্লাহ নিজের নিদর্শনগুলো বা আয়াত মানুষের জন্য, যাতে তারা বাঁচতে পারে।'


এবারে পড়া যাক রমজানের প্রথম রোজার দোয়া ও তার অর্থ:



اليوم الاوّل : اَللّـهُمَّ اجْعَلْ صِيامي فيهِ صِيامَ الصّائِمينَ، وَقِيامي فيهِ قيامَ الْقائِمينَ، وَنَبِّهْني فيهِ عَنْ نَوْمَةِ الْغافِلينَ، وَهَبْ لى جُرْمي فيهِ يا اِلـهَ الْعالَمينَ، وَاعْفُ عَنّي يا عافِياً عَنْ الُْمجْرِمينَ .


হে আল্লাহ ! আমার আজকের রোজাকে প্রকৃত রোজাদারদের রোজা হিসেবে গ্রহণ কর। আমার নামাজকে কবুল কর প্রকৃত নামাজীদের নামাজ হিসেবে। আমাকে জাগিয়ে তোলো গাফিলতির ঘুম থেকে। হে জগত সমূহের প্রতিপালক! এদিনে আমার সব গুনাহ মাফ করে দাও। ক্ষমা করে দাও আমার যাবতীয় অপরাধ। হে অপরাধীদের অপরাধ ক্ষমাকারী। 

 

                                                                                    (২)

সিয়াম বা রোজা হচ্ছে সংযম সাধনা। সব ধরনের প্রবৃত্তি ও ইন্দ্রিয়কে সংযত ও সংযমী রাখার চেষ্টাই হচ্ছে সিয়াম সাধনা। মানুষের প্রবৃত্তি বা নফস বিদ্রোহী স্বভাবের। সীমালঙ্ঘনই এর স্বভাব। এই প্রবৃত্তি যে কোনো অজুহাতে ও সুযোগে বিবেককে বন্দি করে এমন সব কাজে লিপ্ত হতে মানুষকে বাধ্য করে যে তাতে জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য, নিয়ম-নীতি ও খোদায়ী নির্দেশ পদদলিত হয়। রোজার আসল উদ্দেশ্যকে সব সময় মনে রেখে চিন্তা-চেতনা, ইচ্ছা ও কাজে তার প্রভাব বিস্তার করতে না পারলে শুধু পানাহার থেকে ও জৈবিক চাহিদা মেটানো থেকে বিরত থেকে কোনো নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি লাভ করতে পারে না রোজাদার। এ জন্যই মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ ছাড়বে না, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। এমন অনেক রোজাদার আছে যারা ক্ষুধা ও পিপাসার কষ্ট ভোগ ছাড়া অন্য কিছুই অর্জন করে না।’

 

রমজান আসে রমজান যায়। কিন্তু অনেক মানুষ সংযম ও খোদা-প্রেম অর্জন করতে পারে না সারা জীবনেও। অন্যদিকে যারা ঈমানকে প্রতিটি মুহূর্তে টিকিয়ে রাখতে সংগ্রাম করে মনের ভেতরে ও বাহ্যিক কাজে এবং সংযমের চর্চা জোরদার করে রমজান মাসে তারা প্রকৃতপক্ষে সারা বছর ও পুরো জীবনভর রোজার সুফল ভোগ করে। কারণ, এ ধরনের মানুষ রমজানের পরও বাহ্যিক দৃষ্টিতে রোজা রাখুক বা না রাখুক রোজার উদ্দেশ্যকে সব সময় মনে রাখেন এবং সব সময় খোদা-প্রেম ও খোদা-ভীতির সীমানাগুলো মেনে চলার চেষ্টা করেন।

 


পবিত্র রমজান হচ্ছে খোদা-প্রেম, আত্ম-গঠন ও ইবাদত-বন্দেগির বসন্তকাল। পবিত্র কুরআন নাজিল হওয়ার এই মাস মহান আল্লাহর অশেষ রহমত বরকত ও মাগফিরাতের দরিয়ায় অবগাহনের মাস। এ মাস দোয়া এবং গভীর চিন্তা-ভাবনাসহ পবিত্র কুরআন তিলাওয়াতের সবচেয়ে মোক্ষম ঋতু।

 

 

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) পবিত্র রমজান মাসের প্রাক্কালে এই মাসের ও রোজার গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, 
“হে মানুষ! নিঃসন্দেহে তোমাদের সামনে রয়েছে আল্লাহর বরকতপূর্ণ মাস। এ মাস বরকত, রহমত বা অনুগ্রহ ও ক্ষমার মাস। এ মাস মহান আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ মাস। এ মাসের দিনগুলো সবচেয়ে সেরা দিন, এর রাতগুলো শ্রেষ্ঠ রাত এবং এর ঘণ্টাগুলো শ্রেষ্ঠ ঘণ্টা। এ মাস এমন এক মাস যে মাসে তোমরা আমন্ত্রিত হয়েছ আল্লাহর মেহমান হতে তথা রোজা রাখতে ও প্রার্থনা করতে। তিনি তোমাদেরকে এ মাসের ভেতরে সম্মানিত করেছেন। এ মাসে তোমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস মহান আল্লাহর গুণগান করার বা জিকরের (সওয়াবের) সমতুল্য; এ মাসে তোমাদের ঘুম প্রার্থনার সমতুল্য, এ মাসে তোমাদের সৎকাজ এবং দোয়াগুলো কবুল করা হবে। তাই মহান আল্লাহর কাছে আন্তরিক ও (পাপ ও কলুষতামুক্ত) পবিত্র চিত্তে প্রার্থনা করো যে তিনি যেন তোমাদেরকে রোজা রাখার এবং কুরআন তিলাওয়াতের তৌফিক দান করেন।" 

 

 

মহানবী (সা.) আরও বলেছেন, 

"নিঃসন্দেহে সে ব্যক্তি প্রকৃতই হতভাগ্য যে রমজান মাস পেয়েও মহান আল্লাহর ক্ষমা হতে বঞ্চিত হয়। এ মাসে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মাধ্যমে শেষ বিচার দিবসের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কথা স্মরণ কর। অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্রদেরকে সাহায্য কর ও সদকা দাও। বয়স্ক ও বৃদ্ধদের সম্মান কর এবং শিশু ও ছোটদের আদর কর। (রক্তের সম্পর্কের) আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগ রক্ষা কর। তোমাদের জিহ্বাকে অন্যায্য বা অনুপযোগী কথা বলা থেকে সংযত রাখ, নিষিদ্ধ দৃশ্য দেখা থেকে চোখকে ঢেকে রাখ, যেসব কথা শোনা ঠিক নয় সেসব শোনা থেকে কানকে নিবৃত রাখ। ইয়াতিমদেরকে দয়া কর যাতে তোমার সন্তানরা যদি ইয়াতিম হয় তাহলে তারাও যেন দয়া পায়।

 


গোনাহর জন্যে অনুতপ্ত হও ও তওবা কর এবং নামাজের সময় মোনাজাতের জন্যে হাত উপরে তোলো, কারণ নামাজের সময় দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়, এ সময় মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকান, এ সময় কেউ তাঁর কাছে কিছু চাইলে তিনি তা দান করেন, কেউ তাঁকে ডাকলে তিনি জবাব দেন, কেউ কাকুতি-মিনতি করলে তা তিনি গ্রহণ করেন।"

 


রমজানের গুরুত্ব প্রসঙ্গে বিশ্বনবী (সা.) আরও বলেছেন, "হে মানুষ! তোমরা তোমাদের বিবেককে নিজ কামনা-বাসনার দাসে পরিণত করেছো, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে একে মুক্ত করো। তোমাদের পিঠ গোনাহর ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে আছে, তাই সিজদাগুলোকে দীর্ঘ করে পিঠকে হালকা করো। জেনে রাখ, মহান আল্লাহ নিজ সম্মানের শপথ করে বলেছেন, রমজান মাসে নামাজ আদায়কারী ও সিজদাকারীদেরকে জবাবদিহিতার জন্য পাকড়াও করবেন না এবং কিয়ামতের দিন তাদেরকে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। হে মানুষেরা! তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোনো মুমিনের জন্য ইফতারের (দিনের রোজা শেষে যে খাদ্য গ্রহণ করা হয়) আয়োজন করে তাহলে আল্লাহ তাকে একজন গোলামকে মুক্ত করার সওয়াব দান করবেন এবং তার অতীতের সব গোনাহ মাফ করবেন।" বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র সাহাবিরা প্রশ্ন করলেন: কিন্তু আমাদের মধ্যে সবাই অন্যদেরকে ইফতার দেয়ার সামর্থ্য রাখেন না। বিশ্বনবী (সা.) বললেন: তোমরা নিজেদেরকে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা কর, যদিও তা সম্ভব হয় একটি মাত্র খুরমার অর্ধেক অংশ কিংবা তাও যদি না থাকে তাহলে সামান্য পানি অন্য রোজাদারকে ইফতার হিসেবে আপ্যায়নের মাধ্যমে।"

 

এবারে পড়া যাক অর্থসহ দ্বিতীয় রমজানের দোয়া: 

 


اليوم الثّاني : اَللّـهُمَّ قَرِّبْني فيهِ اِلى مَرْضاتِكَ، وَجَنِّبْني فيهِ مِنْ سَخَطِكَ وَنَقِماتِكَ، وَوَفِّقْني فيهِ لِقِرآءَةِ ايـاتِكَ بِرَحْمَتِكَ يا اَرْحَمَ الرّاحِمينَ . 


হে আল্লাহ! তোমার রহমতের উসিলায় আজ আমাকে তোমার সন্তুষ্টির কাছাকাছি নিয়ে যাও। দূরে সরিয়ে দাও তোমার ক্রোধ আর গজব থেকে । আমাকে তৌফিক দাও তোমার পবিত্র কোরআনের আয়াত তেলাওয়াত করার । হে দয়াবানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়াময়। 

 

 (৩)

গত পর্বের আলোচনায় আমরা পবিত্র রমজানের রোজার গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্বনবী (সা.)'র একটি বিখ্যাত ভাষণের কিছু অংশ তুলে ধরেছিলাম। ওই একই ভাষণে মহানবী (সা.) বলেছেন,


'হে মানুষেরা! যে কেউ এই মাসে সৎ আচরণের চর্চা করবে তথা নিজেকে সুন্দর আচরণকারী হিসেবে গড়ে তুলবে সে পুলসিরাত পার হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করবে সেই বিশেষ দিনটিতে তথা কিয়ামতের দিন যেদিন পাগুলো পিছলে যেতে চাইবে। যে কেউ এই মাসে তার অধীনস্থ কর্মীদের কাজের বোঝা কমিয়ে দেবে আল্লাহ পরকালে তার হিসাব-নিকাশ সহজ করবেন এবং যে কেউ এই মাসে অন্যকে বিরক্ত করবে না মহান আল্লাহ তাকে কিয়ামত বা বিচার-দিবসের দিন নিজের ক্রোধ হতে নিরাপদ রাখবেন। যে কেউ কোনো রমজান মাসে কোনো এক ইয়াতিমকে সম্মান করবে ও তার সঙ্গে দয়ার্দ্র আচরণ করবে মহান আল্লাহও বিচার-দিবসে তার প্রতি দয়ার দৃষ্টি দেবেন। যে এই মাসে নিজের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে ভালো আচরণ করবে, মহান আল্লাহও বিচার-দিবসে তার প্রতি দয়া করবেন, আর যে এই মাসে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে খারাপ আচরণ করবে আল্লাহও তাকে নিজ রহমত থেকে দূরে রাখবেন।' 


বিশ্বনবী (সা.) রমজান প্রসঙ্গে আরও বলেছেন, '


''যে রমজান মাসে (এ মাসের জন্য) নির্দেশিত বা নির্দিষ্ট ইবাদতগুলো করবে আল্লাহ তাকে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। যে এই মাসে ফরজ বা অবশ্য পালনীয় ইবাদত বা দায়িত্বগুলো পালন করবে তাকে অন্য মাসে ওই একই কাজের পুরস্কারের চেয়ে সাতগুণ বেশি পুরস্কার দেয়া হবে। যে রমজান মাসে আমার ওপর সালাওয়াত বা দরুদ পাঠাবে আল্লাহ বিচার দিবসে তার ভাল কাজের পাল্লা ভারী করে দেবেন, অথচ অন্যদের পাল্লা হাল্কা থাকবে। 


যে এই মাসে পবিত্র কুরআনের মাত্র এক আয়াত তিলাওয়াত করবে আল্লাহ তাকে এর বিনিময়ে এত সওয়াব দেবেন যে তা অন্য মাসে পুরো কুরআন তিলাওয়াতের সমান হবে।

  

হে মানুষেরা! বেহেশতের দরজাগুলো এই মাসে তোমাদের জন্য খোলা থাকবে। আল্লাহর কাছে এমনভাবে প্রার্থনা কর যাতে তা তোমার জন্য বন্ধ হয়ে না যায়। রমজান মাসে দোযখের দরজাগুলো বন্ধ রয়েছে, আল্লাহর কাছে এমনভাবে প্রার্থনা কর যাতে তা তোমার জন্য কখনও খুলে না যায়। এই মাসে শয়তানগুলোকে হাতকড়া পরিয়ে বন্দী রাখা হয়েছে, আল্লাহর কাছে এমনভাবে প্রার্থনা কর যাতে তারা তোমাদের ওপর কর্তৃত্ব করতে না পারে।"


এ পর্যায়ে আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)বললেন : আমি প্রশ্ন করলাম, " হে আল্লাহর রাসূল (সা.), এই মাসে সবচেয়ে ভাল কাজ কী?" 
তিনি জবাবে বললেন, " হে আবুল হাসান, এই মাসে সবচেয়ে ভাল কাজ হল আল্লাহ যা যা নিষিদ্ধ করেছেন তা থেকে দূরে থাকা।"

 

 

বিশ্বনবী (সা.)'র রমজান সংক্রান্ত ভাষণ থেকে আমরা জানতে পারছি যে এই মাসে সবচেয়ে ভালো কাজ হল নিষিদ্ধ কাজ থেকে দূরে থাকা।  

আমরা নিষিদ্ধ কাজ করি দুই কারণে। প্রথমতঃ নিষিদ্ধ কাজ কী কী তা জানা নেই ভালোভাবে। দ্বিতীয়তঃ জানা থাকা সত্ত্বেও মহান আল্লাহর প্রতি ভয়, প্রেম ও লজ্জা না থাকার কারণে। অর্থাৎ কখনও কখনও আমরা জেনে-শুনেও নিষিদ্ধ কাজ করি। শয়তান অনেক সময় নানা কুযুক্তি তুলে ধরে আমাদের মনে যাতে আমরা নিষিদ্ধ কাজ বা পাপে জড়িত হই। যেমন, শয়তান এ কথা বলে যে, আরে তুমি তো অনেক ভালো কাজ কর!- তাই দু-একটা খারাপ কাজ করলে এতে তেমন কোনো ক্ষতি হবে না! অথবা, আপাতত জরুরি প্রয়োজন বলে এই খারাপ কাজটি কর, পরে ক্ষমা চেয়ে নিবে আল্লাহর কাছে বা যার ক্ষতি করছি সে ভালো মানুষ বলে তার কাছে পরে ক্ষমা আদায় করা যাবে! কিংবা শয়তান এ কুমন্ত্রণা দেয় যে, আরে এটাতো খুবই ক্ষুদ্র বা ছোটোখাটো পাপ! অথবা আল্লাহ ছাড়া আপাতত অন্য কেউ তো তোমার এ পাপ কাজটি লক্ষ্য করছেন না ইত্যাদি। আসলে এইসব কুযুক্তি বা কুমন্ত্রণা আমাদের ওপর জোরালো হয় ঈমানের দুর্বলতার কারণে এবং খোদা-ভীতি ও আল্লাহর ব্যাপারে যথেষ্ট মাত্রায় লজ্জা না থাকার কারণে। 

 

আমরা অনেক সময় ৪-৫ বছর বয়সের কোনো শিশুর সামনেও কোনো অন্যায় বা মন্দ কাজ করতে লজ্জা পাই কিংবা ভয় পাই এ কারণে যে এই শিশুটা কী ভাববে অথবা সমাজের বয়স্ক ব্যক্তিদের কাছে আমার মন্দ কাজটির কথা হয়তো বলে দেবে! অথচ মহান আল্লাহ আমাদের সব কাজের খবর রাখছেন ও আমাদের দেখছেন বলে জানা সত্ত্বেও মহান আল্লাহকে আমরা ভয়ও করি না বা লজ্জাও পাই না তাঁকে! অর্থাৎ আল্লাহকে আমরা পাপ করার সময় শিশুর চেয়েও কম গুরুত্ব দিচ্ছি। আমাদের মনে রাখা উচিত পাপ যত ছোটোই মনে হোক না কেন তা-ও আল্লাহ দেখছেন এবং আল্লাহর সামনেই তা করা হচ্ছে।

 

তাই বলা হয় কোনো পাপকে ক্ষুদ্র মনে করা হলে তা আল্লাহর দরবারে বড় পাপ হিসেবেই ধরা হয়। আমরা কি কেউ অতি অল্প পরিমাণ মল-মুত্রও খেতে রাজি হব, কিংবা তীব্র ক্ষমতা-সম্পন্ন বিষ অল্প পরিমাণেও খেতে রাজি হব? সামান্য আগুন যেমন বিশাল খড়ের পাহাড় বা বনকে জ্বালিয়ে দেয়, তেমনি সামান্য পাপও পুরো ঈমানকে বরবাদ করে দিতে পারে। কারণ, যে মুহূর্তে মানুষ পাপ করে সেই মুহূর্তের জন্য মানুষ এক ধরনের কুফরিতে লিপ্ত হয়। পরবর্তীতে এই কুফরি বাড়তেই থাকে মনের দিক থেকে বাধা না পাওয়ার কারণে। 

 

 

এবারে পড়া যাক, অর্থসহ তৃতীয় রমজানের দোয়া।

 


اليوم الثّالث : اَللّـهُمَّ ارْزُقْني فيهِ الذِّهْنَ وَالتَّنْبيهَ، وَباعِدْني فيهِ مِنَ السَّفاهَةِ وَالَّتمْويهِ، وَاجْعَلْ لى نَصيباً مِنْ كُلِّ خَيْر تُنْزِلُ فيهِ، بِجُودِكَ يا اَجْوَدَ الاَْجْوَدينَ .
হে আল্লাহ ! আজকের দিনে আমাকে সচেতনতা ও বিচক্ষণতা দান কর। আমাকে দূরে রাখ অজ্ঞতা , নির্বুদ্ধিতা ও ভ্রান্ত কাজ-কর্ম থেকে। এ দিনে যত ধরণের কল্যাণ দান করবে তার প্রত্যেকটি থেকে তোমার দয়ার উসিলায় আমাকে উপকৃত কর। হে দানশীলদের মধ্যে সর্বোত্তম দানশীল। 

 

(৪)

 

 

গত পর্বের আলোচনায় আমরা পাপ কাজের পক্ষে শয়তানের কুমন্ত্রণা সম্পর্কে কথা বলছিলাম। আমরা বলছিলাম যে, কোনো পাপকে দৃশ্যত ছোট মনে হলেও তা মনে করা উচিত নয়। কারণ, তা আল্লাহ দেখছেন। কেউ যদি ১ টাকা চুরি করে সেও আল্লাহর দৃষ্টিতে চোর এবং কেউ যদি দশ লাখ টাকা চুরি করে সেও আল্লাহর দৃষ্টিতে চোর। তাই পাপকে ছোটো মনে করা হচ্ছে বড় পাপ। একটি বিশাল দুধের পাত্রে মাত্র এক ফোটা গো-মূত্র বা এ জাতীয় নাপাক কিছু পড়লে সেই বিশাল পাত্রের পুরো দুধই অপবিত্র হয়ে যায়। 


অনেক মানুষ মহান আল্লাহ মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বকে সব সময় হৃদয় দিয়ে অনুভব করে না বলে পাপে জড়িয়ে পড়ে। আমরা নামাজ পড়ার সময় বলছি আল্লাহু আকবার বা আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। অথচ নামাজ পড়ার পরই আবারও পাপে জড়িত হই! অর্থাৎ আল্লাহকে সর্বশ্রেষ্ঠ বলে মুখে স্বীকার করা সত্ত্বেও কাজের বেলায় তার শ্রেষ্ঠত্বকে মানার পরীক্ষায় ফেল করছি। রমজানের রোজা এ ধরনের পরীক্ষায় ফেলের মাত্রা কমিয়ে আনতে সহায়তা করে কুপ্রবৃত্তিকে দমানোর অনুশীলনের মাধ্যমে। ঈমান তো কেবল মৌখিক স্বীকৃতি নয়। কাজেও তা প্রমাণ করতে হয়। তাই সবক্ষেত্রে মহান আল্লাহর আদেশকে শিরোধার্য করতে হবে।

 

মুসলমানরা পবিত্র কুরআনের আলোকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-কে জীবনের সবক্ষেত্রে সর্বোত্তম আদর্শ বলে স্বীকার করে নিলেও বাস্তব জীবনে আমাদের অনেকেই পাশ্চাত্যের নানা দর্শন ও সমাজ-ব্যবস্থাকে জীবনের কোনো কোনো ক্ষেত্রে আদর্শ বলে গ্রহণ করছি। পশ্চিমা পুঁজিবাদ, কথিত উদার গণতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ মতাদর্শ বা সমাজতন্ত্রের মত ত্রুটিপূর্ণ জীবনাদর্শকে মুসলিম প্রধান দেশেও রাষ্ট্রীয় আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন অনেকেই। তাহলে এই ব্যক্তিরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে জীবনের সবক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ বলে মানছেন কি? এভাবে প্রতিটি মুহূর্তে আমরা নানা পরীক্ষায় কখনও জ্ঞানের অভাবে বা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালভাবে চেনা-জানার অভাবে এবং কখনওবা শয়তানের কুমন্ত্রণার কাছে পরাস্ত হওয়ার কারণে ও কখনওবা কুপ্রবৃত্তিকে দমনের অভ্যাস না থাকার কারণে নানা ধরনের পাপে জড়িত হচ্ছি। কখনওবা ব্যক্তিগতভাবে, কখনওবা পারিবারিকভাবে ও কখনওবা সামাজিকভাবে পাপে জড়িত হচ্ছি আমরা। পাপের অনেক ধরন রয়েছে। তার মধ্যে সাংস্কৃতিক পাপও কম ভয়ানক নয়। যে চলচ্চিত্র, যে বই বা যে কার্টুন ও গেইম নিজের জন্য এবং শিশু-কিশোরদের জন্য ক্ষতিকর তা আমরা এড়িয়ে চলছি না সচেতনতার অভাবে। 

 

ধর্মীয় ক্ষেত্রেও পাপ করা হয় নানা পন্থায়। রিয়া বা লোক-দেখানো ইবাদত, নিজেকে বড় আবেদ বা ইবাদতকারী ভাবা তথা অহংকারের ফাঁদে পড়া, ভুল-চিন্তাধারাকে ইসলামী চিন্তাধারা বলে মনে করা এসবও বড় ধরনের পাপ। এইসব পাপেরও একটা বড় কারণ হল, অজ্ঞতা তথা মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে (সা.) ভালোভাবে না চেনা। অজ্ঞতা দূর করার জন্য জ্ঞান-অর্জন জরুরি তথা ফরজ। মানুষের ইবাদতের মূল্য নির্ভর করে ধর্মীয় জ্ঞানের গভীরতার ওপর। একজন মূর্খের বহু বছরের ইবাদত একজন জ্ঞানীর কয়েক মুহূর্তের জ্ঞান-চর্চা ও জ্ঞানগত চিন্তার চেয়েও কম মূল্যবান। মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালভাবে চিনতে হলে দ্বারস্থ হতে হবে পবিত্র কুরআন এবং বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের কাছে। নির্ভরযোগ্য নানা হাদিসে এসেছে যে, মহানবী (সা.) বলেছেন, আমি তোমাদের কাছে দুটি ভারি বস্তু রেখে যাচ্ছি, তোমরা যদি এ দুটি বস্তু আঁকড়ে ধর তাহলে কখনও বিভ্রান্ত হবে না।

 

বিশ্বনবী (সা.) তাঁর পবিত্র আহলে বাইতকে নুহ নবীর (আ.) কিশতির সাথেও তুলনা করেছেন। মুসলমানদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও তাঁর মহান রাসূলের (সা.) পর আহলে বাইতের শ্রেষ্ঠত্বের বিষয়টি উপলব্ধি করেনি তারাই বিভ্রান্ত হয়েছে। যারা অজ্ঞতার কারণে ভুল করছেন তাদেরকে হয়তো আল্লাহ ক্ষমা করবেন। কিন্তু যারা জেনে-শুনে আহলে বাইতকে এড়িয়ে গেছেন তাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। মহানবীর (সা.) আহলে বাইতের মর্যাদা মুসলমানদের কাছে ভালোভাবে তুলে ধরা হয়নি বলেই বিভ্রান্ত মুসলমানদের হাতে এতো নির্মমভাবে শহীদ হতে হয়েছিল হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)সহ কারবালার বীর শহীদদেরকে। ধর্মান্ধ খারিজিরা হযরত আলী (আ.)'র বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল অজ্ঞতার কারণে। তারা আলী (আ.)-কে কাফির বলেছিল! আর একদল জ্ঞানপাপী আলী (আ.)'র সেনাদেরকে ধোঁকা দেয়ার জন্য কুরআনকে বর্শার আগায় তুলে ধরেছিল। তাদেরই ষড়যন্ত্রে বিষ-প্রয়োগে হত্যা করা হয়েছিল ইমাম হাসান (আ.)-কে।

 

বনি-উমাইয়ার আহলে-বাইত-বিদ্বেষী প্রচারণার কারণে সিরিয়ার জনগণ এতই বিভ্রান্ত হয়েছিল যে আমিরুল মু'মিনিন আলী (আ.) যখন কুফার মসজিদে নামাজ পড়ারত অবস্থায় ঘাতকের হামলার শিকার হন এবং ওই আঘাতের কারণে দুদিন পর শহীদ হন তখন সিরিয়ার বিভ্রান্ত মুসলমানরা বিস্মিত হয়ে বলেছিল, আলী মসজিদে কেনো গিয়েছিল?!! সে কি নামাজ পড়তো নাকি?!!! বনি-উমাইয়ার শাসকরা দশকের পর দশক ধরে হযরত আলী (আ.) ও নবী-বংশকে গালি দিয়েছিল জুমআর খুতবায়। বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের ভাষায়: 

 

এই ধূর্ত ও ভোগীরাই তলোয়ারে বেঁধে কোরআন,

আলী'র সেনারে করেছে সদাই বিব্রত পেরেশান !
এই এজিদের সেনাদল শয়তানের প্ররোচনায় 
হাসানে হোসেনে গালি দিতে যেত মক্কা ও মদিনায়।

 


তাই প্রকৃত ইসলামী চিন্তাধারাগুলোকে ভালোভাবে জানার জন্য ও বোঝার জন্য ইসলামের সঠিক ইতিহাস এবং বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতকেও জানতে হবে পবিত্র কুরআন ও হাদিসের জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি। 

 

এবারে পড়া যাক অর্থসহ রমজানের চতুর্থ রোজার দোয়া:

 

 اليوم الرّابع : اَللّـهُمَّ قَوِّني فيهِ عَلى اِقامَةِ اَمْرِكَ، وَاَذِقْني فيهِ حَلاوَةَ ذِكْرِكَ، وَاَوْزِعْني فيهِ لاَِداءِ شُكْرِكَ بِكَرَمِكَ، وَاحْفَظْني فيهِ بِحِفْظِكَ وَسَتْرِكَ، يا اَبْصَرَ النّاظِرينَ .

হে আল্লাহ ! এ দিনে আমাকে তোমার নির্দেশ পালনের শক্তি দাও। তোমার জিকিরের মাধুর্য আমাকে আস্বাদন করাও। তোমার অপার করুণার মাধ্যমে আমাকে তোমার কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনের জন্য প্রস্তুত কর । হে দৃষ্টিমানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দৃষ্টিমান। আমাকে এ দিনে তোমারই আশ্রয় ও হেফাজতে রক্ষা কর। 

                                                                                       (৫)

 

পবিত্র রমজানে পাপ ও ভুল পথ আর ভুল চিন্তা থেকে দূরে থাকার জন্য জ্ঞান চর্চার গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম সম্পর্কে সঠিক জ্ঞানের অভাবেই বর্তমান যুগেও ইসলামের শত্রুদের কারসাজিতে গড়ে উঠেছে সেই অতীতের খারিজি এবং ইয়াজিদি গোষ্ঠীর মতই চরম বিভ্রান্ত, ধর্মান্ধ ও চরম হিংস্র বা মনুষ্যত্বহীন নানা গোষ্ঠী। একদল সরলমনা মুসলমান এইসব জঙ্গি গোষ্ঠীকে সমর্থন করে ভাবছেন যে তারা ইসলামেরই সেবা করছেন! ইসলামের এ জাতীয় বোকা বন্ধুরা ইসলাম ও মুসলমানদের যত ক্ষতি করেছে, ইসলামের প্রকাশ্য শত্রুরাও ততটা ক্ষতি করতে পারেনি।

 


যুগে যুগে মহান নবী-রাসূল এবং তাঁদের যোগ্য উত্তরসূরির মিশনই ছিল মানুষকে প্রকৃত মানুষে পরিণত করা ও মহান আল্লাহর যোগ্য প্রতিনিধি হিসেবে তাদেরকে গড়ে তোলা। বিবেক আর জ্ঞানের বাতি জ্বালিয়ে তারা মানুষকে দেখাতে চেয়েছেন সুপথ। মানুষ যখন পুরোপুরি বিবেকের দাস হতে পারে কেবল তখনই হতে পারে সে প্রকৃত মানুষ এবং পাশবিক নানা আমিত্বের দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে সে কেবল তখনই হতে পারে মহান আল্লাহর খলিফা যে জন্য আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন। রোজা মানুষকে আল্লাহর পরিপূর্ণ দাস ও খলিফা বা প্রতিনিধি হওয়ার শিক্ষা দেয়।


একজন পরিপূর্ণ দাস মহান আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এবং আল্লাহর বিধানকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নিজের সব কিছুকে কুরবানি করতে পারেন। আর রোজা হচ্ছে সেই কুরবানির প্রশিক্ষণ নেয়ার অন্যতম মাধ্যম। প্রকৃত নামাজ ও প্রকৃত রোজার প্রভাব প্রমাণিত হয় আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারের সময়। ইব্রাহিম (আ.) হাসিমুখে নমরুদের জ্বালানো বিশাল অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করতে দ্বিধা বোধ করেননি নামাজ ও রোজার প্রভাবের কারণেই। সর্বোত্তম রোজাদার ও সর্বোত্তম নামাজি ছিলেন বলেই বিশ্বনবী (সা.) বলেছিলেন, আমার এক হাতে যদি সূর্য আর অন্য হাতে যদি চাঁদ এনে দাও তবুও আমি সত্য প্রচার করা থেকে বিরত হব না। তাঁরা মহান আল্লাহকেই প্রকৃত অর্থেই সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বশক্তিমান মনে করতেন এবং আল্লাহর নির্দেশকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন। তাই তাঁদের কোনো ভয় ও দুঃখ ছিল না। একই কারণে আমিরুল মু'মিনিন আলী (আ.) বলেছিলেন, শিশুর কাছে মাতৃস্তন যতটা প্রিয় শাহাদত আমার কাছে তার চেয়েও বেশি প্রিয়।

 

একইভাবে যারা কারবালায় ইসলামের জন্য হাসিমুখে জীবন বিসর্জন দিয়েছিলেন তারা ছিলেন মানব-ইতিহাসের শীর্ষস্থানীয় রোজাদার ও নামাজি। কারবালায় শহীদ হওয়ার জন্য তাঁরা প্রতিযোগিতায় নেমেছিলেন এবং এ জন্য ইমামের একদল অনুসারী এতটাই ব্যাকুল ও আত্মহারা হয়েছিলেন যে তারা ইমামের দেখানো পথে হাজার বার নিহত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করেছিলেন! অন্যদিকে আলী (আ.)' বিরোধী খারিজিরাও রাত জেগে নফল নামাজ পড়তো, কুরআন পাঠ করতো এবং রোজাও রাখত! ইয়াজিদ বাহিনীর বেশিরভাগ সেনাও ছিল নামাজি ও রোজাদার! অথচ তাদের কুরআন-পাঠ এবং নামাজ-রোজায় প্রকৃত ইসলামের প্রাণ-সত্তার সামান্য ছোঁয়াও ছিল না! কারণ, তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে ভালোভাবে চিনতে পারেনি। ফলে তারা প্রকৃত শিক্ষকদেরকে শিক্ষক হিসেবে মেনে নেয়নি। পরিণতিতে আল্লাহ ও বিশ্বনবী (সা.) এবং তাঁর পবিত্র আহলে বাইত তাদের কাছে গুরুত্ব পায়নি। তারা নামাজ ও রোজার মাধ্যমে হয় কেবলই অভিনয় করেছে অথবা মুর্খতার কারণে কাঁচকে হিরা মনে করেছে, আর আসল হিরাকে ভেবেছে কাঁচ। মোট কথা আল্লাহু আকবার বা আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ- এ কথা কেবল মুখে মুখে বললেই হবে না, প্রতিটি মুহূর্তে নানা পরীক্ষায় তা প্রমাণ করতে হবে। 

 

আমরা মহান আল্লাহকে সব কিছুর চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেই না বলেই পাপের শিকার হই। এ প্রসঙ্গে একটি কাহিনী রয়েছে। একবার এক ভিক্ষুক পথে এক মহিলার কাছে ভিক্ষা চাইতে গেলো। মহিলার ব্যাগে ছিল টাকা-পয়সা ও দামী হীরা-জহরত । ভিক্ষুক সেসব দেখে বললো: ওই যে পাথরটা দেখা যাচ্ছে, আমাকে কি সেটা দেবেন? মহিলা বললেন: কেনো দেয়া যাবে না?! নিন এই পাথরটাই নিন।

 


বিস্মিত ভিক্ষুক পাথরটা হাতে পেয়েই দৌড় দিয়ে বহু দূরে চলে যায়। কারণ, সে ভাবছিল যে মহিলা হয়তো ভুল করে এতো দামী পাথরটা দিয়েছেন, তাই হয়তো আফসোস করবেন এবং আবার পাথরটা ফেরত চাইবেন। ভিক্ষুক ওই মহামূল্যবান পাথরটা নিয়ে গেলো জহুরির দোকানে। জহুরি বলল: এতো দেখছি খুবই দামী পাথর। ওটার যে দাম তা দিয়ে তোমার পরবর্তী ১৪ পুরুষের আর কিছুই করা লাগবে না।

 

জহুরি বেশ চড়া দামে পাথরটি কিনতে চাইলেও ভিক্ষুক কি যেন ভেবে তা ফেরত নিয়ে সেই দানশীলা মহিলাকে খুঁজে বের করে। ভিক্ষুক তাকে প্রশ্ন করে: আপনি এই মহামূল্যবান পাথরটা আমায় দান করে কি দুঃখিত নন? মহিলা হেসে বললেন: না, মোটেই দুঃখিত নই।

 


ভিক্ষুক বলল: আপনি কিভাবে এমন উদার মনের অধিকারী হয়েছেন- তা জানতে চাই? আপনার এই মনটাইতো অনেক বেশি দামী। আমিও এমন মনই অর্জন করতে চাই। এই পাথর আর চাই না। নিন, আপনার পাথর ফেরত নিন। মহিলা পাথর ফেরত না নিয়েই অশ্রুসজল চোখে বললেন: দেখুন, আমি এ বিশ্ব-জগতে আল্লাহকেই সবচেয়ে বড় ও সবচেয়ে দামী মনে করি। তাই অন্য কোনো কিছু পেয়ে বা হারিয়ে আমি কখনও দুঃখিত বা আনন্দিত হই না। সবকিছুর মালিক তো তিনিই। তিনি ছাড়া অন্য সব কিছুই আমার কাছে খুবই তুচ্ছ বা মূল্যহীন।

 

এবারে পড়া যাক অর্থসহ পঞ্চম রোজার দোয়া: 

 


اليوم الخامس : اَللّـهُمَّ اجْعَلْني فيهِ مِنْ الْمُسْتَغْفِرينَ، وَاجْعَلْني فيهِ مِنْ عِبادِكَ الصّالِحينَ اْلقانِتينَ، وَاجْعَلني فيهِ مِنْ اَوْلِيائِكَ الْمُقَرَّبينَ، بِرَأْفَتِكَ يا اَرْحَمَ الرّاحِمينَ .
হে আল্লাহ ! এই দিনে আমাকে ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের অন্তর্ভূক্ত কর। আমাকে শামিল কর তোমার সৎ ও অনুগত বান্দাদের কাতারে । হে আল্লাহ ! মেহেরবানী করে আমাকে তোমার নৈকট্যলাভকারী বন্ধু হিসেবে গ্রহণ কর। হে দয়াবানদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ দয়াবান ।

 

 

(৬)

বিশ্বনবী (সা.)'র মতে রমজানের সবচেয়ে বড় আমল হল পাপ থেকে দূরে থাকা। আসলে কেবল রমজানে নয় সারা বছরই পাপ থেকে দূরে থাকতে পারাটা এক বিশাল বা অসাধারণ সাফল্য। রমজানে মানুষ সংযমের চর্চা করে বলে এই মাসে পাপ থেকে দূরে থাকার প্রশিক্ষণ নেয়া সহজ হয় এবং এরই ভিত্তিতে সারা বছর ও সারা জীবন পাপ থেকে দূরে থাকা সম্ভব হয়। 

 

পাপের একটি বড় কারণ হল অজ্ঞতা। তাই অজ্ঞতা দূর করার জন্য জ্ঞান অর্জন জরুরি। গোনাহ'র রয়েছে নানা ধরন। ব্যক্তিগত পাপের চেয়ে সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও পারিবারিক পর্যায়ের পাপ বেশি মারাত্মক। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পাপ ও কুপ্রথা চালু করা হলে তার প্রভাব হয় অনেক সুদূর-প্রসারী। কোনো কোনো পাপ এমন যে তার প্রভাব হাজার হাজার বছর ধরে অব্যাহত থাকে। যেমন, ইহুদি ও খ্রিস্ট ধর্ম এক সময় একটি ঐশী তথা সত্য ধর্ম হওয়া সত্ত্বেও একদল জ্ঞানপাপী এই ধর্ম দু'টির মধ্যে এমন বিকৃতি এনেছে যে হাজার হাজার বছর ধরে শত শত কোটি মানুষ সেই বিচ্যুতি হতে মুক্ত হতে পারছে না। এ ধরনের পাপের হোতা ওই জ্ঞানপাপীরা ছিল মূলত শয়তানেরই শাগরেদ। তারা প্রকৃত ধর্মীয় নেতাদের আসন দখল করেছিল ছলে-বলে কৌশলে।


ধর্মীয় ও সামাজিক ক্ষেত্র এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে যোগ্য নেতা নির্বাচন করতে ব্যর্থ হলে জনগণকে সেই পাপের দায় ও কুফল বহন করতে হয় যুগ যুগ ধরে কিংবা শত শত ও এমনকি হাজার হাজার বছর ধরে। তাই যোগ্য নেতা ও সৎ আর ধার্মিক বন্ধু নির্বাচন পাপ থেকে মুক্ত থাকার ও আত্ম-উন্নয়নের এক মোক্ষম উপায়।


বলা হয় সৎ-সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎসঙ্গে সর্বনাশ। শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানসহ নানা প্রতিষ্ঠানের নেতা নির্বাচনের সময় অনেকে ইচ্ছে করে এমন ব্যক্তিকে ভোট দেন যে মিথ্যা কথা বলে কর্মীদের জন্য অবৈধ স্বার্থ আদায় করে দিতে পারবে, কিংবা স্কুল বা কলেজের ছাত্রদের জন্য অবাধ নকলের ব্যবস্থা করে দিতে পারবে! এমনকি অনেক ক্ষেত্রে একই ধরনের যুক্তিতে মসজিদ ও মাদ্রাসা কমিটির সভাপতি করা হচ্ছে অসৎ অথচ প্রভাবশালী ব্যক্তিকে! আর অমুক ব্যক্তি সৎ ও ধার্মিক মানুষ বলে তাকে দিয়ে অন্যায্য সুবিধা আদায়ের কোনো কাজ করানো যাবে না বিধায় তাকে ভোট দেয়া হয় না!

 


আবার অনেক সময় বলা হয়, অমুক ব্যক্তি যোগ্য ও সৎ হওয়া সত্ত্বেও তাকে ভোট দেব না এ কারণে যে তার জনপ্রিয়তা কম, ফলে তাকে ভোট দিয়ে ভোট প!চাতে চাই না! কিংবা অমুক সবচেয়ে যোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তার জেতার সম্ভাবনা কম বলে এমন কাউকে ভোট দেব যাতে সবচেয়ে খারাপ মানুষটি নির্বাচিত না হয়ে বসে! এইসব যুক্তি আসলে খুবই ভিত্তিহীন ও শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকেই উৎসারিত।


শয়তান সরলমনা মানুষকে অনেক সময় কুমন্ত্রণা দেয় এই বলে যে, নবী-রাসূল ও নিষ্পাপ ইমামদের হুবহু অনুসরণ করা তো তোমার মত সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়! সমাজের সাথে কিছুটা হলেও তো তাল মিলিয়ে চলতে হবে! অত বেশি ভালো মানুষ হতে গেলে তো এই যুগে টিকে থাকা সম্ভব নয়! তাই এক-আধটু মিথ্যাচার, স্বার্থপরতা ও সুবিধাবাদের আশ্রয় নেয়া তেমন দোষের কিছু নয়, পরে তওবা করে নিলেই তো ল্যাঠা চুকে যাবে! 


আসলে মহান আল্লাহ দেখবেন যে, আমরা পাপ থেকে মুক্ত থাকার জন্য যথাসাধ্য ও আন্তরিক চেষ্টা করছি কিনা। যথাসাধ্য ও আন্তরিক চেষ্টার পরও যদি কিছু অনিচ্ছাকৃত ত্রুটি বা ভুল হয়ে থাকে আল্লাহ তা ক্ষমা করবেন। আর সে জন্য নবী-রাসূল ও নিষ্পাপ ইমামদের আদর্শকে যথাসাধ্য অনুসরণের চেষ্টা করতে হবে। আমরা যদি সর্বোত্তম আদর্শ বা পরিপূর্ণ মানবদের অনুসরণের চেষ্টা করি তাহলে পরকালে তাদের সঙ্গেই আমাদের থাকতে দেয়া হবে। এটা কি কম সাফল্য? তা ছাড়া মৃত্যু কখন যে আমাদের গ্রাস করবে তা তো আমরা কেউ জানি না। তাই পরে তওবা করার তো কোনা গ্যারান্টি নেই যে যার ভিত্তিতে এখন ইচ্ছা করেই পাপ করব!


শয়তান আমাদেরকে দারিদ্রের ও ক্ষমতাসীনদের হাতে কঠোর শাস্তি ভোগের ভয় দেখায় এবং ক্ষমতা ও সুবিধা হারানোর ভয় দেখিয়ে পাপে জড়ানোর কুমন্ত্রণা দেয়। অথচ পরিপূর্ণ মু'মিন ব্যক্তি কেবল আল্লাহকেই ভয় করে। মু'মিন মনে করেন যে, তিনি যদি ন্যায়ের পথে অবিচল থাকেন তাহলে আল্লাহ তাকে সাহায্য করবেন, তাকে রিজিক দেবেন অকল্পনীয় পন্থায় ও এমনকি শেষ পর্যন্ত তাকেই বিজয়ী করবেন যদিও তা অকল্পনীয় মনে হয়!


মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে, যারা বা যে আল্লাহর পথে চলার জন্য (যথাসাধ্য) কঠোর চেষ্টা-সাধনা করে আল্লাহ তাকে অবশ্যই পথ দেখান। 
মহান আল্লাহর প্রতিশ্রুতি তো ঠুনকো কোনো বিষয় নয়! আল্লাহ তো ঠাট্টা-মশকরা করে কোনো প্রতিশ্রুতি দেন না। জীবনের ঘাত-প্রতিঘাতে ধৈর্য ধরার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মহান আল্লাহ কুরআনে বলেছেন, তোমরা দুঃখিত ও মনভাঙ্গা হয়ো না, তোমরাই বিজয়ী হবে যদি তোমরা মুমিন হও। 
মহান আল্লাহ সুরা মুহাম্মাদের সপ্তম আয়াতে বলেছেন: হে ঈমানদাররা! তোমরা যদি আল্লাহকে সাহায্য কর তাহলে তিনি তোমাদের সাহায্য করবেন এবং তোমাদের পদক্ষেপগুলোকে সুদৃঢ় করবেন।


অন্যদিকে যারা আল্লাহর এই ওয়াদায় বিশ্বাসী নয় আল্লাহ তাদেরকে অভিশাপ দেন এবং তাদের স্থান জাহান্নামে হবে বলে উল্লেখ করেছেন।সুরা ফাতহের ষষ্ঠ আয়াতে এসেছে- 'তিনি কপট বিশ্বাসী পুরুষ ও কপট বিশ্বাসী নারী এবং অংশীবাদী পুরুষ ও অংশীবাদিনী নারীদেরকে শাস্তি দেন, যারা আল্লাহ সম্পর্কে মন্দ ধারণা পোষণ করে। তাদের জন্য মন্দ পরিণাম। আল্লাহ তাদের প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তাদেরকে অভিশপ্ত করেছেন। এবং তাহাদের জন্যে জাহান্নাম প্রস্তুত রেখেছেন। তাদের প্রত্যাবর্তন স্থল অত্যন্ত মন্দ। এবারে পড়া যাক অর্থসহ ষষ্ঠ রমজানের দোয়া:

 


اليوم السّادس : اَللّـهُمَّ لا تَخْذُلْني فيهِ لِتَعَرُّضِ مَعْصِيَتِكَ، وَلاتَضْرِبْني بِسِياطِ نَقِمَتِكَ، وَزَحْزِحْني فيهِ مِنْ مُوجِباتِ سَخَطِكَ، بِمَنِّكَ وَاَياديكَ يا مُنْتَهى رَغْبَةِ الرّاغِبينَ .
হে আল্লাহ ! তোমার নির্দেশ অমান্য করার কারণে এ দিনে আমায় লাঞ্চিত ও অপদস্থ করো না । তোমার ক্রোধের চাবুক দিয়ে আমাকে শাস্তি দিও না । সৃষ্টির প্রতি তোমার অসীম অনুগ্রহ আর নিয়ামতের শপথ করে বলছি তোমার ক্রোধ সৃষ্টিকারী কাজ থেকে আমাকে দূরে রাখো । হে আবেদনকারীদের আবেদন কবুলের চূড়ান্ত উৎস । 

 

                                                                                       (৭)

 

গত কয়েকটি অনুষ্ঠানে আমরা পাপ থেকে মুক্ত না থাকতে পারার সমস্যা নিয়ে আলোচনা করছিলাম। আমরা জেনেছি যে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে এবং মহান রাসূলের আহলে বাইতকে (আ.) ভালভাবে না চেনাসহ নানা ধরনের অজ্ঞতার কারণে আমরা পাপে জড়িত হচ্ছি। কখনও পাপ করছি শয়তানের কুমন্ত্রণা বা কুযুক্তির জবাব না জানার কারণে। আর এ জন্যই ধর্মীয় জ্ঞান-চর্চাকে ফরজ করা হয়েছে। স্রেফ অজ্ঞতার কারণে যে পাপ করা হয় আল্লাহ তা ক্ষমা করবেন। কিন্তু আমরা কখনও জেনে-শুনেও পাপ করছি ঈমানের দুর্বলতার কারণে। ঈমানের দুর্বলতার বিষয়টিকে এভাবে ব্যাখ্যা করা যায়। যেমন, আমরা জানি যে মৃত ব্যক্তি মানুষের কোনো ক্ষতি করতে পারে না, কিন্তু তারপরও রাতের বেলায় একটি লাশের পাশে একাকী থাকতে আমরা ভয় করি। ঠিক তেমনি আল্লাহর ওপর বিশ্বাস থাকা সত্ত্বেও আমরা পাপ করার মুহূর্তে আল্লাহ যে আমাদের দেখছেন তা হৃদয় দিয়ে অনুভব করি না।

 

এক ব্যক্তি ইমাম হুসাইন (আ.)’র কাছে আরজ করল, হে রাসূলের সন্তান, আমি গোনাহর মধ্যে জর্জরিত। আমার এ অবাধ্যতা থেকে পালানোর কোনো পথ নেই। আপনি আমাকে উপদেশ দিন। ইমাম (আ.) বললেন, “পাঁচটি কাজ করার পর বা ৫ টি বিষয়ে নিশ্চিন্ত হওয়ার পর যত ইচ্ছা পাপ কর। প্রথমত: আল্লাহর রিজিক না খেয়ে যত ইচ্ছা পাপ কর। দ্বিতীয়ত: এমন স্থানে চলে যাও যেখানে আল্লাহর কর্তৃত্ব নেই এবং সেখানে যত ইচ্ছা পাপ কর। তৃতীয়ত: এমন জায়গায় যাও যেখানে আল্লাহ তোমাকে দেখবেন না, সেখানে যত পার গোনাহ কর। চতুর্থত: যখন মালেকুল মওত বা মৃত্যুর ফেরেশতা তোমার রুহ বা প্রাণ নিতে আসবে তখন তুমি নিজেকে রক্ষা করতে পারলে যত ইচ্ছা গোনা হ কর। পঞ্চমত: যখন আজাবের ফেরেশতা তোমাকে আগুনে নিক্ষেপ করবে তখন যদি তা থেকে বাঁচতে পার তাহলে এখন যত খুশি পাপ করে যাও।”

 


পাপ থেকে মুক্ত থাকার জন্য সাধনা, অধ্যবসায় ও একনিষ্ঠতা জরুরি। কুরআনে বলা হয়েছে, 'তোমরা সত্যকে গ্রহণ ও মিথ্যাকে বর্জন কর সেটা যতই কঠিন হোক না কেন।' কিন্তু শয়তান আমাদের বলতে চায় যে, তুমি তো আর নবী-রাসূল বা ইমামদের মত জ্ঞানী নও যে সব বুঝে সঠিক পথটি বাছাই করতে পারবে বা তাঁদের মতই মহান আল্লাহর প্রিয়পাত্র নও যে আল্লাহ তোমাকে ইসলামের পথে ত্যাগ স্বীকারের জন্য অলৌকিকভাবে সহায়তা করবেন, তাই সবক্ষেত্রে ঈমান ও ইসলামের পথে থাকার চেষ্টা করে লাভ নেই! এর উত্তর হল আসলে প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই রয়েছে অসীম সম্ভাবনা। একটি হাদিসে কুদসির বর্ণনা অনুযায়ী যে কোনো সাধারণ মু'মিন বা মুসলমান মানুষ নফল ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর এত বেশি নৈকট্য অর্জন করতে পারে যে সে তখন যা চায় তা-ই করতে পারে বৈধ আশার ভিত্তিতে। আল্লামা ইকবালও তার এক কবিতায় এ বিষয়ে ইঙ্গিত করে বলেছেন, তোমার আত্মাকে এতোটা উন্নত কর যে স্বয়ং আল্লাহই যেন তোমাকে প্রশ্ন করেন যে, বান্দা তুমি কি চাও বা কিসে তোমার সন্তুষ্টি? 

 


পবিত্র কুরআনে আল্লাহ বলেছেন 'যে ব্যক্তি আমার রাস্তায় চলার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালায়, তাকে আমি অবশ্যই পথ দেখাই।'- (২৯: ৬৯) 
পাপকে গভীরভাবে ঘৃণা করেন এমন ব্যক্তিরা মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইলে মহান আল্লাহ অনেক সময় তাদেরকে অলৌকিকভাবে সাহায্য করেন। মানুষের উচিত যখন তারা কোনটি পাপ বা পাপ নয় কিংবা কোনো কাজ কি সাওয়াবের কাজ না পাপের কারণ- তা বোঝা তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না, এরকম ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর সাহায্য চাওয়া যেমনটি চান মহাপুরুষরা। কেউ যখন সৎ থাকার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালায় ও পাপকে এড়িয়ে যাওয়ার জন্য দৃঢ়-সংকল্প থাকে এমন ব্যক্তিকেই আল্লাহ জটিল বিপদের সময় তথা যখন বোঝা যায় না যে কোন্ পথটি সঠিক তখন সহায়তা করেন নানা পন্থায়।

 

 

এ প্রসঙ্গে দু-একটি ঘটনা উল্লেখ করা যায়। যেমন, আল্লামা জাফরি একবার পশ্চিমা এক দেশে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন প্রবাসী ইরানি মুসলমানদের মাধ্যমে। তাদের একজন এই মনীষীর সম্মানে ভোজ-সভার আয়োজন করেছিল। খাবারের সময় হলে আল্লামা কেন জানি খেতে চাইলেন না। আল্লামার ছেলে বাবাকে বার বার বোঝাতে চাইলেন, যে ভোজ-সভা আপনার সম্মানেই আয়োজিত হয়েছে সেখানে আপনার না খাওয়াটা ঠিক হবে না। কিন্তু তিনি বললেন, না, আমার ইচ্ছে হচ্ছে না, কারণ আমার মনে হচ্ছে না খাওয়াটাই ভালো হবে। পিতা ও পুত্র আয়োজকের কাছে ক্ষমা চেয়ে বিদায় নেন। পরে আল্লামার পুত্র ফোন করে আবারও দুঃখ প্রকাশ করতে গেলে সেই ভোজ-সভার আয়োজক বললেন, আল্লাহ আপনার বাবাকে খুবই ভালবাসেন বলে তিনি গতকাল এখানে খাননি! কারণ, যে মুরগি রান্না করা হয়েছিল তা হালালভাবে জবাই করা হয়নি!

 


একজন খোদাভীরু নারীর কথাও এ প্রসঙ্গে বলা যায় যিনি সব সময় হিজাব করে চলতেন এবং এ ব্যাপারে খুবই সচেতন থাকতেন। কিন্তু একবার তার এমন অসুখ হলো যে তাকে অস্ত্রোপচার করার দরকার হল। আর এ কাজের জন্য কোনো মহিলা ডাক্তার ছিলেন না। মহিলা হযরত ফাতিমা জাহরা (সা.)'র ওসিলা দিয়ে মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য চেয়ে বললেন, হে আল্লাহ! হয় আমাকে সুস্থ করে দিন, নতুবা মৃত্যু দিন কিন্তু পরপুরুষের সামনে যেন শরীরের অংশ অনাবৃত করতে না হয়! মহান আল্লাহ তার দোয়া কবুল করলেন। এরপর ওই মহিলা ডাক্তারকে বললেন, আমি পুরোপুরি সুস্থতা অনুভব করছি, আপনারা পরীক্ষা বা টেস্ট করে দেখুন। ডাক্তারি পরীক্ষায় দেখা গেল ওই মহিলার অসুখ পুরোপুরি ভালো হয়ে গেছে। এ ঘটনায় চিকিৎসকরা মহা-বিস্মিত হন।

 


এবারে পড়া যাক অর্থসহ সপ্তম রোজার দোয়া: 


اليوم السّابع : اَللّـهُمَّ اَعِنّي فِيهِ عَلى صِيامِهِ وَقِيامِهِ، وَجَنِّبْني فيهِ مِنْ هَفَواتِهِ وَآثامِهِ، وَارْزُقْني فيهِ ذِكْرَكَ بِدَوامِهِ، بِتَوْفيقِكَ يا هادِيَ الْمُضِلّينَ .
হে আল্লাহ ! এ দিনে আমাকে রোজা পালন ও নামাজ কায়েমে সাহায্য কর । আমাকে অন্যায় কাজ ও সব গুনাহ থেকে রক্ষা করো । তোমার তৌফিক ও শক্তিতে সবসময় আমাকে তোমার স্মরণে থাকার সুযোগ দাও । হে পথ হারাদের পথ প্রদর্শনকারী । 

( ৮)

 

রমজান মাসে পাপ এড়ানোর প্রশিক্ষণ নিয়ে আমরা আলোচনা করছিলাম গত কয়েক অনুষ্ঠানে। পাপ পরিহারের প্রচেষ্টায় সাফল্য অর্জন করতে হলে খোদাভীরু হতে হবে এবং পাপ এড়ানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালানোও জরুরি। 

 

কেউ যদি ভাবে যে আমি ইচ্ছে করেই বা জেনে-শুনে পাপের পথেই থাকবো অথচ আল্লাহ তাকে জোর করে পাপের পথ থেকে সুপথে টেনে আনবেন-এমন ধারণা হাস্যকর।

আমরা অনেক সময় জালিমের জুলুমের ভয়ে বা জুলুমের বিরুদ্ধে কেউ এগিয়ে আসছে না দেখে পাপে জড়িয়ে পড়ি। আসলে জালিমদের বাহ্যিক ভালো অবস্থা দেখে হতাশ হতে নেই। 

 


মহানবী (সা.) বলেছেন, " যখন তোমরা কেউ দেখ যে, কেউ অন্যায়, অবিচার ও পাপাচার করে চলেছে অথচ আল্লাহ তাকে অঢেল নিয়ামত দান করেছেন, তখন বুঝে নিও যে আল্লাহ তার রশিটা বেশি লম্বা বা দীর্ঘ করে দিয়েছেন, আর আল্লাহ এক টানেই এদের গুটিয়ে ফেলবেন।" 

 

অনেক সময় আমরা একই বিষয়ে নানা পথ ও মত দেখে বিভ্রান্ত হই এবং হতাশ হয়ে ধর্ম থেকেই দূরে সরে পড়ি। অথচ পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন,

'যারা মনোনিবেশ সহকারে (নানা মতের) কথা শুনে, অতঃপর যা উত্তম, তার অনুসরণ করে। তাদেরকেই আল্লাহ সৎপথ প্রদর্শন করেন এবং তারাই বুদ্ধিমান।' (সুরা জুমার-১৮) 

 

বিশ্বনবী (সা.)'র হাদিসে এসেছে, আমার উম্মতের মধ্যে ৭২ ফিরকা হবে। তবে ৭২ ফিরকার মধ্যে কেবল এক ফিরকাই বেহেশতে যাবে। -এখানে ৭২ ফিরকা বলতে হুবহু যে ৭২ ফিরকা বোঝানো হয়েছে তা নয়। বাস্তবে মুসলমানদের মধ্যে ৭২টি নয় বরং শত শত ফিরকা সৃষ্টি হয়েছে নানা যুগে।  মহানবী (সা.) বলেছেন, আমার আহলে বাইত হচ্ছে নুহের কিশতির সমতুল্য, যারা তাতে আরোহণ করবে, তারা নাজাত পাবে, আর যারা তাতে আরোহণ করবে না তারা নাজাত পাবে না। মহানবী (সা.) আরও বলেছেন, পবিত্র কুরআন ও আহলে বাইত কখনও বিচ্ছিন্ন হবে না পরস্পর থেকে।

 

মহান আল্লাহ আমাদেরকে যেন পবিত্র কুরআনের অনুসারী করেন এবং বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি অসংখ্য দরুদ ও সালাম পাঠানোর উসিলায় আমাদেরকে চরম প্রশান্তি ও সৌভাগ্য লাভের সুযোগ দান করেন।

 

পাপ পরিহারের জন্য আমাদের কুরআন ও হাদিসের জ্ঞান অর্জন করতে হবে এবং বিশেষ করে মহানবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের বক্তব্যের আলোকে জীবনকে গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে। আমরা যদি এভাবে সচেষ্ট হই তাহলে ভুলেও কখনও গিবত, তোহমৎ বা অপবাদ, পরনিন্দা, চোগলখুরি, সুদ-ঘুষ, ব্যভিচার ও অন্য কোনো ধরনের পাপে জড়িয়ে পড়ব না। বলা হয় একজন মু'মিন মুসলমানের উচিত প্রতিদিন পবিত্র কুরআন থেকে ৫০ আয়াত পাঠ করা। পাপ এড়ানোর নানা কৌশলের জ্ঞানসহ যেসব কারণে নামাজ রোজা ও নানা ইবাদত এবং সৎ কাজ মূল্যহীন হয়ে পড়ে তা আমরা জানতে পারি বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতসহ অন্যান্য মহাপুরুষদের জীবনী থেকে। মহানবী (সা.)'র সহি বা সঠিক হাদিস ও আহলে বাইতের জীবন পবিত্র কুরআনেরই নানা নীতির ব্যাখ্যা তুলে ধরে। ইসলামের পবিত্র মহাপুরুষদের রেখে যাওয়া নানা বক্তব্য, বাণী ও ভাষণ ছাড়াও তাঁদের দোয়াগুলো অধ্যয়ন পাপ পরিহারের পাশাপাশি উন্নত চরিত্র ও জীবন গঠনের জন্য খুবই সহায়ক। এ ধরনের কয়েকটি বিখ্যাত দোয়া হল, মুনাজাতে শাবানিয়া, দোয়ায়ে কুমাইল, দোয়ায়ে আবু হামজা সুমালি, দোয়ায়ে আরাফা এবং সহিফায়ে সাজ্জাদিয়ায় বর্ণিত নানা দোয়া। 

 

সহিফায়ে সাজ্জাদিয়া হচ্ছে মহান ইমাম হযরত যাইনুল আবেদিন (আ.) বা ইমাম সাজ্জাদের রেখে যাওয়া প্রাণস্পর্শী নানা দোয়ার সংকলন। এখানে রয়েছে 'মাকারিমুল আখলাক বা সর্বোচ্চ নৈতিক গুণাবলী' শীর্ষক বিখ্যাত দোয়াসহ বহু বিষয়ের দিক-নির্দেশনায় সমৃদ্ধ অনেক দোয়া। 

 

পাপ এড়ানোর জন্য আমাদেরকে মানুষের ওপর আল্লাহর অধিকার, মানুষের অধিকার ও পরিবেশ ও প্রকৃতির অধিকার এবং এমনকি নিজের ওপর নিজের অধিকার সম্পর্কেও জ্ঞান অর্জন করা উচিত। আর এইসব অধিকারের বিবরণ রয়েছে সহিফায়ে সাজ্জাদিয়ায়। আমরা আল্লাহর অধিকারের ক্ষেত্রে যত পাপই করি না কেনো তওবার মাধ্যমে সেইসব পাপ মোচন করা সম্ভব। তাই কখনও আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে কোনো মুসলমানের হতাশ হওয়া উচিত নয়। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ হতাশাকে একমাত্র কাফির ও মুনাফিকদের বৈশিষ্ট্য বলে উল্লেখ করেছেন। তবে আমরা যদি কোনো মানুষের অধিকার এবং তার সম্মান, সম্পদ ও পরিবারের কোনো ক্ষতি করে থাকি সে জন্য যতক্ষণ সেই ব্যক্তি আমাদের ক্ষমা না করেন ততক্ষণ আল্লাহ সেই পাপ ক্ষমা করেন না। তাই ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির ক্ষতিপূরণ করতে হবেও  তার কাছেই সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ক্ষমা চাইতে হবে।

 

পাপ এড়ানোর প্রশিক্ষণের একটি কৌশল হল, প্রবৃত্তি বা নফসের ঠিক বিপরীত দিকে চলা এবং এ জন্য হালাল অথচ জরুরি নয় এমন বিষয়গুলো পরিহার করা। যেমন,যে কথা না বললেই নয় এমন কথা না বলা, প্রবল ক্ষুধা না পেলে কিছু না খাওয়া বা ক্ষুধা মোটামুটি মিটে যাওয়ার পরই আর কিছু না খাওয়া,  সুস্বাদু খাবার এড়িয়ে চলা, গরমের সময় ঠাণ্ডা পানি ও শীতের সময় গরম পানি পান বা ব্যবহার না করা, বেশি বিশ্রাম না করা, চাকচিক্যময় পোশাক পরিহার, প্রতিহিংসার কারণে কারো কোনো সাফল্য বা ভালা কাজের প্রশংসা করতে ইচ্ছে না হলেও তা করা, অপমানজনক বা মন্দ কথা ও কাজের জবাবে রেগে না গিয়ে ভালো কিছু বলা ও করা ইত্যাদি। আসলে এইসব বিষয়ে প্রশিক্ষণের সবচেয়ে মোক্ষম সময় হল পবিত্র রমজান মাস। কারণ, মানুষ এ সময় ক্ষুধা ও তৃষ্ণা সহ্য করার মাধ্যমে চরিত্র আর মানসিক প্রকৃতিকে উদার ও সহনীয় করার চেষ্টা করে। 

 

এবারে পড়া যাক অর্থসহ অষ্টম রোজার দোয়া:


اليوم الثّامن : اَللّـهُمَّ ارْزُقْني فيهِ رَحْمَةَ الاَْيْتامِ، وَاِطْعامَ اَلطَّعامِ، وَاِفْشاءَ السَّلامِ، وَصُحْبَةَ الْكِرامِ، بِطَولِكَ يا مَلْجَاَ الاْمِلينَ .
হে আল্লাহ ! তোমার উদারতার উসিলায় এ দিনে আমাকে এতিমদের প্রতি দয়া করার, ক্ষুধার্তদের খাদ্য দান করার, শান্তি প্রতিষ্ঠা করার ও সৎ ব্যক্তিদের সাহায্য লাভ করার তৌফিক দাও । হে আকাঙ্খাকারীদের আশ্রয়স্থল । 

                                                                          (৯) 

পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে আল্লাহর সাহায্য কামনা কর। অনেকেই মনে করেন এখানে ধৈর্য বলতে রোজা বা সংযমকে বোঝানো হয়েছে। মহানবী (সা.) বলেছেন, রোজা আত্মরক্ষার ঢালস্বরূপ।  রমজানে পাপ থেকে মুক্ত থাকার প্রশিক্ষণ নেয়ার পূর্বশর্ত হিসেবে পাপের কুফল ও পরিণতি সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি। কোনো কোনো পাপ সংযমের বাঁধ ভেঙ্গে দেয়। যেমন-মদ ও নেশা জাতীয় দ্রব্য সেবন, জুয়া খেলা,তামাশা ও বিদ্রূপপূর্ণ খেলায় অংশগ্রহণ, অপর মানুষের দোষ-ত্রুটি নিয়ে গল্প করা এবং সন্দেহবাদী ও নাস্তিকদের সাথে ওঠাবসা করা (আনিসুল লাইল, ইমাম জাফর সাদিক) কোনো কোনো পাপ দুর্যোগ ডেকে আনে ।  যেমন-চুক্তি ভঙ্গ করা, লজ্জাজনক কাজ প্রকাশ করা,আল্লাহর স্পষ্ট নির্দেশের বিপরীত রায় দেয়া, জাকাত দিতে অস্বীকার করা বা বাধা দেয়া, মাপে কম দেয়া।  (মালবুবি) কোনো কোনো পাপ নিয়ামতগুলোকে গজবে পরিবর্তিত করে দেয় । যেমন-মানুষের সাথে অন্যায় আচরণ করা, একজন আলেমকে  চুপ করিয়ে দেয়া বা তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করা, আল্লাহর রহমতের প্রতি অকৃতজ্ঞ হওয়া এবং আল্লাহর সাথে শরীক করা, নিজের দারিদ্র প্রচার করা, আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হওয়া ও আল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা(ইমাম জাফর সাদিক,আনিসুল লাইল)

 

কোনো কোনো পাপ দোয়া কবুল হবার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।   যেমন-বিকৃত ঈমান পোষণ, দোয়া কবুল হবার ব্যাপারে অবিশ্বাস, ভাইয়ের প্রতি মোনাফেকি, সময়মত নামাজ না পড়া এবং পিতা-মাতার প্রতি দায়িত্ব পালন না করা(প্রাগুক্ত) 

 

কোনো কোনো পাপ দূর্ভাগ্য বা কষ্ট ডেকে আনে । যেমন- যারা কষ্টে আছে তাদের সাহায্য না করা,নির্যাতিত ব্যক্তি, যারা সাহায্য প্রার্থনা করছে, তাদের রক্ষার জন্যে অগ্রসর না হওয়া এবং সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজের প্রতিরোধের বিরোধিতা করা (ইমাম  যাইনুল আবেদীন, আনিসুল লাইল। ) 

 

কোনো কোনো গোনাহ আশাকে বিনষ্ট করে দেয় । যেমন- আল্লাহর অনুগ্রহের ব্যাপারে নিরাশ হওয়া,আল্লাহর ক্ষমাশীলতায় আস্থা না রাখা, আল্লাহর পাশাপাশি অন্য কারো ওপর ভরসা করা এবং আল্লাহর প্রতিশ্রুতিতে অবিশ্বাস করা। (ইমাম জাফর সাদিক) 

 

হাদিসে এসেছে, যার মধ্যে দুটি স্বভাব থাকবে মহান আল্লাহ তাকে বিনা হিসেবে বেহেশত দান করবেন। আর এ দুটি গুণ হল, অল্পে তুষ্টি তথা আল্লাহর দেয়া বরাদ্দে সন্তুষ্ট থাকা এবং গোপন বা নিভৃত স্থানেও আল্লাহকে ভয় করা তথা  আল্লাহর ভয়ে পাপ না করা। 

 

 বিষয়টি বলতে খুব সহজ হলেও কাজে তা সহজ নয়। আর এ জন্যই দরকার  গভীর খোদা-প্রেম। খোদাপ্রেমের শর্ত হল জ্ঞান বা আল্লাহকে জানা। আল্লাহকে জানার উপায় হল তাঁর প্রিয় মহাপুরুষদের ভালোভাবে জানা। আর সব কিছুর আগে জাগিয়ে তুলতে হবে বিবেককে।  বিদ্রোহী প্রবৃত্তিকে দমন করা ছাড়া বিবেক জেগে ওঠে না। আর  কুপ্রবৃত্তিকে দমনের জন্যই দরকার রোজা যা রমজান মাসের পরও বিশেষ ক'টি দিন ছাড়া সারা বছরের যে কোনো দিনে রাখা যায়।

 

দোয়ায়ে মাকারিমুল আখলাক বা বা সর্বোচ্চ নৈতিক গুণাবলী' শীর্ষক বিখ্যাত দোয়ার আলোকে আমাদের উচিত মহান আল্লাহর কাছে সম্মানের আবেদনের পাশাপাশি অহংকার থেকেও দূরে রাখার প্রার্থনা করা। আমাদের উচিত মানুষের উপকার করা কোনো স্বার্থ বা বিনিময় পাওয়ার চিন্তা না করেই। উপকার করার পর মানুষকে উপকারের খোঁচা দিলে তা হয়ে পড়ে মূল্যহীন। মানুষ যদি আমাদের অতীতের চেয়ে একটু বেশি সম্মান দেয় তাহলে মনে মনে নিজেকে আরও বেশি বিনয়ী ও হীন করা উচিত।  যারা আমাদের কষ্ট দেয় তাদের ক্ষমা করা, যারা আমাদের দোষ-ত্রুটি তুলে ধরে তাদেরকে অন্যদের সামনে শ্রদ্ধার সঙ্গ স্মরণ করা, যারা সম্পর্ক ছিন্ন করে তাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলা, যারা আমাদের বঞ্চিত করেছে তাদের দান করা- এসবই অতি উচ্চ স্তরের মহৎ গুণ। মানুষের ভালো কাজের প্রশংসা করা, তাদের দোষ বা ত্রুটি গোপন রাখা, ঘৃণা, ক্রোধ ও প্রতিহিংসার আগুনকে দমিয়ে রাখা  এবং বিবদমান মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতি গড়ে দেয়া- এইসব গুণ অর্জন পবিত্র রমজানের প্রশিক্ষণের অন্যতম লক্ষ্য। অধীনস্থদের প্রতি দয়ার্দ্র থাকা, নিজের ক্ষতি হলেও সত্য কথাটি বলা, অনেক সৎকর্ম করলেও তাকে খুব কম বলে মনে করা এবং খুব কম অন্যায় করা সত্ত্বেও তাকে খুব বেশি বলে মনে করাও অতি উচ্চ স্তরের মহৎ গুণ।

 

রিয়া বা নিজের ভালো কাজকে জাহির করা ইচ্ছা এবং 'ওজব্'  বা অনেক ভালো কাজ করে ফেলেছি বা অনেক ভালো মানুষ হয়ে গেছি- এ জাতীয় ধারণা হল দু'টি মারাত্মক ও সূক্ষ্ম পাপ। এইসব পাপ মানুষের সব পুণ্যকে ধ্বংস করে ফেলে। 

 

মহান নবী-রাসূল (আ.) ও ইমামগণ (আ.) সব সময় নিজেদেরকে হীনতম ও তুচ্ছতম ব্যক্তি বলে মনে করতেন এবং মহা-অপরাধী হওয়ার চেতনা নিয়েই আল্লাহর দরবারে ক্রন্দন করতেন। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) প্রতিদিন অন্তত ৭০ বার তওবা করতেন এবং আল্লাহর ভয়ে ক্রন্দন করতেন যদিও তিনি কখনও কোনো পাপ করেননি। আমিরুল মু'মিনিন আলী (আ.) এই বলে দুঃখ করতেন, পরকালের সফর কত দীর্ঘ অথচ পাথেয় বা সৎকর্ম কতো কম! তিনি রাতের বেলায় এমনভাবে ক্রন্দন করতেন মনে হয় যেন তাঁকে সাপে দংশন করেছে! তাই নবী-রাসূল ও ইমামদের নীচের পর্যায়ে মুসলমানদের তো উচিত আল্লাহর দরবারে আরো বেশি বিনয়ী হওয়া ও আরও বেশি ক্রন্দন করা।  নামাজের সময় উপস্থিত হলে আল্লাহর ভয়ে মহান ইমামগণের মুখের রং বদলে যেত। মহান আল্লাহ আমাদেরকে প্রকৃত খোদাভীরু ও মুমিন হওয়ার তৌফিক দিন। 

 

এবারে পড়া অর্থসহ নবম রোজার দোয়া: 


اليوم التّاسع : اَللّـهُمَّ اجْعَلْ لي فيهِ نَصيباً مِنْ رَحْمَتِكَ الْواسِعَةِ، وَاهْدِني فيهِ لِبَراهينِكَ السّاطِعَةِ، وَخُذْ بِناصِيَتي اِلى مَرْضاتِكَ الْجامِعَةِ، بِمَحَبَّتِكَ يا اَمَلَ الْمُشْتاقينَ .
হে আল্লাহ ! এদিনে আমাকে তোমার রহমতের অধিকারী কর । আমাকে পরিচালিত কর তোমার উজ্জ্বল প্রমাণের দিকে । হে আগ্রহীদের লক্ষ্যস্থল । তোমার ভালোবাসা ও মহব্বতের উসিলায় আমাকে তোমার পূর্ণাঙ্গ সন্তুষ্টির দিকে নিয়ে যাও । 

                                                                                      (১০) 

গত পর্বের আলোচনায় আমরা পবিত্র রমজান মাসে শ্রেষ্ঠ নৈতিক গুণ অর্জনের চেষ্টা সম্পর্কে কথা বলেছি। বিশ্বনবী (সাঃ) বলেছেন, মানুষের সেরা নৈতিক গুণগুলোকে পূর্ণতার শিখরে পৌঁছে দেয়াই ছিল তাঁর মিশন। "শ্রেষ্ঠ নৈতিক গুণাবলী" বলতে কেবল উন্নত নৈতিক চরিত্র বা সৎ স্বভাবকেই বোঝায় না। তিনি এ ধরণের গুণের কিছু দৃষ্টান্ত দিয়েছেন। যেমন, যে তোমাকে কষ্ট দিয়েছে তাকে ক্ষমা কর, যে তোমায় বঞ্চিত করেছে তাকে দান কর, যে তোমার কাছ থেকে দূরে সরে গিয়েছে তাকে কাছে টান, তোমার অসুস্থতার সময় তোমাকে দেখতে আসেনি, তুমি তার অসুস্থতার সময় তাকে দেখতে যাও ইত্যাদি।

 

রোজার উদ্দেশ্য হচ্ছে খোদা-ভীতি অর্জন ও সংযম চর্চা করা। বিশ্বনবী (সা.)'র একটি হাদিস অনুযায়ী মানুষের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের রোজা রয়েছে। যেমন, চোখের রোজা, হাতের রোজা, পায়ের রোজা, মুখের বা জিহ্বার রোজা ইত্যাদি। নিষিদ্ধ দৃশ্য দেখা থেকে দৃষ্টিকে বিরত রাখা চোখের রোজা, নিষিদ্ধ পথে চলা থেকে পাকে বিরত রাখা হচ্ছে পায়ের রোজা, হাত দিয়ে কোনো অবৈধ কাজ না করা হচ্ছে হাতের রোজা, নিষিদ্ধ কথা না বলা হচ্ছে মুখের রোজা।

 

পরকালের মুসাফিরের কাছে পরকালের পাথেয় সংগ্রহ করাই হয় একমাত্র ভাবনা। তার কাছে দুনিয়ার চাকচিক্য বা জাঁকজমকের কিছুই ভালো লাগে না। তেমনি প্রকৃত রোজাদারের কাছেও খোদার সন্তুষ্টি ছাড়া অন্য কিছুই ভালো লাগে না। বিনম্র ও ভগ্ন-হৃদয় খোদা-প্রেমিকের মতই প্রকৃত রোজাদারের কাছে আল্লাহর স্মরণ ছাড়া অন্য কিছুই প্রিয় নয়। আসলে অতি উচ্চ পর্যায়ের রোজাদাররা কেবল পানাহার ও ইন্দ্রিয় তৃপ্তিই বর্জন করেন না, তারা সেইসব বিষয়ও বর্জন করেন যা মনকে সামান্য সময়ের জন্যও আল্লাহর স্মরণ ও প্রেম থেকে মানুষকে উদাসীন করে দেয়।

 

রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস রমজানের প্রায় এক তৃতীয়াংশ আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়েছে। এ সময়ে আমরা কতটা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য অর্জন করতে পেরেছি ? আমরা কি এখনও ইফতার ও সাহরির সময় রসনা-বিলাসে নিয়োজিত হচ্ছি না? অতি-ভোজন, অতিরিক্ত কথা বলা ও অতিরিক্ত ঘুমানো এবং অন্যান্য অপছন্দনীয় অভ্যাস থেকে আমরা নিজেকে কতটা মুক্ত করতে পেরেছি? কান ও চোখকে কতটা সংযত করতে পেরেছি? কাম, ক্রোধ, লোভ, ক্ষমতা-প্রেম, হিংসা- এইসব বিষয়কে কি আমরা আমাদের দাসে পরিণত করতে পেরেছি, না এখনও এইসব বিষয়ের দাস হয়ে আছি।

 

মহানবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ.)-কে বলেছেন:হে আলী! তুমি কি ছয় লাখ ভেড়া চাও? ছয় লাখ দিনার চাও? না ছয় লাখ অমূল্য উপদেশ বাণীর বাক্য চাও? আলী (আ.) শেষোক্ত প্রস্তাবে সায় দিলেন। মহানবী (সা.) বললেন, যদি ছয় লাখ উপদেশের সারাংশ এই ছয়টি বাক্য:১. যখন দেখবে যে লোকেরা নফল বা মুস্তাহাব ও নানা গুণ চর্চা নিয়ে ব্যস্ত তুমি তখন ফরজ বা ওয়াজিব কাজ বা দায়িত্বগুলোকে পরিপূর্ণ করা নিয়ে ব্যস্ত থাক।২. যখন দেখবে যে লোকেরা দুনিয়া (যেমন, বাড়িঘর, বাহন ইত্যাদি) নিয়ে ব্যস্ত, তখন তুমি পরকাল নিয়ে ব্যস্ত হবে।৩. যখন দেখবে যে লোকেরা অন্যের দোষ-ত্রুটি নিয়ে সমালোচনায় ব্যস্ত তখন তুমি তোমার নিজের দোষ-ত্রুটি (সংশোধন) সম্পর্কে সক্রিয় হবে।৪.যখন দেখবে যে লোকেরা দুনিয়াকে (বাড়িঘর, বাহন. ঘরের আসবাবপত্র ইত্যাদিকে) সুসজ্জিত করছে (অপ্রয়োজনীয় বিলাস সামগ্রী কিনছে), তখন তুমি তোমার পরকালকে সুসজ্জিত করা নিয়ে ব্যস্ত হবে। ৫. যখন দেখবে যে লোকেরা বেশি বেশি ইবাদত করছে তখন তুমি তোমার ইবাদতকে খালেস বা একনিষ্ঠ করা নিয়ে সক্রিয় হবে।৬. যখন দেখবে যে লোকেরা সৃষ্টির আশ্রয় নিচ্ছে, তখন তুমি স্রস্টার আশ্রয় নেবে। 

 

প্রকৃত রোজাদার হতে হলে নফসের সঙ্গে সংগ্রামের অভ্যাস থাকতে হবে। এ অভ্যাস কেবল পবিত্র রমজানেই হঠাৎ করে গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তাই এ জন্য সারা বছরই প্রস্তুতি নিতে হবে। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, নফসের সঙ্গে জিহাদ হচ্ছে শ্রেষ্ঠ জিহাদ।

 

পাশবিক স্তরে থেকে-যাওয়া আমাদের নফসের বস্তুগত চাওয়া-পাওয়ার যেন শেষ নেই। এর কারণ হল, আমাদের আত্মার ওপর এত বেশি ময়লা জমে গেছে যে আমরা শয়নে-স্বপনে কেবল সেসব নিয়েই ভাবি যেসবকে আপাত দৃষ্টিতে নগদ ও মধুর বলে মনে হয়। আমরা মনে করি যে কেবল বস্তুগত বিষয়ের মধ্যেই রয়েছে সুখ। কিন্তু প্রকৃত প্রশান্তি রয়েছে কেবল খোদার নৈকট্য অর্জন ও খোদা-প্রেমের মধ্যেই। কারণ, পৃথিবীর সব কিছুই ক্ষণস্থায়ী। পার্থিব সম্পদ, ক্ষমতা, চাকচিক্য-এসব দু'দিনের ভোগের সামগ্রী মাত্র। তা-ও এইসব বিষয়ও সবার ভাগ্যে জোটে না  মানুষের নানা দুর্বলতার কারণে। তাই এই পার্থিব জগতের ক্ষণস্থায়ী সুখ ও সম্পদ লাভের আশায় পরকালকে বরবাদ করা হবে সবচেয়ে বড় বোকামি।

 

 পার্থিব জীবনের সম্পদ যেটুকু না হলেই নয়, কেবল সেটুকু সংগ্রহের জন্য সচেষ্ট হলে তাতে দোষ নেই। কিন্তু প্রয়োজনের চেয়েও বেশি সম্পদ গড়ে তোলার জন্য সর্বশক্তি নিয়োগ করা এমন এক স্বভাব যা মানুষের আত্মাকে কলুষিত করে ফেলে এবং এ ধরনের আত্মা মুক্তির পথ হারিয়ে ফেলে। অন্যদিকে মহামানবরা পার্থিব সম্পদ, সুখ, ক্ষমতা ও সম্মানের জন্য প্রতিযোগিতাকে শিশুসুলভ খেলার মতই হাস্যকর বা মূল্যহীন বলে মনে করেন।

 

 এবারে পড়া যাক অর্থসহ রমজানের দশম রোজার দোয়া: 


اليوم العاشر : اَللّـهُمَّ اجْعَلْني فيهِ مِنَ الْمُتَوَكِّلينَ عَلَيْكَ، وَاجْعَلْني فيهِ مِنَ الْفائِزينَ لَدَيْكَ، وَاجْعَلْني فيهِ مِنَ الْمُقَرَّبينَ اِلَيْكَ، بِاِحْسانِكَ يا غايَةَ الطّالِبينَ .
হে আল্লাহ ! তোমার প্রতি যারা ভরসা করেছে আমাকে সেই ভরসাকারীদের অন্তর্ভূক্ত কর । তোমার অনুগ্রহের মাধ্যমে আমাকে শামিল করো সফলকামদের মধ্যে এবং আমাকে তোমার নৈকট্যলাভকারী বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত করে নাও । হে অনুসন্ধানকারীদের শেষ গন্তব্য ।

 

(১১)

পবিত্র রমজান মাস আত্ম-সংশোধন ও আত্ম-উন্নয়নের সবচেয়ে উপযুক্ত মাস। তাই এ মাসে পাপ বর্জনের জন্য কুরআন ও হাদিস অধ্যয়নসহ ইসলামী জ্ঞান চর্চা জরুরি। আমরা অনেকেই ইবাদত-বন্দেগিকে মাত্রাতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে ইসলামী জ্ঞান-চর্চায় পিছিয়ে পড়ি। অথচ বিশ্বনবী (সা.)'র হাদিসের আলোকে নফল ইবাদত বন্দেগির চেয়ে জ্ঞান চর্চার গুরুত্ব অনেক বেশি। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, যে জানে আর যে জানে না, তারা কি সমান? ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞানগত ভিত্তি ও স্তর যার যত উচ্চ হবে আল্লাহর কাছে তার ইবাদতও তত বেশি গ্রহণযোগ্য এবং পরিপূর্ণ হবে। পবিত্র রমজানের হুকুম-আহকাম বা মাসলা-মাসায়েল না জেনে রোজা রাখা ও সেগুলো জেনে রোজা রাখার মধ্যে অবশ্যই পার্থক্য রয়েছে। আরেকটা বিষয় মনে রাখা জরুরি, এমনভাবে আমাদের নফল ইবাদতে জড়িয়ে পড়া ঠিক হবে না যা ফরজ ইবাদতগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে বা ফরজ ইবাদতগুলো পালনের মধ্যে ত্রুটি-বিচ্যুতি সৃষ্টি করে এবং ফরজ ইবাদতগুলোকে নিখুঁত ও একনিষ্ঠ করার সুযোগ নষ্ট করে দেয়।

 


খোদামুখী হওয়া তথা আত্ম-সংশোধন ও আত্ম-উন্নয়নের পথে এক বড় বাধা হল আমাদের আত্মপ্রীতি ও ভোগ-প্রবণতা এবং এসবের ফলে উদ্ভূত নানা রোগ। যেমন, অলসতা, আরাম-প্রিয় হওয়া এবং নিষিদ্ধ বিষয়ের মধ্যে আনন্দ অনুভব করা ইত্যাদি। সমাজে সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নির্দেশ না থাকা এবং অপসংস্কৃতি ও ইসলামের শত্রুদের সাংস্কৃতিক আগ্রাসনও মুসলিম সমাজগুলোর মধ্যে অবক্ষয় ও অধঃপতন ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ। ইসলামের শত্রুরা ইসলামী বিষয়গুলো, ইসলামী সংস্কৃতি ও জিহাদ সম্পর্কে নানা ধরণের ঘৃণা আর ভয় সৃষ্টির চেষ্টা করছে যাতে তরুণ ও যুব সমাজ ইসলাম, ইসলামী সংস্কৃতি ও ইসলামী মূল্যবোধগুলোর দিকে আকৃষ্ট না হয়। অথচ তরুণ ও যুব সমাজ অপেক্ষাকৃত বেশি সত্য-সন্ধানী ও পবিত্র হৃদয়ের অধিকারী হয় বলে ইসলামের দিকে তাদের এগিয়ে যাওয়ার এবং ইসলামের জন্য তাদের ত্যাগ-তিতিক্ষার সম্ভাবনা অন্যদের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে। আর এ জন্যই অপেক্ষাকৃত কম বয়সে আত্ম-সংশোধন ও আত্ম-উন্নয়নের প্রচেষ্টা শুরু করা উচিত যাতে এই প্রক্রিয়াকে জীবনে বেশি ফলপ্রসূ করা যায়। বলা হয়- যে নিজ আত্মাকে পবিত্র ও সংশোধন করতে পারেনি সে যতই বয়স্ক হতে থাকে তার মধ্যে পাপ-প্রবণতা ও লোভ ততই বাড়তে থাকে।


পার্থিব সম্পদ ও ক্ষমতাকে যারা জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বানিয়ে নিয়েছে তাদের উপমা হল সেই নৌকার মত যার মধ্যে পানি ঢুকে পড়ায় তা ডুবে যায়। অন্যদিকে যারা এইসব বিষয়কে কেবল পার্থিব জীবনের বস্তুগত উপকরণ বলে মনে করেন তাদের উপমা হচ্ছে এমন নৌকার মত যা সব সময় পানির ওপর ভেসে থেকে নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যায়।


আমাদের ইমান বা খোদাভীতি কতটা জোরদার বা দুর্বল হচ্ছে তা নানা পরীক্ষার মাধ্যমে বোঝা যায়। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, যখন দেখবে যে কোনো অন্যায় বা পাপ কাজের পর তোমার মধ্যে অনুশোচনা জেগে উঠেছে তখন বুঝবে যে তোমার ইমান রয়েছে (দুর্বল পর্যায়ের হলেও)। আমরা যদি সত্যকে জানার জন্য ও আত্ম-উন্নয়নের জন্য পবিত্র কুরআন এবং মহানবী (সা.)'র জীবনী ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের বর্ণনাগুলোর প্রতি আগ্রহী না হই তাহলে বুঝতে হবে যে আমাদের ইমান দুর্বল বা অন্তরের চোখ অন্ধ হয়ে গেছে। আর এ জন্যই আধ্যাত্মিক আলোর প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি হচ্ছে না। কেউ যখন অন্ধ হয়ে যায় তখন আলো তার কোনা উপকারেও আসে না।

 

সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নির্দেশের ক্ষেত্রেও মানুষের ইমানের অবস্থা পরীক্ষা করা যায়। যেমন, জালিমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম বা প্রতিরোধ হচ্ছে সর্বোচ্চ পর্যায়ের ইমানের প্রকাশ। মৌখিক প্রতিবাদ হচ্ছে এক্ষেত্রে কিছুটা দুর্বল ইমানের লক্ষণ। আর অন্তরের দিক থেকে ঘৃণা হচ্ছে এক্ষেত্রে সবচেয়ে দুর্বল ইমানের নিদর্শন। কিন্তু কেউ যদি জুলুম ও অন্যায়কে সমর্থন দেয় নীরবে বা প্রকাশ্যে তাহলে সে হয়ে পড়ে জুলুমের শরিক এবং এ ধরনের মানুষের হৃদয় ইমানহীন। ইমানকে পরীক্ষা করে দেখার এমন অনেক উপায় আছে। গাজায় ও লেবাননে যখন ইসরাইল হত্যাযজ্ঞ চালায় তখন কারো কারো নীরবতা, কারো কারো প্রতিরোধ যুদ্ধ বা প্রতিরোধ যোদ্ধাদের প্রতি সহায়তা ও কারো কারো অন্তত মৌখিক নিন্দা ইমানের অবস্থাকে তুলে ধরে। ইয়েমেনে গত কয়েক মাসে একটি আরব দেশের নির্বিচার হামলায় কয়েক হাজার নিষ্পাপ শিশু নিহত হয়েছে! নিহত বেসামরিক নারী ও পুরুষের সংখ্যাও আরও কয়েক হাজার!- কোনো মুসলমানের বিবেক কি এ ধরনের হামলাকে সমর্থন করতে পারে?

 


অনেক সরল-মনা মুসলমান ইরাক ও সিরিয়ার কোনো কোনো অঞ্চলের ওপর পশ্চিমা মদদপুষ্ট তাকফিরি-ওয়াহাবি সন্ত্রাসীদের বিজয়কে বিস্ময়কর সাফল্য বলে মনে করছেন! যদি তাই ঠিক হয় তাহলে তো চেঙ্গিস খান ও হালাগু খানদের নৃশংসতা, গণহত্যা এবং দিগ-বিজয়কেও তাদের উচিত প্রশংসা করা!  

 


যখনই আমরা অনুভব করব যে আমাদের আত্মা মলিন হয়ে আসছে বা ইমান দুর্বল হয়ে পড়ছে, কিংবা নিজের মধ্যে জোরদার হচ্ছে পাশবিক প্রবণতা তখনই আমাদের উচিত তওবা করে মহান আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাওয়া এবং অভিশপ্ত শয়তানের কুমন্ত্রণা থেকে রক্ষার জন্য খোদায়ী দিক-নির্দেশনার প্রার্থনা করা। 



এবারে পড়া যাক অর্থসহ ১১ তম রোজার দোয়া: 


اليوم الحادي عشر : اَللّـهُمَّ حَبِّبْ اِلَيَّ فيهِ الاِْحْسانَ، وَكَرِّهْ اِلَيَّ فيهِ الْفُسُوقَ وَالْعِصْيانَ، وَحَرِّمْ عَلَيَّ فيهِ السَّخَطَ وَالنّيرانَ بِعَوْنِكَ يا غِياثَ الْمُسْتَغيثينَ .
হে আল্লাহ ! এ দিনে সৎ কাজকে আমার কাছে প্রিয় করে দাও আর অন্যায় ও নাফরমানীকে অপছন্দনীয় কর । তোমার অনুগ্রহের উসিলায় আমার জন্য তোমার ক্রোধ ও যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি হারাম করে দাও । হে আবেদনকারীদের আবেদন শ্রবণকারী ।

 

                                                                                         (১২) 

 

মজান মাসে আত্মশুদ্ধির সফল চর্চা ও প্রশিক্ষণ সাধারণ মানুষকে পশুত্বের স্তর থেকে ফেরেশতার স্তরে উন্নত করে। আর মহান আল্লাহর নৈকট্য-প্রাপ্ত মু'মিনরা রমজানের রোজার উসিলায় ফেরেশতাদের চেয়েও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী হতে পারেন। এ জন্য বলা হয় রমজান মাস হচ্ছে আল্লাহর ওলিদের উৎসবের মাস। এই মাস স্রস্টা ও সৃষ্টির মধ্যে সবচেয়ে গভীর সম্পর্ক স্থাপনের মাস। অশেষ রহস্যে ভরা এ মাস খোদাপ্রেমের অভিসারের সবচেয়ে মোক্ষম সময়। আল্লাহর ওলিরা এ মাসে প্রবেশের জন্য সারা বছরই প্রস্তুতি নিতে থাকেন। ফেরেশতারা কী কাজে ব্যস্ত থাকেন? তারা মহান আল্লাহর প্রশংসা ও মহত্ত্ব বর্ণনায় ব্যস্ত থাকেন। রমজান মাসে মানুষও এই একই কাজে মশগুল হওয়ার সুযোগ পান। আসুন আমরা দেখি পবিত্র কুরআনে রমজান সম্পর্কে কী বলা হয়েছে? আল্লাহ বলছেন, এটা এমন এক মাস যে মাসে কুরআন নাজিল হয়েছে। আল্লাহ তো এভাবেও বলতে পারতেন- এটা এমন এক মাস যে মাসে আল্লাহ রোজার বিধান দিয়েছেন! কুরআনে তো রোজা ছাড়াও শত শত বিষয়ের বিধান রয়েছে। অর্থাৎ রোজা হচ্ছে পবিত্র কুরআনের আওতাধীন একটি বিষয়। কুরআন সচেতন মানুষের জন্য ওষুধের সমতুল্য। অন্যদিক কাফির, নাস্তিক ও ফাসিক বা জালিমদের জন্য কুরআন সবচেয়ে অসহনীয় বা তিক্ত বই!


একইভাবে পবিত্র কুরআনের বিরোধীদের কাছে রমজানের চেয়ে অসহ্য ও তিক্ত মাস আর নেই। একইভাবে নিয়মিত পাপাচারে অভ্যস্ত পাপীদের জন্য শবে কদরেরও কোনো গুরুত্ব নেই, বরং রাতটি তাদের জন্য নিকৃষ্টতম রাত। কারণ, শবে কদরের রাতেও যারা গোনাহ করে তাদের গোনাহ কোনো সাধারণ গোনাহ নয়!

 


পবিত্র রমজান মাস হচ্ছে খোদা-প্রেমিকদের জন্য নববর্ষের সূচনা, নৈতিক চরিত্রকে উন্নত করার জন্য নতুন অধ্যায়ের সূচনা। খোদা-প্রেমিকদের প্রেমময় মুনাজাত শুরুর মাস রমজান ও এর শেষের মাস হল শাবান মাস। খোদা-প্রেমিকরা রমজান মাসের আগের মাসে সারা বছরে খোদা-প্রেমের পথে কতটা সক্রিয় ছিলেন ও এ পথে কতটা ভুল-ত্রুটি হল তার পর্যালোচনা করে আরেকটি নতুন বর্ষে তথা রমজান মাসে ভুল-ত্রুটি বা ক্ষতিগুলো পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন।

 


রমজান মাস আল্লাহর পথে দৌড়ানোর ও পরিশ্রম করার মাস। এইসব পরিশ্রমের পুরস্কার রয়েছে ঈদুল ফিতরে। কাজ না করে ও পরিশ্রম না করে তো কোনা পুরস্কার পাওয়া যায় না। 

 

গোনাহর বোঝায় ভারি হয়ে আছে আমাদের সবার পিঠ। আমরা কেউ কি এটা দাবি করতে পারি যে, আল্লাহর কাছে আমার কোনো ঋণ নেই, মানুষের কাছেও আমার কোনো ঋণ নেই? ঋণীকে ঋণ-গ্রহীতার কাছে সম্পদ বা সম্পদের দলিল জামানত রাখতে হয়। অর্থ-সম্পদের ঋণের জন্য জমি, বাড়ি বা গাড়ি ইত্যাদি বন্ধক রাখতে হয়। কিন্তু আল্লাহর কাছে আমাদের যে ঋণ তা শোধের জন্য এইসব বন্ধক রাখা যাবে? নাকি আমাদের সত্তাকেই সমর্পণ করতে হবে আল্লাহর কাছে?


বিশ্বনবী (সা.)'র রমজান সংক্রান্ত নুরানি ভাষণ অনুযায়ী রমজান আমাদের কাছে অনেক কিছুর জ্ঞান তুলে ধরে। যেমন, কিয়ামতের কঠিন অবস্থার চিত্র! সেদিন কেউ কেউ তৃষ্ণার্ত ও ক্ষুধার্ত থাকবে। আর কেউ থাকবে প্রাচুর্যের খনিতে । যারা অবৈধ পন্থায় বা অন্যদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করে সম্পদ গড়তে চেয়েছে, যারা জিনিষ পত্রের দাম বাড়িয়ে বা মজুতদারি করে কিংবা ওজনে কম দিয়ে লাভবান হতে চেয়েছে তারা পরকালে সব সময়ই ক্ষুধার্ত থাকবে। তাই যারা পরকালের ক্ষুধা-তৃষ্ণা থেকে মুক্ত থাকতে চায় বিশ্বনবী (সা.)'র উপদেশ অনুযায়ী তাদের উচিত অন্যদের সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা। 

 

নামাজ ও রোজা ও হজ কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই ধরনের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেয়। হজের সময় ইহরাম অবস্থায় থাকতে হয়। এ সময় অনেক বৈধ বিষয়ও বর্জন করেন হজযাত্রী। আর এই প্রশিক্ষণের আলোকে হজযাত্রী পরে নিজেকে ও সমাজকে সংশোধন করতে পারেন। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, নামাজ মানুষকে অশ্লীলতা থেকে রক্ষা করে। হজ, রোজা ও জাকাতও এই একই বা এই জাতীয় অনেক সুফল দেয়। এভাবে ইসলামের নানা ধরনের ইবাদত মহান আল্লাহর প্রেমিক ও তার যোগ্য প্রতিনিধি হিসেবে মানুষকে গড়ে তোলে এবং মানুষের জন্য নানা কল্যাণ বয়ে আনে।


পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিতে অনেক সময় সন্তান ও সম্পদ মানুষের জন্য বিপদ বা শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। সন্তান যদি সৎ, খোদামুখি ও সুশিক্ষিত না হয় তাহলে তা পরিবারের অন্য সদস্যের ধর্মের জন্য হুমকি হয়ে ওঠে। রমজানে কুরআন অধ্যয়নের মাধ্যমে আমরা এ জাতীয় অনেক বিষয়ে শিক্ষা নিতে পারি।


পবিত্র রমজান হচ্ছে কুরআনের বসন্ত। কুরআনে বর্ণিত আধ্যাত্মিক ও নৈতিক শিক্ষাগুলোর আলোকে নিজেদের অবস্থা পর্যালোচনার মাস হল এই রমজান। পৃথিবীতে সবচেয়ে বুদ্ধিমান ও জ্ঞানী মানুষেরা হলেন নবী-রাসূল এবং আল্লাহর প্রিয়পাত্র ইমাম ও ওলি। যদি বিপথে চলার মধ্যে আনন্দ থাকত তাহলে তারা সেই পথেই চলতেন! কিন্তু তারা বলেছেন, আমরা এই পৃথিবীতে মুসাফির মাত্র। আসল আবাসস্থল হল পরকালে। তাই দুনিয়ার নানা আকর্ষণের টান থেকে মুক্ত থেকে নিজেদের হাল্কা রাখতে হবে। অনেক মানুষের পার্থিব সহায়-সম্পদ কম থাকলেও তাদের লোভের শেষ নেই। আবার অনেক ব্যক্তি অর্থ-সম্পদের প্রাচুর্যের মধ্যে থেকেও সেসবের প্রতি আসক্ত নন। দুনিয়ার চাক-চিক্য, লোভ-লালসা, ক্ষমতা, সম্মান ও খ্যাতিসহ অন্য অনেক আকর্ষণের মোহ কমিয়ে আনা এবং এসবের আসক্তিকে যথাসাধ্য মাত্রায় দমিয়ে রাখার চেষ্টা হচ্ছে রমজানের সিয়াম সাধনার অন্যতম শিক্ষা। 

 

এবারে পড়া যাক অর্থসহ ১২ রোজার দোয়া: 


اليوم الثّاني عشر : اَللّـهُمَّ زَيِّنّي فيهِ بِالسِّتْرِ وَالْعَفافِ، وَاسْتُرْني فيهِ بِلِباسِ الْقُنُوعِ وَالْكَفافِ، وَاحْمِلْني فيهِ عَلَى الْعَدْلِ وَالاِْنْصافِ، وَآمِنّي فيهِ مِنْ كُلِّ ما اَخافُ، بِعِصْمَتِكَ يا عِصْمَةَ الْخائِفينَ .
হে আল্লাহ ! এদিনে আমাকে আত্মিক পবিত্রতার অলঙ্কারে ভূষিত কর। অল্পে তুষ্টি ও পরিতৃপ্তির পোশাকে আবৃত্ত কর । ন্যায় ও ইনসাফে আমাকে সুসজ্জিত কর । তোমার পবিত্রতার উসিলায় আমাকে ভীতিকর সবকিছু থেকে নিরাপদে রাখ। হে খোদা ভীরুদের রক্ষাকারী । 

 

                                                                                   (১৩)  

 

মহান আল্লাহর অশেষ প্রশংসা এবং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত ও ন্যায়পরায়ণ সাহাবিদের শানে অশেষ দরুদ আর সালাম পেশের মাধ্যমে শুরু করছি আজকের আলোচনা।

 

মহান আল্লাহ এমন কোনো বিধান দেননি যা ইহকালে ও পরকালে মানুষের জন্য কল্যাণের ফল্গুধারা বয়ে আনে না। রমজানও মানুষকে পরিপূর্ণ মানুষ হওয়ার পথে এগিয়ে নেয়ার মাধ্যম। মানুষের ব্যক্তিত্ব গঠনে এবং তার আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও নৈতিক উন্নয়নে রোজার রয়েছে অপরিসীম ভূমিকা।

 

প্রাপ্ত-বয়স্ক মুসলমান নর-নারীর জন্য রোজা রাখা ফরজ। নামাজ, হজ ও জাকাতের মতই তা ফরজ। কেউ যদি রমজানে রোজার ফরজ হওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে তাহলে সে কাফির হয়ে যাবে।

 

একজন মুসলমান আল্লাহর বিধান বা নির্দেশের প্রতি অনুগত হয়ে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পানাহার ও বৈধ যৌন আনন্দ থেকে নিজেকে বঞ্চিত রেখে কী অনুভূতি পান? এ হল এমন এক অনুভূতি যে আল্লাহ আপনাকে সব সময়ই দেখছেন ও তিনি সব স্থানেই আছেন এবং আপনি গোপনেও আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করছেন না! এভাবে যেসব খাদ্য ও বিষয় বৈধ ছিল অন্য সময় তা রমজানের ভোর রাত থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আপনি পরিহার করছেন বেশ কষ্ট স্বীকার করে।

 

অন্য কথায় দীর্ঘ অনেক সময় পর্যন্ত আপনি রোজার বিধান অমান্য করার ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও তা করছেন না। আপনি গোপনে কিছু পান করলে বা কিছু খেলেও তো কোনো মানুষ আপনাকে দেখতো না! কিন্তু তা সত্ত্বেও আপনি নিজের প্রবৃত্তিকে দমিয়ে রাখছেন এবং এই সংযম ও খোদাভীরুতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে নিজেই হচ্ছেন নিজের পুলিশ। আর আপনি যখন এভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন তখন আপনি অন্য যে কোনো সময়ও এবং যে কোনো স্থানে সুযোগ পেলেই দুর্নীতি বা ফাঁকিবাজির আশ্রয় নেবেন না, অন্যের অধিকার লঙ্ঘন করবেন না ও কোনো ধরনের পাপে লিপ্ত হবেন না।

 

রমজানে পরস্পরের প্রতি সহানুভূতি, দয়া ও দরিদ্র বা ইয়াতিমদের সহায়তা করার মত নানা মহৎ গুণ বিকাশের মাধ্যমে সামাজিক ঐক্য ও সম্প্রীতিও জোরদার করা যায়। 
রমজান মাস মানব-প্রেম শেখার মাস। নামাজে আমরা সবার জন্য সরল পথ ও মুক্তির পথের কথা উচ্চারণ করি এবং সৎ বান্দাদের প্রতি সালাম দিয়ে থাকি। এর উদ্দেশ্য হল মানুষের সমাজবদ্ধতা ও সামগ্রিক উন্নয়নের দিকে গুরুত্ব আরোপ। মানুষ সামাজিক জীব। তার জন্য স্বার্থপরতা ও আত্মকেন্দ্রীকতা বেমানান। এ জন্যই বলা হয়, যে কেবল নিজের জন্যই দোয়া করে তার দোয়া কবুল হয় না। তাই মহাপুরুষরা অন্য সবার জন্য দোয়া কর পরই নিজের বা নিজের পরিবারের জন্য দোয়া করতেন। বলা হয় যেখানে সমবেতভাবে দোয়া করা হয় সেখানে ৪০ জনের মধ্যে যদি মাত্র একজনও মু'মিন থাকেন তার উসিলায় অন্যদের প্রার্থনাও কবুল করা হয়। তাহাজ্জতের নামাজের কুনুতে চল্লিশ জন মুমিনের জন্য দোয়া করতে বলা হয়েছে। একই কারণে রমজানে আত্মীয়-স্বজনের ও বন্ধু-বান্ধবের খোঁজ-খবর নেয়ার ওপর জোর দেয়া হয়েছে।  



একটি হাদিসে এসেছে, বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, 'মানবজাতি হচ্ছে মহান আল্লাহর পরিবার। তাই তারাই আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় যার তার পরিবারের সবচেয়ে বেশি উপকার বা কল্যাণ করেন।'


বিশ্বনবী (সা.) পথহারা মানুষ ও কাফিরদের মঙ্গল কামনায় উদগ্রীব থাকতেন। কাফিররা অজ্ঞতা ও গোঁড়ামির কারণে সুপথে আসছে না বলে তাদের দুঃখে মহানবীর (সা.) প্রাণ মুবারক যেন দেহছাড়া হওয়ার উপক্রম হত।


পবিত্র কুরআনের সুরা তওবায় বলা হয়েছে, 'আর মুশরিকদের কেউ যদি তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করে, তবে তাকে আশ্রয় দেবে, যাতে সে আল্লাহর কালাম শুনতে পায়, অতঃপর তাকে তার নিরাপদ স্থানে পৌছে দেবে। এটি এজন্যে যে এরা জ্ঞান রাখে না।'

 


খোদা-প্রেমিকদের সব কিছুর আগে হতে হয় মানব-প্রেমিক। রমজানের রোজা আমাদের মানবপ্রেমিক হওয়ার শিক্ষাও দেয়। রমজানে ও এমনকি অন্য সময়ও খোদা-প্রেমিকদের অন্যতম প্রিয় মুনাজাত হল: 'হে আল্লাহ! কবরবাসীদের উৎফুল্ল রাখুন, দরিদ্রদের ধন বা প্রাচুর্য দিন, সব ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান করুন, সব বস্ত্রহীনকে বস্ত্র বা কাপড় দিন, ঋণগ্রস্তকে ঋণমুক্ত করুন, হে আল্লাহ! দুঃখিত বা বিষণ্ণ ব্যক্তিদের খুশি করুন, সব মুসাফিরকে নিরাপদে ঘরে ফিরিয়ে আনুন, সব বন্দীকে মুক্তি দান করুন, সব অসুস্থকে সুস্থতা দান করুন, হে আল্লাহ! মুসলমানদের সমাজ থেকে সব ধরনের দুর্নীতি দূর করুন, হে আল্লাহ! আমাদের মন্দ অবস্থাকে উত্তম অবস্থায় রূপান্তরিত করুন....।' 


রমজানে রোজাদারদের ইফতার করানোর ওপর ব্যাপক জোর দেয়া হয়েছে। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, তোমরা নিজেদের দোযখের আগুন থেকে রক্ষা কর অন্তত একটি খেজুরের অর্ধেক অন্যকে ইফতার করতে দিয়ে বা কিছু না থাকলে সামান্য পানি দিয়ে হলেও! 

 


ইসলাম যে সমাজ কল্যাণের ধর্ম রমজানে অন্যদের ইফতার করানোর ওপর অশেষ গুরুত্ব আরোপ থেকেও তা ফুটে উঠে। পবিত্র রমজান মাসে মৃতদের জন্য ও বিশেষ করে মৃত মা-বাবার জন্য কাঙালি ভোজের আয়োজন আমাদের দেশের একটি ঐতিহ্যবাহী প্রথা। অনেকেই এই প্রথাকে বেদাআত বা কুপ্রথা বলে এই মহতী অনুষ্ঠানটিকে রমজান মাসের বরকত থেকে বিচ্ছিন্ন করতে চান। তারা বলেন, যে এটা তো যে কোনো মাসেই করা যায়। তাহলে প্রশ্ন হল, রমজানের মত বরকতময় মাসে এমন কাঙালি ভোজের আয়োজনে অসুবিধাটা কোথায়? 

 

এবারে পড়া যাক অর্থসহ ১৩ তম রোজার দোয়া: 


اليوم الثّالث عشر : اَللّـهُمَّ طَهِّرْني فيهِ مِنَ الدَّنَسِ وَالاَْقْذارِ، وَصَبِّرْني فيهِ عَلى كائِناتِ الاَْقْدارِ، وَوَفِّقْني فيهِ لِلتُّقى وَصُحْبَةِ الاَْبْرارِ، بِعَوْنِكَ يا قُرَّةَ عَيْنِ الْمَساكينَ .
হে আল্লাহ ! এদিনে আমাকে কলুষতা ও অপবিত্রতা থেকে পবিত্র কর । যা কিছু তকদীর অনুযায়ী হয় তা মেনে চলার ধৈর্য আমাকে দান কর । তোমার বিশেষ অনুগ্রহে আমাকে তাকওয়া অর্জন এবং সৎ কর্মশীলদের সাহচর্যে থাকার তৌফিক দাও । হে অসহায়দের আশ্রয়দাতা । 

 

                                                                                     (১৪)

 

পবিত্র রমজান মাসের প্রাক্কালে এ মাসের রোজার গুরুত্ব সম্পর্কে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) যে ভাষণ দিয়েছিলেন তার আলোকে রমজানে আমরা হলাম মহান আল্লাহর মেহমান। মহান আল্লাহ হলেন আমাদের মেজবান। মহান আল্লাহর আয়োজিত রহমতের এই উৎসবে আমরা কতটা অংশ নিচ্ছি বা এই উৎসবের নানা স্টলে বা প্যাভিলিয়নে কতটা ঢুকতে পেরেছি?


মহান আল্লাহর রহমত সমস্ত সৃষ্টিকুল ও সৃষ্টি জগতের জন্য প্রসারিত রয়েছে। তবে একটি বিশেষ উৎসবে বা ভোজ সভায় আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ব্যাপার। এ উৎসব হল আসলে আমিত্ব, খাদ্য ও পানীয়সহ প্রবৃত্তির নানা চাহিদা ও আশা-আকাঙ্ক্ষা ত্যাগসহ বিভিন্ন বিষয় ত্যাগের তথা আত্মত্যাগের উৎসব। তাই আমরা নিজেকে এ প্রশ্ন করতে পারি যে, আদৌ এ উৎসবে কী আমরা প্রবেশ করতে পেরেছি? আমরা কী আমাদের আত্মাকে আধ্যাত্মিক কামনা-বাসনাসহ নানা ধরনের কামনা-বাসনার দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে পেরেছি? বলা হয় যে যৌবনে নিজেকে সংশোধন করতে পারে না, সে আর কখনও নিজেকে বিশুদ্ধ করতে পারে না। যৌবন পেরিয়ে মানুষ যখন বার্ধক্যের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে তখন সাধারণত তার লোভ-লালসা ও না-পাওয়ার অতৃপ্তি বাড়তেই থাকে। আর এইসব বিষয় মানুষকে আল্লাহ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।


কামনা-বাসনাগুলো দুই ধরনের। এক ধরনের বাসনা হচ্ছে বাহ্যিক ও জৈবিক। আর দ্বিতীয় ধরনের কামনা-বাসনাগুলো হচ্ছে আত্মিক। এইসব আত্মিক বাসনা খোদার পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই সব ধরনের কামনা-বাসনাকে দমনের অনুশীলন জরুরি। বর্তমানে সারা বিশ্বে যত অন্যায়-অবিচার বা দুর্নীতি দেখা যায় এর কারণই হল, মহান আল্লাহর আয়োজিত রহমতের উৎসব বা ভোজসভায় না ঢোকা, কিংবা ঢুকতে পারলেও এই উৎসবকে ব্যবহার করতে না পারা।


সব মানুষকেই রমজানের উৎসবে দাওয়াত দিয়েছেন মহান আল্লাহ। এ উৎসব হচ্ছে ত্যাগের মাস। আর যার মধ্যে বিন্দু পরিমাণ প্রবৃত্তির দাসত্ব-প্রবণতা রয়ে গেছে সে আসলে রমজানের এই উৎসবে প্রবেশ করতে পারেনি, বা প্রবেশ করতে পারলেও সে এই উৎসবকে ব্যবহার করতে পারেনি।


রমজান মাসেও আমরা গিবত, তোহমত, অতি-ভোজন, ভোজন-বিলাস, ঝগড়া-বিবাদ, হিংসা -এসব থেকে দূরে থাকতে পারছি কী? বর্তমান বিশ্বে যত সমস্যা, তা পারিবারিক, ব্যক্তিগত, সামাজিক ও বৈশ্বিক সমস্যা যা-ই হোক না কেন তা হল এই যে আমরা আল্লাহর মেহমান হতে পারিনি।

 

আমরা অনেক সময় মনে করি যে সঠিক পথে চলার জন্য জ্ঞান অর্জনই যথেষ্ট। কিন্তু তা ঠিক নয়। শিক্ষিত মানুষেরা জেনে শুনেও অনেক ক্ষতিকর কাজ করতে পারেন। যেমন, ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এই জ্ঞানটুকু থাকা সত্ত্বেও অনেকেই ধূমপান করে যাচ্ছেন। এভাবে অনেক জ্ঞানই আমাদের কোনো কল্যাণে আসছে না। ধর্মতত্ত্বের ছাত্রদের নৈতিক শিক্ষা দেয়ার ক্ষেত্রে একটি প্রবাদ রয়েছে যে, জ্ঞানী বা ধর্মপ্রচারক হওয়া খুব কঠিন, কিন্তু মানুষ হওয়া (প্রায়) অসম্ভব। 


জ্ঞানপাপীদের তওবা আল্লাহ মৃত্যুর কিছু আগ থেকেই আর কবুল করেন না। কিন্তু অজ্ঞদের তওবা আল্লাহ তাদের জীবনের শেষ মিনিট পর্যন্ত কবুল করে থাকেন। হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী কোনো আলেমের একটি গুনাহ ক্ষমা হবার আগে একজন অজ্ঞ মানুষের ৭০টি পাপ ক্ষমা করা হবে।

 

আগামীকাল ১৫ ই রমজান বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র বড় নাতি হযরত ইমাম হাসান মুজতবা (আ.)'র পবিত্র জন্ম-বার্ষিকী। মুসলিম বিশ্বের যোগ্য ইমাম হিসেবে তাঁকে গড়ে তুলেছিলেন স্বয়ং বিশ্বনবী (সা.), আমিরুল মু'মিনিন আলী (আ.) ও হযরত ফাতিমা জাহরা (সা.)। তাঁর জন্ম হয়েছিল মদীনায় হিজরি তৃতীয় সনে ও মুয়াবিয়ার ষড়যন্ত্রে শহীদ হন হিজরি ৫০ সনে। তিনি সমাহিত হন মদীনার জান্নাতুল বাকিতে। 



মহানবী (সা.) প্রিয় এই নাতিকে কোলে নিয়ে আদর করা ছাড়াও তাঁর সঙ্গে খেলতেন। একবার তিনি এই নাতির জন্য আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে মুনাজাত করে বলছিলেন: হে আল্লাহ! আমি হাসানকে ভালবাসি, তাই আপনিও তাদের ভালবাসুন যারা হাসানকে ভালবাসে।


মহানবী আরো বলেছেন, যারাই হাসান ও হুসাইনকে ভালবাসে আমিও তাদের ভালবাসি, আর আমি যাদের ভালবাসি আল্লাহও তাদের ভালবাসেন, আর আল্লাহ যাদের ভালবাসেন তাদের বেহেশত দান করবেন এবং যারা হাসান ও হুসাইনের সঙ্গে শত্রুতা রাখে তাদেরকে আমিও আমার শত্রু মনে করি, ফলে আল্লাহও তাদের শত্রু হন, আর আল্লাহ তার শত্রুকে জাহান্নামে পাঠাবেন।  


মহানবী (সা.) আরো বলেছেন: হাসান ও হুসাইন বেহেশতি যুবকদের সর্দার। এরা দু' জন আমারই সন্তান। তিনি আরো বলেছেন: হাসান ও হুসাইন-দু'জনই মুসলমানদের ইমাম বা নেতা, তা তাঁরা (তাগুতি শক্তির বিরুদ্ধে) বিপ্লব করুক বা নাই করুক (কিংবা ক্ষমতায় থাকুক বা না থাকুক)।


সমর্থকদের নিষ্ক্রিয়তা ও আদর্শিক বিচ্যুতিসহ নানা দিক থেকে পরিস্থিতি অত্যন্ত প্রতিকূল থাকায় ইমাম হাসান মুজতবা (আ.) মুয়াবিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ-বিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়েছিলেন। কারণ, ইমামের প্রধান সেনাপতিসহ অনেকেই ভেতরে ভেতরে মুয়াবিয়ার কাছে বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। এ সময় তিনি মুয়াবিয়ার সঙ্গে যুদ্ধ অব্যাহত রাখলে ইসলাম পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যেত এবং সুযোগ-সন্ধানী রোমানরা বায়তুল মোকাদ্দাস দখল করে নিত। এ ছাড়াও এ চুক্তির ফলে মুয়াবিয়ার প্রকৃত চেহারা জনগণের কাছে তুলে ধরা সহজ হয়েছিল।


এবারে পড়া যাক অর্থসহ ১৪ রোজার দোয়া: 


اليوم الرّابع عشر : اَللّـهُمَّ لا تُؤاخِذْني فيهِ بِالْعَثَراتِ، وَاَقِلْني فيهِ مِنَ الْخَطايا وَالْهَفَواتِ، وَلا تَجْعَلْني فيهِ غَرَضاً لِلْبَلايا وَالاْفاتِ، بِعِزَّتِكَ يا عِزَّ الْمُسْلِمينَ .
হে আল্লাহ ! এদিনে আমাকে আমার ভ্রান্তির জন্যে জিজ্ঞাসাবাদ করো না । আমার দোষ-ত্রুটিকে হিসেবের মধ্যে ধরো না ।তোমার মর্যাদার উসিলায় আমাকে বিপদ-আপদ ও দুর্যোগের লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত করো না । হে মুসলমানদের মর্যাদা দানকারী। 

                                                                                            

                                                                                         (১৫) 

 

আমরা রোজা রাখা ও নামাজ পড়ার পরও যদি মিথ্যা কথা বলার বা নানা পাপের অভ্যাস ছাড়তে না পারি, তাহলে বুঝতে হবে যে আমাদের নামাজ-রোজা কবুল হচ্ছে না। আর নামাজ-রোজা কবুল হচ্ছে না বলে আমাদের অন্য কোনো দিকেও অগ্রগতি হচ্ছে না। অর্থাৎ আমাদের নামাজ ও রোজা-এসবই এক ধরনের প্রাণহীন অভ্যাস বা অভিনয়ের মত হয়ে পড়ছে। কারণ, নামাজ রোজায় আমরা যে শপথ নিচ্ছি বা যা বলছি তার সঙ্গে আমাদের অন্যান্য আচরণের কোনো মিল নেই। আর এই মিল না থাকার অর্থ হল মুখে আল্লাহকে যতই প্রভু বলি না কেন কাজের বেলায় আল্লাহকে না মেনে নিজের খেয়ালী-প্রবৃত্তিকেই প্রভুতে পরিণত করে নিয়েছি। 

 

তওবা করলে মহান দয়াময় আল্লাহ তাঁর অধিকার সংক্রান্ত যে কোনো পাপ ক্ষমা করবেন, এমনকি তা যদি শির্কের মত কঠিন গোনাহও হয়ে থাকে। কিন্তু কেউ যদি কোনো বান্দাহ'র অধিকার লঙ্ঘন করে থাকে তাহলে ওই ব্যক্তির অধিকার ফিরিয়ে দেয়া বা তার সন্তুষ্টি অর্জন না করা পর্যন্ত মহান আল্লাহ নিজেও এমন ব্যক্তিকে ক্ষমা করবেন না। 

 

আত্মীয়-স্বজনের অধিকার রক্ষাও ইসলামের দৃষ্টিতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পবিত্র কুরআনের সুরা নিসায় আল্লাহ বলছেন: 'আর ইবাদত কর আল্লাহর, শরীক করো না তাঁর সাথে অপর কাউকে। পিতা-মাতার সাথে সৎ ও সদয় ব্যবহার কর এবং নিকটাত্মীয়, এতীম-মিসকিন, প্রতিবেশী, অসহায় মুসাফির এবং নিজের দাস-দাসীর প্রতিও। নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন না দাম্ভিক-গর্বিত-জনকে।


ইসলামের দৃষ্টিতে রক্তের সম্পর্কের আত্মীয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা হারাম। তাই আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ-খবর নেয়ার ওপর জোর দেয়া হয় রমজানের সংস্কৃতিতে। আমাদের দেশে অনেকেই বোনের বা নারী আত্মীয়ের অধিকার রক্ষা করেন না। এ ধরনের মহাপাপের পরিণতি দুনিয়াতেই স্পষ্ট হয়।

 

একবার যুব বয়সী এক সিভিল ইঞ্জিনিয়ার অলৌকিক আধ্যাত্মিক শক্তি ও পবিত্রতার জন্য খ্যাত তেহরানের অধিবাসী শেইখ রজব আলী খাইয়াতের (দর্জি) কাছে এসে জানান যে, তার তৈরি করা বাড়িগুলো বিক্রিও হচ্ছে না ও ভাড়াও হচ্ছে না, অথচ ঋণের চাপে সে দিশেহারা হয়ে আছে! ওই আধ্যাত্মিক সাধক কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, তোমার বোনের কাছে যাও ও তাকে সন্তুষ্ট কর। ইঞ্জিনিয়ার বলল: আমার বোন আমার ওপর সন্তুষ্ট রয়েছেন। শেইখ বললেন, না। এবার ইঞ্জিনিয়ার কিছুটা ভেবে বলল, বাবা মারা যাওয়ার পর উত্তরাধিকার সূত্রে কিছু সম্পত্তি পেয়েছিলাম, সেখান থেকে বোনকে তো কিছুই দেইনি। এই ভেবে সে বোনকে ওইসব সম্পত্তির কিছু অংশ দিল। এরপর সে শেইখের কাছে ফিরে এসে বলল: এবার আমি আমার বোনকে সন্তুষ্ট করেছি। শেইখ কিছুক্ষণ ভেবে বললেন, না এখনও সে সন্তুষ্ট হয়নি। তোমার বোনের কি কোনো বাড়ি আছে? ইঞ্জিনিয়ার বললেন, না। শেইখ বললেন, তোমার নির্মিত সবচেয়ে ভালো মানের অ্যাপার্টম্যান্টগুলো থেকে তাকে একটি দাও। ইঞ্জিনিয়ার তা-ই করল। এর পরপরই তার তিনটি অ্যাপার্টম্যান্ট বিক্রি হয়ে যায় এবং সে অর্থনৈতিক সমস্যা থেকে মুক্ত হয়। 

 

রমজান হচ্ছে খোদাভীতি অর্জনের, চর্চার ও জোরদারের মাস। মানুষ হিসেবে কতটা ভালো হয়েছি তা বিচার করার মাস এই রমজান। রমজানে শয়তান বন্দী থাকে বলে অন্য মাসের চেয়ে এই মাসে খোদাভীতি অর্জন সহজ। অন্য মাসে মানুষকে ভেতর ও বাইরের শয়তান-এ দুয়ের সঙ্গেই লড়াই করতে হয়। রমজানে আমাদের অমার্জিত ইচ্ছেগুলোকে বিবেক ও সুপ্রবৃত্তির আওতায় সংযত বা সুস্থ করা উচিত।

 


রমজান মাসে মহান আল্লাহর ক্ষমা লাভের ব্যাপারে আশাবাদী হওয়া বা সুধারণা রাখা এবং রুজি-রোজগারসহ সব বিষয়ে আল্লাহর ওপর নির্ভরশীলতার সাফল্য সম্পর্কে দৃঢ়-বিশ্বাস পোষণের অনুশীলন বা চর্চা করা জরুরি। কুরআনে মহান আল্লাহর দয়ার ব্যাপারে নিরাশ হওয়াকে কাফিরদের বৈশিষ্ট্য বলে সাবধান করে দেয়া হয়েছে। শয়তান মানুষকে নিরাশ করে তাকে আরও বেশি পাপে জড়াতে চায়।

 


এক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার পর বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য হযরত ইমাম জাফর সাদিক (আ.)'র কাছে এসে পরামর্শ চান। ইমাম তাকে সান্ত্বনা দিয়ে আল্লাহর ওপর ভরসা ও আশা বাড়াতে বললেন। তিনি তাকে বললেন, বাজারে কি তোমার দোকান-ঘর আছে? সে জানাল যে, হ্যাঁ, আছে, তবে কোনো পণ্য নেই। ইমাম বললেন, যাও দোকানটি খুলে পরিষ্কার করে দুই রাকাত নামাজ পড়ে এই দোয়া পড়বে: হে আল্লাহ! আমি আমার সীমিত সক্ষমতাগুলোর ওপর ভরসা করছি না! আমি একমাত্র আপনার অসীম ক্ষমতার ওপরই আস্থাশীল। তাই আমার ক্ষমতা জোরদার করুন ও আমাকে রিজিক দান করুন। আবু তাইয়ারাহ নামের কুফাবাসী ওই ব্যক্তি ইমামের নির্দেশনা অনুযায়ী দোকান খুলে নামাজ ও দোয়া পড়লেন। এক ঘণ্টার মধ্যেই একজন ব্যবসায়ী এসে দোকানের অংশ বিশেষ ভাড়া নেন। এরপর প্রাপ্ত ভাড়ার টাকায় কিছু কাপড় কিনে আবু তাইয়ারাহ। ওই কাপড়গুলো সে এই ব্যবসায়ীর মাধ্যমে সহজেই বিক্রি করতে সক্ষম হন। এভাবে দিনে দিনে তার অবস্থা আবারও ভালো হয়ে যায়। আবারও সে নানা সম্পদ, কর্মচারী ও দাস-দাসীর অধিকারী হয়।

 


বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, আশা হচ্ছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার উম্মতের জন্য এক বিশেষ অনুগ্রহ। যদি আশা না থাকত তাহলে কোনো মা তার শিশুকে দুধ পান করাত না এবং কোনো কৃষক গাছের চারা লাগাতো না।


এবারে পড়া যাক অর্থসহ রমজানের ১৫ তম রোজার দোয়া: 

 


اليوم الخامس عشر : اَللّـهُمَّ ارْزُقْني فيهِ طاعَةَ الْخاشِعينَ، وَاشْرَحْ فيهِ صَدْري بِاِنابَةِ الُْمخْبِتينَ، بِاَمانِكَ يا اَمانَ الْخائِفينَ .
হে আল্লাহ ! এদিনে আমাকে তোমার বিনয়ী বান্দাদের মতো আনুগত্য করার তৌফিক দাও । তোমার আশ্রয় ও হেফাজতের উসিলায় আমার অন্তরকে প্রশস্ত করে খোদাভীরু ও বিনয়ী বান্দাদের অন্তরে পরিণত কর । হে খোদাভীরু মুত্তাকীদের আশ্রয়দাতা । 

 

                                                                                                   (১৬)

 

রমজান মাস তাকওয়া অর্জনের জন্য প্রশিক্ষণের মাস। সুরা বাকারার ২৮৩ নম্বর আয়াত অনুযায়ী রোজার উদ্দেশ্য হল তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন। তাকওয়া শব্দটির অর্থ হল ঢাল নেয়া। মানুষের পার্থিব এই জীবন নানা দিক থেকে প্রকাশ্য ও গোপন শত্রুর নানা ধরনের হামলার হুমকির মুখে রয়েছে। তাই খোদাভীরুকে হতে হয় সব সময়ই শত্রুর বিষয়ে সচেতন ও সংগ্রামী এবং তাকে সংগ্রহ করতে হয় আত্মরক্ষার নানা ধরনের ঢাল। 

 


মানুষের প্রধান অদৃশ্য শত্রু হচ্ছে তার নাফস বা আমিত্বের প্রবৃত্তি। উদ্ধত এই প্রবৃত্তি বিবেক ও খোদা-প্রদত্ত সৎ প্রকৃতির কথা শুনতে চায় না (সুরা শামস-৭), বরং নিজের কোনো কোনো শক্তিকে বেশি গুরুত্ব দেয় (সুরা রুম-২১)। যেমন, সে ভোগ-লিপ্সার চরিতার্থ করার শক্তি বা ক্রোধ কিংবা এ উভয়কেই বেশি গুরুত্ব দিয়ে বিপথে যায়। তাই বলা হয়, মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু হল তার নাফস বা আমিত্বের প্রবৃত্তি। অন্যদিকে মানুষের প্রকাশ্য শত্রু ইবলিসও মানুষের ফিতরাত বা খোদার দেয়া প্রকৃতি, আকল ও ওহির পথ থেকে বিচ্যুত করতে সদা-সচেষ্ট থাকে।



শয়তানের অনুসারী রয়েছে মানুষ ও জিনের মধ্যে। শয়তান আল্লাহর খলিফা হতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ মানুষকে নিজের খলিফা বলে ঘোষণা করায় হিংসায় ক্রোধান্ধ হয়ে শয়তান মানুষকে যে কোনোভাবে খেলাফতের পথ থেকে বিচ্যুত করার শপথ নেয়। (সুরা হজর-৩৮, ৩৯; সোয়াদ-৮১) 

 


শয়তান আদমকে সিজদা করার খোদায়ী নির্দেশ অমান্য করেছিল নিজেকে বড় মনে করত বলে। তার হিংসার উৎসটা ছিল এটাই। সে ভেবেছিল আদম মাটির তৈরি আর সে হল আগুনের তৈরি। কিন্তু সে আদমের মধ্যে মহান আল্লাহর ফুঁকে দেয়া রুহের আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্বের কথা ভাবতেই পারেনি। 
আশার বিষয় হল শয়তান মানুষকে কুমন্ত্রণা দেয়ার চেয়ে বেশি কিছু করতে পারে না। কারণ মানুষের ওপর তাদের কর্তৃত্ব নেই। (ইব্রাহিম-২২)

 

 

তবে সমস্যা হল শয়তানকে খালি চোখে দেখা যায় না; অথচ সে যখন কুমন্ত্রণা দেয় তখন মানুষ সেসবকে নিজেরই চিন্তা ও সিদ্ধান্ত বলে মনে করে। (আরাফ-২৭) ফলে ক্রোধ ও ভোগ-লিপ্সার প্রবৃত্তিকে দিয়ে মানুষ পাপে লিপ্ত হয়। আর পাপ করতে করতে অবস্থা এমন হয় যে তার ভাল-মন্দ বোঝার জ্ঞানও হারিয়ে যায়। (সুরা মুতাফফিন-১৪) বরং এ অবস্থায় সে মন্দকে মনে করে পুণ্য আর ভালোকে মনে করে মন্দ! কিংবা মিথ্যাকে মনে করে সত্য আর সত্যকে মনে করে মিথ্যা! (আরাফ-১৭৯) কারণ, এ অবস্থায় মানুষের চোখ ও কানের ওপর পর্দা পড়ে যায় এবং অন্তরও হয়ে যায় তালাবদ্ধ (বাকারা-৭, জাসিয়া-২৩, তওবা-৮৭, মুনাফিকুন-৩) । 


এভাবে পাপী মানুষ খোদায়ী প্রত্যাদেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শয়তানের বাণীর দাস হয় ও সত্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও বিতর্ক শুরু করে। (আনআম-১২১)
মানুষকে এই শোচনীয় দুর্দশা ও শয়তানের দাসত্ব থেকে মুক্ত করতেই মহান আল্লাহ দিয়েছেন নানা কর্মসূচি। মাহে রমজানের রোজা হল এমনই এক নেয়ামত। এই মাসে শয়তান অন্য সময়ের মত অবাধে তার তৎপরতা চালাতে পারে না। তাই রমজান হচ্ছে আল্লাহর দিকে ফিরে আসার ও আত্ম-সংশোধনের এক অসাধারণ বা সুবর্ণ সুযোগ। 

 


পুরো এক মাস সংযম চর্চার ফলে রমজানে যে শক্তি অর্জন করে রোজাদার তার বলে মানুষ পুরো বছর জুড়ে শয়তানের কুমন্ত্রণাকে প্রতিহত করতে পারে এবং পরিপূর্ণ তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জনের পদক্ষেপ নিতে পারে। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, “হে মানুষ! নিঃসন্দেহে তোমাদের সামনে রয়েছে আল্লাহর বরকতপূর্ণ মাস। এ মাস বরকত, রহমত বা অনুগ্রহ ও ক্ষমার মাস। এ মাস মহান আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ মাস। এ মাসের দিনগুলো সবচেয়ে সেরা দিন, এর রাতগুলো শ্রেষ্ঠ রাত এবং এর ঘণ্টাগুলো শ্রেষ্ঠ ঘণ্টা।" 

 


মুমিন এই মাসে আল্লাহর মেহমান। তাই এ মাসে মুমিনের ঘুম ইবাদতের সমতুল্য ও নিঃশ্বাসগুলো জিকিরের সমতুল্য। এ মাসের এক রাতের ইবাদত অন্য মাসের হাজার রাতের ইবাদতের সমান। এ মাসে কবুল হয় দোয়া। এ মাসে এক আয়াত কুরআন তিলাওয়াত পুরো কুরআন তিলাওয়াতের সাওয়াব এনে দেয়। এ মাসে মুমিনের তওবার অশ্রুতে ধুয়ে মুছে যায় অতীতের গোনাহগুলো। কুরআন নাজিল হওয়ার এ মাসে দেহ ও প্রবৃত্তির ওপর বিজয়ী হয়ে মু’মিন ফিরে আসেন খোদার দিকে। তাই রমজান হচ্ছে মানুষের জন্য আল্লাহর মহাঅনুগ্রহের মাস। এ মাসে মুমিন আল্লাহর মেহমান। তাই তার নিশ্বাস ও ঘুমও সাওয়াবের পরিণত হয়!

 


তবে যে কোনো উৎসবের অতিথি হতে হলে অতিথিকেও কিছু শর্ত বা নিয়ম মেনে চলতে হয়। আর রমজানের অতিথি হওয়ার শর্ত হল পবিত্র অন্তর ও সৎ ইচ্ছা বা নিয়ত। আল্লাহর কাছেই পবিত্র অন্তরে চাইতে হবে প্রকৃত রোজাদার হওয়ার সাফল্য ও কুরআন তিলাওয়াতের সৌভাগ্য। বিশ্বনবী (সা.)’র মতে সে ব্যক্তি হতভাগা যে ক্ষমার এমন মাসেও আল্লাহর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হয়। 



"হে আমাদের ইলাহ্! আমাদেরকে ঐ সব ব্যক্তির অন্তর্ভুক্ত করবেন না যাদের থেকে আপনি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন এবং যাদের ভুল-ত্রুটি তাদেরকে আপনার ক্ষমা থেকে বাধাগ্রস্ত করেছে। হে আমাদের ইলাহ্! আপনি আমাদেরকে সব কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একমাত্র আপনার দিকে পুরোপুরি রুজু হওয়ার তওফিক দিন। আমাদের অন্তরের চোখগুলোকে আপনার দিকে দৃষ্টি দেয়ার মাধ্যমে আলোকিত করে দিন যাতে করে আমাদের অন্তঃ-চক্ষুর দৃষ্টি আলোর পর্দাগুলো ভেদ করে মহত্ত্বের খনিতে গিয়ে উপনীত হয় এবং আপনার পবিত্র সত্তার সম্মানের সাথে আমাদের আত্মা সংযুক্ত হয়।"


এবারে পড়া যাক অর্থসহ ১৬ তম রোজার দোয়া:


اليوم السّادس عشر : اَللّـهُمَّ وَفِّقْني فيهِ لِمُوافَقَةِ الاَْبْرارِ، وَجَنِّبْني فيهِ مُرافَقَةَ الاَْشْرارِ، وَآوِني فيهِ بِرَحْمَتِكَ اِلى دارِ الْقَـرارِ، بِاِلهِيَّتِكَ يا اِلـهَ الْعالَمينَ .
হে আল্লাহ ! এ দিনে আমাকে তোমার সৎবান্দাদের সাহচর্য লাভের তৌফিক দাও। আমাকে মন্দ লোকদের সাথে বন্ধুত্ব থেকে দূরে সরিয়ে রাখো। তোমার খোদায়ীত্বের শপথ করে বলছি, আমাকে তোমার রহমতের বেহেশতে স্থান দাও। হে জগতসমূহের প্রতিপালক।

 

                                                                                               (১৭)

 

আল্লাহর প্রতি ইয়াকিন বা দৃঢ়-বিশ্বাস ও ভরসা করা হচ্ছে খাঁটি মু'মিনের বৈশিষ্ট্য। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, তোমরা মন-ভাঙ্গা হয়ো না, হীনবল হয়ো না, তোমরাই বিজয়ী হবে যদি তোমরা মুমিন হও। মহান আল্লাহ সুরা ইব্রাহিমে বলেছেন, যদি কৃতজ্ঞতা স্বীকার কর, তবে তোমাদেরকে আরও দেব এবং যদি অকৃতজ্ঞ হও তবে নিশ্চয়ই আমার শাস্তি হবে কঠোর। (৭ নম্বর আয়াত)  


রমজান মাস হচ্ছে মহান আল্লাহর প্রতি হৃদয়ে ইয়াকিন বা দৃঢ় বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠিত করার মাস। আমাদের প্রচেষ্টা যদি আন্তরিক তথা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে তাহলে আল্লাহ আমাদের সমস্ত বৈধ দোয়া কবুল করবেন- এ ব্যাপারে আমাদের নিশ্চিত হওয়া উচিত।


মহান আল্লাহ আমাদের সব সমস্যার সমাধান দিতে পারেন এই দৃঢ়-বিশ্বাস আমাদের রাখা উচিত। আমাদের সমস্ত সমস্যার মূল কারণই এটা যে, আমরা এসব বিষয়ে আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করি না। আন্তরিক-চিত্তে খোদায়ী পথ-নির্দেশনা চাইলে ও সাহায্য চাইলে আল্লাহ অবশ্যই তা কবুল করবেন-এই দৃঢ় বিশ্বাস আমাদের রাখা উচিত। যা ঘটা আপাত দৃষ্টিতে অসাধ্য বলে মনে হয় তাও আল্লাহর সহায়তায় সাধন করা সম্ভব।


ইরানের তাব্রিজ শহরের বড় বাজারে একজন দিন-মজুর শ্রেণীর খোদাভীরু বৃদ্ধ ব্যক্তি কাজ করতেন। একদিন তিনি দেখছিলেন যে এক বালক বাজারের ছাদের আলো প্রবেশের পথ দিয়ে পড়ে যাচ্ছে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন: হে আল্লাহ! এই বালককে রক্ষা করুন। ফলে বালকটি শূন্যের মধ্যেই স্থির হয়ে থাকে। আর এ অবস্থায় তাকে মাটিতে নামান ওই শ্রমিক! ঘটনা দেখে বাজারের জনতার ভিড় জমে যায়। সবাই তাকে প্রশ্ন করছিলেন, আপনি কী এমন আমল করেছেন যে এভাবে বালকটিকে রক্ষা করতে পারলেন? আপনি কি একজন দরবেশ? ওই শ্রমিক বললেন, আমি বিগত ৬০ বছর ধরে আমার জানামতে কোনো পাপ করিনি এবং আল্লাহর নির্দেশ বা ফরজ কাজগুলো মেনে চলার চেষ্টা করেছি, তাই আল্লাহ আমার এই একটি প্রার্থনা কেনো কবুল করবেন না?

 


অনেক খোদাভীরু ব্যক্তির কথা জানা যায় যারা 'বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম' বলে নদীর পানির ওপর দিয়ে এমনভাবে হেঁটে নদী পার হয়েছেন যেভাবে আমরা পার হই মাটির প্রান্তর বা রাস্তা। তাই যারা আল্লাহর ওলি তারা মুহূর্তেই পার হয়ে যান সমুদ্র এবং মুহুর্তের মধ্যে তারা চলে যেতে পারেন এক মহাদেশ থেকে আরেক মহাদেশে! আর আমরা এসব অলৌকিক ঘটনা শুনে বলি: এসব কী করে সম্ভব!!? অন্যদিকে আল্লাহর প্রিয়পাত্রদের জন্য এসব খুবই সাধারণ ঘটনা।

 

আজ ১৭ রমজান। ঐতিহাসিক বদর যুদ্ধ-দিবস। দ্বিতীয় হিজরির এই দিনে মুসলমানরা অসম এক যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছিল কাফিরদের ওপর। এটি ছিল ইসলামের ইতিহাসের প্রথম সুসংগঠিত বা বড় ধরনের যুদ্ধ। অবশ্য কুরাইশ কাফিরদের বাণিজ্য কাফিলাকে বাধা দেয়ার লক্ষ্যে ও তাদের সম্পদ আটকের জন্যই একদল মুসলিম মুজাহিদ বিশ্বনবীর (সা.) নেতৃত্বে মদীনা থেকে বেরিয়ে আসেন। কাফিররা মক্কায় মুসলমানদের অনেক সম্পদ আটক করে রেখেছিল। তাই এ ধরনের হামলার অধিকার মুসলমানদের ছিল। তবে বড় ধরনের কোনো যুদ্ধ হবে বলে মুসলমানদের কেউই ভাবেননি এবং সে জন্য প্রস্তুতিও ছিল না। কিন্তু কুরাইশ কাফিরদের শীর্ষস্থানীয় নেতা আবু সুফিয়ান তার বাণিজ্য কাফিলার ওপর মুসলমানদের হামলার প্রস্তুতির খবর জানতে পেরে সেই খবর মক্কার কাফিরদের জানালে অনেক কাফির নেতা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। ফলে তারা একটি সুসংগঠিত যুদ্ধের আয়োজন করে এবং মুসলমানরাও মহানবীর (সা.) নেতৃত্বে কাফিরদের মোকাবেলা করতে বাধ্য হন।


এ যুদ্ধে মুসলিম মুজাহিদদের সংখ্যা মাত্র ৩১৩ জন হওয়া সত্ত্বেও তারা মক্কার সুসজ্জিত প্রায় এক হাজার কাফিরের ওপর বিজয়ী হয়েছিলেন। মহান আল্লাহর অদৃশ্য সাহায্য থাকাতেই তা সম্ভব হয়েছে। এ যুদ্ধে কাফির বাহিনীর ৭০ জন মুজাহিদদের হাতে নিহত এবং তাদের ৭০ জন মুসলিম বাহিনীর হাতে বন্দী হয়।
অন্যদিকে মুসলিম বাহিনীর ১৪ জন শাহাদত বরণ করেন। মুসলমানদের পক্ষে এই যুদ্ধের প্রধান বীর ছিলেন আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আ.)। তিনি একাই ৩৬ জন কাফিরকে হত্যা করেছিলেন যাদের মধ্যে অনেকেই ছিল নেতৃস্থানীয় কাফির সর্দার ও তৎকালীন আরব বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় খ্যাতিমান যোদ্ধা ।


বহু বছর পরে মুয়াবিয়া হযরত আলী (আ.)'র খেলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করলে এক চিঠিতে আমিরুল মু'মিনিন তাকে সতর্ক করে দিয়ে লিখেছিলেন, “যে তরবারি দিয়ে আমি তোমার নানা (উৎবা), তোমার মামা (ওয়ালিদ) ও ভাই হানজালার ওপর আঘাত হেনেছিলাম (তথা তাদের হত্যা করেছিলাম) সে তরবারি এখনও আমার কাছে আছে।” 


বদর যুদ্ধে মুসলিম সেনাদলে ছিলেন বিরাশি জন মুহাজির। এ ছাড়াও মদিনার খাজরাজ গোত্রের একশ’ সতের জন এবং আওস গোত্রের একষট্টি জন লোক ছিলেন। এই সেনাদলে মাত্র তিনটি ঘোড়া ও সত্তরটি উট ছিল। 


ইসলামের সে যুগে মুসলিম সমাজে আত্মত্যাগ ও শাহাদাতের আকাঙ্ক্ষা এতটা তীব্র ছিল যে, অনেক অপ্রাপ্তবয়স্ক বালকও সে যুদ্ধে অংশগ্রহণের আগ্রহ ব্যক্ত করেছিল; কিন্তু রাসূল (সা.) তাদেরকে মদীনায় ফিরিয়ে দেন। 


প্রকৃতপক্ষে কুরাইশদের কাফেলাগুলোর ওপর মুসলমানদের আক্রমণের কারণ ছিল মুসলমানদের প্রতি তাদের নির্যাতনমূলক আচরণ যা কোরআনও উল্লেখ করেছে এবং মুসলমানদের এ আক্রমণের অনুমতি দিয়ে বলেছে : 


'' যাদের প্রতি আক্রমণ করা হয়েছে তাদের প্রতিরোধের অনুমতি দেয়া হলো। কারণ তারা নির্যাতিত হয়েছে এবং নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তাদের সাহায্য করতে পূর্ণ ক্ষমতাবান।'' (সুরা হজ, ৩৯)


এবারে পড়া যাক অর্থসহ ১৭ রমজানের দোয়া: 

 


اليوم السّابع عشر : اَللّـهُمَّ اهْدِني فيهِ لِصالِحِ الاَْعْمالِ، وَاقْضِ لي فيهِ الْحَوائِجَ وَالاْمالَ، يا مَنْ لا يَحْتاجُ اِلَى التَّفْسيرِ وَالسُّؤالِ، يا عالِماً بِما في صُدُورِ الْعالَمينَ، صَلِّ عَلى مُحَمَّد وَآلِهِ الطّاهِرينَ .
হে আল্লাহ ! এ দিনে আমাকে সৎকাজের দিকে পরিচালিত কর। হে মহান সত্ত্বা যার কাছে প্রয়োজনের কথা বলার ও ব্যাখ্যা দেয়ার দরকার হয় না । আমার সব প্রয়োজন ও আশা-আকাঙ্খা পূরণ করে দাও। হে তাবত দুনিয়ার রহস্যজ্ঞানী ! হযরত মুহাম্মদ (সঃ) এবং তাঁর পবিত্র বংশধরদের ওপর রহমত বষর্ণ কর। 

 

                                                                                      (১৮) 

মহান আল্লাহর অশেষ প্রশংসা এবং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত ও ন্যায়পরায়ণ সাহাবিদের শানে অশেষ দরুদ আর সালাম পেশের মাধ্যমে শুরু করছি আজকের আলোচনা। 


বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, সব কিছুরই একটি ভিত্তি রয়েছে, আর ইসলামের ভিত্তি হচ্ছে আমাদের প্রতি তথা আমার পবিত্র বংশধরদের (আহলে বাইতের) প্রতি ভালবাসা।


তিনি আরও বলেছেন, 'প্রত্যেক বিষয়েরই রয়েছে জাকাত। আর শরীর বা দেহের জাকাত হচ্ছে রোজা।'


ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য রিজিক হালাল হওয়া খুবই জরুরি। হালাল রিজিকের প্রভাব শুধু নিজের দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্যের জন্যই যে জরুরি তা নয়, নিজের সন্তানের ওপরও এর প্রভাব থাকে। রুজি-রোজগারের মধ্যে খুব সামান্য ও এমনকি বিন্দু পরিমাণ হারাম এবং সুদের প্রভাব সন্তানের মধ্যে প্রকাশ পায়। এ সংক্রান্ত অনেক ঘটনা ধর্মীয় সাহিত্যে স্থান পেয়েছে।


একবার প্রাচীন যুগের একজন বিশ্বখ্যাত আলেম তার শিশু পুত্র সন্তানকে মসজিদে নিয়ে আসেন। ওই শিশুকে অজুখানার কাছে বসিয়ে তিনি নামাজ আদায় করতে মসজিদে যান। ফিরে এসে দেখেন যে তার শিশু-পুত্র মুসল্লিদের ওজুর পানি তোলার পাত্রটি পেরেক জাতীয় কোনো কিছু দিয়ে ফুটো করে দিয়েছে। ওই আলেম দুঃখিত ও বিস্মিত হয়ে ভাবতে লাগলেন কেনো এমন হল? ঘরে ফিরে স্ত্রীকে এই ঘটনা জানালে তিনি জানান, আমি বুঝতে পেরেছি যে কেনো এই মন্দ কাজটি আমাদের পুত্র করেছে। এ জন্য আসলে আমিই দায়ী। ও যখন আমার গর্ভে ছিল তখন আমি অনুমতি না নিয়ে এক ব্যক্তির বাগানের একটি ডালিমের মধ্যে সুঁই দিয়ে খোঁচা দিয়েছিলাম এবং সুঁইয়ে লেগে-থাকা ডালিমের রস জিভে লাগিয়েছিলাম!

 


ইমাম হুসাইন (আ.) একজন নিষ্পাপ ইমাম এবং বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিপূর্ণ মহামানব হওয়া সত্ত্বেও কারবালায় তাঁর যুক্তিপূর্ণ আহ্বান ও বক্তব্যে মুসলমান নামধারী ইয়াজিদ বাহিনীর মন বিন্দুমাত্র গলেনি। ইমামের মতে, এর কারণ ছিল হারাম খাদ্যের প্রভাব। 
আমাদের জীবনে যদি এ জাতীয় ঘটনা ঘটে থাকে যে আমরা কেউ অন্যের এক পয়সা মূল্যেরও কিছু ভোগ করেছি বিনা অনুমতিতে এবং এ জন্য পরে মালিকের সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করিনি তাহলে অবিলম্বে ক্ষমা বা সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্যোগ নেয়া উচিত। যদি মালিক মারা গিয়ে থাকেন তাহলে তার সন্তানদের কাছে ক্ষমা চাইতে হবে। যদি তাদের কাউকেই পাওয়া সম্ভব না হয় তাহলে তাদের নামে সদকা দেয়া উচিত।

 


আজ ১৮ রমজান শেষ হয়ে ১৯ তম রমজান শুরু হতে যাচ্ছে। আজ হতে ১৩৯৬ চন্দ্র-বছর আগে ৪০ হিজরির এই দিনে তথা ১৮ ই রমজানের দিন শেষে ১৯ রমজানের ভোর বেলায় ইবনে মোলজেম নামের এক ধর্মান্ধ খারেজি ফজরের নামাজে সেজদারত আমীরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আঃ)'র মাথায় বিষ-মাখানো তরবারি দিয়ে আঘাত হানায় দুই দিন পর তিনি শাহাদত বরণ করেন। এ ঘটনা ঘটেছিল কুফার গ্র্যান্ড মসজিদে।


আলী (আ.) সর্বত্র প্রকৃত ইসলাম ও ন্যায়-বিচার কায়েমের তথা সংস্কারের পদক্ষেপ নিয়েছিলেন বলেই সুবিধাবাদী, মুনাফিক এবং স্বল্প-জ্ঞানী ধর্মান্ধ ও বিভ্রান্ত শ্রেণীগুলো তাঁর শত্রুতে পরিণত হয়েছিল। যেমন, তিনি খিলাফত লাভের পর সব সাহাবির জন্য সরকার-প্রদত্ত ভাতা সমান করে দিয়ে রাসূল (সা.) সুন্নাত পুন:প্রবর্তন করেছিলেন। ফলে অনেকেই তাঁর শত্রুতে পরিণত হয়।

 

হযরত আলী (আ.) জানতেন সত্যের পথে অবিচল থাকলে অনেক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও নেতা তাঁকে ত্যাগ করবেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি ন্যায়-বিচারের পথ ত্যাগ করেননি। ফলে শাহাদতের উচ্চ মর্যাদা অর্জন করেছিলেন হযরত আলী (আ.)। মুয়াবিয়া যখন বায়তুল মালের সম্পদ অবাধে ব্যবহার করে নিজের পক্ষে সুযোগ সন্ধানী লোকদের টেনে দল ভারী করতো, তখন মুয়াবিয়ার বিদ্রোহের সম্মুখীন হওয়া সত্ত্বেও হযরত আলী (আঃ) তাঁর গভর্নরদের মাধ্যমে ব্যবহৃত বায়তুল মালের সম্পদের প্রতিটি পয়সার হিসেব নিতেন।

 

আলী (আ.)-এর জীবনের শেষ রমজান মাস ছিল অন্য এক রকম রমজান। এ মাস ভিন্ন এক পবিত্রতা নিয়ে বিরাজ করছিল। হযরত আলী(আ.) বলেছেন,‘ মানুষ কি ভেবে নিয়েছে আমরা ঈমান এনেছি এ কথা বললেই তাদের ছেড়ে দেয়া হবে এবং তাদেরকে পরীক্ষা করা হবে না- এই আয়াত (আনকাবুত ১-২) যখন নাযিল হলো তখন বুঝতে পারলাম রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মৃত্যুর পর এ উম্মতের জন্য ফিতনা ও কঠিন পরীক্ষা আসবে। তখন রাসূলকে প্রশ্ন করলাম : হে রাসূলাল্লাহ্! এ আয়াতে আল্লাহ যে ফিতনার কথা বলছেন সেটা কি? তিনি বললেন : ‘হে আলী! আমার পর আমার উম্মত পরীক্ষার সম্মুখীন হবে।’ যখন আলী শুনলেন রাসূল মৃত্যুবরণ করবেন এবং তাঁর পরে কঠিন পরীক্ষা আসবে তখন ওহুদের যুদ্ধের কথা স্মরণ করে বললেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ্! ওহুদের দিনে যারা শহীদ হওয়ার তাঁরা শহীদ হলেন, আমি শাহাদাত থেকে বঞ্চিত হলাম এবং খুবই দুঃখ পেয়ে আপনাকে প্রশ্ন করলাম, কেন এ মর্যাদা আমার হলো না। আপনি বলেছিলেন, যদিও এখানে শহীদ হওনি কিন্তু অবশেষে শাহাদাত তোমার ভাগ্যে ঘটবে।’ আলী(আ.) এ সময় পঁচিশ বছরের যুবক ছিলেন এবং এক বছর হলো হযরত ফাতিমা যাহরা (সা.)-কে বিবাহ করেছেন ও এক সন্তানের জনক। এ বয়সের যুবক যখন জীবনকে সুন্দরভাবে সাজানোর স্বপ্ন দেখে তখন থেকেই আলী(আ.) ছিলেন শাহাদাতের প্রত্যাশী! 

 

শাবান মাসের শেষ শুক্রবারে রমজানের ফজিলত সম্পর্কে বলতে গিয়ে বিশ্বনবী (সা.) ভাষণের শেষ পর্যায়ে কাঁদতে থাকেন। তা দেখে হযরত আলী (আ.) এর কারণ জানতে চান। জবাবে মহানবী বহু বছর পর রমজান মাসে আলী (আ.)'র মর্মান্তিক শাহাদতের ভবিষ্যদ্বাণীর কথা উল্লেখ করলেন। তিনি বললেন,"হে আলী, এই মাসে তোমার ওপর যা নেমে আসবে সে জন্য আমি কাঁদছি। আমি নিজেকে কল্পনা করছি তোমার স্থানে যখন তুমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছ এবং সামুদ জাতির কাছে পাঠানো খোদায়ী উটের পা কর্তনকারী লোকটির মতই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তিটি তোমার মাথার ওপর আঘাত হানবে এবং তোমার দাড়ি তাতে (রক্তে) রঞ্জিত হবে।"

 

নিজের শাহাদতের ভবিষ্যদ্বাণীর কথা শুনে সব কিছুর আগে হযরত আলী (আ.)'র মনে যে চিন্তাটির উদয় হয়েছিল তা এই বস্তু-জগত সম্পর্কিত ছিল না, বরং তা ছিল নিজের ঈমান সম্পর্কিত। তাই তিনি প্রশ্ন করলেন: " হে আল্লাহর রাসূল! সে সময় আমি কী ঈমানের ওপর অবিচল থাকব? "রাসূল (সা.) বললেন: " হ্যাঁ, সে সময় তোমার ঈমান নিরাপদ থাকবে।" 

 

বিশ্বনবী (সা.) আরো বলতে লাগলেন,

 

"হে আলী, যে তোমাকে হত্যা করে সে (বাস্তবে) আমাকে হত্যা করল, যে তোমাকে বিরক্ত করে সে আমাকে বিরক্ত করল এবং যে তোমার অবমাননা করল সে আমার অবমাননা করল, কারণ তুমি আমার আত্মা বা প্রাণের সমতুল্য। তোমার ও আমার মানসিকতা এবং স্বভাব অভিন্ন। নিঃসন্দেহে প্রশংসিত ও গৌরবান্বিত আল্লাহ প্রথমে আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং এরপর সৃষ্টি করেছেন তোমাকে,তিনি প্রথমে বেছে নিয়েছেন আমাকে এবং এরপর বেছে নিয়েছেন তোমাকে। আল্লাহ আমাকে নবুওতের জন্য মনোনীত করেছেন, আর তোমাকে মনোনীত করেছেন ইমামতের জন্য। আর যে তোমার ইমামতকে অস্বীকার করবে সে (কার্যত) আমার নবুওতকে প্রত্যাখ্যান করল। হে আলী, তুমি আমার উত্তরাধিকারী, আমার সন্তানদের তথা নাতী-নাতনীর পিতা এবং আমার কন্যার স্বামী আর আমার উম্মতের জন্য আমার জীবদ্দশায় ও আমার মৃত্যুর পর আমার প্রতিনিধি বা খলিফা। তোমার নির্দেশ হল আমারই নির্দেশ, তোমার নিষেধাজ্ঞা হল আমারই নিষেধাজ্ঞা। সেই শক্তির শপথ করে বলছি যেই শক্তি আমাকে নবুওত দান করেছেন এবং আমাকে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে তৈরি করেছেন, তুমি হচ্ছ সৃষ্টিকুলের জন্য হুজ্জাতুল্লাহ বা আল্লাহর নিদর্শন এবং তাঁর রহস্যগুলোর আমানতদার বা ট্রাস্টি ও সৃষ্টিকুলের ওপর আল্লাহর খলিফা।" 

 

আলী (আ.) জিহাদ থেকে ফিরে আসলে মহানবী (সা.) তাঁকে অভ্যর্থনা জানাতে যেতেন এবং তাঁর মুখের ঘাম মুছে দিতেন নিজ হাতে। তাঁকে জিহাদ বা সফরের সময় বিদায় দিতে গিয়ে তাঁর বিজয়ের জন্য দোয়া করতেন এবং বলতেন: হে আল্লাহ, আলীর সঙ্গে এটাই যেন আমার শেষ দেখা না হয় কিংবা বলেছেন: হে আল্লাহ, আমার মৃত্যুর আগে আলীকে যেন আরো একবার দেখতে পারি ।

 


আলী (আ.) বলেছেন, উট-শাবক যেমন মায়ের পিছে পিছে থেকে সব সময় মাকে অনুসরণ করে আমিও শৈশব থেকেই রাসূল (সা.)-কে সেভাবে অনুসরণ করতাম। রাসূল শৈশবে আমাকে কোলে নিতেন, খাইয়ে দিতেন, ঘুম পাড়িয়ে দিতেন ও বুকে চেপে ধরতেন। রাসূলের (সা.) কাছে ওহি নাজিল হওয়ার সময় আমিও দেখতে পেতাম ফেরেশতাদের। মহানবী (সা.) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন আলী (আ.)'র কোলে মাথা রেখেই এবং তাকে গোসলও দেন তিনি।

 


হযরত আলী (আ.)’র বিরুদ্ধে সিরিয়ায় বিদ্রোহ শুরু করার পেছনে মুয়াবিয়ার অজুহাত ছিল তৃতীয় খলিফার হত্যাকাণ্ডের বিচার। এটা যে নিছক অজুহাতই ছিল তার প্রমাণ হল হযরত আলী (আ.)’র শাহাদতের পর মুসলিম বিশ্বের সব অঞ্চল ছলে বলে কৌশলে করায়ত্ত করা সত্ত্বেও এই উমাইয়া শাসক আর কখনও তৃতীয় খলিফার হত্যাকারীদের বিচারের কথা মুখেও উচ্চারণ করেনি। দ্বিতীয় খলিফার শাসনামল থেকেই সিরিয়ায় প্রায় স্বাধীন রাষ্ট্র প্রধানের মত চালচলনে অভ্যস্ত মুয়াবিয়া জানত যে হযরত আলী (আ.)’র মত কঠোর ন্যায়-বিচারক শাসক তাকে কখনও ছোট বা বড় কোনো পদই দেবেন না। তাই আলী (আ.) খলিফা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অন্য অনেক দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার মত মুয়াবিয়াকেও পদচ্যুত করলে ইসলামের ইতিহাসে রাজতন্ত্র প্রবর্তনকারী মুয়াবিয়া সিরিয়ায় বিদ্রোহের পতাকা উত্তোলন করে।

 

 মুয়াবিয়া সিরিয়াতে বহু বছর ধরে গভর্নর ছিল। সেখানে আলী (আ.) ও তাঁর পরিবার এবং বংশধরদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের কুৎসা রটনা ও গালি দেয়ার প্রচলন শুরু করেছিল মুয়াবিয়া। এই নোংরা প্রথাটি বন্ধ করেছিল ইতিহাস-খ্যাত দ্বিতীয় ওমর। বিশ্বনবী (সা.)'র আহলে বাইত ও আলী-পরিবারের বিরুদ্ধে বিষাক্ত প্রচারণার প্রভাবে সিরিয়ার জনগণ এতটাই বিভ্রান্ত হয়েছিল যে, আলী (আ.) কুফার মসজিদে শহীদ হয়েছেন শুনে দামেস্কের অনেকেই প্রশ্ন করেছিল: আলী মসজিদে মারা গেল কিভাবে! সে কি নামাজ পড়ত?!

 

বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের বিরুদ্ধে মুয়াবিয়াসহ উমাইয়া শাসকদের কূটকৌশল, ষড়যন্ত্র আর মিথ্যা প্রচার প্রসঙ্গে বাংলাদেশের জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম লিখেছেন:

এই ধূর্ত ও ভোগীরাই তলোয়ারে বেঁধে কোরআন,
আলী'র সেনারে করেছে সদাই বিব্রত পেরেশান !
এই এজিদের সেনাদল শয়তানের প্ররোচনায় 
হাসানে হোসেনে গালি দিতে যেত মক্কা ও মদিনায়।..... 
বিশ্বনবী (সা.) তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীতে বলেছিলেন, আমার পরে তোমারা নাকিতুন, কাসিতুন ও মারিকুনদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। যারা জামাল যুদ্ধে হযরত আলী (আ.)'র বিপক্ষে লড়াই করেছিল আলী (আঃ) তাদেরকে নাকিতুন বা আনুগত্য ভঙ্গকারী, সিফফিনের যুদ্ধে বিপক্ষীয়দেরকে তিনি কাসিতুন বা বিপথগামী এবং নাহরাওয়ানের যুদ্ধে বিপক্ষীয় খারেজীদেরকে তিনি মারিকুন বা ধর্মের সত্য উপলব্ধিতে ব্যর্থ বলে মন্তব্য করেছিলেন। খারেজীদের দেখা পেলে রাসূল-সাঃ তাদের ধ্বংস করে দিতেন বলে মন্তব্য করেছিলেন।


বিশ্বনবী (সা.) একবার সাহাবি যুবাইরকে বলেছিলেন, তুমি কী আলীকে ভালবাস? বিস্মিত যুবাইর বলেছিল, আলীর মত ভালো মানুষকে আমি ভালবাসবো না, এটা কী করে সম্ভব, তা ছাড়া তিনি তো আমার আত্মীয়!! এবার মহানবী (সা.) বললেন, কিন্তু মনে রেখ, একদিন তুমি আলীর বিরুদ্ধে অন্যায় যুদ্ধে লিপ্ত হবে!! আলী (আ.) যুবাইরকে জামাল যুদ্ধের সময় মহানবীর (সা.) এ কথাটি স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি লজ্জিত হয়ে যুদ্ধ ক্ষেত্র ত্যাগ করার উদ্যোগ নেন। কিন্তু এ সময় তিনি নিহত হন।


আলী (আ.)'র বিরুদ্ধে সংঘটিত সিফফিনের যুদ্ধও যে ছিল অন্যায় যুদ্ধ সে প্রসঙ্গেও মহানবী (সা.) বলেছিলেন, বিদ্রোহীর দল আম্মার ইবনে ইয়াসিরকে হত্যা করবে। সে মানুষকে ডাকবে সত্যের দিকে, অথচ তার প্রতিপক্ষ মানুষকে ডাকবে মিথ্যার দিকে।... আম্মার ইবনে ইয়াসির সিফফিনের যুদ্ধে আলী (আ.)'র পক্ষে লড়াই করতে গিয়ে মুয়াবিয়ার বাহিনীর হামলায় শহীদ হয়েছিলেন! 


৪০ হিজরির ১৯ শে রমজানে যখন মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্ট মানুষটি সিজদারত আলী (আ.) মাথায় বিষ-মাখানো তরবারির আঘাত হানে তখনই তিনি বলে ওঠেন, কাবার প্রভুর শপথ, আমি সফল!


দুধের শিশুরা যেমন মায়ের স্তনকে ভালবাসে শাহাদত ছিল তার কাছে আরও বেশি প্রিয়। ২১ রমজানের রাতে শাহাদতের কিছুক্ষণ আগেও তিনি বলেন, 'আল্লাহর শপথ! শাহাদত আমার কাছে এমন কিছু নয় যে তার সম্মুখীন হতে আমি অসন্তুষ্ট হব, বরং তা যেন আমার কাছে নিজের হারানো অস্তিত্বকে ফিরে পাবার মত আনন্দদায়ক, কিংবা আমি যেন রাতের অন্ধকারে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় পানি খুঁজছিলাম, আর হঠাৎ তা পেয়ে গেলাম, আল্লাহর কাছে যা আছে সৎকর্মশীলদের জন্য সেটাই তো উত্তম।' 

 

এবারে পড়া যাক অর্থসহ ১৮ রমজানের রোজার দোয়া: 

 


اليوم الثّامن عشر : اَللّـهُمَّ نَبِّهْني فيهِ لِبَرَكاتِ اَسْحارِهِ، وَنَوِّرْ فيهِ قَلْبي بِضياءِ اَنْوارِهِ، وَخُذْ بِكُلِّ اَعْضائي اِلَى اتِّباعِ آثارِهِ، بِنُورِكَ يا مُنَوِّرَ قُلُوبِ الْعارِفينَ .
হে আল্লাহ ! এ দিনে আমাকে সেহরীর বরকতের উসিলায় সচেতন ও জাগ্রত করে তোল। সেহরীর নূরের ঔজ্জ্বল্যে আমার অন্তরকে আলোকিত করে দাও। তোমার নূরের উসিলায় আমার প্রত্যেক অঙ্গ প্রত্যঙ্গে তোমার নূরের প্রভাব বিকশিত কর। হে সাধকদের অন্তর আলোকিতকারী !# 

 

 

                                                                                     (১৯) 

 

মহান আল্লাহর অশেষ প্রশংসা এবং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত ও ন্যায়পরায়ণ সাহাবিদের শানে অশেষ দরুদ আর সালাম পেশের মাধ্যমে শুরু করছি আজকের আলোচনা। 


আজ ১৯ রমজান। অনেকেই মনে করেন আজকের রাত তথা ১৮ রমজানের দিবাগত রাতটি পবিত্র শবে ক্বদর। বিশেষ করে, আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আ.) ১৯ রমজানের রাতে মহাপাপিষ্ঠ ইবনে মুলজেমের তরবারির আঘাতে আহত হন এবং ২১ রমজান শাহাদত বরণ করেন বলে এ দুই রাতে শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি বলে অনেকেই মনে করেন। অনেকে ২৩ রমজানের রাতকেই শবে কদর বলে মনে করেন। আবার অনেকে ২৭ রমজানকে শবে কদর বলে মনে করেন। রমজানের শেষ দশ দিনের যে কোনো বেজোড় রাতই কদরের রাত হতে পারে বলে অনেকে মনে করেন এবং তারা এইসব রাতেই বেশি বেশি ইবাদত, কুরআন তিলাওয়াত ও ইসলামী জ্ঞান চর্চা করেন।

 

ঠিক কোন্ রাতটি শবে কদর তা আল্লাহর পক্ষ থেকে সাধারণ মানুষের জন্য গোপন রাখার রহস্য হল মানুষ যেন রমজানের এই রাতগুলোতে বেশি বেশি খোদামুখি হয় এবং আল্লাহর ইবাদত করে। বলা হয় যে মানুষ সারা বছর কতটা সৌভাগ্য অর্জন করবে তা নির্ধারণ করা হয় কদরের রাতে। এই রাতের ইবাদত এক হাজার মাসের ইবাদতের সমান। পাপীদের জন্য কদরের রাত তওবা করার ও গোনাহ মাফ করিয়ে নেয়ার অতি মোক্ষম সময়। আর যারা আল্লাহর প্রিয় বান্দা তারা এই রাতে তাঁর আরও প্রিয় হওয়ার এবং আল্লাহর আরও বেশি সন্তুষ্টি অর্জনের একনিষ্ঠ সাধনার পুরস্কার পান। যারা আল্লাহর অতি-নৈকট্যপ্রাপ্ত বান্দা বা আল্লাহর ওলি তারা এই রাতে ফেরেশতাদের অবতীর্ণ হওয়ার বিষয়টি দেখতে পান। এমন পবিত্র রাত যেন বৃথা না যায় সেজন্য সবারই সচেষ্ট হওয়া উচিত। সারা বছর জুড়ে এমন পাপ ও মহাপাপে জড়িত হওয়া উচিত নয় যাতে এমন রাতেও সেই পাপের কলঙ্ক মোচন করা না যায়। রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন করা ও বাবা-মায়ের মনে কষ্ট দেয়া হচ্ছে এমনই এক মহাপাপ যার উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ না দিয়ে কেউ আল্লাহর সন্তুষ্টি বা ক্ষমা শবে কদরের মত রাতেও অর্জন করতে পারে না।  


পবিত্র রমজান ও বিশেষ করে শবে কদর বা কদরের রাত মহান আল্লাহর প্রেমে আত্মহারা হওয়ার লগ্ন। তবে যারা অতি উচ্চ স্তরের খোদাপ্রেমিক তাদের জন্য জীবনের প্রতিটি রাতই যেন শবে কদর। খোদা-প্রেমের মধুর শরাব পিয়ে তারা মহান আল্লাহর দরবারে বেহুঁশ হয়ে থাকেন প্রত্যেক রাতেই। তাঁদের মুনাজাতে ফুটে উঠে আল্লাহর সামনে সর্বোচ্চ বিনয় ও ত্যাগের আকুতি। এমন কোনো মুহূর্ত নেই যখন তাঁদের মন আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে থাকে। এমন কোনো ঘটনা বা দৃশ্য নেই যাতে তারা আল্লাহর উপস্থিতি বা নিদর্শনকে অনুভব করেন না।


এমন পবিত্র দিন ও রাতগুলোতে আমরা যদি একটু ভেবে দেখি বা চিন্তা করি তাহলে আমরা দেখতে পাব যে, মহান আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর প্রেমিক হওয়ার সুযোগ সারা বছরই খুলে রেখেছেন। তিনি আমাদের আধ্যাত্মিক ও নৈতিক উন্নয়নের জন্য দিয়েছেন পবিত্র রমজান, শবে কদর, পবিত্র কুরআন, বিশ্বনবী ও তাঁর আহলে বাইতের শিক্ষা আর আদর্শ। 


খোদাদত্ত আদর্শের আলোকে তথা ইসলামী শিক্ষার আলোকে আমরা ইয়াতিমের সেবা করে, অনাথ ও নিরাশ্রয়কে আশ্রয় দিয়ে, অশিক্ষিতকে শিক্ষিত করে বা পথহারাকে পথ দেখিয়ে, দরিদ্র আত্মীয়-স্বজনকে সাহায্য দিয়ে, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সেবা করে, ইসলামের নানা শিক্ষা ও মূল্যবোধকে ছড়িয়ে দিয়ে কিংবা জালিমের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাসহ ইসলামী নানা দায়িত্ব পালন করে মহান আল্লাহর প্রিয়পাত্র হতে পারি। অথচ আমরা অনেকেই এইসব পথে চলার ব্যাপারে মহান আল্লাহর আহবানকে প্রত্যাখ্যান করছি। মহান আল্লাহর আদেশ-নিষেধ অমান্য করে আল্লাহর বন্ধুত্বের আহ্বানকে পদদলিত করছি! মহান আল্লাহ আমাদেরকে দিয়েছেন জ্ঞান, রুজি-রিজিক, দৈহিক শক্তি ও সুস্থ অঙ্গ-প্রতঙ্গসহ অসংখ্য নেয়ামত। অথচ আমরা আল্লাহর অশেষ অনুগ্রহের জবাবে মৌখিক কৃতজ্ঞতাটুকুও প্রকাশ করছি না। বরং আল্লাহর ইচ্ছা ও নির্দেশের বিরোধী পথে চলছি! নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত থেকে দূরে রয়েছি এবং আল্লাহর অসহায় বান্দাহদের সাহায্যেও এগিয়ে আসছি না। আর এতসব অকৃতজ্ঞা সত্ত্বেও আল্লাহ কিন্তু আমাদের শাস্তি দিচ্ছেন না, বরং আগের মতই রুজি-রোজগার দিয়ে যাচ্ছেন! 

 

ভেবে দেখুন মহান আল্লাহর অশেষ দয়া ও অনুগ্রহের বিপরীতে এ ধরনের আচরণ কত বেশি অজ্ঞতাপূর্ণ ও কত বেশি নিকৃষ্ট! মহান আল্লাহ আমাদের জন্য বেহেশতের দরজা খুলে রেখেছেন ও তিনি চাচ্ছেন যেন আমরা বেহেশতের দিকে যাই। অথচ আমরা যাচ্ছি দোযখের দিকে!


মহান আল্লাহ কুরআনে আমাদের কাছে কর্জে হাসানা বা উত্তম ঋণ চেয়েছেন। এর অর্থ কী এটা যে আল্লাহ অভাবগ্রস্ত?-নাউজুবিল্লাহ। না, বরং আল্লাহ চান যে তার দেয়া রিজিক বা অর্থ থেকে আমরা যদি দরিদ্রদের সাহায্য দেই তাহলে তা যেন আল্লাহকেই ঋণ দেয়া হল! আর তা আল্লাহর রিজিক বা অর্থ হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ এর বিনিময়ে আমাদের বহুগুণ পুরস্কার দেবেন বলে কুরআন ওয়াদা দিয়েছেন। অথচ এমন দয়াময় আল্লাহ'র আহ্বান ও তাঁর প্রেমিক হওয়ার নানা সুযোগকে আমরা হেলায়-ফেলায় নষ্ট করছি। অথচ আল্লাহই হচ্ছেন সবচেয়ে ধনী ও সর্বশক্তিমান এবং সর্বোত্তম সহায় ও বন্ধু।

 

হাদিসে এসেছে, যদি মানুষ একটা মিথ্যা বলে তবে তার মুখের দুর্গন্ধে সাত আসমান পর্যন্ত ফেরেশতারা কষ্ট পান। যেমন বলা হয় যখন মানুষ জাহান্নামে থাকবে তখন জাহান্নাম প্রচণ্ড দুর্গন্ধ ছড়াবে। এ দুর্গন্ধ প্রকৃতপক্ষে এ দুনিয়াতেই আমরা সৃষ্টি করেছি মিথ্যা কথা বলা, গালি দেয়া, অপবাদ ও পরনিন্দা চর্চার মাধ্যমে। 


পরনিন্দা ও অপবাদ আরোপ গীবত থেকেও খারাপ, যেহেতু পরনিন্দার মাধ্যমে যেমন মিথ্যাও বলা হয় তেমন গীবতও করা হয়। কিন্তু যে মিথ্যা বলে সে শুধু মিথ্যাই বলে, গীবত করে না। তাই পরনিন্দায় দু’টি কবীরা গুনাহ এক সঙ্গে করা হয়। গিবত, চোগলখুরি, অপবাদ ও গুজবকে বিশ্বাস করার মত পাপও মানুষের সব সৎকর্মকে মূল্যহীন করে দেয়। আর রমজান মাসে যে কোনো পাপের শাস্তি অন্য যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি হয়ে থাকে।


এবারে পড়া যাক, অর্থসহ ১৯ তম রোজার দোয়া:


اليوم التّاسع عشر : اَللّـهُمَّ وَفِّرْ فيهِ حَظّي مِنْ بَرَكاتِهِ، وَسَهِّلْ سَبيلي اِلى خَيْراتِهِ، وَلا تَحْرِمْني قَبُولَ حَسَناتِهِ، يا هادِياً اِلَى الْحَقِّ الْمُبينِ .
হে আল্লাহ ! আমাকে এ মাসের বরকতের অধিকারী কর। এর কল্যাণ অজর্নের পথ আমার জন্য সহজ করে দাও। এ মাসের কল্যাণ লাভ থেকে আমাকে বঞ্চিত করো না। হে স্পষ্ট সত্যের দিকে পথো নির্দেশকারী।

                                                                           

                                                                                 (২০)

মহান আল্লাহর অশেষ প্রশংসা এবং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত ও ন্যায়পরায়ণ সাহাবিদের শানে অশেষ দরুদ আর সালাম পেশের মাধ্যমে শুরু করছি আজকের আলোচনা। 


যে কোনো কারণে কিংবা ভুল বোঝাবুঝির কারণে দু'জন মুসলমানের মধ্যে যদি সম্পর্কের অবনতি ঘটে বা সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায় তাদের মধ্যে আবারও সদ্ভাব প্রতিষ্ঠা এবং বন্ধুত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা অত্যন্ত বড় ধরনের সৎকর্ম হিসেবে বিবেচিত হয়। সারা বছরে সম্ভব না হলেও এটা হওয়া উচিত পবিত্র রমজান মাসের অন্যতম কর্মসূচি ও সংস্কৃতি। ইসলামী বিধান অনুযায়ী এ জাতীয় প্রচেষ্টাকে সফল করার জন্য মিথ্যা কথা বলাও বৈধ। যেমন, এটা বলা যে, আপনি অমুক ভাইয়ের ওপর খুবই রেগে আছেন, অথচ উনি আপনার অমুক কাজের খুবই প্রশংসা করেছেন!

 

কখনও গাড়িতে দেখা যায় এক যাত্রী একটি পুরনো নোট দিচ্ছেন ভাড়া হিসেবে কিন্তু চালক তা নিতে চাচ্ছে না। এ বিষয়ে দু'জনই নাছোড়বান্দা। এমন সময় একজন মুমিনের উচিত এটা বলা, আপনার নোটটা আমাকে দিন আর এর পরিবর্তে নিন এই ভালো নোট। এরপর ভালো নোটটি চালককে দিলেই ঝামেলা মিটে যায়। এ ধরনের কাজেও রয়েছে অনেক সাওয়াব। কিংবা দেখছেন যে, কখনও দুই শিশু একই কাজ করার জন্য বা একই খেলনা পাওয়ার জন্য ঝগড়া করছে। তখন তাদের দু'জনকেই একই কাজ অর্ধেক মাত্রায় করতে দেয়া বা খেলনাটিকে সমান সময়ের জন্য উভয়কে ব্যবহার করতে দেয়া- এসবই সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য কিছু উদ্ভাবনী পন্থা ও কৌশল হতে পারে।

 

মহান আল্লাহ ক্ষমাশীল। তাই তিনি ক্ষমাশীলদেরও ভালবাসেন। যারা অন্যদের ক্ষমা করে না, আল্লাহও তাদের সহজেই ক্ষমা করবেন না। আসলে প্রতিশোধস্পৃহা ও স্বার্থপরতা মানুষকে ক্ষমা থেকে দূরে রাখে। আমরা অনেক সময় এ আশা করি যে বয়সে ছোট কারও কাছে ক্ষমা চাইলে আমি ছোট হয়ে যাব! কিংবা অমুক যেহেতু বড়দের সম্মান করে না তাকেও কখনও সম্মান দেখাব না! আমরা অনেক সময় ছোটদের কাছে সম্মান আশা করি অথচ তাদেরকে কতটা সম্মান দিয়েছি ও স্নেহ করেছি তার খবর রাখি না। কখনও কি কোনো ছোটো ভাইয়ের জন্য বড় কোনো সুযোগ বা স্বার্থ ত্যাগের কথা ভেবেছি? অথচ মহানবী (সা.) বলেছেন, মু'মিন ভাইয়ের উচিত নিজের জন্য যা পছন্দ করা তা অন্য ভাইদের জন্যও তা পছন্দ করা। আর অন্যদের যেসব মন্দ কাজ বা স্বভাবকে আমরা ঘৃণা করি, নিজেরাও যেন সেসবকে এড়িয়ে চলি। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন, তোমরা কেন এমন কথা বল যা নিজেরা কর না? এটা আল্লাহর কাছে খুবই অপছন্দনীয়। এ জন্যই দেখা যায় মহানবী (সা.) যে দিন খেজুর খেয়েছেন সেদিন অতিরিক্ত খেজুর খেতে অভ্যস্ত শিশুকে ওই বদ-অভ্যাস দূর করার জন্য সেদিন কিছুই না বলে অন্য দিন উপদেশ দিয়েছেন। 

 

যারা কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়াই বয়স্কদের বা বড়দের সম্মান করে না, স্বাভাবিকভাবেই তারা নিজেরাও একদিন ছোটদের মাধ্যমে অপমানিত হয়। একই ধরনের কথা বাবা-মায়ের প্রতি সম্মানের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যারা নিজ বাবা মায়ের সঙ্গে কঠোর আচরণ করে, তারাও একদিন নিজ সন্তানের কাছ থেকে কঠোর আচরণের শিকার হবে। 


ইসলামের নৈতিক উপদেশমালায় বলা হয় যে ছোটদেরকে সন্তানের মত স্নেহ কর এবং বড়দের বা বড় ভাইকে বাবার মত সম্মান কর। অন্যের ব্যাপারে হীন ধারণা রাখাও পাপ। অন্যদিকে সুধারণা রাখা সাওয়াবের কাজ। তাই বয়সের দিক থেকে ছোটদেরকে ভাবতে হবে উনি বয়সে বড় বলে নিশ্চয়ই উনার সৎকর্মের পরিমাণ আমার চেয়ে বেশি। অন্যদিকে ছোটদের ব্যাপারে বয়স্ককে এটা ভাবতে হবে যে, বয়স কম বলে তারা আমার চেয়ে নিশ্চয়ই কম পাপ করেছে।

 

অন্যদের দোষ গোপন রাখাও অত্যন্ত বড় মাপের উদারতা ও সাওয়াবের কাজ। একবার কোনো এক মহান আলেম অন্য এক বয়স্ক ব্যক্তির একটি মন্দ বিষয় শুনে ফেলেন। কিন্তু শোনা সত্ত্বেও তিনি অন্যদের সামনে এমন ভাব করলেন যেন তিনি কিছুই শোনেননি। ওই ব্যক্তি লজ্জিত অবস্থায় আলেমের সঙ্গে কথা বলতে আসলে তিনি বলতে থাকেন, কি বলছেন? আরো জোরে বলুন। ...না- না, এখনও শুনতে পারছি না, বুঝতে পারছি না ইত্যাদি। ওই মহান আলেম এই ব্যক্তিকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য এরপর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কানে কম-শোনা ব্যক্তির মতই আচরণ করে গেছেন!


যারা অন্যের দোষ গোপন করে তারা আল্লাহ ও মহাপুরুষদের ভালোবাসার পাত্রে পরিণত হয়েছেন বলে অনেক কাহিনী ও বর্ণনা রয়েছে।  

 


মানুষের সম্মান ক্ষুণ্ণ করা, দুই-জনের মধ্যে সম্পর্ক খারাপ করার মত কিছু বলা বা করা, অহেতুক কারো সম্পর্কে খারাপ ধারণা করা বা সন্দেহ পোষণ করা মারাত্মক পাপ। এইসব পাপের শাস্তি রহিত করার জন্য ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির কাছে গিয়ে ক্ষমা চাইতে হবে। অথবা তা যদি সম্ভব না হয় তবে তার নামে সদকা দেয়া, তার জন্য সব সময় ক্ষমা প্রার্থনা করা ও তার হয়ে দরুদ পাঠ করা ইত্যাদি জরুরি।

 


বিশে রমজানের রাত তথা একুশে রমজান আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আ.)'র শাহাদত-বার্ষিকী। একুশে রমজান পৃথিবী হারিয়েছিল বিশ্বনবী-(সা.)'র শ্রেষ্ঠ প্রতিনিধি ও শ্রেষ্ঠ অনুসারীকে, হারিয়েছিল বিশ্বনবী-সা:'র জ্ঞান-নগরীর মহা-তোরণকে, হারিয়েছিল রাসূল (সা:)'র পর সবচেয়ে দয়ালু ও উদার আত্মার অধিকারী মানুষ এবং হেদায়াতের উজ্জ্বলতম প্রদীপকে। সেদিন মুসলিম বিশ্ব তার অত্যন্ত দুঃসময়ে হারিয়েছিল সাধনা ও আধ্যাত্মিক পূর্ণতার সর্বোত্তম আদর্শকে, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় মহানবী (সা:)'র নিজ হাতে গড়ে তোলা ইসলামের শ্রেষ্ঠ সেনাপতি ও সবচেয়ে আপোষহীন নেতাকে। কিন্তু অকাল-মৃত্যু সত্ত্বে আমীরুল মু'মিনীন হযরত আলী (আঃ)’র শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের স্বর্গীয় আলোকোজ্জ্বল প্রভা যুগ যুগ ধরে ইতিহাসের পরতে পরতে আদর্শ মুমিনের কর্মতৎপরতার গভীরে অতুলনীয় ও ক্রমবর্ধমান প্রভাব সৃষ্টি করে চলেছে। সেই আমীরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আঃ)'র শাহাদত বার্ষিকী উপলক্ষে সবার প্রতি আমরা জানাচ্ছি অশেষ সমবেদনা।

 

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হযরত আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ীর মতে,
আলী (আ.) ছিলেন যুবকদের জন্য বীরত্ব ও সাহসিকতার আদর্শ, সরকার-প্রধানদের জন্য ন্যায়বিচারের আদর্শ, ইবাদত, খোদা-প্রেম ও ভারসাম্যপূর্ণ অনাড়ম্বর জীবনের জন্য সব মুমিন মুসলমানের জন্যই আদর্শ। তাঁর মুক্তিকামীতা বিশ্বের সব মুক্তিকামীর আদর্শ এবং প্রজ্ঞাময় বক্তব্য ও চিরস্মরণীয় উপদেশগুলো আলেম, বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও চিন্তাবিদদের জন্য আদর্শ। 


আমিরুল মু'মিনিন আলী (আ.) ছিলেন সেই ব্যক্তিত্ব নদী-দখলকারী শত্রুরা যার বাহিনীর জন্য নদীর পানি ব্যবহার নিষিদ্ধ করলে সেই শত্রুদের পরাজিত করার পরও তিনি ওই নদীর পানি কোনো শত্রুর জন্য নিষিদ্ধ করেননি। জালিমদের বিরুদ্ধে আলী (আ.) সবচেয়ে কঠোর হলেও তিনি ব্যক্তিগত ক্রোধের বশে নয় বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তাদের ওপর আঘাত হানতেন। 


সিফফিনের যুদ্ধের প্রাক্কালে উভয়পক্ষের লোকক্ষয় এড়ানো ও বিদ্রোহীদের সুপথে আনার জন্য তিনি এত বেশী অপেক্ষার নীতি গ্রহণ করেছিলেন যে, সে সময় শত্রুরা এ প্রচারণা চালিয়েছিল যে মহাবীর আলী (আ.) মৃত্যুকে ভয় পান! অথচ শিশুর কাছে মাতৃস্তন যতটা প্রিয় শাহাদত ছিল আলীর কাছে তার চেয়েও বেশি প্রিয়। 


হযরত আলী (আঃ) ছিলেন সেই ব্যক্তিত্ব যার সম্পর্কে রাসূলে পাক (সা:) বলেছেন, মুসার সাথে হারুনের যে সম্পর্ক তোমার সাথে আমার সেই সম্পর্ক, শুধু পার্থক্য হল হারুন (আঃ) নবী ছিলেন, তুমি নবী নও। 


রাসূল (সা.) বলেছেন, " আমি জ্ঞানের নগরী, আলী তার দরজা, যে কেউ আমার জ্ঞানের মহানগরীতে প্রবেশ করতে চায় তাকে এ দরজা দিয়েই আসতে হবে"।

মহানবী (সা:) আরো বলেছেন:
হে আম্মার! যদি দেখ সমস্ত মানুষ একদিকে চলে গেছে, কিন্তু আলী চলে গেছে অন্য দিকে, তবুও আলীকে অনুসরণ কর, কারণ, সে তোমাকে ধ্বংসের দিকে নেবে না।



বিশ্বনবী (সা:) আরো বলেছেন:
* আমি আলী থেকে, আর আলী আমার থেকে, যা কিছু আলীকে কষ্ট দেয়, তা আমাকে কষ্ট দেয়, আর যা কিছু আমাকে কষ্ট দেয় তা আল্লাহকে কষ্ট দেয়।
* হে আলী! ঈমানদার কখনও তোমার শত্রু হবে না এবং মোনাফেকরা কখনও তোমাকে ভালবাসবে না।
অনেক সাহাবী এ হাদিসের ভিত্তিতেই মোনাফেকদের সনাক্ত করতেন। 


রাসূলে পাক (সা:)'র স্ত্রী বিবি আয়শা হযরত আলী (আঃ)'র শাহাদতের খবর শুনে বলেছিলেন,
"হে রাসূল! তোমার সবচেয়ে প্রিয়পাত্র শাহাদত বরণ করেছেন। আজ এমন এক ব্যক্তি শহীদ হয়েছেন যিনি ছিলেন রাসূল (সা:)'র পর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ।"
ওয়াশিংটন আরভিং বলেছেন, "সব ধরনের নীচতা ও কৃত্রিমতা বা মিথ্যার বিরুদ্ধে আলী (আ.)'র ছিল মহত সমালোচনা এবং আত্মস্বার্থ-কেন্দ্রিক সব ধরনের কূটচাল থেকে তিনি নিজেকে দূরে রেখেছিলেন।"


ঐতিহাসিক মাসুদির মতে, রাসূল (সা.)'র চরিত্রের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি মিল যার ছিল তিনি হলেন আলী (আ.)।

শাহাদত-প্রেমিক আলী(আ.) যখন মৃত্যুশয্যায় শায়িত, তাঁর সঙ্গীরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত, সবাই কাঁদছে, চারিদিকে ক্রন্দনের শব্দ, কিন্তু আলী (আ.)-এর মুখ হাস্যোজ্জ্বল। তিনি বলছেন,
“আল্লাহর শপথ! আমার জন্য এর চেয়ে উত্তম কি হতে পারে যে, ইবাদতরত অবস্থায় শহীদ হব?”

 


ঘাতকের প্রাণঘাতী আঘাতে ধরাশায়ী আমিরুল মু'মিনিন এ ঘটনা নিয়ে কোনো ধরনের বাড়াবাড়ি বা অবিচার না করার আহ্বান জানিয়ে বলেছিলেন,
“আব্দুল মুত্তালিবের সন্তানেরা তোমরা এমন যেন না কর, যখন আমি পৃথিবী থেকে বিদায় নেব তখন মানুষের উপর হামলা করবে এ অজুহাতে যে, আমীরুল মু'মিনীনকে শহীদ করা হয়েছে। অমুকের এটার পেছনে হাত ছিল, অমুক এ কাজে উৎসাহিত করেছে। এসব কথা বলে বেড়াবে না, বরং আমার হত্যাকারী হল এই ব্যক্তি।” 


আলী (আ.) ইমাম হাসান (আ.)-কে বলেছিলেন,

“বাবা হাসান! আমার মৃত্যুর পর যদি চাও আমার হত্যাকারীকে মুক্তি দেবে তাহলে মুক্তি দিও, যদি চাও কিসাস গ্রহণ করবে তাহলে লক্ষ্য রাখবে, সে তোমার পিতাকে একটি আঘাত করেছে, তাকেও একটি আঘাত করবে। যদি তাতে মৃত্যুবরণ করে তো করল, নতুবা ছেড়ে দেবে।”
তারপর আবার বন্দির চিন্তায় মগ্ন হলেন আলী (আ.)। বন্দিকে ঠিক মতো খেতে দিয়েছ তো? পানি দিয়েছ খেতে? ঠিক মতো দেখাশোনা কর ওর। কিছু দুধ তাঁর জন্য আনা হলে কিছুটা খেয়ে বললেন, বাকীটা বন্দিকে দাও। 


হযরত আলী (আঃ) নিজেকে সব সময় জনগণের সেবক বলে মনে করতেন এবং সব সময় অত্যন্ত বিনয়ী ছিলেন। দ্বিতীয় খলিফা বলেছেন, আলী ইবনে আবি তালিবের মতো আরেকজনকে জন্ম দেয়ার ক্ষমতা নারীকূলের কারো নেই, আলী না থাকলে ওমর ধ্বংস হয়ে যেত।
জীরার ইবনে হামজা তাঁর প্রিয় নেতার গুণাবলী তুলে ধরতে গিয়ে বলেছিলেন,

 

"আলীর ব্যক্তিত্ব ছিল সীমাহীন, তিনি ক্ষমতায় ছিলেন দোর্দণ্ড, তাঁর বক্তব্য ছিল সিদ্ধান্তমূলক, তাঁর বিচার ছিল ন্যায়ভিত্তিক, সব বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ছিল, তাঁর প্রতিটি আচরণে প্রজ্ঞা প্রকাশিত হত। তিনি মোটা বা সাদামাটা খাদ্য পছন্দ করতেন এবং অল্প দামের পোশাক পছন্দ করতেন। আল্লাহর কসম, তিনি আমাদের একজন হিসেবে আমাদের মাঝে ছিলেন, আমাদের সব প্রশ্নের উত্তর দিতেন, আমাদের সকল অনুরোধ রক্ষা করতেন। তাঁর প্রতি সশ্রদ্ধ অনুভূতি থাকা সত্ত্বেও তাঁকে সম্বোধন করে কিছু বলতে ও প্রথমে কথা বলতে আমরা ভয় পেতাম না। তাঁর হাসিতে মুক্তা ছড়িয়ে পড়তো। তিনি ধার্মিকদের খুব সম্মান করতেন। অভাবগ্রস্তের প্রতি খুবই দয়ালু ছিলেন। এতিম, নিকট আত্মীয় ও অন্নহীনকে খাওয়াতেন। তিনি বস্ত্রহীনে বস্ত্র দিতেন ও অক্ষম ব্যক্তিকে সাহায্য করতেন। তিনি দুনিয়া ও এর চাকচিক্যকে ঘৃণা করতেন। আমি আলী ইবনে আবি তালিবকে গভীর রাতে বহুবার এ অবস্থায় মসজিদে দেখেছি যে তিনি নিজ দাড়ি ধরে দাঁড়িয়ে এমনভাবে আর্তনাদ করতেন যেন সাপে কামড় খাওয়া মানুষ এবং শোকাহত লোকের মতো রোদন করে বলতেন, হে দুনিয়া, ওহে দুনিয়া, আমার কাছ থেকে দূর হও! আমাকে ধোঁকা দেয়ার চেষ্টা করো না!" 

 

হযরত আলী (আঃ)' বলেছেন, 'বাহ্যিক অলংকার ও পোশাক-পরিচ্ছদ সৌন্দর্য নয়, সৌন্দর্য হল-জ্ঞান ও সভ্যতা। যার পিতা-মাতা মারা গেছে সে এতীম নয়, প্রকৃত এতীম সে যার মধ্যে জ্ঞান ও বিবেক নেই।' 


এবারে পড়া যাক অর্থসহ ২০ রোজার দোয়া:


اليوم العشرون : اَللّـهُمَّ افْتَحْ لي فيهِ اَبْوابَ الْجِنانِ، وَاَغْلِقْ عَنّي فيهِ اَبْوابَ النّيرانِ، وَوَفِّقْني فيهِ لِتِلاوَةِ الْقُرْآنِ، يا مُنْزِلَ السَّكينَةِ فى قُلُوبِ الْمُؤْمِنينَ .
হে আল্লাহ ! এ দিনে আমার জন্যে বেহেশতের দরজাগুলো খুলে দাও এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দাও। আমাকে কোরআন তেলাওয়াতের তৌফিক দান কর। হে ঈমানদারদের অন্তরে প্রশান্তি দানকারী।

 

 

                                                                                          (২১) 

 

মহান আল্লাহর অশেষ প্রশংসা এবং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত ও ন্যায়পরায়ণ সাহাবিদের শানে অশেষ দরুদ আর সালাম পেশের মাধ্যমে শুরু করছি আজকের আলোচনা।


আজ আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আ.)'র শাহাদত বার্ষিকী। এ উপলক্ষে সবাইকে জানাচ্ছি গভীর শোক ও সমবেদনা।


আলী (আ.)'র প্রশংসা করে কোনো এক প্রাচীন কবি লিখেছিলেন: 
“কোথাও তোমার চরিত্র এমন যে, তোমার কোমলতা দেখে মৃদুমন্দ বাতাসও লজ্জা পায়
কখনো তোমার দৃঢ়তা পাথরকেও হার মানায়।” 


অর্থাৎ তাঁর সাহসিকতা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপোষহীনতা, শৌর্য আর সংগ্রামী আত্মার সামনে যেন পাথর, শীলা বা ধাতুও গলে যায়। আবার তাঁরই চারিত্রিক কোমলতা মৃদুমন্দ বাতাসকেও লজ্জা দেয়। একই ব্যক্তির মধ্যে কোমলতা ও কঠোরতার এক অপূর্ব সমন্বয়। তুমি কেমন আশ্চর্য সৃষ্টি? 


মাওলানা রুমি আলী (আ.)'র দয়া ও মহানুভবতা এবং বীরত্বের তুলনা করে লিখেছেন:

“সাহসিকতায় তুমি শেরে খোদা জানি 
পৌরুষত্বে কি ছিলে তুমি, জানেন শুধুই অন্তর্যামী।” 


পূর্ণ মানব ছিলেন বলেই আলী (আ.) ছিলেন সব ধরণের মানবিক মূল্যবোধের ময়দানে বিজয়ী বীর। মানবতার সবগুলো ময়দানেই তিনি শ্রেষ্ঠ। এখান থেকে আমরা এ শিক্ষা নেব যে, ভুল করে শুধু একটি মূল্যবোধকে গ্রহণ করে অন্যান্য মূল্যবোধকে যেন আমরা ভুলে না যাই। যদিও আমরা সবগুলো মূল্যবোধের ক্ষেত্রেই শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারব না, কিন্তু নির্দিষ্ট পর্যায় পর্যন্ত সব মূল্যবোধই একত্রে ধারণ তো করতে পারি। যদি পূর্ণ মানুষ নাও হই অন্তত ভারসাম্যপূর্ণ মানুষ তো হতে পারি। আর তাহলেই একজন প্রকৃত মুসলমান হিসেবে সবগুলো ময়দানে আমরা উপস্থিত হতে পারব।

 

আলী (আ.) মহান প্রভুর ইবাদতের সময় আল্লাহর প্রেমে ভুলে যেতেন অন্য সব কিছু, এমনকি বিদ্ধ তীর খুলে নেয়ার ব্যথাও টের পেতেন না। আবার এই একই আলী নামাজের মধ্যেই দরিদ্রের প্রার্থনা শুনতে পেয়ে হাতের আংটি এগিয়ে দেন! যে খোদাপ্রেমের গভীরতা তাঁকে সবকিছু ভুলিয়ে দেয় সেই খোদাই আলীর কানকে সময়মত দরিদ্রের প্রার্থনা শোনার ক্ষমতা যুগিয়ে দেন। নিজের কাঁধে খাদ্যের বোঝা বহন করে ইয়াতিম আর দরিদ্রদের ঘরে রাতের বেলায় খাদ্য দিয়ে আসতেন যিনি সেই ন্যায় বিচারের প্রতীক আলী (আ.)'র শাহাদতের বহু দিন পর তারা বুঝতে পেরেছিল যে অচেনা সেই মানুষটিই ছিলেন তাদের প্রিয় আমীরুল মু'নিনিন!  


মহান আল্লাহ আমাদের সবাইকে আলী (আ.)'র অনুরাগী ও অনুসারী হওয়ার তৌফিক দিন।

 

শেষ দশ রাত পবিত্র রমজানের সবচেয়ে বরকতময় রাত। এর মধ্যে বেজোড় সংখ্যার রাতগুলোর যে কোনো রাত হতে পারে কদরের রাত। কেউ কেউ মনে করেন ২৭ তম রাতটিতেই শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। আবার অনেকে মনে করেন রমজানের ২৩ তম রাতটি ১৯ ও ২১ তম রাতের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এই তিন রাতই শবে কদর। বর্ণনায় এসেছে পুরো বছরের ভাগ্য তথা আয়ু ও রিজিক নির্ধারিত হয় ১৯রমজানের রাতে। এই বছরে কারা হজে যেতে পারবে তাও ঠিক করা হয় এ রাতে। আর ২১ রমজানের রাতে এ বিষয়গুলোকেই নথিবদ্ধ করা বা স্বীকৃতি দেয়া হয়। আর ২৩ রোজার রাতে এইসব বিষয়কে চূড়ান্ত করা হয়। তাই এই তিন রাতই ইবাদত ও প্রার্থনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এইসব রাতে কুরআন তিলাওয়াত, জামাআতে নামাজ আদায়, সদকা দেয়া, মৃতদের জন্য প্রার্থনা, জিকির এবং বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের রেখে যাওয়া দোয়াগুলো পড়ার যথাসাধ্য চেষ্টা করা উচিত।


পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে মহিমান্বিত রজনী বা কদরের রাতে নাজিল হয়েছে পবিত্র কুরআন। তাই এ রাতে আমাদেরকে শপথ নিতে হবে জীবনকে কুরআনের শিক্ষা ও বিধানের আলোকে গড়ে তোলার। আর সারা বছরেই বাস্তবায়ন করতে হবে এই শপথকে।  


বিশ্বনবী (সা.)'র মতে বাবা মায়ের জন্য সন্তানদের দোয়া যেমন গুরুত্বপূর্ণ তেমনি সন্তানদের সার্বিক কল্যাণের জন্য দোয়া করাও বাবা-মায়েদের জন্য সমান মাত্রায় জরুরি। কদরের রাতে এ বিষয়টি মনে রাখা উচিত। দৃঢ় আশাবাদী হয়ে দোয়া করা ও একনিষ্ঠভাবে তওবা করাও কদরের রাতে খুবই জরুরি। এক যুবক মহানবীর (সা.) কাছে এসে বলে: কল্পনা করা যায় এমন সব পাপই আমি করেছি, ক্ষমার কোনো আশা কি আমি করতে পারি? সৃষ্টিকুলের জন্য মহান আল্লাহর রহমতের নবী (সা.) বললেন: তোমার বাবা-মা কী জীবিত? যুবক জানায় মা মৃত, তবে বাবা জীবিত। আল্লাহর রাসুল বললেন, তোমার বাবার সঙ্গে ভালো আচরণ কর ও তাঁর সেবা কর। যুবকটি চলে যাওয়ার পর মহানবী বললেন, এই যুবকের মা যদি বেঁচে থাকত তাহলে তার পাপগুলোকে আরও দ্রুত ক্ষমা করা হত। 

 

হযরত মুসা নবী (আ.) তাঁর জীবিত অবস্থায় আল্লাহর কাছে মুনাজাত করে জানতে পেরেছিলেন যে এক সাধারণ কষাই বেহেশতে তার সঙ্গী হওয়ার গৌরব অর্জন করবে। মুসা (আ.) খোঁজ নিয়ে দেখেন যে ওই যুবক কষাই কোনো বাড়তি ইবাদত-বন্দেগি করে না। তবে সে তার বৃদ্ধা ও অচল হয়ে পড়া মায়ের সেবা করে এমনভাবে যেভাবে বাবা-মা তার শিশুর যত্ন নিয়ে থাকে। ছেলে যখন মায়ের জন্য রান্না করে যত্নভরে তাকে খাইয়ে দেয় তখনই মা দোয়া করতেন তার ছেলেকে যেন আল্লাহ মুসা নবীর সঙ্গী করেন। মুসা (আ.) যুবককে জানান যে তাঁর মায়ের দোয়া কবুল হয়েছে।


এবারে পড়া যাক রমজানের ২১ রোজার দোয়া: 


اليوم الحادي والعشرون : اَللّـهُمَّ اجْعَلْ لى فيهِ اِلى مَرْضاتِكَ دَليلاً، وَلا تَجْعَلْ لِلشَّيْطانِ فيهِ عَلَيَّ سَبيلاً، وَاجْعَلِ الْجَنَّةَ لى مَنْزِلاً وَمَقيلاً، يا قاضِيَ حَوائِجِ الطّالِبينَ .
হে আল্লাহ ! এ দিনে আমাকে তোমার সন্তুষ্টির দিকে পরিচালিত কর। শয়তানদের আমার উপর আধিপত্য বিস্তার করতে দিওনা। জান্নাতকে আমার গন্তব্যে পরিণত কর। হে প্রার্থনাকারীদের অভাব মোচনকারী । 

 

                                                                                               (২২) 

 

মহান আল্লাহর অশেষ প্রশংসা করছি এবং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত ও ন্যায়পরায়ণ সাহাবিদের শানে অশেষ দরুদ আর সালাম জানাচ্ছি।

 

রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস রমজান শেষ হয়ে আসছে। পবিত্র শবে কদর বা তথা ভাগ্য-নির্ধারণের রাতগুলো অতিক্রম করছি আমরা। আত্ম-সংশোধন ও পাপ বর্জনের অনুশীলনের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত এই দিন ও রাতগুলোকে আবারও ফিরে পেতে এক বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আজ আমাদের সঙ্গে এমন অনেক আপনজন বা পরিচিত মানুষেরা নেই যারা গত বছরের এমন দিনেও উপস্থিত ছিলেন! তাই আমাদের এমন পরিকল্পনা নেয়া উচিত যাতে রমজানের মধ্যেই আত্মাকে পুরোপুরি বিশুদ্ধ ও পাপের প্রভাব থেকে মুক্ত করা যায়। অপ্রস্তুত অবস্থায় যেন মৃত্যু বরণ করতে না হয়। আমরা পাপ থেকে দূরে থাকতে কতটা বাস্তব উদ্যোগ নিয়েছি? বড় বড় পাপের ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে কতটা নিজেকে ও নিজের পরিবারকে সচেতন করেছি? যেসব বই পড়লে বা যেসব আলোচনা শুনলে ধর্মের জরুরি বিষয়গুলো জানা যায় ও পাপ পরিহার সহজ হয় -এমনসব কাজে কতটা সক্রিয় হয়েছি?


উন্নত চরিত্র গঠনের জন্য মহাপুরুষ বা আল্লাহর প্রিয়পাত্রদের জীবনী ও তাঁদের দোয়া থেকে কতটা শিক্ষা নিচ্ছি আমরা? পবিত্র কুরআন পড়ে ও মহাপুরুষদের শেখানো দোয়া পড়ে আমাদের চোখে কি পানি আসছে? যদি না আসে তাহলে বুঝতে হবে যে অন্তর বা আত্মা মরে আছে। অতিরিক্ত পাপের ফলে কলুষিত আত্মা পাষাণ হয়ে পড়েছে। তাই এই মৃত আত্মাকে জাগাতে হবে।


মহান আল্লাহ সুরা ফাতিরে বলেছেন,

 'কেউ অপরের বোঝা বহন করবে না। কেউ যদি তার গুরুতর ভার বহন করতে অন্যকে আহবান করে কেউ তা বহন করবে না-যদি সে নিকট- আত্নীয়ও হয়। আপনি কেবল তাদেরকে সতর্ক করেন, যারা তাদের পালনকর্তাকে না দেখেও ভয় করে এবং নামায কায়েম করে। যে কেউ নিজের সংশোধন করে, সে সংশোধন করে, নিজ কল্যাণের জন্যেই। আর আল্লাহর কাছেই সবাইকে ফিরতে হবে। দৃষ্টিমান ও দৃষ্টিহীন সমান নয়। সমান নয় অন্ধকার ও আলো। সমান নয় ছায়া ও তপ্তরোদ। আরও সমান নয় জীবিত ও মৃত। আল্লাহ শ্রবণ করান যাকে ইচ্ছা। আপনি কবরে শায়িতদেরকে শুনাতে সক্ষম নন। আপনি তো কেবল একজন সতর্ককারী।.....


আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে জ্ঞানীরাই কেবল তাঁকে ভয় করে। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী ক্ষমাময়। যারা আল্লাহর কিতাব পাঠ করে, নামায কায়েম করে, এবং আমি যা দিয়েছি, তা থেকে গোপনে ও প্রকাশ্যে ব্যয় করে, তারা এমন ব্যবসা আশা করে যাতে কখনও লোকসান হবে না। পরিণামে তাদেরকে আল্লাহ তাদের সওয়াব পুরোপুরি দেবেন এবং নিজ অনুগ্রহে আরও বেশী দেবেন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, গুণগ্রাহী।' 

 

পবিত্র কুরআনের হৃদয়-নিংড়ানো এইসব বাণী থেকে এটা স্পষ্ট যে, কিয়ামতের দিন সৎকর্ম ও ঈমান ছাড়া আর অন্য কিছুই কোনো কাজে আসবে না। আপনার ধন-সম্পদ, পদ-মর্যাদা, সন্তান-সন্ততি, দল-বল –এসব কিছুই কাজে আসবে না কবরে চলে যাওয়ার পর থেকে। তাই সেই মহাবিপদের দিনের জন্য এখন থেকেই পাথেয় সংগ্রহ করতে হবে।  


আমরা আরও জানলাম কুরআন থেকে যে, কেবল জ্ঞানীরাই আল্লাহকে ভয় করেন। তাই জ্ঞান অর্জন সবচেয়ে বেশি জরুরি পাপ বর্জনের জন্য। আত্মগঠন ও আত্ম-সংশোধনের ক্ষেত্রে এটাই হওয়া উচিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রাথমিক পদক্ষেপ। হাদিসেও এসেছে, আল্লাহ যাকে ভালবাসেন তাকে ধর্মের জ্ঞান দান করেন। 


বড় বড় পাপগুলো কী কী এবং সেসব এড়ানোর উপায় সম্পর্কে ধারণা অর্জন করার পর আমাদেরকে উন্নত চরিত্র গঠনের জন্য মনোযোগী হতে হবে। কদরের রাতে নফল ইবাদতের চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হল ওয়াজিব বা ফরজ দায়িত্বগুলো পালন ও হারাম বর্জন সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করা। 

 

ইবাদতকে একনিষ্ঠ করার জন্য ব্যাপক জ্ঞান চর্চা জরুরি। আল্লাহর কাছে আমাদের এটাই চাইতে হবে যাতে তিনি আমাদেরকে সবচেয়ে জরুরি জ্ঞান তথা ধর্মের জ্ঞান দান করেন যার সুবাদে আমরা আমাদের দায়িত্বগুলো ভালোভাবে পালন করতে পারি এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলসহ আল্লাহর প্রিয় ব্যক্তিদের ভালোভাবে জেনে তাঁদের অনুসরণ করতে পারি।


প্রাচীন যুগের ধর্মমনা এক লোক দেখল যে এক জায়গায় লোকজন বিভ্রান্ত হয়ে একটি গাছের পূজা করছে! তাই সে ওই গাছ কাটার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু শয়তান বৃদ্ধ জ্ঞানীর বেশ ধরে তাকে বলল, যে এ কাজ করো না। এ কাজ জরুরি হলে নবীদের পাঠিয়ে আল্লাহ তা করতেন! কিন্তু ওই লোক শয়তানের কথায় কান না দিয়ে তার সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। লোকটি খুব সহজেই শয়তানকে পরাস্ত করে। এবার শয়তান বলল, তুমি গাছটি না কাটলে তোমাকে প্রতিদিন ২ দিনার দেব। লোকটি লোভের ফাঁদে পড়ে ভাবল, তা মন্দ কি! এক দিনার নিজের জন্য রাখব আর এক দিনার আল্লাহর পথে দান করব! সে গাছ না কাটায় কয়েক দিন ধরে বালিশের নীচে ২ দিনার পেল।

 

কিন্তু একদিন ওই ধার্মিক দেখে দিনার আর আসছে না। ফলে সে আবারও গাছটি কাটতে যায়। এবারও সংঘর্ষ হল। কিন্তু এবার শয়তান খুব সহজেই তাকে হারিয়ে দিল। সে প্রশ্ন করল শয়তানকে: এত সহজেই এবার হেরে গেলাম!? অথচ সেবার তুমি হেরেছিলে! শয়তান বলল, সেবার তুমি ছিলে আল্লাহর পথে একনিষ্ঠ তাই আল্লাহ তোমাকে জয়ী করেছিলেন। কিন্তু এবার তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গাছ কাটতে আসনি, বরং দিনার না পাওয়ার রাগে গাছ কাটতে এসেছ, তাই সহজেই কুস্তিতে পরাজিত হলে।


এবারে পড়া যাক অর্থসহ ২২ রোজার দোয়া: 


اليوم الثّاني والعشرون : اَللّـهُمَّ افْتَحْ لى فيهِ اَبْوابَ فَضْلِكَ، وَاَنْزِلْ عَلَيَّ فيهِ بَرَكاتِكَ، وَوَفِّقْني فيهِ لِمُوجِباتِ مَرْضاتِكَ، وَاَسْكِنّي فيهِ بُحْبُوحاتِ جَنّاتِكَ، يا مُجيبَ دَعْوَةِ الْمُضْطَرّينَ .
হে আল্লাহ ! আজ তোমার করুণা ও রহমতের দরজা আমার সামনে খুলে দাও এবং বরকত নাজিল কর । আমাকে তোমার সন্তুষ্টি অর্জনের তৌফিক দাও। তোমার বেহেশতের বাগানের মাঝে আমাকে স্থান করে দাও। হে অসহায়দের দোয়া কবুলকারী।

 

মহান আল্লাহর অশেষ প্রশংসা করছি এবং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত ও ন্যায়পরায়ণ সাহাবিদের শানে অশেষ দরুদ আর সালাম জানাচ্ছি।

গত পর্বের আলোচনায় আমরা পবিত্র কুরআনের কয়েকটি হৃদয়-নিংড়ানো আয়াতের অর্থ শুনিয়েছিলাম। আজও আমরা এমন কয়েকটি আয়াত তুলে ধরব যা আমীরুল মু'মিনিন আলী (আ.) তাঁর একটি বিখ্যাত দোয়ায় উল্লেখ করতেন। কুফার মসজিদে এই মুনাজাত করতেন ইমাম আলী (আ.)। তিনি বিনীত কণ্ঠে বলতেন:

 

'হে আল্লাহ! আমি সেই দিনের অনিষ্ট থেকে তোমার কাছে নিরাপত্তা চাইছি যেদিন ধন-সম্পদ ও সন্তান সন্ততি কোন উপকারে আসবে না; কিন্তু কেবল সে ছাড়া যে সুস্থ অন্তর নিয়ে আল্লাহর কাছে আসবে।(২৬:৮৮) যেদিন জালেম নিজের হাত দুটি দংশন করতে করতে বলবে, হায় আফসোস! আমি যদি রসূলের পথ অবলম্বন করতাম।(২৫:২৭) যেদিন অপরাধীদের পরিচয় পাওয়া যাবে তাদের চেহারা থেকে; এরপর তাদের কপালের চুল ও পা ধরে টেনে নেয়া হবে। (৫৫:৪১) যেদিন বাবা ছেলের কোন কাজে আসবে না এবং ছেলেও তার বাবার কোনো উপকার করতে পারবে না। নিঃসন্দেহে আল্লাহর ওয়াদা সত্য।(৩১:৩৩) যেদিন জালিমদের ওজর-আপত্তি কোন উপকারে আসবে না, তাদের জন্যে থাকবে অভিশাপ এবং তাদের জন্যে থাকবে মন্দ ঘর। (৪০:৫২) যেদিন কেউ কারও কোন উপকার করতে পারবে না এবং সেদিন সব কর্তৃত্ব হবে আল্লাহর। (৮২:১৯) যেদিন পালিয়ে যাবে মানুষ তার ভাইয়ের কাছ থেকে, তার মা, বাবা, স্ত্রী ও সন্তানদের কাছ থেকে। (৮০:৩৪)' যেদিন গোনাহগার পন হিসেবে দিতে চাইবে তার সন্তান-সন্ততিকে, স্ত্রীকে, ভাইকে ও তার গোষ্ঠীকে যারা তাকে আশ্রয় দিত এবং এমনকি নিজেকে রক্ষার জন্য পৃথিবীর সবকিছু দিতে চাইবে। কিন্তু না, কখনও নয়। নিশ্চয়ই এটা লেলিহান আগুন যা শরীরের গোশত ও চামড়া ঝলসিয়ে নিঃশেষ করে দেবে৷ (৭০: ১১-১৬)'


কুরআনের এই আয়াতগুলো থেকে আমাদের উচিত শিক্ষা নেয়া। আমাদের ভাবা উচিত আমরা যদি পাপ করে থাকি এবং আল্লাহ যদি আমাদের পাপগুলো ক্ষমা না করেন তাহলে আমাদের কি উপায় হবে? অতীতের পাপগুলো ক্ষমা করা হলো কিনা তা জানার উপায় নেই বলে সব সময়ে আল্লাহর রহমতের প্রত্যাশী হতে হবে এবং সব সময়ই সবিনয়ে ক্ষমা প্রার্থনা অব্যাহত রাখতে হবে। এ ছাড়াও কোনো নতুন পাপে যেন জড়িয়ে না পড়ি সে জন্য মহান আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে।


কদরের রাতগুলোতে পবিত্র কুরআনের সুরা দুখান, সুরা রুম ও সুরা আনকাবুত পড়ার ওপর খুব জোর দেয়া হয়। বিশ্বনবী (সা.) রমজানের শেষ দশ রাতে মোটেই ঘুমাতেন না। বিশেষ করে ২৩ রোজার রাতে নিজ পরিবারের সদস্যদেরকেও জেগে থাকতে বলতেন এবং এ রাতে পরিবারের কেউ ঘুমিয়ে গেলে চোখে পানি দিয়ে তাদের জাগিয়ে দিতেন। হযরত ফাতিমা জাহরা (সা. আ.) তৈরি করতেন হাল্কা খাবার যাতে ঘুম না আসে। রাতে জেগে থাকতে যাতে অসুবিধা না হয় সে জন্য তিনি দিনে ঘুমাতে বলতেন।


রমজানের শেষ শুক্রবার হচ্ছে বিশ্ব কুদস্ দিবস। মুসলমানদের প্রথম কেবলা আলআকসা মসজিদ ও পবিত্র বায়তুল মুকাদ্দাস শহরকে ইহুদিবাদী ইসরাইলের জবরদখল ও পুরো ফিলিস্তিনকে ইসরাইলের নাগপাশ থেকে মুক্ত করার জন্য বিশ্বব্যাপী গণ-সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ইসলামী বিপ্লবের রূপকার মরহুম ইমাম খোমেনীর আহ্বানে চালু হয়েছে এই দিবস। ১৯৭৯ সালে ইসলামী বিপ্লবের পর প্রথম চালু হয় এই দিবস। সেই থেকে প্রতি বছর কুদস দিবসের শোভাযাত্রা ও সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ। 
ইমাম খোমেনী (র.) বলেছিলেন, কুদস‌্ দিবস হচ্ছে ইসলামের দিবস। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, আরব দেশগুলোর মানুষ যদি এক বালতি করে পানি ঢালত তাহলে ইসরাইল ভেসে যেতো। ইসলামী ঐক্যের জন্য বিশ্ব কুদস্ দিবসের গুরুত্ব অপরিসীম।


বর্তমানে মুসলিম বিশ্বের মধ্যে হানাহানি এবং বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতির আলোকে বিশ্ব কুদস্ দিবসের গুরুত্ব কয়েক গুণ বেড়ে গেছে বলে মনে করা যায়। কারণ, ইসলামের শত্রুরা মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে গোত্রীয় ও ধর্মীয় বিভেদ সৃষ্টি করে মুসলমানদেরকে পারস্পরিক সংঘাতে জড়িয়ে ফেলেছে। ফিলিস্তিন সংকটকে ভুলিয়ে দেয়ার জন্যই এটা করা হয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।


ইহুদিবাদী ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান আগ্রাসী ও সন্ত্রাসী তৎপরতার প্রেক্ষাপটে মুসলিম সরকারগুলো ও বিশেষ করে আরব সরকারগুলোর উচিত ছিল ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়া। কিন্তু তারা তা না করে ইয়েমেন ও বাহরাইনের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেয়ার জন্য সেখানে দমন-পীড়নের ও ত্রাসের রাজত্ব সৃষ্টির চেষ্টা করছে। ইয়েমেনে ১০০ দিনেরও বেশি সময় ধরে চলছে সৌদি বিমান হামলার মাধ্যমে ইসরাইলি স্টাইলের গণহত্যা অভিযান। অন্যদিকে সিরিয়ার বাশার আসাদ সরকার ইসরাইল বিরোধী হওয়ায় এই সরকারকে দমনের জন্য সেখানে পাশ্চাত্য ও তাদের সেবাদাসদের মদদে লেলিয়ে দেয়া হয়েছে ধর্মান্ধ নানা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে। ধর্মান্ধ ওয়াহাবি-তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী সিরিয়ায় ও ইরাকে যেসব অমানবিক হত্যাকাণ্ড চালাচ্ছে তাতে পাশ্চাত্যের জনগণের কাছে ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক প্রচারণা চালানোর মোক্ষম সুযোগ পেয়ে গেছে ইসলাম বিরোধী শক্তি এবং তাদের প্রচার মাধ্যম।

 

বিস্ময়ের ব্যাপার হল ওয়াহাবি-তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো জিহাদের নামে মুসলমানদের হত্যা করলেও ইসরাইলের বিরুদ্ধে টু শব্দটিও করছে না। বরং ইসরাইলের নানা ধরনের সাহায্য পাচ্ছে তারা। তাই ইসরাইলকে দুর্বল করতে হলে এইসব তাকফিরি গোষ্ঠীর গড-ফাদার এবং তাদের আঞ্চলিক সহযোগী সরকারগুলোর বিরুদ্ধেই আন্দোলন ও জনমত গড়ে তোলা জরুরি। বিশ্ব-কুদস্ দিবস এ জন্য একটি উপযুক্ত সুযোগ হতে পারে।


এবারে পড়া যাক ২৩ রোজার দোয়া :


اليوم الثّالث والعشرون : اَللّـهُمَّ اغْسِلْني فيهِ مِنَ الذُّنُوبِ، وَطَهِّرْني فيهِ مِنَ الْعُيُوبِ، وَامْتَحِنْ قَلْبي فيهِ بِتَقْوَى الْقُلُوبِ، يا مُقيلَ عَثَراتِ الْمُذْنِبينَ .
হে আল্লাহ ! আমার সকল গুনাহ ধুয়ে মুছে পরিস্কার করে দাও। আমাকে সব দোষ-ত্রুটি থেকে পবিত্র কর। তাকওয়া ও খোদাভীতির মাধ্যমে আমার অন্তরকে সকল পরিক্ষায় উত্তীর্ণ কর। হে অপরাধীদের ভুল-ত্রুটি মার্জনাকারী। 

 

                                                                    (২৪) 

 

মহান আল্লাহর অশেষ প্রশংসা করছি এবং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত ও ন্যায়পরায়ণ সাহাবিদের শানে অশেষ দরুদ আর সালাম জানাচ্ছি।


গত পর্বের আলোচনায় আমরা পবিত্র কুরআনের কয়েকটি আয়াত থেকে বিচার দিবসের কঠোরতার চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। পবিত্র কুরআনে কিয়ামত দিবসের কঠোরতা সম্পর্কে এও বলা হয়েছে যে সেদিন মা তার নবজাতক শিশুর কথা ভুলে যাবে আতঙ্ক ও ত্রাসের কারণে। বিচার বা পুনরুত্থান দিবসে কাফির পাপীরা তীব্র দাবদাহ ও তৃষ্ণার কারণে এটা বলতে থাকবে যে, তাড়াতাড়ি বিচার শেষ করে আমাদের জাহান্নামে পাঠিয়ে দিন, কিন্তু বিচারের পূর্বে কষ্টকর এই অপেক্ষা ও ভোগান্তি আর সহ্য হচ্ছে না। অন্যদিকে সেদিন পুণ্যবানরা থাকবে সুশীতল ছায়ার নীচে এবং তাদের থাকবে না ভয়, তৃষ্ণা ও ক্ষুধার যন্ত্রণা।


মৃত্যুর সময় যদি আমরা ঈমান নিয়ে মরতে না পারি তাহলে আমাদের পুরো জীবনটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে। বলা হয় যাদের মধ্যে আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্য ছাড়া অন্য কোনো কারণে দুনিয়ার নানা বিষয়ের প্রতি আসক্তি রয়েছে সেসব বিষয়কে হাতছাড়া করার ভয় দেখিয়ে শয়তান মৃত্যুর সময় মানুষের ঈমান কেড়ে নেয়। মহান আল্লাহ আমাদেরকে এমনসব আসক্তি থেকে মুক্ত থাকার তৌফিক দিন। মোট কথা আমাদেরকে এ দুনিয়াতেই সর্বাত্মক ও যথাসাধ্য চেষ্টা চালাতে হবে জাহান্নামের আগুন থেকে নিজেদের রক্ষা করার জন্য। যারা মনে করেন যে তারা কখনও কোনো পাপ করেননি বা ভুল করেননি তাদেরকেও সদা-সর্বদা বিনয়ী থাকতে হবে। কারণ, তাদের সৎকর্মগুলো আল্লাহ কবুল করেছেন কিনা তা তো তিনি জানেন না। বলা হয় আল্লাহ তওবাকারী বিনয়ী পাপীকে অহংকারী পুণ্যবানের চেয়ে বেশি ভালবাসেন।


অহংকারের কারণে বহু বছরের সৎকর্ম, নামাজ-রোজা ও অন্য ইবাদত বরবাদ হয়ে যায়। আর বহু বছর পাপ করার পরও একনিষ্ঠ তওবা ও বিনয়ের কারণে একজন পাপী আল্লাহর কাছে অহংকারী ও আত্মতুষ্ট ইবাদতকারীর চেয়ে অনেক বেশি নৈকট্য অর্জন করেন।

 

রমজানের শেষ রাতগুলোতে আমরা রাত জেগে ইসলামী জ্ঞান চর্চা এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য কুরআন পাঠের পাশাপাশি মহাপুরুষদের দোয়াগুলোও অধ্যয়ন করতে পারি। কুফার মসজিদে আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আ.)'র উচ্চারিত কান্নাসিক্ত দোয়াটি তাঁর খোদাপ্রেম ও বিনয়াবনত হৃদয়ের অনুভূতিকে তুলে ধরে চমৎকারভাবে। এ দোয়ায় তিনি বলতেন:

 

'প্রভু! হে প্রভু! আপনি প্রভু, আমি দাস। দাসের উপর প্রভু ছাড়া আর কে দয়া করবে? প্রভু! হে প্রভু! আপনি অধিপতি, আমি অধীন। অধীনের উপর অধিপতি ছাড়া আর কে দয়া করবে? প্রভু! হে প্রভু! আপনি পরাক্রমশালী, আমি হীন-নীচ। হীন-নীচের উপর পরাক্রমশালী ছাড়া আর কে দয়া করবে? প্রভু! হে প্রভু! আপনি স্রষ্টা, আমি সৃষ্ট। সৃষ্টের উপর স্রষ্টা ছাড়া আর কে দয়া করবে? প্রভু! হে প্রভু! আপনি মহামহিম বা সর্বশক্তিমান, আমি তুচ্ছ বা অপাংক্তেয়, মূল্যহীন। তুচ্ছ ও মূল্যহীনের উপর মহামহিম ছাড়া আর কে দয়া করবে? প্রভু! হে প্রভু! আপনি সবল, আমি দুর্বল। দুর্বলের উপর সবল ছাড়া আর কে দয়া করবে? প্রভু! হে প্রভু! আপনি ধনী, আমি দরিদ্র। দরিদ্রের উপর ধনী ছাড়া আর কে দয়া করবে? প্রভু! হে প্রভু! আপনি দাতা, আমি প্রার্থনাকারী বা ভিক্ষুক। ভিক্ষুকের উপর দাতা ছাড়া আর কে দয়া করবে? প্রভু! হে প্রভু! আপনি চিরঞ্জীব, আমি মৃত্যুর আওতাধীন। মৃত্যু-পথযাত্রীর উপর চিরঞ্জীব ছাড়া আর কে দয়া করবে? প্রভু! হে প্রভু! আপনি স্থায়ী, আমি ধ্বংসশীল। ধ্বংসশীলের উপর স্থায়ী ছাড়া আর কে দয়া করবে?' 

 

এ মুনাজাতে আলী (আ.) আরও বলছেন: 

 

'প্রভু! হে প্রভু! আপনি চিরস্থায়ী, আমি ক্ষণস্থায়ী। ক্ষণস্থায়ীর উপর চিরস্থায়ী ছাড়া আর কে দয়া করবে? প্রভু! হে প্রভু! আপনি রিজিকদাতা, আমি হচ্ছি সেই যাকে রিজিক দেয়া হয়। রিজিকগ্রহীতার উপর রিজিকদাতা ছাড়া আর কে দয়া করবে? আপনি দানশীল, আমি কৃপণ। কৃপণের উপর দানশীল ছাড়া আর কে দয়া করবে?  


প্রভু! হে প্রভু! আপনি আরোগ্যদানকারী, আমি রোগগ্রস্ত। রোগগ্রস্তের উপর আরোগ্যদানকারী ছাড়া আর কে দয়া করবে? আপনি বৃহৎ, আমি ক্ষুদ্র। ক্ষুদ্রের উপর বৃহৎ ছাড়া আর কে দয়া করবে? প্রভু! হে প্রভু! আপনি সুপথ প্রদর্শনকারী, আমি পথভ্রষ্ট। পথভ্রষ্টের উপর সুপথ প্রদর্শনকারী ছাড়া আর কে দয়া করবে? প্রভু! হে প্রভু! আপনি দয়ালু, আমি হচ্ছি সেই যাকে দয়া করা হয়। দয়াপ্রাপ্তের উপর দয়ালু ছাড়া আর কে দয়া করবে?.....' প্রভু! হে প্রভু! আপনি গৌরবান্বিত, আমি নতজানু। নতজানুর উপর গৌরবান্বিত ছাড়া আর কে দয়া করবে? প্রভু! হে প্রভু! আপনার রহমতের মাধ্যমে এবং আপনার দান, মহানুভবতা এবং কৃপার মাধ্যমে আমার উপর দয়া করুন। আমার উপর সন্তুষ্ট হোন, হে দাতা, দয়ালু এবং অবারিত দানশীল ও অনুগ্রহকারী সত্তা! আপনার রহমতের মাধ্যমে, হে সর্বশ্রেষ্ঠ দয়ালু!' 

 

কৃপণতা খুবই মন্দ স্বভাব। কৃপণতা শুধু অর্থ-সম্পদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য তা নয়। আল্লাহর প্রতি মনোযোগহীনতা ও কৃতজ্ঞতার অভাবও নিকৃষ্ট শ্রেণীর কৃপণতা। হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি (বিনা ওজরে) নামাজকে সংক্ষিপ্ত করে সে হচ্ছে সবচেয়ে বড় কৃপণ।


ভেবে দেখুন আমরা হাসি-খেলায় ও টেলিভিশনের নানা তামাশা দেখার পেছনে কত সময় নষ্ট করছি। অথচ নামাজ পড়ার বেলায় এত দ্রুত রুকু-সিজদা করছি যেন এখনই আমার বাস বা ট্রেন মিস হয়ে যাবে!


মহান আল্লাহ আমাদেরকে প্রতিটি ফরজ কাজ, দায়িত্ব ও অধিকার যথাযথভাবে পালনের সুযোগ দিন এবং সেজন্য যথেষ্ট মাত্রায় জ্ঞান অর্জনের তৌফিক দিন এই হোক শবে কদরের অন্যতম প্রধান প্রার্থনা। 

 

 

এবারে পড়া যাক অর্থসহ ২৪ রোজার দোয়া:


اليوم الرّابع والعشرون : اَللّـهُمَّ اِنّي اَسْأَلُكَ فيهِ ما يُرْضيكَ، وَاَعُوذُبِكَ مِمّا يُؤْذيكَ، وَاَسْأَلُكَ التَّوْفيقَ فيهِ لاَِنْ اُطيعَكَ وَلا اَعْصيْكَ، يا جَوادَ السّائِلينَ .
হে আল্লাহ ! আজ তোমার কাছে ঐসব আবেদন করছি যার মধ্যে তোমার সন্তুষ্টি রয়েছে। যা কিছু তোমার কাছে অপছন্দনীয় তা থেকে তোমার আশ্রয় চাই। তোমারই আনুগত্য করার এবং তোমার নাফরমানী থেকে বিরত থাকার তৌফিক দাও। হে প্রার্থীদের প্রতি দানশীল। 

 

                                                                                              (২৫)

রমজান খোদাপ্রেমের অশেষ সাগরে অবগাহনের মাস। আমরা যদি খোদাপ্রেমিক হতে পরি তাহলে আল্লাহও হবেন আমাদের প্রেমিক। যখন প্রেমিক ও প্রেমাস্পদ দুজনে দুজনার হয়ে যায় তখনই প্রেম হয় সার্থক। আল্লাহ মানুষকে খুব ভালবেসে সৃষ্টি করেছিলেন তাঁর প্রেমিক হওয়ার জন্য ও তাঁকে ভালভাবে চেনার জন্যই যাতে আমরা তাঁর যোগ্য প্রতিনিধি হতে পারি। ফানাফিল্লাহ বা আল্লাহতে চিন্তাগতভাবে বিলীন হয়ে যাওয়ার জন্য খোদার রঙ্গে রঙ্গিন করতে হবে আমাদের জীবনকে।

 

লোহাকে যখন আগুনে অতি তপ্ত করা হয় তখন আগুন আর লোহার রঙ একই রকম দেখায়। বলা হয় আল্লাহর রঙে রঙ্গিন হতে পারার আনন্দেই মনসুর হাল্লাজের মত সাধক বলতেন: আনাল হক বা আমিই খোদা। রমজানে সংযম বা খোদাভীতি অর্জনের সাধনা হচ্ছে ফানাফিল্লাহর পথে অগ্রযাত্রারই এক মাধ্যম। আমাদের জীবনকে এমনভাবে গড়ে তোলা উচিত যাতে আল্লাহ ফেরেশতাকুলের কাছে মানুষের জন্য গর্ব প্রকাশ করে বলতে পারেন যে দেখো, তোমরা বলেছিলে এই মানুষ হয়তো হানাহানি করা ও অকৃতজ্ঞতা দেখানো ছাড়া আর কিছুই করবে না!-অথচ এখন দেখ এই মানুষ নিজের কাম, ক্রোধ ও লোভ-লালসাকে এবং এমনকি বৈধ সব প্রবৃত্তিকেও দমিয়ে রাখছে শুধু আমার সন্তুষ্টির জন্য যদিও তারা জানে যে গোপনে অসংযমী হলেও অন্য কোনো মানুষ তাকে দেখবে না!!


বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত হচ্ছেন খোদাপ্রেমের সর্বোচ্চ আদর্শ। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনেই বলেছেন, মুহাম্মাদ (সা.) সর্বোত্তম বা অনুপম চরিত্রের অধিকারী। হাদিসে কুদসিতে এসেছে, আল্লাহ যদি মহানবী (সা.)-কে সৃষ্টি না করতেন তাহলে জগতকে সৃষ্টি করতেন না। আর মহানবী বলেছেন, তিনি ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত একই নুরে সৃষ্ট হয়েছেন। মহানবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের মর্যাদা এত বেশি যে অন্য নবী-রাসূলরা শেষ নবীর উম্মত হওয়ার আকাঙ্ক্ষা করে বলতেন, ইস্, যদি নবী না হয়ে শেষ নবীর উম্মত হতাম! বলা হয় শেষ নবীর খাঁটি আলেমদের মর্যাদা বনি ইসরাইলের নবীদের চেয়েও বেশি। হযরত ঈসা (আ.) দুনিয়াতে আবার ফিরে এসে শেষ নবীর উম্মত হবেন। তাই মুসলমানদের বোঝা উচিত আল্লাহ তাদের কত বেশি মর্যাদা দিয়েছেন। আর এই মর্যাদা ধরে রাখার জন্য তাদের উচিত নবুওতি চরিত্র অর্জন করা। মহান আল্লাহর সত্যিকারের প্রেমাস্পদরা ছিলেন এমন যে বেহেশত ও দোযখ না থাকলেও তারা আল্লাহর ইবাদত বা দাসত্ব করতেন পরমানন্দে! আজ যদি আল্লাহ ঘোষণা করেন যে মানুষকে সব দায়িত্ব থেকে মুক্ত করা হল, নামাজ রোজা না করলেও কোনো গোনাহ হবে না, জাহান্নামকে ধ্বংস করা হয়েছে এবং বেহেশত বলেও আর কিছু নেই- এ অবস্থায় আমরা ক'জন নামাজ-রোজা করব? 


নবী-রাসূল ও ইমামরা বলতেন, বেহেশত ও দোযখ না থাকলেও কেবল স্রস্টা হিসেবেই আল্লাহ আমাদের ইবাদত পাওয়ার যোগ্য। বেহেশতের আশায় ইবাদত করা হচ্ছে লোভী শ্রমিকের বা মুনাফালোভীর ইবাদতের মত। শাস্তির ভয়ে ইবাদত করা হচ্ছে ভীত ছাত্রের অনিচ্ছাকৃত পড়াশুনার মত। আর মুক্ত, স্বাধীন ও উদারমনা ব্যক্তির ইবাদত হচ্ছে কেবলই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য।

 

সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ করা নবীদের অন্যতম বড় বৈশিষ্ট্য। কিন্তু আমরা যদি নিজেরাই সৎ না হই তাহলে অন্যদের সৎ কাজের দিকে ডাকার কোনো নৈতিক অধিকার কী আমাদের থাকবে? আর অসৎ ব্যক্তির পক্ষ থেকে সৎ কাজের আহ্বান যে কোনো প্রভাব ফেলে না তা খুবই স্পষ্ট। রমজানের পবিত্রতা রক্ষা বলতে কেবল বাহ্যিক ইসলামী অনুশাসনগুলো মেনে চলাকেই বোঝায় না। আল্লাহ ছাড়া অন্য যে কোনো কিছুর আসক্তিকে দূর করাই হচ্ছে প্রকৃত আত্মিক পবিত্রতা।


আমরা যে নামাজ রোজা করছি, হজ করছি, দান-খয়রাত করছি এসবই কি একান্তই আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য করছি কী? অনেক সময় এমন হয় যে আমাদের নামাজ রোজ হজ জাকাত – এসবই এক ধরনের নেশা বা বাতিক মাত্র। কেবল অভ্যাসের বশেই সবার আগে মসজিদের দিকে ছুটছি! নিজের অহংকারকে ধরে রাখার জন্যই বা গর্ব করার জন্যই ইসলামী জ্ঞান চর্চা করছি ও তা জাহির করছি কি? যদি এমন হয় তাহলে এসবই হচ্ছে শির্ক। আর এইসব কিছুই জাহান্নাম ছাড়া অন্য কিছুই বয়ে আনবে না।


একজন প্রকৃত মু'মিনের বৈশিষ্ট্য হল বহু সৎকর্ম ও ইবাদতের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও তিনি সেসবকে খুবই কম এবং তুচ্ছ বলে মনে করেন। অন্যদিকে পাপ কাজ খুব কম করা সত্ত্বেও তিনি মনে করেন যে তার চেয়ে বড় কোনো পাপী নেই।


বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের বর্ণিত প্রসিদ্ধ দোয়া মুনাজাতে শাবানিয়ার একাংশে এসেছে:


'হে আমার ইলাহ্! আপনি যদি আমাকে আমার অপরাধের জন্য পাকড়াও করেন তাহলে আমি আপনার ক্ষমাকে আঁকড়ে ধরব। আপনি যদি আমাকে আমার পাপের কারণে পাকড়াও করেন তাহলে আমি আপনার ক্ষমার উসিলায় আপনাকে আঁকড়ে ধরব। আর আপনি যদি আমাকে জাহান্নামে প্রবেশ করান তাহলে আমি জাহান্নামের অধিবাসীদের কাছে ঘোষণা করছি যে, নিশ্চয়ই আমি আপনাকেই ভালোবাসি। হে আমার ইলাহ্! আপনার আনুগত্যের ক্ষেত্রে আমার আমল যদি ক্ষুদ্র হয় তাহলে আপনাকে পাওয়ার ক্ষেত্রে আমার আশা বড় হবে। হে আমার ইলাহ্! কিভাবে আমি আপনার কাছে বঞ্চিত হব অথচ দয়া ও মুক্তিপ্রাপ্ত হওয়ার ক্ষেত্রে আপনার মহানুভবতা সম্বন্ধে আমার সুধারণা জন্মেছে?' 


এবারে পড়া যাক অর্থসহ ২৫ রোজার দোয়া: 


اليوم الخامس والعشرون : اَللّـهُمَّ اجْعَلْني فيهِ مُحِبَّاً لاَِوْلِيائِكَ، وَمُعادِياً لاَِعْدائِكَ، مُسْتَنّاً بِسُنَّةِ خاتَمِ اَنْبِيائِكَ، يا عاصِمَ قُلُوبِ النَّبِيّينَ .
হে আল্লাহ ! এ দিনে আমাকে তোমার বন্ধুদের বন্ধু এবং তোমার শত্রুদের শত্রু করে দাও। তোমার আখেরী নবীর সুন্নত ও পথ অনুযায়ী চলার তৌফিক আমাকে দান কর। হে নবীদের অন্তরের পবিত্রতা রক্ষাকারী। 

                                                                                                     

                                                                                           (২৬)

 

মহান আল্লাহর অশেষ প্রশংসা করছি এবং বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত ও ন্যায়পরায়ণ সাহাবিদের শানে অশেষ দরুদ আর সালাম জানাচ্ছি। 


পবিত্র রমজানের প্রাণ বা হৃদয় হলো শবে কদর। আরবিতে 'কাদর' শব্দটির অর্থ হচ্ছে পরিমাপ। এই রাতে কি পরিমাপ করা হয়? এর উত্তর হল: কতটা সৌভাগ্য বা বরকত বণ্টন করা হবে সারা বছরের জন্য- তাই পরিমাপ করা হয় সৌভাগ্যের এই রাতে। কতটা সৌভাগ্য বা বরকত বরাদ্দ করা হয়? এর উত্তর হল: আপনি যতটা চান ততটাই বরাদ্দ করা হয়। কারণ, এই রাতে যিনি দান করেন তিনি হলেন অফুরন্ত কল্যাণ ও বরকতের অধিকারী অসীম দয়ালু ও দাতা মহান আল্লাহ। কেউ যদি কম চায় তাহলে তো কেউই তাকে বেশি দেয় না। মহান আল্লাহর কাছে কেউ যদি কম চায় তাহলে তা আল্লাহর জন্য এক ধরণের অবমাননাকর বিষয়। ধরুন একজন মহারাজা এক বিশেষ দিনে বলছেন, আজ যে যা চাইবে তাকে তা-ই দেয়া হবে। শত শত বা হাজার হাজার স্বর্ণমুদ্রা ও হীরা-জহরত দেয়া হবে চাওয়া মাত্রই। এ অবস্থায় কেউ যদি বলেন আমাকে কয়টা রূপার মুদ্রা দেন। রাজা তাকে অপমান করা হচ্ছে ভেবে তাড়িয়ে দিতে পারেন প্রাসাদ থেকে অনেক দূরে।


শবে কদরের রাতে কেউ যদি প্রতিজ্ঞা করে, হে আল্লাহ আমি আর মিথ্যা কথা বলবো না, আমি আর গিবত করবো না। তাহলে মহান আল্লাহ তার এই সৎ সিদ্ধান্তের আলোকে তাকে সারা বছর ধরে সম্মান ও মর্যাদা দানের ব্যবস্থা করবেন এবং তার রুটি-রুজিতেও দেবেন বরকত। কেউ যদি এ রাতে সিদ্ধান্ত নেয় যে আমি যথাসম্ভব দরিদ্র ও ইয়াতিমদের সহায়তা করবো এবং দূরে সরে যাওয়া আত্মীয়-স্বজনের খোঁজ-খবর নেব, তাহলে আল্লাহও তাকে এই সট সিদ্ধান্তের আলোকে সারা বছর ধরে নানা পুরস্কার দেবেন। মোট কথা এই রাতে যে যত বেশি ভাল কাজ করার ও পাপাচার বা বদ-অভ্যাস বর্জনের সিদ্ধান্ত নেবে আল্লাহ তাকে ততই বরকত দেবেন গোটা এক বছর ধরে। তবে এ রাতে বড় বড় সৎকর্মের বা মহত কাজের সিদ্ধান্ত নেয়ার পরও যদি কেউ হাত গুটিয়ে বসে থাকে এবং এইসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য বাস্তব কোনো পদক্ষেপ না নেয় তাহলে কাঙ্ক্ষিত পুরস্কার বা উন্নতি তার ভাগ্যে জুটবে না। শবে কদরের রাতে কেউ অতীতের পাপের জন্য ক্ষমা চাইলে আল্লাহ তা ক্ষমা করেন। কিন্তু এরপর আবার পরের দিন থেকে একই বা নতুন নতুন নানা পাপে জড়িয়ে পড়লে বাস্তবে শবে কদর থেকে সে কিছুই অর্জন করতে সক্ষম হল না।  


রমজানের আর মাত্র অল্প ক'টি দিন বাকি রয়েছে। এ মাস হল দান খয়রাতের মাস। জাকাত ও খুমস পরিশোধের জন্যও সবচেয়ে ভালো সময়। পবিত্র কুরআনে ৭০ বারেও বেশি ধৈর্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ধৈর্য ধারণের ১৬টিরও বেশি উপায়ের কথা বলা হয়েছে। ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা শেখার সবচেয়ে ভাল সময় হল পবিত্র রমজান মাস। বরকতময় এই দিন ও রাতগুলোয় আমরা কি অর্জন করতে পেরেছি জানি না হে প্রভু। একমাত্র আল্লাহই জানেন আমাদের প্রকৃত অবস্থা সম্পর্কে। তাই আসুন আমরা হাত তুলি তাঁর দরবারে ও সমস্বরে বলি:

  

'মহান ফেরেশতাকুল ও নবী-রাসুল এবং তোমার প্রিয় বান্দাহ ও বিশেষ করে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের উসিলায় তোমার কাছে প্রার্থন করছি হে আল্লাহ!- তাঁদের প্রতি তোমার অসীম শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক- আমাদেরকে রক্ষ কর দোযখের আগুন থেকে ও দান কর বেহেশত। তোমার অপার করুণায় আমাদেরকে তুমি ক্ষমা কর ও দান কর তোমার নৈকট্য। কবুল কর আমাদের মুনাজাত ও দান কর বিচার দিবসের নিরাপত্তা। তোমার মহিমান্বিত সত্তা ও তোমার প্রবল প্রতাপের উসিলায় তোমার কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি এমন অবস্থা থেকে যে রমজান শেষ হয়ে যাওয়ার পরও আমাদের গোনাহর খাতায় এমন কোনো পাপ ও ত্রুটি থেকে গেছে যা তুমি ক্ষমা করনি। হে আমাদের প্রভু, প্রভু হে, প্রভু হে! এ মাসে যদি তুমি আমাদের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে থাক তাহলে আরও বেশি সন্তুষ্ট হও, আর যদি সন্তুষ্ট না হয়ে থাক তাহলে এখন থেকে সন্তুষ্ট হও। হে তুমি যে দয়ালুদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দয়ালু। যে তুমি এক ও অমুখাপেক্ষী, যে সন্তান জন্ম দেয় না ও নিজেও জন্ম নেয়নি এবং কোনো কিছুই তাঁর সমকক্ষ ও সমতুল্য নয়।' 

 

' হে তুমি যে দাউদ নবীর (আ.) জন্য লোহাকে নরম করেছ, হে তুমি যে আইয়ুব নবী (আ.) হতে দুঃখ-দুর্দশা ও কষ্ট দূর করেছ, হে তুমি যে দূর করেছ ইয়াকুব নবীর (আ.) বেদনা, যে তুমি নিবারণ করেছ ইউসুফ নবীর (আ.) যাতনা; মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর আহলে বাইতের ওপর বর্ষণ কর সেই পরিমাণ দরুদ, রহমত ও শান্তি যতটা তাঁরা এর উপযুক্ত। আমাদের সঙ্গে সেরকম আচরণ কর যেরকম আচরণ করা তোমার মহানুভবতার সঙ্গে মানানসই; আমরা যার যোগ্য তার আলোকে আচরণ করো না আমাদের সঙ্গে।'


'হে আল্লাহ আমাদেরকে প্রস্তুতিবিহীন মৃত্যু দান করো না। আমাদেরকে প্রকৃত মানুষের মত মানুষ তথা তোমার প্রিয় নবী ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের অনুসারী হওয়ার তৌফিক দান কর।'


এবারে পড়া যাক অর্থসহ ২৬ রোজার দোয়া: 

 


اليوم السّادس والعشرون : اَللّـهُمَّ اجْعَلْ سَعْيي فيهِ مَشْكُوراً، وَذَنْبي فيهِ مَغْفُوراً وَعَمَلي فيهِ مَقْبُولاً، وَعَيْبي فيهِ مَسْتُوراً، يا اَسْمَعَ السّامِعينَ .
হে আল্লাহ ! এ দিনে আমার প্রচেষ্টাকে গ্রহণ করে নাও। আমার সব গুনাহ মাফ করে দাও। আমার সব আমল কাজ কবুল করো এবং সব দোষ-ত্রু টি ঢেকে রাখ। হে সর্বশ্রেষ্ঠ শ্রোতা। 

 

                                                                                          (২৭)

 

 

মহান আল্লাহর অশেষ প্রশংসা করছি এবং বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত ও ন্যায়পরায়ণ সাহাবিদের শানে পেশ করছি অশেষ দরুদ আর সালাম। 


ধৈর্য ও দৃঢ়তা শেখার অন্যতম মাধ্যম হল রোজা। সৎপথে অবিচল থাকা ও সত্য প্রচারে দৃঢ়তা রাখা হচ্ছে মু'মিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-কে সত্য প্রচার থেকে বিরত রাখার জন্য কাফির ও মুশরিকরা এমন কোনো কাজ নেই যা করেনি। তারা কখনও মানবজাতির সবচেয়ে বড় এই সুহৃদ ও শিক্ষককে কখনও পাগল, কবি, গণক বা জাদুকর বলেছে। কখনওবা তাঁকে হত্যার চেষ্টা করেছে। কখনওবা প্রলোভন দেখিয়ে বলেছে, কি চাও- রাজত্ব? সবচেয়ে সুন্দরী নারী? না অঢেল ধন-সম্পদ! কিন্তু মহানবী (সা.) অশেষ ধৈর্যশীল ও দৃঢ় থেকে বলেছেন: আমার এক হাতে চাঁদ ও অন্য হাতে যদি সূর্যও এনে দাও তবুও আমি সত্য প্রচারে বিরত হব না।

 

তায়েফের জনগণের কাছে একত্ববাদ প্রচার করতে গিয়ে বিশ্বনবী (সা.) সেখানকার সর্দারদের লেলিয়ে দেয়া পেটোয়া বাহিনীর ইট-পাথরের আঘাতে রক্তাক্ত হয়েছেন। কিন্তু তিনি তাদের জন্য বদদোয়া দেননি। যদিও বলা হয় ফেরেশতারা বলেছিল, আপনি যদি ইশারা করেন তাহলে এদের ধ্বংস করে দেয়া হবে। কিন্তু গোটা বিশ্ব জগতের জন্য আল্লাহর রহমত হিসেবে প্রেরিত মহানবী অজ্ঞ তায়েফবাসীর মুক্তি ও সুপথ লাভের জন্য দোয়া করেছেন! তিনি আহত অবস্থায় তায়েফের এক আঙ্গুর বাগানে আশ্রয় নিলে বাগানটির মালিক ক্লান্ত ও আহত এই মুসাফিরকে আঙ্গুর দিয়ে আপ্যায়ন করতে বলেন বাগানের এক কর্মীকে। মহানবী ধন্যবাদ জানিয়ে আঙ্গুর খাওয়ার সময় বললেন: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। আল্লাহর নাম শুনে ওই কর্মী বিস্মিত হয়ে বলল, এর অর্থ কী? এমন কথা তো আর কখনও শুনিনি? তিনি বললেন, আমি মহান স্রষ্টা তথা আল্লাহর নাম নিয়েছি যিনি হলেন সবচেয়ে দয়ালু ও করুণাময় দাতা।

 

মহানবী প্রশ্ন করে জানতে পারেন যে এই শ্রমিক ইরাকের নেইনাভা অঞ্চলের অধিবাসী। রাসূল (সা.) স্মিত হেসে বললেন, আপনি তো তাহলে হযরত ইউনুস নবীর (আ.) এলাকার অধিবাসী। ওই বাগান-কর্মী বলল, আপনি ইউনুস নবীর কথা জানেন কিভাবে? তিনি বললেন, এই নবীর মত আমিও আল্লাহর একজন নবী। আল্লাহই আমাকে তাঁর জীবন সম্পর্কে জানিয়েছেন। এরপর তিনি ইউনুস নবীর জীবনের বেশ কিছু ঘটনা এমনভাবে তুলে ধরলেন যে ওই কর্মীর চোখ বেয়ে ঝরল অশ্রু। সে মহানবীর হাতে চুমো খেয়ে বলল, আমি আপনার ও আপনার আল্লাহর ওপর ঈমান আনলাম। মহানবী (সা.) খুশি হলেন ও তায়েফে এ পর্যন্ত যত কষ্ট ও যন্ত্রণার শিকার হলেন সবই ভুলে গেলেন। এভাবে ধৈর্য ধারণ করায় তিনি আরও এক ব্যক্তিকে ইসলামের পথে আনতে সক্ষম হন।

 

 

রমজানের শেষ রাতগুলোতে দোয়া ও ইবাদতের গুরুত্ব অপরিসীম। এইসব রাতই মনের সব কথা আল্লাহর কাছে খুলে বলার শ্রেষ্ঠ সময়: 'হে আল্লাহ! যে তুমি রাত থেকে দিনকে নিয়ে আস ও দিনের ফিরিয়ে আন রাতকে! নিশ্চয়ই আমরা ডুবে আছি অন্ধকারে! তোমার নির্দেশেই সূর্য ভ্রমণ করছে নির্দিষ্ট কক্ষপথে। তুমিই নির্ধারণ করেছ চাঁদের নানা পর্যায় যতক্ষণ না তা পুনরায় বেঁকে যায় পুরনো খেজুর শাখার মত। হে সমস্ত আলোর আলো! হে সব লক্ষ্যের চূড়ান্ত গন্তব্য ও সব কল্যাণের অভিভাবক। হে এক আল্লাহ! হে অনন্য! হে দয়ালু! হে পবিত্র! সবচেয়ে সুন্দর নামগুলো তো তোমারই! সর্বোচ্চ মহত্ত্ব, সব গুণগান ও প্রশংসা সে তো তোমারই! শ্রেষ্ঠত্ব বলতে যা যা আছে সে-সবই তো তোমার! মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের ওপর তোমার অপার রহমত, কল্যাণ ও শান্তি বর্ষণ কর। রমজানের এই রাতগুলোতে আমাদের নাম নথিভুক্ত কর সৌভাগ্যবানদের তালিকায় এবং শামিল কর শহীদদের মিছিলে। আমাদের সৎকর্মগুলোকে স্থান দাও নেককারদের খাতায় ও ক্ষমা কর আমাদের পাপ। আমাদেরকে দাও এমন নিশ্চিত বিশ্বাস যা হৃদয়কে করবে প্রফুল্ল ও দূর করবে সব সন্দেহ! আর যেন আমরা সন্তুষ্ট থাকি তোমার দেয়া বরাদ্দে। আমাদেরকে দাও দুনিয়া ও আখিরাতের সমস্ত কল্যাণ। আর রক্ষা কর দোযখের আগুন থেকে।'


'হে আল্লাহ কদরের রাতে যেন তোমাকে স্মরণ করি ও কৃতজ্ঞচিত্ত হই এবং আগ্রহী হই তোমাকে সন্তুষ্ট করতে। আর যেন এ রাতে ক্ষমা চাই তোমার কাছে। এ ছাড়াও সেইসব সাফল্য চাই যা তুমি বরাদ্দ করেছ মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের জন্য। তাঁদের ওপর বর্ষিত হোক তোমার অপার করুণা ও শান্তি।' 
পবিত্র কুরআনে বর্ণিত দোয়াগুলোর পাশাপাশি বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের দোয়াগুলো যেন হয় আমাদের সারা জীবনের পাথেয়। কারণ, মহানবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত হচ্ছেন জীবন্ত ও বাস্তব কুরআন। তাঁরা মহান আল্লাহর শেখানো কথার বাইরে কোনো কথাই নিজ হতে বলতেন না। তাই তাঁরা সঠিক হাদিস বাছাইয়ের মানদণ্ড তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন, যদি দেখো যে আমাদের নামে প্রচলিত কোনো কথা পবিত্র কুরআনের বাণীর বিরোধী হয় তাহলে তা দেয়ালে ছুঁড়ে মারবে। মহানবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত খাওয়া-দাওয়ার, উঠা-বসার, ঘুমানোর, গোসলের, ভ্রমণের ও জিহাদের দোয়া থেকে শুরু করে প্রতিটি বিষয়ের ও এমনকি নখ কাটার দোয়াও রেখে গেছেন মানব জাতির জন্য। প্রকৃত মুসলমানের উচিত এইসব দোয়া শিখে সেসবের মাধ্যমে সব সময়ই আল্লাহর সঙ্গে নৈকট্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা।

 

এবারে পড়া যাক অর্থসহ ২৭ রোজার দোয়া: 

 


اليوم السّابع والعشرون : اَللّـهُمَّ ارْزُقْني فيهِ فَضْلَ لَيْلَةِ الْقَدْرِ، وَصَيِّرْ اُمُوري فيهِ مِنَ الْعُسْرِ اِلَى الْيُسْرِ، وَاقْبَلْ مَعاذيري، وَحُطَّ عَنّيِ الذَّنْبَ وَالْوِزْرَ، يا رَؤوفاً بِعِبادِهِ الصّالِحينَ
হে আল্লাহ ! আজকের দিনে আমাকে শবেকদরের ফজিলত দান কর। আমার কাজ কর্মকে কঠিন থেকে সহজের দিকে নিয়ে যাও। আমার অক্ষমতা কবুল কর এবং ক্ষমা করে দাও আমার সব অপরাধ। হে যোগ্য বান্দাদের প্রতি মেহেরবান।

 

                                                                                                      (২৮)

 

পবিত্র রমজানে শয়তানকে বন্দি রাখা হয়। কিন্তু তাই বলে শয়তানের অনুসারী মানুষ ও জিনেরা তো বসে নেই। সারা বছর ধরে শয়তান দুর্বল ঈমানের অধিকারী মানুষের মনে যে প্রভাব সৃষ্টি করে তা থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা চালাতে হবে পবিত্র রমজান মাসে। শয়তান মানুষের শপথ-করা প্রকাশ্য শত্রু। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে সে মানুষকে বিভ্রান্ত করার জন্য চারদিক থেকে হামলা চালায়। শয়তানের স্পর্ধা এত বেশি যে সে নবী-রাসূলকেও বিভ্রান্ত করার চেষ্টা চালিয়েছে! তার আশা ছিল কিছুক্ষণের জন্য হলেও নবী-রাসূলকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিরত রাখতে সে সফল হবে চরম বিভ্রান্ত করা সম্ভব না হলেও! কিন্তু মহান নবী-রাসূলরা সদা-সচেতন ও শয়তানের কৌশলগুলো সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত বলে শয়তান কখনও তাঁদের বিন্দুমাত্রও প্রভাবিত করতে পারেনি।

 

আদম ও হাওয়ার ঘটনাটি ছিল দুনিয়ার জীবন শুরুর পূর্ববর্তী অনভিজ্ঞতা-প্রসূত অস্থায়ী বেহেশতের একটি ঘটনা। নির্দিষ্ট ওই গাছের কাছে না যাওয়ার নির্দেশ পালন করা বাধ্যতামূলক বা ওয়াজিবও ছিল না। যাই হোক নবী-রাসূল ও ইমামদের বাইরের মুসলমানকে বিভ্রান্ত করা শয়তানের জন্য খুব কঠিন কাজ নয়। তাই প্রত্যেক মুসলমানের উচিত এ জন্য আত্মরক্ষার নানা ঢাল সংগ্রহ করা। নামাজ ও রোজা হল এমনই দুই ঢাল।

 

শয়তান মসজিদগামী কোনো মুসলমানকে মসজিদে যাওয়া থেকে বিরত রাখার জন্য নানা ধরনের বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করে। পথে কারো সঙ্গে ধাক্কা লাগানো বা হোঁচট খাওয়ানো, আলসেয়েমি সৃষ্টি করা- এসবই শয়তানের কৌশল হতে পারে। আর যিনি এইসব বাধা কাটিয়ে মসজিদে চলে আসেন তাকে কুমন্ত্রণা দিয়ে শয়তান বলে: খবরদার মসজিদে মুসল্লিদের প্রথম কাতারে দাঁড়াবে না! সেখানে দাঁড়ালে তোমার মনে অহংকার জাগতে পারে! আর যদি মু'মিন প্রথম কাতারে দাঁড়ান তখন শয়তান বলবে: তুমি তো আর যেইসেই মুসল্লি নও, সব সময় মসজিদে আস এবং আগেভাগে আস বলে এটাই তো তোমার জন্য দাঁড়ানোর সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান! এভাবে শয়তান মুসুল্লিকে প্রথম কাতারে শামিল হওয়ার অজস্র বা বিপুল সাওয়াব থেকে বঞ্চিত করতে ব্যর্থ হয়ে হয়ে তার মধ্যে অহংকার ঢুকিয়ে তাকে ব্যর্থ করতে চায়।

 

তাই এটা স্পষ্ট, শয়তান অত্যন্ত বেহায়া ও নাছোড়বান্দা। সে কাউকে খোদার পথের প্রথমেই, কাউকে মাঝখানে ও কাউকে শেষ প্রান্তে বিভ্রান্ত করার জন্য কুমন্ত্রণা দিতেই থাকে। একইভাবে শয়তান কাউকে জীবনের শুরুর দিকে বা যৌবনে, কাউকে মধ্য-বয়সে ও কাউকে বৃদ্ধ বয়সে বিভ্রান্ত করতে পারে। এমনকি মৃত্যুর প্রাক্কালে মুসলমানকে ঈমানহীন করার জন্যও শয়তান নানা কৌশল অবলম্বন করে। অনেক খোদাভীরু ও বড় আলেম এবং এমনকি আল্লাহর ওলি হবার পরও শয়তানের হাতে বিভ্রান্ত হয়ে ঈমান হারানোর নজির রয়েছে। আজাজিল বা ইবলিস নিজেও ছিল বড় ধরনের আবেদ ও সাধক। সে ব্যাপক ইবাদতের সুবাদে জিন হয়েও ফেরেশতার কাতারে উন্নীত হতে পেরেছিল। কিন্তু মানুষের প্রতি হিংসা তাকে অভিশপ্ত শয়তান ও খোদাদ্রোহীতে পরিণত করে।

 


তাই মৃত্যুর সময় যেন শয়তান আমাদের ঈমানকে ছিনিয়ে নিতে না পারে সে জন্য সদা-সতর্ক থাকতে হবে। এ জন্য বেশি বেশি সৎকর্ম করার পাশাপাশি কুরআন অধ্যয়ন, মহানবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের ওপর বেশি বেশি দরুদ পেশ এবং তাঁদের উসিলা দিয়ে মৃত্যুর সময় ঈমান ঠিক রাখার জন্য সাহায্য চাওয়া, ইসলামী সাহিত্য অধ্যয়ন এবং সৎ ও জ্ঞানী আলেমদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা জরুরি। কথায় বলে সব ভালো যার শেষ ভালো তার।


রমজানের রাতগুলোতে দোয়া পাঠ যেন মহান আল্লাহর সঙ্গে প্রেমালাপ ও প্রেমাস্পদের জন্য নিজেকে সবচেয়ে বিনীত করার আকুল মহড়া। এমনসব রাতে বহু পাপ ও অত্যন্ত কম বা নগণ্য ভালো কাজের কথা স্মরণ করে বলা উচিত:


'হে আল্লাহ! আমরা একদল রহমত-প্রত্যাশী ভিক্ষুক তোমার সম্মান ও মহামর্যাদার উসিলায় তোমার রহমতের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। পুণ্য বলতে কিছুই নেই আমাদের। তাই নতজানু ও দরিদ্রদের সঙ্গে চড়েছি এমন এক জাহাজে যা অপেক্ষা করছে তোমার দয়া ও করুণার মহাসাগর-তীরে। অনুমতি চাচ্ছি তোমার যাতে পাড়ি দিতে পারি তোমার দয়া ও রহমতের এই মহাসাগর। তুমি যদি এই সম্মানিত মাসে কেবল তাদেরকেই ক্ষমা কর যারা একনিষ্ঠ ইবাদত তথা রোজা ও নামাজের মাধ্যমে নিজেদের পবিত্র করেছে তাহলে উদাসীন পাপীদের কে রক্ষা করবে যারা ডুবে আছে তাদের পাপের সাগরে? যদি তুমি তোমার অনুগত বান্দাহ ছাড়া অন্যদের করুণা না কর তাহলে হতভাগা অবাধ্যদের কে রক্ষা করবে? যারা সৎকর্ম করেছে কেবল তাদের কাজকেই যদি তুমি কবুল কর তাহলে তাদের কি উপায় হবে যারা পুণ্যহীন বা যাদের সৎকর্ম খুবই নগণ্য?'

 

'হে আল্লাহ! আমরা অনুতপ্ত পাপী বলেই তুমি আমাদের ক্ষমা কর ও রক্ষা কর দোযখের আগুন থেকে তোমার অপার করুণায়। হে সর্বোচ্চ দাতা ও দয়ালু! তোমার প্রিয় নবী ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি অশেষ দরুদ পাঠানোর উসিলায় ক্ষমা কর আমাদের।'


হে আল্লাহ আমরা যেন শয়তানের অবিরাম হামলা ও কুমন্ত্রণার বিষয়টিকে হাল্কাভাবে না নেই। এ ব্যাপারে তোমারই সাহায্য চাইছি হে মহাকৌশলী ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ!


এবারে পড়া যাক অর্থসহ ২৮ রোজার দোয়া:


اليوم الثّامن والعشرون : اَللّـهُمَّ وَفِّرْ حَظّي فيهِ مِنَ النَّوافِلِ، وَاَكْرِمْني فيهِ بِاِحْضارِ الْمَسائِلِ، وَقَرِّبْ فيهِ وَسيلَتى اِلَيْكَ مِنْ بَيْنِ الْوَسائِلِ، يا مَنْ لا يَشْغَلُهُ اِلْحـاحُ الْمُلِحّينَ .
হে আল্লাহ ! এ দিনে আমাকে নফল এবাদতের পর্যাপ্ত সুযোগ দাও। ধর্মীয় শিক্ষার মর্যাদায় আমাকে ভূষিত কর। তোমার নৈকট্য লাভের পথকে আমার জন্যে সহজ করে দাও। হে পবিত্র সত্ত্বা ! যাকে, অনুরোধকারীদের কোন আবেদন নিবেদন , ন্যায়বিচার থেকে টলাতে পারে না। 

 

                                                                                         (২৯) 

 

পবিত্র রমজানের বরকতময় ঘণ্টা ও মুহূর্তগুলোর আর খুব কম সময়ই অবশিষ্ট রয়েছে। রমজানকে ঘিরে একজন মুমিন মুসলমানের উচিত সার্বিক আত্ম- উন্নয়নের পরিকল্পনা নেয়া। পার্থিব ও পরকালীন বিষয়গুলোকে সংশোধনের জন্য প্রার্থনা করা উচিত সবারই এই পবিত্র মাসে। আর সে জন্য বাস্তব পদক্ষেপ নেয়া উচিত। এখন সময় এসেছে আত্ম-সমালোচনার। রমজানের আগেও আমাদের মধ্যে পার্থিব বিষয়ে যতটা লোভ-লালসা ও আসক্তি ছিল সেসবকে কী দমাতে বা অন্তত কমাতে পেরেছি? পরনিন্দা, গিবত, চোগলখোরি বা এখানের কথা সেখানে লাগিয়ে বেড়ানো, অন্যের দোষ-ত্রুটির চর্চা-এসবকে কী কমাতে পেরেছি? যদি উত্তর হয় নেতিবাচক তাহলে এইসব নামাজ-রোজা ও ক্ষুধা-তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য করা বৃথাই গেল! অথচ আমাদের উচিত এইসব পাপ বা আত্মিক রোগগুলোকে পুরোপুরি নির্মূল করা। তা না হলে পরকালে মুক্তির আশা করা ঠিক হবে না এবং ঈদুল ফিতর বা খোদাদত্ত প্রকৃতিতে ফিরে আসার উৎসবে অংশ নেয়ার পরিহাস করাও হবে অর্থহীন।

 

শয়তান মৃত্যুর সময় আমাদের সবচেয়ে প্রিয় বিষয়টিকে পণবন্দী করে বলবে: যদি এটা চাও তাহলে বল, আল্লাহ-রাসূল-পরকাল-বিচার, বেহেশত-দোযখ-এসবই মিথ্যা! মানুষের ঈমানের জোর যদি কম হয় ও সৎকর্ম যদি কম হয় এবং খোদাপ্রেম ও মহানবী আর তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের প্রতি ভালবাসা কম হয় তাহলে এখানে সে কাবু হবে শয়তানের কাছে। মৃত্যুর সময় প্রবল তৃষ্ণার মুহূর্তে একটু ঠাণ্ডা পানি শয়তানের হাত থেকে পাওয়ার লোভে মানুষ আল্লাহকে অস্বীকার করে বসতে পারে। তাই এই মহাপরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য সব-সময়ই আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে এবং আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের জন্য বেশি বেশি কান্নাকাটি করতে হবে রমজানের শেষের রাতগুলোতে। নিয়মিত বেশি বেশি দরুদ পড়ে, নানা নফল ইবাদতে মশগুল হয়ে ও তাহাজ্জতের নামাজ পড়ে এবং মহানবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের উসিলা দিয়ে আমাদের শেষ-অবস্থায় ঈমান বজায় রাখার জন্য নিয়মিত দোয়া করে যেতে হবে।

 

মহান আল্লাহর রঙ্গে নিজেকে রঙ্গিন করা রমজানের অন্যতম শিক্ষা। মহান আল্লাহ দয়ালু তাই আমাদেরও হতে হবে অন্যদের প্রতি দয়া-প্রবণ। অসহায় ইয়াতিম, দরিদ্র, নিঃস্ব ও মজলুমদের প্রতি দয়া করা আল্লাহর পছন্দনীয় একটি গুণ। পশুর প্রতি নির্দয় হওয়ার জন্য জাহান্নামী হওয়ার নজির রয়েছে। অন্যদিকে ক্ষুধার্ত কুকুরকে নিজের ক্ষুধার অন্ন ও বা খাদ্য দিয়ে মহান আল্লাহর প্রিয়পাত্র এবং দরিদ্র থেকে বিপুল ধন-সম্পদের অধিকারী হয়েছেন এমন নজিরও রয়েছে।

 


এই পবিত্র রমজান মাসেই ইয়েমেনের বেসামরিক ও দরিদ্র নারী-পুরুষ এবং শিশুদেরকে হত্যা করছে সৌদি রাজকীয় বাহিনী! মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ মানবাধিকারের ধ্বজাধারী ও সভ্যতার শীর্ষস্থানে থাকার দাবিদার পশ্চিমা নেতারা যেন নীরবে উপভোগ করছেন এইসব গণহত্যা। জাতিসংঘের পক্ষ থেকেও যখন বলা হচ্ছে যে ইয়েমেনে মানবীয় বিপর্যয়ের ফলে ত্রাণ-সরবরাহ করার জন্য সৌদি হামলা কয়েক দিনের জন্য বন্ধ করা দরকার! কিন্তু সৌদি রাজ-সরকারের বিবেক তাও খুলছে না। ইয়েমেনের বাড়ি-ঘর ও এমনকি মসজিদও রক্ষা পাচ্ছে না সৌদি হামলার বর্বরতা থেকে! অথচ এই সৌদি রাজারা বলছেন, তারা নাকি পবিত্র মক্কা ও মদীনার ইসলামী স্থাপনাগুলোর সেবক! 

 

ইয়েমেনে ও মিয়ানমারে মুসলমানদের ওপর গণহত্যা ঠেকানোর জন্য কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না পাশ্চাত্যপন্থী মুসলিম শাসকরা। অন্যদিকে ফিলিস্তিনে ইসরাইলি অপরাধযজ্ঞের হোতা নেতানিয়াহু এবং এইসব অপরাধের শরিক ওবামার মত শাসকরা ইফতার মাহফিল দিয়ে এবং ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে পরিহাস করছেন মুসলিম উম্মাহকে!

 

ইসলাম হচ্ছে ভারসাম্যপূর্ণ ধর্ম। এ ধর্ম জীবনের সবক্ষেত্রে অযৌক্তিক আচরণের বিরোধী। যখন ও যে সময়ে যে কাজ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইসলাম ঠিক তা-ই করতে বলে। একজন নারী যখন কোনো মু'মিন মুসলমানের সামনে ডুবে মারা যেতে থাকে তখন তিনি এটা বলতে পারেন না যে এই মহিলা ডুবে যাক্, আমি তো বেগানা মহিলাকে স্পর্শ করতে পারি না! না, বরং এক্ষেত্রে ওই নারীকে উদ্ধার করা একটি মানবিক দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। তদ্রূপ এটাও বলা যাবে না যে, কাফিরের সঙ্গে অন্যায় আচরণে সমস্যা নেই। বরং সব ক্ষেত্রেই ন্যায়-বিচার বজায় রাখা মুসলমানের জন্য ফরজ।

 

রমজানের রোজা বা সংযম সাধনার উদ্দেশ্য হল খোদাভীতি অর্জন। আর এ জন্য 'যুহ্ দ্' বা পরকালের জন্য দুনিয়াদারি ও বস্তুবাদীতা পরিহার জরুরি। যে ব্যক্তি অতীতের ব্যাপারে দুঃখ করে না এবং ভবিষ্যতের ব্যাপারে আনন্দিত হয় না আসলে সেই যুহদের দুই প্রান্ত নিজ হাতের মুঠোয় আনতে সক্ষম হয়েছে।

 


আলী (আ.) বলেছেন: "যুহ্দ্ হচ্ছে সংক্ষিপ্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা পোষণ, নেয়ামতগুলোর ক্ষেত্রে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ এবং হারামগুলোর ক্ষেত্রে সংযম প্রদর্শন।"
তবে মহানবী (সা.) স্পষ্টভাষায় বলেছেন, “ইসলাম ধর্মে বৈরাগ্যবাদের কোন স্থান নেই।”যখন মহানবী (সা.)-কে জানান হলো একদল সাহাবী জগৎ-জীবন ও সংসার ত্যাগ করে কেবলই নির্জন-বাস ও ইবাদত-বন্দেগীতে লিপ্ত হয়েছে তখন তিনি তাদের কঠোর ভাষায় তিরস্কার করে বলেছিলেন,

 


“আমি যে তোমাদের নবী আমিও তো এমন নই।” মহানবী (সা.) তাঁর বক্তব্যের মাধ্যমে বুঝাতে চেয়েছিলেন যে, ইসলাম একটি সামাজিক ধর্ম। এ ধর্ম জীবন ও সমাজমুখী। এ ধর্ম জগৎ-জীবন-সংসার ত্যাগের আহ্বান জানায় না। ইসলামের দৃষ্টিতে সমাজবিমুখ ইবাদত ও ইবাদতবিমুখ সমাজ-মুখিতা উভয়ই নিন্দনীয়।


তবে ইসলাম যে 'যুহ্ দ্'-এর কথা বলে তার দর্শন হচ্ছে আত্মত্যাগ বা কুরবানি, মানবিকতা ও মানবসেবা। 

 

এবারে পড়া যাক অর্থসহ ২৯ রোজার দোয়া: 

 



اليوم التّاسع والعشرون : اَللّـهُمَّ غَشِّني فيهِ بِالرَّحْمَةِ، وَارْزُقْني فيهِ التَّوْفيقَ وَالْعِصْمَةَ، وَطَهِّرْ قَلْبي مِنْ غَياهِبِ التُّهْمَةِ، يا رَحيماً بِعِبادِهِ الْمُؤْمِنينَ .
হে আল্লাহ ! আজ আমাকে তোমার রহমত দিয়ে ঢেকে দাও। গুনাহ থেকে মুক্তিসহ আমাকে সাফল্য দান কর। আমার অন্তরকে মুক্ত কর অভিযোগ ও সন্দেহের কালিমা থেকে । হে ঈমানদার বান্দাদের প্রতি দয়াবান। 

 

                                                                        (৩০)

 

আজ অফুরন্ত রহমত, বরকত ও মাগফিরাতের মাস রমজানের শেষ দিন। মহান আল্লাহ যেন এবারের রমজানকেই জীবনের শেষ রমজান না করেন। 

 

আমরা রমজানে অর্জিত খোদাভীতি ও খোদাপ্রেমকে যেন সারা জীবনের জন্য ধরে রাখতে পারি এবং দিনকে দিন আল্লাহর আরো প্রিয়পাত্র হতে পারি সে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। বলা হয় যে দিনটিতে মুসলমান কোনো পাপ করে না সে দিনটিই হল তার প্রকৃত ঈদের দিন। 

 


পবিত্র ঈদের জামাআতে শরিক হওয়ার আগেই ঈদের ফিতরা পরিশোধ করা উত্তম। আপনার প্রধান খাদ্যগুলোর প্রায় তিন বা সাড়ে তিন কেজি'র আর্থিক মূল্যই হচ্ছে একজনের জন্য প্রদেয় সর্বনিম্ন ফিতরা। 
ইসলামী ঐক্য প্রতিষ্ঠা ও সাম্রাজ্যবাদীদের জুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম রমজানের আরেকটি বড় শিক্ষা। পবিত্র ঈদের জামাত এই ইসলামী ঐক্যের একটি মাধ্যম। তাই বলা হয়েছে, যতটা সম্ভব মুসলিম নারীরাও যেন ঈদের জামাতে শরিক হয় যাতে ইসলামের শত্রুরা মুসলমানদের আধিক্য দেখে তাদের সমীহ করে। 

 

পবিত্র কুরআনকে নিজেদের জীবনের সবক্ষেত্রে বাস্তবায়ন ছাড়া কেবলই নামাজ ও রোজা কোনো কাজে আসবে না। আমরা কোনো কোনো ক্ষেত্রে বা যেসব ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান মানা সহজ কেবল সেসব ক্ষেত্রে কুরআনের বিধান মেনে চলব -এটা মোটেই যৌক্তিক নয়। আমরা যদি বিশ্বনবী (সা.)-কে যদি জীবনের সবক্ষেত্রেই আদর্শ মনে না করি তাহলে আমাদের ঈমান কিছুতেই পূর্ণতা পাবে না। ঠিক যেভাবে কেউ যদি বলে আমি নামাজকে মানি কিন্তু রোজাকে মানি না বা জাকাতকে মানি না কিংবা হজ ও জিহাদ ছাড়া ইসলামের অন্য সব কিছুই মানি- এ জাতীয় ধারণা যেমন ইসলামকে পুরোপুরি অস্বীকারেরই নামান্তর তেমনি রাজনীতি ও সমাজনীতির ক্ষেত্রে পশ্চিমা মতবাদগুলোকে ইসলামের চেয়ে উন্নত মনে করলে তা হবে মহানবী (সা.)-কে এইসব ক্ষেত্রে শ্রেষ্ঠ বলতে অস্বীকৃতি জানানোরই নামান্তর। কুরআনকে যদি আমরা বিশ্বাস করি তাহলে এর সব অংশকেই বিশ্বাস করতে হবে। কুরআনেই মহান আল্লাহ বিশ্বনবী (সা.)কে সর্বোত্তম আদর্শ বলে উল্লেখ করেছেন। তাই ধর্মনিরপেক্ষতা বা কথিত পশ্চিমা উদার গণতন্ত্র অথবা সমাজতন্ত্র ইসলামের মত পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ ধর্মের বিকল্প হতে পারে না।


রমজান পাপ থেকে মুক্তির, আত্মশুদ্ধির ও কুরআন তিলাওয়াতের মাস এবং আল্লাহকে জানার ও খোদাপ্রেমের মাস। এ মাসে কুরআন-হাদিস ও জ্ঞান চর্চারও উদ্দেশ্য ছিল খোদাপ্রেম বা আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। আমরা যখন ইসলামকে জীবনের সবক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠা করতে পারব তখনই ঈদ উৎসব হয়ে উঠবে প্রকৃত ঈদ।


মহানবী (সা.) বলেছেন, আমি মানুষকে প্রশিক্ষণ ও শিক্ষা দিতে এসেছি। অথচ আজও প্রকৃত ইসলামী শিক্ষার অভাবই মুসলমানদের বর্তমান দুর্দশার সবচেয়ে বড় কারণ।

 

হযরত আলী (আ.)'র যুগে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী খারেজীদের জ্ঞান ছিল চিন্তাহীন। কুরআনের আয়াতের শাব্দিক অর্থ ছাড়া অন্য কোন চিন্তা-ভাবনা তারা করতো না। তাই যারা কুরআনের গভীর অর্থ জানেন-এমন লোকদের কথাবার্তা তারা মেনে নিতে পারতো না। ফলে তারা মুয়াবিয়া ও আমর ইবনে আসের মত লোকদের অতি সাধারণ ছল-চাতুরী, প্রতারণা ও ভণ্ডামির ফাঁদে পড়ে ধোঁকা খেয়েছিল। আলী (আ.) ছিলেন কুরআনের জীবন্ত ভাষ্যকার ও মুফাসসির। অথচ খারিজিরা তাঁকেই কুরআনের তাফসির বোঝাতে চেয়েছিল। এরা অজ্ঞতা ও ইবাদতকে সমান্তরালে চালিয়েছিল। তাদের কথিত ব্যাপক ইবাদত, তাকওয়া ও যোহদ তাদের অজ্ঞতা থেকে ভিন্ন ছিল না। তাই মহানবীর (সা.) পর ইসলামের সর্বশ্রেষ্ঠ জ্ঞানী-গুণী ও পণ্ডিত আলী (আ.) -এর কাছে খারিজিদের নিষ্প্রাণ ও শুষ্ক ইবাদতের কোনো মূল্যই ছিল না। ফলে আলী (আ.) তাদেরকে কঠোর হাতে দমন ও নির্মূল করেছিলেন।


বর্তমান যুগের তাকফিরি-ওয়াহাবি মতবাদ ও তাদের সমর্থক ধর্মান্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোও হচ্ছে খারিজিদের মতই পথভ্রষ্ট। এইসব গোষ্ঠীও কথায় কথায় মুসলমানদেরকে কাফির বলছে ও নানা অজুহাতে তাদেরকে নৃশংসভাবে হত্যা করছে। আর তাদের নৃশংসতাকে ব্যাপক মাত্রায় প্রচার করে সাম্রাজ্যবাদীরা ইসলামকেই সহিংস ও নৃশংস বলে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। তাই ইসলামের ঘোর শত্রুদের মদদপুষ্ট এইসব ধর্মান্ধদের হাত থেকে মুসলমানদের রক্ষার জন্য আজ মুসলমানদেরকে হতে হবে জ্ঞান ও ঐক্যের শক্তিতে বলীয়ান।


তাকফিরি-ওয়াহাবি গোষ্ঠীগুলো ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে কিছুই বলছে না। অথচ পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ বলেছেন, মুসলমানদের বিরুদ্ধে শত্রুতার ক্ষেত্রে ইহুদিরাই সবচেয়ে কঠোর।


তাকফিরি-ওয়াহাবি গোষ্ঠীগুলো ইসলামের সবচেয়ে কঠোর শত্রু তথা ইহুদিবাদীদের ইঙ্গিতেই শিয়া-সুন্নি বিরোধকে উসকে দেয়ার চেষ্টা করছে।


সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো আজ তাকফিরি সন্ত্রাস উসকে দিয়ে একেই ইসলাম বলে তুলে ধরতে চাইছে। অথচ বিশ্বের দেশে দেশে গোপন মার্কিন কারাগারগুলোতে নিরপরাধ বন্দীদের ওপর কিংবা কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর যেসব নৃশংসতা চালাচ্ছে সেইসব খবর প্রচার করছে না পাশ্চাত্যের নেতৃবৃন্দ ও তাদের নিয়ন্ত্রিত প্রচার মাধ্যম। পাশ্চাত্য বাহরাইনের জনগণ ও ইয়েমেনের জনগণের ওপর তাদের সেবাদাস রাজতান্ত্রিক শাসকদের দমন-পীড়ন এবং গণহত্যার বিষয়েও নীরব রয়েছে।


আসুন আমরা পবিত্র ঈদুল ফিতরের প্রাক্কালে ফিলিস্তিন, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, বাহরাইন, মিয়ানমার ও কাশ্মীরের মুসলমানসহ বিশ্বের সব অঞ্চলের সব নিপীড়িত মানুষের মুক্তির জন্য মহান আল্লাহর দরবারে দোয়া করি। হে আল্লাহ! মুসলমানরা যেন আবারও ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিশ্বসভ্যতাকে সমৃদ্ধ করতে ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে সেই সোনালী যুগের ঐতিহ্য আবারও ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হয়। আমীন।


এবারে পড়া যাক অর্থসহ ত্রিশ রোজার দোয়া:

 
اليوم الثلاثون : اَللّـهُمَّ اجْعَلْ صِيامى فيهِ بِالشُّكْرِ وَالْقَبُولِ عَلى ما تَرْضاهُ وَيَرْضاهُ الرَّسُولُ، مُحْكَمَةً فُرُوعُهُ بِالاُْصُولِ، بِحَقِّ سَيِّدِنا مُحَمَّد وَآلِهِ الطّاهِرينَ، وَالْحَمْدُ للهِ رَبِّ الْعالَمينَ .
হে আল্লাহ ! তুমি ও তোমার রাসুল ঠিক যেমনিভাবে খুশি হবে তেমনি করে আমার রোজাকে পুরস্কৃত কর এবং কবুল করে নাও। আমাদের নেতা হযরত মুহাম্মদ (সঃ) ও তার পবিত্র বংশধরদের উসিলায় আমার সব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আমলকে মূল এবাদতের সাথে যোগ করে শক্তিশালী কর। আর সব প্রশংসা ও স্তুতি জগতসমূহের প্রতিপালক একমাত্র আল্লাহর। #

 

রেডিও তেহরান

 

 

 

 

 

 

  

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

  

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন