এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 25 মার্চ 2009 21:23

ইসলামী ঐক্য সপ্তাহ-২০০৯

১ম পর্ব

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর শুভ জন্মদিন ঠিক কোনটি সে নিয়ে ঐতিহাসিকদের মাঝে কিছুটা মতপার্থক্য রয়েছে। কেউ বলছেন, ১২ই রবিউল আউয়াল হচ্ছে নবীজীর জন্মদিন। বিশেষ সুন্নি আলেমগণ এই মতে বিশ্বাস করেন। আবার কেউ কেউ মনে করেন ১৭ ই রবিউল আউয়াল নবী কারিম (সা) পৃথিবীতে এসেছিলেন। তো ১২ থেকে ১৭ তারিখের মধ্যে ব্যবধান খুবই কম। সেজন্যে বিতর্কের উর্ধ্বে উঠে এই কটা দিনকেই মতানৈক্যের বিপরীতে ঐক্যের সেতু বন্ধন রচনার আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রহ)। সেই থেকে ইরানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১২ই রবিউল আউয়াল থেকে ১৭ই রবিউল আউয়ালকে ঐক্য সপ্তাহ হিসেবে পালন করা হয়।

মানব জাতিকে ঐক্যবদ্ধ জাতি এবং সমান মর্যাদাবান করে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। যেমনটি কবি ইকবাল বলেছিলেন-

আসলে হুজ্জাত এবং স্বত্ত্বাধিকার একই
আমাদের তাঁবুগুলো আলাদা যদিও অন্তরগুলো একই
আমরা যদিও হেজাজি,চীনী কিংবা ইরানী
আমরা হাস্যোজ্জ্বল প্রভাতের অভিন্ন শিশির

আল্লাহর কাছে মুসলমানের পরিচয় আলাদা আলাদা নয়। সেজন্যে তিনি বহুভাবে মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধ থাকার কথা বলেছেন। মুসলমানদের সবাই এ ব্যাপারে নিশ্চিত হবার পরও আজকের বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যাবে মুসলমানদের মাঝে বিভাজন রয়েছে। এই বিভাজন যতোটা সম্ভব কাটিয়ে ওঠার জন্যেই ঐক্য সপ্তাহের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসলামী চিন্তাবিদ এবং উলামা মাশায়েখদের ব্যাপক চেষ্টা-প্রচেষ্টার ফলে মুসলমানদের মাঝে ঐক্যের বন্ধনটি কিছুটা মজবুত হয়ে উঠেছিল। কিন্তু ষড়যন্ত্রের জাল ব্যাপকভাবে বিস্তৃত হওয়ায় এখনো বিচ্ছিন্নতার ধ্বনি কানে বাজে। সেই ধ্বনি কানের ভেতর দিয়ে অন্তরে প্রবিষ্ট হয়ে বেদনার সৃষ্টি করে। গেল ক'সপ্তায় নিশ্চয়ই লক্ষ্য করে থাকবেন, ইরাক এবং পাকিস্তানে মুসলমানদের ভাইদের শহীদ করা হয়েছে। প্রতিহিংসা পরায়ন একদল সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠির হাতে তারা শহীদ হয়েছেন। এটা মুসলিম উম্মাহর সাথে খেয়ানত করা বৈ ত নয়। এর কিছুদিন আগেও আপনারা শুনে থাকবেন হয়তো,পাকিস্তানের একটি শোকানুষ্ঠানে সেদেশের ৭০ জন শিয়া মুসলমানকে শহীদ করা হয়েছে।

আসলে মুসলমানদের মাঝে সংহতি ও ঐক্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অবদান রাখতে পারে যে বিষয়টি তাহলো,রাসূলে খোদার সুন্নাত অর্থাৎ তাঁর কার্যক্রম ও কর্মপদ্ধতি অনুসরণ করা। কেননা তিনি কোটি কোটি মুসলমানের অন্তরাত্মায় জ্বলজ্বলে সূর্যের আলোর মতো ঔজ্জ্বল্য ছড়ান। ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে বিভিন্ন সময় মুসলমানদের মাঝে বিচ্ছিন্নতা রোধকল্পে নবীজীর ঐক্যগঠন প্রক্রিয়া বা পদ্ধতিকে কাজে লাগানো হয়েছে। এই পদ্ধতি বা নিদর্শন সুস্পষ্ট হবার পর অনৈক্য থাকা ঠিক নয়। যেমনটি পবিত্র কোরআনে সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
"তোমরা তাদের মতো হয়ো না যাদের সামনে আল্লাহর সুস্পষ্ট নিদর্শন আসার পরও বিচ্ছিন্ন হয়েছিল এবং পরস্পরের মধ্যে মতানৈক্য সৃষ্টি করেছিল। ( সূরা আল-ইমরান,আয়াত : ১০৫)

ইসলামের নবী ( সা ) মদীনায় হিজরতের পর বিভিন্ন দল ও গোষ্ঠির মাঝে চুক্তিপত্র করেন। সামাজিক ঐক্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটা ছিল সে সময়কার খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা পদক্ষেপ বা কর্মকৌশল। নবীজীর প্রথম চুক্তিটি হয়েছিল মদীনার বিভিন্ন গোত্র ও জাতির সাথে। ঐ চুক্তিটিকে অনেকেই বিশ্বের সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান বলে মনে করেন। ধর্মীয় সংহতি এবং জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠায় এই পদক্ষেপ ছিল সবচেয়ে বেশি কার্যকর। কেননা এই চুক্তির ফলে দ্বন্দ্বপীড়িত গোত্রগুলোর মধ্যে সৃষ্ট ঐক্য মুসলমানদের সামাজিক অধিকারকে নিশ্চিত করেছিল এবং শাসন বা হুকুমাত প্রতিষ্ঠাসহ রাজনৈতিক সংহতি প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল।
মদীনায় রাসূলে খোদার গুরুত্বপূর্ণ একটি অবদান হলো মুসলমানদের মাঝে সামাজিক সম্পর্ক ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক স্থাপন করা। এই ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্কের ফলে গোত্রগত বিভাজন চিন্তা দূর হয় এবং অভিন্ন ঈমানের ভিত্তিতে সামাজিক সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গড়ে ওঠে। রাসূলে খোদা (সা) মক্কা থেকে হিজরত করে আসা প্রত্যেক মুহাজিরের সাথে মদীনার একজন অধিবাসীর ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক সূত্র তৈরী করেন। এক্ষেত্রে ঐতিহাসিক একটি ঘটনা হলো ইমাম আলী (আ) কে নবীজী দুনিয়া এবং আখেরাতে নিজের ভাই বলে অভিহিত করেন। যাই হোক এই ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক সৃষ্টির বিষয়টি ছিল সামাজিক ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি কালজয়ী পদক্ষেপ। রাসূল (সা) মুসলিম উম্মাহকে হুশিয়ার করে দিয়ে বলেছিলেন-মানুষেরা! আমার কথা শুনুন! জানি না, এরপর হয়তো এখানে আপনাদেরকে আর না-ও দেখতে পারি! মানুষেরা! আপনাদের একজনের জান-মাল আরেকজনের জন্যে হারাম! জেনে রাখুন! প্রত্যেক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই এবং মুসলমানরা পরস্পর ভাই-ভাই!

এই ঘোষণার মধ্যেই ইসলামের মানদণ্ড প্রকাশ পায়। তা হলো,গোত্র কিংবা বংশ নয় ভ্রাতৃত্বের বন্ধনটি নির্ভর করে ঈমানের ওপর। শ্বাশ্বত এই সত্যটিকে কাজে লাগিয়ে আজো কি সামাজিক ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা যায় না! নবীজী মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের জন্যে সকল প্রকার অন্যায়-বৈষম্য,গোত্র ও বংশপ্রীতির নেতিবাচকতা তুলে ধরেছেন। জাহেলি জুলুম ও মূল্যবোধগুলোকে রহিত করে বিভিন্ন গোত্র ও বংশের লোকজনকে তৌহিদের পথে আহ্বান জানিয়ে বা নতুন দ্বীনের মাঝে দাওয়াত দিয়ে সামাজিক সাম্য প্রতিষ্ঠা করেছেন। এই সাম্য প্রতিষ্ঠা ও বংশগত বৈষম্য দূর করে তিনি যায়েদ বিন হারেসার মতো ব্যক্তিকে ইসলামের সেনা কমান্ডার বানিয়েছেন। কৃষ্ণাঙ্গ দাস বেলাল হাবশি'কে বিশেষ মুয়াজ্জিন বানালেন এবং ইরানের অধিবাসী সালমান ফারসি'কে সম্মানিত করেছেন। এভাবেই তিনি বিদ্যমান সামাজিক অন্যায় মূল্যবোধ ও বৈষম্যগুলোকে দূর করে নতুন এক সামাজিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠা করেন।

আজকের পৃথিবীতে আমরা মুসলমান হিসেবে গর্বিত যে হযরত মুহাম্মাদ (সা) এর মতো ইসলামের শ্রেষ্ঠনবীর উম্মাত আমরা। সেইসাথে দুঃখিত এবং উদ্বিগ্ন এ কারণে যে,মুসলিম উম্মাহর মাঝে এখন যেরকম বিচ্ছিন্নতা আর বিভাজন লক্ষ্য করা যাচ্ছে,তাতে নাজানি নবীজী কতোটা ব্যথিত। তাই আমাদের উচিত নবীজীর কর্মসূচি,তাঁর দিক-দর্শন এবং কোরআনের শিক্ষার আলোকে পুনরায় ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা পুনপ্রতিষ্ঠা করা। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এবং বিশিষ্ট চিকিৎসক ওবায়েদ রাহমানীর একটি উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করবো আজকের আলোচনা।

ওবায়েদ রাহমানী বলেছেন-মুসলমানদের মাঝে শক্তিশালী ঐক্য গড়ে তোলার জন্যে বিশেষ করে শিয়া এবং সুন্নিদের মাঝে ঐক্য আরো মজবুত করার জন্যে উভয় পক্ষকেই যথার্থ এবং যৌক্তিক চিন্তা করতে হবে। সকল মুসলমানকে তথা সামগ্রিকভাবে সকল মানুষকে বিশেষ কোনো কায়দায় বা কোনো চিন্তাদর্শ কিংবা নীতির আদলে ফেলে তাদের মাঝে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে ফেলার ধারণাটা অযৌক্তিক। এই সুন্নি ডাক্তার আরো বলেছেন-সকল মুসলমান চাই শিয়া কিংবা সুন্নি,সবার উচিত সর্বপ্রকার মতপার্থক্য পরিহার করে সুচিন্তিত ও যৌক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করা এবং উদার চিন্তা ও মন-মানসিকতা নিয়ে আলোচনা করা। সম্প্রতি বিভিন্ন মুসলিম দেশে ধর্মীয় এবং মাযহাবগত যে সংকট দেখা দিয়েছে, তার কারণ সুচিন্তার অভাব এবং যথার্থ যুক্তিহীনতা। তাই মুসলমানদের মাঝে বাস্তব ঐক্য প্রতিষ্ঠার জন্যে এখন প্রয়োজন নবীজীর সিরাতের দিকে ফিরে যাওয়া। আল্লাহ আমাদেরকে সেই তৌফিক দিন। আমিন!

২য় পর্ব

যে-কোনো কাজের ক্ষেত্রেই ঐক্যের যৌক্তিকতা অনস্বীকার্য। পৃথিবীতে মানব বসতির প্রথম দিন থেকেই এটা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছে যে বিপদাপদ মোকাবেলা করার জন্যে ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা সহজ এবং সর্বোত্তম। ইসলামী চিন্তাবিদগণ তাই কোরআন হাদিসের আলোকে সবসময়ই মুসলিম উম্মাতের ঐক্যের ওপর জোর দিয়েছেন। বর্তমানে ইসলামের শত্রুরা ইসলাম এবং মুসলমানদেরকে দুর্বল করার লক্ষ্যে একত্রিত হয়েছে,তাই ইসলামী ঐক্য আগের যে-কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি জরুরি। বহু আলেম ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উপলব্ধি করে মুসলমানদের মাঝে ঐক্যকে আরো দৃঢ় ও মজবুত করার জন্যে বহু পদক্ষেপ নিয়েছেন এবং জনগণকে মতপার্থক্য ও বিচ্ছিন্নতার বিপদ সম্পর্কে সচেতন করেছেন।

বর্তমান সময়ে ইরানের ইসলামী বিপ্লবের রূপকার ইমাম খোমেনী (রহ) কে বলা যেতে পারে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের মহান আহ্বায়ক। তিনি তাঁর ব্যাপক শিক্ষা-দীক্ষার মাধ্যমে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন এবং সেই বিপ্লব-পূর্ববর্তী সময় থেকেই সমকালীন বিশ্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে মুসলিম ঐক্যের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিপ্লব বিজয়ের পর ইমাম খোমেনী (রহ) ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব দানকারী হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয়তা নিয়ে আরো বেশি উন্মুক্তভাবে বিশ্ব মুসলমানদের ঐক্যের আহ্বান জানান। ১২ রবিউল আউয়াল থেকে ১৭ রবিউল আউয়াল পর্যন্ত ঐক্য সপ্তা হিসেবে পালন করার আহ্বানও জানান তিনি।

শিয়া এবং সুন্নি আলেম-উলামা ও চিন্তাবিদদের মাঝে মুসলিম ঐক্য চিন্তার প্রতি ব্যাপক সমর্থন রয়েছে। কিন্তু এক্ষেত্রে বাস্তব চেষ্টা-প্রচেষ্টা যথেষ্ট ছিল না। শিয়া এবং সুন্নিদেরকে একই প্লাটফর্মে আনার জন্যে মিশরীয় মুফতি শায়খ আলী জুমা একটি ফতোয়া দেন। ফতোয়ায় বলা হয়েছে শিয়া ফেকা অনুযায়ী সুন্নিদের ধর্মীয় ইবাদাত করা জায়েয। এই মুফতি তাঁর দেওয়া ফতোয়ার কারণ সম্পর্কে বলেন,অনেকেই চেষ্টা চালাচ্ছে শিয়া এবং সুন্নিদের মাঝে বিভেদরেখা টানতে এবং মুসলমানদের মাঝে ঐক্য বিনষ্ট করার মধ্য দিয়ে তাদের স্বার্থ হাসিল করতে। সে কারণেই আমি এ ধরনের ফতোয়া দিয়েছি। শায়খ আলী জুমা শিয়াদেরকে মুসলিম উম্মাহর অভিন্ন অংশ বলে ঘোষণা করে শিয়াদের মাধ্যমে নেওয়া ঐক্যের ব্যাপারে ইতিবাচক পদক্ষেপগুলোর প্রতি ইঙ্গিত করেন। তিনি মনে করেন,ওহাবিদের পৃষ্ঠপোষকতায় কিছু কিছু রাজনৈতিক ব্যবস্থা আছে যার মাধ্যমে তারা শিয়া এবং সুন্নিদের মধ্যকার সম্পর্ক নষ্ট করার চেষ্টা চালায়।

শায়খ আলী জুমা ছাড়াও অন্যান্য সুন্নি আলেম ঐক্যের গুরুত্বকে স্বীকার করে শিয়াদের ফেকাকে সমৃদ্ধ বলে মন্তব্য করেছেন। আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যান্ড মুফতি শায়খ মাহমুদ শালতুত শিয়া আলেমদের সাথে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা করার পর বলেছেন শিয়া ফেকার ওপর আমল করা মুসলমানদের জন্যে জায়েয। এছাড়া শিয়া এবং সুন্নি আলেমদের অনেকেই শিয়া ইমামের পেছনে সুন্নিদের এবং সুন্নি ইমামের পেছনে শিয়াদের নামায পড়াকে জায়েয বলে উল্লেখ করেছেন এবং এটাকে ঐক্যের প্রকাশ বলে অভিহিত করেছেন। মিশরের আরেক মুফতি ডক্টর ওয়াসেল নাসরের কাছে একবার শিয়াদের জামাতে অংশগ্রহণ করা জায়েয কিনা সে ব্যাপারে জানতে চাওয়া হলে তিনি তাকে অনুমোদন করে লিখেছেন, আল্লাহর মেহেরবাণীতে আমরা যখন ইসলামী ইরানে যাবার সুযোগ পেলাম তখন আমরা কোম এবং তেহরানে পরস্পরের পেছনে নামায পড়েছি। অর্থাৎ শিয়া আলেমদের পেছনে আমরা যেমন নামায আদায় করেছি তেমনি শিয়া আলেমগণও আমাদের পেছনে নামায আদায় কেরেছেন। আল্লাহর দরবারে দোয়া করি তিনি যেন মুসলমানদের মধ্যকার সকল বিভেদ,সংঘর্ষ, মতানৈক্য,শত্রুতা দূর করে দেন এবং মুসলিম উম্মাহর মাঝে ঐক্য সৃষ্টি করে দেন।

অবশ্য এই বক্তব্য থেকে এটা বোঝায় না যে,মুসলিম বিশ্বের কোনো কোনো ব্যক্তি শিয়া ও সুন্নিদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির জন্যে এমনকি শত্রুতা সৃষ্টির জন্যে কলকাঠি নাড়ছে না। পাকিস্তান এবং ইরাকে শিয়াদেরকে যেভাবে হত্যা করা হচ্ছে তা থেকেই শিয়া বিরোধী শত্রুদের তৎপরতার বিষয়টি ফুটে ওঠে। শত্রুদের এই উগ্র চিন্তার বিষয়টি এতোদূর পর্যন্ত গড়িয়েছে যে তারা শিয়াদেরকে কাফের বলতে পর্যন্ত দ্বিধা করে নি। কেবল তাই নয় তারা শিয়াদের রক্ত ঝরানোকে সওয়াবের কাজ বলে মনে করে। এই উগ্র চিন্তার অধিকারীদের সংখ্যা যদিও কম,তবুও এ ধরনের চিন্তা মুসলমানদের ঐক্যকে ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। দুঃখজনক ব্যাপারটি হলো যারা শিয়াদেরকে কাফের বলে অভিহিত করে কিংবা শিয়া নারী-পুরুষ-শিশুদেরকে হত্যা করাকে জায়েয বলে ঘোষণা করে,তারা আসলে না শিয়া সম্পর্কে কিছু জানে না সুন্নি মাযহাব সম্পর্কেই ভালো জানে। এরা আসলে বিদেশী কোনো কোনো সরকারের স্বার্থে মুসলমানদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির জন্যেই কাজ করে।

সৌভাগ্যক্রমে সুন্নি আলেমগণ এ ধরনের অযৌক্তিক, সহিংস এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী ফতোয়ার জবাব দিয়েছেন। ওমানের বিশিষ্ট মুফতি শায়খ আহমাদ বিন হামদ খালিলী শিয়াদেরকে কাফের বলা এবং তাদের খুন করাকে জায়েয বলাটাকে বিবেকহীন বা আহাম্মকের কাজ বলে মন্তব্য করেছেন। তিনি লিখেছেন-এ ধরনের ফতোয়া দেওয়ার কারণ হলো অদূরদর্শিতা,সংকীর্ণ দৃষ্টি এবং ইসলামী নৈতিকতা সম্পর্কে ধারণা না থাকা। এরা আসলে ঐক্যের নয় বরং বিচ্ছিন্নতার দিকে আহ্বান জানাতে চায়। তারা জানুক বা নাজানুক,তারা ইসলামের শত্রুদের হাতেই পরিচালিত হচ্ছে। জর্দানের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ডক্টর সামি হামুদও এই ধরনের ফতোয়াকে দুঃখজনক, ফেতনা সৃষ্টিকারী বলে মন্তব্য করে কোরআনের ভাষায় বলেছেন-ফেতনা হত্যা করার চেয়েও খারাপ। মুসলিম বিশ্বের সকল চিন্তাবিদ আলেম একবাক্যে বলেছেন, কোরআন ও হাদিস অনুযায়ী শিয়ারাও মুসলমানদের একটি ফির্কা হিসেবে বিবেচিত। রাসূলে খোদা (সা) বলেছেন-যে কেউ এক আল্লাহ এবং রাসূলে খোদার ওপর ঈমান আনবে এবং নামায, রোযা, হজ্জ্ব, যাকাতের মতো ইসলামের মৌলিক বিধানগুলোর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করবে সে মুসলমান।

ইসলামের দুটি মাযহাব হিসেবে শিয়া এবং সুন্নি পরস্পরের বিরোধী তো নয়ই বরং ইসলামের বিধি-বিধানের বহু খুঁটিনাটি বিষয়েও তাদের মধ্যে রয়েছে নিকট সম্পর্ক। মিশরের আল-আযহারের গ্র্যান্ড মুফতি মুহাম্মাদ সাঈদ তানতাভি, মুসলিম বিশ্বের ওলামা পরিষদের প্রধান শায়খ ইউসুফ কারজাভিসহ সুন্নি ওয়ার্ল্ডের আরো বহু আলেমে দ্বীন এ বিষয়টিকে নিজেদের ফতোয়ার অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ইরানের বিশিষ্ট আলেম আয়াতুল্লাহ ওয়াহিদ খোরাসানী শিয়াদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন,অপরাপর মুসলমানদের সাথে যেন সদাচরণ করে এবং সদ্ভাব রেখে চলে। তিনি বলেছেন, তোমাদের ধর্মীয় দায়িত্ব হলো যারা তোমাদেরকে কাফের বলে মনে করে,তাদের সাথে তোমরা সুন্দর আচরণ করো,তাদের সাথে একত্রে জীবনযাপন করো। তোমরা কিছুতেই সত্য ও ন্যায়ের সরল-সঠিক পথ থেকে বিচ্যুত হয়ো না। তোমরা আল্লাহর আদেশের আনুগত্য করো,যেখানে আল্লাহ বলেছেন-কোনো একদল লোকের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদেরকে ন্যায়নীতি পরিহার করার মতো গুণাহের দিকে টেনে না নিয়ে যায়। ন্যায় আচরণ করো! এটাই তাকওয়ার অতি নিকটবর্তী।

স্বনামধন্য আলেম সমাজের আন্তরিক ঐক্যানকূল এইসব ফতোয়া থেকেই বোঝা যায় যে,মুসলিম বিশ্বে বিচ্ছিন্নতা সৃষ্টিকারী যেসব আহ্বান জানানো হয়,সেগুলো আলেমদের কিংবা মাযহাবগত বিভিন্নতা থেকে উৎসারিত নয়। বরং এই মতানৈক্যগুলো অজ্ঞতা প্রসূত এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত। উদাহরণত বলা যায়,কিছুদিন আগে নবী কারিম (সা) এর ওফাত বার্ষিকীর দিনে মদীনায় আরব শিয়াদের ওপর আক্রমণ করা হলো এবং ঐ আক্রমণে বেশ কয়েকজন হতাহত হয়েছিল। ঐ আক্রমণ মূর্খতা এবং সঙ্কীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গী প্রসূত। সৌদি আরবের শিয়া আলেমগণ ঐ দুর্ঘটনাকে চরমপন্থী ওহাবিদের সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি প্রসূত বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁরা তাঁদের মাযহাবকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি প্রদানেরও আহ্বান জানান।

পশ্চিমা সরকারগুলো এবং মুসলিম বিশ্বে তাদের কোনো কোনো মিত্রদেশ মুসলমানদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টির ব্যাপক চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালানোর পরও ইসলামী উম্মাহর জাগরণের ফলে ঐক্য প্রক্রিয়া আগের যে-কোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি অগ্রসর। তাছাড়া ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ঐক্যের ঘোষণাপত্র প্রস্তুত করেছে। এই ঘোষণাপত্র বহু আলেম ও ইসলামী চিন্তাবিদ অনুমোদন করেছেন। সেইসাথে শিয়াদের সাথে ঐক্যের ব্যাপারে মিশরের মুফতি শায়খ আলী জুমার বক্তব্য এবং এ জাতীয় ফতোয়াগুলোও প্রমাণ করছে যে মুসলিম বিশ্ব ঐক্য ও সংহতির দিকে আগের তুলনায় অনেক বেশি অগ্রসরমান। #


এই ক্যাটাগরিতে আরো: « শবে বরাত পবিত্র ঈদে গাদীর »

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন