এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 24 ফেব্রুয়ারী 2016 09:01

সুরা তওবার নানা আলোচ্য বিষয় (৩)

সুরা তওবার নানা আলোচ্য বিষয় (৩)
'তাদের মালামাল থেকে জাকাত গ্রহণ কর যাতে তুমি সেগুলোকে পবিত্র করতে এবং সেগুলোকে বরকতময় করতে পার এর মাধ্যমে।

আর (জাকাত গ্রহণকালে) তুমি তাদের জন্য দোয়া কর, নিঃসন্দেহে তোমার দোয়া তাদের জন্য সান্ত্বনা বা প্রশান্তিস্বরূপ। বস্তুতঃ আল্লাহ সবকিছুই শোনেন, জানেন।'

সুরা তওবার ১০৩ নম্বর আয়াতের অর্থ শুনলেন।

এ আয়াতে জাকাতের সামগ্রীক বিধানটি দেয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে সম্পদের একটা অংশ দান করা বা সদকা দেয়াই হচ্ছে জাকাত। এরপর জাকাতের সামাজিক, মনোস্তাত্ত্বিক ও নৈতিক দর্শন তুলে ধরে বলা হয়েছে: এই জাকাত দেয়ার মাধ্যমে কৃপণতাসহ নানা ধরণের খারাপ অভ্যাস থেকে মানুষ পবিত্র হয় ও মানুষ হয় দানশীল বা দানবীর।

জাকাত গ্রহণের সময় জাকাত দাতার জন্য দোয়া করতে বলা হয়েছে। মহানবী (সা.) তাঁর কাছে জাকাত জমা দানকারী ব্যক্তিদের জন্য দোয়া করতেন। এ ধরনের দোয়া ও দরুদ তাদের জন্য প্রশান্তির কারণ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে এই আয়াতে।

‘আর যারা নির্মাণ করেছে মসজিদ (ইসলামের) ক্ষতি আর কুফরিকে জোরদারের জন্য ও মুমিনদের মধ্যে বিভেদ সৃস্টির উদ্দেশ্যে এবং ঐ লোকের জন্য ঘাঁটি হিসেবে যে অতীত থেকে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের সাথে যুদ্ধ করে আসছে। আর তারা অবশ্যই শপথকরে বলে যে, আমরা কেবল কল্যাণ (ও সেবাই) চেয়েছি। কিন্তু আল্লাহ সাক্ষী যে, তারা সবাই মিথ্যাবাদী।’ (তওবা-১০৭)

সুরা তওবার ১০৭ নম্বর আয়াতের অর্থ শুনলেন। এবারে শুনুন এই আয়াতের পটভূমি বা শানে নজুল।

আবু আমর মদীনায় বসবাস করত।সে ছিল খাযরাজ গোত্রের লোক এবং তাওরাত ও ইনজীল বিশেষজ্ঞ। আবু আমর্ সবসময় মহানবী (সা.)-এর নিন্দা ও সমালোচনা করত। মহানবী (সা.) মদীনায় আসার পর মানুষ যখন তাঁর দিকে আসতে লাগল তখন আমর‌্ হিংসার আগুনে জ্বলতে থাকে। অবশেষে সে মদীনা ছেড়ে মক্কার কাফিরদের সঙ্গে যোগ দেয় এবং বদর ও ওহুদ যুদ্ধে অংশ নেয়। আমর‌্ যখন কোনো দিক দিয়ে কিছু করতে পারল না, তখন সে রোম সম্রাট হারকিউলাস কাছে রাসূল (সা.)-এর বিরুদ্ধে প্ররোচনা দেয়ার উদ্দেশ্যে চলে যায়। সে মুসলমানদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান চালাতে রোমান সম্রাটকে কুমন্ত্রণা দেয়ার জন্যই ওই সফরের পদক্ষেপ নিয়েছিল।

আবু আমর‌্ রোম থেকে সেনা নিয়ে এসে মুনাফিকদের সাহায্য করবে বলেও জানিয়েছিল। আমর তার সহযোগীদের নিয়ে তৎপরতা চালানোর জন্য মদিনায় একটি অফিস বা ঘাঁটি নির্মাণ করতে চেয়েছিল। কিন্তু তা সম্ভব হবে না জেনেই সে মসজিদ নির্মাণের মাধ্যমে তার অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের পরিকল্পনা নেয়।ফলে সে রোমের দিকে যাত্রাকালে কুবা মসজিদের কাছে একটি মসজিদ নির্মাণ করতে মুনাফিকদের নির্দেশ দেয়। প্রচার করা হয় যে যখন আবু আমর্ ফিরে আসবে তখন সে ঐ মসজিদে বসে ধর্মীয় শিক্ষা দেবে। কিন্তু তার আসল উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের ওপর আঘাত হানার জন্য ষড়যন্ত্র করা।

নবম হিজরিতে বিশ্বনবী (সা.) যখন একদল মুসলিম মুজাহিদকে নিয়ে তাবুক যুদ্ধের জন্য রওনা হন তখন একদল মুনাফিক মহানবীর (সা.) কাছে এসে আরজ করে যে, তিনি যেন ইসলামের প্রথম মসজিদ তথা কুবা মসজিদের কাছে আরেকটি মসজিদ নির্মাণের অনুমতি দেন যাতে অক্ষম ও দুর্বল লোকেরাসহ যারা বর্ষণমুখর রাতে কুবা মসজিদে যেতে সক্ষম নন তারা এই নতুন মসজিদে ফরজ ইবাদত সম্পন্ন করতে পারেন। মহানবী (সা.)ও তাদের অনুমতি দেন।

আবু আমরের অনুসারী সালবা বিন হাতিবসহ বার জন মুনাফিক একত্র হয়ে দ্রুতগতিতে একটি মসজিদ তৈরি করে এবং মহানবী (সা.)-কে এতে নামায পড়ার অনুরোধ জানায়। তিনি তাবুক থেকে ফিরে আসার পর নামায পড়বেন বলে কথা দিলেন। ফিরে এসে যখন তাতে নামায পড়ার প্রস্তুতি গ্রহণ করছিলেন তখন এ আয়াত তথা সুরা তওবার ১০৭ নম্বর আয়াত নাজিল হয়। সাথে সাথে এ আদেশও দেয়া হয় যে, ‘ঐ মসজিদ ধ্বংস করে দাও, জ্বালিয়ে দাও এবং সেটাকে আস্তাকুড় বা আবর্জনা ফেলার স্থানে পরিণত কর।’ আদেশগুলো খুব দ্রুত কার্যকর করা হয়েছিল। কারণ, তা ইবাদাতের জন্য নির্মিত হয়নি; বরং অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল। মহান আল্লাহ এ জন্যই কথিত ওই মসজিদকে ‘মাসজিদান জিরারান’ বা ক্ষতির মসজিদ বলে উল্লেখ করেছেন। এভাবে মহান আল্লাহর সহায়তায় মুনাফিকদের এক মহাষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়।

জেরার মসজিদে কখনও ইবাদত না করার নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহ পরের আয়াতে বলেছেন: ‘তুমি কখনো সেখানে দাঁড়াবে না, তবে যে মসজিদের ভিত্তি রাখা হয়েছে খোদাভীতি বা তাকওয়ার উপর প্রথম দিন থেকে, সেটিই তোমার দাঁড়াবার যোগ্য স্থান। সেখানে রয়েছে এমন লোক, যারা পবিত্রতাকে ভালবাসে। আর আল্লাহ পবিত্র লোকদের ভালবাসেন।’ (তওবা-১০৮)

সুরা তওবার পরের আয়াত অর্থাৎ ১০৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন: 'যে মানুষ তার ঘরের বুনিয়াদ আল্লাহ-ভীতি ও তাঁর সন্তোষের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠা করে সে-ই উত্তম, না সেই ব্যক্তি যে তার ঘরের ভিত্তি গর্তের পতনোন্মুখ কিনারায় স্থাপন করে? এবং এরপর সে পুরো ঘরসহ জাহান্নামের আগুনে নিপতিত হয়। এবং আল্লাহ জালিম তথা অবিচারকদের পথ দেখান না।'

মু'মিনরা হচ্ছেন সেইসব ব্যক্তির মত যারা তাদের ভবন নির্মাণের জন্য খুবই শক্ত ও ভালো জমি বেছে নেন। অন্যদিকে মুনাফিকদের অবস্থা ঠিক এর বিপরীত।

জেরার মসজিদের ঘটনা থেকে স্পষ্ট যে, মুনাফিকরা ধর্মের পোশাক ও এমনকি মসজিদের মত স্থাপনাকেও ব্যবহার করে থাকে। বর্তমান যুগের অনেক মুনাফিক এবং ওয়াহাবি ও তাকফিরি সন্ত্রাসীরাও মসজিদকে ব্যবহার করছে। তারা ধর্মের পোশাক পরে এবং লম্বা দাড়ি ও টুপি দেখিয়ে অনেক সরলমনা মুসলমানকে বিভ্রান্ত করছে। এইসব মুনাফিকদের চেনার জন্য দরকার যথেষ্ট মাত্রায় সচেতনতা, ধর্মীয় বিচক্ষণতা এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করার মত জ্ঞান।

জেরার মসজিদ সংক্রান্ত আয়াত থেকে এটাও স্পষ্ট, ইসলামী ঐক্য এতো বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে তথাকথিত মসজিদ যদি হয় মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির মাধ্যম তাহলে তা আসলে আল্লাহর ঘর বা মসজিদই নয়, বরং তা শয়তানের ঘর এবং এ ধরনের ঘর ধ্বংস করে দেয়া বৈধ।#

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন