এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 24 ফেব্রুয়ারী 2016 11:25

সুরা ইউনুসের কয়েকটি আয়াতের ব্যাখ্যা (দুই)

সুরা ইউনুসের কয়েকটি আয়াতের ব্যাখ্যা (দুই)
সুরা ইউনুসের ২১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে: (২১) 'এবং আমি মানুষকে দুঃখ-কষ্ট স্পর্শ করার পর যখন একটু অনুকম্পার আস্বাদন করাই, তারা তৎক্ষণাৎ আমার নিদর্শনগুলোর বিরুদ্ধে পরিকল্পনা আঁটতে শুরু করে। তুমি বল, ‘কৌশলে আল্লাহ সবচেয়ে বেশি তৎপর।’

তোমরা যা অপকৌশল করে থাক তা আমার প্রেরিতগণ (তথা ফেরেশতারা) লিপিবদ্ধ করতে থাকে।'

একবার মক্কাবাসী সাত বছর যাবৎ অনাবৃষ্টি ও খরার প্রকোপে পড়েছিল। তাদের জীবন ওষ্ঠাগত হয়েছিল এবং তারা কোন উপায় বের করতে সক্ষম হয়নি। তখন আল্লাহ দয়া করলেন এবং বৃষ্টি বর্ষিত হল। কিন্তু যে মুহূর্তে তাদের পেটে দানা-পানি পৌঁছল অমনি তারা জুলুম শুরু করল এবং রাসূল (সা.)-কে অতিষ্ট করতে লাগল। এ পরিপ্রেক্ষিতে আয়াতটি অবতীর্ণ হয়।

সুরা ইউনুসের ২২ ও ২৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

(২২) ‘তিনি সেই আল্লাহ যিনি তোমাদের স্থলে ও সমুদ্রে পরিভ্রমণ করান। এমনকি যখন তোমরা নৌকাগুলোতে চড় এবং তা অনুকূল বাতাসের সুবাদে আরোহীদের নিয়ে চলে, আর তারা এর গতিবেগে আনন্দ উপভোগ করে, সহসা নৌকাগুলোর উপর এল তীব্র ঝড়, আর চারদিক থেকে সেগুলোর ওপর ঢেউয়ের রাশি আছড়ে পড়তে লাগলএবং তারা সেসবে পরিবেষ্টিত হয়ে (মৃত্যুকে আসন্ন) মনে করল, আর তারা তখন নিজেদের বিশ্বাসকে বিশুদ্ধ করে একনিষ্ঠভাবে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করল, ‘তুমি আমাদের এ বিপদ হতে উদ্ধার করলে আমরা অবশ্যই কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হব।’

(২৩) ‘এরপর আল্লাহ তাদের পরিত্রাণ দেয়া মাত্রই তারা আবারও অন্যায়ভাবে দেশে জুলুম বা দৌরাত্ম্য করতে থাকে। হে মানুষ! শোন, (স্মরণ রাখ,) তোমাদের অনাচার বা দৌরাত্ম্যের দায় তোমাদের ওপরই বর্তাবে। এশুধু পার্থিব জীবনের আনন্দ। এরপর তোমাদের সবাইকে ফিরতে হবে আমাদের দিকেই হবে, তখন আমরা তোমাদের জানিয়ে দেব যা কিছু তোমরা করেছিলে।’

এ দুই আয়াতে মহান আল্লাহ বেশিরভাগ বা সাধারণ মানুষের একটি প্রকৃতির কথা তুলে ধরে বলছেন, মানুষ বড় বড় সংকট ও বিপদের সময় অত্যন্ত একনিষ্ঠভাবে আল্লাহকে স্মরণ করে বিনম্র চিত্তে বলে:আমাকে যদি এই মহাবিপদ বা আসন্ন মৃত্যু থেকে রক্ষা করো তাহলে তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ হব। কিন্তু যখনই বিপদ কেটে যায় তখনই তারা নব-উদ্যমে অন্যায় ও পাপাচার শুরু করে এবং মহান আল্লাহর দয়াকে ভুলে যায়। আসলে দুনিয়া-পূজারী ও অদূরদর্শী মানুষের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এই অকৃতজ্ঞতা। দুর্বল ঈমানের কারণে এই শ্রেণীর মানুষ মহান আল্লাহকে দেয়া সব প্রতিশ্রুতি ভুলে যায়। অপেক্ষাকৃত কম পাপীরা একবার সচেতন হওয়ার পর পুনরায় একই ভুল করে না। তারা নিজেদের পথ বা জীবনকে শুধরে নেয়। ঈমানদার বান্দাহরা জীবনের সবক্ষেত্রে ভারসাম্য বজায় রাখেন। তারা সুখে ও দুঃখে সব সময়ই আল্লাহকে স্মরণ রাখেন।

এবারে শোনা যাক সুরা ইউনুসের ৯০, ৯১ ও ৯২ নম্বর আয়াতের অর্থ:

(৯০) আমরা বনী ইসরাইলকে দরিয়া তথা নীল নদ পারকরালাম। কিন্তু ফিরআউন ও তার সৈন্যবাহিনী ঔদ্ধত্য দেখিয়ে সীমালঙ্ঘন করে তাদের অনুসরণ করল। পরিশেষে যখন ফেরাউন ডুবতে লাগলো তখন বলল, আমি বিশ্বাস স্থাপন করলাম সেই সত্তার প্রতি যিনি ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই, যাঁর প্রতি বনী ইসরাইল বিশ্বাস করেছে এবং আমি আত্মসমর্পণকারীদের অন্তর্ভুক্ত।’ (৯১) (তখন ফিরআউনকে বলা হল) ‘এখন! অথচ ইতঃপূর্বে তুমি অবাধ্যতা করেছ এবং তুমি বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের মধ্যে ছিলে। (৯২) সুতরাং আজ আমরা তোমার দেহকে (সলিলসমাধি হতে) রক্ষা করব যাতে তুমি তোমার পরবর্তীদের জন্য নিদর্শন হয়ে থাক। নিশ্চয়ই বেশিরভাগ মানুষ আমাদের নিদর্শনগুলোর ব্যাপারে উদাসীন।’

এ আয়াতগুলোতে জালিম শাসক ফেরাউনের সঙ্গে বনি-ইসরাইলের সংগ্রামের পরিণতি তুলে ধরা হয়েছে।ফিরআউনের সেনাবাহিনী হযরত মূসা (আ.) ও তাঁর সম্প্রদায়কে ধরার জন্য তাদের পেছনে ছুটে চলেছিল। ফেরাউনের এই বাহিনীতে ছিল ষোল লাখ সেনা এবং তারা সবাই ছিল শিরস্ত্রাণ পরিহিত ও অশ্বারোহী। হযরত মূসা (আ.) তাঁর সৈন্যদলের পেছনভাগে এবং হযরত হারুন (আ.) সম্মুখভাগে ছিলেন। বনি ইসরাইল যখন বিশাল সেনাবাহিনী দেখে ঘাবড়ে গেল তখন আল্লাহর আদেশে মূসা (আ.) নীল নদে তাঁর লাঠি দিয়ে আঘাত করলেন। ফলে তা দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল। যেহেতু বনি ইসরাইল বারোটি গোত্রে বিভক্ত ছিল সেজন্য প্রত্যেক গোত্রের জন্য পৃথক পৃথক রাস্তা তৈরি হয়ে গেল। তারা নিজ নিজ রাস্তা দিয়ে চলছিল, এমন সময় তারা লক্ষ্য করল একগোত্র অপর গোত্রকে দেখতে পাচ্ছে না। অন্য গোত্রগুলো বেঁচে থাকল না ডুবে মারা গেল তারও কোন খবর তারা জানতে পারছে না। তাদের এ উদ্বেগ দেখে আল্লাহ পানির যে প্রাচীর দিয়ে রাস্তা করেছিলেন তাতে জালের মত ছিদ্র সৃষ্টি করে দিলেন,ফলে তারা পরস্পরকে দেখতে থাকল।

ফিরআউন তার বাহিনীসহ নীল নদের কাছে উপস্থিত হলে নীল নদে মুক্ত রাস্তা পেয়ে যায়। তবে ঐ রাস্তায় যেতে তার ঘোড়া বেঁকে বসল। পরিশেষে হযরত জিবরীল (আ.) এক মাদী ঘোড়ার পিঠে উঠে আগে আগে যেতেই ফিরআউনের (পুরুষ) ঘোড়া সেটার পেছনে ছুটতে শুরু করল। ফিরআউন অনেক চেষ্টা করেও সেটাকে থামাতে পারল না এবং যখন পুরো বাহিনী দরিয়ায় নেমে পড়ল তখন সঙ্গে সঙ্গে দু’দিকের পানি এক হয়ে গেল এবং সবাই পানিতে ডুবে মারা গেল।

ডুবে যাওয়ার সময় ফেরাউন মহান আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার ঘোষণা দেয়। কিন্তু মৃত্যুর মুখে এসে মহাবিপদ দেখে ঈমানের ঘোষণা দেয়া মূল্যহীন। ফলে আল্লাহ তাকে ডুবিয়েই মারলেন। তবে মৃত্যুর পর আল্লাহর নির্দেশে দরিয়ার ঢেউ ফেরাউনের লাশকে ডাঙ্গার এক বিশেষ স্থানে তুলে দেয় যাতে ওই অক্ষত লাশ ভবিষ্যতে মানবজাতির জন্য শিক্ষা ও নিদর্শনের মাধ্যম হয়ে থাকে।

বর্তমানে মিশর ও ব্রিটেনের জাদুঘরে কয়েকজন ফেরাউনের মমিকৃত লাশ সংরক্ষিত রয়েছে।#

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন