এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 24 ফেব্রুয়ারী 2016 11:33

সুরা ইউনুসের দু-একটি আয়াতের ব্যাখ্যা

সুরা ইউনুসের দু-একটি আয়াতের ব্যাখ্যা
গত পর্বের আলোচনায় আমরা নীল নদে ফেরআউন ও তার দলবলের ডুবে যাওয়ার কাহিনী শুনেছি। মিশরের ফেরআউনদেরকে মমি করে রাখা হ'ত। বর্তমানে মিশর ও ব্রিটেনের জাদুঘরে কয়েকজন ফেরাউনের মমিকৃত লাশ সংরক্ষিত রয়েছে।

মিশর সরকার মরিস বুকাইলিসহ ফ্রান্সের কয়েকজন বিজ্ঞানীকে এইসব লাশ সম্পর্কে গবেষণার আমন্ত্রণ জানান যাতে এটা স্পষ্ট হয় যে, হযরত মুসার যুগে দরিয়ায় ডুবে-মরা সেই ফেরাউনের লাশও এইসব লাশের মধ্যে রয়েছে কিনা। ফেরাউনের লাশে থাকা লবনের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে বুকাইলি এ বিষয়ে নিশ্চিত হন যে সে নীল দরিয়ায় ডুবে মারা গিয়েছিল; এরপর ফেরাউনের লাশ মমি করে রাখা হয়েছিল। কিন্তু বুকাইলির কাছে এটা ছিল বিস্ময়ের ব্যাপার যে কিভাবে এই লাশটি অন্য লাশগুলোর তুলনায় বেশি অক্ষত থেকেছে? তাকে বলা হলো যে পবিত্র কুরআনেই ফেরাউনের ডুবে মরার ও তার লাশ অক্ষত থাকার কথা বলা হয়েছে। বিষয়টি বুকাইলির কাছে অসম্ভব ও অবিশ্বাস্য ব্যাপার বলেই মনে হচ্ছিল। কারণ, তার বিশ্বাস, মহানবী (সা.)’র যুগের আরবরা ও অন্যান্য জাতি ফেরাউনের লাশের মমি করে রাখার বিষয়টি জানতো না।

অবশেষ মরিস বুকাইলি যখন চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের এক সম্মেলনে যোগ দিয়ে সেখানে সুরা ইউনুসের ৯২ নম্বর আয়াতটি একজন মুসলিম পণ্ডিতের মুখে শুনলেন তখন তা সত্য-সন্ধানী এই বিজ্ঞানীর হৃদয়ে এমন এক বিপ্লবের ঝড় তুললো যে তিনি সেখানেই দাঁড়িয়ে উঠে ঘোষণা করেন: আমি মহাগ্রন্থ কুরআনের প্রতি ঈমান আনলাম। এরপর মরিস বুকাইলি কুরআন নিয়ে ব্যাপক গবেষণা করেন। তিনি ‘বাইবেল, কুরআন ও বিজ্ঞান’ শীর্ষক তার বইয়ের ভূমিকায় লিখেছেন: ‘কুরআনের বৈজ্ঞানিক দিকগুলো আমাকে যারপরনাই বিস্মিত করেছে। কখনও কল্পনাও করিনি যে কুরআন এতো বিচিত্রময় বিষয় নিয়ে এমন যথাযথ বক্তব্য রাখতে পারে। এইসব বক্তব্য বৈজ্ঞানিক নানা আবিষ্কার ও অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ। অথচ এইসব বক্তব্য এসেছে ১৪০০ বছর আগে!’সুরা ইউনুসের ৯৮ আয়াতে হযরত ইউনুস (আ.) ও তার জাতির ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে যাতে তা ভবিষ্যত প্রজন্মগুলোর জন্য শিক্ষার মাধ্যম হয়ে থাকে। মহান আল্লাহ বলছেন:

'ইউনুসের সম্প্রদায় ছাড়া অন্য কোন জনপদবাসী কেন এমন হল না যে, (যথাসময়ে) ঈমান আনবে বা বিশ্বাস স্থাপন করবে, করলে তাদের বিশ্বাস তাদের উপকারে আসত। যখন তারা (ইউনুসের সম্প্রদায়) বিশ্বাস করল তখন আমরা তাদের পার্থিব জীবন থেকে লাঞ্ছনার শাস্তি রহিত করে দিলাম এবং তাদের কিছুকালের জন্য ভোগ-বিলাস করতে দিলাম। (ইউনুস-৯৮)

হযরত ইউনুস বিন মাত্তা (আ.) মসুল শহরের কাছাকাছি নেইনাভা ও বাবেল অঞ্চলের অধিবাসীদের জন্য ত্রিশ বছর বয়সে নবী নিযুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর সম্প্রদায়ের লোকের সংখ্যা ছিল লক্ষাধিক। মূর্তিপূজা ছেড়ে এক আল্লাহকে মেনে নেয়ার জন্য ত্রিশ বছরব্যাপী দাওয়াত দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দু’জন ছাড়া কেউ ঈমান আনেনি। বিশ্বাসী দু’জনের মধ্যে একজনের নাম রুবায়েল, যিনি হাকিম ও জ্ঞানী ছিলেন এবং ইউনুস (আ.)'র বিশেষ বন্ধু ছিলেন। দ্বিতীয় জনের নাম তনূখা। তিনি খুব বেশি ইবাদাত করতেন। নিজ সম্প্রদায়ের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে কোনো এক বন্ধুর পরামর্শে বদদোয়া করলেন ইউনুস (আ.)। আদেশ হল ধৈর্যধারণের। কিন্তু লোকেরা নিজেরাই বার বার আজাব চাওয়ায় অবশেষে আদেশ হল, ১৫ শাওয়াল বুধবার আজাব নাযিল হবে। তবে এটা চূড়ান্ত নির্দেশ ছিল না।

রুবায়েল তাঁর ঘনিষ্ঠ ইউনুস (আ.)কে ব্যাকুল না হতে যথাসাধ্য অনুরোধ করলেন, কিন্তু তিনি তনূখার কথায় শহরে আজাব নাযিল হওয়ার কথা ঘোষণা করে দিলেন এবং তনুখার সঙ্গে পাহাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকলেন। এদিকে রুবায়েল পাহাড়ে আরোহণ করে লোকদের উদ্দেশে ঘোষণা দিলেন, ‘তোমরা উদসীন হয়ে বসে আছ, অথচ অমুক দিন আজাব আসছে। এখন কালবিলম্ব না করে হযরত ইউনুস (আ.) ও আল্লাহর ওপর ঈমান আন এবং আল্লাহর কাছে ক্রন্দন করে আজাব মোচনের জন্য দোয়া কর। আমি তোমাদের হিতাকাঙ্ক্ষী।

যারা ঈমান আনবে না তারা সব ধ্বংস হয়ে যাবে।’ লোকেরা তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে ঈমান আনল। তারা শহরের বাইরে এসে শিশুদেরকে মায়েদের এবং বৃদ্ধদেরকে যুবকদের থেকে পৃথক করে জঙ্গলে গেল এবং কান্নাকাটি ও দোয়ায় মশগুল হয়ে গেল। তারা নানা স্থানে ইউনুস (আ.)-কেও খুঁজলো, কিন্তু তাঁকে পেলো না। হযরত ইউনুস (আ.) মনে করলেন আজাবে সব ধ্বংস হয়ে গেছে, কিন্তু যখন মানুষকে আনাগোনা করতে দেখলেন তখন শংকিত হয়ে পড়লেন যে, লোকেরা তাঁকে মিথ্যাবাদী বলবে। ফলে তিনি শহরের বাইরে গিয়ে নৌকায় চড়লেন। অবশেষে মাছের পেটে গেলেন এবং পরে বেরিয়ে আসলেন।

হযরত ইউনুস (আ.) চল্লিশ দিন পর শহরে ফিরে আসেন। সবাই তাঁকে মনে-প্রাণে মেনে নেয় এবং তিনি সানন্দে তাদের সাথে বসবাস করতে থাকলেন।

পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিতে হযরত ইউনুস (আ.)'র জাতিই হলো একমাত্র জাতি যারা সময়মতো বিভ্রান্তির পথ ছেড়ে দিয়ে সঠিক পথ ধরেছিল। যদিও নবী-রাসূলদের অনুসরণ করেছিল অন্য অনেক জাতি। কিন্তু ইউনুস (আ.)'র জাতির বিশেষত্ত্ব হলো তারা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আসন্ন শাস্তি নেমে আসার আগেই সবাই একত্রে ঈমান আনে।

এ ঘটনা থেকে বোঝা যায় আজাব আসার আগেই আন্তরিক তওবা ও দোয়ার কারণে ওই আসন্ন আজাব আর নাজিল হয়নি। একটি জাতির জন্য সচেতন ও দরদি নেতা থাকা যে কতটা জরুরি তাও ফুটে উঠেছে এই ঘটনায়। জ্ঞান ও সচেতনতাবিহীন ইবাদত মানুষের জন্য কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না। এ জন্যই বলা হয়, একজন মুর্খ ব্যক্তির ৭০ বছরের ইবাদতের চেয়ে একজন জ্ঞানী বা আলেমের এক মুহূর্তের জ্ঞান-সাধনা অনেক বেশি মূল্যবান।#

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন