এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 24 ফেব্রুয়ারী 2016 11:43

সুরা হুদের আয়াত সম্পর্কিত আরো কিছু ব্যাখ্যা

সুরা হুদের আয়াত সম্পর্কিত আরো কিছু ব্যাখ্যা
গত পর্বের আলোচনায় আমরা শুনেছি, হযরত নুহ (আ.) তার জাতির লোকদের কাছে বহু বছর ধরে একত্ববাদ, সত্য ও ন্যায়বিচারের দাওয়াত দেয়া সত্ত্বেও মুষ্টিমেয় কয়েকজন ব্যক্তি ছাড়া তাদের প্রায় সবাই নানা অজুহাত ও অপযুক্তি দেখিয়ে ওই আহ্বান নাকচ করে দেয়,

এমনকি তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা আল্লাহর আজাব বা শাস্তির খোদায়ী বিধানকেও চ্যালেঞ্জ করে বসে। তারা বলে যে, 'হে নুহ! তুমি আমাদের সঙ্গে অনেক কথা বলেছো। আর তর্ক করতে চাই না। যদি যা বলছো তা সত্যিই হয়ে থাকে তাহলে তোমার কথিত সেই খোদায়ী শাস্তি আমাদের ওপর প্রয়োগ করো!'

এ পর্যায়ে মহান আল্লাহ ওহির মাধ্যমে নুহ নবীকে (আ.) জানিয়ে দেন, অল্প যে কয়জন তোমার প্রতি ঈমান এনেছে তারা ছাড়া আর কেউ ঈমান আনবে না। অর্থাৎ ওদেরকে সতর্ক করে বা সত্যের দাওয়াত দিয়ে আর লাভ নেই। ওরা সুপথে আসবে না। তাই দরকার পরিশুদ্ধি ও বিপ্লব। মহান আল্লাহ নুহ (আ.)-কে বললেন: এখন আমাদের তত্ত্বাবধানে ও আমাদের ওহি বা নির্দেশ অনুযায়ী নৌকা বানাও। (হুদ-৩৭)

নুহ (আ.) নৌকা নির্মাণ শুরু করলেন। তাঁর জাতির লোকেরা এ ব্যাপারে তাকে পরিহাস করতো। কিন্তু লোকদের হাসাহাসি ও পরিহাস উপেক্ষা করে খুব দ্রুত গতিতে নৌকা বানাতে থাকেন নুহ (আ.)। অবশেষে সেই নৌকা নির্মাণের কাজ শেষ হয়। এরপরের ঘটনা সম্পর্কে সুরা হুদের ৪০ নম্বর আয়াতে এসেছে:

(৪০) অবশেষে যখন আমাদের (আল্লাহর) আদেশ এল এবং চুলা থেকে পানি স্ফীত হতে থাকল, আমরা বললাম, ‘(হে নুহ!) প্রত্যেক জোড়া (প্রাণীর) থেকে দু’টি (করে অর্থাৎ একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী প্রজাতির প্রাণী নৌকায় নিয়ে নাও) এবং যাদের ব্যাপারে আগেই (ধ্বংসের) আদেশ স্থির করা হয়েছে, তাদের ছাড়া নিজের পরিবার পরিজন এবং যারা বিশ্বাস করেছে তাদের সবাইকে নৌকায় ওঠাও।’ অল্প সংখ্যক লোক ছাড়া তার প্রত আর কেউ ঈমান আনেনি।

নুহ (আ.) খুব দ্রুত গতিতে পরিবারের ঈমানদার সদস্য, আপনজন ও বিশ্বাসীদের এক জায়গায় সমবেত করেন। এরপর যখন প্রবল ঝড় ও প্লাবন-রূপ খোদায়ী শাস্তি ঘনিয়ে এলো, তখন তিনি তাদেরকে মহান আল্লাহর নাম নিয়ে নৌকায় চড়তে বললেন। নৌকা চলার সময় ও স্থির হওয়ার সময় মুখে আল্লাহর নাম উচ্চারণ এবং মনে মনে স্মরণ করারও উপদেশ দেন তিনি।

অবশেষে এসে গেলো মহাশাস্তির দিন। শুরু হয় প্রবল ঝড়-তুফান এবং আকাশে দেখা যেতে থাকে ঘন কালো মেঘ, অহরহ বিদ্যুতের চমক ও গর্জন। কেবল আকাশ থেকেই যে প্রবল বারি-বর্ষণ শুরু হলো তা নয়, মাটির নীচ থেকেও পানি এতোটা উপরে উঠে এলো যে পৃথিবীর পুরো স্থলভাগ তলিয়ে গিয়ে পরিণত হলো মহাসাগরে। প্রবল বাতাসের ধাক্কায় সৃষ্টি হলো সুউচ্চ পাহাড়ের সমান উঁচু বিশাল তরঙ্গমালা। কিন্তু নুহ নবীর (আ.) বিশাল কিশতি সেইসব ঢেউ কেটে ভেসে রইল। এই মহান নবীর এক পুত্র নৌকায় ওঠেনি। তিনি তাকে নৌকায় ওঠার আহ্বান জানালেন ও কাফিরদের সঙ্গ ত্যাগ করে বিশ্বাসী হতে বললেন। তওবা করে ঈমান না আনলে পরিণতি যে অনিবার্য ধ্বংস তাও তিনি তাকে বোঝালেন। কিন্তু অবাধ্য ও কাফির পুত্র দয়াময় বাবার কথায় কান না দিয়ে বললো:

'আমাকে নিয়ে ভাববেন না, আমি খুব শিগগিরই উঁচু পাহাড়ে উঠে যাব, আর বন্যার পানি কখনও সেখানে পৌঁছবে না।' হঠাৎ এক বিশাল ঢেউ পিতা ও পুত্রকে বিচ্ছিন্ন করে দিল। অসৎদের সাহচর্যে থেকে কাফির হয়ে গোল্লায় যাওয়া ওই পুত্র অন্যান্য কাফিরের মতই ডুবে মরলো।

মহান আল্লাহর নির্দেশে পানি আবার ভূগর্ভে সরে যেতে লাগলো ও আকাশ থেকেও থেমে গেল বৃষ্টি বর্ষণ। নুহ নবীর (আ.) কিশতি জুদি পাহাড়ে নোঙ্গর ফেললো। মহান আল্লাহ নুহ নবীসহ নৌকার আরোহীদেরকে সুস্থতা, নিরাপত্তা ও প্রাচুর্যের সুসংবাদ দিলেন এবং তাদেরকে স্থলভাগে নামতে বললেন। মহাপ্লাবন নিশ্চয়ই সবুজ বাগান ও ক্ষেত-খামারসহ সব কিছু ধ্বংস করে ফেলেছে এবং খাদ্য বলতে কিছুই বাকি নেই -এমন আশঙ্কার প্রেক্ষাপটে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাচুর্য ও নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেয়া হয় মুক্তিপ্রাপ্ত নৌকারোহীদেরকে।

হযরত নূহ (আ.)-এর নৌকাটি ছিল বারশ’ গজ দীর্ঘ, আটশ’ গজ প্রস্থ, আশি গজ উচ্চতা-বিশিষ্ট এবং তিনতলা বিশিষ্ট। নিচের তলায় চতুষ্পদ জীব-জন্তু, মাঝের তলায় পাখি এবং ওপরের তলায় মানুষ ও প্রয়োজনীয় সব উপকরণ মজুত ছিল। নৌকা তৈরি হয়ে গেলে তিনি সকল জীবকে আহ্বান করেন এবং প্রতিটি জীবের এক এক জোড়া এবং ঈমান আনয়নকারী আশি জন মানুষকে নিয়ে তাতে আরোহণ করেছিলেন। প্রথমে চুলা বা তন্দুর থেকে পানি স্ফীত হতে থাকে, সূর্যে গ্রহণ দেখা দেয় এবং আকাশ থেকে মুষল ধারায় পানি বর্ষিত হতে থাকে। এরপর ভূপৃষ্ঠের সব ঝরনা থেকে তীব্র বেগে পানি বেরিয়ে আসতে থাকে। ফলে গোটা পৃথিবী পানিতে ভরে যায় এবং আকাশ ও পানি ছাড়া কিছুই দেখা যাচ্ছিল না।

ইরাকের যেখানে আমিরুল মু'মিনিন হযরত আলী (আ.)'র স্মৃতিধন্য কুফার ঐতিহাসিক মসজিদ রয়েছে সেখানেই নুহ নবীর (আ.) নৌকা নির্মিত হয়েছিল। এখান থেকেই মহাপ্লাবনের সূচনা হয়েছিল। যে চুলা বা তন্দুর থেকে পানি উঠতে শুরু করে তাও ঐ মসজিদেই ছিল।

উল্লেখ্য, হাম, সাম ও ইয়াফ্স- এই তিন পুত্র এবং তাঁদের তিন স্ত্রী, স্বয়ং নূহ (আ.) ও তাঁর এক ঈমানদার স্ত্রী- নুহ পরিবারের এই আটজন এবং উম্মতের মধ্যে বাহাত্তর জন মিলে সর্বমোট আশিজন নুহ নবীর (আ.) কিশতিতে আরোহণ করেছিল। এজন্যই মহান আল্লাহ সুরা হুদে বলেছেন, বিশ্বাসীদের সংখ্যা অতি নগণ্য।

নুহ (আ.)'র কাফির ছেলেটির নাম ছিল কিনান এবং তার মায়ের নাম ছিল ওয়ায়েলা। তারা উভয়েই নুহ নবীর (আ.) নৌকায় আরোহণ করেনি এবং পানিতে ডুবে মারা যায়।#

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন