এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বুধবার, 24 ফেব্রুয়ারী 2016 11:49

সুরা হুদের আয়াত সম্পর্কিত আরো কিছু ব্যাখ্যা (দুই)

সুরা হুদের আয়াত সম্পর্কিত আরো কিছু ব্যাখ্যা (দুই)
গত পর্বে আমরা হযরত নূহ (আ.)-এর যুগে সংঘটিত মহাপ্লাবনের বর্ণনা দিয়েছি। নুহ (আ.)'র ছেলে 'কিনান' ছিল কাফির এবং তার মা 'ওয়ায়েলা'ও ছিল অবিশ্বাসী বা কাফির।

তারা উভয়েই নুহ নবীর (আ.) নৌকায় আরোহণ করেনি এবং পানিতে ডুবে মারা যায়। তাই তারা যেমন বাস্তবে নুহ নবীর (আ.) ঈমানের দাওয়াত গ্রহণ করেনি, তেমনি তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে খোদায়ী শাস্তি তথা মহাপ্লাবন থেকে রক্ষার জন্য নৌকাতেও ওঠেনি। এখন প্রশ্ন হলো, ছেলে কাফির হওয়া সত্ত্বেও কেনো এই মহান নবী তাদকে নৌকায় ওঠার আহ্বান জানিয়েছিলেন?

এর উত্তর হলো, কিনান বাহ্যিকভাবে ঈমানদার ছিল এবং হযরত নূহ (আ.) তার অন্তরের খবর সম্বন্ধে জানতেন না। অন্যদিকে আল্লাহ তাঁর পরিবারকে রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এজন্য তিনি তাকে নিমজ্জিত হতে দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে বিস্মিত হয়ে প্রশ্ন করেছিলেন। কিন্তু আল্লাহ তাঁকে জানিয়ে দিলেন যে, সে কাফির। তাই তাঁর কাছে তিনি যেন এই ছেলের জন্য সুপারিশ না করেন। সারকথা এ প্রশ্ন ও উত্তরে দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে : সম্ভ্রান্ত বংশের হওয়া কোন কাজে আসে না; বরং নিজের কর্ম ভাল হওয়া প্রয়োজন; এবং মানুষ অবাধ্যতার কারণে বংশগত মর্যাদার সম্মান থেকে বঞ্চিত হয়ে যায় এবং পিতা-মাতার অবাধ্যতা সন্তানদের অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণ হয়ে থাকে।

হযরত নূহ (আ.)-এর অপর তিন ছেলে হাম, সাম ও ইয়াফ্স-এর সন্তান-সন্ততিই সারা পৃথিবীতে বিস্তার লাভ করেছে। কারণ, হযরত নূহ (আ.) নৌকা হতে নেমে জুদি পর্বতের পাদদেশে বসতি স্থাপন করেছিলেন। তিনি এর নাম দেন ‘সাওকুস সামানিন’বা আশি জনের বাজার। আল্লাহর এমনই মহিমা যে, কিছুদিন পর সেখানে মহামারী দেখা দিলে নূহ (আ.)-এর তিন ছেলে ও তাঁদের স্ত্রীরা ছাড়া উম্মতের বাহাত্তর জনই পরপর মারা যায়। এই তিন ছেলের বংশধররাই পরে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে। এজন্য হযরত নূহ (আ.)-কে ‘দ্বিতীয় আদম’ বলা হয়।

এবারে আমরা নজর দেব সুরা হুদের ৭ নম্বর আয়াতের দিকে। এই আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

(৭) তিনিই (আল্লাহ) যিনি আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীকে ছয় দিনে তথা ছয় যুগে সৃষ্টি করেছেন, তখন তাঁর আরশ বা কর্তৃত্ব পানির ওপর ছিল। যাতে তিনি তোমাদের মধ্যে কে কর্মে উত্তম তা পরীক্ষা করতে পারেন এবং (হে নবী) যদি তুমি বল, ‘নিশ্চয় তোমরা মৃত্যুর পর পুনরুত্থিত হবে’, তবে যারা অবিশ্বাস করেছে তারা বলবে, ‘এতো এক প্রকাশ্য জাদু।’

এই আয়াত পবিত্র কুরঅনের অন্যতম মু'জিজা। এখানে একটি বৈজ্ঞানিক সত্য তুলে ধরে বলা হচ্ছে, সৃষ্টি জগতের প্রাথমিক উপাদান ছিল পানি বা পানি জাতীয় তরল পদার্থ। মহান আল্লাহ সেই তরল পদার্থ থেকেই নানা জীব বা সৃষ্টিকুল তৈরি করেছেন। সৃষ্টির সূচনালগ্নে সৃষ্ট-জগত ছিল ঘণীভুত মেঘমালা বা গ্যাসের মতো। এরপর তাকে তীব্রভাবে গতিশীল করা হয় এবং ঘটানো হয় অনেক বড় বড় বিস্ফোরণ এবং সেই ঘন মেঘের নানা অংশ প্রক্ষিপ্ত হতে থাকে। ফলে সৃষ্টি হতে থাকে মহাজগতের ছায়াপথ, সৌর-জগৎ ও গ্রহ-নক্ষত্র। সুরা আম্বিয়ার ত্রিশ নম্বর আয়াতে এ দিকেই ইঙ্গিত করে মহান আল্লাহ বলেছেন:

'কাফেররা কি ভেবে দেখে না যে, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবীর মুখ বন্ধ ছিল তথা আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী যুক্ত ছিল, এরপর আমি উভয়কে খুলে দিলাম এবং প্রাণবন্ত সবকিছু আমি পানি থেকে সৃষ্টি করলাম। এরপরও কি তারা ঈমান আনবে না?'

সৃষ্টি জগৎ হঠাৎ করে বা এক দিনেই সৃষ্টি হয়নি। ছয়টি দীর্ঘ যুগ লেগেছে এই সৃষ্টি-জগৎ গড়ে তুলতে। আরো একটি বিষয় এখানে তুলে ধরা হয়েছে। আর তা হলো, সৃষ্টি জগত গড়ে তোলার উদ্দেশ্য মানুষকে পরীক্ষা করা যাতে বোঝা যায় যে কারা বেশি ভালো কাজ করতে পারে।

পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিতে বিশ্ব জগত ও মানুষকে সৃষ্টি করার উদ্দেশ্য হলো তাকে পূর্ণতা দেয়া। পূর্ণতার পথ পেতে হলে মানুষকে অবশ্যই শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পেতে হবে এবং প্রতিটি মুহূর্তে মহান আল্লাহর দিকে ঘনিষ্ঠতর হতে হবে। আর একমাত্র পরীক্ষার মাধ্যমেই তা সম্ভব। খোদায়ী বিশ্ব-ব্যবস্থায় যারাই অন্যের তুলনায় বেশি ভালো কাজ করবে তারা উচ্চতর সম্মান অর্জন করবে। মানুষের অন্তরের অবস্থা বোঝার জন্য এইসব পরীক্ষার ব্যবস্থা করেননি মহান আল্লাহ। বরং মানুষকে সুশিক্ষিত ও প্রশিক্ষণ দেয়াই হলো এসবের উদ্দেশ্য।

লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো, এ আয়াতে মানুষের মূল্যকে তার সৎকর্মের ওপর নির্ভরশীল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ ইসলাম কাজের পরিমাণ বা আধিক্যকে গুরুত্ব দেয় না, বরং কাজের মানকে গুরুত্ব দেয়।

নুহ (আ.)'র ঘটনা বর্ণনার পর সুরা হুদে হযরত হুদ (আ.)'র ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। হুদ নবী ছিলেন নুহ নবীর বংশধারার সপ্তম পুরুষ। নুহ (আ.) তাঁর এই বংশধরের ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন। আদ জাতিকে সুপথ দেখানোর জন্য পাঠানো হয়েছিল হুদ (আ.)-কে। আদ জাতি শিল্প, প্রযুক্তি ও কৌশলে খুবই উন্নত ছিল। তাদের সমকক্ষ কেউ ছিল না। তারা ছিল দীর্ঘকায়, হৃষ্টপুষ্ট ও দীর্ঘায়ুর অধিকারী এবং যুদ্ধ-বিদ্যায় পারদর্শী। কিন্তু কৃষিসহ নানা ক্ষেত্রে বহু খোদায়ী নেয়ামত পাওয়ার পরও তারা মূর্তি পূজাসহ নানা অনাচার ও জুলুমে লিপ্ত হয়। হযরত হুদ (আ.) সাধ্যমত তাদের বোঝালেন। কিন্তু তারা এই মহান নবীর কথায় কর্ণপাত করেনি। সুরা হুদের ৫০ নম্বর আয়াতে আদ জাতি প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:

'(৫০) আমরা আদ জাতির কাছে তাদের ভাই হুদকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলল, ‘হে আমার জাতি! আল্লাহরই উপাসনা কর; তিনি ছাড়া অন্য কেউ তোমাদের উপাস্য নেই। তোমরা তো কেবল মিথ্যা আরোপ করছো।'

এরপর আদ জাতি কী বলেছিল এবং তাদের পরিণতি কী হয়েছিল সে সম্পর্কে আমরা কথা বলবো এই আলোচনার আগামী আসরে। তখনও আমাদের সঙ্গ দেবেন এই আশা নিয়ে শেষ করছি আজকের আলোচনা। সবাইকে জানাচ্ছি ধন্যবাদ।#

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন