এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 25 ফেব্রুয়ারী 2016 15:10

সুরা হুদের আয়াত সম্পর্কিত আরো কিছু ব্যাখ্যা (তিন)

সুরা হুদের আয়াত সম্পর্কিত আরো কিছু ব্যাখ্যা (তিন)
গত পর্বে আমরা জেনেছিলাম, হযরত হুদ (আ.) তাঁর জাতি তথা আদ জাতিকে একত্ববাদের দাওয়াত দিয়েছিলেন এবং সব ধরনের অন্যায় ও পাপ কাজ থেকে দূরে থাকতে তাদের আহ্বান জানিয়েছিলেন।

কিন্তু তারা এই মহান নবীর কথায় কর্ণপাত করেনি। বরং আদ জাতি মূর্তি পূজা থেকে বিরত হবে না ও হুদ নবীর প্রতি ঈমান আনবে না বলে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয়। তাদের দুর্বৃত্ততা যখন সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন প্রথমে পানি বন্ধ হয়ে তিন বছর খরা চললো। এ অবস্থায়ও হুদ নবী (আ.) তাদের বোঝালেন:

(৫২) এবং ‘হে আমার সম্প্রদায়! তোমাদের প্রতিপালকের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, এরপর তাঁর দিকে ফিরে আস। (তবে) তিনি তোমাদের ওপর আকাশ থেকে মুষলধারায় বৃষ্টি বর্ষণ করবেন এবং তোমাদের শক্তিকে আরও শক্তি দিয়ে বৃদ্ধি করবেন এবং অপরাধী হয়ে তাঁর থেকে বিমুখ হয়ো না।’

কিন্তু এরপরও আদ জাতি যখন হুদ (আ.)'র আহ্বান বা প্রস্তাবগুলো মানলো না তখন আল্লাহ এক খণ্ড কালো মেঘ পাঠান। তারা মাথার ওপর মেঘ দেখে ভেবেছিল, এবার বুঝি বৃষ্টি হবে। ফলে সবাই মেঘের নীচে চলে আসে। আর তখনই ওঠে তীব্র ঝড় ও বিদ্যুতের চমকানি। এ অবস্থা চলে আট দিন ধরে। ঝড়-তুফান এতোই তীব্র ছিল যে তা পিঠে বাঁধা বোঝাসহ উটকে উপরে তুলে আছাড় দিত। এ ঝড়ে গাছে ঝরা পাতার মতই ছিন্ন-ভিন্ন ও ধ্বংস হয়ে যায় পুরো আদ জাতি। তাদের একজনও বাঁচেনি। অবশ্য হযরত হুদ (আ.) ও তাঁর কয়েকজন সঙ্গী আগেই ওই অঞ্চল থেকে চলে গিয়েছিলেন। এভাবে আদ জাতি হয়ে রইলো অন্যান্য খোদাদ্রোহী ও জালিম গোষ্ঠীর জন্য শিক্ষার বিষয়।

সুরা হুদের ৫৯ ও ৬০ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

(৫৯) (হে রাসূল!) এ ঘটনা আদ সম্প্রদায়ের যারা তাদের প্রতিপালকের নিদর্শনগুলোকে অস্বীকার করেছিল এবং তাঁর রাসূলদের অবাধ্যতা করেছিল এবং তারা প্রত্যেক দুর্বিনীত স্বৈরাচারীর অনুসরণ করত। (৬০) এবং ইহকালেও তাদের পেছনে অভিশাপকে ছায়া-সঙ্গী করা হয়েছে এবং কিয়ামত দিবসেও ছায়া-সঙ্গী হয়ে থাকবে। জেনে রাখ, আদ সম্প্রদায় নিজ প্রতিপালককে অস্বীকার করেছিল। জেনে রাখ, হূদের সম্প্রদায় 'আদ'-এর জন্য ধ্বংস বৈ কিছুই ছিল না।

হযরত হুদ (আ.)'র ঘটনার পর হযরত সালেহ (আ.)'র জাতির ঘটনা এসেছে সুরা হুদে। সুরা হুদের ৬১ নম্বর আয়াতে এসেছে:

(৬১) এবং সামুদ সম্প্রদায়ের কাছে তাদের ভাই সালেহকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! আল্লাহর ইবাদত কর, তিনি ছাড়া অন্য কেউ তোমাদের উপাস্য নেই। তিনি তোমাদের ভূমি (মৃত্তিকা) থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনি তোমাদেরকে তাতে বসবাস করিয়েছেন। তাই তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর এবং তাঁরই দিকে ফিরে এস। নিশ্চয়ই আমার প্রতিপালক (সবারই) কাছে রয়েছেন , (এবং তিনি তাদের প্রার্থনা) গ্রহণ করেন।’

হযরত সালেহ (আ.)ও অন্যান্য নবী-রাসুলের মতই একত্ববাদ ও ন্যায়বিচার অনুসরণের এবং পাপ বর্জনের আহ্বান জানিয়েছিলেন। যে আল্লাহ মানুষকে মাটি থেকে সৃষ্টি করে তাদেরকে সব ধরনের জীবন-উপকরণ ও বাসস্থান দিয়েছেন কেবল তাঁরই ইবাদত করা উচিত এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরিক করা উচিত নয় বলে তিনি যুক্তি দেখান।

কিন্তু সামুদ জাতি হযরত সালেহ (আ.)'র এইসব আহ্বানকে নাকচ করে দেয় এবং মূর্তি পূজাসহ নানা ধরনের অনাচার ও ভোগ-বিলাস অব্যাহত রাখে। তারা এই মহান নবীকে বললেন: সে তার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে এবং নিজেকে নবী বলে ভাবছে!

সামুদ জাতির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা হযরত সালেহ (আঃ) কে বলল যে, সত্যিই যদি তুমি আল্লাহর প্রেরিত নবী হও, তাহলে এ ব্যাপারে কোনো মুজেযা বা নিদর্শন দেখাও।

এ অবস্থায় হযরত সালেহ (আঃ) আল্লাহর দরবারে দোয়া করলেন। ফলে পাথর থেকে একটি গর্ভবতী উষ্ট্রী বেরিয়ে আসে এবং তা সাথে সাথে একটি বাচ্চাও প্রসব করে। এই উষ্ট্রীর যেন কোনো ক্ষতি করা না হয় ও তাকে যেনো কেউ কোনো কষ্ট না দেয় মহান আল্লাহ সেই নির্দেশও দেন। যেমন, ওই উষ্ট্রীকে বাহন হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না ও তাকে তাড়ানোও যাবে না এবং জবাই করা যাবে না ইত্যাদি। এ ছাড়াও সপ্তাহের যে দিনটিতে ওই উষ্ট্রীকে পানি পান করানো হবে সেদিন ওই অঞ্চলের জনগণের জন্য পানি সংগ্রহও নিষেধ করা হয়েছিল। মোট কথা ওই উষ্ট্রীকে কষ্ট দেয়া হলে খোদায়ী শাস্তি নেমে আসবে বলে হুঁশিয়ার করে দেয়া হয়। কিন্তু সালেহ নবীর (আ.) সম্প্রদায়ের মানুষ ওইসব সতর্কবাণীকে উপেক্ষা করে ওই উষ্ট্রীর পা কেটে তাকে মেরে ফেলে। ফলে তাদের ওপর নেমে আসে খোদায়ী শাস্তি এবং তারা ধ্বংস হয়ে যায়।

সুরা হুদে বর্ণিত নবী-রাসূলদের কাহিনী এটা স্মরণ করিয়ে দেয় যে সব নবী-রাসূল একই উদ্দেশ্যে একই দাওয়াত তথা একত্ববাদের দাওয়াত দিয়েছেন ও শির্ক পরিহার করতে বলেছেন। কারণ, শির্ক বা অংশীদারিত্ব হচ্ছে সব ধরনের সংকট ও পাপের মূল উৎস। কিন্তু মানবজাতির এই শিক্ষকদের আহ্বান অস্বীকার করে অযৌক্তিক অবস্থান নিয়েছিল যুগে যুগে খোদাদ্রোহী নানা জাতি। ফলে মহান আল্লাহর ক্রোধ তাদের ধ্বংস করে দেয়। অন্য কথায় শির্ক নির্মূল না করা পর্যন্ত সমাজ-সংস্কার করা সম্ভব নয়। একত্ববাদ বা তাওহিদ মানবজাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং তা সব ধরনের প্রাচুর্যের উৎস। আর শির্ক হলো সব ধরনের অনৈক্য ও স্বার্থপরতার উৎস। মানুষ পাপাচারে লিপ্ত হলেও যদি খোদায়ী সতর্ক বাণীর প্রভাবে তওবা করে তথা অনুশোচনা করে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ওপর ঈমান আনে তাহলে তারা ধ্বংস হওয়া থেকে রক্ষা পায় এবং পুনরায় সব ধরনের নেয়ামত বা প্রাচুর্যের অধিকারী হয়। হযরত ইউনুস নবীর (আ.) সম্প্রদায়ের তওবা আমাদের তাই স্মরণ করিয়ে দেয়। #

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন