এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 25 ফেব্রুয়ারী 2016 17:22

সুরা হুদের আয়াত সম্পর্কিত আরো কিছু ব্যাখ্যা (চার)

সুরা হুদের আয়াত সম্পর্কিত আরো কিছু ব্যাখ্যা (চার)
(৬৯) এবং ইবরাহীমের কাছে আমাদের প্রেরিতরা তথা ফেরেশতারা সুসংবাদ নিয়ে এল, তারা বলল, ‘সালাম (শান্তি)।’ সেও বলল, ‘সালাম’ এবং অনতিবিলম্বে সে তাদের জন্য ভাজা বাছুর নিয়ে এল।

সুরা হুদে হযরত নুহ, হুদ ও সালেহ (আ.)'র ঘটনা বর্ণনার পর হযরত ইবরাহিম ও লুত (আ.)'র ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। মহান আল্লাহর ফেরেশতারা দু'টি মিশন নিয়ে ওই সময় পৃথিবীর বুকে নেমে এসেছিল। একটি হলো লুত (আ.)'র জাতির লোকদের শাস্তি দেয়া এবং দ্বিতীয়টি হলো ইব্রাহিম (আ.)'র স্ত্রী সারার গর্ভে ইসহাক (আ.)'র জন্মের সুসংবাদ দেয়া।

ফেরেশতারা অতি সুন্দর যুবকের বেশে এসেছিল এবং এসেই ইব্রাহিম নবীকে সালাম দেয়। সালামের জবাব শোনার পর তারা বলেছিল, ‘হে আল্লাহর বন্ধু ! আপনি কি অতিথি গ্রহণ করতে চান না?’ শুনেই তিনি তাঁদের মেহমানখানায় স্থান করে দিলেন এবং ঘরের ভেতরে খাবারের আয়োজনের জন্য আসলেন। কিন্তু তাঁর ঘরে কোন খাবার ছিল না। তিনি তাঁর স্ত্রীকে বললেন, ‘সারাহ! এমন সুন্দর, সৎ ও সদাচারী অতিথি এসেছে যে, আমি আমার জীবনে কখনও দেখিনি। তাঁদের জন্য শিগগিরই খাবার তৈরি কর।’

ইব্রাহিম (আ.)'র স্ত্রী সারাহ বললেন, ‘কোন কিছুই তো নেই, তবে আমি একটি বাছুর পালন করেছি, সেটাকে খুবই আদর করি। যদি বলেন, সেটাকেই জবাই করে মাংস ভাজা করে দিই।’ ভাজা মাংস প্রস্তুত হলে তিনি তা নিয়ে অতিথিদের কাছে গেলেন। কিন্তু যখন দেখলেন যে, তাঁরা খাদ্য গ্রহণ করছেন না তখন শংকিত হলেন। কারণ, সে যুগের প্রথা ছিল যে, যদি কোন লোক কারও কাছে মন্দ উদ্দেশ্যে আসত তবে সে তার দেওয়া খাদ্য গ্রহণ করত না। তবে তাঁরা যখন নিজেদের ফেরেশতা হওয়ার কথা এবং লুত (আ.)'র জাতিকে শাস্তি দেয়া সংক্রান্ত তাদের মিশনের কথা প্রকাশ করলেন তখন তিনি আশ্বস্ত হলেন। এরপর ফেরেশতারা এই নবীর সন্তান ইসহাক-এর জন্মগ্রহণের সুসংবাদ দিল যদিও নবী-দম্পতি ছিলেন বৃদ্ধ ও বৃদ্ধা। এমনকি ইসহাকের ঔরশে ইয়াকুব নামের নবী জন্ম নেবেন বলেও ফেরেশতারা সুসংবাদ দেয়। বৃদ্ধ ইব্রাহিম (আ.)'র বৃদ্ধা স্ত্রী সারা এই সংবাদ শুনে খুবই বিস্মিত হলেন। ফেরেশতারা শিগগিরই এই বিস্ময়ের ঘোর থেকে তাঁদের মুক্ত করে। এই পরিবারকে মহান আল্লাহ যেসব অসাধারণ নেয়ামত দিয়েছেন এবং অলৌকিকভাবে নমরুদের আগুন থেকে তাঁকে কিভাবে রক্ষা করেছেন তাও তারা উল্লেখ করে।

এরপর ইব্রাহিম (আ.) লুত নবীর (আ.) জাতিকে ধ্বংস না করতে ফেরেশতাদের সঙ্গে কথা বলেন। কিন্তু তারা জানায় যে : ‘হে ইবরাহীম! এ ব্যাপারে নিবৃত্ত হও, তোমার প্রতিপালকের চূড়ান্ত আদেশ এসে গেছে এবং নিশ্চয় তাদের ওপর এক অনিবার্য শাস্তি আপতিত হবে। (হুদ-৭৬)

এ ঘটনাটি হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর হৃদ্যতা ও সহানুভূতির পরিচায়ক। কারণ, তিনি লুত সম্প্রদায়ের শাস্তিকে বিলম্বিত করতে ফেরেশতাদের সাথে তর্ক করেছেন। কারণ, তখনও লুত জাতিকে সংশোধন ও রক্ষার পথ খোলা রয়েছে বলে তিনি আশা করছিলেন। কিন্তু যখন ফেরেশতারা যখন নিষেধ করলেন তখন তিনি নীরব হয়ে গেলেন।

এরপর ফেরেশতারা লুত নবী (আ.)'র কাছে গেলো। এ সময় তিনি নিজ কৃষি জমিতে কাজ করছিলেন। হঠাৎ দেখতে পেলেন যে কয়েকজন সুদর্শন যুবক তার দিকে আসছে ও তারা এই মহান নবীর মেহমান হতে চাইলো। তিনি যদিও মেহমানদারি করতে খুবই আগ্রহী ছিলেন, কিন্তু তার জাতির লোকদের বিকৃত যৌনাচারের কথা ভেবে আতঙ্কিত হলেন। কারণ, লুত জাতির লোকেরা ছিল সমকামী, নারী ও কন্যাদের প্রতি তাদের কোনো আগ্রহ ছিল না। লুত (আ.) তাদেরকে এ মহাপাপসহ সব ধরনের পাপাচার ত্যাগ করে খোদাভীরু হতে বলতেন ও প্রকৃত মনুষ্যত্বের দিকে ফিরে আসতে বলতেন। তাদেরকে কঠোর শাস্তির ব্যাপারেও সদা-সতর্ক করতেন তিনি। কিন্তু অধঃপতিত ও খোদাদ্রোহী এ জাতির কাছে এইসব সতর্কবাণী ছিল যেন অরণ্যে রোদন। বরং তারা আরো উদ্ধত হয়ে ওঠে পাপাচারের ব্যাপারে। সুরা হুদের ৭৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

"যখন আমাদের প্রেরিতরা (ফেরেশতারা) লুতের কাছে এল, তখন সে তাদের ব্যাপারে শংকিত হল এবং তাদের আগমনে বিষন্ন হল এবং বলল, ‘এটা কঠিনতম বিপদের দিন।’"

হযরত লুত (আ.) জানতেন যে, তার জাতির লোকদের পাশবিকতা থেকে এইসব মেহমান তথা সুদর্শন যুবকদের রক্ষা করা সহজ হবে না। লুত (আ.)'র স্ত্রী ছিল অবিশ্বাসী বা বেঈমান নারী। সে যখন এই সুদর্শন যুবকদের মেহমান হওয়ার খবর পেলো সঙ্গে সঙ্গে ঘরের ছাদে গিয়ে হাতে তালি দিয়ে ও আগুন জ্বালিয়ে একদল লোকের কাছে এই যুবকদের আগমনের খবর পৌঁছে দেয়।

পবিত্র কুরআনে এসেছে: (৭৮) এবং লুতের সম্প্রদায় তাঁর কাছে ছুটে এল, তারা অতীত থেকেই জঘন্যতম কাজে মশগুল ছিল। লুত বলল, ‘হে আমার সম্প্রদায়! এরা আমার (সম্প্রদায়ের) কন্যা, তারা তোমাদের জন্য বেশি পবিত্র, সুতরাং আল্লাহকে ভয় কর এবং আমাকে আমার অতিথিদের ব্যাপারে লাঞ্ছিত কর না। তোমাদের মধ্যে কি কেউ বোধসম্পন্ন নেই?’ (৭৯) তারা বলল, ‘নিঃসন্দেহে তুমি জানো যে, আমাদের তোমার কন্যাদের কোন প্রয়োজন নেই। আমরা যা চাই তা তুমি ভালোভাবেই জানো।’

লুত (আ.) ওই পথভ্রষ্ট সমকামী সম্প্রদায়কে বার বার বোঝানোর চেষ্টা করেন ও তাদেরকে সতর্ক করে দেয়ার পর বলেন:

হে লোকেরা! আমার জাতির এই মেয়েদেরকে তোমরা বিয়ে কর। এরা পবিত্র মেয়ে। তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আমার মেহমানদের সামনে আমাকে অপমানিত করো না। এরপর বললেন: তোমাদের মধ্যে কি ভদ্র ও বিবেক-সম্পন্ন কেউ নেই যে তোমাদেরকে এমন নির্লজ্জ ও কলঙ্কিত কাজ থেকে বিরত রাখবে? এভাবে লুত (আ.) নিজ জাতির পথভ্রষ্ট ও অসভ্য ওই লোকগুলোর বিবেককে জাগিয়ে তোলার এবং তাদেরকে সত্যের দিকে ফেরানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা ওই মেহমানদের ওপর পাশবিকতা চালাবেই বলে ঘোষণা করায় এই মহান নবী অত্যন্ত পেরেশান হয়ে পড়েন।

এ অবস্থায় তিনি বললেন: (৮০), ‘হায়! আমার যদি তোমাদের সাথে মোকাবিলার ক্ষমতা থাকত অথবা আমি যদি কোন শক্তিশালী অবলম্বনের আশ্রয় নিতে পারতাম!’ (৮১) তারা (ফেরেশতারা) বলল, ‘হে লুত! আমরা তোমার প্রতিপালকের প্রেরিত, তারা কখনই তোমাকে ধরতে পারবে না। সুতরাং তুমি তোমার পরিবারবর্গকে নিয়ে রাতের কোন এক সময়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যাও এবং তোমাদের কেউ যেন এদিকে মুখ ফিরিয়ে না তাকায়; তবে তোমার স্ত্রী ছাড়া। নিশ্চয়ই তার ওপরেও সেই শাস্তি নেমে আসবে যা তাদের ওপর পতিত হবে। সকালই তাদের শাস্তির নির্ধারিত সময়। ভোর কি অত্যাসন্ন নয়?’

অবশেষে লুত জাতির ওপর কঠোর শাস্তি নেমে আসে। তাদের ওপর পাথর বর্ষিত হয়েছিল এবং তাদের জমিনকে উল্টিয়ে দেয়া হয়েছিল। ফলে তারা ধ্বংস হয়ে যায় এবং অন্যান্য জাতির মানব প্রজন্মগুলোর জন্য হয় শিক্ষার মাধ্যম।

ইসলামের দৃষ্টিতে সমকামিতাকে খুবই বড় পাপ। কারণ, এ ধরনের পাপ সমাজের ভারসাম্য ধ্বংস করে দেয়। মানুষ যদি প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে পুরুষকে নারীর প্রতি আগ্রহীহীন করে তোলে তাহলে মানব প্রজন্ম বিলুপ্তির শিকার হবে। তাই এই পাপের জন্য খুবই কঠোর শাস্তি দেয় ইসলাম।

সমকামীতাকে অত্যন্ত বিকৃত মানসিকতা। দুঃখজনকভাবে সভ্যতার দাবিদার হওয়া সত্ত্বেও পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে বর্তমানে এই মহাপাপ ছড়িয়ে পড়েছে এবং এমনকি আইন করে এই পাপাচারকে বৈধতা দেয়া হচ্ছে। এ ধরনের পাপাচারের ফলে সৃষ্টি হয়েছে এইডসের মতো প্রাণঘাতি রোগ এবং বিলুপ্ত হচ্ছে সুস্থ সামাজিক -সম্পর্ক । তাই এটা স্পষ্ট যারাই লুত (আ.)'র জাতির মতো অনাচারে লিপ্ত হবে তাদের ধ্বংস অনিবার্য। এটা গোটা মানবজাতির জন্য একটি চিরন্তন শিক্ষা।#

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন