এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 25 ফেব্রুয়ারী 2016 17:30

সুরা হুদের আয়াত সম্পর্কিত আরো কিছু ব্যাখ্যা (পাঁচ)

সুরা হুদের আয়াত সম্পর্কিত আরো কিছু ব্যাখ্যা (পাঁচ)
গত পর্বের আলোচনায় আমরা মূলত লুত (আ.)'র জাতির অত্যন্ত ঘৃণ্য বিকৃত রুচি তথা সমকামিতার শাস্তি নিয়ে আলোচনা করেছি। আমরা শুনেছি যে কিভাবে মহান আল্লাহ লুত (আ.)'র কাছে সুদর্শন যুবকের ছদ্মবেশে আসা ফেরেশতাদের পাঠানোর পর ওই জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছিলেন।

হযরত লুত (আ.) তার জাতির লোকদের পাশবিকতা থেকে এইসব মেহমান তথা সুদর্শন যুবকদের রক্ষা করা সহজ হবে না বলে খুবই চিন্তিত হয়ে পড়েছিলেন।

লুত (আ.)'র জাতির আগে অতীতে কোনো জাতি কখনও সমকামিতার মতো নিকৃষ্ট পাপাচারে লিপ্ত হয়নি।

হযরত লুত (আ.) ছিলেন হযরত ইবরাহিম (আ.)'র খালাতো ভাই। এই মহান নবীর সহোদর বোন ছিলেন হযরত ইবরাহিম (আ.)'র প্রথম স্ত্রী সারা যিনি ছিলেন হযরত ইসহাক নবীর (আ.) মা ও ইয়াকুব নবীর (আ.) দাদী। লুত নবী (আ.) মধ্যপ্রাচ্যের একটি বিশেষ অঞ্চলের লোকদের সুপথ দেখানোর দায়িত্ব পেয়েছিলেন। এই লোকেরা ৫০০ টি শহরে বসবাস করতো। এই শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় শহরের নাম ছিল সাদুম। এই শহরগুলোর অধিবাসীরা সিরিয়া ও মিশরের মধ্যবর্তী রাজপথের পাশে বসবাস করতো এবং খুবই কৃপণ ছিল। তারা পথচারীদের আনাগোনায় শঙ্কিত থাকতো। অবশেষে শয়তান তাদের কুমন্ত্রণা দেয় যে, আগত মুসাফিরদের সঙ্গে সমকামিতায় লিপ্ত হলে তাদের আনাগোনা বন্ধ হয়ে যাবে। এভাবে তারা কুরুচিকর কাজে জড়িয়ে পড়ে এবং ক্রমেই এই পাপে এমন অভ্যস্ত হয়ে পড়ে যে নারীদের সঙ্গ ত্যাগ করে। কোনো অতিথি এলে তাদেরকে তারা অপমান করতো সমকামিতার মাধ্যমে। এইসব পাপীদের সুপথ দেখানোর জন্য লুত (আ.)-কে পাঠানো হয়েছিল। তিনি ত্রিশ বছর ধরে তাদের সুপথে আনার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা ভালো কথায় কান দিলো না। অবশেষে আল্লাহর ভয়াবহ আজাবে তারা ধ্বংস হয়ে যায়।

ইসলামের দৃষ্টিতে সমকামিতা খুবই বড় পাপ। কারণ, এ ধরনের পাপ সমাজের ভারসাম্য ধ্বংস করে দেয়। মানুষ যদি প্রকৃতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে পুরুষকে নারীর প্রতি আগ্রহীহীন করে তোলে তাহলে মানব প্রজন্ম বিলুপ্তির শিকার হবে। তাই এই পাপের জন্য খুবই কঠোর শাস্তি দেয় ইসলাম।

সমকামীতাকে অত্যন্ত বিকৃত মানসিকতাও বলা যায়। দুঃখজনকভাবে সভ্যতার দাবিদার হওয়া সত্ত্বেও পাশ্চাত্যের দেশগুলোতে বর্তমানে এই মহাপাপ ছড়িয়ে পড়েছে এবং এমনকি আইন করে এই পাপাচারকে বৈধতা দেয়া হচ্ছে। এ ধরনের পাপাচারের ফলে সৃষ্টি হয়েছে এইডসের মতো প্রাণঘাতি রোগ এবং বিলুপ্ত হচ্ছে সুস্থ সামাজিক-সম্পর্ক। তাই এটা স্পষ্ট যারাই লুত (আ.)'র জাতির মতো অনাচারে লিপ্ত হবে তাদের ধ্বংস অনিবার্য। এটা গোটা মানবজাতির জন্য একটি চিরন্তন শিক্ষা।

হযরত লুত (আ.)'র জাতির ঘটনা বর্ণনার পর হযরত শোয়াইব (আ.)'র জাতির ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে সুরা হুদে। হযরত শোয়াইব (আ.) ছিলেন হযরত ইবরাহীম (আ.)'র বংশধর। তার জাতির লোকেরা মাদইয়ান অঞ্চলে বসবাস করতো। তারা কয়েকটি অপকর্মে জড়িত ছিল। এইসব অপকর্মের মধ্যে কয়েকটি ছিল খুবই নিকৃষ্ট কাজ। যেমন, রাহাজানি, ওজনে বেশি নেয়া ও কম দেয়া। এদেরকে হেদায়াতের জন্যই পাঠানো হয়েছিল হযরত শোয়াইব (আ.)-কে। তিনি যথাসাধ্য তাদের উপদেশ দেন। কিন্তু কেউই তাঁর কথা শুনেনি। ফলে শাস্তি হিসেবে মহান আল্লাহ প্রথমে তাদের ওপর এমন তীব্র তাপ সৃষ্টি করেন যে, তারা ভূগর্ভের আস্তানায়ও শান্তিতে থাকতে পারতো না।

এরপর একটি শীতল ও শুকনো মেঘ এলো। শোয়াইব (আ.)'র জাতির সব মানুষ এর নিচে আশ্রয় নেয়। মেঘটি পুরো বসতি বা জনপদটিকে ঘিরে ফেলে। এরপর একটি চিৎকার ধ্বনির মধ্য দিয়ে ভূমিকম্প শুরু হয় এবং আগুন বর্ষিত হতে থাকে। ফলে সবাই ধ্বংস হয়ে যায়। হযরত শোয়াইব (আ.)'র অন্যতম মু'জিজা ছিল এটা যে, যখন তিনি পাহাড়ে আরোহণ করতে ইচ্ছা করতেন তখন পাহাড়ের শৃঙ্গ সমতল ভূমির সঙ্গে মিশে যেতো এবং তিনি তাতে আরোহণ করতেন। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে যে, হযরত মুসা (আ.)'র ছড়ি ছিল তাঁরই দেয়া। মুসা (আ.)'র আগে তাঁর কাছে তা থেকে নানা মু'জিজা প্রকাশিত হত।

উল্লেখ্য, হযরত সালেহ (আ.)ও ছিলেন নুহ নবীর (আ.) বংশধর এবং তাঁর নবম অধঃস্তন পুরুষ। হযরত সালেহ (আ.) মাত্র ১৬ বছর বয়সে নবী হয়েছিলেন। তাঁর জাতির নাম ছিল সামুদ জাতি। এরাও আদ জাতির মতই প্রভাব-প্রতিপত্তি ও ধন-সম্পদের অধিকারী ছিল। সালেহ নবী ১২০ বছর ধরে ধর্ম প্রচার করলেও কেউ তার দাওয়াতে সাড়া দেয়নি। তার জাতির লোকেরা পাহাড়ের পূজা করতো। তিনি তাদের এসব করতে নিষেধ করলে তারা জানায় যে, পাহাড় থেকে শাবকসহ একটি উষ্ট্রী বেরিয়ে আসলে আমরা ঈমান আনব। সালেহ নবীর দোয়ায় তাদের বাসনা পূরণ হওয়া সত্ত্বেও তারা ঈমান আনেনি। উটটি এতো দুধ দিত যে সালেহ নবীর সম্প্রদায়ের সবাই তা পান করে পরিতৃপ্ত হতো। কিন্তু উটটিকে বিরক্ত করা নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তারা উটটির পা কেটে তাকে মেরে ফেলে ও উটটির মাংস খেয়ে ফেলে। শাবকটি পাহাড়ে গিয়ে মাথা উঁচু করে তিন বার কেঁদে পাহাড়ের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে যায়। হযরত সালেহ (আ.) তাদের তওবা করার জন্য তিন দিন সময় দেন। কিন্তু তারা তা না করায় মহান আল্লাহ তাদের তিন দিন পর ধ্বংস করে দেন।

নবী-রাসুলদের সঙ্গে পাঠানো খোদায়ী মু'জিজা বা নির্ধারিত অলৌকিক নিদর্শন দেখার পরও যখন কেউ বা কোনো জাতি তাদের ইচ্ছা অনুযায়ী আরো নতুন মু'জিজা দেখার আব্দার করে তখন সে মু'জিজা দেখার পরও যদি মানুষ ঈমান না আনে তখন তাদের ধ্বংস করে দেয়া হল মহান আল্লাহর একটি নীতি।

সুরা হুদে নবী-রাসুলদের নানা ঘটনার রয়েছে নানা ধরনের শিক্ষা। এইসব শিক্ষণীয় ঘটনার উপসংহার টেনে সুরা হুদের ১০০ ও ১০১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলছেন:

'(১০০) (হে রাসূল!) এটা জনপদগুলোর কয়েকটি ঘটনা যা আমরা তোমার কাছে বিবৃত করছি; সেইসব জনপদের মধ্যে কোনো কোনোটি এখনও রয়েছে গেছে এবং কোনো কোনো জনপদ বা শহর কর্তিত ফসলের মতো বিলুপ্ত হয়েছে। (১০১) আমরা তাদের ওপর কোন অবিচার করিনি; বরং তারাই নিজেদের ওপর অবিচার করেছিল। এরপর যখন তোমাদের প্রতিপালকের আদেশ এল তখন তাদের উপাস্যগুলো, আল্লাহকে ছেড়ে যাদের তারা উপাসনা করত, তাদের কোন কাজেই এল না এবং তারা (সেসব উপাস্য) তাদের ধ্বংস করা ছাড়া কোন কিছুই বর্ধিত করল না।#

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন