এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 25 ফেব্রুয়ারী 2016 17:54

সুরা ইউসুফের প্রাথমিক পরিচিতি ও এ সুরার দুটি আয়াতের ব্যাখ্যা

সুরা ইউসুফের প্রাথমিক পরিচিতি ও এ সুরার দুটি আয়াতের ব্যাখ্যা
সুরা ইউসুফ মক্কায় অবতীর্ণ একটি সুরা। পবিত্র কুরআনের ১২ তম এ সুরায় রয়েছে ১১১ টি আয়াত ও ১২ টি রুকু। সুরা ইউসুফকে মহান আল্লাহ নিজে বিশ্বের কাহিনীগুলোর মধ্যে শ্রেষ্ঠ কাহিনী বলে উল্লেখ করেছেন।

বিশ্বনবী (সা.) সুরা ইউসুফ অবতীর্ণ হওয়ার আগে হযরত ইউসুফ নবীর (আ.) ওই ঘটনা জানতেন না বলেও মহান আল্লাহ উল্লেখ করেছেন। মানুষের সুন্দর ও পবিত্র প্রকৃতি ফুটে উঠেছে এই বাস্তব ঘটনায়। এ সুরায় মূলতঃ হযরত ইউসুফ (আ.)'র জীবনের অত্যন্ত শিক্ষনীয় ঘটনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে বলেই সুরাটির নামকরণ করা হয়েছে ইউসুফ। খোদাপ্রেম, ধৈর্য, ত্যাগ, সততা, সংযম ও পবিত্রতার সুষমায় অনন্য এইসব ঘটনা বিশ্ব-ইতিহাসে ইউসুফ (আ.)-কে করেছে অমর। অন্য কোনো সুরা মূলত একজন নবীর ঘটনা-কেন্দ্রীক না হলেও সুরা ইউসুফের প্রায় পুরো অংশ জুড়েই রয়েছে এই মহান নবীর জীবনের বিস্ময়কর নানা ঘটনা, যা অসাধারণ আকর্ষণীয় ভঙ্গীতে তুলে ধরা হয়েছে।

অন্য সুরাগুলোয় নবী-রাসুলদের ঘটনা মূলত খোদাদ্রোহীদের সঙ্গে সংগ্রাম-কেন্দ্রীক। কিন্তু সুরা ইউসুফের প্রায় পুরো অংশ জুড়ে রয়েছে এই মহান নবীর শৈশব জীবন থেকে শুরু করে তাঁর জীবনের নানা চড়াই উৎরাইসহ মিশরের প্রধানমন্ত্রী হওয়া পর্যন্ত বিচিত্রময় ও শিহরণ-জাগানো বহু ঘটনা। আর এ জন্যই মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে এই নবীর ঘটনাকে শ্রেষ্ঠ কাহিনী বলে উল্লেখ করেছেন। মানুষ নিজের অজান্তেই শিক্ষণীয় ও নজিরবিহীন এইসব ঘটনার মহানায়কের প্রতি আকৃষ্ট হয়।

এবারে সুরা ইউসুফের মূল ঘটনা জানতে চতুর্থ থেকে ষষ্ঠ আয়াতের অর্থ শোনা যাক:

"(৪) ( হে রাসুল!) স্মরণ কর, যখন ইউসূফ নিজ পিতাকে বলল, ‘হে পিতা! আমি এগারটি নক্ষত্র , সূর্য ও চাঁদকে দেখেছি আমাকে সিজদা করছে।’ (৫) সে (ইয়াকুব) বলল, ‘হে বৎস! (খবরদার!) তোমার স্বপ্ন তোমার ভাইদের কাছে বলো না। তা না হলে তারা তোমার সাথে প্রতারণার জাল বোনা শুরু করবে। নিশ্চয়ই শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।’(৬) এবং এভাবেই তোমার প্রতিপালক তোমাকে মনোনীত করবেন, তোমাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষাদান করবেন এবং তোমার প্রতি ও ইয়াকুবের বংশধরদের প্রতি স্বীয় নিয়ামত পূর্ণ করবেন, যেভাবে তিনি তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম ও ইসহাকের প্রতি পূর্বে তা পূর্ণ করেছিলেন। নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।"

হযরত ইউসূফ (আ.) স্বপ্ন দেখেছিলেন যে, আকাশের দরজা খুলে গেল এবং এক মহান নূর প্রকাশ পেল যাতে সারাবিশ্ব আলোকময় হয়ে গেল। তিনি দেখতে পেলেন সাগর তরঙ্গায়িত হচ্ছে, মৎস্যকুল ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় তাসবিহ করছে। তিনি এক উঁচু পাহাড়ে দাঁড়িয়ে আছেন, এর চারদিকে সবুজ গাছ-পালা রয়েছে এবং নদী প্রবাহিত হচ্ছে। তাঁকে এক নূরানি পোশাক পরানো হয়েছে যাতে সব জিনিস উজ্জ্বল হয়ে গেছে। পৃথিবীর ধন-সম্পদের ভাণ্ডারের চাবি তাঁর সামনে রাখা হয়েছে। এরপর সূর্য, চাঁদ এবং এগারটি নক্ষত্র নেমে এসে তাঁর সামনে সিজদা করল। স্বপ্নে উল্লিখিত ‘মহান নূর’ বাদশাহী অর্থে, ‘নূরানী পোশাক’ নবুওয়াত অর্থে, ‘সূর্য’ বলতে হযরত ইয়াকুব (আ.), ‘চাঁদ’ বলতে হযরত ইউসূফের খালা যিনি তাঁকে লালন-পালন করেন, আর তিনি তাঁকে মা বলতেন এবং ‘এগার নক্ষত্র’ বলতে তাঁর এগার ভাইকে বোঝানো হয়েছে। এ স্বপ্ন তিনি বারো বছর বয়সে দেখেছিলেন।

হযরত ইয়াকুব (আ.) প্রথমে লিয়া বিনতে লিয়ান বিন ইসরাইলকে বিয়ে করেন। তাঁর গর্ভে ছয় ছেলে তথা ইহুদা, রুওয়াঈল, শাময়ূন, লাবি, যাবালুন ও ইয়াশজার জন্ম নেয়। পরে তিনি রায়ীল নামের এক নারীকে বিয়ে করেন যাঁর গর্ভে দীনা নামে এক মেয়ে ও দুই ছেলে- বিন ইয়ামিন ও ইউসূফ (আ.) জন্ম নেন। হযরত ইউসূফ (আ.)-এর শিশুকালে তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়। সেজন্য তাঁকে তাঁর খালা রাহিল লালন-পালন করেন এবং তাঁকেই তিনি মা বলতেন। হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর প্রথমা স্ত্রী লিয়ার এক দাসী ছিল। তাঁর গর্ভে দুটি এবং দ্বিতীয় স্ত্রী রায়িল-এরও এক দাসীর গর্ভে দুই ছেলে জন্ম নেয়- তাদের নাম ছিল যথাক্রমে হাদ ও আশর এবং দান ও থাফতানি। অর্থাৎ হযরর ইয়াকুব (আ.)'র বারো ছেলে ও এক মেয়ে ছিল। কিন্তু এই মহান নবী ইউসুফ ও বিন ইয়ামিনকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন। কারণ, তারা সবার চেয়ে বেশি ছোটো হওয়ায় বেশি যত্ন ও আদর পাওয়ার দাবিদার ছিল। আর ভবিষ্যতের নবী ইউসুফ (আ.)'র মধ্যে অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর দেখতে পেয়েছিলেন বলে ইয়াকুব (আ.)'র হৃদয়ের মধ্যে তাঁর জন্য বেশি ও বিশেষ স্নেহ

থাকাটা ছিল স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু এতে ইউসুফ (আ.) ও তার ভাই বিন ইয়ামিন অন্য ভাইদের প্রবল হিংসার শিকার হন।

সুরা ইউসুফের পরবর্তী আয়াতগুলোতে এসেছে:

"(৭) (হে রাসুল!) নিশ্চয় ইউসুফ ও তার ভাইদের বৃত্তান্তে জিজ্ঞাসুদের জন্য বহু নিদর্শন রয়েছে। (৮) যখন তারা বলল, ‘ইউসুফ ও তার সহোদর ভাই (বিন ইয়ামীন) আমাদের পিতার দৃষ্টিতে আমাদের চেয়ে বেশি প্রিয়, অথচ আমরা সংহত দল। নিশ্চয় আমাদের পিতা প্রকাশ্য বিভ্রান্তিতে আছে। (৯) (সুতরাং) ইউসুফকে হত্যা কর অথবা তাকে কোন (দূরবর্তী) ভূমিতে ফেলে দাও, তাহলে তোমাদের পিতার দৃষ্টি কেবল তোমাদের দিকে নিবিষ্ট হবে। এবং তোমরা সবাই তার পরে সৎকর্মপরায়ণ এক দলে পরিণত হয়ে যাবে।’"

উল্লেখ্য, ইহুদী পণ্ডিতরা মুসলমানদের কাছে ইয়াকুব বংশের মিশরে আগমন করার কারণ জিজ্ঞেস করার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ এ সম্পর্কে পূর্ণ বৃত্তান্ত বর্ণনা করেছেন। এছাড়া মহানবী (সা.)-কেও এর মাধ্যমে সান্ত¡না দান করেছেন যে, যখন হযরত ইউসুফ (আ.)-এর নিজের ভাইয়েরা তাঁর ওপর এতটা নির্যাতন করেছে, তখন তিনিও তাঁর উম্মতের দ্বারা নির্যাতিত হওয়ায় বিস্ময়ের কী আছে?

হিংসুকদের বৈশিষ্ট্য হল তারা অন্যের সুখ ও সম্মান বা আদর-যত্ন সহ্য করতে পারে না। তারা এর পেছনের কারণ হিসেবে যোগ্যতার দিকটি দেখে না এবং নিজেদের যোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা না করে যোগ্য ব্যক্তির ক্ষতি করার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে।#

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন