এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 25 ফেব্রুয়ারী 2016 18:00

সুরা ইউসুফের কয়েকটি আয়াতের ব্যাখ্যা

সুরা ইউসুফের কয়েকটি আয়াতের ব্যাখ্যা

 

 

 

বলা হয় হযরত ইউসুফ (আ.)-কে হত্যা করতে তার ভাইদের পরামর্শ দিয়েছিল খোদ শয়তান। তারা তাঁকে হত্যা না করলেও অবশেষ কুয়ায় ফেলে দিয়েছিল।

বর্তমান যুগেও সেই একই শয়তানের পরামর্শ অনুযায়ী ইসলামের শত্রুদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কোনো কোনো কথিত মুসলিম ও আরব সরকার নিজেদেরই মজলুম মুসলিম ও বিপ্লবী ভাইদের কষ্ট দিতে দ্বিধা বোধ করছে না। গাজা ও পশ্চিম তীরের মজলুম ফিলিস্তিনিরাই এর দৃষ্টান্ত। অনেক আরব ও মুসলিম সরকার এইসব ফিলিস্তিনিদের সহায়তা করছে না, বরং তারা দখলদার ইসরাইলকেই সহায়তা দিচ্ছে।

যাই হোক, হযরত ইউসুফ (আ.)'র ঘটনা প্রসঙ্গে এর পরের আয়াতগুলোতে এসেছে:

 

"(১০) তাদের মধ্যে একজন বলল, ‘ইউসুফকে হত্যা কর না, আর তোমরা যদি কিছু করতেই চাও, তবে তাকে কোন কুয়ার গভীরে নিক্ষেপ কর, যাতে কোন যাত্রীদল তাকে তুলে নিয়ে যায়।’(১১) তারা বলল, ‘হে আমাদের পিতা! আপনার কী হয়েছে যে, আপনি ইউসুফের ব্যাপারে আমাদের ওপর আস্থা রাখেন না? অথচ অবশ্যই আমরা তার হিতাকাঙ্ক্ষী। (১২) আপনি আগামীকাল তাকে আমাদের সাথে পাঠান, যাতে আমাদের সাথে (ফল-মূল আহার করে ও) ঘুরে বেড়ায় এবং খেলাধূলা করে। এবং নিশ্চয় আমরা তাকে রক্ষণাবেক্ষণ করব।’ (১৩) সে বলল, ‘তোমরা যে তাকে নিয়ে যাবে নিশ্চয় এটা আমার জন্য অতিশয় কষ্টদায়ক এবং আমি আশংকা করি যে, তোমরা তার ব্যাপারে উদাসীন হয়ে যাবে, আর তাকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলবে।’ (১৪) তারা বলল, ‘আমরা সংঘবদ্ধ দল হওয়া সত্ত্বেও যদি তাকে নেকড়ে বাঘ খেয়ে ফেলে, তবে আমরা নিশ্চয় ক্ষতিগ্রস্ত হব।’ (১৫) বস্তুত যখন তারা তাকে নিয়ে গেল এবং এ ব্যাপারে একমত হল যে, তাকে কুয়ার গভীরে নিক্ষেপ করবে;

 

তখন আমরা তার (ইউসুফের) কাছে ওহি বা প্রত্যাদেশ পাঠালাম, ‘অবশ্যই তুমি (একদিন) তাদেরকে (এইসব ষড়যন্ত্রের) বিষয়ে অবহিত করবে এ অবস্থায় যে তারা তোমাকে চিনবে না। (১৬) এবং তারা রাতে তাদের পিতার কাছে কাঁদতে কাঁদতে এল।"

হযরত ইউসুফ (আ.)'র ভাইরা ভ্রাতৃসুলভ মমতার আড়ালে তাকে হত্যার বা নির্বাসনে দেয়ার গোপন চক্রান্ত করেছিল। তাই তারা ছোটো ভাইয়ের জন্য কৃত্রিম দরদ দেখিয়ে বাবাকে বলে: বাবা, আপনি কেনো ইউসুফকে কখনও নিজের কাছ থেকে দূরে রাখেন না? আপনি কী আমাদেরকে বিশ্বস্ত মনে করেন না? অথচ আমরা তার কল্যাণই চাই! আপনি আগামীকাল তাকে আমাদের সাথে পাঠান। আর যদি তার নিরাপত্তার ব্যাপারে চিন্তিত হয়ে থাকেন তাহলে আমরা গ্যারান্টি দিচ্ছি যে নিশ্চয়ই আমরা তাকে রক্ষণাবেক্ষণ করব।

 

এভাবে তারা ইউসুফকে তাদের বাবার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করার ষড়যন্ত্র পাকাপোক্ত করে। কিন্তু ইয়াকুব (আ.) এ আশঙ্কা ব্যক্ত করেন যে তোমরা তার ভাই হওয়া সত্ত্বেও তোমাদের উদাসীনতার সুযোগে বাঘ ইউসুফকে খেয়ে ফেলতে পারে।

 

উল্লেখ্য, যেদিন ছেলেরা হযরত ইয়াকুব (আ.)-এর কাছে আবেদন করেছিল সে রাতেই তিনি স্বপ্ন দেখেন যে, দশটি নেকড়ে বাঘ ইউসুফ (আ.)-এর ওপর হামলা করছে এবং সেগুলোর মধ্যে যে বড় নেকড়ে ছিল সেটা তাঁকে রক্ষা করছে। এ সময় মাটি দু’ভাগ হয়ে গেল এবং ইউসুফ (আ.) মাটির ভিতরে চলে গেলেন। তাই ছেলেরা হযরত ইউসুফ কে তাদের সঙ্গে যেতে দেওয়ার আবেদন করলে তিনি সেই স্বপ্নের কারণে বলেছিলেন যে, নেকড়ে বাঘ তাঁকে খেয়ে ফেলতে পারে।

 

অবশেষে ইউসুফ (আ.)'র ভাইরা তাঁকে রক্ষার ব্যাপারে বাবাকে জোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরের দিন তাঁকে নিজেদের সঙ্গে নিয়ে যায়। খুব উদ্বিগ্ন মনে ইয়াকুব নবী (আ.) প্রিয়তম ছেলেকে বিদায় জানান।

 

এ যাত্রা যদিও খুবই সংক্ষিপ্ত ছিল তবুও হযরত ইয়াকুব (আ.) প্রয়োজনীয় সব জিনিসপত্র প্রিয় সন্তানের সঙ্গে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর দৃষ্টির বাইরে যেতেই অন্য ভাইয়েরা তাঁর কাছ থেকে সব জিনিস ছিনিয়ে নেয় এবং তাঁকে নানা রকম বিপদে ফেলে, এমনকি তাঁকে পানিও খেতে দেয়নি। ফলে তিনি পিপাসায় কাতরাতে থাকলেন। তারা তাঁকে ভীষণ মারধোর করে, পরিধানের কাপড়ও খুলে নেয়। এ অবস্থায় তিনি যে ভাইয়ের কাছেই একটু দয়া লাভের জন্য গিয়েছেন সে-ই তাঁকে যাতনা দিয়েছে। অবশেষে তারা বালক ইউসুফ (আ.)-কে কুয়ায় ফেলে দেয়ার জন্য তাঁকে একটি কুয়ার কাছে নিয়ে আসে। এ সময় ইউসুফ (আ.) হঠাৎ হাসতে থাকেন। তার ভাইয়েরা বিস্ময়ে হতবাক হলো এই ভেবে যে, এমন কঠিন বিপদের সময় ও হাসছে কেন! ইউসুফ (আ.) বললেন:

 

"আমার এতোসব শক্তিশালী ভাই আছে ভেবে একদিন আমি খুবই খুশি হয়েছিলাম ও মনে মনে বলেছিলাম, এতোসব সহায়তাকারী থাকতে আমার জীবনে তো কোনো দুঃখ আসার সম্ভাবনা নেই! সেদিন আমি তোমাদের ওপর নির্ভর করেছিলাম, অথচ আজ আমি তোমাদের হাতেই বন্দী! আল্লাহ তোমাদেরকে আমার ওপর কর্তৃত্বশালী করেছেন এটা শেখাতে যে আল্লাহ ছাড়া যেন আর কারো ওপরই ভরসা না করি।"

 

এ সময় মহান আল্লাহ ইউসুফ (আ.)'র কাছে ওহি বা প্রত্যাদেশ পাঠিয়ে বলেন ‘অবশ্যই তুমি (একদিন) তাদেরকে (এইসব ষড়যন্ত্রের) বিষয়ে অবহিত করবে এ অবস্থায় যে তারা তোমাকে চিনবে না। অর্থাৎ তুমি একদিন ক্ষমতার মসনদে বসবে এবং তোমার ভাইরা তোমার কাছে সাহায্যের জন্য হাত পাতবে। আর সে সময় তোমার অতি উচ্চ পদে আসীন অবস্থা দেখে তারা বিশ্বাসই করতে চাইবে না যে, তুমি তাদেরই ভাই! সেদিন তুমি তাদেরকে বলবে: তোমরা কি তোমাদের ছোটো ভাই ইউসুফের সঙ্গে ওইসব জঘন্য আচরণ করোনি? তারা সেদিন তাদের ওইসব কাজের জন্য লজ্জিত ও অনুতপ্ত হবে।

 

যাই হোক, ইউসুফ (আ.)-কে কুয়ায় ফেলে দেয়ার পর তার ভাইয়েরা সেদিন সন্ধ্যায় বাবার কাছে ফিরে আসে কাঁদতে কাঁদতে। প্রিয় ছেলের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমান বাবা ছেলেকে না দেখে মর্মাহত হলেন ও তাঁর খোজ-খবর জানতে চাইলেন। তাঁর ছেলেরা বললো:

 

(১৭) এবং বলল, ‘হে আমাদের পিতা! আমরা দৌড়ের প্রতিযোগিতা করছিলাম এবং ইউসুফকে আমাদের মালপত্রের কাছে রেখে গিয়েছিলাম, তখন নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলেছে। কিন্তু তুমি তো আমাদের বিশ্বাস করবেই না, আমরা যতই সত্যবাদী হই না কেন।’

 

তার ভাইরা তাদের বাবাকে জানায় যে, প্রতিযোগিতার ক্ষমতা রাখতো না বলে ইউসুফকে তারা তাদের মালপত্র দেখার দায়িত্ব দিয়েছিল এবং খেলায় ব্যস্ত হওয়ায় তারা ইউসুফের কথা ভুলে গিয়েছিল। ফলে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলে। আর আমরা জানি যে, 'তুমি তো আমাদের বিশ্বাস করবেই না, আমরা যতই সত্যবাদী হই না কেন!’কারণ, তুমি নিজেই এমন ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করছিলে!

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন