এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
বৃহস্পতিবার, 25 ফেব্রুয়ারী 2016 18:10

সুরা ইউসুফের কয়েকটি আয়াতের ব্যাখ্যা (দুই)

সুরা ইউসুফের কয়েকটি আয়াতের ব্যাখ্যা (দুই)

 

 

 

শিশু বা বালক ইউসুফ (আ.)-কে মেরে ফেলার বা তাঁকে কুয়ায় ফেলে দেয়ার ষড়যন্ত্র করেছিল তাঁর ভাইয়েরা। কারণ, তাদের বাবা ইউসুফ (আ.)-কে সবচেয়ে বেশি ভালবাসতেন বলে তাদের মধ্যে হিংসার আগুন প্রজ্জ্বলিত হয়েছিল।

অবশেষে তারা শিশু ইউসুফকে কুয়ায় ফেলে দেয় এবং সেদিন সন্ধ্যায় বাবার কাছে ফিরে আসে কাঁদতে কাঁদতে। তারা বললো:

'(১৭) এবং বলল, ‘হে আমাদের পিতা! আমরা যখন দৌড়ের প্রতিযোগিতা করছিলাম এবং ইউসুফকে আমাদের মালপত্রের কাছে রেখে গিয়েছিলাম, তখন নেকড়ে বাঘ তাকে খেয়ে ফেলেছে। কিন্তু তুমি তো আমাদের বিশ্বাস করবেই না, আমরা যতই সত্যবাদী হই না কেন।’

 

বাবা যাতে তাদের কথা বিশ্বাস করে সে জন্য তারা ইউসুফ (আ.)'র সুস্থ অবস্থায় তাঁর শরীর থেকে জামা খুলে নেয় এবং ওই জামায় ভেড়া বা ছাগলের রক্ত মিশিয়ে দেয়। বাঘের হামলার নিদর্শন হিসেবে জামাটিকে ছিন্ন-ভিন্ন করা হলে তাদের ওই মিথ্যাচারের পক্ষে যুক্তি জোরদার হতো, কিন্তু তারা তা করতে ভুলে যায়। তাই ইয়াকুব (আ.) বুঝতে পারেন যে তারা মিথ্যা কথা বলছে। এ সম্পর্কে সুরা ইউসুফে বলা হয়েছে: "(১৮) এবং তারা ইউসূফের জামায় মিথ্যা রক্ত লেপন করে নিয়ে এল। (ইয়াকুব) বলল, ‘বরং তোমাদের মন একটি (মন্দ) বিষয়কে তোমাদের জন্য সুন্দর করে দেখিয়েছে, তাই উত্তমভাবে ধৈর্যধারণই (আমার জন্য) শ্রেয়; এবং তোমরা যা বর্ণনা করেছ তার বিপরীতে একমাত্র আল্লাহর কাছে সাহায্য চাওয়া যায়।’ (১৯) এবং এক যাত্রীদল সেখানে এল এবং তারা তাদের পানি বাহককে প্রেরণ করল। সে তার বালতি (কুয়ায়) ফেলল এবং সে বলল, ‘বড় সুসংবাদ! এতো এক বালক!’ এবং তারা তাকে এক মূল্যবান পণ্য হিসেবে গোপন করে রাখল। এবং আল্লাহ তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে সবিশেষ অবহিত ছিলেন।"

বালক ইউসুফ (আ.) কুয়ার ভয়ানক অবস্থার মধ্যে কয়েক দিন কাটালেন। আল্লাহর ওপর দৃঢ় ঈমানের কারণে মুক্তির ব্যাপারে তিনি ছিলেন আশাবাদী। এরপর এক কাফেলা এসে পানি তুলতে গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে এবং দাসদের বাজারে তাকে খুব কম দামে বিক্রি করে দেয়। ঘটনাক্রমে মিশরের রাজা ফেরাউনের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফকে কিনে নেন। এভাবে মিশরে যাওয়ার পর ইউসুফ (আ.)'র জীবনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয়। ফেরাউনের প্রধানমন্ত্রী বা আজিজের কোনো সন্তান ছিল না। তাই অতি সুদর্শন ও নিষ্পাপ চেহারার এই শিশুকে সন্তানের মতোই যত্ন করতে নিজ স্ত্রী জুলায়খার প্রতি পরামর্শ দেন তিনি। পবিত্র কুরআনে এসেছে:

 

(২১) এবং মিশরের যে লোক তাকে কিনে নিয়েছিল, সে তার স্ত্রীকে বলল, ‘তুমি তার সম্মানজনক বসবাসের ব্যবস্থা কর, হয়ত সে আমাদের কোন উপকার সাধন করবে। অথবা আমরা একে পুত্র হিসেবে গ্রহণ করতে পারি।’ এবং এভাবেই আমরা ইউসুফকে ঐ দেশে আধিপত্য দান করেছিলাম (যাতে আমরা তাকে সম্মানিত করতে পারি) এবং যেন তাকে স্বপ্নের ব্যাখ্যা শিক্ষাদান করতে পারি। এবং আল্লাহ নিজ কর্ম সম্পাদনে অপ্রতিহত। যদিও বেশিরভাগ মানুষ তা জানে না।

 

ইউসুফ (আ.) কুয়ার ভয়ানক পরিবেশ থেকে মুক্তি পেয়ে মিশরের রাজ-প্রাসাদের নিরাপদ ও সুখময় পরিবেশে আশ্রয় পেলেন মহান আল্লাহর ইচ্ছায়। ফলে মিশরে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলার সুযোগ পান ইউসুফ (আ.)। তিনি যতই বড় হচ্ছিলেন মহান আল্লাহ তাঁকে অসাধারণ জ্ঞান ও প্রজ্ঞাও দান করছিলেন। হযরত ইউসুফ (আ.)'র চেহারার অপরূপ সৌন্দর্য ও নিষ্পাপতার নুরানি ঔজ্জ্বল্য আজিজ বা প্রধানমন্ত্রীকে গভীরভাবে আকৃষ্ট করেছিল। শুধু তাই নয়, আজিজের স্ত্রীও তাকে গভীরভাবে ভালবাসতো। আর ইউসুফ (আ.) যখন যৌবনে উপনীত হন তখন তাঁর সৌন্দর্য আজিজের স্ত্রী জুলাইখাকে অসংযমী করে তোলে। অথচ ইউসুফ (আ.) ছিলেন সব সময় নিজের চারিত্রিক পবিত্রতা রক্ষার প্রতি যত্নশীল, খোদাভীরু ও খোদাপ্রেমিক। জুলাইখা নানা পন্থায় যুবক ইউসুফ (আ.)-কে নিজের প্রতি প্রলুব্ধ করতে চেয়েও ব্যর্থ হয়। এরপর এই নারী তার অসৎ কামনা বাস্তবায়নের জন্য একদিন নিজেকে সুসজ্জিত করে এবং পুতঃপবিত্র যুবক ইউসুফ (আ.)-কে নিজের প্রসাদের নির্জন কক্ষে এনে দরজা বন্ধ করে দিয়ে তাঁকে তার সঙ্গে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়ার আহ্বান জানায়।

 

হযরত ইউসুফ (আ.) অসৎ আনন্দে লিপ্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েও নিজের ধৈর্য ও সংযম বজায় রাখেন এবং পাপাচারে লিপ্ত হওয়ার আহ্বান নাকচ করে দিয়ে দৃঢ়চিত্তে বলেন: আমি মহান আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইছি। এভাবে ইউসুফ (আ.) জুলাইখাকে বুঝিয়ে দেন যে তিনি কখনও তার অসৎ ও অবৈধ ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করবেন না। তিনি এটাও বুঝিয়ে দেন যে শয়তানের প্ররোচনার হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার এবং অসৎ আনন্দের কঠিন ফাঁদ থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় হল মহান আল্লাহর কাছে আশ্রয় নেয়া। পবিত্র কুরআনে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে: "(২৩) এবং সে (ইউসুফ) যে স্ত্রীলোকটির গৃহে ছিল সে তার কাছে অসৎকর্ম কামনা করল এবং দরজাগুলো বন্ধ করে দিল এবং বলল, ‘এস!’ সে তথা ইউসুফ বলল, ‘আমি আল্লাহর আশ্রয় কামনা করছি।

 

নিশ্চয়ই তিনি আমার প্রভু, তিনি আমাকে ভালভাবে থাকার ব্যবস্থা করেছেন; এবং নিশ্চয়ই অবিচারকরা সফল হয় না।’(২৪) নিঃসন্দেহে সে নারী তাঁর তথা ইউসুফের প্রতি সংকল্প করেছিল এবং ইউসুফও সেই নারীর প্রতি সংকল্প করত যদি না সে তার প্রতিপালকের প্রমাণ প্রত্যক্ষ করত। আমরা এমন (ভাবে ব্যবস্থা) করলাম যাতে তার থেকে অসৎকর্ম ও অশ্লীলতাকে দূরে রাখতে পারি। নিশ্চয়ই সে আমাদের পরিশুদ্ধ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত ছিল।"

 

প্রাসাদের নির্জন কক্ষে ইউসুফ (আ.)-কে আটকে রেখে জুলাইখার অসৎ উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টার ঘটনাটি এই মহান নবীর জীবনের অন্যতম প্রধান স্পর্শকাতর মুহূর্ত। জুলাইখা ইউসুফ (আ.)-কে চরম চারিত্রিক পথভ্রষ্টতার শিকার করতে চেয়েছিল। কিন্তু এই মহান নবীর দৃঢ় ঈমান ও বিবেক জুলাইখার কামনা-বাসনার ওই প্রচণ্ড হামলাকে পুরোপুরি বানচাল করে দেয়। মানবীয় লোভ ও দুর্বলতাকে কঠোরভাবে দমনের জন্য সেই কঠিন মুহূর্তে নিজের মনের সঙ্গে কঠোর জিহাদ বা সংগ্রাম করতে হয়েছিল হযরত ইউসুফ (আ.)-কে। নিজেকে পবিত্র রাখতে সদা-দৃঢ়-সংকল্প নবী-রাসূলরা সাধারণত পাপকে বিষের মতোই বর্জন করেন। তাঁরা মহান আল্লাহ'র একনিষ্ঠ বান্দা বলেই তাঁদের কঠিন বিপদের সময় আল্লাহ তাদের ত্যাগ করেন না, বরং নানা পন্থায় তাদের সাহায্য করেন।#

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন