এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
রবিবার, 06 মার্চ 2016 17:11

সুরা ইউসুফের কয়েকটি আয়াতের ব্যাখ্যা (তিন)

সুরা ইউসুফের কয়েকটি আয়াতের ব্যাখ্যা (তিন)

 

 

 

গত কয়েক পর্বে আমরা হযরত ইউসুফ (আ.)'র জীবনের দারুণ শিক্ষণীয় কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। ইউসুফ (আ.) ক্রীতদাস হিসেবে মিশরের রাজার প্রধানমন্ত্রীর প্রাসাদে স্থান পেয়েছিলেন।

কিন্তু আজিজ বা প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রী জুলাইখা ইউসুফ নবীর অপরূপ সৌন্দর্যে অসংযমী হয়ে তার সঙ্গে অবৈধ দৈহিক সম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করে। কিন্তু এই মহান নবী কেবল বাহ্যিক রূপ-লাবন্যের দিক থেকেই অসাধারণ সুন্দর ছিলেন না, তাঁর মনটাও ছিল পুরোপুরি পবিত্র ও সুন্দর। তাই জুলাইখা তার প্রাসাদের সবগুলো দরজা বন্ধ করে দিয়ে ইউসুফ (আ.)-কে অসৎ উদ্দেশ্যে আটকানোর চেষ্টা করা সত্ত্বেও এই মহান নবী মহান আল্লাহর ওপর ভরসা করে দৌড় দিয়ে দরজার দিকে পালিয়ে যেতে থাকেন যাতে দরজা খুলে বেরিয়ে পড়ে নিজেকে পবিত্র রাখতে পারেন। অলৌকিকভাবে মহান আল্লাহর ইচ্ছায় বেশ কয়েকটি দরজা খুলে যায় একের পর এক। কিন্তু অসংযমী কামনার কাছে পরাজিত ও বিবেক-বুদ্ধি লোপ-পাওয়া জুলাইখাও পেছনে পেছনে ছুটতে থাকে যাতে ( শেষ দরজাটি খুলে যাওয়ার আগেই) সুদর্শন ইউসুফ নবীকে আটকানো যায়। আর এ লক্ষ্যে সে পেছন থেকে ইউসুফ (আ.)'র জামার অংশ ধরে টান দেয়ায় জামাটি ছিঁড়ে যায়। আর এ সময় জুলাইখার স্বামী সেখানে হাজির হন। ফলে অপ্রস্তুত জুলাইখা তার স্বামীকে বলে:

(২৫) ‘যে তোমার স্ত্রীর সাথে অসৎ কাজের ইচ্ছা করে তার সাজা কারারুদ্ধ করা অথবা অন্য কোন বেদনাদায়ক শাস্তি ছাড়া আর কী হতে পারে?’

 

কিন্তু জুলাইখার স্বামী তথা মিশরের আজিজ বা প্রধানমন্ত্রী নানা স্বাক্ষ্য-প্রমাণের মাধ্যমে বুঝতে পারেন যে ইউসুফ (আ.) নির্দোষ, বরং জুলাইখা নিজেই মিথ্যাবাদী ও বিশ্বাসঘাতক। কিন্তু এ ঘটনা ফাঁস হয়ে পড়লে তার সম্মানহানি হবে এই ভয়ে তিনি ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার ব্যবস্থা করেন। তিনি ইউসুফ (আ.)-কে বললেন: ইউসুফ! এখন তুমি এটা উপেক্ষা কর (আর, এ ব্যাপারে কোথাও কিছু বলো না) এবং হে নারী! তুমি তোমার অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা কর; নিশ্চয় তুমি অপরাধীদের অন্তর্ভুক্ত।

কিন্তু জুলাইখা ও তার স্বামীর জন্য সম্মানহানিকর বা কলঙ্কজনক এ ঘটনাটি ধামাচাপা থাকেনি, বরং মানুষের কাছে প্রচারিত হতে থাকে। পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে: অতঃপর নগরের নারীরা বলতে লাগল, ‘(মিশরের) আজিজের স্ত্রী নিজের যুবক দাস হতে কাম-লালসা পূর্ণ করতে চেয়েছিল এবং প্রেম তাকে বিমোহিত করেছে। নিশ্চয়ই আমরা তাকে প্রকাশ্য বিভ্রান্তিতে দেখছি।’ ’

 

মিশরের আজিজের স্ত্রী তার সম্পর্কে স্বদেশী অভিজাত ঘরের নারীদের ব্যাঙ্গ-বিদ্রুপ শুনে এর মোকাবেলা করার ভাবে। জুলাইখা তাদেরকে এক ভোজ-সভায় আমন্ত্রণ জানায়। সে তাদের সবার হাতে একটি ধারালো ছুরি দেয় ফল কেটে খাওয়ার জন্য। এরপর ওই নারীদের মজলিসে ইউসুফ (আ.)-কে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয় জুলাইখা যাতে ইউসুফের অসাধারণ রূপের বিষয়টি বুঝতে পেরে ওই নারীরা যেন প্রধানমন্ত্রীর স্ত্রীকে কলঙ্কজনক ওই ঘটনার জন্য তিরস্কার না করে।

 

ওই নারীরা যখন ইউসুফ (আ.)-কে দেখলো তখন তারা তার অপরূপ সৌন্দর্য ও মহত্ত্ব দেখে এতোই বিমোহিত হয় যে ফল বা কমলা কাটার পরিবর্তে তারা তাদের হাত কেটে ফেলে ছুরি দিয়ে। তারা বলে উঠলো: ‘আল্লাহর মাহাত্ম্য! এ তো মানুষ নয়; বরং কোন সম্মানিত ফেরেশতা।’ হাদিস বা ইসলামী বর্ণনায় এসেছে যে, তারা সংখ্যায় ছিল চল্লিশজন এবং তাদের মধ্যে নয়জন মহিলা হযরত ইউসূফ (আ.)-কে দেখে বেহুঁশ হয়ে যায়।

 

এভাবে জুলাইখা মিশরের অভিজাত ঘরের নারীদের এটা বোঝাতে চায় যে, ইউসুফের মত অপরূপ সুন্দর যুবকের প্রেমে উন্মাদিনী হয়ে পড়াটা তার জন্য কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ছিল না। সে ওই সভায় প্রকাশ্যেই তার পাপের কথা স্বীকার করে বললো:

 

‘এই সে-ই (যুবক) যার ব্যাপারে তোমরা আমার নিন্দা করেছ এবং আমি অবশ্যই তার থেকে আমার কামনা পূর্ণ করতে চেয়েছি। কিন্তু সে নিজেকে সুরক্ষিত রাখল। যদি আমার কথা সে মান্য না করে, তবে অবশ্যই কারারুদ্ধ হবে এবং লাঞ্ছিতদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’অর্থাৎ ইউসুফ যদি জুলাইখার নির্দেশ মোতাবেক নিজেকে অপবিত্র করতে রাজি না হয় তাহলে তাকে অবশ্যই কারাগারে থাকতে হবে ও লাঞ্ছনা সইতে হবে বলে জুলাইখা লজ্জার মাথা খেয়ে হুঁশিয়ারি দেয়।

 

জীবনের এই পর্যায়ে যখন সব দিক থেকে অপবিত্রতার আগ্রাসী হামলা শুরু হল ইউসুফ নবীর ওপর তখনও তিনি পবিত্র থাকার সাহসি সিদ্ধান্তটি নেন এবং প্রবৃত্তি-পূজারী ও সুন্দরী অভিজাত নারীদের সঙ্গে সংলাপে বসার চেয়ে কারাগারকেই উত্তম বলে মনে করেন। এ প্রসঙ্গে কুরআনে এসেছে: সে তথা ইউসুফ বলল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তারা আমাকে যে ব্যাপারে আহ্বান করছে তার চেয়ে কারাগার আমার কাছে বেশি প্রিয়। যদি তুমি আমাকে তাদের ছলনা থেকে উদ্ধার না কর, তবে আমি তাদের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারি এবং আমি অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারি।’

মহান আল্লাহ ইউসুফ নবীর দোয়া কবুল করেন এবং তাকে প্রবৃত্তি-পূজারী নারীদের ষড়যন্ত্রের হাত থেকে রক্ষা করেন।

 

অবশেষে ইউসুফের পবিত্রতা ও আজিজের স্ত্রীর অপবিত্রতা প্রমাণিত হয়। এ অবস্থায় মিশরের আজিজ বা প্রধানমন্ত্রী তার স্ত্রীর কলঙ্কের কালিমা যাতে আরও না ছড়ায় সে জন্য ইউসুফ নবীকে লোক-চক্ষুর অন্তরালে তথা কারাগারে রাখার ব্যবস্থা করেন যাতে মানুষ তার কথা একেবারেই ভুলে যায়। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে মানুষকে এটা বোঝানো হলো যে, আসল অপরাধী হল ইউসুফই! ফলে খোদাভীরু, সংযমী ও পবিত্র মহামানব ইউসুফ (আ.)-কে যেতে হল কারাগারে।

 

বর্ণনায় এসেছে, জুলাইখা ইউসুফ (আ.)-কে নিজের একান্ত কক্ষে আমন্ত্রণ জানানোর পর সেই কক্ষে রাখা আমুন দেবতার মূর্তিকে ঢেকে দিয়েছিল এই ভেবে যে মূর্তির সামনে পাপাচারে লিপ্ত হলে মূর্তি তা দেখবে যা লজ্জাজনক। অথচ বাস্তবে মূর্তির কোনো কিছু দেখার কোনো ক্ষমতাই নেই, বরং মহান আল্লাহ সব অবস্থায় সৃষ্টিকুলের সব তৎপরতা দেখেন ও জানেন। আর এটা জানেন বলেই নবী তো দূরের কথা, মহান আল্লাহর প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসী ও তাঁর প্রতি লজ্জাশীল এবং খোদাভীরু কোনো মু'মিনের পক্ষেও কখনো কোনো পাপে লিপ্ত হবার চিন্তাও আসার কথা নয়।#

 

 

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন