এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
রবিবার, 06 মার্চ 2016 17:21

সুরা ইউসুফের কয়েকটি আয়াতের ব্যাখ্যা (চার)

সুরা ইউসুফের কয়েকটি আয়াতের ব্যাখ্যা (চার)

 

 

 

গত পর্বের আলোচনায় আমরা শুনেছি, হযরত ইউসুফ (আ.) নিষ্পাপ বা নিরপরাধ হওয়া সত্ত্বেও জুলাইখার ষড়যন্ত্রে কারাগারে যেতে বাধ্য হন। এরপর আরও দুই যুবক নবী ইউসুফের (আ.) সঙ্গে কারাগারে আসে।

একদিন ওই দুই যুবকই স্বপ্ন দেখে। ইউসুফের কাছে তারা তাদের স্বপ্নের ঘটনা খুলে বলে এবং ব্যাখ্যা জানতে চায়।

 

হযরত ইউসুফ (আ.) ইবাদত ও খোদাপ্রেমে নিষ্ঠার কারণে অনেক গোপন রহস্য জানতে পারতেন। তিনি কারাগারের ওই দুই যুবকের কাছে একত্ববাদ বা তৌহিদের বাস্তবতার কিছু যুক্তি তুলে ধরার পর তাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা দেন। এ মহান নবী বলেন, 'হে আমার কারাসঙ্গীরা! তোমাদের একজন মুক্তি পাবে এবং মনিবের মদ পরিবেশক হবে। আর দ্বিতীয় জনকে ফাঁসি দেয়া হবে ও আকাশের পাখিরা তার মাথা ঠুকরিয়ে খাবে।'

 

যে যুবক মুক্তি পেয়ে রাজার সাকি বা মদ পরিবেশক হয় ইউসুফ (আ.) তাকে বলে দিয়েছিলেন যে, রাজাকে আমার ঘটনার ব্যাপারে তদন্ত করার কথা বলবে যাতে আমার নির্দোষ থাকার বিষয়টি প্রমাণিত হয়। কিন্তু ওই যুবক ইউসুফের বিষয়টি পুরোপুরি ভুলে যায়। ফলে এই মহান নবীকে একজন বিস্মৃত ব্যক্তি হিসেবে বহু বছর কারাগারে থাকতে হয়। তিনি কারাগারে আত্মগঠন ও বন্দীদের সুপথ দেখানো এবং অসুস্থদের সেবার কাজে ব্যস্ত থাকতেন। এভাবে সাত বছর কেটে যাওয়ার পর কোনো এক রাতে মিশরের বাদশাহ এক ভয়ানক স্বপ্ন দেখেন। সকালে স্বপ্ন-বিশারদদের ডেকে পাঠানো হয়। রাজা তাদের বলেন:

 

(৪৩) ‘আমি স্বপ্নে সাতটি মোটা গাভী দেখেছি যেগুলোকে সাতটি শীর্ণকায় গাভীকে খেয়ে ফেলেছে; এবং আমি আরও দেখেছি সাতটি তাজা সবুজ শীষ ও অপর সাতটি শুষ্ক ( শুকনো শীষগুলো তাজা-সবুজ শীষগুলোকে খেয়ে ফেলেছে) । হে হে পারিষদবর্গ!! তোমরা আমার স্বপ্নের ব্যাপারে অভিমত দাও যদি তোমাদের স্বপ্নের ব্যাখ্যা করার সাধ্য থাকে।’ (৪৪) তারা বলল, ‘এগুলো উদ্বেগজনিত স্বপ্ন, আর আমরা এমন স্বপ্নের ব্যাখ্যা সম্পর্কে অজ্ঞ।’

 

বার বার চেষ্টা করেও প্রচলিত স্বপ্ন-বিশারদরা রাজার স্বপ্নের কোনো বিশ্বাসযোগ্য বা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। এ সময় সেই দুই বন্দির মধ্যে যে মুক্তি পেয়েছিল তার মনে পড়ল বুদ্ধিদৃপ্ত ইউসুফের কথা। সে বলল, ‘আমি এর ব্যাখ্যা সম্পর্কে তোমাদের জানাব, তাই আমাকে (কারাগারে) পাঠাও।’ কারাগারে ইউসুফের কাছে এসে সে বলল, ‘হে ইউসুফ! হে সত্যবাদী! সাতটি মোটা গাভীকে সাতটি শীর্ণকায় গাভী খেয়ে ফেলেছে এবং সাতটি শীষ আছে তাজা-সবুজ, আর অপর সাতটি শুষ্ক ( শুকনো শীষগুলো তাজা-সবুজ শীষগুলোকে খেয়ে ফেলেছে), -- এই স্বপ্নের ব্যাখ্যা আমাকে জানাও যাতে আমি তাদের কাছে ফিরতে পারি এবং যাতে তারাও জানতে পারে। জবাবে ইউসুফ নবী বললেন,

 

‘তোমরা একটানা সাত বছর খুব ভালভাবে কৃষিকাজ করবে এবং যে শস্য তোমরা কাটবে তার থেকে স্বল্প পরিমাণ তোমরা খাবে, এ ছাড়া সব ফসল শীষসহ গুদামে সংরক্ষণ করা উচিত। কারণ, এরপর সাতটি কঠিন খরার বছর আসবে, এ সময় তোমরা এই কঠিন বছরগুলোর জন্য যা সঞ্চয় করেছিলে তা থেকে খাবে, কেবল স্বল্প পরিমাণ ছাড়া, যা তোমরা (বীজ হিসাবে) সংরক্ষণ করে রাখবে।– এ কাজ না করলে তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে। এভাবে পরের সাতটি বছর পার করে দিতে পারলে তোমাদের জন্য আর কোনো ভয় থাকবে না। কারণ, এরপর আবারও বর্ষণমুখর বছর ফিরে আসবে। ফলে কৃষিকাজে কোনো ঝামেলা ও শস্যের কোনো অভাব আর থাকবে না।'

 

হযরত ইউসুফ (আ.) রাজার স্বপ্নের এই যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন তা ছিল একেবারেই নির্ভুল ও বিশ্বাসযোগ্য। ফলে রাজা ও তার আশপাশের অভিজাত ব্যক্তিরা বিস্মিত হন। এবার রাজা ইউসুফকে নিজের কাছে আসতে বললেন। কিন্তু হযরত ইউসুফ (আ.) শর্ত দিলেন যে, তাঁকে যে অপবাদ দেয়া হয়েছিল সে বিষয়ে তদন্ত হতে হবে এবং তাঁর নির্দোষিতার প্রমাণটি তুলে ধরতে হবে যাতে ভবিষ্যতে কেউ তাকে অপরাধী না ভাবে।

 

এ অবস্থায় রাজদরবারে এসে জোলায়খা নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করে বলে যে, আমিই ইউসুফকে অসৎ কাজের প্রস্তাব দিয়েছিলাম, কিন্তু ইউসুফ নিজেকে সৎ রেখেছে। এভাবে ইউসুফ (আ.)'র চারিত্রিক পবিত্রতা ও সততা মিশরের জনগণের কাছে প্রমাণিত হয়।

 

এরপর মিশরের রাজা ইউসুফ (আ.)-কে নিজের প্রধান উপদেষ্টা বা আজিজ পদে নিয়োগ দেন এবং দেশের নানা সমস্যা সমাধানে এই মহান নবীর সাহায্য চান। ইউসুফ নবীর সাক্ষাৎ পেয়ে রাজা বুঝতে পারেন যে এ মহান নবী অসাধারণ জ্ঞানী ও দূরদর্শী। রাজা ইউসুফ (আ.)-কে দেশের অর্থ বিভাগেরও প্রধান করেন।

হযরত ইউসুফ (আ.)'র ভবিষ্যদ্বাণী মোতাবেক ৭ বছর ধরে মিশরে ব্যাপক বৃষ্টি বর্ষণের সুবাদে সন্তোষজনক মাত্রায় ফসল ফলে। ইউসুফ (আ.) খাদ্য-শস্য সঞ্চয়ের নির্দেশ দেন এবং কেবল প্রয়োজন মাফিক শস্য নিজের জন্য রেখে বাকী শস্য সরকারের কাছে বিক্রি করতে কৃষকদের অনুরোধ জানান। ফলে গুদামগুলো খাদ্য-শস্যে ভরপুর থাকে।

 

এরপর দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে হযরত ইউসুফের ব্যবস্থাপনায় সরকার জনগণের কাছে ন্যায্য দামে ও ন্যায্য পরিমাণে শস্য সরবরাহ করে। দুর্ভিক্ষ ছড়িয়ে পড়েছিল ফিলিস্তিন ও কানানেও। ফলে ইয়াকুব নবীর (আ.) সন্তানরাও শস্য কেনার জন্য মিশরে আসতে বাধ্য হয়। ইউসুফ (আ.) নিজেই খাদ্য-সরবরাহ প্রক্রিয়ার ওপর নজর রাখতেন। ফলে তিনি ক্রেতাদের মধ্যে উপস্থিত নিজের ভাইদের চিনতে পারলেন। কিন্তু তারা ইউসুফ নবীকে (আ.) চিনতে পারেনি। তিনি তাদের অনুগ্রহ করেন এবং তাদের খোঁজ-খবর নেন। তারা বলল, 'আমরা দশ ভাই ইব্রাহিম (আ.)'র নাতি ইয়াকুব (আ.)'র সন্তান। নবী হওয়া সত্ত্বেও আমাদের বাবা তীব্র দুঃখ-বেদনার শিকার হয়েছেন। কারণ, তাঁর এক প্রিয় সন্তান আমাদের সঙ্গে খেলতে আসলে নেকড়ে বাঘ তাঁকে খেয়ে ফেলে! আমরা উদাসীন ছিলাম বলে তাঁকে রক্ষা করতে পারিনি!'

 

ইউসুফ (আ.) তাঁর ভাইদের বললেন যেভাবেই হোক দ্বিতীয়বার মিশরে আসার সময় তারা যেন তাদের সর্বকনিষ্ঠ ভাই বেনইয়ামিনকেও মিশরে নিয়ে আসে। যদি তারা তাকে না আনে তাহলে তাদের আর শস্য দেয়া হবে না বলে ইউসুফ নবী সতর্ক করে দেন। ইউসুফের নির্দেশে ভাইদের কাছে সরবরাহকৃত শস্যের ভেতরে গোপনে কিছু অর্থ দেয়া হয়। এরপর কী ঘটেছিল তা আমরা আপনাদের শোনাব এই আলোচনার আগামী পর্বে। আশা করছি তখনও আমাদের সঙ্গ দিতে ভুলবেন না। #

 

 

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন