এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
রবিবার, 06 মার্চ 2016 17:31

সুরা ইউসুফের আলোকে নবী ইউসুফ ও তাঁর বাবা এবং ভাই

সুরা ইউসুফের আলোকে নবী ইউসুফ ও তাঁর বাবা এবং ভাই

 

 

 

ইউসুফ (আ.) খাদ্যের জন্য মিশরে আগত তার ভাইদের দেখে চিনতে পারেন এবং তাদের অনুগ্রহ করেন ও খোঁজ-খবর নেন।

তারা অবশ্য ইউসুফকে চিনতে পারেনি। তারা তাঁর কাছে পিতা ইয়াকুবের (আ.) তীব্র দুঃখের কাহিনী বলতে গিয়ে ছোট ভাই ইউসুফকে বাঘে খাওয়ার সেই মিথ্যা কাহিনী তুলে ধরে। ইউসুফ (আ.) তৎক্ষণাত এ বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করেননি। বরং তাঁর ভাইদের বললেন যেভাবেই হোক দ্বিতীয়বার মিশরে আসার সময় তারা যেন তাদের সর্বকনিষ্ঠ ভাই বেনইয়ামিনকেও নিয়ে আসে। যদি তারা তাকে না আনে তাহলে তাদের আর শস্য দেয়া হবে না বলে ইউসুফ নবী সতর্ক করে দেন। ইউসুফের নির্দেশে ভাইদের কাছে সরবরাহকৃত শস্যের ভেতরে গোপনে কিছু অর্থ দেয়া হয়। কয়েকদিন পর তারা নিজ শহরে পৌঁছে।

 

ইয়াকুব (আ.)'র সন্তানরা তাদের শস্যের মধ্যে মিশরের আজিজের দেয়া উপহার পেয়ে বিস্মিত ও সন্তুষ্ট হয়। তাই তারা ছোট ভাই বেনইয়ামিনকে তাদের সঙ্গে মিশরে পাঠাতে বাবা ইয়াকুব (আ.)কে জোর অনুরোধ জানাতে থাকে। ফলে ইয়াকুব (আ.) বেনইয়ামিনকে ভাইদের সঙ্গে মিশরে যাওয়ার অনুমতি দেন। ইউসুফ (আ.) তাদের সবাইকে সসম্মানে আপ্যায়ন করেন। এরপর ইউসুফ (আ.) বেনইয়ামিনকে গোপনে জানান যে তিনি নিজেই হলেন তাঁর সেই হারানো ভাই ইউসুফ। তিনি সহদোর ছোট ভাইকে বলেন, 'তুমি দুঃখিত হয়ো না এবং ভাইদের আচরণে মন খারাপ করো না।'

 

এরপর ইউসুফ (আ.)'র নির্দেশে সরকারি কর্মচারীরা বেনইয়ামিনের শস্যের বোঝার মধ্যে একটি সোনার পেয়ালা গোপনে লুকিয়ে রাখে। ইউসুফ (আ.)'র ভাইদের কাফেলা দেশে ফেরার জন্য প্রস্তুত হলে তারা ওই পেয়ালা চুরির অপরাধে কাফেলাকে থামিয়ে দেয়। ইউসুফের ভাইরা বলল: আল্লাহর শপথ! আমরা কখনও চুরি করিনি। তখন সরকারি-কর্মচারীরা বলল, যদি তোমাদের কারো বোঝার মধ্যে ওই বাটি পাওয়া যায় তাহলে তার শাস্তি কী হবে? তখন তারা বলল: আমাদের প্রথা হল চোরকে দাস বানিয়ে রাখা হয়। ফলে শুরু হল তল্লাশি। সোনার পেয়ালা বেনইয়ামিনের বোঝার মধ্যেই আবিস্কৃত হল। এ দৃশ্য দেখে ইউসুফের ভাইদের মধ্যে যেন দুঃখের পাহাড় নেমে এল। তারা বলল, বেনইয়ামিন চোর হতেও পারে। কারণ, তার আপন ভাই ইউসুফও অতীতে একবার চুরি করেছিল! ইউসুফ এ কথা শুনে খুবই অসন্তুষ্ট হন, তবে তিনি মুখে অসন্তোষের কোনো চিহ্ন ফুটিয়ে তোলেননি।

 

ইউসুফ (আ.)'র অপরাধী ভাইরা তাঁকে বলল, 'হে মিশরের আজিজ বা রাজার প্রধান উপদেষ্টা! আমাদের বাবা খুবই বৃদ্ধ। তাই বেনইয়ামিনের পরিবর্তে আমাদের কোনো একজনকে দাস হিসেবে আটকে রাখুন। আমরা তো আপনাকে একজন ন্যায়বিচারক হিসেবেই দেখতে পাচ্ছি।' জবাবে হযরত ইউসুফ (আ.) বললেন: যার বোঝার মধ্যে পেয়ালা পাওয়া গেছে তাকে ছাড়া অন্য কাউকে আটক করা হবে অন্যায়। ফলে ইউসুফ নবীর সব সৎ ভাই বেনইয়ামিনের মুক্তির ব্যাপারে হতাশ হয়ে পড়ে। বেনইয়ামিন ছিল ইউসুফ (আ.)'র আপন ভাই। এ অবস্থায় ইউসুফ নবীর এক বড় সৎ ভাই মিশরে থেকে যায় ও অন্য ভাইদেরকে বাবা ইয়াকুব নবীর (আ.) কাছে পাঠায় যাতে তার মতামত বা নির্দেশ জানা যায়। বাবা যখন ছেলেদের মুখে বেনইয়ামিনের কথিত চুরির বিষয় ও তার আটক হওয়ার ঘটনা শুনে বললেন, না ঘটনা এমনটি নয়, বরং তোমরা নিজেরাই নিজেদের নফসের ধোঁকায় পড়েছ, আমি ধৈর্য ধরব এবং আশা করছি আল্লাহ আমার সব সন্তানকেই আমার কাছে ফিরিয়ে দেবেন।

 

হযরত ইয়াকুব (আ.) সবচেয়ে আদরের পুত্র ইউসুফকে হারিয়ে এত কাঁদতেন যে তিনি এর ফলে অন্ধ হয়ে যান। তিনি সন্তানদেরকে আবারও মিশরে ফিরে যেতে বলেন এবং তাদের সৎভাই ইউসুফ (আ.) ও বেনইয়ামিনকে খোঁজার নির্দেশ দেন। তিনি মহান আল্লাহর রহমতের ব্যাপারে নিরাশ না হতেও তাদের পরামর্শ দেন।

 

ইউসুফের ভাইরা আবারও মিশরে ফিরে যায় এবং ইউসুফের কাছে ধর্না দিয়ে বলে যে তিনি যেন তার মহানুভবতা দেখিয়ে ও বৃদ্ধ পিতার দুঃখের কথা ভেবে বেনইয়ামিনের বিষয়ে তাদের সহায়তা করেন। তারা কিন্তু তখনও ইউসুফকে চিনতে পারেনি বা ইউসুফ যে বেঁচে থাকতে পারে তা তাদের মনে উদয় হয়নি যদিও তাদের কারো কারো কাছে ইউসুফকে কিছুটা চেনা চেনা লাগছিল। এ অবস্থায় ইউসুফ (আ.) তাদের বললেন, তোমরা যখন অজ্ঞ ও মুর্খ ছিলে তখন ইউসুফ ও তার ভাই বেনইয়ামিনের সঙ্গে কী আচরণ করেছিলে তা কী তোমাদের মনে আছে? – এ কথা শোনার পরও তারা বিশ্বাস করতে পারছিল না যে সেই ইউসুফই এখন মিশরের প্রধানমন্ত্রী!!!? তাই তারা বেশ সন্দেহ নিয়েই বলল, 'তুমিই কি ইউসুফ'?

 

এ অবস্থায় ইউসুফ (আ.) সত্য প্রকাশ করে বললেন: হ্যাঁ, আমিই হচ্ছি ইউসুফ, আর ও হচ্ছে আমার ভাই বেনইয়ামিন। মহান আল্লাহ তাঁর অনুগ্রহে আমাদেরকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করেছেন। খোদাভীতি ও ধৈর্যের পুরস্কার হিসেবে মহান আল্লাহ আমাকে এই অনুগ্রহ করেছেন।

 

ইউসুফের ভাইরা বলল, আল্লাহর শপথ! আল্লাহ তোমাকে আমাদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব ও বেশি সম্মান দান করেছেন। অথচ আমরা তোমার ব্যাপারে ভুল করেছিলাম। মহান ইউসুফ (আ.) নবী বললেন, তোমরা যা করেছিলে সে জন্য আজ তোমাদের নিন্দা করব না। আমি তোমাদের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও দয়া চাইছি। আর তিনি হলেন সবচেয়ে দানশীল ও দয়াময়। এরপর ইউসুফ (আ.) তাঁর জামাটি ভাইদেরকে দিয়ে বলেন, এটি বাবার কাছে নিয়ে তাঁর চেহারায় লাগিয়ে দাও, তাহলে দেখবে যে তিনি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেয়েছেন। তারা সেটাই করে এবং ইয়াকুব নবী (আ.) দৃষ্টিশক্তি ফিরে পান ও বলেন, আমি কি তোমাদের বলিনি যে আমি আল্লাহর কাছ থেকে এমন কিছু জানি যা তোমরা জান না।

 

ইয়াকুব নবী ও তাঁর সন্তানরা ইউসুফের সঙ্গে মিলিত হতে মিশরে আসেন। ইউসুফ নবীও বাবা-মাকে অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে আসেন। সে সময় ইউসুফের আপন মা জীবিত ছিলেন না। এভাবে পিতা ও পুত্রের প্রায় ৪০ বছরের বিচ্ছেদের অবসান ঘটে এবং দুই নবীর জীবনের সুমিষ্টতম পর্বটি বাস্তবায়িত হয়। আল্লাহর ইচ্ছায় ইউসুফের বাবা-মা পরিপূর্ণ নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে মিশরে প্রবেশ করেন। ইউসুফ তাঁদেরকে মিশরের সিংহাসনে বসিয়ে সম্মান জানান। আর মহান আল্লাহর সৃষ্ট এমন পরিবেশ ও দয়ার মহত্ত্ব উপস্থিত সবাইকে এতোটা প্রভাবিত করে যে সবাই সিজদায় পড়ে আল্লাহর কৃতজ্ঞতা আদায় করেন। ইউসুফ নবী এ সময় বাবাকে বলেন, প্রিয় বাবা, এটাই হল সেই স্বপ্নের বাস্তবায়ন যা আমি শৈশবে দেখেছিলাম। মহান আল্লাহই তা বাস্তবায়ন করেছেন। #

 

 

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন