এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
রবিবার, 06 মার্চ 2016 17:41

সুরা রাদের প্রাথমিক পরিচিতি ও এই সুরার কয়েকটি আয়াতের ব্যাখ্যা

সুরা রাদের প্রাথমিক পরিচিতি ও এই সুরার কয়েকটি আয়াতের ব্যাখ্যা

 

 

 

সুরা রাদ পবিত্র কুরআনের ১৩ তম সুরা। মক্কায় অবতীর্ণ এই সুরায় রয়েছে ৪৩ আয়াত ও ৬টি রুকু।

মাক্কি সুরাগুলোয় সাধারণত ইসলামী আকিদা বা বিশ্বাসের নানা বিষয়, বিশেষ করে একত্ববাদের দিকে আহ্বন এবং শির্ক বা অংশীবাদিতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও পরকালের অস্তিত্ব থাকার প্রমাণ সম্পর্কে কথা থাকে।

 

সুরা রাদের শিক্ষণীয় কয়েকটি বিষয় হল : কুরআনের সত্যতা, সব কিছুর স্রষ্টা আল্লাহ, আল্লাহর ক্ষমতা বিষয়ে চিন্তার নির্দেশ, প্রত্যেক সম্প্রদায়ের একজন ইমাম থাকা, আল্লাহ সর্বজ্ঞ, ফেরেশতাদের দিয়ে মানুষকে রক্ষা করা ইত্যাদি। আল্লাহ কারও নিয়ামত অযথা ছিনিয়ে নেন না, সব বস্তু এমনকি বজ্রও আল্লাহর মহিমা বর্ণনা করে, সত্য ও মিথ্যার উপমা-এসবও এই সুরার আকর্ষণীয় কয়েকটি আলোচ্য বিষয়। মুমিনের বৈশিষ্ট্য, কাফিরের বৈশিষ্ট্য, অতীতের খোদাদ্রোহী জাতিগুলোর পরিণতি, আল্লাহর স্মরণ সান্ত্বনাদায়ক, তাঁর প্রতিশ্রুতি সত্যতা, তৃণ-বৃক্ষের বর্ণনা ও হযরত আলী (আ.)-এর মহত্ত্ব নিয়েও আলোচনা রয়েছে সুরা রাদে।

 

এ ছাড়াও সুরা রাদে বলা হয়েছে মানুষ যদি তার ভাগ্য বা পরিণতি পরিবর্তন করতে চায় তাহলে তাকেই এ কাজ শুরু করতে হবে। অঙ্গীকার পূরণ করা, আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক ও যোগাযোগ রক্ষা করা এবং ধৈর্য, প্রতিরোধ বা দৃঢ়তা ও দানশীলতার ওপরও জোর দেয়া হয়েছে এই সুরায়। এ সুরার শেষের দিকে কাফিরদের জন্য একটি কঠোর হুঁশিয়ারি রয়েছে।

সুরা রাদের দ্বিতীয় আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

 

(২) 'আল্লাহ তিনিই যিনি আকাশমণ্ডলীকে স্তম্ভ ছাড়াই সুউচ্চ করেছেন যা তোমরা দেখছ, এরপর তিনি আরশে তথা বিশ্ব পরিচালনার দায়িত্বে অধিষ্ঠিত হলেন এবং তিনি সূর্য-চন্দ্রকে করেছেন অধীন, প্রত্যেকেই এক নির্ধারিত মেয়াদ অবধি চলমান থাকবে। তিনিই প্রত্যেক বিষয়ের পরিচালনা করেন এবং (নিজ) নিদর্শনগুলোকে বিশদভাবে বর্ণনা করেন যাতে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সাক্ষাৎ সম্পর্কে দৃঢ় বিশ্বাস অর্জন করতে পার।'

 

এ বিশ্ব-জগত ও সৃষ্টি-জগত মহান আল্লাহর এক অসাধারণ ও অনুপম সৃষ্টি। জ্ঞান-বিজ্ঞান সৃষ্টি জগতের কিছু রহস্যের দিকে আমাদের চিন্তাকে টেনে নেয়। সুরা রাদের এই আয়াতেও সৃষ্টি বা প্রাকৃতিক জগতের রহস্যের একটি পর্দা তুলে দেয়া হয়েছে এমন এক যুগে যখন কেউই এ বিষয়ে জ্ঞান রাখতো না। কুরআন নাজিল হওয়ার যুগে প্রচলিত টলেমিয় জ্ঞান অনুযায়ী জ্ঞানীদের মহলে মনে করা হত যে আকাশগুলো পিঁয়াজের স্তরের মতই একটির ওপর অন্যটি বিন্যস্ত হয়ে আছে এবং প্রতিটি স্তর অন্য স্তরের ওপর ভর করে আছে! কিন্তু বহু শতক পর মানুষ এ সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে যে প্রতিটি গ্রহ-নক্ষত্র এক সুনির্দিষ্ট অক্ষকে কেন্দ্র করে সুনির্দিষ্ট পথে ভাসমান এবং এসবের কোনোটিই অন্য কোনোটির ওপর ভর করে নেই। আর এসবই আকর্ষণ ও বিকর্ষণের ভিত্তিতে নিজ নিজ কক্ষপথে ভাসমান রয়েছে। এভাবে কোনো স্তম্ভের বা খুঁটির ওপর ভর না করা সত্ত্বেও এক আকাশের ওপর আরেক আকাশ বা এক গ্রহের ওপর আরেক গ্রহ কখনও ভেঙ্গে পড়ছে না। অন্য কথায় কুরআনে 'স্তম্ভ ছাড়াই আকাশগুলোকে উঁচুতে টিকিয়ে রাখা'-কথাটির অর্থ হল অদৃশ্য আকর্ষণ ও বিকর্ষণ শক্তি। এই আয়াতে মহান আল্লাহর সৃষ্টি-কৌশলের রহস্য তুলে ধরার মাধ্যমে মহান আল্লাহর অশেষ মহত্ত্ব ও শ্রেষ্ঠত্বই তুলে ধরা হয়েছে।

 

বিজ্ঞানী নিউটন মাধ্যাকর্ষণ শক্তির কথা স্বীকারের পাশাপাশি এও বলেছেন যে, গ্রহ-নক্ষত্র জগতের রহস্য তুলে ধরার জন্য কেবল মাধ্যাকর্ষণ শক্তিই যথেষ্ট নয়, বরং এমন এক বিজ্ঞ ও মহাশক্তিধর উৎসকেও ব্যাখ্যায় আনা জরুরি যিনি গ্রহ-নক্ষত্রগুলোর দূরত্ব এবং সেসবের গতিশীলতার তীব্রতাকে নিখুঁতভাবে মেপে তাদেরকে নির্দিষ্ট অক্ষের চারদিকে কক্ষপথে স্থাপন করেছেন। আর সেই মহাজ্ঞানী ও মহাশক্তিধর উৎস সর্বশক্তিমান আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ নন।

 

এর পরের আয়াতে এসেছে: (৩) এবং তিনি সেই সত্তা যিনি জমিন বা ভূতলকে বিস্তৃত করেছেন এবং তাতে অটল পাহাড় ও নদ-নদী সৃষ্টি করেছেন এবং নির্ধারণ করেছেন প্রত্যেক ফলের জোড়া; তিনি রাতের (কালো) আবরণে দিনকে আবৃত করেন। নিশ্চয়ই এতে চিন্তাশীল সম্প্রদায়ের জন্য নিদর্শন আছে।

 

মহান আল্লাহ ভূমিকে মানুষ, জীব-জন্তু ও গাছপালার উপযোগী করে বিস্তৃত করেছেন। বিপজ্জনক ঢাল ও গর্তগুলোকে পাহাড়ের ধ্বস দিয়ে এবং পাথরগুলোকে মাটিতে পরিণত করে ভরাট ও সমতল করেছেন। আদিতে ভূমিতে যেসব ফাটল বা খাদ ছিল সেগুলো থাকলে মানুষ পৃথিবীতে বসবাসই করতে পারতো না।

 

এরপর সুরা রাদে পাহাড়ের প্রসঙ্গ এসেছে। কুরআনের অন্য আয়াতে পাহাড়কে পৃথিবীর কিলক বা পেরেক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মাটির ভেতর পর্যন্ত প্রোথিত পাহাড়গুলো খুঁটি বা পেরেকের মতই ভূমির ওপর বাইরের ও ভেতরের চাপকে প্রতিরোধ করে। তাই পাহাড় না থাকলে অবিরাম নড়াচড়া ও ভূমিকম্পের ফলে পৃথিবীতে জীবন-যাপন অসম্ভব হয়ে পড়ত।

 

এরপর একই আয়াতে নদ-নদীর কথা এসেছে। পাহাড় থাকার ফলে পৃথিবীর সেচ-ব্যবস্থা হয়েছে খুবই চমৎকার। পৃথিবীর অনেক পাহাড়ই বরফ আকারে পানি সংরক্ষণ করছে। এই বরফ গলে নিচের দিকে নেমে আসে পানি। এভাবে সারা বছরই পৃথিবীতে প্রাকৃতিকভাবেই সেচের কাজ হয়ে যাচ্ছে। এরপর এসেছে ফলের কথা যার পেছনে রয়েছে ভূমি বা মাটি, পানি ও সূর্যের আলোর অবদান। প্রতিটি ফল আবার দুই ধরনের। এখানে দুই ধরনের বলতে অনেকেই মনে করেন, দুই বা ততোধিক বৈশিষ্ট্যের ফল। যেমন, টক ও মিস্টি বা শুকনো ও রসালো কিংবা কাঁচা ও পাকা ফল ইত্যাদি।

 

অন্য সব জীবের মত উদ্ভিদেও ফল ধরে স্ত্রী ও পুরুষ ফুলের মিলনে। (অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রী ও পুরুষ গাছ আলাদা।) বিজ্ঞানীদের মহলে মাত্র ২০০ বছর আগেও বিষয়টিকে সার্বজনীন নিয়ম বলে মনে করা হত না। অথচ পবিত্র কুরআন ১৪০০ বছরেরও আগে এ সার্বজনীন বিধানের কথা ঘোষণা করেছে যা এ মহাগ্রন্থের অন্যতম মু'জিজা।#

 

 

 

মাধ্যম

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন