এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শনিবার, 06 জুলাই 2013 17:02

রমজান সম্পর্কে বিশ্বনবী (সা.)'র প্রাণস্পর্শী ভাষণ

 রমজান সম্পর্কে বিশ্বনবী (সা.)'র প্রাণস্পর্শী ভাষণ

“হে মানুষ! নিঃসন্দেহে তোমাদের সামনে রয়েছে আল্লাহর বরকতপূর্ণ মাস। এ মাস বরকত, রহমত বা অনুগ্রহ ও ক্ষমার মাস। এ মাস মহান আল্লাহর কাছে শ্রেষ্ঠ মাস। এ মাসের দিনগুলো সবচেয়ে সেরা দিন, এর রাতগুলো শ্রেষ্ঠ রাত এবং এর ঘণ্টাগুলো শ্রেষ্ঠ ঘণ্টা। এ মাস এমন এক মাস যে মাসে তোমরা আমন্ত্রিত হয়েছ আল্লাহর মেহমান হতে তথা রোজা রাখতে ও প্রার্থনা করতে। তিনি তোমাদেরকে এ মাসের  ভেতরে সম্মানিত করেছেন। এ মাসে তোমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাস মহান আল্লাহর গুণগান করার  বা জিকরের (সওয়াবের) সমতুল্য; এ মাসে তোমাদের ঘুম প্রার্থনার সমতুল্য, এ মাসে তোমাদের সৎকাজ এবং প্রার্থনা বা দোয়াগুলো কবুল করা হবে। তাই মহান আল্লাহর কাছে আন্তরিক ও (পাপ ও কলুষতামুক্ত) পবিত্র চিত্তে প্রার্থনা করো যে তিনি যেন তোমাদেরকে রোজা রাখার এবং কোরআন তেলাওয়াতের তৌফিক দান করেন।

 

নিঃসন্দেহে সে ব্যক্তি প্রকৃতই দুর্ভাগা বা হতভাগ্য যে রমজান মাস পেয়েও মহান আল্লাহর ক্ষমা হতে বঞ্চিত হয়। এ মাসে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার মাধ্যমে কিয়ামত বা শেষ বিচার দিবসের ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কথা স্মরণ কর। অভাবগ্রস্ত ও দরিদ্রদেরকে সাহায্য কর ও সদকা দাও। বয়স্ক ও বৃদ্ধদেরকে সম্মান কর এবং শিশু ও ছোটদেরকে আদর কর। (রক্তের সম্পর্কের) আত্মীয় স্বজনের সাথে সম্পর্ক ও যোগাযোগ রক্ষা কর।  তোমাদের জিহ্বাকে অন্যায্য বা অনুপযোগী কথা বলা থেকে সংযত রাখ, নিষিদ্ধ বা হারাম দৃশ্য দেখা থেকে চোখকে আবৃত রাখ, যেসব কথা শোনা ঠিক নয় সেসব শোনা থেকে কানকে নিবৃত রাখ। এতীমদেরকে দয়া কর যাতে তোমার সন্তানরা যদি এতীম হয় তাহলে তারাও যেন দয়া পায়।

 

গোনাহর জন্যে অনুতপ্ত হও ও তওবা কর এবং নামাজের সময় মোনাজাতের জন্যে হাত উপরে তোলো, কারণ নামাজের সময় দোয়া কবুলের শ্রেষ্ঠ সময়, এ সময় মহান আল্লাহ তাঁর বান্দাদের দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকান, এ সময় কেউ তাঁর কাছে কিছু চাইলে তিনি তা দান করেন, কেউ তাঁকে ডাকলে তিনি জবাব দেন, কেউ কাকতি-মিনতি করলে তার কাকতি মিনতি তিনি গ্রহণ করেন।

 


 হে মানুষ! তোমরা তোমাদের বিবেককে নিজ কামনা-বাসনার দাসে পরিণত করেছো, আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে একে মুক্ত করো। তোমাদের পিঠ গোনাহর ভারে ভারাক্রান্ত হয়ে আছে, তাই সেজদাগুলোকে দীর্ঘ করে পিঠকে হালকা করো। জেনে রাখ মহান আল্লাহ নিজ সম্মানের শপথ করে বলেছেন, রমজান মাসে নামাজ আদায়কারী ও সেজদাকারীদেরকে জবাবদিহিতার জন্য পাকড়াও করবেন না না এবং কিয়ামতের দিন তাদেরকে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করবেন।

 


হে মানুষেরা! তোমাদের মধ্যে কেউ যদি কোনো মুমিনের জন্য ইফতারের (দিনের রোজা শেষে যে খাদ্য গ্রহণ করা হয়)  আয়োজন করে তাহলে আল্লাহ তাকে একজন গোলামকে মুক্ত করার সওয়াব বা পুণ্য দান করবেন এবং তার অতীতের সব গোনাহ মাফ করবেন। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র সাহাবিরা প্রশ্ন করলেন: কিন্তু আমাদের মধ্যে সবাই অন্যদেরকে ইফতার  দেয়ার সামর্থ্য রাখেন না।

 


বিশ্বনবী (সা.) বললেন: তোমরা নিজেদেরকে দোযখের আগুন থেকে রক্ষা কর, যদিও তা সম্ভব হয় একটি মাত্র খুরমার অর্ধেক অংশ কিংবা তাও যদি না থাকে তাহলে সামান্য পানি অন্য রোজাদারকে ইফতার হিসেবে আপ্যায়নের মাধ্যমে।

 


হে মানুষেরা! যে কেউ এই মাসে সত আচরণের চর্চা করবে তথা নিজেকে সুন্দর আচরণকারী হিসেবে গড়ে তুলবে সে পুলসিরাত পার হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করবে সেই বিশেষ দিনটিতে তথা কিয়ামতের দিন যেদিন পাগুলো পিছলে যেতে চাইবে। (পুলসিরাত হল এমন এক সেতু যা দোযখের প্রান্ত বা ওপর দিয়ে বেহেশতের সঙ্গে যুক্ত)  যে কেউ এই মাসে তার অধীনস্থ কর্মীদের কাজের বোঝা কমিয়ে দেবে আল্লাহ পরকালে তার হিসাব-নিকাশ সহজ করবেন এবং যে কেউ এই মাসে অন্যকে বিরক্ত করবে না মহান আল্লাহ তাকে কিয়ামত বা বিচার-দিবসের দিন নিজের ক্রোধ থেকে নিরাপদ রাখবেন। যে কেউ  কোনো রমজান মাসে  কোনো এক এতীমকে সম্মান করবে ও তার সঙ্গে দয়ার্দ্র আচরণ করবে মহান আল্লাহও বিচার-দিবসে তার প্রতি দয়ার দৃষ্টি দেবেন। যে এই মাসে নিজের আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে ভালো আচরণ করবে, মহান আল্লাহও বিচার-দিবসে তার প্রতি দয়া করবেন, আর যে এই মাসে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে খারাপ আচরণ করবে আল্লাহও তাকে নিজ দয়া বা রহমত থেকে দূরে রাখবেন।

 


যে রমজান মাসে  (এ মাসের জন্য) নির্দেশিত বা নির্দিষ্ট ইবাদতগুলো করবে আল্লাহ তাকে  দোযখের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। যে এই মাসে ফরজ বা অবশ্য পালনীয়  ইবাদত বা দায়িত্বগুলো পালন করবে তাকে অন্য মাসে ওই একই কাজের পুরস্কারের চেয়ে সাতগুণ বেশি পুরস্কার দেয়া হবে। যে রমজান মাসে আমার ওপর সালাওয়াত বা দরুদ পাঠাবে আল্লাহ বিচার দিবসে তার ভাল কাজের পাল্লা ভারী করে দেবেন, অথচ অন্যদের পাল্লা হাল্কা থাকবে।

 


যে এই মাসে পবিত্র কুরআনের মাত্র এক আয়াত তিলাওয়াত করবে আল্লাহ তাকে  এর বিনিময়ে এত সওয়াব দেবেন যে তা অন্য মাসে পুরো কুরআন তিলাওয়াতের সমান হবে।

 

হে মানুষেরা! বেহেশতের দরজাগুলো এই মাসে তোমাদের জন্য খোলা থাকবে। আল্লাহর কাছে এমনভাবে প্রার্থনা কর যাতে তা তোমার জন্য বন্ধ হয়ে না যায়। রমজান মাসে দোযখ বা নরকের দরজাগুলো বন্ধ রয়েছে, আল্লাহর সমীপে এমনভাবে প্রার্থনা কর যাতে তা তোমার জন্য কখনও খুলে না যায়। এই মাসে শয়তানগুলোকে হাতকড়া পরিয়ে বন্দী রাখা হয়েছে, আল্লাহর কাছে এমনভাবে প্রার্থনা কর যাতে তারা তোমাদের ওপর কর্তৃত্ব করতে না পারে।"

 

 

 এ পর্যায়ে আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)বললেন : আমি প্রশ্ন করলাম, " হে আল্লাহর রাসূল, এই মাসে সবচেয়ে ভাল আমল বা কাজ কী?" 

তিনি জবাবে বললেন, " হে আবুল হাসান, এই মাসে সবচেয়ে ভাল আমল বা কাজ হল আল্লাহ যা যা নিষিদ্ধ বা হারাম করেছেন তা থেকে দূরে থাকা।"

 

 

 এরপর আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)প্রশ্ন করলেন: " হে আল্লাহর রাসূল, আপনি কেন কাঁদছেন? এর জবাবে বিশ্বনবী (সা.) বহু বছর পর রমজান মাসে হযরত আলী (আ.)'র মর্মান্তিক শাহাদতের ভবিষ্যদ্বাণীর কথা উল্লেখ করলেন। রাসূল (সা.) বললেন, "হে আলী, এই মাসে তোমার ওপর যা আপতিত হবে তার জন্য আমি কাঁদছি। (আমি নিজেকে কল্পনা করছি) তোমার স্থানে যখন তুমি আল্লাহর সমীপে প্রার্থনা করছ এবং সামুদ জাতির কাছে পাঠানো (খোদায়ী) উটের পা (উটটি ছিল হযরত সালেহ -আ. 'র নবুওতি মিশনের সপক্ষে খোদায়ী মোজেজা) কর্তনকারী লোকটির মতই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে নিকৃষ্ট ব্যক্তিটি তোমার মাথার ওপর আঘাত হানবে এবং তোমার দাড়ি তাতে (রক্তে) রঞ্জিত হবে।"

 

 নিজের শাহাদতের ভবিষ্যদ্বাণীর কথা শুনে সব কিছুর আগে আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)'র মনে যে চিন্তাটির উদয় হয়েছিল তা এই বস্তু-জগত সম্পর্কিত ছিল না, বরং তা ছিল নিজের ঈমান সম্পর্কিত। তাই তিনি প্রশ্ন করলেন: " হে আল্লাহর রাসূল, সে সময় কী আমার ঈমান নিরাপদ থাকবে? (অর্থাত আমি কী ঈমানের ওপর অবিচল থাকব?)" রাসূল (সা.) বললেন: " হ্যাঁ, সে সময় তোমার ঈমান নিরাপদ থাকবে।"

 

বিশ্বনবী (সা.) আরো বলতে লাগলেন, আর তাঁর সাহাবিরা শুনছিলেন বিস্মিত হয়ে।

 

 রাসূল (সা.) বললেন: " হে আলী, যে তোমাকে হত্যা করে সে (বাস্তবে) আমাকে হত্যা করল, যে তোমাকে বিরক্ত করে সে আমাকে বিরক্ত করল এবং যে তোমার অবমাননা করল সে আমার অবমাননা করল, কারণ তুমি আমার আত্মা বা প্রাণের সমতুল্য। তোমার ও আমার মানসিকতা এবং স্বভাব অভিন্ন। নিঃসন্দেহে প্রশংসিত ও গৌরবান্বিত আল্লাহ প্রথমে আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং এরপর সৃষ্টি করেছেন তোমাকে, তিনি প্রথমে বেছে নিয়েছেন আমাকে এবং এরপর বেছে নিয়েছেন তোমাকে। আল্লাহ আমাকে নবুওতের জন্য মনোনীত করেছেন, আর তোমাকে মনোনীত করেছেন ইমামতের জন্য। আর যে তোমার ইমামতকে অস্বীকার করবে সে (কার্যত) আমার নবুওতকে প্রত্যাখ্যান করল। হে আলী, তুমি আমার উত্তরাধিকারী এবং আমার সন্তানদের (নাতী-নাতনীর) পিতা এবং আমার কন্যার স্বামী এবং আমার উম্মতের জন্য আমার জীবদ্দশায় ও আমার মৃত্যুর পর আমার প্রতিনিধি বা খলিফা। তোমার নির্দেশ হল আমারই নির্দেশ এবং তোমার নিষেধাজ্ঞা হল আমারই নিষেধাজ্ঞা। সেই শক্তির শপথ করে বলছি যেই শক্তি আমাকে নবুওত দান করেছেন এবং আমাকে শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি হিসেবে তৈরি করেছেন, তুমি হচ্ছ সৃষ্টিকুলের জন্য হুজ্জাতুল্লাহ বা আল্লাহর নিদর্শন এবং তাঁর রহস্যগুলোর আমানতদার বা ট্রাস্টি ও সৃষ্টিকুলের ওপর আল্লাহর খলিফা।"

 

 

 (সূত্র: এই বিখ্যাত ও পবিত্র হাদিসটি বর্ণনা করেছেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ-সা.'র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য ও অষ্টম ইমাম হযরত ইমাম রেজা-আ.। হাদিসটির বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতা সূচিত হয়েছে আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী –আ.'র মাধ্যমে যিনি সরাসরি রাসূল-সা.'র এই ভাষণ শুনেছিলেন। ভাষণটি বিশ্বনবী-সা. দিয়েছিলেন কোনো এক শাবান মাসের শেষ শুক্রবারে) #

 

রেডিও তেহরান/এএইচ/৭

           

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন