এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
রবিবার, 02 জুন 2013 15:16

বিশ্বনবী (সা.)'র আদর্শ ও ইমাম খোমেনী (র.)

১৯৮৯ সালের চৌঠা জুন সমকালীন বিশ্ব-ইতিহাসের  ও  বিশেষ করে ইসলামী এবং মানবতার মুক্তিকামী জাগরণের ইতিহাসে এক অতি শোকাবহ দিন। এই দিনে ইন্তেকাল করেছেন এমন একজন মহান ব্যক্তিত্ব যিনি ছিলেন আধুনিক বিশ্বে  কিংবদন্তীতুল্য ইসলামী বিপ্লব ও ইসলামী রাষ্ট্রের রূপকার এবং ইরানের অবিসম্বাদিত নেতা ও মুক্তিকামী জাতিগুলোর জন্য অনুকরণীয় আদর্শ প্রবাদ-পুরুষ।

এই মহান নেতার মৃত্যু বার্ষিকী উপলক্ষে সবাইকে জানাচ্ছি গভীর শোক ও সমবেদনা।  

 

ইমাম খোমেনী (র.)’র ব্যাপক দূরদৃষ্টি ও ইস্পাত-কঠিন খোদায়ী সংকল্প তাঁকে দিয়েছে কিংবদন্তীতুল্য জনপ্রিয়তা। কেবল তাঁর নামই কিংবা তাঁর মুখনিঃসৃত প্রতিটি কথায় টগবগ করে উঠত বিপ্লবী জনতার রক্ত এবং হৃদয়। আর এই সব কিছুরই প্রধান কারণ হল ইমাম তাঁর কর্মততপরতা,কর্মকৌশল ও আচার-আচরণে বিশ্বনবী (সা.)'র  প্রকৃত সুন্নাত অনুসরণ করেছেন এবং খাটি মুহাম্মাদি ইসলামের চেতনায় জাগিয়ে তুলেছিলেন ইরানের আলেম সমাজ ও জনগণকে।

 

মরহুম ইমাম খোমেনী প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক চিন্তাধারা বা মতাদর্শের মোকাবেলায় ইরানের মুসলিম সমাজে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করেছেন। ইমামের খোদাভীতি ও একনিষ্ঠতাও ছিল বিশ্বনবী (সা.)’র নুরানি আদর্শের প্রতিফলন।  ফলে তাঁর নেতৃত্ব বা দিক-নির্দেশনার সুবাদে ঈমান ও আধ্যাত্মিকতার প্রেরণায় ইরানি জাতি এতটা উজ্জীবিত হয়েছিল যে তাদের সব স্তরে,বিশেষ করে যুব সমাজের মধ্যে জিহাদ ও শাহাদতের সংস্কৃতির বিস্ময়কর প্রভাব বিশ্ববাসীকে অভিভূত করে।

 

ইমাম খোমেনী (র.) নারীর মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বিশ্বনবী (সা.)’র আদর্শকে তুলে ধরতেন। আধুনিক যুগে পশ্চিমা শিক্ষার প্রভাবে অনেক মুসলমানের দৃষ্টিতে ও বিশেষ করে পাশ্চাত্যে নারীর জন্য গৃহিনী বা সংসারী হওয়াকে সেকেলে ও পশ্চাতপদ বিষয় বলে বিবেচনা করা হয়। অথচ বিশ্বনবী (সা.) যখন তাঁর সাহাবিদের প্রশ্ন করেছিলেন,কোন্ মুহূর্তে নারী আল্লাহর বেশি নৈকট্য অর্জন করে?- এবং সাহাবিদের কেউই যখন এই প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারছিলেন না তখন নবী-নন্দিনী হযরত ফাতিমা (সালামুল্লাহি আলাইহা) বলেছেন, এটা হচ্ছে সেইসব মুহূর্ত যখন নারী ঘরে থেকে সাংসারিক কাজকর্ম ও সন্তানদের শিক্ষাদান এবং প্রতিপালনে লিপ্ত থাকে।

 

মরহুম ইমামও তাঁর পূর্বপুরুষের এই আদর্শ তথা ঘরের মধ্যে নারীর মাতৃত্বের ও স্বামীকে সাহায্য করার ভূমিকাকে নারীর অন্য যে কোনো ভূমিকার চেয়ে বেশি গুরুত্ব  দিয়ে বলতেন:

 

“নারীর গৃহস্থালি ভূমিকাকে ছোট মনে করবেন না,সন্তানকে সুশিক্ষিত করা সমাজের জন্য বড় ধরনের খেদমত। নারীর ভালবাসা অন্যদের চেয়ে বেশি এবং তাদের স্নেহ ও ভালবাসাই পরিবারকে জোরদার ও স্থায়ী করে।”

 

ইমাম খোমেনী (র.) সন্তান প্রতিপালনের ক্ষেত্রে নিজেই স্ত্রীকে সহযোগিতা করতেন। তাঁর স্ত্রী বলেছেন,রাতে বাচ্চারা যখন খুব কাঁদত ও সকাল পর্যন্ত জেগে থাকত, তখন ইমাম সময়কে ভাগ করে নিয়ে পালাক্রমে বাচ্চাদের দেখাশুনা করতেন। যেমন,ইমাম নিজে দুই ঘণ্টা জেগে থেকে বাচ্চাদের দেখাশুনা করতেন, আর এর পরের দুই ঘণ্টা বিশ্রাম নিতেন,আর এ সময় তাঁর স্ত্রী বাচ্চাদের দেখাশুনার জন্য জেগে থাকতেন। পরের দুই ঘণ্টায় আবার বাচ্চাদের দেখাশুনা করতেন ইমাম নিজে এবং স্ত্রী বিশ্রাম নিতেন। এভাবে তারা দুজন পালাক্রমে বিশ্রাম করতেন।

 

বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন,নেক সন্তান বা সুসন্তান হল বেহেশতের ফুল। তাদেরকে আনন্দের মধ্যে রাখা ও প্রতিভা বিকাশের সুযোগ দেয়া খুবই জরুরি। ইমাম খোমেনী (র.)ও সন্তান প্রতিপালনের সঠিক ও ইসলামী নীতি মেনে চলার ক্ষেত্রে ছিলেন খুবই যত্নশীল এবং সদা-সতর্ক। ইমামের এক কন্যা তার  শিশু সন্তানের শিশুসুলভ অতিরিক্ত অস্থিরতা বা চপলতার ব্যাপারে বাবার কাছে অভিযোগ করলে ইমাম বলেন,

"ওর দুষ্টুমি সহ্য করার জন্য যে সওয়াব বা পুণ্য তুমি পাচ্ছ তুমি যদি সেই সওয়াবগুলো আমাকে দাও তাহলে আমি আমার ইবাদতের সব সওয়াব তোমাকে দিয়ে দিতে প্রস্তুত!"

 

বিশ্বনবী (সা.) শিশুদের খুবই ভালবাসতেন,তাদের চুমু খেতেন এবং শিশুদেরকে এভাবে ভালবাসতে অন্যদেরও  পরামর্শ দিতেন। রাসূল (সা.) শিশুদের জন্য ঘোড়ার মত আনত হয়ে তাদেরকে আনন্দ দিতে গিয়ে কখনও কখনও নামাজের জামায়াতে উপস্থিত হতে দেরি করেছেন। শিশুদের জন্য ঘোড়া হতে অন্য সাহাবিদেরও নির্দেশ দিতেন বিশ্বনবী(সা.)। একবার খুব জরুরি কাজ থাকায় রাসূল(সা.)’র পরামর্শে এক সাহাবি শিশুদের বললেন তোমাদের ঘোড়া বিশ্বনবী (সা.)সহ অন্য ঘোড়াগুলোকে কেনা হবে খেজুরের বিনিময়ে। মূল্য হিসেবে কে কত খেজুর চাও? শিশুরা খেজুরের বিনিময়ে তাদের ঘোড়া বিক্রি করতে রাজি হয়।

রাসূল (সা.) শিশুদের আনন্দ দেয়ার  গুরুত্ব তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন,

 

"যে তার কন্যা শিশুকে আনন্দ দেবে সে হযরত ঈসমাইল (আ.)’র একজন বংশধরকে মুক্ত করার সওয়াব পাবে। আর যে তার শিশু পুত্রকে আনন্দ দেবে সে হবে এমন ব্যক্তির মত যে নিজেকে আল্লাহর শাস্তির ভয় থেকে মুক্ত করেছে। আর এমন ব্যক্তির পুরস্কার হল বেহেশত।"

 

মরহুম ইমাম খোমেনী (র.) ছিলেন অনাড়ম্বর জীবন-যাপনে অভ্যস্ত। ছাত্র জীবনে, কিংবা বিশ্বের মুসলমানদের বিশিষ্ট নেতা হওয়ার সময় এবং রাষ্ট্রের কর্ণধার থাকাকালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি বিশ্বনবী (সা.)’র এই সুন্নাত মেনে চলেছেন। বিশ্বের বড় বড় দেশের নেতা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিরা ইমামের বাসভবনের অতি সাধারণ অবস্থা দেখে বিস্মিত হতেন।

 

বিশ্ব ইতিহাসের গতি পরিবর্তনকারী এক অসাধারণ,বরেণ্য ও শক্তিশালী নেতা হওয়া সত্ত্বেও ইমাম ছিলেন সদালাপী,অত্যন্ত বিনয়ী ও নিরহংকার। তিনি কখনও ক্ষিপ্ত হতেন না। বরং মানুষের সঙ্গে রসিকতাও করতেন। তিনি বলতেন,আমি জনগণের একজন সেবক মাত্র,আমাকে নেতা না বলে সেবক বলাই ভাল হবে।

 

বৃদ্ধ হওয়ার কারণে সরাসরি জিহাদে অংশ নিতে না পারার জন্য তিনি মুজাহিদদের কাছে নিজের গভীর লজ্জার কথা উল্লেখ করতেন। ইমাম কিশোর মুজাহিদ ও শহীদ হোসাইন ফাহমিদের প্রশংসা করে নিজের বিনয় প্রকাশ করেছিলেন এভাবে:

 

"১২ বছরের এই কিশোর আমাদের নেতা,তার ক্ষুদ্র হৃদয়টির দাম আমাদের শত শত বক্তব্য ও কলমের চেয়ে মূল্যবান;সে তার ক্ষুদ্র বুকে গ্রেনেড পেতে শত্রুর ট্যাংকের নীচে শুয়ে ট্যাংকটি ধ্বংস করে শাহাদতের শরবত পান করেছে।"

 

যাঁদের হৃদয়ে থাকে প্রকৃত ঈমান ও যারা উপযুক্ত সত কর্ম করে থাকেন মানুষের অন্তরে তাঁদের জন্য ভালবাসা সৃষ্টি করবেন বলে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনের সুরা মরিয়মের ৯৮ নম্বর আয়াতে উল্লেখ করেছেন। শত সহস্র বছর পরও বিশ্বনবী (সা.) এবং তার পবিত্র আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি মুসলমানদের হৃদয়ের গভীর ভালবাসাই এর প্রমাণ।

 

ইমাম খোমেনী(র.)’রও বহুমুখী প্রতিভা এবং অত্যন্ত উচ্চ পর্যায়ের নানা গুণ সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে যাচ্ছেন দেশি-বিদেশী,মুসলিম ও অমুসলিম অনেক ব্যক্তিত্ব।

 

আল্লাহর প্রতি ইমাম খোমেনী (র.)'র সুগভীর নির্ভরতা থেকে উদ্ভূত তাঁর নানা বক্তব্য এবং এই গভীর আস্থার ফলে সৃষ্ট তাঁর সদা-প্রশান্ত চিত্ত পরিদর্শকদের মুগ্ধ করত। তাই বাহ্যিক দৃষ্টিতে ইমামের অনেক কথা খুব সাধারণ মনে হলেও শ্রোতাদের মধ্যে তা গভীর প্রভাব ফেলত। তিনি ইরানের ওপর সাদ্দামের সর্বাত্মক হামলাকে খুবই সাধারণভাবে তুলে ধরে বলেছিলেন: এক চোর এসে একটা ঢিল মেরে পালিয়ে গেছে। 

 

ইমামের এ ধরনের সহজ-সরল বক্তব্য অলৌকিক আলোর ঝর্ণাধারার মতই মানুষের অন্তরে গভীর প্রভাব ফেলত ও বয়ে আনত বিস্ময়কর প্রশান্তি।#

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন