এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 19 আগস্ট 2014 18:39

কেন ইসলাম ইমাম জা'ফর আস সাদিক (আ.)'র কাছে চিরঋণী?

১৪৮ হিজরির ২৫ শাওয়াল ইসলামের ইতিহাসে এক গভীর শোকাবহ দিন। কারণ, এই দিনে শাহাদত বরণ করেন মুসলিম বিশ্বের প্রাণপ্রিয় প্রবাদপুরুষ ইমাম আবু আব্দুল্লাহ জাফর আস সাদিক (আ.)। ইসলাম ও এর প্রকৃত শিক্ষা তাঁর কাছে চিরঋণী। 

 

ইমাম সাদিক (আ.) আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের শাসনামলে ৮২ হিজরির ১৭ই রবিউল আউয়ালে মদিনায় জন্ম গ্রহণ করেন। সে সময় মুসলিম বিশ্বে চলছিল নিষ্ঠুর ও স্বৈরাচারী শাসকদের রাজত্ব। ইসলামী ভূখণ্ডের যে প্রান্তেই তাদের অপকর্মের প্রতিবাদ করা হত সেখানেই উম্মতের নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষদের নির্দ্বিধায় হত্যা করা হত। এ সময় ইসলামের প্রকৃত বাণী তুলে ধরাই ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। 

 

কিন্তু ইসলামের সেই মহাদুর্দিনে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবন, সংরক্ষণ, বিকাশ এবং মুসলিম সমাজের সংস্কারের ক্ষেত্রে কাণ্ডারি হিসেবে আবির্ভূত হন বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য ইমাম জাফর সাদিক (আ.)। তাঁর মহান আত্মার প্রতি অশেষ দরুদ ও সালাম পেশের পাশাপাশি সবাইকে জানাচ্ছি গভীর শোক ও সমবেদনা। এই মহান ইমামের কিছু অমূল্য অবদান ও তাঁর অনুপম চরিত্রের নানা দিক তুলে ধরব এ প্রবন্ধে।  

   

ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.) মুসলমানদের সব মাজহাবের কাছেই বরেণ্য ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব হওয়ায় তাঁর আদর্শ হতে পারে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের সূত্র। চারজন সুন্নি ইমামের মধ্যে একজন তাঁর প্রত্যক্ষ ছাত্র এবং আরো দুই জন সুন্নি ইমাম তাঁর পরোক্ষ ছাত্র ছিলেন। উল্লেখ্য শিয়া মাজহাব ইমাম জাফর সাদেক (আ) এর জ্ঞান থেকে বিরতিহীনভাবে গ্রহণ করে হৃষ্টপুষ্ট ও সমৃদ্ধ হয়েছে, যে কারণে শিয়া মাজহাব 'জাফরি মাজহাব' হিসেবেও খ্যাত। 

 

শেইখ আব্দুর রহমান নাকশবান্দি তার ‘আল ইকদুল ওয়াহদি’ গ্রন্থে আহলে বাইতকে স্মরণ করে বলেছেন: তাঁরা হলেন আমাদের ধর্মের তরিকা, আমাদের শরীয়তের উৎস এবং সাহাবীদের মধ্যে দৃঢ়-স্তম্ভ স্বরূপ। ইসলাম তাঁদের মধ্যে আবির্ভূত ও প্রকাশিত হয়েছে।  ইসলামের ভিত্তি তাদের মাধ্যমে সুপ্রতিষ্ঠিত ও বিস্তার লাভ করছে। এ কারণেইে মহানবী (সা.) বলেছেন: নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মধ্যে এমন কিছু রেখে যাচ্ছি যা তোমরা আঁকড়ে ধরলে কখনও বিপথগামী হবে না : আল্লাহর কিতাব ও আমার বংশধর আহলে বাইত। সুতরাং লক্ষ্য রাখ আমার পর কিভাবে এ দু'য়ের সাথে আচরণ করছ। তিনি আরো বলেন, দরুদ ও সালাম পড়ার সময় যে পূর্ণ মাত্রায় সাওয়াব লাভে সন্তুষ্ট হতে চায় সে যেন বলে: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলিহি, অর্থাৎ হে আল্লাহ, মুহাম্মাদ ও তাঁর বংশধরদের ওপর দরুদ বর্ষিত হোক। ইমাম শাফেয়ী থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নামাজের শেষ রাকাতের তাশাহুদ শেষে দরুদ পড়া ওয়াজিব। 

 

রাসুলের  আহলে বাইত বা পবিত্র বংশধরের মর্যাদা এত  বেশি যে, সুন্নি ইমাম শাফেয়ী তার প্রসিদ্ধ কবিতায় বলেছেন:

 “হে মহানবী (স.) এর বংশধর! আপনাদের প্রতি ভালোবাসা একটি ফরজ কাজ যা মহান আল্লাহ কুরআনে অবতীর্ণ করেছেন। আপনাদের মাহাত্ম্য প্রমাণের ক্ষেত্রে এতটুকুই যথেষ্ট যে,  যে ব্যক্তি তোমাদের ওপর দরুদ পড়বে না তাঁর (আল্লাহর রাসূলের) জন্যও  সে দরুদ পড়েনি।”

 

 ইমাম সাদিক (আ.) রিসালাতের কোলে তথা রাসূলের বংশ-ধারায় জন্ম নেন এবং বিশ্বনবী (সা.)'র আহলে বাইতের ঘরেই বেড়ে ওঠেন। তিনি নিজ দাদা ও বনি হাশিমের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি ইমাম আলী ইবনে হুসাইন জাইনুল আবেদীন (আ.) এবং পিতা ইমাম মুহাম্মাদ বাকির (আ.)-এর মাধ্যমে প্রশিক্ষিত হন। তিনি বারো বছর ধরে (অন্যান্য বর্ণনামতে ১৫ বছর বা  ১৬ বছর) দাদার সান্নিধ্য এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর ইমাম সাদিক (আ.) নিজ পিতা ইমাম বাকির (আ.)-এর তত্ত্বাবধানে উনিশ বছর শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং অবশেষে তাঁর মৃত্যুর পর ইমামতের মহান দায়িত্ব গ্রহণ করেন। 

 

ইমাম সাদিক (আ.) এমন এক সমাজে বড় হন যেখানে মানুষ কেবল অত্যন্ত গোপনে ও সতর্কতা অবলম্বন করে বিশ্বনবী (সা.)'র আহলে বাইতের সাথে যোগাযোগ করতে পারত। 

 

ইমাম সাদিক (আ.) যখন যুবক ছিলেন তখন পারস্পরিক চাওয়া-পাওয়া এবং চিন্তাধারাগুলোর মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছিল এবং হিংসা-বিদ্বেষ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। মানুষের জীবনের কোন মূল্য ছিল না এবং ধর্মকেও অবমাননা করা হত। আর জনগণ ছিল কেবলই শাসকদের লক্ষ্যে পৌঁছার হাতিয়ার।

 

সবচেয়ে বেশী যাদের ওপর দমন নিপীড়ন চালানো হতো তারা হল রাসূল (সা.)-এর আহলে বাইতের সমর্থক ও অনুসারীরা। আলী (আ.)-কে গালি দেয়া ছিল আহলে বাইতের শত্রুদের কাছে ফরজ আমলের পূর্ণতাদায়ক মুস্তাহাব! আর এ বিষয়টি ছিল মহানবী (সা.)-এর আহলে বাইতের জন্য চরম মর্মবেদনার কারণ। কিন্তু তাঁরা ধৈর্যশীলদের জন্য মহান আল্লাহর মহাপুরস্কারের প্রতিশ্রুতির কারণে এই কষ্ট সহ্য করতেন। ইমাম সাদিক (আ.) তাঁর কৈশোর ও যৌবনে এ ঘটনা প্রবাহের সাক্ষী ছিলেন এবং তাঁর বাবার কাছ থেকে এ ধরনের বাস্তবতাকে মোকাবিলার শিক্ষা পেয়েছিলেন। যখন তাঁকে তার বাবা ইমাম বাকির (আ.)-এর সঙ্গে সব অন্যায় ও অবিচারের কেন্দ্র সিরিয়ায় জোর কোরে নিয়ে যাওয়া হয় তখন থেকে তাঁর ওপরও বনি উমাইয়ার শত্রুতার ঝড় বইতে থাকে। 

 

পরিবেশ এতটা প্রতিকূল হওয়া সত্ত্বেও ইমাম সাদিক (আ.) সত্য বলতে কুণ্ঠিত হতেন না এবং মানুষকে সঠিক পথের দিক নির্দেশনা দান থেকে বিরত থাকতেন না। তিনি তাদেরকে সবসময় জালিম শাসককে সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিতেন, শাসকদের পক্ষ থেকে নিয়োজিত বিচারকদের শরণাপন্ন হতে নিষেধ করতেন এবং সরকারী যে কোন পদ গ্রহণে নিরুৎসাহিত করতেন। ইমাম সাদিক (আ.)-এর সময় যাইদ ইবনে আলী (আ.) উমাইয়া শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। যখন যাইদ শহীদ হন ইমাম (আ.) প্রকাশ্যে তাঁর প্রশংসা ও তাঁর হত্যাকারীদের লানত করেন। যাইদ ইবনে আলীকে হত্যার পর হিশাম ইবনে আব্দুল মালিক হযরত আলী (আ.)-এর বংশধরদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করতে থাকে। এ ছাড়াও সে নানা পন্থায় ইমাম সাদিক (আ.)-এর ওপর সংকীর্ণতা আরোপ করে। কিন্তু মহান আল্লাহর কৃপায় বনি উমাইয়াদের এইসব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মহানবী (সা.)-এর আহলে বাইতের প্রতি জনগণের ভালবাসা বাড়তেই থাকে।

 

বনি উমাইয়াদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব জোরদার হওয়ার সুযোগে আব্বাসীয়রা ১৩২ হিজরিতে উমাইয়া শাসনের পতন ঘটায়। তারা জনগণকে এ কথা বলে আন্দোলনে শামিল করেছিল যে, উমাইয়াদের পতন ঘটলে তারা নবী(সা.)'র বংশকেই তথা আহলে বাইতকে ক্ষমতায় বসাবে ও কারবালার ঘটনার প্রতিশোধ নেবে। কিন্তু উমাইয়াদের পতনের পর তারা নিজেরাই ক্ষমতা দখল করে এবং নবী-বংশের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেব দেব করে বহু বছর পার করার পর এটা বলে যে নবী বংশ বলতে তারা নিজেদের তথা বনি-আব্বাসকেই বুঝিয়েছিল। 

 

 জনগণ বুঝতে পারে যে তারা প্রতারিত হয়েছে। প্রথম আব্বাসিয় শাসক সাফফাহ তার ক্ষমতা কিছুটা সংহত করার পর নিজের ভাই মনসুর দাওয়ানিকির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে।

 

বনি উমাইয়ার শক্তির ভিত দুর্বল হওয়া ও অন্যরা পর্যাপ্ত শক্তি ও ক্ষমতার অধিকারী না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী এ অবস্থাটি  ইমাম সাদিক (আ.)-এর জন্য সুবর্ণ এক সুযোগ এনে দেয়। ইমাম এ বিষয়টি পূর্ণরূপে অনুভব করে তীব্র কষ্ট পেতেন যে, দীর্ঘ দিনের বিচ্যুতি ও অনাচার ইসলামকে এতোই বদলে দিয়েছে যে তা অন্তঃসারশূন্য ও আচারসর্বস্ব এক ধর্মে পরিণত হয়েছে। এ কারণে তিনি মানুষকে হেদায়াত এবং ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও বিধিবিধান প্রচারের লক্ষ্যে তাঁর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দ্বার উন্মোচন করেন। 

 

এ সময়ে ইমাম সাদিক (আ.)-এর ঘর ছিল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মত ছিল যেখানে বড় বড় মনীষীরা তাঁর কাছে হাদিস, তাফসির, দর্শন ও কালাম শাস্ত্র শিখতেন। তাঁর ক্লাসে সাধারণত দুই হাজার প্রসিদ্ধ আলেম অংশ নিতেন। কখনও কখনও এ সংখ্যা চার হাজারে পৌঁছাত।  হাদিস বর্ণনাকারী এবং জ্ঞান পিপাসুরা তাঁর কাছ থেকে শেখার জন্য দূর দূরান্ত থেকে মদীনায় আসত। কারণ ঐ সময় তিনি সতর্ক প্রহরা ও নজরবন্দী অবস্থায় ছিলেন না। তাঁর বিশেষ ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন বনি হারিস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব ও বনি হাসান ইবনে হাসান ইবনে আলী (আ.)। 

 

ফিকাহ শাস্ত্র ও হাদিস বিষয়ক জ্ঞানের বিশিষ্ট ও প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের অনেকেই তাঁর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। যেমন, ইয়াহিয়া ইবনে সাঈদ আনসারী, ইবনে জারিহ, মালিক ইবনে আনাস, সুফিয়ান সওরী, ইবনে উয়াইনা, আবু হানিফা, শোবা, আইয়ুব সাজেস্তানি ও অন্যান্যরা। তাঁরা সবাই ইমাম সাদিক (আ.)-এর ছাত্র হওয়ার কারণে গর্ব করতেন। ইমাম সাদিক (আ.)-এর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। কারণ তিনি তাঁর সময়ে শিক্ষা ও চিন্তার বিকাশ আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনিই প্রথম ব্যক্তি হিসাবে ইসলামে দর্শন শাস্ত্রের প্রবর্তন করেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে কেবল ফিকাহ শাস্ত্রের বিভিন্ন মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতারাই ছিলেন না বরং হিকমত ও দর্শনের অনুরাগীরাও ইসলামী বিশ্বের সকল প্রান্ত থেকে তাঁর কাছে আসতেন। 

 

হাদিস শাস্ত্রে ইমামের অবস্থান এত উচ্চে ছিল যে, যে কোন হাদিসের বর্ণনায় তাঁর নামের উল্লেখই ঐ হাদিসটির বিশুদ্ধতার প্রমাণ বলে বিবেচিত হত।  এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন যে, তিনি কুফার মসজিদে নয়শত ধর্মীয় পণ্ডিত ও ধর্ম প্রাণ ব্যক্তিকে দেখেছেন যে তারা সকলে বলছিল : জাফর ইবনে মুহাম্মাদ আমাকে এটা বলেছেন।

 

সাফফাহর পর তার ভাই মনসুর দাওয়ানিকি ক্ষমতা গ্রহণ করলেও জনগণ নবী-বংশকেই শাসন-ক্ষমতার জন্য প্রকৃত যোগ্যতার অধিকারী বলে মনে করতো।

তাছাড়া মদীনার আলেমরাও প্রকাশ্যে আব্বাসীয়দের হাতে বাইয়াত করা হারাম বলে ফতোয়া দিতেন। তবে যে বিষয়টি মানসুরকে বেশি উদ্বিগ্ন করেছিল তা হল আলী (আ.)'র বংশধরদের কার্যক্রম বিশেষত তাদের শীর্ষ ব্যক্তি জাফর ইবনে মুহাম্মাদ আস সাদিক (আ.)-এর ভূমিকা। মানসুর ইমামকে জব্দ করা ও দমিয়ে রাখার জন্য সব ক্ষমতার অপব্যবহার ও বল প্রয়োগ করা ছাড়াও সব ধরনের প্রতারণার আশ্রয় নিত। 

 

মানসুর যখন চাইত কোন লোককে গোপনে হত্যা করবে তখন তার সাথে এক খৃষ্টান চিকিৎসককে সঙ্গে নিয়ে যেত যে ছিল সম্পূর্ণ নাস্তিক এবং ন্যায়-অন্যায়ের ধার ধারত না। মানসুর যাকেই হত্যার নির্দেশ দিত সে তার পানীয়তে বিশ মিশিয়ে তাকে পরিবেশন করত। মানসুর যদি কাউকে নিজের কব্জায় আনতে পারত তবে তাকে জীবন্ত অবস্থায় দুই দেয়ালের মধ্যে আটকে ঢালাই করে বন্ধ করে দিত। হাশেমিয়া ও বাগদাদের দেয়ালগুলো যদি কথা বলতে পারত তবে তারা সাক্ষ্য দিত যে, কত নিরপরাধ লোককে মানসুর দেয়ালগুলোর মধ্যে জীবন্ত সমাধিস্থ করেছে। একবার মানসুর হজ্বে গেলে। আব্দুল্লাহ ইবনে হাসানের কন্যা তার কাছে এসে তার বৃদ্ধ বন্দী পিতার মুক্তির আকুল আবেদন জানিয়ে একটি কবিতা পাঠ করে যাতে মানসুরের সঙ্গে তাদের পরিবারের আত্মীয়তার সম্পর্কের দোহাইও ছিল। 

 

কিন্তু এ কবিতার জবাবে মানসুর তার বাবাকে হত্যার নির্দেশ দিয়ে তার বিচ্ছিন্ন মাথাটি মেয়ের সামনেই প্রদর্শন করে। এ ঘটনাটি মানসুরের পাষাণ হৃদয় ও অত্যাচারের একটা খণ্ডচিত্র মাত্র। 

 

ইমাম সাদিক (আ.) সাফফাহর শাসনামলের বিশেষ অবস্থার কারণে শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে ছিলেন। কারণ রাজনৈতিক নাজুক অবস্থার কারণে সাফফাহ বিরাজমান পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে চলতে বাধ্য ছিল। কিন্তু মানসুরের সময় ইমাম সাদিক (আ.)-এর সামনে বিভিন্ন সমস্যা উদ্ভূত হওয়ায় পূর্বের অবস্থার অবনতি ঘটে। ইমাম সাদিক (আ.)-এর সামাজিক মর্যাদা ও জনসাধারণের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তার বিষয়টি মানসুরের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর ছিল। সে ইমামকেই তার সবচেয়ে বড় শত্রু বলে মনে করত। 

 

ইমাম সাদিক (আ.)-এর বিরুদ্ধে মানসুরের বানোয়াট অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছিল ও বাড়ছিল গুপ্তচরদের প্রচারণা। এ অবস্থায় মানসুর ১৪৭ হিজরিতে হজ্বের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে মদীনায় পৌঁছায়। সে রাবি নামক এক ব্যক্তিকে ইমামের কাছে পাঠিয়ে তাঁকে তার সামনে হাজির করার নির্দেশ দিল। মানসুর তাকে বলল, আল্লাহ আমাকে হত্যা করুন যদি তাঁকে হত্যা না করি। রাবি প্রথমে মানসুরের নির্দেশকে না শোনার ভান করল যাতে হয়তো মানসুর তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে অথবা বিষয়টি একেবারে ভুলে যায়। কিন্তু মানসুর তার নির্দেশের পুনরাবৃত্তি করে বলে, তাঁকে কষ্ট দিয়ে অপমানজনক অবস্থায় আমার সামনে উপস্থিত কর। যখন ইমাম তার কাছে গেলেন সে তাঁর সঙ্গে অত্যন্ত রূঢ় আচরণ করে এবং অশোভনীয় ভঙ্গিতে বলে যে, ইরাকের লোকেরা তোমাকে নিজেদের ইমাম মনে করে এবং তোমার কাছে তাদের সম্পদের জাকাত পাঠায়। আর তাই পূর্ণশক্তি নিয়ে আমার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছো এবং সংঘাত সৃষ্টি করছো। আল্লাহ আমাকে হত্যা করুন যদি আমি তোমাকে হত্যা না করি। ইমাম সাদিক (আ.) বললেন : হে আমির (শাসক)! আল্লাহ সুলাইমান (আ.) কে নিয়ামত দিয়েছিলেন। আর তিনি তার শোকর আদায় করেছিলেন। তিনি আইয়ুব (আ.)কে বিপদাপদ দিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন। আর তিনি তাতে ধৈর্য ধধারণ করেছিলেন। হযরত ইউসুফ (আ.) এর প্রতি জুলুম করা হয়েছিল। আর তিনি তাঁর ওপর অবিচারকারীদের ক্ষমা করেছিলেন। মানসুর তখন বলল, "আমার কাছে আস। তুমি নিরপরাধ প্রমাণিত হয়েছো। তাই তোমাকে নিরাপত্তা দিচ্ছি। তুমি আমার জন্য কোন সমস্যা নও। এক আত্মীয় তার আত্মীয়দের থেকে যা নিয়েছে আল্লাহ তার থেকে অনেক বেশী তোমাকে দান করুন।" এরপর সে ইমামের হাত ধরে টেনে নিয়ে নিজের পাশে বসাল এবং বলল, উপহারের বক্সটি আমার কাছে নিয়ে এস। সুগন্ধি আতরের পাত্র আনা হলে মানসুর নিজের হাতে ইমামকে তা মাখিয়ে দিল ও বলল, আল্লাহর আশ্রয় ও সংরক্ষণে থাক। অতঃপর রাবিকে বলল, হে রাবি! আবা আব্দিল্লাহর উপহার ও জোব্বা তার ঘরে পৌঁছে দিয়ে এস। রাবি ইমামের কাছ জিনিসগুলো পৌঁছে দিয়ে বলল, আমি আপনার কাছে প্রথমবার আসার পূর্বে যা দেখেছিলাম আপনি তা দেখেননি। আর তারপর যা দেখলাম তা আপনি জানেন। হে আবা আব্দিল্লাহ, আপনি মানসূরের কাছে গিয়ে কি বলেছিলেন। ইমাম বললেন, "(মনে মনে এ দোয়া করেছিলাম) হে আল্লাহ, আপনি আমাকে আপনার সেই চোখ দিয়ে হেফাজত করুন যা কখনও নিদ্রা যায় না এবং আপনার অপরাজেয় দুর্গে আমাকে আশ্রয় দিন। আমার ওপর আপনার অসীম ক্ষমতা দিয়ে আমাকে ক্ষমা করুন। কারণ আপনিই আমার সেই আশার স্থল যা আমাকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করবে। হে আল্লাহ! আপনি ঐ ব্যক্তি হতে মহান ও শ্রেষ্ঠ যাকে আমি আমার জন্য অনিষ্টকারী বলে ভয় করি। হে আমার প্রতিপালক! তার রক্তপাতের ইচ্ছাকে আপনার মাধ্যমে প্রতিরোধ করছি এবং তার কাঙ্ক্ষিত মন্দ থেকে আপনার আশ্রয় চাইছি।" 

 

ইমাম সাদিক (আ.)-কে অসহনীয় এক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে দেখার বিষয়টি মানসুরের মনে দৃঢ়ভাবে গেঁথে গিয়েছিল। কারণ সে জানত যে, লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁকে ইমাম হিসাবে মানে, তাঁর কাছে খোমস ও যাকাতের অর্থ পাঠায় এবং তাঁকে বিশেষ শ্রদ্ধার চোখে দেখে। এমনকি মানসুরের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদেরও বেশিরভাগই তাঁর প্রতি দুর্বল। 

 

 ইমাম সাদিক (আ.) মানসুরের সমালোচনা থেকে রক্ষা পেতে যে কৌশল অবলম্বন করতেন এবং যেসব সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিতেন সেগুলো উদঘাটন করতে মানসুরকে গলদঘর্ম হতে হত। মানসুর তা জানার জন্য সব ধরনের ষড়যন্ত্র করত এবং কোন কৌশলই বাদ রাখত না। কখনও কখনও শিয়াদের নামে মিথ্যা চিঠি দিয়ে ইমামকে নিজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহবান জানাতো এবং লক্ষ্য করত ইমাম কি করেন। কখনও আবার তার বিশ্বস্ত অনুচরদের হাতে প্রচুর অর্থ দিয়ে ইমামের কাছে পাঠিয়ে পরীক্ষা করত। এগুলো তার ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনার কিছু নমুনা। সে আশা করত এভাবে সে তার লক্ষ্যে পৌঁছাবে। যদি ইমাম ঐ পত্রগুলোর জবাব দিতেন অথবা তাদের পাঠানো অর্থ গ্রহণ করতেন তাহলে এভাবে সে ইমামের ওপর চড়াও হওয়ার সুযোগ পেত। কিন্তু তার এইসব প্রচেষ্টা ও ষড়যন্ত্র বিফল হত। 

 

ইমাম সাদিক (আ.) এমন এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন যিনি জ্ঞানের আন্দোলনের সূর্যোদয় ঘটিয়ে মানুষকে তার আলো দিয়ে উদ্ভাসিত করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম অত্যন্ত ব্যাপক ছিল এবং তাঁর অধীনে বিদ্যার্থীরা ভিড় জমিয়েছিল। তিনি এ বিষয়ে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি ব্যক্তির চিন্তা ও মতের অনুসরণ (কিয়াস) ও আহলে হাদিসের (হাদিসের অনুসারী) দ্বন্দ্বে আহলে হাদিস ধারার নেতৃত্ব দান করেন। 

 

 মানসুর ইমামের এই সুপরিচিতিকে ভয় করত এবং আতঙ্কিত থাকত যে, হয়তো বা আলাভীরা (আলীর বংশধররা) হঠাৎ করে তাদের অধিকার নিয়ে বিপ্লবের ঘোষণা দিবে ও বিদ্রোহ করে বসবে। মুসলিম উম্মাহর মনীষীরা জাফর ইবনে মুহাম্মাদ (আ.)-এর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেন এবং আহলে বাইতের মর্যাদা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। তাই মানসুর আশঙ্কা করতো হয়তো তারাও ইমামের সাথে যোগ দিবেন। মানসুর আলাভীদের ওপর ইমাম সাদিক (আ.)-এর প্রভাবকে নব্য প্রতিষ্ঠিত আব্বাসীয়দের খেলাফতের জন্য বিপজ্জনক মনে করত। অন্যদিকে ইমাম সাদিক (আ.) তাঁর দূরদর্শী চিন্তা ও তীক্ষ্ম দৃষ্টির আলোকে গৃহীত পরিকল্পনার মাধ্যমে মানসুরের ষড়যন্ত্রগুলোকে একের পর এক নস্যাৎ করে তাঁর লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হচ্ছিলেন। কারণ তিনি ভবিষ্যতে যা ঘটতে পারে সে সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। ফলে তা ঘটার আগেই তিনি খবর দিতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন তৎকালীন পরিস্থিতিতে ক্ষমতার জন্য কোন পদক্ষেপ নেয়া ঠিক হবে না, এবং তিনি নিজ আত্মীয়-স্বজনদেরও বিপ্লবী তৎপরতা চালাতে নিষেধ করতেন। তাদের সবসময় উপদেশ দিতেন সরকারী পদ গ্রহণে বিরত থাকতে। উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সেনাপতি আবু সালমা খাল্লাল যিনি আলে মুহাম্মাদের (সা.) উজির বা পরামর্শদাতা বলে বিবেচিত হতেন বিপ্লবের শুরুতেই ও তার সেনাদল তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগেই ইমাম সাদিক (আ.)-এর কাছে গিয়ে তাঁকে খিলাফতের পদ গ্রহণের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ইমাম তা প্রত্যাখ্যান করেন। আবু সালমা এতে না দমে যে কোনভাবেই হোক ইমামকে রাজী করানোর চেষ্টায় রত হয়। যখন ৭০ হাজার সেনা তার সাথে এসে যোগ দেয় তখন সে ইমামকে এ মর্মে চিঠি লিখে যে, আমার সঙ্গে এখন ৭০ হাজার যোদ্ধা রয়েছে আপনার মত কি? ইমাম নেতিবাচক উত্তর দিয়ে বলেন, তোমার পর সাফফাহ ও মানসুর ক্ষমতা লাভ করবে। 

 

অনুরূপভাবে বিপ্লবের অপর সেনাপতি আবু মুসলিম খোরাসানী যার ওপর ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলের দায়িত্বভার ন্যস্ত ছিল তিনিও ইমাম সাদিক (আ.)-কে ক্ষমতা গ্রহণের আহবান জানিয়েছিল। কিন্তু ইমাম তার প্রস্তাবকেও প্রত্যাখ্যান করেন। আবু মুসলিম জনগণকে মহানবী  (সা.)-এর বংশের সর্বমান্য এক ব্যক্তির দিকে আহবান জানাচ্ছিল। সে আহলে বাইতের ওপর বনি উমাইয়া যে অবিচার চালিয়েছিল এবং তাদের অনেককে হত্যা করেছিল এর বিরুদ্ধে ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করত। সে চাচ্ছিল খিলাফতকে হযরত আলী (আ.)-এর বংশধর কোন ব্যক্তির হাতে অর্পণ করবে। কারণ তাঁরা এ পদের জন্য অগ্রগণ্য ও সবচেয়ে উপযুক্ত ছিলেন। এ জন্য সে ইমাম সাদিক (আ.)-যিনি আহলে বাইতের নেতা ও প্রধান ব্যক্তি বলে গণ‍্য হতেন-তার  উদ্দেশ্যে একটি চিঠি পাঠায়। 

 

সে চিঠিতে উল্লেখ করেছিল, সবাই আপনার দিকে তাকিয়ে রয়েছে এবং তারা অন্তর থেকে আপনাকে চায়। আমি আন্দোলন শুরু করেছি এবং জনগণকে বনি উমাইয়ার আনুগত্য ত্যাগ করে আহলে বাইতের অনুসরণের দিকে আহবান জানিয়েছি। আপনি শুধু সম্মতি দিন, বাকি কাজ আমিই করব। কিন্তু ইমাম সাদিক (আ.) তার উত্তরে বললেন, তুমি আমার অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত নও, আর সময়ও আমার অনুকূলে নয়।  ইমাম তাঁর দিব্যদৃষ্টি  এবং পর্দার অন্তরালের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে তাঁর পূর্ণ অবহিতির কারণে নিশ্চিত জানতেন যে, এ আহবান ও বিপ্লবের উদ্দেশ্য মুসলিম উম্মাহর মুক্তি এবং অনাচার ও বিশৃঙ্খলার মূলোৎপাটন নয়। তাই তিনি এ ডাকে সাড়া দেয়া ঠিক হবে না বলে মনে করেছেন। 

 

ইমাম স্পষ্টভাবে অবগত ছিলেন যে, যারা এ বিপ্লবের পতাকা উত্তোলন করেছে তারা কেউই সত্যনিষ্ঠ নয়। তারা এমন এক লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে যে, ইমাম এতে তাদের সমর্থন করতে পারেন না। ইমাম বাস্তব দৃষ্টিতে সবকিছু বিবেচনা করতেন এবং বিচক্ষণতার সঙ্গে তৎকালীন পরিস্থিতিকে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতেন। 

 

ইমাম সাদিক (আ.) ইতোপূর্বে বনি আব্বাসের ক্ষমতাসীন হওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। এর ভিত্তিতেই তিনি মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে হাসান (নাফসে যাকিয়া)-এর হাতে বাইয়াতের বিরোধিতা করেছিলেন যা একশভাগ সঠিক ও যথার্থ ছিল। প্রকৃতপক্ষে ইমাম সাদিক (আ.)-এর পূর্বের ইমামরাও (আ.) বনি হাশিমের মধ্যে থেকে আব্বাসীয়দের খেলাফত লাভের বিষয়টি বারংবার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তাঁরা আগেই এ ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, বনি আব্বাস ক্ষমতা লাভ করে লোকদের হত্যা করবে, পূর্ব ও পশ্চিমের ভূখণ্ডগুলো তাদের পদানত হবে এবং তারা এতটা সম্পদ হস্তগত করবে যে পূর্ববর্তী কোন শাসক তা অর্জন করতে পারে নি। তাদের শাসনকালও দীর্ঘ হবে এবং বনি উমাইয়ার থেকে কয়েকগুণ বেশি সময় ধরে তারা ক্ষমতায় থাকবে। ইমামগণ অনেক আগ থেকেই এরূপ ঘটবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। 

 

উপরন্ত ইমামদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতাও তাদের বিশেষ  সচেতনতা দিয়েছিল যার কারণে তারা বংশীয় ও গোত্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামী বিশ্বের শাসন-ক্ষমতাকে হস্তগত করার লক্ষ্যে সংঘটিত বিপ্লবগুলোর জটিলতা সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত ছিলেন।

যাই হোক, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ও ইসলামী ভূখণ্ডগুলোতে ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.)’র ইমামতের প্রভাব ও সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ায় ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল আব্বাসিয় জালিম শাসক মনসুর দাওয়ানিকি। দাওয়ানিকি বলেছিল:

 "জাফর ইবনে মুহাম্মাদ যদিও তরবারি দিয়ে সংগ্রাম করছে না, কিন্তু তার পদক্ষেপগুলো আমার কাছে একটি অভ্যুত্থানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ এবং কঠিন বলে মনে হয়।" 

 

 অবশেষে দাওয়ানিকির নির্দেশে (১৪৭ বা ১৪৮ হিজরির ২৫ শে শাওয়াল) বিষ প্রয়োগ করে শহীদ করা হয় ইসলামের এই চির-প্রদীপ্ত সূর্য ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.)কে। কিন্তু শাহাদাতের পর ইমামের নুরানি ব্যক্তিত্বের ঔজ্জ্বল্য বরং বহুগুণ বেড়ে যায়। ৬৫ বছর বয়স্ক ইমামের লাশ দাফন করার সময় ইমাম-প্রেমিক আবু হুরাইরা আজালি নিজেকে বলছিলেন:

"তুমি কি জানো কোন মহামানবের লাশ নিয়ে যাচ্ছ মাটি দিতে? তাঁর আগে ও পরে যদি ইমাম না থাকত তাহলে অবশ্যই বলতাম, কাল কিয়ামত পর্যন্ত এ পৃথিবী এমন মহামানব তৈরিতে অপারগ। " 

 

মানসুর দাওয়ানিকি নিজেও ইমাম সম্পর্কে বলেছিল: 

 

"জাফর (ইবনে মুহাম্মাদ) হলেন সেই ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত যাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন, 'অতঃপর আমরা আমাদের বান্দাদের থেকে মনোনীতদের কিতাবের উত্তরাধিকারী করলাম।'  মহান আল্লাহ যাদের মনোনীত করেছেন এবং সৎকর্মে অগ্রগামী করেছেন তিনি তাদের অন্যতম।  তিনি ঐ পরিবারের অন্তর্গত যাদের মধ্যে এমন ব্যক্তি রয়েছেন যার সঙ্গে ফেরেশতারা কথা বলে (মুহাদ্দাস)। বর্তমান যুগে আমাদের মধ্যে যে ব্যক্তির সঙ্গে ফেরেশতারা কথা বলেন তিনি হলেন জাফর ইবনে মুহাম্মাদ।" 

 

আহলে সুন্নাতের মালিকি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা মালিক ইবনে আনাস বলেছেন.

"এক সময় আমি জাফর ইবনে মুহাম্মাদের কাছে যাওয়া-আসা করতাম। যখনই আমি তাঁর সাক্ষাতে যেতাম তখন আমি তাকে এ তিন অবস্থার যে কোন এক অবস্থায় পেতাম, হয় তিনি নামাজ পড়ছেন অথবা রোজা রেখেছেন অথবা কুরআন তিলাওয়াত করছেন।  জ্ঞান, ইবাদত ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে জাফর ইবনে মুহাম্মাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো ব্যক্তিকে কোনো চোখই দেখেনি, কোনো কানই শোনেনি এবং কোনো মানুষই কল্পনা করেনি।" মালিক ইমামের কাছ থেকে হাদিসও বর্ণনা করেছেন। 

 

আহলে সুন্নাতের হানাফি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা আবু হানিফা বলেছেন,

"আমি জাফর ইবেন মুহাম্মাদ থেকে বড় কোন ফকিহকে দেখিনি। সবচেয়ে জ্ঞানী হল সেই ব্যক্তি যে মানুষের মধ্যে (মত) পার্থক্যের বিষয়গুলো সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞান রাখেন। (আর জাফর ইবেন মুহাম্মাদ হলেন সেই জ্ঞানের অধিকারী।)

যদি (জাফর ইবনে মুহাম্মাদের সান্নিধ্যের তথা ক্লাসের) ঐ দু’বছর না থাকত তবে নোমান তথা আবু হানিফা ধ্বংস হয়ে যেত।"

ইমামের সামনে বিশ্বনবী (সা.)’র নাম উচ্চারিত হলে তাঁর চেহারার রং পাল্টে যেত। হজের ইহরাম বাধার পর ইমাম আল্লাহর ভয়ে এতটা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়তেন যে লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক শীর্ষক তালবিয়া উচ্চারণকে ঔদ্ধত্য বলে মনে করতেন। 

 

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) থেকে অসংখ্য কারামাত বা অলৌকিক ঘটনা দেখা গেছে এবং প্রসিদ্ধ অনেক মুকাশাফা (অন্তরে আধ্যাত্মিকভাবে প্রতিফলিত অদৃশ্য জগতের সত্য ঘটনাগুলো) বর্ণিত হয়েছে। এরূপ একটি ঘটনা হল একবার এক ব্যক্তি খলিফা মানসূরের কাছে তাঁর সম্পর্কে মিথ্যা রটনা করল (যে ইমাম সাদিক মানসূরের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন)। অতঃপর মানসুর যখন হজ্বে আসল যে ব্যক্তি অপবাদ দিয়েছিল তাকে ডেকে পাঠাল এবং জাফর সাদিকের সামনে তাকে বলল, তুমি যা বলেছিলে তা সত্য প্রমাণের জন্য আল্লাহর নামে কসম করতে রাজি আছ? সে বলল, হ্যাঁ।  ইমাম জাফর সাদিক মানসুরকে বললেন, ঠিক আছে, সে যা দাবি করছে সে অনুযায়ী তাকে কসম করতে বল। মানসুর তাকে বলল, তাঁর সামনে কসম কর। জাফর সাদিক ঐ ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বললেন এভাবে কসম কর, ‘আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতা থেকে আমি বিচ্ছিন্ন হই এবং আমার শক্তি ও ক্ষমতার আশ্রয় চাই। সত্যিই জাফর এমন বলেছেন ও এমন করেছেন।’ ঐ ব্যক্তি প্রথমে এরূপে কসম করতে রাজী হল না। পরে তা করলো। তার কসম খাওয়া সমাপ্ত হওয়া মাত্রই ঐ লোকটি মানসূরের সামনে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। অন্য একটি ঘটনা এরূপ বর্ণিত হয়েছে যে, এক জালেম ব্যক্তি তাঁর দাসকে হত্যা করে। তিনি ভোর রাত্রিতে নামাজ পড়ে তার প্রতি অভিশাপ বর্ষণ করেন। তিনি এরূপ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঐ জালেম ব্যক্তির মৃত্যুও কারণে তার ঘর থেকে কান্নার ধ্বনি শোনা গেল। 

 

বর্ণিত হয়েছে, যখন তাঁর কাছে এ সংবাদ পৌঁছল যে, হাকাম ইবনে আব্বাস কালবি ইমামের চাচা যাইদ (ইবনে আলী) সম্পর্কে এ কবিতাটি (ব্যঙ্গ করে) পাঠ করেছে :

আপনাদের কারণেই আমরা যাইদকে খেজুর গাছে ঝুলিয়ে হত্যা করেছি। আমরা কখনও দেখিনি কোন সৎপথপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে খেজুর গাছের কাণ্ডে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। তখন ইমাম তাকে অভিশাপ দিয়ে বললেন, হে আল্লাহ আপনার কুকুরগুলো থেকে একটি কুকুরকে তার ওপর প্রবল করে দিন। কিছুদিন অতিবাহিত না হতেই একটি সিংহ তাকে ছিন্ন ভিন্ন করে (খায়)। 

 

তাঁর অন্যতম কারামত তাশরী ইবনে ওয়াহাব বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, লাইস ইবনে সাদকে বলতে শুনেছি, আমি ১১৩ হিজরিতে হজ্বে গিয়েছিলাম। যখন আসরের নামাজ শেষ করে আবু কুবাইস পাহাড়ে উঠলাম সেখানে এ ব্যক্তিকে বসে দোয়া করতে দেখলাম। তিনি ‘ইয়া রাব’ ‘ইয়া রাব’ বললেন ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ তাঁর নিশ্বাসের টান ছিল। এরপর ‘ইয়া হাইয়ু’ বলা শুরু করলেন যতক্ষণ তার দম থাকে। এরপর বললেন, হে আল্লাহ আমি আঙ্গুর খেতে চাই। আমাকে আঙ্গুর দিন। আমার গায়ের চাদরও ছিঁড়ে গেছে, আমাকে বস্ত্র দান করুন। তখনও তাঁর দোয়া শেষ হয়নি দেখলাম তাঁর সামনে এক ঝুড়ি আঙ্গুর উপস্থিত দেখলাম... 

 

একবার মানসুর ইমামকে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল এ উদ্দেশ্যে যেন তাঁর ওপর এই অজুহাতে কঠোরতা আরোপ করা যায়। এ লক্ষ্যে ইবনে মুহাজিরকে ডেকে বলল: এ অর্থ নিয়ে মদীনায় যাও। আব্দুল্লাহ ইবনে হাসান, জাফর ইবনে মুহাম্মাদ ও তাদের পরিবারবর্গের কাছে গিয়ে বলল, আমি খোরাসান থেকে মদীনায় এসেছি। এখানে আমি অপরিচিত। আর আমি আপনাদের এক অনুসারী। খোরাসানের লোকেরা এ অর্থ আপনাদের জন্য পাঠিয়েছেন। এরপর তাদের প্রত্যেককে আমি যেভাবে নির্ধারণ করেছি সেভাবে অর্থ দান কর। কিন্তু দেয়ার সময় শর্ত করবে যে, যেহেতু আমি অন্যদের প্রেরিত সেহেতু অনুরোধ হল যে পরিমাণ অর্থ আপনি গ্রহণ করলেন তা একটি কাগজে লিখে দিন। ইবনে মুহাজির মদীনায় গিয়ে তার দায়িত্ব সম্পন্ন করে ফিরে আসলে মানসুর তাকে জিজ্ঞেস করল: তুমি কি করে এসেছো তার বর্ণনা দাও। ইবনে মুহাজির বলল, তাদের কাছে গিয়েছি এবং তাদের নির্ধারিত অর্থ দিয়ে লিখিত রসিদ নিয়ে এসেছি। কিন্তু জাফর ইবনে মুহাম্মাদ তা গ্রহণ করেননি। যখন আমি তাঁর কাছে যাই তখন তিনি মসজিদুন্নবীতে নামাজ পড়ছিলেন। আমি তাঁর পেছনে গিয়ে বসলাম। মনে মনে ভাবলাম, যখন তিনি নামাজ শেষ করবেন তখন আমার কথা তাকে বলব। তিনি নামাজ শেষ করা মাত্রই আমার দিকে ঘুরে বললেন: হে লোক, আল্লাহকে ভয় কর এবং মুহাম্মাদ (সা.)-এর আহলে বাইতের সাথে প্রতারণার চেষ্টা কর না। আর তোমার বন্ধুকেও (মানসুর) যেয়ে বল, সেও যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং মুহাম্মাদ (সা.)-এর আহলে বাইতের সাথে যেন প্রতারণার চেষ্টা না করে। তাদের (বনি আব্বাস) সাথে বনি উমাইয়ার কোন পার্থক্য নেই। তারা উভয়েই অভাবী। আমি (হতচকিত হলেও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে) বললাম, ‘আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন। আমি আপনার উদ্দেশ্য বুঝতে পারি নি।’ তিনি বললেন, আমার আরো কাছে আস। আমি তার কাছে গেলে তিনি আমার ও তোমার মধ্যে যা কথোপকথন হয়েছিল তা হুবহু বর্ণনা করলেন যেন তিনি আমাদের সঙ্গে তৃতীয় ব্যক্তি হিসাবে ছিলেন। মানসুর (একথা শুনে) বলল ইবনে মুহাজির, নিঃসন্দেহে আল্লাহর রাসূলের আহলে বাইতের মধ্যে একজন অবশ্যই মুহাদ্দাস (যার সঙ্গে ফেরেশতারা কথা বলেন) রয়েছে যার কাছে ইলহাম (গায়েবীভাবে খবর) হয়। নিশ্চয়ই বর্তমানে জাফর ইবনে মুহাম্মাদ আমাদের মধ্যকার সেই ব্যক্তি। 

 

বিশ্বনবী (সা.) পবিত্র আহলে বাইতের অন্য অনেক সদস্যের মত ইমাম জাফর সাদিক (আ.)’র মহিমান্বিত জীবনও এটা প্রমাণ করে যে, সমাজের কাছে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করার পথ ক্ষমতা দখল, ভয়-ভীতি সৃষ্টি ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়া নয় বরং এর সর্বোত্তম পথ হল নিজের মধ্যে বিদ্যমান গুণাবলীর (জ্ঞান, চরিত্র ও কর্ম) পূর্ণতা দান।

তিনি এ আদর্শ তুলে ধরেছিলেন যে, সমাজের সার্বিক সংস্কারকামী ব্যক্তিকে অবশ্যই তার সব যোগ্যতা ও প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। ক্ষমতার প্রয়োগের মাধ্যমে নয় বরং নিজের মধ্যে আত্মিক ও ব্যক্তিত্ব গঠনমূলক মূল্যবোধগুলোর বিকাশ ঘটিয়ে সমাজের ওপর (নৈতিকভাবে) প্রভাব বিস্তার করতে হবে। 

 

ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.)’র কয়েকটি অমূল্য বাণী শুনিয়ে শেষ করব আজকের আলোচনা:

যারা নামাজকে গুরুত্বহীন মনে করবে আমাদের তথা বিশ্বনবী (সা.)’র আহলে বাইতের শাফায়াত তাদের ভাগ্যে জুটবে না।

ইমাম বলেছেন, কোনো বান্দাই পরিপূর্ণভাবে প্রকৃত ঈমানে পৌঁছাতে পারবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে এই তিনটি বৈশিষ্ট্য অর্জিত হবে: পুরোপুরি ধর্মকে বুঝতে পারা, সঠিক পদ্ধতিতে জীবন যাপন করা এবং দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য ধারণ করা।

তিনটি বিষয়ের পরিচয় পাওয়া যায় এ তিন ক্ষেত্রে: রাগের মুহূর্তে ধৈর্যের পরিচয়, যুদ্ধের সময় বীরত্বের পরিচয় ও অভাবের সময় ভাইয়ের পরিচয়। # 

 

রেডিও তেহরান/২০ 

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন