এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শুক্রবার, 01 জানুয়ারী 2016 17:52

সূরা আশ-শোয়ারা; আয়াত ৪৯:৫২ (পর্ব-৮)

সূরা শোয়ারার ৪৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

قَالَ آَمَنْتُمْ لَهُ قَبْلَ أَنْ آَذَنَ لَكُمْ إِنَّهُ لَكَبِيرُكُمُ الَّذِي عَلَّمَكُمُ السِّحْرَ فَلَسَوْفَ تَعْلَمُونَ لَأُقَطِّعَنَّ أَيْدِيَكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ مِنْ خِلَافٍ وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ أَجْمَعِينَ (49)  

“ফেরাউন বলল: কি! (এতবড় সাহস!) আমি অনুমতি দেয়ার পূর্বেই তোমরা তার প্রতি ঈমান আনলে? নিশ্চয়ই সে তোমাদের (জাদুবিদ্যার) গুরু, যে তোমাদেরকে জাদু শিক্ষা দিয়েছে। শিগগিরই তোমরা (তোমাদের শাস্তি) জানতে পারবে। আমি অবশ্যই তোমাদের হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কর্তন করব এবং তোমাদের সবাইকে শূলে চড়াব।” (২৬:৪৯)

 

আগের পর্বে বলা হয়েছে, জাদুকররা  হযরত মুসা (আ.)’র মোজেযা দেখার পর বুঝতে পারে, এটি তাদের দেখানো জাদুর মতো নয়, বরং তা বাস্তব মোজেযা বা অলৌকিক ঘটনা। এ কারণে তারা সবাই হযরত মুসার উপর ঈমান আনে এবং এ বিষয়টি সর্বসমক্ষে ঘোষণা করে দেয়। কিন্তু অত্যাচারী শাসক ফেরাউন তো এটা চায়নি। সে চেয়েছিল জাদুকরদের মাধ্যমে হযরত মুসা (আ.)কে অপমান করতে। কিন্তু বাস্তবে ফল হলো উল্টো। জাদুকরদের মাধ্যমে ফেরাউন নিজেই জনগণের সামনে অপমানিত হলো। ফেরাউন দেখল, জাদুকরদের কাণ্ড দেখে জনগণও যেকোনো মুহূর্তে মুসা (আ.)’র উপর ঈমান আনতে পারে; সেক্ষেত্রে কেউ আর তার পূজা-অর্চনা করবে না।

 

আর তাই প্রথমেই ফেরাউন জাদুকরদেরকে বলল: তোমরা সবাই মুসার কাছ থেকে জাদুবিদ্যা শিখেছ এবং সবাই মিলে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছ।  এর সে তাদেরকে কঠিনতম শাস্তির হুমকি দিয়ে বলল: সব জাদুকরের হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কাটার পর তাদের সবাইকে সে শূলে চড়াবে। ফেরাউন আরো বলে, এই শাস্তি এজন্য দেয়া হবে যাতে তোমরা কঠিন যন্ত্রণায় ভুগে মারা যাও এবং বাকিরা এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়। সেইসঙ্গে ভবিষ্যতে কেউ যেন মুসার প্রতি ঈমান আনার সাহস না দেখায়।

 

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. স্বৈরশাসকদের শাসনাধীন মানুষদের চিন্তা ও কথা বলার স্বাধীনতা থাকে না। শাসকরা যেকোনো মূল্যে জনগণের উপর নিজেদের মতামত চাপিয়ে দিতে চায়।

২. স্বৈরশাসকের কাছে মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নেই। কাজেই যারা শাসকদের স্বার্থ বিরোধী কাজ করে তাদেরকে হত্যা করাকে বৈধ বলে মনে করে।

 

সূরা শোয়ারার ৫০ ও ৫১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রব্বুল আলামিন বলেছেন:  

قَالُوا لَا ضَيْرَ إِنَّا إِلَى رَبِّنَا مُنْقَلِبُونَ (50) إِنَّا نَطْمَعُ أَنْ يَغْفِرَ لَنَا رَبُّنَا خَطَايَانَا أَنْ كُنَّا أَوَّلَ الْمُؤْمِنِينَ (51)

“জাদুকররা বলল, কোন ক্ষতি নেই। আমরা আমাদের পালনকর্তার কাছে প্রত্যাবর্তন করব।” (২৬:৫০)

“আমরা আশা করি, আমাদের পালনকর্তা আমাদের ক্রটি-বিচ্যুতি মার্জনা করবেন। কারণ, আমরা বিশ্বাস স্থাপনকারীদের মধ্যে অগ্রগামী।” (২৬:৫১)

 

ফেরাউন কঠিনতম শাস্তির নির্দেশ দিলেও জাদুকররা বিন্দুমাত্র ভয় পেল না। তারা ঈমানের পথ থেকে সরে না গিয়ে বরং ঈমানের বলে এত বলীয়ান হয়ে গেল যে, সব ধরনের ভয়ভীতির ঊর্ধ্বে উঠে স্পষ্ট ভাষায় ফেরাউনের প্রশ্নের উত্তর দিল। তারা ফেরাউনকে বলল: আমাদেরকে তুমি নির্যাতন ও হত্যার হুমকি দিচ্ছ? তুমি কি জান না, আমরা আল্লাহর রাস্তায় মরে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছি? আমরা আশা করছি তোমার হাতে নিহত হওয়ার মাধ্যমে আমাদের অতীতের গোনাহগুলো মাফ হয়ে যাবে এবং হযরত মুসা (আ.)-এর প্রতি ঈমান আনা প্রথম ব্যক্তিদের অন্তর্ভূক্ত হয়ে আমরা আল্লাহতায়ালার বিশেষ অনুগ্রহভাজনে পরিণত হতে পারব।  কাজেই তুমি যে বিষয়টিকে হুমকি বলে মনে করছ আমরা তাকে নিজেদের জন্য সুসংবাদ মনে করছি এবং সেজন্য গর্ব অনুভব করছি।  

 

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো: 

১. যদি কেউ সঠিকভাবে আল্লাহকে চেনার মাধ্যমে তাঁর প্রতি ঈমান আনে তাহলে শত হুমকি দিয়েও তার বিশ্বাসে ফাটল ধরানো যাবে না। উল্টো এ ধরনের ঈমান মানুষকে সাহস ও প্রতিরোধ শক্তি যোগায়।

২. যেকোনো কাজের পরিণতিই আসল, শুরুটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। যে জাদুকররা সারাজীবন জাদুটোনা দেখানো এবং মানুষকে বিভ্রান্ত করার কাজ করেছে তারা  হযরত মুসা (আ.)’র মোজেযা দেখে ঈমান আনে এবং নিজেদের পারলৌকিক মুক্তি নিশ্চিত করে। অন্যদিকে অনেক মুসলমান আছে যারা সারাজীবন নামাজ-রোজা করার পরও বেঈমান হিসেবে মৃত্যুবরণ করে।

 

সূরা শোয়ারার ৫২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

  وَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنْ أَسْرِ بِعِبَادِي إِنَّكُمْ مُتَّبَعُونَ (52)

“এবং আমি মুসাকে আদেশ করলাম-আমার বান্দাদেরকে নিয়ে রাতের বেলায় বের হয়ে যাও,কারণ (নিশ্চয়ই) তোমাদের পশ্চাদ্ধাবন করা হবে।”  (২৬:৫২)  

জাদুর প্রতিযোগিতায় হযরত মুসা (আ.) এর কাছে পরাজিত হওয়ার পর ফেরাউন আল্লাহর নবী ও তাঁর সঙ্গীদের পশ্চাদ্ধাবন করার সিদ্ধান্ত নেয় যাতে তারা জনগণের মাঝে আল্লাহর একত্ববাদ প্রচার করতে না পারে।  

 

অন্যদিকে আল্লাহতায়ালা হযরত মুসার প্রতি ওহি নাজিল করে বলেন, ফেরাউনের শাসনাধীনে ক্রীতদাসের মতো জীবনযাপনকারী বনি-ইসরাইল জাতিকে নিয়ে মিশর থেকে পালিয়ে যাও। তাদেরকে তাদের নিজেদের দেশ শাম বা বর্তমানের সিরিয়ায় নিয়ে যাও। বনি ইসরাইলের লোকজন হযরত মুসার মোকাবিলায় ফেরাউনকে পরাজিত হতে দেখে আল্লাহর নবীর বিশাল ক্ষমতার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হয়ে গিয়েছিল।  এ কারণে তারা মুসা (আ.)’র ডাকে সাড়া দিয়ে নানা ধরনের বাধা বিপত্তি পেরিয়ে রাজধানীতে পৌঁছে গেল। তাদের লক্ষ্য ছিল একটাই- হযরত মুসা (আ.)’র নেতৃত্বে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি পাওয়া।

 

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো: 

১. কলুষিত সমাজে যদি বসবাস করতেই হয় তাহলে জুলুম-অত্যাচারের বিরুদ্ধে সাধ্যমত রুখে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতে হবে। আর যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে অন্তত সে সমাজ থেকে অন্য কোথাও চলে যেতে হবে। কলুষিত সমাজে বসবাস করে নিজেকে কলুষিত করা যাবে না।

২. অত্যাচারী শাসকদের হাত থেকে জনগণকে মুক্তি দেয়া ছিল নবী-রাসূলদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। এ কাজে আল্লাহতায়ালা তাদেরকে দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন ও সাহায্য করেছেন।#

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন