এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শুক্রবার, 01 জানুয়ারী 2016 17:54

সূরা আশ-শোয়ারা; আয়াত ৫৩:৬২ (পর্ব-৯)

সূরা শোয়ারা সূরার ৫৩ থেকে ৫৬ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

فَأَرْسَلَ فِرْعَوْنُ فِي الْمَدَائِنِ حَاشِرِينَ (53) إِنَّ هَؤُلَاءِ لَشِرْذِمَةٌ قَلِيلُونَ (54) وَإِنَّهُمْ لَنَا لَغَائِظُونَ (55) وَإِنَّا لَجَمِيعٌ حَاذِرُونَ (56)

“অতঃপর ফেরাউন (সেনাবাহিনীতে মানুষ ভর্তি করার জন্য) শহরে শহরে লোক সংগ্রহকারী পাঠাল।” (২৬:৫৩)

“এই বলে (ঘোষণা করল) যে, বনি-ইসরাইল তো একটি ক্ষুদ্র দল।” (২৬:৫৪)

“ওরা তো আমাদের ক্রোধ উদ্রেক করেছে।” (২৬:৫৫)

“এবং আমরা তো একদল, সদা সতর্ক।” (২৬:৫৬)

 

আগের আসরে আমরা বলেছিলাম, মহান আল্লাহ হযরত মুসা (আ.)কে নির্দেশ দিয়েছিলেন তিনি যেন ফেরাউনের অত্যাচার থেকে বনি-ইসরাইল জাতিকে রক্ষা করার জন্য তাদেরকে মিশর থেকে শামদেশ বা বর্তমান সিরিয়ায় নিয়ে যান। এ অবস্থায় হযরত মুসা তার সিদ্ধান্তের কথা মিশরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বনি-ইসরাইল জাতির কাছে পৌঁছে দেন। এ বার্তা পাওয়ার পর ফেরাউনের অত্যাচার থেকে বাঁচার জন্য বনি-ইসরাইল জাতির লোকজন সারাদেশ থেকে রাজধানীতে এসে জড়ো হয়।

এ খবর জানতে পেরে হযরত মুসা ও তাঁর সঙ্গীদের প্রতিহত করতে ফেরাউন লোক সংগ্রহের জন্য সারাদেশে সেনাবাহিনী পাঠিয়ে দেয়। সেইসঙ্গে জনগণের মধ্যে একথা প্রচার করতে বলে: ফেরাউনের বাহিনীর তুলনায় বনি-ইসরাইল অতি ক্ষুদ্র ও দুর্বল একটি জাতি। তাদের পক্ষে যুদ্ধে জয়লাভ করা সম্ভব নয়।

 

এই প্রচারণা চালিয়ে একদিকে হযরত মুসার সঙ্গীদের এ হুমকি দেয়া হয়, যদি তোমরা ফেরাউনের অবাধ্য হও তাহলে তোমাদেরকে ধ্বংস করে দেয়া হবে। অন্যদিকে সরকারি সেনাদের মনোবল চাঙ্গা করা হয় এই বলে যে, শিগগিরই বনি-ইসরাইল জাতি ফেরাউনের প্রতাপশালী বাহিনীর কাছে পরাজিত হবে।

 

এই চার আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. অত্যাচারী শাসকেরা সব সময় প্রচারণার মাধ্যমে নিজের শক্তি ও ক্ষমতাকে অনেক বড় করে তুলে ধরার পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে ক্ষুদ্র শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে চায়।

২. স্বৈরশাসকরা নিজেদের জনপ্রিয়তা বাড়ানোর জন্য প্রচুর অর্থ খরচ করে। কিন্তু জনগণের মধ্যে তাদের প্রতি ঘৃণা ও অসন্তোষই শুধু বাড়তে থাকে।

সূরা শোয়ারার ৫৭ থেকে ৫৯ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে বলা হয়েছে:

  فَأَخْرَجْنَاهُمْ مِنْ جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ (57) وَكُنُوزٍ وَمَقَامٍ كَرِيمٍ (58) كَذَلِكَ وَأَوْرَثْنَاهَا بَنِي إِسْرَائِيلَ (59)

“পরিণামে আমি ফেরাউন গোষ্ঠীকে বহিষ্কৃত করলাম ওদের উদ্যানরাজী ও প্রস্রবণ হতে।” (২৬:৫৭)

“এবং ধন ভাণ্ডার ও সুরম্য সৌধমালা হতে।”(২৬:৫৮)

“এইরূপই ঘটেছিল এবং বনি-ইসরাইলকে এই সমুদয়ের অধিকারী করেছিলাম।” (২৬:৫৯)

 

এই তিন আয়াতে হযরত মুসা ও তাঁর সঙ্গীদের সঙ্গে ফেরাউনের বিশাল সেনাবাহিনীর সংঘর্ষের পরিণতির কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: ফেরাউন পরাজিত ও নিহত হওয়ার ফলে তার ক্ষমতা, সিংহাসন, প্রাসাদ, উদ্যান ও অফুরন্ত ধন-সম্পদ বনি-ইসরাইলের হাতে চলে যায়।

হযরত মুসা (আ.) প্রথমে চেয়েছিলেন অত্যাচারী ফেরাউনের হাত থেকে বনি-ইসরাইল জাতিকে মুক্তি দিতে। কিন্তু মহান আল্লাহ দেন তার চেয়েও বিশাল কিছু। অত্যাচারী ফেরাউন তার দল-বলসহ নীল নদীতে ডুবে মারা যায় এবং তার বিশাল সাম্রাজ্য বনি-ইসরাইল জাতির হস্তগত হয়। যে প্রাসাদে বসে হযরত মুসার জাতিকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করা হয়েছিল সেই প্রাসাদ বনি-ইসরাইল জাতির নিয়ন্ত্রণে চলে আসে। এত বিশাল প্রাপ্তির কথা বনি-ইসরাইল জাতি চিন্তাই করেনি।

 

এ তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. জনগণের উপর অত্যাচারকারী শাসকরা টিকে থাতে পারে না। জালিম শাসকের পতন অনিবার্য।

২. অহংকারী ও জালিম শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করে নির্যাতিত জনগণকে ক্ষমতায় বসানো মহান আল্লাহর একটি গুরুত্বপূর্ণ রীতি।

৩. প্রচুর ধন-সম্পদশালী ব্যক্তি যদি তার সম্পদকে সঠিকভাবে ব্যবহার না করে তাহলে এই সম্পদ জীবনে সুখ ও সমৃদ্ধি আনার পরিবর্তে তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

 

সূরা শোয়ারার ৬০ থেকে ৬২ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে বলা হয়েছে:

  فَأَتْبَعُوهُمْ مُشْرِقِينَ (60) فَلَمَّا تَرَاءَى الْجَمْعَانِ قَالَ أَصْحَابُ مُوسَى إِنَّا لَمُدْرَكُونَ (61) قَالَ كَلَّا إِنَّ مَعِيَ رَبِّي سَيَهْدِينِ (62)

“(ফেরাউনের সেনাবাহিনী) সূর্যোদয়কালে তাদের পশ্চাদ্ধাবন করেছিল।” (২৬:৬০)

“অতঃপর যখন দু’দল পরস্পরকে দেখল- তখন মুসার সঙ্গীরা বলল- আমরা তো ধরা পড়ে গেলাম।” (২৬:৬১)

“মুসা বলল- কিছুতেই নয়, নিঃসন্দেহে আমার প্রতিপালক আমার সঙ্গে আছেন; তিনি আমাকে পথ-নির্দেশ করবেন।” (২৬:৬২)

আল্লাহতায়ালার নির্দেশ পেয়ে হযরত মুসা (আ.) বনি ইসরাইল জাতিকে নিয়ে রাতের অন্ধকারে নীল নদের দিকে রওনা হন। এদিকে খবর পেয়ে ফেরাউন তার সেনাবাহিনী ও দলবল নিয়ে খুব ভোরে নীল নদের দিকে ছুটে যায়। তারা দ্রুতগামী ঘোড়ায় রওনা হয় বলে খুব দ্রুত বনি-ইসরাইল জাতির কাছে পৌঁছে যায়। এ সময় হযরত মুসা ও তার সঙ্গীরা নিরস্ত্র ছিলেন এবং তাদের কাছে এমন কোনো বাহন ছিল না যাতে চড়ে তারা সেখান থেকে পালিয়ে যাবেন। ফলে খুব দ্রুত তারা তিন দিক দিয়ে ফেরাউনের বাহিনীর হাতে ঘেরাও হয়ে পড়েন। অন্যদিকে ছিল নীল নদ। তখন প্রাণভয়ে ভীত এসব মানুষ এমন অসহায় অবস্থায় পড়ে যাওয়ার জন্য হযরত মুসা (আ.)কে দায়ী করে বলল: তুমি যখন আমাদেরকে ডেকে এনেছিলে তখন কি জানতে না এরকম মৃত্যুর মুখোমুখি অবস্থায় আমরা পড়ে যেতে পারি? হযরত মুসা তখন শান্ত ও দৃঢ়চিত্তে আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ নির্ভরতায় জবাব দিলেন: তোমরা এমন আশঙ্কা করো না। যে আল্লাহ আমাদেরকে এখানে আসার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি আমাদেরকে অসহায় অবস্থায় ফেলবেন না বরং শিগগিরই আমাদেরকে মুক্তির উপায় বলে দেবেন।

 

এ তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. আমরাও যদি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহতায়ালা’র আদেশ-নিষেধ মেনে চলতে পারি তাহলে তিনি বিপদের সময় আমাদেরকে অবশ্যই রক্ষা করবেন। কাজেই কখনো নিরাশ হওয়া যাবে না বরং সব সময় তাঁর ওপর নির্ভর করতে হবে।

২. আল্লাহর প্রতিশ্রুতিতে নির্ভর করতে পারলে আমাদের মধ্যে কখনোই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা বা হতাশা কাজ করবে না। বরং আমরা সব সময় আল্লাহর সাহায্যের ব্যাপারে আশাবাদী থেকে নিজেদের ও অন্যের মানসিক প্রশান্তির কারণ হতে পারব।#

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন