এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
শুক্রবার, 01 জানুয়ারী 2016 17:56

সূরা আশ-শোয়ারা; আয়াত ৬৯:৭৭ (পর্ব-১১)

সূরা শোয়ারার ৬৯,৭০ ও ৭১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ إِبْرَاهِيمَ (69) إِذْ قَالَ لِأَبِيهِ وَقَوْمِهِ مَا تَعْبُدُونَ (70) قَالُوا نَعْبُدُ أَصْنَامًا فَنَظَلُّ لَهَا عَاكِفِينَ (71)

“(হে রাসূল) ওদের নিকট ইব্রাহিমের বৃত্তান্ত বর্ণনা করুন।” (২৬:৬৯)

“সে যখন তাঁর পিতাকে এবং তাঁর সম্প্রদায়কে বলল: তোমরা কিসের পূজা করো?” (২৬:৭০)

“তারা বলল, আমরা প্রতিমার পূজা করি এবং সারাদিন এদেরকে নিষ্ঠার সাথে আঁকড়ে থাকি।” (২৬:৭১)

 

সূরা শোয়ারায় হযরত মুসা (আ.)’র জীবনের যে অংশ বর্ণনা করা হয়েছে, আগের পর্বে আমরা তার শেষাংশ জেনেছি। আর এ আয়াত দিয়ে হযরত ইব্রাহিম (আ.)’র কাহিনী শুরু হয়েছে। পবিত্র কুরআনে হযরত মুসা (আ.)’র পর হযরত ইব্রাহিম (আ.)’র  নাম সবচেয়ে বেশিবার এসেছে।

 

বিভিন্ন ঐতিহাসিক গ্রন্থে এবং তাওরাতে হযরত ইব্রাহিম (আ.)’র পিতার নাম ‘তারুখ’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এই আয়াতে আল্লাহর এই নবীর পিতা বলে যার কথা উল্লেখ করা হয়েছে তিনি আসলে তার প্রকৃত পিতা ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন তার পালক পিতা যার নাম ছিল আযর। বিশ্বের বিভিন্ন জাতির সংস্কৃতিতে বিজ্ঞ ব্যক্তি বা আধ্যত্মিক নেতাদের পিতা বলে উল্লেখ করা হয়। খ্রিস্টানরা তাদের আধ্যাত্মিক গুরুকে পোপ বা পিতা বলে অভিহিত করে। এখানেও হযরত ইব্রাহিম (আ.)কে লালনপালনকারী ব্যক্তিকে তাঁর পিতা বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

রাসূলের যুগে মক্কার মুশরিক ও মূর্তিপূজকরা হযরত ইব্রাহিমকে চিনত এবং তাঁর নামেই প্রতি বছর হজ্বব্রত পালন করত। এ কারণে এই আয়াতে আল্লাহতায়ালা তাঁর রাসূলকে বলছেন: মুশরিকদেরকে এই নবীর কাহিনী শোনান এবং তাদেরকে বলুন, হযরত ইব্রাহিম (আ.) সারাজীবন মূর্তিপূজার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন।  তিনি কিশোর বয়সেই নিকটজনদেরকে শিরকের পথ থেকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য তাদের সামনে কিছু প্রশ্ন তুলে ধরেন। এসব প্রশ্নের মাধ্যমে হযরত ইব্রাহিম তার সম্প্রদায়ের লোকদের বিবেককে জাগ্রত করার চেষ্টা চালান। তিনি যদিও জানতেন মুশরিকরা কার পূজা করে তারপরও তিনি তাদের মুখ থেকেই উত্তরটি শুনতে চেয়েছেন যাতে পরবর্তী প্রশ্নগুলো উত্থাপন করা যায়। প্রত্যেকে তার নিজের কৃতকর্মের পক্ষে কথা বলবে এটাই স্বাভাবিক। হযরত ইব্রাহিম যখন তাদেরকে প্রশ্ন করেন, তোমরা কার পূজা করছ তখন তারা স্পষ্টভাবে জবাব দেয়: আমরা মূর্তিগুলোর পূজা করছি। তারা আরো বলে, আমরা শুধু মূর্তিগুলোর পূজাই করছি না বরং সারাক্ষণ এগুলোর সামনে মস্তক অবনত করে রাখছি।

 

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. আমরা নবী-রাসূলদের জীবনকাহিনী অধ্যয়ন করে তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ এবং সে শিক্ষাকে নিজেদের জীবনে কাজে লাগাতে পারি।

২. সমাজে প্রচলিত কুপ্রথা ও খারাপ কাজের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ক্ষেত্রে সরাসরি বাধা না দিয়ে প্রচলিত কাজের ব্যাপারে প্রশ্ন উত্থাপন করা যায়। যাতে সে প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে কুপ্রথায় লিপ্ত মানুষ তাদের কৃতকর্ম সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করতে বাধ্য হয়।

৩.  পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া ধর্ম ও সংস্কৃতির অন্ধ অনুসরণ না করে বিবেক দিয়ে চিন্তাভাবনা করে সঠিক পথ বেছে নিতে হবে।

৪. কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের ক্ষেত্রে নিজের একাকীত্ব কিংবা প্রতিপক্ষের সংখ্যাধিক্য নিয়ে ভয় পেলে চলবে না। হযরত ইব্রাহিম (আ.) একাকী মূর্তিপূজকদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন।

 

সূরা শোয়ারার ৭২,৭৩ ও ৭৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

  قَالَ هَلْ يَسْمَعُونَكُمْ إِذْ تَدْعُونَ (72) أَوْ يَنْفَعُونَكُمْ أَوْ يَضُرُّونَ (73) قَالُوا بَلْ وَجَدْنَا آَبَاءَنَا كَذَلِكَ يَفْعَلُونَ (74)

“(ইব্রাহিম) বলল: তোমরা যখন তাদের আহবান কর,তখন তারা শুনতে পায় কি?” (২৬:৭২)

“অথবা তারা কি তোমাদের উপকার কিংবা ক্ষতি করতে পারে?” (২৬:৭৩)

“তারা বলল: (না) তবে আমরা আমাদের পিতৃপুরুষদেরকে (দেখতে) পেয়েছি, তারা এরকমই করত।” (২৬:৭৪)

 

হযরত ইব্রাহিম (আ.) চেয়েছিলেন মূর্তিপূজকরা উপলব্ধি করুক যে, তাদের ইবাদত অর্থহীন। তাই তিনি তাদের কাছে আরো কিছু প্রশ্ন করেন: মুক্ত চিন্তার অধিকারী যেকোনো ব্যক্তি কাউকে মূর্তিপূজা করতে দেখলে স্বাভাবিকভাবেই এসব প্রশ্ন করবেন। প্রশ্নগুলো হচ্ছে: তোমরা যাদের পূজা করছ তারা কি তোমাদের কথা শুনতে পায় এবং তোমাদের প্রয়োজন সম্পর্কে কি তাদের কোনো ধারণা আছে? তারা কি তোমাদের প্রয়োজন মেটাতে বা তোমাদেরকে কোনো বিপদ-আপদ থেকে উদ্ধার করতে পারে? যদি না পারে তাহলে তোমার কেন তাদের সামনে মাথা অবনত করে তাদের উদ্দেশ্যে কুরবানি করছ?

 

মজার ব্যাপার হচ্ছে, হযরত ইব্রাহিমের সবগুলো প্রশ্নের উত্তরেই তারা না-সূচক জবাব দেয়। তারা সবাই জানতো মূর্তিগুলোর প্রাণ নেই এবং এগুলো তাদের কোনো কাজেই আসে না। কিন্তু এ কুসংস্কার ও কুপ্রথা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে তাদের একমাত্র যুক্তি ছিল এই যে, তাদের পূর্বপুরুষরা এ কাজ করে এসেছে। জাতিগত অন্ধত্ব ও গোঁড়ামি থেকে তারা এ কাজ করে যাচ্ছে। তাদের কথা শুনে মনে হয় তাদের পূর্বপুরুষরা ছিল পূর্ণাঙ্গ মানব এবং তারা কোনো ভুল করতে পারে না। অথচ পূর্বপুরুষদের রসম-রেওয়াজ অন্ধভাবে অনুসরণ করলে মানুষের চিন্তা করার স্বাধীনতা থাকে না এবং সঠিক পথ বেছে নিতে না পারার কারণে মানুষ পেছনের দিকে ধাবিত হয়।

 

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১.  আমাদের এমন কারো ইবাদত করা উচিত যিনি আমাদের সব খবর জানেন এবং আমাদের প্রয়োজনগুলো মেটাতে পারেন। তিনি হলেন মহান আল্লাহ।

২. সবসময়ই অন্ধ অনুসরণ ও মূর্খতা মানুষকে ভুল পথে নিয়ে যায়।

 

সূরা শোয়ারার ৭৫,৭৬ ও ৭৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

 

قَالَ أَفَرَأَيْتُمْ مَا كُنْتُمْ تَعْبُدُونَ (75) أَنْتُمْ وَآَبَاؤُكُمُ الْأَقْدَمُونَ (76) فَإِنَّهُمْ عَدُوٌّ لِي إِلَّا رَبَّ الْعَالَمِينَ (77)

“(ইব্রাহিম) বলল: তোমরা যাদের পূজা করে আসছ তাদের সম্পর্কে ভেবে দেখেছ কি?” (২৬:৭৫)

“তোমরা এবং তোমাদের পূর্বপুরুষরা?” (২৬:৭৬)

“বিশ্ব পালনকর্তা ছাড়া তারা সবাই আমার শত্রু  (এবং আমিও তাদের শত্রু)।”(২৬:৭৭)   

 

হযরত ইব্রাহিম (আ.) মূর্তিপূজকদের সামনে কিছু যুক্তিঙ্গত প্রশ্ন তুলে ধরার পর বলেন: তাহলে দেখলে তো তোমরা ও তোমাদের পূর্বপুরুষরা এমন কিছুর পূজা করছ যা তোমাদের কোনো কাজে আসে না? এ কারণে আমি এমন এক প্রভুর উপাসনা করি যিনি বিশ্বজাহানের পালনকর্তা। তিনি ছাড়া অন্য সবাই আমার শত্রু। কারণ আমি জানি, বিশ্বপালনকর্তা ছাড়া আর যাদেরকেই অনুসরণ করব তারা সবাই আমার ক্ষতি ছাড়া অন্য কিছু করতে পারবে না।

 

এ তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো: 

১. আল্লাহতায়ালাকে চিন্তাভাবনা করে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়ে মানতে হবে; না বুঝে তাকে অনুসরণ করলে কোনো ফল পাওয়া যাবে না বরং যেকোনো সময় পথভ্রষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

২. খাঁটি সত্য খুঁজে বের করার জন্য বিভিন্ন মতাদর্শের অনুসারীদের মধ্যে বিতর্ক অনুষ্ঠান একটি জরুরি বিষয়। নৈতিকতা ও যুক্তির নিয়ম মেনে বিতর্ক করা ছিল নবী-রাসূলদের বৈশিষ্ট্য।

৩. কল্পনাপ্রসূত ও মিথ্যা প্রভু মানুষের পূর্ণতায় পৌঁছানোর পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। #

 

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন