এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 05 জানুয়ারী 2016 11:41

সূরা আশ-শোয়ারা; আয়াত ৭৮:৮২ (পর্ব-১২)

সূরা শোয়ারার ৭৮, ৭৯ এবং ৮০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

   الَّذِي خَلَقَنِي فَهُوَ يَهْدِينِ (78) وَالَّذِي هُوَ يُطْعِمُنِي وَيَسْقِينِ (79) وَإِذَا مَرِضْتُ فَهُوَ يَشْفِينِ (80)

“তিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই আমাকে পথ-প্রদর্শন করেন।” (২৬:৭৮)

“তিনিই আমাকে আহার ও পানীয় দান করেন।” (২৬:৭৯)

“এবং রোগাক্রান্ত হলে তিনিই আমাকে আরোগ্য দান করেন।” (২৬:৮০)  

 

আগের পর্বে আমরা মূর্তিপূজকদের সঙ্গে হযরত ইব্রাহিম (আ.)’র কথোপকথন বর্ণনা করেছিলাম। সেখানে হযরত ইব্রাহিম (আ.) অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণ ভাষায় মূর্তিপূজকদের কাছে জিজ্ঞাসা করেন, এসব মূর্তি তো তোমাদের কোনো উপকার করতে পারে না, তারপরও কেন এসবের পূজা করছো। এর জবাবে মুশরিকদের কোনো যুক্তি ছিল না, বরং তাদের বক্তব্য ছিল একটিই। আর তা হলো- আমাদের পূর্বপুরুষরা এ কাজ করেছে বলে আমরাও করছি। আজকের এ তিন আয়াতে হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর আরো কিছু বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহর এ নবী মুশরিকদের উদ্দেশ করে আরো বলেন: এতক্ষণ তো তোমাদের প্রভুদের কথা শুনলাম। এবার তোমরা আমার প্রভুর কথা শোনো। আমার প্রভু হচ্ছেন তিনি যিনি আমাকে সৃষ্টি ও প্রতিপালন করেছেন। সত্য ও মিথ্যা এবং সঠিক ও ভুল পথ শনাক্ত করার মতো প্রজ্ঞা আমাকে দিয়েছেন। তিনি আমাকে বুদ্ধিবৃত্তি দিয়েছেন যাতে আমি সঠিক পথ খুঁজে বের করে সেই পথে চলতে পারি।  

 

হযতর ইব্রাহিম (আ.) আরো বলেন, আমার প্রতিপালক আমাকে শুধু সঠিক পথের দিশাই দেননি সেইসঙ্গে আমার শারীরিক প্রয়োজনগুলোও মিটিয়েছেন। তিনিই আমাকে খাদ্য ও পানীয় দিয়েছেন এবং এখনো দিচ্ছেন। তিনিই আমাকে শিখিয়েছেন অসুস্থ হলে কীভাবে সুস্থ হয়ে উঠতে হয় এবং আমার আরোগ্য লাভের বিষয়টিও তাঁর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আমার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত, আমার আত্মা ও শরীর, আমার সুস্থতা সব কিছুই আল্লাহর হাতে। কোনো সময়ই আমি তার থেকে বিচ্ছিন্ন নই এবং আমি না চাইতেই তিনি আমার প্রয়োজনগুলো মিটিয়ে থাকেন।

 

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. মানুষকে সৃষ্টি করার পর তার প্রতি আল্লাহর সবচেয়ে বড় নেয়ামত হলো তাকে সঠিক পথে পরিচালিত করা।

২. ওষুধ হচ্ছে চিকিৎসার মাধ্যম। কিন্তু ওষুধে কাজ হবে কিনা এবং মানুষ রোগমুক্তি পাবে কিনা তা সম্পূর্ণ নির্ভর করে আল্লাহতায়ালার ওপর। তিনি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দিয়ে আমাদের দেহ সৃষ্টি করেছেন; এমনকি শরীরে ক্ষত তৈরি হলেও তা ভরাট হয়ে যাওয়ার অবস্থা তৈরি করেই তিনি এই শরীর সৃষ্টি করেছেন। এ ছাড়া, রোগমুক্তির জন্য ওষুধ তৈরির বুদ্ধিও আল্লাহই মানুষকে দিয়েছেন। কাজেই দেখা যাচ্ছে, আমাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর ভূমিকা অপরিসীম।

 

সূরা শোয়ারার ৮১ ও ৮২ নম্বর আয়াতে  মহান আল্লাহ বলেছেন:  

وَالَّذِي يُمِيتُنِي ثُمَّ يُحْيِينِ (81) وَالَّذِي أَطْمَعُ أَنْ يَغْفِرَ لِي خَطِيئَتِي يَوْمَ الدِّينِ (82)

“এবং তিনিই আমার মৃত্যু ঘটাবেন, অতঃপর পুনরুজ্জীবিত করবেন।” (২৬:৮১)

“এবং আমি আশা করি তিনিই কেয়ামতের দিন আমার ক্রটি-বিচ্যুতি মাফ করবেন।” (২৬:৮২)

 

আগের তিন আয়াতে হযরত ইব্রাহিম (আ.) এই দুনিয়ায় আল্লাহর ক্ষমতা বর্ণনা করেন। আর এই দুই আয়াতে তিনি মৃত্যু পরবর্তী জীবনে মহান আল্লাহর ভূমিকা সম্পর্কে আলোকপাত করেন। তিনি মুশরিকদের একথা বোঝানোর চেষ্টা করেন, মানুষের জীবন ও মৃত্যু এবং ইহকালীন ও পারলৌকিক জীবনের সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হচ্ছেন আল্লাহতায়ালা। তিনি বলেন, একদিন যেমন এই দুনিয়াতে আমার অস্তিত্ব ছিল না বরং একদিন আল্লাহই আমাকে সৃষ্টি করেছেন; আবার তিনিই একদিন আমার জান কবজ করে আমাকে এই দুনিয়া থেকে নিয়ে যাবেন। কিন্তু মৃত্যু হলেও তিনি আমাকে ছেড়ে দেবেন না। ওই দুনিয়াতে তিনি আমাকে আবার জীবনদান করবেন। সেখানে আমি আমার ভালো কাজের প্রতিদান এবং খারাপ কাজের শাস্তি দেখতে পাবো। হযরত ইব্রাহিম (আ.) আরো বলেন, আমার প্রভু অত্যন্ত দয়ালু। তিনি শুধু এই দুনিয়াতেই তার বান্দাদের আহার ও পানীয় দেন না সেইসঙ্গে কিয়ামতের দিনও তিনি তাদের প্রতি দয়া দেখাবেন। আমি আশা করছি, এই দুনিয়াতে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যত গাফিলতিই করি না কেন তিনি তা উপেক্ষা করে আমাকে ক্ষমা করবেন।

 

আমরা বিশ্বাস করি, নবী-রাসূলরা নিস্পাপ ছিলেন। তারা কখনোই আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করেননি। কিন্তু তারপরও তারা সারাক্ষণ আল্লাহর দরবারে নিজেদেরকে অপরাধী ভাবতেন। রিসালাতের গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ভুল হয়ে থাকতে পারে ভেবে সব সময় আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতেন। অন্য কথায় নবী-রাসূলদের মূল দায়িত্ব ছিল মানুষকে আল্লাহর পথে হেদায়েত করা। তারা মনে করতেন, মানুষকে হেদায়েতের দায়িত্ব পালন করতে অর্থাৎ মানুষের কানে আল্লাহর বাণী পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে তাদের গাফিলতি হয়ে থাকতে পারে। এজন্য তারা আল্লাহর কাছে বারবার ক্ষমা চেয়েছেন।

 

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি বিষয় হলো:

১.  মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের জীবন শেষ হয়ে যায় না বরং এর মাধ্যমে আরেকটি জীবনের সূত্রপাত হয়।

২.  ভালো কাজ করে কখনো আত্মতুষ্টিতে ভোগা যাবে না। কারণ, কিয়ামতের দিন শুধুমাত্র নেক আমল দিয়ে মুক্তি পাওয়া যাবে না বরং অবশ্যই আল্লাহর অনুগ্রহের প্রয়োজন হবে। বিষয়টি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, নবীরা পর্যন্ত ওই দয়ার ভিখারি হবেন।

৩. আল্লাহর ক্ষমার প্রতি আশাবাদী থাকা এবং তাঁর কাছে মাগফেরাত কামনা করা ছিল নবী-রাসূলদের সুন্নত।

৪. জন্ম থেকে মৃত্যু এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবনের সব ক্ষেত্রে মানুষের সব প্রয়োজন একমাত্র আল্লাহই মেটাতে পারেন।#

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন