এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 05 জানুয়ারী 2016 11:42

সূরা আশ-শোয়ারা; আয়াত ৮৩:৮৯ (পর্ব-১৩)

সূরা শোয়ারার ৮৩ ও ৮৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:


رَبِّ هَبْ لِي حُكْمًا وَأَلْحِقْنِي بِالصَّالِحِينَ (83) وَاجْعَلْ لِي لِسَانَ صِدْقٍ فِي الْآَخِرِينَ (84)

“হে আমার প্রতিপালক! আমাকে জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দান করো এবং আমাকে সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভূক্ত করো।” (২৬:৮৩)

“এবং আমাকে পরবর্তীদের মধ্যে খ্যাতিসম্পন্ন করে দাও।” (২৬:৮৪)

আগের পর্বে বলা হয়েছে, আল্লাহর নবী হযরত ইব্রাহিম (আ.) মুশরিকদের প্রভুদের সঙ্গে মহান আল্লাহর তুলনা করেছেন। এ কাজে তার উদ্দেশ্য ছিল মুশরিকদের সামনে এ অকাট্য প্রমাণ তুলে ধরা যে, তোমাদের মূর্তিগুলোর পক্ষে কিছুই করা সম্ভব নয় অথচ বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহই সব ক্ষমতার উৎস। আজকের এই দুই আয়াত এবং পরবর্তী বেশ কয়েকটি আয়াতে হযরত ইব্রাহিম (আ.) আল্লাহতায়ালার কাছে কিছু আবেদন পেশ করেছেন যা শুরু হয়েছে ‘রাব্বি’ শব্দ দিয়ে যার অর্থ হে আমার প্রতিপালক। এ থেকে আল্লাহর সঙ্গে মানুষের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রমাণ পাওয়া যায়। অর্থাৎ, তিনি গোটা বিশ্বজগতের প্রতিপালক বলে আমার মতো ক্ষুদ্র প্রাণীর প্রতি যে তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই তা নয়। বরং তিনি আমার এতাটা নিকটবর্তী যে, আমি তাঁকে নিজের প্রতিপালক বলে সম্মোধন করছি। তাকে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে বলছি: রব্বি বা হে আমার প্রতিপালক!

হযরত ইব্রাহিম (আ.) প্রথমেই আল্লাহর কাছে যে বিষয়টি চেয়েছেন সেটি হচ্ছে হিকমত বা প্রজ্ঞা। গভীর জ্ঞান ও যুক্তি-বুদ্ধি দিয়ে মহাসত্যকে উপলব্ধি করার নাম হচ্ছে হিকমত। এরপর তিনি আল্লাহর সালেহ বান্দা বা সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভূক্ত হতে চেয়েছেন। যে নবীকে আল্লাহ প্রজ্ঞা দিয়ে এবং সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভূক্ত করে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন তাঁর পক্ষ থেকে এ ধরনের আবেদন-নিবেদন দেখে স্পষ্টভাবে বোঝা যায়, আল্লাহর ইবাদত করার ক্ষেত্রে আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো সুযোগ নেই। সারাক্ষণ আল্লাহর খাঁটি বান্দা হওয়ার জন্য চেষ্টা চালানোর পাশাপাশি এ কাজে তাঁর সাহায্যও চাইতে হবে। হযরত ইব্রাহিম (আ.) নিস্পাপ নবী হওয়া সত্ত্বেও ভুলক্রমেও যেন সিরাতুল মুস্তাকিম থেকে বিচ্যুত না হন এবং আল্লাহর কাছে তাঁর মর্যাদা যেন বাড়তেই থাকে সেজন্য আল্লাহর দরবারে এই দরখাস্ত করেছেন।

তৃতীয় যে দাবিটি তিনি আল্লাহর কাছে করেছেন সেটি হচ্ছে মৃত্যুর পর যেন তাঁর চিন্তাধারা ও সৎকর্ম পৃথিবীর বুকে চালু থাকে। একত্ববাদের প্রতি বিশ্বাস ও এক আল্লাহর ইবাদত করার যে প্রক্রিয়া তিনি পৃথিবীতে চালু করেছেন তা যেন হারিয়ে না যায় এবং তাঁর নাম যেন মানুষ ভুলে না যায়। হযরত ইব্রাহিম চেয়েছেন, কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবীতে আগমনকারী সব মানুষ যেন তাঁকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে এবং তাঁর দেখিয়ে দেয়া ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতাগুলো পালন করতে থাকে।

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:


১. সব কাজে বিশেষ করে জ্ঞান ও আধ্যাত্মিকতার দিক দিয়ে পূর্ণতায় পৌঁছার জন্য আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে।
২. হিকমত বা প্রজ্ঞা মহান আল্লাহর বিশেষ উপহার। পাক-পবিত্র ও তাকওয়াপূর্ণ অন্তরকেই কেবল তিনি এটি দান করেন।
৩. তারাই সদাচারণ ও সৎকর্ম করে এবং সত্যবাদী হয় যাদের অন্তঃকরণ পবিত্র এবং সারাক্ষণ সৎচিন্তায় মশগুল থাকে।
৪. প্রজ্ঞা লাভ এবং সৎকর্মপরায়ণদের অন্তর্ভূক্ত হতে পারা মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় সাফল্য।

সূরা শোয়ারার ৮৫ ও ৮৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:


وَاجْعَلْنِي مِنْ وَرَثَةِ جَنَّةِ النَّعِيمِ (85) وَاغْفِرْ لِأَبِي إِنَّهُ كَانَ مِنَ الضَّالِّينَ (86)

“এবং আমাকে সুখ-সম্পদপূর্ণ জান্নাতের অধকারীদের অন্তর্ভূক্ত করো।”(২৬:৮৫)

“এবং আমার পিতাকে ক্ষমা করো, তিনি তো পথভ্রষ্ট ছিলেন।” (২৬:৮৬)

হযরত ইব্রাহিম (আ.) চতুর্থ জিনিসটি চেয়েছেন মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য। এখান থেকে বোঝা যায়, আমাদের সবাইকে পার্থিব জীবনের কাজকর্মের পাশাপাশি আখেরাতের জন্যও চিন্তা করতে হবে এবং মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। আল্লাহর কাছে চাইতে হবে তিনি যেন আমাদের সঙ্গে দয়ার আচরণ করে তার নেয়ামতপূর্ণ জান্নাতে প্রবেশ করান। পিতা যেমন তার ফলের বাগান সন্তানদের জন্য রেখে যান এবং সন্তানরা বিনা পরিশ্রমে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বাগান থেকে সুস্বাদু ফল খেতে পারে, তেমনি দয়ালু আল্লাহ মুত্তাকি ও সৎকর্মপরায়ণদের জন্য রেখেছেন নিয়ামতপূর্ণ উদ্যান। এই ক্ষুদ্র জীবনে আমরা যে সামান্য আমল করতে পারি তার তুলনায় জান্নাত এত বেশি নিয়ামতপূর্ণ যে, স্বাভাবিক নিয়মে ক্ষণস্থায়ী জীবনের সামান্য আমল দিয়ে ওই চিরস্থায়ী জান্নাতে প্রবেশের সুযোগ পাওয়ার কথা নয়। কিন্তু মহান আল্লাহ অসীম দয়াময় বলে তিনি তাঁর নেক বান্দাদেরকে ওই নিয়ামতপূর্ণ জান্নাতে চিরস্থায়ী আবাস দান করবেন।

এরপর হযরত ইব্রাহিম (আ.) তার পালক পিতার জন্য দোয়া করেন যিনি মুশরিক ছিলেন। ইব্রাহিম (আ.) এর মনে এই আশা ছিল যে, তার পালক পিতা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবেন। এ কারণে, আল্লাহর নবী তার জন্য দোয়া করার ব্যাপারে পালক পিতাকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে তিনি তাকে ক্ষমা করে দেয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দরখাস্ত পেশ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হযরত ইব্রাহিমের পালক পিতা ঈমান আনেননি এবং এ কারণে আল্লাহর নবী তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ক্ষণস্থায়ী জীবনে মুমিন বান্দাদের সামান্য আমলের পরিবর্তে চিরস্থায়ী জান্নাত দান মহান আল্লাহর অশেষ করুণার বহিঃপ্রকাশ।
২. পূর্বপুরুষ ও ঘনিষ্ঠজনদের আত্মার মাগফিরাতের জন্য দোয়া করা নবী-রাসূলদের অন্যতম রীতি।

সূরা শোয়ারার ৮৭, ৮৮ ও ৮৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:


 (وَلَا تُخْزِنِي يَوْمَ يُبْعَثُونَ (87) يَوْمَ لَا يَنْفَعُ مَالٌ وَلَا بَنُونَ (88) إِلَّا مَنْ أَتَى اللَّهَ بِقَلْبٍ سَلِيمٍ (89)

“আমাকে পুনরুত্থান দিবসে লাঞ্ছিত (ও অপমানিত) করো না।” (২৬:৮৭)

“যে দিন ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতি কোনো কাজে আসবে না।” (২৬:৮৮)

“(সেদিন উপকৃত হবে সে) যে আল্লাহর নিকট বিশুদ্ধ অন্তঃকরণ নিয়ে আসবে।” (২৬: ৮৯)

হযরত ইব্রাহিমের সর্বশেষ এ আবেদন থেকে বোঝা যায়, নিজের প্রতি অর্পিত দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে তিনি সর্বোচ্চ আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছেন। যে দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করলে কিয়ামতের দিন লাঞ্ছিত ও অপমানিত হতে হবে এবং কোনো ব্যক্তি বা বস্তু ওই লাঞ্ছনার হাত থেকে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে রক্ষা করতে পারবে না। পার্থিব জীবনে অনেক সময় আর্থিক জরিমানা দিয়ে বিভিন্ন অপরাধের দণ্ড থেকে রক্ষা পাওয়া যায় অথবা বিচার ব্যবস্থাকে ঘুষ দিয়ে দণ্ড রহিত করা যায়। কিন্তু কিয়ামতের দিন কারো হাতে এমন কোনো অর্থ থাকবে না যা দিয়ে সে রক্ষা পেতে পারে।

পার্থিব জীবনে সন্তান-সন্তুতি মানুষের নানা উপকারে লাগলেও কিয়ামতের দিন পারিবারিক সম্পর্কের কোনো অর্থ থাকবে না বরং প্রত্যেকে যার যার মুক্তির উপায় খুঁজবে ও ‘ইয়া নাফসি’ ‘ইয়া নাফসি’ করবে। এমনকি পরম মমতাময়ী মা-ও সেদিন সন্তানদের কাছ থেকে পালিয়ে বাঁচতে চাইবে এবং আল্লাহর কাছে শুধু নিজের মুক্তির জন্য ফরিয়াদ জানাবে। সেই কঠিন দিনে যে জিনিসটি মানুষের মুক্তির মাধ্যম হবে তা হচ্ছে নেক আমল বা সৎকর্ম।  যে আমল মানুষ করেছে একাগ্রচিত্তে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য এবং যে আমলে লোক দেখানোর কোনো উপকরণ ছিল না। শিরক, কুফর ও ভণ্ডামিপূর্ণ নেক আমল পরকালে পৌঁছাবে না।

এ তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. মানুষ যত বেশি নেক আমলই করুক না কেন আত্মতুষ্টিতে ভোগার কোনো সুযোগ নেই; বরং সারাক্ষণ নিজের ভুল-ত্রুটির ব্যাপারে উদ্বেগের মধ্যে থাকতে হবে এবং কিয়ামতের দিন যাতে অপমানিত হতে না হয় সেজন্য আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে।
২. কিয়ামতের দিনের সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত হচ্ছে আল্লাহর বিচারের কাঠগড়ায় অন্য মানুষের সামনে অপমানিত ও লাঞ্ছিত হওয়া।
৩. ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্তুতি, সরকারি উচ্চ পদ, ক্ষমতা, বংশমর্যাদা ইত্যাদি কিয়ামতের দিন মানুষের কোনো কাজে আসবে না।
৪. আল্লাহর দরবারে সেই আমল গ্রহণযোগ্য হবে যা শুধুমাত্র তাঁর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে করা হবে যাতে ভণ্ডামি থাকবে না।#

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন