এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 05 জানুয়ারী 2016 11:51

সূরা আশ-শোয়ারা; আয়াত ৯০:১০১ (পর্ব-১৪)

সূরা শোয়ারার ৯০, ৯১, ৯২ ও ৯৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  وَأُزْلِفَتِ الْجَنَّةُ لِلْمُتَّقِينَ (90) وَبُرِّزَتِ الْجَحِيمُ لِلْغَاوِينَ (91) وَقِيلَ لَهُمْ أَيْنَ مَا كُنْتُمْ تَعْبُدُونَ (92) مِنْ دُونِ اللَّهِ هَلْ يَنْصُرُونَكُمْ أَوْ يَنْتَصِرُونَ (93)

“(সেদিন) সংযমীদের নিকটবর্তী করা হবে জান্নাত।” (২৬:৯০)

“এবং পথভ্রষ্টদের সামনে জাহান্নাম স্পষ্ট হয়ে উঠবে।” (২৬:৯১)

“ওদের বলা হবে,তারা কেথায়-তোমরা যাদের ইবাদত করতে?” (২৬:৯২)

“আল্লাহর পরিবর্তে (যেসব প্রভুদের)? ওরা কি তোমাদের সাহায্য করতে পারে নাকি, ওরা আত্মরক্ষা করতে সক্ষম?” (২৬:৯৩)

 

আগের পর্বে আল্লাহর দরবারে হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর কিছু আবেদন-নিবেদন নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। সে আলোচনার ধারাবাহিকতায় এই চার আয়াতে আল্লাহতায়ালা কিয়ামতের দিনের কঠিন পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছেন। সেখানে জান্নাতবাসী ও জাহান্নামবাসীর পরিচয় হিসেবে যথাক্রমে সংযমী ও পথভ্রষ্ট শব্দ দু’টি ব্যবহার করা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, কিয়ামতের দিন তাকওয়া ও ধৈর্য মানুষকে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাবে এবং যারা পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত তাদেরকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।

 

জাহান্নামবাসী যখন দেখতে পাবে তারা যাদের উপাসনা করত তারা তাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করতে পারছে না তখন তারা চরম দুর্দশায় পড়ে যাবে। সেদিন তারা উপলব্ধি করবে, দুনিয়ায় তারাই ছিল পথভ্রষ্ট। অথচ তারা নিজেদেরকে ঈমানদার বলে দাবি করত ও ঈমানদারদের পথভ্রষ্ট বলে উপহাস করতো।

 

এ চার আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. জান্নাত ও জাহান্নাম এমন একদিন মানুষের চোখের সামনে প্রতিভাত হয়ে উঠবে যেদিন নেক আমল করার আর কোনো সুযোগ থাকবে না।

২.  মুত্তাকি ও মুমিন ব্যক্তিকে আল্লাহ এত উচ্চ মর্যাদা দান করবেন যে, জান্নাতকে তাদের কাছে নিয়ে আসা হবে; কষ্ট করে তাদেরকে জান্নাত পর্যন্ত হেঁটে যেতে হবে না।

৩.  যেসব মূর্তি বা মানুষ নিজেদেরই রক্ষা করতে সক্ষম নয় তারা কীভাবে কিয়ামতের দিন আমাদেরকে রক্ষা করবে?

 

সূরা শোয়ারার ৯৪ থেকে ৯৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  فَكُبْكِبُوا فِيهَا هُمْ وَالْغَاوُونَ (94) وَجُنُودُ إِبْلِيسَ أَجْمَعُونَ (95) قَالُوا وَهُمْ فِيهَا يَخْتَصِمُونَ (96) تَاللَّهِ إِنْ كُنَّا لَفِي ضَلَالٍ مُبِينٍ (97) إِذْ نُسَوِّيكُمْ بِرَبِّ الْعَالَمِينَ (98)

“অতঃপর ওদের এবং পথভ্রষ্টদের (অর্থাৎ মিথ্যা প্রভু ও তাদের পথভ্রষ্ট বান্দাদের) অধঃমুখী করে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” (২৬:৯৪)

“এবং ইবলিসের বাহিনীর সকলকেও (জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে)।” (২৬:৯৫)

“ওরা সেখানে বিতর্কে লিপ্ত হয়ে বলবে।” (২৬:৯৬)

“আল্লাহর শপথ; আমরা তো স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে ছিলাম।” (২৬:৯৭)

“আমরা তোমাদেরকে বিশ্বজগতের প্রতিপালকের সমকক্ষ গণ্য করতাম।” (২৬:৯৮)

 

পবিত্র কুরআনের অন্যত্র এসেছে, মহান আল্লাহ কিয়ামতের দিন মুশরিকদের সামনে তাদের উপাস্য মূর্তিগুলোকে উপস্থিত করবেন এটা দেখানোর জন্য যে, তারা দুনিয়াতে যাদের উপাসনা করত এমনকি মানতের বিভিন্ন জিনিস যাদের সামনে হাজির করত তাদের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা নেই। আল্লাহর নির্দেশে যখন এসব মূর্তিকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে তখন তারা নিজেদেরকেই রক্ষা করতে পারবে না। কাজেই যারা নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারবে না তারা তো তাদের মিথ্যা বান্দাদেরও রক্ষাকারী হতে পারবে না। এ ছাড়া, ইবলিস ও তার বাহিনীর শয়তানদেরও জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে। সেখানে এই জাহান্নামিরা ভীষণ তর্কে লিপ্ত হবে এবং এই চরম দুবির্ষহ পরিণতির জন্য পরস্পরকে দোষারোপ করবে।

 

এর বিপরীতে জান্নাতে থাকবে আন্তরিকতা ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ। জাহান্নামে বিদ্যমান থাকবে হিংসা, বিদ্বেষ ও ঘৃণার পরিবেশ। জাহান্নামবাসী পরস্পরকে ঘৃণা করবে এবং নিজেদের বদ আমলের জন্য অনুতাপ করবে। তারা চিৎকার করে বলতে থাকবে- আমরা পথভ্রষ্ট ছিলাম, আমরা সময়মতো আল্লাহর প্রতি ঈমান আনিনি।

 

এ চার আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. পৃথিবীতে পাপকাজ ও বিভ্রান্তির ভিত্তিতে যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে তা কিয়ামতের দিন ঘৃণাপূর্ণ শত্রুতায় পরিণত হবে।

২. কিয়ামতের দিন মানুষের বিবেক জাগ্রত হবে এবং নিজের বিবেক নিজেকে অভিশাপ দেবে। কিন্তু সেদিনের অভিশাপ কোনো কাজে আসবে না বরং অনুতাপের পরিমানই কেবল বৃদ্ধি করবে।

 

সূরা শোয়ারার ৯৯, ১০০ ও ১০১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

  وَمَا أَضَلَّنَا إِلَّا الْمُجْرِمُونَ (99) فَمَا لَنَا مِنْ شَافِعِينَ (100) وَلَا صَدِيقٍ حَمِيمٍ (101)

“এবং দুষ্কৃতকারীরাই আমাদের বিভ্রান্ত করেছিল।” (২৬:৯৯)

“পরিণামে (আজ) আমাদের না আছে কোনো সুপারিশকারী।” (২৬:১০০)

“এবং না আছে কোনো সুহৃদয় বন্ধু।” (২৬:১০১)

 

মুশরিক ও মূর্তি পূজকরা কিয়ামতের দিন বলবে, আমাদেরকে যারা পথভ্রষ্ট ও বিভ্রান্ত করেছিল তারা ছিল কিছু সংঘবদ্ধ অপরাধী। যারা তাদের সম্পদ ও ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। আমরা তাদের অনুসরণ করেছি এই ভেবে যে, তাদের অনুসরণ করার মধ্যেই রয়েছে সফলতা ও মুক্তি। কিন্তু আজ আমরা বুঝতে পারছি যে, আমরা পথভ্রষ্ট হয়েছিলাম। আজ আমাদের না আছে কোনো শাফায়াতকারী ও না আছে সাহায্য করার জন্য ঘনিষ্ঠ কোনো বন্ধু। মুমিন ব্যক্তিদের মধ্যেও আমাদের কোনো বন্ধু নেই যে আজকের এই কঠিন দিনে আমাদের মুক্তির কাজে সাহায্য করতে পারে।

 

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. কিয়ামতের দিন প্রত্যেকে তার নিজের দোষ অন্যের ঘাড়ে চাপানোর চেষ্টা করবে। মুশরিক ও পথভ্রষ্ট ব্যক্তিরা তাদের মিথ্যা প্রভূদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানাবে।

২. কিয়ামতের দিন আল্লাহ শাফায়াতের পথ উন্মুক্ত রাখবেন। কিন্তু মুশরিকদের জন্য কেউ শাফায়াত করতে পারবে না। নবী-রাসূলগণ শুধু সেইসব মুমিনের জন্য শাফায়াত করবেন যারা তার যোগ্য।

৩. কিয়ামতের দিনও মানুষের উত্তম বন্ধুর প্রয়োজন হবে। কাজেই বন্ধু নির্বাচন করতে হবে এমনভাবে যাতে সে দুনিয়া এবং আখেরাত উভয় স্থানে আমাদের সাহায্যকারী হতে পারে। কেবলমাত্র ঈমানদার ব্যক্তিরাই হতে পারেন এমন বন্ধু। #

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন