এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 05 জানুয়ারী 2016 11:53

সূরা আশ-শোয়ারা; আয়াত ১০২:১০৯ (পর্ব-১৫)

সূরা শোয়ারার ১০২ থেকে ১০৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  فَلَوْ أَنَّ لَنَا كَرَّةً فَنَكُونَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ (102) إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَةً وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ (103) وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ (104)

“হায়! আমরা যদি আরেকবার (দুনিয়ায়) ফিরে যেতে পারতাম এবং মুমিনদের অন্তর্ভূক্ত হতাম!” (২৬:১০২)

“নিঃসন্দেহে এই (পরিণতিতে) রয়েছে শিক্ষা। কিন্তু তাদের বেশিরভাগই ঈমান আনেনি।” (২৬:১০৩)

“নিঃসন্দেহে তোমার প্রতিপালক অশেষ ক্ষমতাবান ও দয়ালু।” (২৬:১০৪)

 

আগের পর্বে বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন জাহান্নামবাসী ব্যক্তিরা এই পৃথিবীতে গোনাহগার ও অপরাধী ব্যক্তিদের অনুসরণের জন্য অনুতাপ করবে এবং জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার জন্য পরস্পরকে দোষারোপ করবে। আজকের তিন আয়াতে বলা হচ্ছে, জাহান্নামীরা প্রচণ্ড অনুশোচনায় আরেকবার পৃথিবীতে ফিরে আসার আকুতি জানাবে। তারা বলবে, আরেকবার দুনিয়ায় ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেয়া হলে তারা আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। তারা বলবে, আজ আমরা উপলব্ধি করছি যে, দুনিয়াতে আমরা ভুল করেছিলাম যার কারণে আজ এই দুর্বিষহ পরিণতি ভোগ করতে হচ্ছে। কিন্তু সেদিন এই অনুশোচনা কোনো কাজে আসবে না। কারণ, মৃত্যুর পর আর এই দুনিয়ায় ফিরে আসার কোনো সুযোগ থাকবে না।

 

পবিত্র কুরআনে তাদের এই আকুতির জবাবে বলা হচ্ছে: পৃথিবীতে তাদের সৎপথে ফিরে আসার জন্য বহু নিদর্শন দেয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা তা উপলব্ধি করে হেদায়েত পাওয়ার চেষ্টা করেনি। মহান আল্লাহ তাদেরকে ভ্রান্ত পথ থেকে সিরাতুল মুস্তাকিমে আসার জন্য গোটা জীবন সময় দিয়েছেন। কিন্তু সেই সুযোগ ও সময়ের অপব্যবহার করে তারা তাদের ভ্রান্ত পথে চলা অব্যাহত রেখেছে। কাজেই তারা আজ অনুতাপের যে কথা মুখে উচ্চারণ করছে তা ভণ্ডামি ছাড়া কিছু নয় এবং আজ যদি তাদেরকে আবার দুনিয়ায় পাঠানো হয় তারা ঈমান আনবে বলে মনে হয় না।

 

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. কিয়ামতের দিন হচ্ছে অনুতাপ ও অনুশোচনার দিন। কিন্তু সেদিনের অনুতাপ কোনো কাজে আসবে না।

২. মানুষ যদি অহংকার ও গোঁড়ামিতে ডুবে থাকে এবং সত্য গ্রহণের ইচ্ছা না করে তাহলে কুরআনের আয়াতও তাকে সৎপথ প্রদর্শন করতে পারে না।

৩.  মহান আল্লাহ একদিকে যেমন রহমান ও রহীম অন্যদিকে তেমনি প্রবল ক্ষমতাশালী ও সম্মানের অধিকারী। যারা গোঁড়ামির কারণে সত্য গ্রহণ করেনি তাদের সঙ্গে তিনি অত্যন্ত কঠোর আচরণ করবেন।

 

সূরা শোয়ারার ১০৫, ১০৬ ও ১০৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

  كَذَّبَتْ قَوْمُ نُوحٍ الْمُرْسَلِينَ (105) إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ نُوحٌ أَلَا تَتَّقُونَ (106) إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ (107)

“নুহের গোত্র আল্লাহর নবীদের অস্বীকার করেছিল।” (২৬:১০৫)

“যখন তাদের ভাই নুহ তাদেরকে বলল: তোমরা কি (আল্লাহকে) ভয় পাও না?” (২৬:১০৬)

“নিশ্চয়ই আমি তোমাদের জন্য বিশ্বস্ত নবী (হিসেবে আবির্ভূত হয়েছি)।” (২৬:১০৭)

 

হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ঘটনা বর্ণনার পর মহান আল্লাহ হযরত নুহ (আ.)-এর ঘটনা তুলে ধরেছেন। হযরত নুহ (আ.) যদিও হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর অনেক আগে এ পৃথিবীতে এসেছিলেন তারপরও পবিত্র কুরআনে আগে হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। কারণ, পবিত্র কুরআন কোনো ঐতিহাসিক গ্রন্থ নয় যে, সেখানে ইতিহাসের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে হবে।

 

পবিত্র কুরআনে ৪৩ বার হযরত নুহ (আ.)-এর নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং মহান আল্লাহ তার প্রতি বিশেষভাবে সালাম জানিয়েছেন। নুহের জাতি তাঁকে নবী হিসেবে অস্বীকার করেছিল, কিন্তু পবিত্র কুরআন বলছে: নুহের গোত্র সব নবীকে অস্বীকার করেছে। এর কারণ হচ্ছে, আল্লাহর সব নবী পৃথিবীতে এসেছিলেন তাঁর একত্ববাদের বাণী প্রচারের অভিন্ন মিশন নিয়ে। কাজেই তাদের যেকোনো একজনকে অস্বীকার করার অর্থ সব নবী ও রাসূলকে অস্বীকার করা।

 

সব যুগের সব নবী দাওয়াতের কাজ শুরু করার আগেই তার গোত্র ও সম্প্রদায়ের কাছে সৎ ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী বলে পরিচিত ছিলেন। তাঁদের নবী হওয়ার ব্যাপারেও বেশিরভাগ মানুষের কোনো সন্দেহ ছিল না। কিন্তু অহংকার ও গোঁড়ামির কারণে তারা নবী-রাসূলদের দাওয়াতের বাণী প্রত্যাখ্যান করে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি ও ইন্দ্রিয়পূজায় ডুবে ছিল।

 

নবী-রাসূলরা অত্যন্ত ভ্রাতৃত্বপূর্ণ ও আন্তরিক ভাষায় জনগণের সামনে প্রশ্ন রেখে বলতেন: তোমরা কেন তোমাদের প্রতিপালকের সামনে খারাপ কাজ করতে লজ্জা পাও না? কিন্তু কাফের মুশরিকরা উত্তর দেয়াতো দূরের কথা- এ ধরনের প্রশ্ন শুনতেও প্রস্তুত ছিল না। তারা সব সময় নবী-রাসূলদের এড়িয়ে চলত এবং নবীকে আসতে দেখলে তারা অন্য রাস্তা দিয়ে পালিয়ে যেত।

 

এ তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে:

১. সব নবী-রাসূল অভিন্ন লক্ষ্য নিয়ে পৃথিবীতে এসেছিলেন বলে তাদের যেকোনো একজনকে অস্বীকার করার অর্থ সব নবী-রাসূলকে অস্বীকার করা।

২. নবী-রাসূলরা তাদের গোত্র ও সমাজের লোকজনের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ আচরণ করতেন এবং নিজেদেরকে সাধারণ মানুষ বলে পরিচয় দিতেন। কখনোই তাদের অধিপতির মতো আচরণ করতেন না।

৩. মানুষের সুপ্ত বিবেককে জাগ্রত করার সর্বোত্তম উপায় হলো প্রশ্ন করা। স্বাভাবিক বাক্য প্রয়োগের চেয়ে প্রশ্ন করলে এক্ষেত্রে ভালো ফল পাওয়া যায়।

 

সূরা শোয়ারার ১০৮ ও ১০৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ (108) وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ (109)

“কাজেই আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার নির্দেশ মেনে চলো।”  (২৬:১০৮)

“আমি আমার এই (রেসালাতের জন্য) তোমাদের কাছে কোনো উপহার চাই না। বিশ্বজগতের প্রতিপালক ছাড়া আমার আর কোনো পুরস্কারের প্রয়োজন নেই।” (২৬:১০৯)

 

এখানে আরেকবার মানুষকে তাকওয়া বা আল্লাহভীতির প্রতি আহ্বান এবং তার পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে। যে কারণে মানুষ পাপকাজের দিকে ধাবিত হয় তা হলো সেই মহান আল্লাহকে ভুলে যাওয়া যিনি অসংখ্য নেয়ামত দান করে আমাদেরকে ঋণের জালে আবদ্ধ করেছেন। হযরত নুহ (আ.) এ বক্তব্যের মাধ্যমে তাঁর জাতিকে একথা বোঝানোর চেষ্টা করেন, যে আল্লাহ তোমাদেরকে দয়া করে বাঁচিয়ে রেখেছেন এবং যিনি তোমাদেরকে দু’বেলা অন্ন দান করেন তার অবাধ্যতা তোমরা কীভাবে করছো? এরপর গোনাহ থেকে দূরে থাকা এবং সত্যে পৌঁছানোর উপায় বাতলে দিয়ে আল্লাহর নবী বলেন: আমি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের সৎপথ প্রদর্শনের জন্য এসেছি। যদি আমার কথা শোনো তাহলে তোমরাই লাভবান হবে। এখানে আমার বিন্দুমাত্র স্বার্থ নেই। আমি ধন-সম্পদ বা প্রভাব-প্রতিপত্তি কিছুই চাই না।  আমি যদি আমার রেসালাতের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করি তাহলে মহান আল্লাহই আমাকে পুরস্কৃত করবেন এবং আমার সব অভাব পূরণ করবেন।

 

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. মানুষকে হেদায়েত করার ক্ষেত্রে আল্লাহকে স্মরণ এবং তাঁকে ভয় করার মতো বিষয়গুলো বারবার তুলে ধরতে হবে যাতে মানুষ তার স্রষ্টাকে ভুলে গিয়ে পথভ্রষ্ট হয়ে না যায়।

২. দ্বীনের প্রচারক যেসব আলেম মানুষকে আল্লাহর পথে হেদায়েতের দায়িত্ব পালন করছেন- মানুষের কাছ থেকে দুনিয়াবি স্বার্থ গ্রহণ করা তাদের উচিত হবে না; বরং একান্তভাবেই আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে এ কাজ করতে হবে এবং তার ওপর পরিপূর্ণভাবে নির্ভর করতে হবে। তাহলেই তাদের বক্তব্য সাধারণ মানুষের মনে বেশি প্রভাব ফেলবে এবং মানুষ দ্বীনের দাওয়াত গ্রহণ করবে।#

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন