এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 05 জানুয়ারী 2016 11:54

সূরা আশ-শোয়ারা; আয়াত ১১০:১১৫ (পর্ব-১৬)

সূরা শোয়ারার ১১০ ও ১১১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ (110) قَالُوا أَنُؤْمِنُ لَكَ وَاتَّبَعَكَ الْأَرْذَلُونَ (111)

“সুতরাং আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো।” (২৬:১১০)

“ওরা বলল- যখন গরীব ও ইতর লোকেরা তোমার অনুসরণ করছে তখন কি আমরা তোমার প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করব?” (২৬:১১১)

 

আগের পর্বে বলা হয়েছে, হযরত নূহ (আ.) সব সময় তার জাতির লোকদের তাকওয়া অর্জন করতে এবং গোনাহর কাজ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানাতেন। সেইসঙ্গে আল্লাহর রাস্তায় কীভাবে চলতে হয় তা নিজের জীবনে বাস্তবায়ন করে দেখিয়ে দিয়ে সেই জীবনকে অনুসরণ করার জন্য জনগণকে আহ্বান জানাতেন। আজকের দুই আয়াতও শুরু হয়েছে সেই আহ্বানের পুনরাবৃত্তি করে। কিন্তু নবীর এ আহ্বানের প্রতি কাফেরদের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল এই যে, তারা বলল- তোমাকে যারা অনুসরণ করছে তারা তো হতদরিদ্র ও সমাজে নীচু শ্রেণির মানুষ হিসেবে পরিচিত। তাদের না আছে টাকা-পয়সা আর না আছে প্রভাব-প্রতিপত্তি। এসব লোক তো আমাদের কাজ-কর্ম করে দেয় এবং তাদের মধ্যে সমাজে মাথা উঁচু করে কথা বলার মতো কোনো লোক নেই। কাজেই, আমরা কীভাবে তাদের দলে ভিড়ে তোমার আনুগত্য করবো?

 

প্রকৃতপক্ষে এসব অবিশ্বাসীর কাছে মানুষের মর্যাদা ছিল অর্থ-সম্পদ, প্রভাব-প্রত্তিপত্তি ও ক্ষমতায়। এসবের কোনো কিছুই হযরত নূহ (আ.)এর অনুসারীদের ছিল না বলে কাফেররা আল্লাহর বাণী গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয়নি। অথচ হযরত নূহ এবং আল্লাহর দৃষ্টিতে মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হয় তাকওয়ার মাধ্যমে। কে নিজেকে পাপকাজ থেকে কতটা মুক্ত রাখতে পেরেছে এবং কতটা তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন করতে পেরেছে তার ভিত্তিতে আল্লাহর কাছে মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হয়। সাধারণভাবে দরিদ্র মানুষের মধ্যে এই গুণাবলী বেশি দেখা যায়। এটি সব যুগে ছিল এবং বর্তমান যুগের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

 

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ধন-সম্পদ ও প্রভাব-প্রতিপত্তির অনেকগুলো খারাপ দিক রয়েছে। এর একটি হলো সম্পদশালী লোকজন অহংকারী হয় এবং দরিদ্র ও দুর্বল শ্রেণির মানুষকে তুচ্ছ ও ইতর ভাবে।

২. সত্য গ্রহণের জন্য কারা এটি গ্রহণ করেছে তা দেখা উচিত নয়। অমুক অমুক সত্য গ্রহণ করেছে বলে আমি গ্রহণ করবো না- এটি কোনো অজুহাত হতে পারে না।

৩. নবী-রাসূলরা সব মানুষকে সমান চোখে দেখতেন এবং তাদের মধ্যে কোনো বৈষম্য করতেন না।

 

সূরা শোয়ারার ১১২ ও ১১৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

 قَالَ وَمَا عِلْمِي بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (112) إِنْ حِسَابُهُمْ إِلَّا عَلَى رَبِّي لَوْ تَشْعُرُونَ (113)

“নূহ বলল- ওরা কি করত, তার আমি কি জানি?” (২৬:১১২)

“ওদের হিসাব গ্রহণ তো আমার প্রতিপালকেরই কাজ, যদি তোমরা বুঝতে।” (২৬:১১৩)

 

নিজ জাতির অহংকারী ব্যক্তিদের অজুহাতের জবাবে  হযরত নূহ (আ.) বলেন: আমার দায়িত্ব হচ্ছে সমাজের সবার কাছে একত্ববাদের বাণী তুলে ধরা এবং বাতিলের পথ থেকে তোমাদেরকে বিরত রাখার দাওয়াত দেয়া। আমার দাওয়াত শুনে কারা ঈমান আনল এবং কারা ঈমান আনল না তাতে আমার কোনো হাত নেই। এ ছাড়া, যারা ঈমান এনেছে তাদের পেশা কি এবং তারা অতীতে কি কাজ করতো তা দেখাও আমার দায়িত্ব নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, তারা ঈমান এনেছে এবং এখন তারা ঈমানদার। তোমরা যদি একটু চিন্তা করো তাহলে উপলব্ধি করবে-তাদের অতীত কাজের হিসাব-নিকাশ আল্লাহর হাতে এবং সে হিসাব নেয়া আমার কাজ নয়। কাজেই তাদের অতীত নিয়ে আমার সঙ্গে তর্ক করে এ বিষয়টিকে নিজেদের ঈমান না আনার অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিও না।

 

ইসলামে অন্যের ব্যক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ বা অপরের ছিদ্রান্বেষণ করা এবং অপরের দোষ-ত্রুটি মানুষের মধ্যে প্রচার করতে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। কাজেই কেউ যদি মুখে ঈমান আনে এবং ঈমানদারের আচরণ করে তাহলে তার অতীত কর্মকাণ্ডকে খুঁচিয়ে বের করে তাকে কাফের বলে প্রত্যাখান করার অধিকার আমাদের নেই।

 

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১.  নবী-রাসূলরা মানুষের অতীত ও বর্তমানের কতটুকু জানবেন তা সম্পূর্ণভাবে নির্ভর করে মহান আল্লাহর উপর। গায়েব বা অদৃশ্যের খবর সরাসরি জানার ক্ষমতা নবী-রাসূলদের নেই।

২. প্রত্যেক ব্যক্তি তার ভালো ও মন্দ কাজের হিসাব আল্লাহর কাছে দেবে। এখানে একজনকে আরেকজনের দায়িত্ব নিতে হবে না। কিয়ামতে কার পরিণতি কি হবে তা বলার কোনো অধিকার আমাদের নেই।

 

সূরা শোয়ারার ১১৪ ও ১১৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

  وَمَا أَنَا بِطَارِدِ الْمُؤْمِنِينَ (114) إِنْ أَنَا إِلَّا نَذِيرٌ مُبِينٌ (115)

“আমি কখনো ঈমানদারদের তাড়িয়ে দেবো না।” (২৬:১১৪)

“আমি তো কেবল একজন স্পষ্ট সতর্ককারী।” (২৬:১১৫)

 

হযরত নূহ (আ.)-এর বিরোধীরা আল্লাহর নবীকে এই শর্ত দিয়েছিল যে, যেসব দরিদ্র লোক ঈমান এনেছে তাদেরকে যদি তিনি ত্যাগ করেন তাহলেই তারা ঈমান আনবে। যদিও এটি ছিল কাফিরদের নিছক অজুহাত। কারণ, হযরত নূহ (আ.) যদি ঈমানদার ব্যক্তিদের তাড়িয়ে দিতেন তারপরও তারা ঈমান গ্রহণ না করার জন্য অন্য কোনো অজুহাত দাঁড় করাতো।

কিন্তু হযরত নূহ কাফেরদের এ দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বলেন: আমার কাজ হচ্ছে হেদায়েতের বাণী প্রচার করে তোমাদেরকে সৎপথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা। আমি অর্থ-সম্পদ বা নামডাক কুড়ানোর জন্য আসিনি। কাজেই গরীব লোকদের তাড়িয়ে দিয়ে আমি নিছক সম্পদের মোহে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের দিকে ছুটে যেতে পারব না।

 

মজার ব্যাপার হলো- পবিত্র কুরআনে আরো অনেক নবীর ঘটনা এসেছে যাদের সম্প্রদায়ের ধনী লোকেরা এই একই অজুহাত তুলে ধরেছিল। তারাও তাদের নবীকে বলেছিল, যদি তুমি তোমার আশপাশ থেকে দরিদ্র লোকদের তাড়িয়ে দিতে পারো তাহলেই আমরা তোমার প্রতি ঈমান আনবো। কিন্তু সেসব নবীও সম্পদশালী কাফিরদের এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে বলেছিলেন, সমাজের সবার কাছে সত্যের বাণী পৌঁছে দেয়া আমার কাজ; কোনো বিশেষ শ্রেণির কাছে নয়।

 

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. অবিশ্বাসীদের ভ্রান্ত দাবি দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে এবং তাদেরকে আকৃষ্ট করার জন্য মুমিনদের বিতাড়িত করা যাবে না।

২. ঐশী ধর্মগুলোতে মানুষের মর্যাদা নির্ধারিত হয় ঈমানের ভিত্তিতে; তাদের ধন-সম্পদ বা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে নয়।#

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন