এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 05 জানুয়ারী 2016 11:57

সূরা আশ-শোয়ারা; আয়াত ১১৬:১২৭ (পর্ব-১৭)

সূরা শোয়ারার ১১৬, ১১৭ ও ১১৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-

    قَالُوا لَئِنْ لَمْ تَنْتَهِ يَا نُوحُ لَتَكُونَنَّ مِنَ الْمَرْجُومِينَ (116) قَالَ رَبِّ إِنَّ قَوْمِي كَذَّبُونِ (117) فَافْتَحْ بَيْنِي وَبَيْنَهُمْ فَتْحًا وَنَجِّنِي وَمَنْ مَعِيَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ (118)

“ওরা বলল- হে নূহ! তুমি যদি (দাওয়াতের কাজ থেকে) নিবৃত্ত না হও,তাহলে তোমাকে অবশ্যই প্রস্তরাঘাতে হত্যা করা হবে।” (২৬:১১৬)

“নূহ বলল- হে আমার প্রতিপালক! আমার সম্প্রদায় তো আমাকে মিথ্যাবাদী বলছে।” (২৬:১১৭)

“সুতরাং আমার ও ওদের মধ্যে স্পষ্ট মীমাংসা করে দাও (এবং একটি পথ বাতলে দাও) এবং আমাকে ও আমার সাথে যে সব ঈমানদার আছে,তাদেরকে (কাফেরদের অনিষ্ট থেকে) রক্ষা করো।” (২৬:১১৮)

 

আগের পর্বে বলা হয়েছে, হযরত নূহ (আ.) যখন মানুষকে আল্লাহর একত্ববাদ ও তাকওয়ার দিকে আহ্বান জানান, তখন অবিশ্বাসীরা তাঁর অনুসারীদের দরিদ্র বলে হেয় প্রতিপন্ন করে এবং তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য আল্লাহর নবীর প্রতি আহ্বান জানায়। তারা বলে, এসব হতদরিদ্র ও নীচু শ্রেণির লোকেরা দূরে সরে না যাওয়া পর্যন্ত আমরা ঈমান আনব না।

 

এই তিন আয়াতে অবিশ্বাসীদের ক্রোধের মাত্রা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তারা আল্লাহর নবীকে সরাসরি হত্যার হুমকি দিয়ে বলে, তুমি যদি দাওয়াতের কাজ থেকে বিরত না থাকো তাহলে তোমাকে পাথর মেরে হত্যা করা হবে। এ অবস্থায় হযরত নূহ (আ.) এসব কাফেরের ঈমান আনার ব্যাপারে হতাশ হয়ে পড়েন এবং আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন তিনি যেন কাফেরদের সঙ্গে তাঁর এই বিরোধের একটা চূড়ান্ত ফয়সালা করে দেন। আল্লাহ যেন এমন মীমাংসা দেন যাতে আল্লাহর নবী ও তাঁর অনুসারীরা কাফেরদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা পান।

 

এ তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১.  যুগে যুগে কাফের মুশরিকরা নবী-রাসূলদের ওপর অত্যাচার ও নির্যাতন চালিয়েছে, এমনকি তাদের অনেককে হত্যা করেছে। কিন্তু তারপরও তাঁরা তাদের দাওয়াতি কাজ চালিয়ে যেতে বিন্দুমাত্র ভয় পাননি বা পিছ পা হননি।

২. অত্যাচারীদের অনিষ্ট থেকে রক্ষা পেতে আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে। তাহলে তিনি নিশ্চয়ই একটা পথ বের করে দেবেন।

 

সূরা শোয়ারার ১১৯ থেকে ১২২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

   فَأَنْجَيْنَاهُ وَمَنْ مَعَهُ فِي الْفُلْكِ الْمَشْحُونِ (119) ثُمَّ أَغْرَقْنَا بَعْدُ الْبَاقِينَ (120) إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَةً وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ (121) وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ (122)

“অতঃপর আমি তাকে ও তার সঙ্গে যারা ছিল,তাদের রক্ষা করলাম (মানুষ ও পশু) বোঝাই নৌকায়।” (২৬:১১৯)

“তৎপর অবশিষ্ট লোককে নিমজ্জিত করলাম (এবং ডুবিয়ে মারলাম)।” (২৬:১২০)

“এতে অবশ্যই নিদর্শন আছে, কিন্তু ওদের অধিকাংশই বিশ্বাসী ছিল না।” (২৬:১২১)

“এবং তোমার প্রতিপালক, তিনি তো পরাক্রমশালী, দয়াময়।” (২৬:১২২)

 

পবিত্র কুরআনের অন্যত্র এসেছে, মহান আল্লাহ হযরত নূহ (আ.)কে বিশাল একটি কিশতি বা নৌকা তৈরির নির্দেশ দিয়ে বলেন, প্রত্যেক প্রাণী ও উদ্ভিদের এক এক জোড়া ওই কিশতিতে তুলে নিতে হবে। এরপর যেসব মানুষ ঈমান এনেছিল তাদেরকেও কিশতিতে তুলে নেয়ার নির্দেশ দিলেন। সব মুমিন কিশতিতে উঠে যাওয়ার পর আল্লাহর নির্দেশে মাটি ফেটে পানি বের হতে থাকে এবং আকাশ থেকে নেমে আসে প্রবল বর্ষণ। শুরু হয় মহা প্রলয়ংকর ঝড়-তুফান ও বন্যা। হযরত নূহের কিশতিতে অবস্থানরত ঈমানদার ব্যক্তিরা এ তুফান থেকে রক্ষা পান এবং অবিশ্বাসী কাফেরদের সবাই ডুবে মারা যায়।

নিঃসন্দেহে এই সত্য ঘটনা মহান আল্লাহর কুদরতেরই একটি  নিদর্শন। কিন্তু এ ঘটনা জানার পরও হযরত নূহের পরবর্তী জাতিগুলিও আল্লাহর প্রতি ঈমান আনেনি।

 

এ চার আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. আল্লাহতায়ালা নবী-রাসূল ও আউলিয়াদের দোয়া কবুল করেন এবং তাদেরকে সব ধরনের অনিষ্ট থেকে রক্ষা করেন।

২. নবী-রাসূলদের প্রদর্শিত পথ প্রত্যাখ্যান ধ্বংস ডেকে আনে।

৩. মহান আল্লাহ যুগে যুগে মুমিনদের সহযোগিতা করেছেন এবং অবিশ্বাসীদের দমন করেছেন।

 

সূরা শোয়ারার ১২৩ ও ১২৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

كَذَّبَتْ عَادٌ الْمُرْسَلِينَ (123) إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ هُودٌ أَلَا تَتَّقُونَ (124)

“আদ সম্প্রদায়ও রসূলগণের প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছিল।” (২৬:১২৩)

“যখন ওদের ভ্রাতা হুদ ওদের বলল, তোমরা কি তাকওয়া অবলম্বন করবে না?” (২৬:১২৪)

 

হযরত নূহের পর পবিত্র কুরআনে হযরত হুদ (আ.)-এর কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। তিনি আদ জাতিকে সৎপথ প্রদর্শনের দায়িত্ব প্রাপ্ত হয়েছিলেন। এই জাতি বর্তমান সৌদি আরবের দক্ষিণে অবস্থিত ‘ইহকাফ’ নামক স্থানে বসবাস করত। বর্তমানে এই ভূখণ্ডের একাংশ ইয়েমেনের মধ্যে পড়েছে। এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: আদ জাতিও অতীতের জাতিগুলোর মতো সব নবীকে অস্বীকার করে। তারা হযরত হুদ (আ.) এর বাণী মেনে নিতে রাজি হয়নি। আল্লাহর এ নবীও তাঁর সম্প্রদায়ের লোকদের এক আল্লাহর ইবাদত করতে এবং সব ধরনের খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

 

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. সব নবী রাসূল এক আল্লাহর ইবাদত করার দাওয়াত দিতে এসেছিলেন বলে তাদের যেকোনো একজনকে অস্বীকার করার অর্থ হলো সব নবী-রাসূলকে অস্বীকার করা।

২. নবী-রাসূলরা নিজেদেরকে সমাজের আর দশজন মানুষের মতোই মনে করতেন কখনোই নিজেদেরকে তাদের অধিপতি ভাবেননি। এর মাধ্যমে দায়িত্ব পালনে তাঁদের আন্তরিকতার প্রমাণ পাওয়া যায়।

 

এই সূরার ১২৫ থেকে ১২৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে,

إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ (125) فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ (126) وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ (127)  

“আমি তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রাসূল।” (২৬:১২৫)

“অতএব আল্লাহকে ভয় করো ও আমার আনুগত্য করো।” (২৬:১২৬)

“আমি তোমাদের নিকট এর জন্য কোনো প্রতিদান চাই না,আমার পুরস্কার তো বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকটই আছে।” (২৬:১২৭)

 

সব নবী-রাসূল তাঁদের যুগের মানুষের মধ্যে সবচেয়ে উত্তম চরিত্রের অধিকারি ছিলেন এবং প্রায় সবাই আমিন বা বিশ্বস্ত হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। এ কারণে সমাজের ন্যায়পরায়ণ লোকেরা সচ্চরিত্রবান নবী-রাসূলদের প্রতি ঈমান আনত। এ তিন আয়াতের দেখা যাচ্ছে, হযরত হুদ (আ.)ও হযরত নূহ (আ.)-এর মতো দাওয়াতের একই বাণী তাঁর জাতির সামনে তুলে ধরছেন। তিনি বলছেন:  আল্লাহর অবাধ্য হয়ো না। জীবন চলার সঠিক পথ পেতে চাইলে আমার আনুগত্য করো। আমার আনুগত্য করলে তোমাদেরকে চূড়ান্ত সাফল্যের পথ দেখিয়ে দেবো। কিন্তু হযরত হুদের বিরোধিতাকারীরা সত্য মেনে নিতে প্রস্তুত ছিল না। তারা নিজেদের মতে অটল থাকার জন্য নানা ফন্দি-ফিকির ও অজুহাত তুলে ধরে। এ অবস্থায় আল্লাহর নবী অবিশ্বাসীদের অজুহাত সৃষ্টির বিষয়টিকে প্রত্যাখ্যান করে স্পষ্ট ভাষায় বলেন: আমি তোমাদের কাছে পুরস্কার হিসেবে কিছুই চাই না। তোমরা ভেবো না যে, আমি রেসালাতের দায়িত্ব পালনের বিনিময়ে তোমাদের কাছ থেকে কোনো দুনিয়াবি স্বার্থ আদায় করতে চাই। আমাকে মহান আল্লাহ তোমাদের অমুখাপেক্ষী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন এবং দুনিয়া ও আখেরাতে আমি তাঁর দয়া লাভ করবো।

 

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. দুনিয়া ও আখেরাতে সফলকাম হতে হলে আল্লাহর বিরোধিতা থেকে বিরত থাকতে এবং নবী-রাসূলদের অনুসরণ করতে হবে।

২. ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে সফলতার চাবিকাঠি হচ্ছে এর বিনিময়ে মানুষের কাছ থেকে কোনো কিছু প্রত্যাশা না করে একমাত্র আল্লাহর কাছে থেকে পুরস্কার লাভের আশা করা।#

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন