এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 05 জানুয়ারী 2016 11:58

সূরা আশ-শোয়ারা; আয়াত ১২৮:১৩৬ (পর্ব-১৮)

সূরা শোয়ারার ১২৮, ১২৯ ও ১৩০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  أَتَبْنُونَ بِكُلِّ رِيعٍ آَيَةً تَعْبَثُونَ (128) وَتَتَّخِذُونَ مَصَانِعَ لَعَلَّكُمْ تَخْلُدُونَ (129) وَإِذَا بَطَشْتُمْ بَطَشْتُمْ جَبَّارِينَ (130)

“তোমরা তো প্রবৃত্তির তাড়নায় (অযথা) প্রতিটি উচ্চস্থানে স্তম্ভ নির্মাণ করছো।” (২৬:১২৮)

“তোমরা প্রাসাদ নির্মাণ করছো এই মনে করে যে,তোমরা চিরস্থায়ী হবে।” (২৬:১২৯)

“আর যখন তোমরা আঘাত হানো, তখন আঘাত হানো জালেমের মতো ও নিষ্ঠুরভাবে।” (২৬:১৩০)

 

আগের পর্বে বলা হয়েছে, আদ জাতিকে সৎপথ প্রদর্শনের জন্য হযরত হুদ (আ.) পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়েছিলেন। এই তিন আয়াতে বলা হচ্ছে: হযরত হুদের সঙ্গে বিরোধিতাকারীরা ছিল সম্পদশালী এবং বিলাসী জীবনে অভ্যস্ত। অহংকারী এসব লোক আত্মম্ভরিতা দেখানোর জন্য উঁচু পাহাড় ও টিলার উপর বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণ করতো। কোনো মানুষের বসবাসের জন্য এসব স্থাপনা প্রয়োজন ছিল না বরং মাঝেমধ্যে ফুর্তি করার জন্য তারা সেসব স্থানে যেত। ভবন ও প্রাসাদ নির্মাণের পেছনে তারা এত বেশি অর্থ ব্যয় করতো যে, তাদের দেখলে মনে হতো তারা কখনো মারা যাবে না বরং এই পৃথিবীতে চিরদিন বেঁচে থাকবে।

 

এরপর হযরত হুদ (আ.) আদ জাতির আরেকটি নিকৃষ্ট বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরে বলেন:  তোমরা একে অন্যের প্রতি কোনো ধরনের দয়ামায়া দেখাতে প্রস্তুত নও। কারো প্রতি ক্ষুব্ধ হলে তোমরা অত্যাচারী শাসকের মতো তার ওপর নির্যাতন চালাও এবং এ কাজে তোমাদের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। সামান্য অপরাধে তোমরা দোষী ব্যক্তিকে অত্যন্ত কঠিন শাস্তি দিয়ে থাকো।

 

এ তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ইসলামি সংস্কৃতিতে প্রদর্শনমূলক যেকোনো কাজ অশোভন। শুধুমাত্র প্রদর্শনীর উদ্দেশ্যে নির্মিত যেসব স্থাপনায় শৈল্পিক নিদর্শন রয়েছে তাও এর অন্তর্ভূক্ত।

২. প্রাসাদোপম বাড়ি নির্মাণ করলে পৃথিবীর প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়ে এবং সে আখেরাতকে ভুলে যায়।

৩. পার্থিব জীবনের অন্যান্য কাজের মতো বাড়ি ও ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রেও কিছু নিয়ম মেনে চলতে হবে। এ কাজে অপব্যয় ও  বিলাসিতা করা যাবে না এবং প্রদর্শনমূলক কোনো উপাদানও থাকতে পারবে না।

 

এই সূরার ১৩১ থেকে ১৩৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে,

  فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ (131) وَاتَّقُوا الَّذِي أَمَدَّكُمْ بِمَا تَعْلَمُونَ (132) أَمَدَّكُمْ بِأَنْعَامٍ وَبَنِينَ (133) وَجَنَّاتٍ وَعُيُونٍ (134)

“সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো।” (২৬:১৩১)

“এবং ভয় করো তাঁকে- যিনি তোমাদের  সেইসব বিষয় দিয়ে সাহায্য করেছেন, যা তোমরা জানো।” (২৬:১৩২)

“তিনি তোমাদের গৃহপালিত পশু ও সন্তান-সন্ততি দিয়ে সাহায্য করেছেন।” (২৬:১৩৩)

“এবং (সাহায্য করেছেন) উদ্যান ও প্রস্রবণ (দিয়ে)।” (২৬:১৩৪)

 

আগের কয়েকটি আয়াতে নিজ জাতির কিছু বদ অভ্যাসের কথা তুলে ধরার পর এই চার আয়াতে হযরত হুদ (আ.) আদ জাতির প্রতি মহান আল্লাহর কিছু অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করেন। এরপর তিনি বলেন, তোমরা এমন দয়ালু আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করো না। বরং তাঁর আদেশ নিষেধ মেনে নিয়ে চূড়ান্ত সফলতা অর্থাৎ জান্নাতে যাওয়ার পথ উন্মুক্ত করো। আল্লাহর নবী এখানে যেসব নেয়ামতের কথা উল্লেখ করেছেন তার কোনোটিই অস্বীকার করার মতো নয়। অবিশ্বাসী কাফেররাও এসব নেয়ামতের কথা স্বীকার করতে বাধ্য। প্রবাহমান পানির অসংখ্য প্রস্রবন, ফলের বাগান, বিভিন্ন ধরনের কৃষিপণ্য, গৃহপালিত পশু- এসবই ছিল আদ জাতির প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহ। সেইসঙ্গে আল্লাহতায়ালা তাদেরকে দিয়েছিলেন অনেক সন্তান-সন্ততি যারা কৃষিকাজ ও পশুপালনে তাদেরকে সহযোগিতা করত।

 

এই চার আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ব্যক্তিগত ও সামাজিক সব সমস্যা ও অনাচারের মূল উৎস হচ্ছে আল্লাহর ভয় লোপ পাওয়া। এ কারণে সব যুগের সব নবী-রাসূল সবার আগে মানুষকে তাকওয়া বা খোদাভীতির প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

২. মহান আল্লাহ মানুষকে যেসব নেয়ামত দান করেছেন তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হলো তাকওয়া অবলম্বন। আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামত উপভোগ করার পর কৃতজ্ঞতা জানাতে পারি আর না পারি অন্তত তাঁর কোনো নির্দেশ অমান্য করা আমাদের উচিত হবে না।

 

সূরা শোয়ারার ১৩৫ ও ১৩৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

إِنِّي أَخَافُ عَلَيْكُمْ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ (135) قَالُوا سَوَاءٌ عَلَيْنَا أَوَعَظْتَ أَمْ لَمْ تَكُنْ مِنَ الْوَاعِظِينَ (136)

“আমি তোমাদের ওপর মহাদিবসের শাস্তি (নেমে আসার) আশঙ্কা করি।” (২৬:১৩৫)

“(আদ জাতির লোকজন) বলল- তুমি উপদেশ দাও, আর নাই দাও, উভয়ই আমাদের কাছে সমান। (আমরা ঈমান আনবো না)।” (২৬:১৩৬)

 

এখানে হযরত হুদ (আ.) অত্যন্ত আন্তরিকতা ও সহানুভূতি নিয়ে কাফেরদের উদ্দেশ করে বলছেন: আমি যে আহ্বান জানাচ্ছি তাতে আমার নিজের কোনো স্বার্থ নেই বরং তা শুনলে তোমরাই লাভবান হবে। আমি তোমাদের কাছ থেকে কোনো সম্পদ চাই না বা তোমাদের নেতাও হতে চাই না। আমি তোমাদের শেষ পরিণতির কথা ভেবে ভয় পাচ্ছি কারণ, আল্লাহর নির্দেশ এত বেশি অমান্য করলে তোমাদেরকে জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করা হবে। কিন্তু কাফেররা নিজেদের সম্পদ ও ধনভাণ্ডার নিয়ে এত বেশি মত্ত ছিল যে, তারা আল্লাহর নবীর দাওয়াতের প্রতি বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ করেনি। তারা হযরত হুদ (আ.)কে চরম অবজ্ঞাভরে জবাব দেয়:  তুমি শুধু শুধু এত কষ্ট করো না। তুমি যতই চিৎকার চেচামেচি করো না কেন তা আমাদের কানে প্রবেশ করবে না এবং আমাদের অন্তরে বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলবে না।

 

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. যারা অজ্ঞতা ও অহংকারে ডুবে আছে তাদেরকে পরকালের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করতে হবে; তারা শুনবে না বলে আশঙ্কা থাকার পরও তা করতে হবে।

২. কেউ যদি সত্য গ্রহণ করতে না চায় তাহলে আল্লাহর শ্রেষ্ঠ বান্দা অর্থাৎ নবী-রাসূলদের বক্তব্যও তাদের অন্তরে কোনো প্রভাব ফেলে না।#

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন