এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 05 জানুয়ারী 2016 11:59

সূরা আশ-শোয়ারা; আয়াত ১৩৭-১৫০ (পর্ব-১৯)

সূরা শোয়ারার ১৩৭ থেকে ১৪০ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

إِنْ هَذَا إِلَّا خُلُقُ الْأَوَّلِينَ (137) وَمَا نَحْنُ بِمُعَذَّبِينَ (138) فَكَذَّبُوهُ فَأَهْلَكْنَاهُمْ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَةً وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ (139) وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ (140)

“এ তো পূর্ববর্তীগণের আচরণ।” (২৬:১৩৭)

“এবং আমরা শাস্তি পাব না।” (২৬:১৩৮)

“অতঃপর ওরা তাকে (অর্থাৎ হুদকে) প্রত্যাখ্যান করল এবং আমি ওদের ধ্বংস করলাম। এতে অবশ্যই (শিক্ষা ও) নিদর্শন আছে, কিন্তু ওদের অধিকাংশই বিশ্বাসী ছিল না।” (২৬:১৩৯)

“এবং তোমার প্রতিপালক, তিনি তো পরাক্রমশালী, দয়াময়।” (২৬:১৪০)

 

আগের পর্বে বলা হয়েছে, হযরত হুদ (আ.) যখন আদ জাতির লোকদেরকে তাকওয়া অর্জন ও অশ্লীল কাজ থেকে দূরে থাকার আহ্বান জানান তখন তারা বলেছিল: তুমি অযথা কষ্ট করো না। আমাদেরকে তুমি ভয় দেখাও বা না দেখাও, তাতে কিছু যায় আসে না। কারণ, তোমার আহ্বান আমাদের উপর কোনো প্রভাব ফেলবে না।

আর আজকের এ পাঁচ আয়াতে বলা হচ্ছে, আদ জাতির লোকজন তাদের অশ্লীল কাজকর্মের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পূর্বপুরুষদের অনুসরণের কথা বলতো। তারা বলতো: তুমি অনর্থক আমাদের কাজে ভুল ধরছো এবং মনে করছো যে, আমরা ভুল পথে রয়েছি। আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের পথ অনুসরণ করে চলেছি, যে পথ সঠিক ছিল। আর এ জন্য আমরা শাস্তি পাব না। কারণ আমরা কোনো অন্যায় করছি না।

 

আদ জাতির এ দাম্ভিক কথাবার্তার জবাবে আল্লাহতায়ালা বলেন: তারা হুদকে মিথ্যাবাদী বলল এবং তাঁর রেসালতকে অস্বীকার  করল। এ কারণে আমি তাদেরকে এ দুনিয়াতেই ধ্বংস করে দিলাম। কারণ তাদের বেশিরভাগ লোক ঈমান আনেনি এবং ঈমান আনার ক্ষেত্র সৃষ্টির জন্য সত্য অনুসন্ধানের কোনো চেষ্টাও তারা করেনি।  

আয়াতগুলোর পরবর্তী অংশে আল্লাহ আরো বলেন: আদ জাতির কৃতকর্মের পরিণতিতে যে নিদর্শন রয়েছে তা থেকে অন্যান্য জাতির শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত।

 

এ পাঁচ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. পূর্বপুরুষরা কোনো কাজ করেছে বলেই তা সঠিক হবে এমন কোনো কথা নেই। কাজেই তাদের আচার-আচরণ অন্ধভাবে অনুসরণ বা সেই পথে অটল থাকার জন্য গোঁয়ার্তুমি করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

২. নিজেদের অন্যায় কাজকে সাফাই দেয়ার জন্য পূর্বপুরুষদের অনুসরণ করার অজুহাত দেখানো যাবে না। একথা বলে আল্লাহর দরবারে পার পাওয়া যাবে না।

 

সূরা শোয়ারার ১৪১ থেকে ১৪৫ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:  

كَذَّبَتْ ثَمُودُ الْمُرْسَلِينَ (141) إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ صَالِحٌ أَلَا تَتَّقُونَ (142) إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ (143) فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ (144) وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ (145)

“সামুদ সম্প্রদায় রসূলগণের প্রতি মিথ্যা আরোপ করেছিল।” (২৬:১৪১)

“যখন ওদের ভ্রাতা সালেহ ওদের বলল- তোমরা কি সাবধান হবে না?” (২৬:১৪২)

“আমি তো তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রাসূল।” (২৬:১৪৩)

“অতএব আল্লাহকে ভয় করো ও আমার আনুগত্য করো।” (২৬:১৪৪)

“আমি তোমাদের নিকট এর জন্য কোনো প্রতিদান চাই না, আমার পুরস্কার তো বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকটই আছে।” (২৬:১৪৫)

 

হযরত নূহ, হযরত ইব্রাহিম, হযরত মুসা ও হযরত হুদ (আ.)’র ঘটনা বর্ণনা করার পর এই আয়াতগুলোতে হযরত সালেহ (আ.)’র ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। আর সে সঙ্গে সালেহ (আ.) কিভাবে সমুদ গোত্রকে দ্বীনের দাওয়াত দিতেন সে সম্পর্কে বর্ণনা দেয়া হয়েছে। অন্যান্য নবী রাসূলের মতো হযরত সালেহ (আ.)-এর দ্বীনের দাওয়াতও ছিল তিনটি মূলনীতি নির্ভর। প্রথমত তারা মানুষকে বলতেন, আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করা যাবে না। দ্বিতীয়ত তাঁরা দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জন করার জন্য সত্যবাদী পয়গম্বরের আনুগত্য করার আহ্বান জানাতেন। এবং তৃতীয়ত নবী-রাসূলরা শুধুমাত্র আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টির জন্য দাওয়াতি কাজ করেন। এজন্য তারা মানুষের কাছে কোনো প্রতিদান চান নি এবং মানুষের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যও কোনো কাজ করেন নি। 

 

এ পাঁচ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো: 

১. সব নবী-রাসূলের দাওয়াতের পদ্ধতি ও বিষয়বস্তু অভিন্ন। তাদের সবাই আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান জানাতেন এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে মানুষকে দূরে থাকতে বলতেন।

২. যিনি সত্যবাদী ও ন্যায়পূর্ণ জীবনযাপন করেছেন তিনিই রিসালাতের গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিতে পারেন। যারা আল্লাহর দ্বীনের প্রচারক হবেন তাদেরকেও অবশ্যই এই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হতে হবে। কারণ দ্বীন প্রচারকরা নবী-রাসূলদের পথ অব্যাহত রাখার দায়িত্ব নিয়েছেন।  

 

সূরা শোয়ারার ১৪৬ থেকে ১৫০ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন: 

أَتُتْرَكُونَ فِي مَا هَاهُنَا آَمِنِينَ (146) فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ (147) وَزُرُوعٍ وَنَخْلٍ طَلْعُهَا هَضِيمٌ (148) وَتَنْحِتُونَ مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا فَارِهِينَ (149) فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ (150)

“(তোমরা কি মনে করো) তোমাদের পার্থিব ভোগ-সম্পদের মধ্যে নিরাপদে রেখে দেয়া হবে।” (২৬:১৪৬)

“উদ্যানসমূহে ও প্রস্রবণে।”(২৬:১৪৭)

“ও শষ্যক্ষেত্র এবং মঞ্জরিত খর্জুর বাগানে?” (২৬:১৪৮)

 “তোমরা তো নৈপুণ্যের সাথে পাহাড় কেটে গৃহ নির্মাণ করেছো।” (২৬:১৪৯)

“কাজেই তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং আমার আনুগত্য করো।” (২৬:১৫০)

 

এ আয়াতে হযরত সালেহ (আ.) তার গোত্রের অধিবাসীদের সর্তক করে বলছেন: তোমরা কেন মনে করছো, তোমাদের এ দুনিয়া চিরস্থায়ী এবং আজীবন ভোগ-বিলাসের মধ্যে থাকতে পারবে? তোমরা কেন মনে করছো, তোমাদের শস্যক্ষেত্র এবং খেজুর বাগান চিরকাল বিদ্যমান থাকবে এবং এগুলোর ফসল তোমরা সারাজীবন উপভোগ করতে থাকবে?

তোমরা কেন এতবেশি নিজেদের পেটের পূজা করছ ও ভোগ-বিলাসের মধ্যে ডুবে থাকছ? তোমরা আল্লাহর নেয়ামত উপভোগ করেও কেন তাঁর নাফরমানি করছো? আমার আনুগত্য করতে না চাইলে অন্তত আল্লাহর আনুগত্য করো এবং তার সঙ্গে নাফরমানি করো না।  

হযরত সালেহ (আ.) সামুদ জাতিকে আরো বলেন, যদি দুনিয়া ও আখিরাতে সফল হতে চাও তাহলে আমার কথা শোন, আমি আমার নিজের পক্ষ থেকে কিছুই বলিনা। আল্লাহতায়ালা যা বলেন আমি শুধুমাত্র সেগুলি তোমাদের কাছে জানাই।  

 

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো: 

১. আমরা দুনিয়াতে আল্লাহর নেয়ামত উপভোগ করব, কিন্তু সেগুলোর মায়ায় জড়িয়ে যাব না। কারণ এগুলি চিরস্থায়ী নয়। একদিন সবকিছুর মায়া ত্যাগ করে এ দুনিয়া ছেড়ে চলে যেতে হবে।

২. ভোগ-বিলাসিতা মানুষের মধ্যে আল্লাহ ভীতি কমিয়ে দেয় ও পাপাচারের পথ প্রশস্ত করে। তাই বিলাসি সমাজের মানুষদের বারবার সতর্কবার্তা দেয়ার প্রয়োজন রয়েছে।#

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন