এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 05 জানুয়ারী 2016 12:00

সূরা আশ-শোয়ারা; আয়াত ১৫১-১৫৬ (পর্ব-২০)

সূরা শোয়ারার ১৫১ ও ১৫২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَلَا تُطِيعُوا أَمْرَ الْمُسْرِفِينَ (151) الَّذِينَ يُفْسِدُونَ فِي الْأَرْضِ وَلَا يُصْلِحُونَ (152)

“এবং অপব্যয়ীদের আদেশের অনুসরণ করো না।” (২৬:১৫১)

“এরা পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করে এবং শান্তি স্থাপন করে না।” (২৬:১৫২)

 

আগের আসরে বলা হয়েছে, সামুদ জাতিকে হেদায়েত করার জন্য মহান আল্লাহ হযরত সালেহ (আ.)কে দুনিয়াতে পাঠিয়েছিলেন। আল্লাহর এ নবী তাঁর জাতির লোকজনকে সৃষ্টিকর্তার আদেশ-নিষেধ মেনে চলার আহ্বান জানান। কিন্তু সামুদ জাতি আমোদ-ফুর্তিতে দিন কাটাতো বলে তারা হযরত সালেহ’র আহ্বান মেনে নিতে অস্বীকার করে। এই দুই আয়াতে আল্লাহর এ নবী তার উম্মতকে বলছেন: তারা যেন অপচয় ও প্রচণ্ড রকমের অপব্যয় করা থেকে বিরত থাকে। কারণ, অপব্যয় হচ্ছে নিজের ও অপরের প্রতি এক ধরনের জুলুম। অপচয়ের ফলে সমাজে পাপাচার ও অনাচার বেড়ে যায় এবং মানুষের মধ্যে ভালো ও উন্নত কাজ করার প্রবণতা কমে যায়। ফলে সমাজ ক্রমেই অধঃপতনের দিকে যেতে থাকে।

ইসলামি সংস্কৃতিতে দান-খয়রাত করার সময়ও অপচয় করতে নিষেধ করা হয়েছে। কাজেই পাপাচার ও খারাপ কাজে অর্থ উড়ানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মহান আল্লাহ কঠোরভাবে তা নিষেধ করে দিয়েছেন।

 

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় তিনটি দিক হলো:

১. ইসলামের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী অর্থ ব্যয় না করলে সমাজে খারাপ কাজ ও পাপাচার ছড়িয়ে পড়ে।

২. অপব্যয়কারী ব্যক্তিকে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেয়া উচিত নয়। কারণ, এই দায়িত্ব পালন করার যোগ্যতা তার নেই।

৩. সমাজে ইতিবাচক সংস্কার আনা অপচয়কারী ব্যক্তিদের পক্ষে সম্ভব নয়। কাজেই সমাজ সংস্কারককে হতে হবে মিতব্যয়ী এবং তাকে ইসলামের দিক-নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করতে হবে।

 

সূরা শোয়ারার ১৫৩ ও ১৫৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে,

قَالُوا إِنَّمَا أَنْتَ مِنَ الْمُسَحَّرِينَ (153) مَا أَنْتَ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُنَا فَأْتِ بِآَيَةٍ إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّادِقِينَ (154)

“ওরা বলল-(হে সালেহ) নিশ্চয়ই তুমি জাদুগ্রস্ত।” (২৬:১৫৩)

“তুমি তো আমাদের মতো‌ই একজন মানুষ, কাজেই তুমি যদি সত্যবাদী হও তাহলে কোনো একটি নিদর্শন উপস্থিত করো (বা একটি অলৌকিক ঘটনা দেখাও)।” (২৬:১৫৪)

 

পাপকাজ থেকে বিরত থাকার জন্য হযরত সালেহ (আ.) তাঁর জাতিকে যে আন্তরিক আহ্বান জানান তার প্রতিক্রিয়ায় জনগণ তাঁকে জাদুগ্রস্ত বলে অপবাদ দেয়। তারা বলে, সালেহর বিচারবুদ্ধি লোপ পেয়েছে বলে সে প্রলাপ বকছে। তাদের এ বক্তব্যের কারণ ছিল এই যে, আল্লাহর নবীর বক্তব্য তাদের চিরাচরিত খারাপ কাজের পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছিল এবং তা মানলে তাদের পক্ষে আর অনৈতিক আমোদফুর্তি করা সম্ভব হতো না। কাফেররা হযরত সালেহ (আ.)এর বক্তব্যকে প্রলাপ হিসেবে অভিহিত করার পর আরো বলছে: যদি সত্যিই তোমার আহ্বান এক আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে তাকে তাহলে এমন কোনো অলৌকিক ঘটনা দেখাও যা দেখে আমরা তোমার কথা বিশ্বাস করব।  কারণ, তুমি আমাদের মতোই মানুষ এবং নিজেদের ভোগবিলাসকে আমরা তোমার মতো মানুষের কথায় পরিত্যাগ করতে পারি না।

 

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. দুনিয়া পূজারি ব্যক্তিদের দৃষ্টিতে তাদের ভোগবিলাস ও আমোদফুর্তির বিরুদ্ধে কেউ কথা বললেই সে উন্মাদ হয়ে যায় এবং তার প্রতি নানা ধরনের অপবাদ আরোপ করে।

২. দুনিয়া পূজারি ব্যক্তিরা চরম পাপাচারে লিপ্ত কথিত সেলিব্রেটিদেরকে নিজেদের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করে এবং এ কাজে গর্ব অনুভব করে। তারা সত্যিকার সৎ ও উন্নত চরিত্রের ব্যক্তিদের অনুসরণ করতে রাজি নয়।

 

সূরা শোয়ারার ১৫৫ ও ১৫৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

قَالَ هَذِهِ نَاقَةٌ لَهَا شِرْبٌ وَلَكُمْ شِرْبُ يَوْمٍ مَعْلُومٍ (155) وَلَا تَمَسُّوهَا بِسُوءٍ فَيَأْخُذَكُمْ عَذَابُ يَوْمٍ عَظِيمٍ (156)

“সালেহ (অলৌকিকত্ব দেখানোর দাবির উত্তরে তাদের) বলেছিল- এটি একটি উষ্ট্রী (এটি আল্লাহর ইচ্ছায় পাহাড় থেকে বেরিয়ে এসেছে), নির্ধারিত দিনে একে একবার পানি পান করতে দেবে এবং তোমরাও একবার পান করবে।” (২৬:১৫৫)

“এবং ওকে কষ্ট দিও না, অন্যথায় তোমাদের উপর মহাদিবসের শাস্তি নেমে আসবে।” (২৬:১৫৬)

 

অবিশ্বাসী কাফেররা আল্লাহর নবী হযরত সালেহ (আ.)-এর কাছে মুজেযা বা অলৌকিক ক্ষমতা দেখানোর আহ্বান জানানোর পর মহান আল্লাহ সামুদ জাতির জন্য পাহাড়ের ভেতর থেকে একটি মাদি উট পাঠিয়ে দেন। উটটি সেই পাহাড় ফেটে বেরিয়ে আসে যার উপর কাফেররা অত্যন্ত বিলাসবহুল অট্টালিকা ও প্রাসাদোপম বাড়ি নির্মাণ করেছিল। পাহাড় থেকে উটটির বেরিয়ে আসা এবং এর পানি খাওয়ার পদ্ধতি- দু’টিই ছিল অলৌকিক ঘটনা। সামুদ জাতি যেখানে বাস করত সেখানে পানি সহজলভ্য ছিল না বরং প্রতিদিন পাহাড় থেকে সীমিত পরিমান পানি নেমে আসত। পুরো সামুদ জাতি সারাদিনে যে পানি পান করতো- অলৌকিক উটটি একাই সে পরিমান পানি পান করত। অর্থাৎ যেদিন উটটি পানি পান করত সেদিন সামুদ জাতির লোকজন পানি খেতে পারত না।

 

হযরত সালেহ (আ.) ঘোষণা করেন, এই উট মহান আল্লাহর ইচ্ছায় সৃষ্টি হয়েছে এবং এটি কোনো সাধারণ পশু নয়। কাজেই তোমরা এর সম্মান রক্ষা করবে এবং এর কোনো ক্ষতি করবে না। এটি যা খেতে চায় তাই খেতে দেবে এবং যা পান করতে চায় তাই পান করতে দেবে। তাকে কোনো কাজে বাধা দেবে না। কারণ, উটটির কোনো ক্ষতি হলে তোমাদেরকে মহাশাস্তির সম্মুখিন হতে হবে।

 

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. প্রকৃতির উপর মহান আল্লাহর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। যে আল্লাহ হযরত মূসার লাঠিকে বিশাল অজগরে পরিণত করতে পারেন তিনি পাথরের পাহাড়ের ভেতর থেকে জীবন্ত উটও বের করে আনতে সক্ষম।

২. যদি একটি পবিত্র পশুর ক্ষতি করলে চরম শাস্তি পেতে হয় তাহলে ইসলামের মহান ব্যক্তিত্বদের অবমাননার শাস্তি হবে আরো ভয়ঙ্কর।#

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন