এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 05 জানুয়ারী 2016 12:02

সূরা আশ-শোয়ারা; আয়াত ১৫৭-১৬৬ (পর্ব-২১)

সূরা শোয়ারার ১৫৭, ১৫৮ ও ১৫৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

   فَعَقَرُوهَا فَأَصْبَحُوا نَادِمِينَ (157) فَأَخَذَهُمُ الْعَذَابُ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَةً وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ (158) وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ (159)

“কিন্তু ওরা ওকে (অর্থাৎ উটটিকে) হত্যা করল, পরিণামে ওরা অনুতপ্ত হলো।” (২৬:১৫৭)

“অতঃপর শাস্তি ওদের গ্রাস করল, এতে অবশ্যই  (শিক্ষা ও) নিদর্শন আছে, কিন্তু ওদের অধিকাংশই বিশ্বাসী নয়।” (২৬:১৫৮)

“এবং তোমার প্রতিপালক, তিনি তো পরাক্রমশালী, দয়াময়।” (২৬:১৫৯)

 

আগের পর্বে বলা হয়েছিল, সামুদ জাতি হযরত সালেহ (আ.)-এর কাছে মুজিযা বা অলৌকিক ঘটনা দাবি করলে মহান আল্লাহর ইচ্ছায় পাহাড় ফেটে একটি মাদি উট বেরিয়ে আসে। এটি দেখার পর নিজেদের দেয়া শর্ত অনুসারেই সামুদ জাতির উচিত ছিল আল্লাহতায়ালার প্রতি ঈমান আনা। কিন্তু তা না করে উল্টো এই কাফির জাতির নেতারা এক ব্যক্তিকে নিয়োগ দেয় হাত-পা কেটে উটটিকে হত্যা করার জন্য। সামুদ জাতির নেতারা ভাবে, এই উট যত বেশিদিন জীবিত থাকবে তত বেশি সাধারণ মানুষ সালেহ নবীর ধর্মের প্রতি ঈমান আনবে এবং তাদের বাপ-দাদাদের ভ্রান্ত বিশ্বাস পরিত্যাগ করবে। এ কারণে তারা অলৌকিক উটটিকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে। যেহেতু সামুদ জাতির বেশিরভাগ লোক মাদি উটটিকে হত্যা করার পক্ষে ছিল তাই পবিত্র কুরআনে এ হত্যাকাণ্ডের জন্য গোটা জাতিকে দায়ী করা হয়েছে।

 

কিন্তু খোদ সামুদ জাতির দাবি মেনে নিয়ে এই অলৌকিক উটটি পাঠানো হয়েছিল বলে এটিকে হত্যা করার সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর আযাব তাদের জন্য অবধারিত হয়ে যায়। ঐশী আযাবের আগাম নিদর্শন দেখে সামুদ জাতি ভয় পেয়ে যায় এবং কৃতকর্মের জন্য অনুশোচনা করতে থাকে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। কারণ, খোদায়ি আযাব দেখার পর আর তওবা করার সুযোগ থাকে না। কাজেই আকাশ থেকে আল্লাহর গজব নেমে আসে। প্রচণ্ড ঝড়-তুফানের পাশাপাশি ভয়াবহ ভূমিকম্পে সামুদ জাতির বিশাল বিশাল অট্টালিকা ও প্রাসাদোপম বাড়ি তাদের মাথার উপর ভেঙে পড়ে এবং গোটা জাতি ধ্বংস হয়ে যায়।

 

সামুদ জাতির ঘটনা বর্ণনার শেষাংশে পবিত্র কুরআন সেই কথার পুনরাবৃত্তি করে যা বলা হয়েছিল হুদ, নুহ ও হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর জাতির পরিণতির ক্ষেত্রে। এসব নবীর রেসালাতের সত্যতা সাধারণ মানুষের কাছে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছিল। কিন্তু তারপরও তারা সত্যকে মেনে না নিয়ে আল্লাহতায়ালার বিরোধিতা চালিয়ে যায়। অতীত জাতিগুলোর ঘটনা ছিল পরবর্তী জাতিগুলোর জন্য বড় ধরনের শিক্ষা। কিন্তু তারা শিক্ষা না নিয়ে অতীত জাতিগুলোর কুফরির পথে অটল থাকার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা ভেবেছিল নবী-রাসূলদেরকে পরাজিত করা তাদের পক্ষে সম্ভব হবে। অথচ মহান আল্লাহ হচ্ছেন অপরাজেয়। অবশ্য এখানে একথাও উল্লেখ না করলেই নয় যে, যে ব্যক্তি সত্যিকার অর্থে নিজের ভুল বুঝতে পেরে অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর দরবারে তওবা করে মহান আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দেন।

 

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. পৃথিবীতে মহান আল্লাহর নিদর্শন ধ্বংস করা নবী-রাসূলদের বিরোধিতাকারী কাফিরদের কাজ। বর্তমান যুগে যারা শিরক বিরোধী কাজ করার অজুহাতে নবী-রাসূলদের রেখে যাওয়া নিদর্শন ধ্বংস করছে তারা ইচ্ছা কিংবা অনিচ্ছায় কাফিরদের পথ অনুসরণ করছে।

২. অন্যের যেকোনো কাজের প্রতি সন্তুষ্ট থাকার অর্থ হচ্ছে ওই কাজের পুরস্কার বা শাস্তির জন্য নিজেকে যোগ্য করে তোলা। মাত্র এক ব্যক্তি অলৌকিক উটটিকে হত্যা করলেও বাকি সবাই যেহেতু এ কাজের সমর্থক ছিল তাই তাদেরকেও ঐশী গজবে পড়তে হয়েছে।

৩. মহান আল্লাহ অসীম দয়ালু ও মেহেরবান। কিন্তু আমরা নিজেদের নিকৃষ্ট কাজের পরিণামে সেই দয়ালু আল্লাহর ক্রোধের শিকার হই।

 

সূরা শোয়ারার ১৬০ থেকে ১৬৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

كَذَّبَتْ قَوْمُ لُوطٍ الْمُرْسَلِينَ (160) إِذْ قَالَ لَهُمْ أَخُوهُمْ لُوطٌ أَلَا تَتَّقُونَ (161) إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ (162) فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ (163) وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ (164)

“লুতের সম্প্রদায়(ও) রাসূলগণের প্রতি মিথ্যারোপ করেছিল।” (২৬:১৬০)

“যখন ওদের ভ্রাতা লুত ওদের বলল- তোমরা কি (আল্লাহর ভয়ে) সাবধান হবে না?” (২৬:২৬১)

“আমি তো তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত রাসূল।” (২৬:১৬২)

“সুতরাং তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর।” (২৬:১৬৩)

“এবং আমি এই (রেসালাতের) জন্য তোমাদের নিকট কোনো প্রতিদান চাই না। আমার পুরস্কার তো বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকটেই আছে।” (২৬:১৬৪)

 

আল্লাহর পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদের আগের বক্তব্যেরই পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে এই পাঁচ আয়াতের মাধ্যমে। এসব আয়াত থেকে বোঝানো হয়েছে, সব নবী-রাসূলের দাওয়াতের বাণী ছিল অভিন্ন। তারা সবাই মহান আল্লাহকে ভয় করে সৎপথে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন এবং বলেছেন, এজন্য তারা মানুষের কাছে কোনো প্রতিদান চান না। এ ছাড়া, তারা প্রথমেই মানুষকে পাপাচার থেকে বিরত থাকতে বলেছেন যাতে বিশ্বব্যাপী সৎকাজ দিয়ে পূর্ণ করে দেয়ার ক্ষেত্র তৈরি করা যায়।

 

এই সূরার ১৬৫ ও ১৬৬ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

  أَتَأْتُونَ الذُّكْرَانَ مِنَ الْعَالَمِينَ (165) وَتَذَرُونَ مَا خَلَقَ لَكُمْ رَبُّكُمْ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ بَلْ أَنْتُمْ قَوْمٌ عَادُونَ (166)

“মানুষের মধ্যে তোমরা তো কেবল পুরুষের সাথেই (যৌন-মিলনে)  উপগত হও।” (২৬:১৬৫)

“এবং তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের জন্য যে স্ত্রীগণকে সৃষ্টি করেছেন- তোমরা তাদের বর্জন করে থাকো। তোমাদের এই কাজের কি ব্যাখ্যা থাকতে পারে? তোমরা তো সীমা লঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়।” (২৬:১৬৬)

 

সার্বিক অর্থে আল্লাহতায়ালার নির্দেশের অবাধ্য হতে নিষেধ করার পর হযরত লুত (আ.) তার জাতির মধ্যে প্রচলিত জঘন্য পাপাচারের কথা উল্লেখ করেন। তিনি তার সম্প্রদায়ের বিবেককে জাগ্রত করার জন্য প্রশ্ন করেন: তোমাদের কি স্ত্রী নেই যে তোমরা কামলিপ্সা চরিতার্থ করার জন্য পুরুষদের কাছে যাও? এ কাজের কি ব্যাখ্যা আছে তোমাদের কাছে?

 

দুঃখজনকভাবে বর্তমান যুগেও পুরুষদের মধ্যেই শুধু নয় সেইসঙ্গে নারীদের মধ্যেও সমকামিতা ছড়িয়ে পড়েছে। যারা এ জঘন্য কাজ করছে তারা দাবি করে, নিজেদের দেহের ওপর তাদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব রয়েছে; ফলে যেকোনো উপায়ে যৌনলিপ্সা চরিতার্থ করার অধিকার তারা সংরক্ষণ করে। অথচ ধর্মীয় সংস্কৃতিতে নিজের দেহের মালিক মানুষ নয় বরং আল্লাহতায়ালা। কাজেই শরীরের যেকোনো চাহিদা পূরণ করতে হবে আল্লাহর নির্দেশিত পথে। এই শরীর আমাদের কাছে আল্লাহর আমানত, সুতরাং আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী শরীরকে পরিচালিত করলে তা হবে বৈধ এবং এর ব্যত্যয় ঘটলে তা হবে অবৈধ। যদিও কিছু পশ্চিমা দেশের পার্লামেন্ট জঘন্য ও সহজাত প্রবৃত্তি বিরোধী এই কাজকে বৈধতা দিয়েছে।

 

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. যেকোনো সমাজে প্রচলিত খারাপ কাজগুলো শনাক্ত করে তার বিস্তার রোধ করার চেষ্টা করতে হবে।

২. যেকোনো অন্যায় কাজ ও পাপাচার বন্ধ করার আগে সঠিক পথে মানুষের জৈবিক প্রয়োজন মেটানোর পথ বাতলে দিতে হবে। যেমন হযরত লুত (আ.) তার সম্প্রদায়ের লোকদের খারাপ কাজ থেকে ফিরে আসার জন্য নারীদের সঙ্গে বিয়ে করে শারীরিক প্রয়োজন মেটানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন।

৩. জৈবিক চাহিদা মেটানোর জন্য মানুষকে আল্লাহতায়ালা সহজাত প্রবৃত্তিভিত্তিক পথ বাতলে দিয়েছেন। ঠিক একারণেই যুগে যুগে সব নবী-রাসূল মানুষকে বিয়ে করতে উৎসাহিত করেছেন।

৪. সমকামিতার মতো বিকৃত যৌনাচার একটি প্রকৃতি বিরোধী জঘন্য পাপাচার যাকে মহান আল্লাহ সীমালঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছেন।#

 

 

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন