এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 05 জানুয়ারী 2016 12:05

সূরা আশ-শোয়ারা; আয়াত ১৬৭-১৭৫ (পর্ব-২২)

সূরা শোয়ারার ১৬৭ ও ১৬৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-

   قَالُوا لَئِنْ لَمْ تَنْتَهِ يَا لُوطُ لَتَكُونَنَّ مِنَ الْمُخْرَجِينَ (167) قَالَ إِنِّي لِعَمَلِكُمْ مِنَ الْقَالِينَ (168)

“ওরা বলল- হে লুত! যদি তুমি (এ বক্তব্য প্রদান থেকে) নিবৃত্ত না হও, তবে অবশ্যই তুমি নির্বাসিত হবে।” (২৬:১৬৭)

“লুত বলল- আমি তো তোমাদের এই (জঘন্য) কাজকে ঘৃণা করি।” (২৬:১৬৮)

 

আগের পর্বে বলা হয়েছে- হযরত লুত (আ.) তাঁর জাতির লোকদের জঘন্য পাপাচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করে তাদেরকে এ কাজ থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছিলেন। আজকের এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: কাফিররা আল্লাহর নবীর আহ্বান শুনে সমকামিতা পরিত্যাগ করার পরিবর্তে হযরত লুতকে হুমকি দিয়ে বলে, তুমি যদি তোমার ওয়াজ নসিহত বন্ধ না করো এবং আমাদের পেছনে লেগে থাকো তাহলে তোমাকে আমরা আমাদের শহর থেকে বের করে দেব। এরপর আমরা আগের মতো যা খুশি তাই করব।

 

কিন্তু হযরত লুত (আ.) তাঁর জাতির এ হুমকিতে ভয় না পেয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে জবাব দেন, আমি তোমাদের এ জঘন্য কাজকে ঘৃণা করি এবং এ কাজ পরিত্যাগ করার জন্য তোমাদের প্রতি আমার আহ্বান অব্যাহত থাকবে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, হযরত লুত একথা বলেননি যে, আমি তোমাদের শত্রু বরং বলেছেন, আমি তোমাদের জঘন্য কাজের শত্রু। অর্থাৎ যদি এই খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকো তাহলে তোমাদের সঙ্গে আবার আমার বন্ধুত্ব তৈরি হবে। তোমাদের পাপাচারের কারণে আমি তোমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছি এবং এই মারাত্মক গোনাহর বিস্তার রোধ করার জন্য আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাব।

 

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. যুগে যুগে পাপাচারী ও জালিম ব্যক্তিরা তাদের অপকর্ম চালিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে সমাজের সৎ ও ভালো মানুষদের নির্বাসনে পাঠিয়েছে। এই কাজ বর্তমান যুগেও চলছে।

২. ইসলামে খারাপ কাজের সামনে নীরবতা বৈধ নয়। কথা ও কাজ দিয়ে পাপাচারের বিরোধিতা করতে এবং এর বিস্তার রোধের চেষ্টা করতে হবে।

৩.  নবী-রাসূলরা মহান আল্লাহর উপর ভরসা করতেন বলে শত্রুদের হুমকিকে ভয় পেতেন না। তারা কখনোই অন্যায়, জুলুম ও পাপাচারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে কুণ্ঠাবোধ করেননি।

 

সূরা শোয়ারার ১৬৯, ১৭০ ও ১৭১ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে-

رَبِّ نَجِّنِي وَأَهْلِي مِمَّا يَعْمَلُونَ (169) فَنَجَّيْنَاهُ وَأَهْلَهُ أَجْمَعِينَ (170) إِلَّا عَجُوزًا فِي الْغَابِرِينَ (171)

“হে আমার প্রতিপালক! ওরা যা করে তা হতে আমাকে এবং আমার পরিজনবর্গকে রক্ষা করো।” (২৬:১৬৯)

“অতঃপর আমি তাকে ও তার পরিবার-পরিজনের সকলকে রক্ষা করলাম।” (২৬:১৭০)

“এক বৃদ্ধা (অর্থাৎ লুতের স্ত্রী) ব্যতীত, যে ছিল ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভূক্ত।” (২৬:১৭১)

 

নিজ জাতির প্রতি হযরত লুত (আ.)-এর উপদেশবাণী ও নসিহত কোনো কাজে আসেনি। কাফিররা উল্টো আল্লাহর নবীকে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করে। এ অবস্থায় হযরত লুত নিজের পাশাপাশি তাঁর প্রতি ঈমান আনা মুষ্টিমেয় ব্যক্তিদের জীবন রক্ষার জন্য আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানান। মহান আল্লাহ তাঁর নবীর এ আবেদন কবুল করেন। তিনি হযরত লুত ও তার প্রতি ঈমান আনা ব্যক্তিদের নির্দেশ দেন তারা যেন রাতের অন্ধকারে সবাই যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন শহর ছেড়ে চলে যান। তখনকার সমাজে পাপাচারে লিপ্ত ব্যক্তিদের সহযোগিতা করত হযরত লুতের স্ত্রী। আল্লাহর নবী তার জাতির সমকামিতার বিরুদ্ধে লড়াই করলেও এ কাজে তিনি স্ত্রীর সহযোগিতা পাননি। এ কারণে মহান আল্লাহ তাকে সঙ্গে নিতে হযরত লুতকে নিষেধ করেন। ফলে নবী ও তার সঙ্গীরা শহর থেকে বেরিয়ে গেলে আসমানি গজবে ওই নারীসহ গোটা লুত জাতি ধ্বংস হয়ে যায়।

 

এ তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. পাপাচারে পরিপূর্ণ সমাজে বসবাস করার অনুমতি ইসলামে নেই। বরং এ ধরনের সমাজ ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য চেষ্টা করতে হবে। তবে চলে যাওয়ার আগে সমাজকে সংশোধনের জন্য সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টাও চালাতে হবে।

২. আল্লাহতায়ালার কাছে পারিবারিক সম্পর্কের চেয়ে ইসলামি আইন মেনে চলা বেশি প্রাধান্য পায়। নবী-রাসূলদের স্ত্রীরাও যদি পাপাচারী হয় তাহলে তাদেরকেও শাস্তি পেতে হবে। নবীর স্ত্রী বলে তারা পার পাবে না।

 

এই সূরার ১৭২ থেকে ১৭৫ নম্বর আয়াতে

  ثُمَّ دَمَّرْنَا الْآَخَرِينَ (172) وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ مَطَرًا فَسَاءَ مَطَرُ الْمُنْذَرِينَ (173) إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَةً وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ (174) وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ (175)

“অতঃপর অপর সকলকে ধ্বংস করলাম।” (২৬:১৭২)

“তাদের উপর শাস্তিমূলক (পাথরের) বৃষ্টিধারা বর্ষণ করেছিলাম, যাদের ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিল। তাদের জন্য এই (গজবস্বরূপ) বৃষ্টি ছিল কত নিকৃষ্ট।” (২৬:১৭৩)

“এতে অবশ্যই (শিক্ষা ও) নিদর্শন আছে, কিন্তু ওদের অধিকাংশই বিশ্বাসী নয়।” (২৬:১৭৪)

“নিশ্চয় তোমার প্রতিপালক, তিনি তো পরাক্রমশালী, দয়াময়।” (২৬:১৭৫)

 

হযরত লুত (আ.) ও তার প্রতি ঈমান আনা লোকেরা যখন রাতের অন্ধকারে লোকালয় ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন তখন ভয়াবহ ভূমিকম্পে নিজেদের ঘরবাড়ির নীচে চাপা পড়ে ধ্বংস হয়ে গেল পাপাচারে লিপ্ত জনগোষ্ঠী। কেউ পাপাচারে লিপ্ত অবস্থায় আবার কেউবা গোনাহর কাজ শেষে গভীর ঘুমে অচেতন থাকা অবস্থায় ধ্বংসস্তুপের নীচে চাপা পড়ে নিহত হয়। হযরত লুতের সম্প্রদায়কে শুধু ভূমিকম্পই আঘাত হানেনি সেইসঙ্গে মহান আল্লাহ আকাশ থেকে পাথরের বৃষ্টিও বর্ষণ করেন। অর্থাৎ এই জাতি আল্লাহর এত বেশি ক্রোধের শিকার হয়েছিল যে জমিন ও আসমান থেকে একযোগে গজব নেমে আসে। ফলে মহাপ্রলয়ে সমকামিতায় লিপ্ত লুত জাতি ধ্বংস হয়ে যায়।

 

আকাশ থেকে কীভাবে পাথর বৃষ্টি সম্ভব হয়েছিল সে সম্পর্কে কেউ কেউ মনে করেন, মহান আল্লাহ এতবেশি বেগে ঝড়-তুফান পাঠান যে, তাতে ভূমিতে অবস্থিত ছোট ছোট পাথর আকাশে উঠে যায় এবং পরে তা হযরত লুতের জাতির উপর বর্ষিত হয়। আবার কেউ কেউ মনে করেন, হয়তো পার্শ্ববর্তী কোনো আগ্নেয়গিরি থেকে উৎক্ষিপ্ত লাভায় লুত সম্প্রদায় চাপা পড়ে গিয়েছিল।

এরপরে অতীতের নবী-রাসূলদের পরিণতির কথা আবার স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহতায়ালা বলছেন: সমাজের বেশিরভাগ মানুষের সামনে সত্য স্পষ্ট হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও যখন তারা তা গ্রহণ না করে নবীকে হত্যার ষড়যন্ত্র করে তখন তাদের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে।

 

এই চার আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১. কলুষিত ও পাপাচারে আক্রান্ত সমাজকে ঐশী শাস্তির মুখোমুখী হতেই হবে। সে শাস্তি যেকোনো সময় এবং যেকোনো ধরনের হতে পারে।

২. মহান আল্লাহ সতর্ককারী পাঠানোর আগে কোনো সমাজকে ধ্বংস করেন না।

৩. বিশ্ব-প্রকৃতি আল্লাহতায়ালার নিয়ন্ত্রণাধীন। যিনি আকাশ থেকে রহমতের বারিধারা বর্ষণ করতে পারেন তার পক্ষেই গজব হিসেবে আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ করা সম্ভব।#

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন