এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 05 জানুয়ারী 2016 12:07

সূরা আশ-শোয়ারা; আয়াত ১৭৬-১৮৭ (পর্ব-২৩)

সূরা শোয়ারার ১৭৬ থেকে ১৮০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

كَذَّبَ أَصْحَابُ الْأَيْكَةِ الْمُرْسَلِينَ (176) إِذْ قَالَ لَهُمْ شُعَيْبٌ أَلَا تَتَّقُونَ (177) إِنِّي لَكُمْ رَسُولٌ أَمِينٌ (178) فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ (179) وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ (180)

“বনের অধিবাসীরা (অর্থাৎ শোয়াইব (আ.)-এর সম্প্রদায়) রাসূলগণের প্রতি মিথ্যারোপ করেছিল।” (২৬:১৭৬)

“যখন শোয়াইব তাদেরকে বললেন, তোমরা কি সাবধান হবে না?” (২৬:১৭৭)

“আমি তোমাদের জন্য এক বিশ্বস্ত পয়গম্বর।” (২৬:১৭৮)

“অতএব, তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর।” (২৬:১৭৯)

“আমি তোমাদের কাছে এর জন্য কোন প্রতিদান চাই না। আমার প্রতিদান তো বিশ্বজগতের পালনকর্তাই দেবেন।” (২৬:১৮০)   

 

মাদায়েন নগরীর পাশে আইকা নামক একটি অঞ্চল ছিল। আল্লাহতায়ালা মাদায়েনের পাশাপাশি আইকা অঞ্চলের লোকদেরও হেদায়েতের দায়িত্ব দিয়েছিলেন হযরত শোয়াইব (আ.)কে। আইকা শব্দের অর্থ বন ও জঙ্গল। এই অঞ্চলে অনেক বেশি গাছপালা ছিল বলে এর পবিত্র কুরআনে এর নামকরণ করা হয়েছে আইকা। এখানকার মানুষের ছিল  প্রচুর ধন-সম্পদ;  কাজেই তারা বেশ আরাম-আয়েশে জীবন-যাপন করছিল। ধন-সম্পদ হলে মানুষের মধ্যে যে অহংকার সৃষ্টি হয় এবং আল্লাহকে ভুলে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে। আইকা অঞ্চলের মানুষেরও তাই হয়েছিল।

 

এই সূরায় এর আগে অন্যান্য নবী তাদের উম্মতদের যে উপদেশবাণী দিয়েছেন

হযরত শোয়াইব (আ.)ও তার উম্মতকে সেই একই বাণী শোনান। তিনিও তার উম্মতকে তাকওয়া অর্জন, অশ্লীল কাজ বর্জন এবং আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলার আহ্বান জানান। এই পাঁচ আয়াতে আল্লাহতায়ালা পয়গম্বরদের দু’টি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেন। প্রথমত তারা সত্যবাদিতা, আমানতদারী ও ন্যায়পূর্ণ আচরণের মাধ্যমে নবুওয়াত পাওয়ার আগেই মানুষের কাছে সৎকর্মশীল ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত তাঁরা মানুষের কাছ থেকে কোনো ধরনের পুরস্কারের আশা করেন নি। ফলে কাফিররা নবী-রাসূলদের বিরুদ্ধে একথা বলার সুযোগ পায়নি যে, তারা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য মানুষের মাঝে দাওয়াতি কাজ করছেন।

 

সূরা শোয়ারার ১৮১ থেকে ১৮৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-

  أَوْفُوا الْكَيْلَ وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُخْسِرِينَ (181) وَزِنُوا بِالْقِسْطَاسِ الْمُسْتَقِيمِ (182) وَلَا تَبْخَسُوا النَّاسَ أَشْيَاءَهُمْ وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ (183) وَاتَّقُوا الَّذِي خَلَقَكُمْ وَالْجِبِلَّةَ الْأَوَّلِينَ (184)

“মাপে পূর্ণমাত্রায় দেবে এবং যারা পরিমাপে কম দেয়,তাদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (২৬:১৮১)

“আর ওজন করবে সঠিক দাঁড়িপাল্লায়।” (২৬:১৮২)

“মানুষকে তাদের প্রাপ্য বস্তু কম দেবে না এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় ঘটাবে না।”  (২৬:১৮৩)

“এবং ভয় করো তাঁকে, যিনি তোমাদেরকে এবং তোমাদের পূর্বে যারা গত হয়েছে তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন।” (২৬:১৮৪)

 

হযরত শোয়াইব (আ.) সামগ্রিকভাবে তাকওয়া অর্জনের দাওয়াত দেয়ার পর, আইকা অঞ্চলের মানুষের মধ্যে যে অর্থনৈতিক দুর্নীতি বিরাজ করছিল তার কথা উল্লেখ করে বলেন: তোমরা ওজনে কম দিয়ে খরিদ্দারদের সঙ্গে প্রতারণা করো কেন? কেন তোমরা সঠিক দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার না করে মানুষের হক নষ্ট করছো?  কোনো কিছু কেনার সময় ঐ বস্তুর মধ্যে ত্রুটি-বিচ্যুতি খুঁজে তার দাম কমিয়ে দাও কেন?

 

আইকা অঞ্চলের আবহাওয়া ছিল চমৎকার। হিজাজ বা বর্তমান সৌদি আরব ও শাম বা বর্তমান সিরিয়ার মধ্যবর্তী বাণিজ্যিক রুটে এর অবস্থান ছিল। এ কারণে বিদেশি বহু বাণিজ্যিক কাফেলা এখানে যাতায়াত করত। তখনকার যুগে মূদ্রার প্রচলন ছিল না এবং মানুষ বাজারে গিয়ে জিনিষপত্র আদান-প্রদান করত। দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষজন আইকা থেকে তাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কেনার জন্য নিজেদের কাছে থাকা কিছু জিনিস বিক্রি করত। আইকার স্থানীয় অধিবাসীরা এসব জিনিস কেনার সময় এগুলোর নানা দোষত্রুটি খুঁজে বের করে তার জন্য কম দাম দিত। আর নিজেদের জিনিস বিক্রি করার সময় ওজনে কম দিত। এ কাজে তারা ত্রুটিপূর্ণ বাটখারা ও দাঁড়িপাল্লা ব্যবহার করত।

 

আয়াতগুলোর শেষাংশে আল্লাহ ওজনে কম দিয়ে মানুষের হক নষ্ট করার কথা উল্লেখ করে বলেন: এ নিকৃষ্ট কাজের জন্য পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি হয় এবং মানুষ ধ্বংস হয়ে যায়।

 

এ চার আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো: 

১. তাকওয়া বা খোদাভীতির অর্থ অনেক বেশি বিস্তৃত। অন্যের অধিকার রক্ষা করাও এর অন্তর্ভূক্ত। কাজেই যেকোনো উপায়ে অন্যের অধিকার লঙ্ঘনের অর্থ তাকওয়া থেকে দূরে সরে যাওয়া।

২. ওজনে কম দেয়া একটি বিশাল অর্থনৈতিক অপরাধ। এটা শুধুমাত্র ব্যবসার দাঁড়িপাল্লার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সমাজের সব পেশায় নিযুক্ত ব্যক্তিরা এ অপরাধে জড়িত। অফিস-আদালতে ঠিকমতো কাজ না করাও ওজনে কম দেয়ার শামিল।

৩.  সুস্থ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা ছিল সব পয়গম্বরের অন্যতম লক্ষ্য। কারণ আর্থিক দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক খাতে বিশৃঙ্খলা মানুষকে বিপথে পরিচালিত করে এবং সমাজে ভাঙ্গন তৈরি হয়।

 

সূরা শোয়ারার ১৮৫, ১৮৬ ও ১৮৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন: 

  قَالُوا إِنَّمَا أَنْتَ مِنَ الْمُسَحَّرِينَ (185) وَمَا أَنْتَ إِلَّا بَشَرٌ مِثْلُنَا وَإِنْ نَظُنُّكَ لَمِنَ الْكَاذِبِينَ (186) فَأَسْقِطْ عَلَيْنَا كِسَفًا مِنَ السَّمَاءِ إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّادِقِينَ (187)

“ওরা বলল, তুমি তো জাদুগ্রস্তদের অন্তর্ভূক্ত।” (২৬:১৮৫)

“তুমি আমাদেরই মত একজন মানুষ, আমাদের ধারণা-তুমি মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত।” (২৬:১৮৬)

“অতএব, যদি সত্যবাদী হও, তবে আকাশের এক টুকরা আমাদের উপর ফেলে দাও (তো দেখি)।” (২৬:১৮৭)  

 

আগেই আমরা যেমনটি বলেছি, হযরত সালেহ (আ.) আইকার অধিবাসীদেরকে অন্যের অধিকার লঙ্ঘন না করার আহ্বান জানান। তাঁর এই যুক্তিপূর্ণ ও সুস্পষ্ট আহ্বানে কান দেয়ার পরিবর্তে তারা আল্লাহর নবীকে যাদুগ্রস্ত বলে অভিহিত করে ঘোষণা করল: তার বিচারবুদ্ধি লোপ পেয়েছে। তার কথায় কোনো যুক্তি নেই। তারা হযরত সালেহ (আ.)কে আরো বলল: যেহেতু তোমার কথা আমাদের বিচার বিবেচনায় টেকে না তাই তোমাকে প্রমাণ করতে হবে যে, এসব কথা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে এবং তুমি সত্যিই আল্লাহর নবী। তুমি এমন সময় নিজেকে নবী দাবি করছ যখন আমাদের সঙ্গে তোমার কোনো পার্থক্য নেই এবং তুমি আমাদের মতোই একজন মানুষ। কাজেই যতক্ষণ পর্যন্ত নিজের নবুওয়াতের প্রমাণ দিতে না পারছ ততক্ষণ আমরা তোমাকে নবী হিসেবে মেনে নেব না। তুমি যে ঐশী শাস্তির কথা বলছ তা আমাদের দেখাও। পারলে আকাশ থেকে পাথর বর্ষণ করে আমাদের দেখিয়ে দাও যে তুমি সত্যিই আল্লাহর প্রেরিত পুরুষ।

 

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো: 

১. যাদের কাছে কোনো যুক্তি-প্রমাণ নেই তাদের পক্ষে যুক্তিপূর্ণ উত্তর দেয়া সম্ভব নয়। এ ধরনের লোকেরা অপবাদকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। যেমনিভাবে আইকাবাসী হযরত শোয়াইব (আ.)’র সুস্পষ্ট যুক্তির জবাব দিতে না পেরে তাঁকে যাদুগ্রস্ত ও বোধশক্তিহীন মানুষ বলে আখ্যা দিয়েছিল।

২. কাফেরদের অনেকে বলে, নবী-রাসূল হওয়া উচিত ফেরেশতাদের মধ্য থেকে। মানুষের মধ্য থেকে নবী নির্বাচন করা তাদের জন্য দুর্বলতা। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে- মানুষের মধ্য থেকে নবী-রাসূলদের আবির্ভাবের বিষয়টি তাদের শক্তিশালী দিক। কারণ, তাঁরা মানুষের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পরিচিত বলে দাওয়াতি কাজে তাদের ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব রাখতে পারেন। মানুষের জন্য সর্বোত্তম আদর্শ হতে পারেন নবী-রাসূলগণ।#

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন