এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 05 জানুয়ারী 2016 12:08

সূরা আশ-শোয়ারা; আয়াত ১৮৮-১৯৭ (পর্ব-২৪)

সূরা শোয়ারার ১৮৮ থেকে ১৯১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

قَالَ رَبِّي أَعْلَمُ بِمَا تَعْمَلُونَ (188) فَكَذَّبُوهُ فَأَخَذَهُمْ عَذَابُ يَوْمِ الظُّلَّةِ إِنَّهُ كَانَ عَذَابَ يَوْمٍ عَظِيمٍ (189) إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَةً وَمَا كَانَ أَكْثَرُهُمْ مُؤْمِنِينَ (190) وَإِنَّ رَبَّكَ لَهُوَ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ (191)

“(শোয়াইব) বলল- তোমরা যা করো সে সম্পর্কে আমার প্রতিপালক ভালো জানেন।” (২৬:১৮৮)

“অতঃপর ওরা তাকে প্রত্যাখ্যান করল, পরে ওদেরকে মেঘাচ্ছন্ন দিবসের (অগ্নিবৃষ্টির) শাস্তি গ্রাস করল। এ ছিল এক ভীষণ দিবসের শাস্তি।”(২৬:১৮৯)

“এই (ঘটনায়) অবশ্যই (মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে) নিদর্শন আছে, কিন্তু ওদের অধিকাংশই ঈমান আনেনি।” (২৬:১৯০)

“এবং তোমার প্রতিপালক, তিনি তো পরাক্রমশালী, দয়াময়।” (২৬:১৯১)

 

আগের পর্বে বলা হয়েছে: মাদায়েনের নিকটবর্তী আইকা জনপদের কাফেররা হযরত শোয়াইব (আ.)কে জাদুকর বলে আখ্যায়িত করে। তারা বলে, শোয়াইবের মতিভ্রম হয়েছে বলে সে উল্টোপাল্টা কথা বলছে। সেইসঙ্গে তারা আল্লাহর নবীকে অস্বীকার করে। কাফেররা হযরত শোয়াইব (আ.)কে কটাক্ষ করে বলে: তুমি আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছ এবং তাঁর কথা অমান্য করলে তিনি আমাদের শাস্তি দেবেন বলে যে দাবি করছ, তা যদি সত্যি হয় তাহলে এই দুনিয়ায়ই আসমান থেকে আমাদের উপর বড় বড় পাথর বর্ষণ করতে বলো এবং এখানেই পারলে আমাদের শাস্তি দাও।

 

এরপর আজকের এই চার আয়াতে বলা হচ্ছে: হযরত শোয়াইব (আ.) কাফেরদের এ প্রস্তাবের জবাবে বলেন: মহান আল্লাহ তোমাদের কাজকর্ম দেখছেন ও শুনছেন এবং তিনি তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী তোমাদের সঙ্গে আচরণ করবেন। তিনি তোমাদেরকে শাস্তি দেবেন কি দেবেন না এবং কীভাবে শাস্তি দেবেন তা তিনিই ভালো জানেন এবং এখানে আমার কোনো হাত নেই।

 

এরপর আল্লাহতায়ালা হযরত শোয়াইবের জাতিকে ভয়াবহ শাস্তি দিয়ে ধ্বংস করে ফেলেন। হাদিস শরীফে তাদের উপর নেমে আসা শাস্তি সম্পর্কে বলা হয়েছে: তাদের জনপদে কিছুদিন প্রচণ্ড সূর্যতাপ বর্ষণ করা হয়। কিছুদিন পর গরমে যখন সবার প্রাণ ওষ্ঠাগত তখন আকাশ কালো মেঘে ছেয়ে যায়। এটি দেখে মানুষ ভাবে, এখনই বুঝি বৃষ্টি নেমে আবহাওয়া শীতল হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায় উল্টো ঘটনা। হঠাৎ কালো মেঘের ভেতর থেকে প্রচণ্ড এক বজ্রপাত হয়। বজ্রপাতে আইকা জনপদের সব গাছপালায় আগুন ধরে যায় এবং প্রকাণ্ড অগ্নিকুণ্ডলি সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি ভয়াবহ ভূমিকম্প সংঘটিত হয় এবং অবিশ্বাসী কাফেররা অসহনীয় যন্ত্রণা ভোগ করার পর মারা যায়।

 

হযরত শোয়াইব (আ.)-এর জাতির পরিণতি বর্ণনা করার পরের দুই আয়াতে সেই কথারই পুনরাবৃত্তি করা হয়েছে যা বলা হয়েছিল আগের নবী ও জাতিগুলোর পরিণতি জানানোর পর। এসব আয়াতে বলা হচ্ছে: এই অহংকারী ও উদ্ধত জাতির ধ্বংস হয়ে যাওয়ার মধ্যে অনেক নিদর্শন ও শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ এসব নিদর্শন দেখা সত্ত্বেও ঈমান আনে না। তাদের আচরণ দেখে মনে হয়, যারা মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ করে তাদেরকে যে তিনি ধ্বংস করে দিতে পারেন- একথা যেন তাদের জানা নেই। অবশ্য যারা বিরুদ্ধাচরণ ও পাপকাজ করার পর অনুতপ্ত হয়ে তওবা করে, তাদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করে দেন এবং তাদের জন্য নিজের রহমতের দরজা খুলে দেন।

 

এই চার আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১. পাপী ব্যক্তিদের শাস্তির ধরণ ও পরিমান সম্পর্কে আমাদের কোনো কথা বলা উচিত নয়। কারণ, আল্লাহর নবীরা পর্যন্ত এ ব্যাপারে কথা বলেননি এবং তারা শুধু বলেছেন, এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আল্লাহর।

২. দুনিয়াপুজা ও পার্থিব সম্পদ লাভের লালসা মানুষকে নবী-রাসূলদের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেয়। আর এ বিরুদ্ধাচরণের জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে ভয়াবহ শাস্তি অপেক্ষা করছে।

 

সূরা শোয়ারার ১৯২ থেকে ১৯৫ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে বলা হয়েছে:

  وَإِنَّهُ لَتَنْزِيلُ رَبِّ الْعَالَمِينَ (192) نَزَلَ بِهِ الرُّوحُ الْأَمِينُ (193) عَلَى قَلْبِكَ لِتَكُونَ مِنَ الْمُنْذِرِينَ (194) بِلِسَانٍ عَرَبِيٍّ مُبِينٍ (195)

“এবং নিশ্চয় এই (কোরআন) বিশ্বজগতের প্রতিপালকের নিকট হতে অবতীর্ণ হয়েছে।” (২৬:১৯২)

“বিশ্বাসী আত্মা (জিব্রাইল) দ্বারা এটি অবতীর্ণ হয়েছে;” (২৬:১৯৩)

“তোমার অন্তরের উপর; যাতে তুমি  সতর্ককারী হতে পারো।” (২৬:১৯৪)

“(অবতীর্ণ করা হয়েছে) সুস্পষ্ট আরবি ভাষায়।” (২৬:১৯৪)

 

সাতজন নবী-রাসূলের সত্য ঘটনা এবং তাদের জাতিগুলোর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কাহিনী বর্ণনা করার পর এই চার আয়াতে বলা হচ্ছে: এতক্ষণ অতীত জাতিগুলোর যেসব ঘটনা বর্ণনা করা হলো তা রূপকথা বা কল্পকাহিনী নয়। এগুলো মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে হযরত জিব্রাইল আমিনের মাধ্যমে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর অন্তরে নাজিল হয়েছে। রাসূলে খোদাও সে বাণী হুবহু মানুষের সামনে তুলে ধরেছেন যাতে তারা আল্লাহর নাফরমানি থেকে রিবত থাকে। এ ছাড়া, পবিত্র কুরআন যে/ সব ধরনের বিকৃতির হাত থেকে রক্ষাপ্রাপ্ত একটি আসমানি কিতাব তাও এসব আয়াতে তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমে বলা হচ্ছে, আল্লাহর পক্ষ থেকে যে ফেরেশতা কুরআনের বাণী নিয়ে এসেছেন তিনি আমিন বা বিশ্বাসী। এরপর যার অন্তরে এই সত্যবাণী নাজিল হয়েছে তিনি নবুওয়াতপ্রাপ্তির আগে থেকেই আল-আমিন উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।  বিশ্বনবী (সা.) তাঁর অন্তরে বদ্ধমূল সেই বাণী উদ্ধৃত করে মানুষকে সঠিক পথে ফিরে আসার আহ্বান জানান। কাজেই মহাগ্রন্থ আল-কুরআন সব ধরনের সংশয়মুক্ত একটি আসমানি কিতাব যা উচ্চস্তরের বাগ্মিতা ও অলংকারশাস্ত্রে  পরিপূর্ণ।

 

এই চার আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১.  যিনি হযরত জিব্রাইলের মাধ্যমে ওহী নাজিল করেন এবং মানুষের চূড়ান্ত সফলতার জন্য হেদায়েতের বাণী পাঠান তিনিই এই বিশ্বজগত সৃষ্টি ও পরিচালনা করছেন।

২. পবিত্র কুরআন আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে নাজিল হওয়া ওহীর সমষ্টি এবং এটি সব ধরনের বিকৃতি ও সংশয়মুক্ত।

৩. অবিশ্বাসী কাফির-মুশরিকদের সৎপথে পরিচালনা ও আল্লাহর শাস্তি সম্পর্কে সচেতন করে তোলার জন্য যুগে যুগে আল্লাহ নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন। তিনি সতর্ক করার আগে কোনো জাতিকে শাস্তি দেননি।

 

সূরার ১৯৬ ও ১৯৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

وَإِنَّهُ لَفِي زُبُرِ الْأَوَّلِينَ (196) أَوَلَمْ يَكُنْ لَهُمْ آَيَةً أَنْ يَعْلَمَهُ عُلَمَاءُ بَنِي إِسْرَائِيلَ (197)

“পূর্ববর্তী কেতাবসমূহে অবশ্যই এই (ঘটনার খবর) উল্লেখ আছে।” (২৬:১৯৬)     

“বনী-ইসরাইলের পণ্ডিতগণ যে এ সম্পর্কে অবগত আছে, তা কি ওদের কাছে (এর সত্যতার) নিদর্শন নয়?” (২৬:১৯৭)

 

এই দুই আয়াতে পবিত্র কুরআনের সত্যতার অন্যতম নিদর্শন উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: মক্কার মুশরিকদের যদি কুরআনের সত্যতার ব্যাপারে সন্দেহ থাকে তাহলে তারা ইহুদি পণ্ডিতদের শরণাপন্ন হতে পারে। তাওরাতে যে বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর প্রতি অবতীর্ণ কিতাবের কথা উল্লেখ রয়েছে সেকথা তাদের কাছ থেকে জেনে নিতে পারো। রাসূলের আবির্ভাবের যুগে ইহুদিদের হাতে যে তাওরাত ছিল তাতে যদি বিশ্বনবী (সা.)-এর আগমনের কথা না থাকতো এবং ইহুদি পণ্ডিতদের তা জানা না  থাকতো তাহলে পবিত্র কুরআনে এ দাবি করা হতো না। কারণ, সেক্ষেত্রে ইহুদি পণ্ডিতরা কুরআনের দাবি অস্বীকার করতো এবং তখন মক্কার কাফিররা বিশ্বনবীকে মিথ্যাবাদী আখ্যায়িত করার সুযোগ পেত।

 

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. শেষ নবীর আগমন এবং  তাঁর উপর শেষ আসমানি গ্রন্থ নাজিল হওয়ার সুসংবাদ পূর্ববর্তী আসমানি কিতাবগুলোতে দেয়া হয়েছিল।

২. পবিত্র কুরআনে বর্ণিত বহু আয়াতের মর্মার্থ অতীতের আসমানি গ্রন্থগুলোতেও এসেছিল। আর এসব আয়াতের পূর্ণাঙ্গ রূপ মহানবীর পবিত্র অন্তরে নাজিল হয়।

৩. ইহুদি পণ্ডিতরা পবিত্র কুরআনের সত্যতা সম্পর্কে জানতো। কিন্তু নিজেদের স্বার্থ ও অবস্থান ধরে রাখতে তারা সত্য গ্রহণ করেনি।#

 

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন