এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 05 জানুয়ারী 2016 12:10

সূরা আশ-শোয়ারা; আয়াত ১৯৮-২০৯ (পর্ব-২৫)

সূরা শোয়ারার ১৯৮ ও ১৯৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন :

وَلَوْ نَزَّلْنَاهُ عَلَى بَعْضِ الْأَعْجَمِينَ (198) فَقَرَأَهُ عَلَيْهِمْ مَا كَانُوا بِهِ مُؤْمِنِينَ (199)

“এবং যদি এ (কুরআন) কোন অনারবের প্রতি অবতীর্ণ করা হতো।” (২৬:১৯৮)

“এবং সে (অর্থাৎ রাসূল) এটি ওদের নিকট পাঠ করত; তবুও ওরা বিশ্বাস করত না।” (২৬:১৯৯)

 

আগের পর্বে বলা হয়েছে, মহান আল্লাহ জোর দিয়ে এটা বলেছেন যে, তিনি শুদ্ধ আরবি ভাষায় পবিত্র কুরআন নাজিল করেছেন যাতে তোমরা শিক্ষা নিতে ও সাবধান হতে পারো। আজকের এই দুই আয়াতে এর একটি কারণ উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: আরবদের গোত্রগত সংকীর্ণতা এতটা প্রবল যে, যদি কুরআন অন্য কোনো ভাষায় নাজিল হতো এবং রাসূলে খোদা অন্য কোনো জাতির মধ্যে আসতেন তাহলে তারা কোনো অবস্থাতেই ঈমান আনতো না এবং বিশ্বনবীর বক্তব্য মেনে নিত না। মক্কার কাফেরদের আচরণেই এ কথার সত্যতা প্রমাণিত হচ্ছে।

 

আরবদের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত বংশের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত গোত্রের একজন পুরুষকে রিসালাতের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে এবং তাঁর ব্যাপারে পূর্ববর্তী গ্রন্থগুলোতেও ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে। এতকিছুর পরও মক্কার কাফের-মুশরিকরা বিশ্বনবী (সা.)কে মেনে নিত রাজি হয়নি। আর তিনি যদি অনারব কোনো পুরুষ হতেন এবং অন্য কোনো ভাষায় কুরআন নাজিল হতো তাহলে সত্যিই আরবরা আল্লাহতায়ালার প্রতি ঈমান আনতো না। ইমাম জাফর সাদেক (আ.) এ সম্পর্কে বলেন: পবিত্র কুরআন আরবি ভাষায় নাজিল হওয়ার পরও অনারবরা এর প্রতি ঈমান এনেছেন। কিন্তু অনারব কোনো ভাষায় মহাগ্রন্থ আল কুরআন অবতীর্ণ হলে বহু আরব ইসলাম গ্রহণ করতো না।

 

এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. দ্বীন প্রচারের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ভাষা এবং অনুভূতিকে বিবেচনায় নিতে হবে। তা না করলে তাদের মধ্যে সত্যবাণী গ্রহণের প্রবণতা কমে যাবে।

২. সত্য গ্রহণের ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান বাধা হচ্ছে গোত্র ও বর্ণগত উগ্রতা। আমাদেরকে এ ব্যাপারে সাবধান থাকতে হবে যে, জাতীয়তাবাদী চেতনা যেন সত্য গ্রহণের পথে প্রতিবন্ধকতা হয়ে না দাঁড়ায়।

 

সূরা শোয়ারার ২০০ থেকে ২০৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

  كَذَلِكَ سَلَكْنَاهُ فِي قُلُوبِ الْمُجْرِمِينَ (200) لَا يُؤْمِنُونَ بِهِ حَتَّى يَرَوُا الْعَذَابَ الْأَلِيمَ (201) فَيَأْتِيَهُمْ بَغْتَةً وَهُمْ لَا يَشْعُرُونَ (202) فَيَقُولُوا هَلْ نَحْنُ مُنْظَرُونَ (203)

“এইভাবে আমি কুরআনকে (বোধগম্য ও স্পষ্ট ভাষায়) অপরাধীদের অন্তরে স্থাপন করেছি।” (২৬:২০০)

“(কিন্তু ওরা) এতে বিশ্বাস স্থাপন করবে না (ততক্ষণ পর্যন্ত) যতক্ষণ না ওরা মর্মন্তুদ শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।” (২৬:২০১)

“এ (শাস্তি) ওদের নিকট আকস্মিকভাবে এসে পড়বে, ওরা কিছুই বুঝতে পারবে না।”(২৬:২০২)

“তখন ওরা বলবে-আমাদের কি অবকাশ দেয়া হবে না?” (২৬:২০৩)

 

পবিত্র কুরআন শুধু মুমিনদের জন্য উপদেশবাণী নিয়ে আসেনি। বরং কাফের ও মুশরিকদের উদ্দেশ্যেও এ মহাগ্রন্থের বাণী তুলে ধরতে হবে যাতে তারা ঈমান না আনার পক্ষে কোনো অজুহাত তুলে ধরতে না পারে। মহান আল্লাহ যেমনটি বলছেন: আমি এমন ভাষায় কুরআন নাজিল করেছি যাতে সবাই এটি বোঝে ও উপলব্ধি করে। কিন্তু উগ্রতা, গোঁড়ামি এবং পাপাচারে লিপ্ত হয়ে অন্তরকে কলুষিত করে ফেলার কারণে অনেকে আল্লাহর বাণীর প্রতি ঈমান আনে না বরং তা প্রত্যাখ্যান করে। কেউ কেউ আবার তাদের কুফরির প্রতি এতটা দৃঢ়তা দেখায় যে দাবি করে, যে আজাবের কথা তুমি আমাদেরকে শোনাচ্ছো পারলে তা আমাদেরকে দেখাও যাতে আমরা নিজেদের চোখে তা দেখে ঈমান আনতে পারি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে আল্লাহর আজাব নাজিল হওয়ার পর আর ঈমান আনার সুযোগ দেয়া হবে না। কারণ, আজাব নাজিল হয় হঠাৎ করে এবং পূর্ব সতর্কতা ছাড়াই।

 

এই চার আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১.  অন্তরকে সত্য গ্রহণের জন্য প্রস্তুত না করলে পবিত্র কুরআনের বাণী মানুষের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না।

২.  গোনাহ ও পাপাচারের কাজ বন্ধ না করলে মানুষের অন্তরে হেদায়েতের বাণী পৌঁছায় না।

৩. আল্লাহ আমাদেরকে সময় ও সুযোগ দিয়েছেন বলে অহংকারি হওয়া যাবে না। কারণ, মৃত্যু ও খোদায়ী আজাব হঠাৎ করেই আসবে এবং এরপর আর সময় পাওয়া যাবে না।

 

সূরা শোয়ারার ২০৪ থেকে ২০৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

  أَفَبِعَذَابِنَا يَسْتَعْجِلُونَ (204) أَفَرَأَيْتَ إِنْ مَتَّعْنَاهُمْ سِنِينَ (205) ثُمَّ جَاءَهُمْ مَا كَانُوا يُوعَدُونَ (206) مَا أَغْنَى عَنْهُمْ مَا كَانُوا يُمَتَّعُونَ (207)

“ওরা কি তবে আমার শাস্তি ত্বরান্বিত করতে চায়?” (২৬:২০৪)

“তুমি কি লক্ষ্য করছো- যদি আমি তাদের দীর্ঘকাল (আমার নেয়ামতের মাধ্যমে) ভোগবিলাস করতে দেই;” (২৬:২০৫)

“এবং পরে ওদের যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল, তা ওদের নিকট এসে পড়ে।” (২৬:২০৬)

“তখন ওদের ভোগবিলাসের উপকরণ (আজাব প্রতিহত করার কাজে) ওদের কোনো উপকারে আসবে না।” (২৬:২০৭)

 

আগের কয়েকটি আয়াতে বলা হয়েছে, অবিশ্বাসী কাফেররা খোদায়ী আজাব প্রত্যক্ষ করার পর পাপাচার ত্যাগ করার এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনার জন্য সময় প্রার্থনা করে। তারা বলে, এখন আমরা এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করলাম। আর এই চার আয়াতে আল্লাহ বলছেন: তাদেরকে যদি বছরের পর বছরও সময় দেয়া হয় তারপরও তারা ঈমান আনবে না এবং আল্লাহর প্রতিশ্রুতিগুলো প্রত্যাখ্যান করবে। এ অবস্থায় কোনো কিছুই তাদেরকে আল্লাহর শাস্তি থেকে রক্ষা করতে পারবে না। দুনিয়ার ধন-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি তাদের কোনো কাজে আসবে না।

পাপাচারী ও জালিম ব্যক্তিদের অন্তর পাপ করতে করতে এতটাই কলুষিত হয়ে যায় যে, যখনই নবী-রাসূলগণ তাদেরকে আল্লাহর শাস্তির ভয় দেখান তখনই তারা হাসি-ঠাট্টার মাধ্যমে তা উড়িয়ে দেয় এবং বলে, যদি তুমি সত্য বলে থাকো তাহলে যে শাস্তির কথা বলছো তা নাজিল করে দেখাও। অথচ ঐশী শাস্তি নাজিল হওয়ার পর আল্লাহ কাউকে আর সঠিক পথে আসার জন্য সময় দেবেন না।

 

এই চার আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. আজ যারা আল্লাহর শাস্তির হুমকি প্রত্যাখ্যান করে কালই তারা ওই শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য সময় প্রার্থনা করবে। কিন্তু তখন এ প্রার্থনা কোনো কাজে আসবে না কারণ, আসমানি শাস্তি চোখে দেখার পর তওবা বা অনুশোচনার পথ বন্ধ হয়ে যায়।

২. আল্লাহর শাস্তি নেমে আসলে সম্পদ, ক্ষমতা ও সুখ্যাতি মানুষের কোনো কাজে আসবে না।

৩. দুনিয়ায় ধন-সম্পদ থাকার অর্থ এই নয় যে, মহান আল্লাহ আমাদের ওপর সদয় আছেন। কারণ, অনেক কাফের-মুশরিকও পার্থিব জীবনে অনেক ধন-দৌলতের অধিকারী হয়। আর পরকালে পার্থিব জীবনের ধন-সম্পদ কোনো কাজে আসবে না।

 

এই সূরার ২০৮ ও ২০৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন বলেছেন:

وَمَا أَهْلَكْنَا مِنْ قَرْيَةٍ إِلَّا لَهَا مُنْذِرُونَ (208) ذِكْرَى وَمَا كُنَّا ظَالِمِينَ (209)

“এবং আমি কোনো জনপদ ধ্বংস করিনি সতর্ককারী না পাঠিয়ে।” (২৬:২০৮)

“এটি উপদেশস্বরূপ, আমি জালেম বা অন্যায়াচারী নই।” (২৬:২০৯)

 

এই দুই আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর একটি সার্বিক আইন তুলে ধরেছেন। বলা হচ্ছে: আল্লাহর নিয়ম হচ্ছে সব মানুষের সামনে ঈমানের দাওয়াত তুলে ধরা। এজন্য তিনি যুগে যুগে নবী-রাসূল পাঠিয়েছেন মানুষকে তাদের অন্যায়, অত্যাচার ও পাপাচারের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করার এবং সঠিক পথে ফিরে আসার আহ্বান জানানোর জন্য। এই আহ্বান শুনে যারা সত্য পথ অবলম্বন করেছে তারাই সফলকাম। কিন্তু যারা আহ্বান শোনার পরও জেনে-বুঝে আল্লাহর আদেশ অমান্য করেছে মহান আল্লাহ তাদের ধ্বংস করে দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে এই বিধান দিয়েছেন এবং এখানে তিনি কারো প্রতি জুলুম করেননি।

 

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে:

১. সব যুগে সব জাতি ও সম্প্রদায়কে সতর্ক করার জন্য মহান আল্লাহ নবী বা রাসূল পাঠিয়েছেন।

২. আগে সতর্ক না করে কাউকে শাস্তি দেয়া অন্যায় বা জুলুম এবং মহান আল্লাহ তার কোনো বান্দার সঙ্গে এ ধরনের অন্যায় আচরণ করেন না।#

 

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন