এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 05 জানুয়ারী 2016 12:10

সূরা আশ-শোয়ারা; আয়াত ২১০-২১৬ (পর্ব-২৬)

সূরা শোয়ারা’র ২১০, ২১১ ও ২১২  নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

    وَمَا تَنَزَّلَتْ بِهِ الشَّيَاطِينُ (210) وَمَا يَنْبَغِي لَهُمْ وَمَا يَسْتَطِيعُونَ (211) إِنَّهُمْ عَنِ السَّمْعِ لَمَعْزُولُونَ (212)

“শয়তানরা আল-কোরআন অবতীর্ণ করেনি।” (২৬:২১০)

“ওরা এই কাজের যোগ্য নয় এবং ওরা এর সামর্থ্যও রাখে না।” (২৬:২১১)

“নিঃসন্দেহে ওদেরকে (আসমানের খবর) শ্রবণের অধিকার দেয়া হয়নি।” (২৬:২১২)

 

আগের পর্বের ধারাবাহিকতায় এই তিন আয়াতে মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি কাফির-মুশরিকদের আরেকটি মিথ্যা অপবাদের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: অবিশ্বাসীরা বলত, একটি জ্বিনের সঙ্গে রাসূলে খোদার সম্পর্ক আছে এবং ওই জ্বিনটি তাঁর কাছে কুরআনের আয়াত নিয়ে আসে (নাউজুবিল্লাহ)। বিরুদ্ধবাদীরা রাসূলকে যে শব্দটি প্রয়োগ করে অপবাদ দিতো এবং যে শব্দটির কথা পবিত্র কুরআনে বেশ কয়েকবার উল্লেখ করা হয়েছে তা হচ্ছে মাজনুন। এই শব্দটির মাধ্যমে বিশ্বনবীকে কবি বলেও অপবাদ দিতো কাফেররা। আরবি ভাষায় জিনের আসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে মাজনুন বলা হয়।

 

মক্কার মুশরিকদের এই অপবাদের জবাবে আল্লাহতায়ালা তাদেরকে বলছেন: তোমরা সত্যবাণীকে শয়তানের বক্তব্য বলে অপবাদ দিচ্ছ। অথচ পবিত্র কুরআনের উন্নত শিক্ষার সঙ্গে শয়তানের চিন্তাধারার কোনো সম্পর্ক নেই। এ ধরনের উন্নত ও উচ্চ মানের বাণী লেখা শয়তানদের পক্ষে সম্ভব নয়। এমনকি এসব বাণীকে আল্লাহর বক্তব্য বলে চালিয়ে দিয়ে নবীর উপর নাজিল করার ক্ষমতাও তাদের নেই। কারণ, অদৃশ্য থেকে যে বাণী আসে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে নাকি শয়তান ধোকা দিচ্ছে সে তারতম্য করার ক্ষমতা মহান আল্লাহর হুজুরে পাক (সা.)কে দিয়েছিলেন।

 

এ ছাড়া, বিশ্বনবী (সা.)-এর আবির্ভাবের পর  জিন জাতির সঙ্গে আরশে আযিমের সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায়। জ্বিনরা তার আগ পর্যন্ত ফেরেশতাদের সঙ্গে মিশে গিয়ে ঊর্ধ্বাকাশের খবরাখবর পেয়ে যেত। কিন্তু রাসূলের আবির্ভাবের পর এই যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন হয়ে যায়। কাজেই তাদের পক্ষে আর আসমানের কোনো কথা শুনে তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া সম্ভব ছিল না।

 

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. মহান আল্লাহ বিশেষভাবে পবিত্র কুরআনের পবিত্রতা ও স্বাতন্ত্র সংরক্ষণ করেছেন। অন্য কারো পক্ষে এতে বিকৃতি আনা সম্ভব নয়। এ কারণে শয়তান আল্লাহর ওহী গ্রহণ বা তা রাসূলের কাছে পাঠানোর ক্ষমতা রাখে না।

২. শয়তান শুধুমাত্র তার নিজের ঘনিষ্ঠজনদের কাছে হাজির হয়ে তাদেরকে কুমন্ত্রণা দিতে পারে। কিন্তু নবী-রাসূলসহ আল্লাহর খাঁটি বান্দাদের ধারেকাছে যাওয়ারও শক্তি শয়তানের নেই।

৩. মানুষের অন্তর যদি কলুষমুক্ত ও পবিত্র না হয় তাহলে আল্লাহর বাণী তার ওপর কোনো প্রভাব ফেলে না এবং সে হক কথা শোনার পরও সত্য পথ পায় না।

 

এই সূরার ২১৩ থেকে ২১৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,

  فَلَا تَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آَخَرَ فَتَكُونَ مِنَ الْمُعَذَّبِينَ (213) وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ (214) وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ (215) فَإِنْ عَصَوْكَ فَقُلْ إِنِّي بَرِيءٌ مِمَّا تَعْمَلُونَ (216)


“অতএব তুমি কোনো উপাস্যকে আল্লাহর শরিক করো না। করলে তুমি শাস্তি পাবে।” (২৬:২১৩)

“এবং তোমার আত্মীয়-স্বজনকে তুমি সতর্ক করে দাও।” (২৬:২১৪)

“এবং মু’মিনদের মধ্য থেকে যারা তোমার অনুসরণ করে তাদের সাথে বিনম্র ব্যবহার করো।” (২৬:২১৫)

“ওরা যদি তোমার অবাধ্যতা করে, তুমি বলো- তোমরা যা করো তার জন্য আমি দায়ী নই।” (২৬:২১৬)

 

এই চার আয়াতে মহান আল্লাহ বিশ্বনবী (সা.)কে উদ্দেশ করে কিছু বিষয়ে নির্দেশনা জারি করেছেন। বিরুদ্ধবাদীদের সম্পর্কে প্রথম নির্দেশ জারি করে আল্লাহ বলছেন: মুশরিকদের মোকাবিলায় শক্ত অবস্থান ও দৃঢ় প্রত্যয় দেখাতে হবে। তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য তৌহিদ ও একত্ববাদের বাণী প্রচার থেকে বিরত থাকা যাবে না। যদি বিশ্বনবী এ কাজ করেন তাহলে তাকেও মুশরিকদের পরিণতি ভোগ করতে হবে। নিজের আত্মীয়-স্বজনদের ব্যাপারে দ্বিতীয় নির্দেশনায় আল্লাহতায়ালা বলছেন: মানুষের মধ্যে তৌহিদের বাণী প্রচারের ক্ষেত্রে প্রথমে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজন থেকে শুরু করুন। অন্য সবার আগে নিজস্ব লোকদেরকে শিরক ও মূর্তিপূজার পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করুন। মহান আল্লাহ তৃতীয় নির্দেশ দিচ্ছেন মুমিন বান্দাদের ব্যাপারে। তিনি বলছেন: আপনি আপনার অনুসারীদের সঙ্গে সদয় আচরণ করুন। রাজা-বাদশাহরা যেমন সাধারণ মানুষকে নিজেদের দাস বলে মনে করে এবং তাদের সঙ্গে প্রজাসুলভ আচরণ করে- আপনি তেমনটি করবেন না। মুমিন ব্যাক্তিদের সঙ্গে আপনার আচরণ হতে হবে দয়ালু ও সদয়।

 

একটি পাখী যেমন নিজের বাচ্চাদেরকে তার ডানার নীচে আশ্রয় দেয় এবং তাদের ভালোবাসে আপনাকেও তেমন আচরণই করতে হবে। এরপর দ্বিতীয় নির্দেশের জের ধরে চতুর্থ দিক-নির্দেশনায় আল্লাহ বলছেন: যেসব ঘনিষ্ঠজনকে তৌহিদের দিকে আহ্বান জানিয়েছেন তাদের মধ্যে যারা সত্য গ্রহণ না করে শিরকের প্রতি অটল থেকেছে তাদের ব্যাপারে আপনি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করুন। বলে দিন যে,তাদের এ কাজের প্রতি আপনার কোনো সায় নেই এবং আপনি এ কাজকে ঘৃণা করেন।

ইতিহাসে এসেছে, এই আয়াতগুলো নাজিল হওয়ার পর রাসূলে খোদা (সা.) তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনকে দাওয়াত করেন। এসব ব্যক্তির মধ্যে ছিল আবু তালেব, আবু লাহাব ও হযরত হামজা। খাওয়া-দাওয়া শেষ হওয়ার পর বিশ্বনবী যাতে তাঁর দাওয়াতের বাণী উপস্থিত মেহমানদের সামনে তুলে ধরতে না পারেন সেজন্য আবু লাহাব গণ্ডগোল বাঁধিয়ে দেয়।

 

এ অবস্থায় সবাই যে যার বাড়ি চলে যায়। বিশ্বনবী আরেকদিন তাদের সবাইকে দাওয়াত দেন এবং খাওয়া-দাওয়া শেষ হওয়ার পর বলেন: মহান আল্লাহ আমাকে নির্দেশ দিয়েছেন আমি যেন আপনাদের মাঝে তৌহিদের বাণী প্রচার করি। আমি আপনাদের পার্থিব ও পারলৌকিক কল্যাণ কামনা করি এবং আমি আপনাদের জন্য যা নিয়ে এসেছি অন্য কোনো ব্যক্তি তার জাতির জন্য সেরকম কিছু আনতে পেরেছে বলে আমার জানা নেই। আপনাদের মধ্য থেকে যে কেউ আমাকে সাহায্য করবেন তিনি হবেন আমার ভাই এবং আমার উত্তরাধিকারী। রাসূলে খোদার এ আহ্বানে মাত্র একজনই সাড়া দিলেন। তিনি হলেন আলী ইবনে আবি তালেব। এ অবস্থায় বিশ্বনবী (সা.)  উপস্থিত জনতার উদ্দেশে বলেন: আপনারা জেনে রাখুন আলী আমার ভাই এবং আমার উত্তরাধিকারী। আমার পরে তার কথা মেনে চলবেন এবং তার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করবেন। বেশিরভাগ মুসলিম ইতিহাসবিদ এই ঘটনা ঠিক এভাবেই বর্ণনা করেছেন। এ থেকে বোঝা যায় হযরত আলী (আ.) বিশ্বনবী (সা.)-এর কতটা ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং তার মর্যাদা কত ঊর্ধ্বে।

 

এ চার আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো অনুসরণের পরিণতি হবে অত্যন্ত ভয়াবহ। শিরক করার কারণে অতীতের বহু জাতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।

২. ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের প্রতি মানুষের দায়িত্ব অনেক বেশী। পরিবারের সদস্যদের ভরণ-পোষণের দায়িত্বের মতো তাদেরকে সঠিক পথে হেদায়েত করাও মানুষের কর্তব্যের মধ্যে পড়ে।

৩. অসৎ কাজে নিষেধ করতে গিয়ে ঘনিষ্ঠজন বলে পিছিয়ে আসার সুযোগ নেই। তারা মনঃক্ষুণ্ন হলেও খারাপ কাজ থেকে তাদেরকে বিরত থাকার আহ্বান জানাতে হবে।

৪. সমাজের শিক্ষক ও নেতাদের অবশ্যপালনীয় গুণগুলোর একটি হলো মার্জিত ও সদয় আচরণ। নিজের অনুসারী ও অনুগত ব্যক্তিদের সঙ্গে সদয় আচরণ করতে হবে।

৫.সমাজকে বিকৃতির হাত থেকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সামনে নিজের অবস্থান সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করতে হবে। কেউ মনঃক্ষুণ্ন হতে পারে ভেবে নিজের অবস্থান অস্পষ্ট রাখার সুযোগ নেই।#

 

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন