এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
মঙ্গলবার, 05 জানুয়ারী 2016 12:18

সূরা আশ-শোয়ারা; আয়াত ২১৭-২২৭ (পর্ব-২৭)

সূরা শোয়ারার ২১৭ থেকে ২২০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:  

وَتَوَكَّلْ عَلَى الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ (217) الَّذِي يَرَاكَ حِينَ تَقُومُ (218) وَتَقَلُّبَكَ فِي السَّاجِدِينَ (219) إِنَّهُ هُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ (220)

“তুমি নির্ভর করো পরাক্রমশালী ও দয়াময় আল্লাহর ওপর।” (২৬:২১৭)

“যিনি তোমাকে দেখেন  যখন তুমি (নামাজে) দাঁড়াও।” (২৬:২১৮)

“এবং সিজদাকারীদের মধ্যেও তোমার তৎপরতা (প্রত্যক্ষ করেন)।” (২৬:২১৯)

“তিনি তো সর্বশ্রোতা ও সর্বজ্ঞ।” (২৬:২২০)

 

আগের পর্বে বলা হয়েছে, অবিশ্বাসী কাফেরদের অশ্লীল কথাবার্তা ও পীড়াদায়ক আচরণের বিপরীতে বিশ্বনবী (সা.)কে কিছু দিক-নির্দেশনা দিয়েছেন মহান আল্লাহ। আমরা এরকম চারটি নির্দেশের কথা উল্লেখ করেছি। এখানে এ সংক্রান্ত পঞ্চম নির্দেশে আল্লাহতায়ালা বলছেন: ধৈর্য ও প্রচেষ্টার পাশাপাশি আল্লাহর ওপর নির্ভর করুন। কারণ, তিনি মহাপরাক্রমশালী এবং তিনি যদি কিছু করতে চান তাহলে তার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করার সাধ্য কারো নেই। আগের নবী-রাসূলদের জীবনীতে তো আপনি দেখেছেন, ফেরাউন ও নমরুদ মহা প্রতাপশালী রাজা হওয়ার পরও আমি তাদেরকে ধ্বংস করে দিয়েছি এবং মুসাকে ক্ষমতা দান করেছি।

 

পরবর্তী আয়াতে বলা হয়েছে, নামাজ ও অন্যান্য ইবাদত করার সময় যেমন মহান আল্লাহ আপনাকে দেখছেন তেমনি আপনি যখন অন্য নামাজ আদায়কারীদের মধ্যে থাকেন তখনও অর্থাৎ সব অবস্থায় তাঁর দৃষ্টিসীমার মধ্যে রয়েছেন। এমনকি আপনি যখন মুশরিকদের একত্ববাদের প্রতি দাওয়াত দেয়ার কাজ করেন তখনও আপনাকে আল্লাহ দেখেন। আপনি সর্বাবস্থায় যা বলেন ও করেন সে সম্পর্কে আল্লাহ অবহিত এবং সব সময় তিনি আপনাকে সাহায্য করছেন। কাজেই তার উপর নির্ভর করে আপনি নিজের পথচলা অব্যাহত রাখুন এবং দৃঢ়তার সঙ্গে অবিশ্বাসী কাফিরদের বিরুদ্ধাচরণ করুন।

 

এ চার আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১- দুনিয়ার সম্পদ, সম্মান ও প্রভাব-প্রতিপত্তির পরিবর্তে আমরা সবাই মহান আল্লাহর উপর নির্ভর করবো যিনি একই সঙ্গে দয়ালু ও দাতা, সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ ও মহাপরিক্রমশালী।

২-নবী-রাসূলগণ সাধারণ কাজ থেকে শুরু করে ইবাদত ও সিজদারত অবস্থায়- সার্বক্ষণিকভাবে মহান আল্লাহর সরাসরি তত্ত্বাবধানে থাকেন।

 

সূরা শোয়ারা’র ২২১‌, ২২২ ও ২২৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

هَلْ أُنَبِّئُكُمْ عَلَى مَنْ تَنَزَّلُ الشَّيَاطِينُ (221) تَنَزَّلُ عَلَى كُلِّ أَفَّاكٍ أَثِيمٍ (222) يُلْقُونَ السَّمْعَ وَأَكْثَرُهُمْ كَاذِبُونَ (223)

“আমি কি তোমাকে জানাবো- কার প্রতি শয়তান অবতীর্ণ হয়?” (২৬:২২১)

“ওরা তো অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক ঘোর মিথ্যাবাদী ও পাপীর কাছে।” (২৬:২২২)

“ওরা (শয়তানের কথা শোনার জন্য) কান পেতে থাকে এবং ওদের বেশিরভাগই মিথ্যাবাদী।” (২৫:২২৩)

 

ইসলামের শত্রুরা দাবি করত- বিশ্বনবীর কাছে শয়তান আসে এবং সে যেসব কথা বলে যায় সেগুলোই হচ্ছে কুরআনের আয়াত। নাউজুবিল্লাহ। অবিশ্বাসী কাফিরদের এ ধরনের অপবাদের জবাবে এই তিন আয়াতে বলা হচ্ছে- শয়তান আসে মিথ্যাবাদী ও পাপাচারী ব্যক্তিদের কাছে এবং তাদেরকে আরো বেশি মিথ্যাচার ও পাপকাজে লিপ্ত হতে উৎসাহিত করে। এসব ব্যক্তিও শয়তানের কথা শোনার অপেক্ষায় থাকে এবং মিথ্যা ও পাপাচারের ভিত্তিতে নিজেদের দৈনন্দিন কাজকর্ম সাজায়। অথচ নবুওয়াত পাওয়ার আগে মক্কায় তোমাদের মধ্যে জীবনযাপনের সময় বিশ্বনবী ছিলেন সত্যবাদী, আমানতদার ও সচ্চরিত্র ব্যক্তি। তোমরা কি জীবনে একবারও মুহাম্মদকে মিথ্যা বলতে শুনেছো যে, এখন তার প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করে তার কথাকে শয়তানের বাণী বলে দাবি করছো? এ ছাড়া, সে তো পাক-পবিত্রতার দিকেই দাওয়াত দেয় এবং পাপাচার ও অত্যাচার থেকে তোমাদেরকে বিরত থাকতে বলে। অন্যদিকে, শয়তান সব সময় খারাপ কাজ, মিথ্যা ও পাপাচারের দিকে তোমাদেরকে উষ্কানি দেয়।

 

এ তিন আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় দিক হলো:

১. মিথ্যাচারী ও পাপী ব্যক্তিদের অন্তর সব সময় শয়তানের কুমন্ত্রণা গ্রহণের জন্য প্রস্তুত থাকে।

২. মিথ্যা কথা বেশিরভাগ পাপ ও খারাপ কাজের উৎস এবং শয়তানের কথা ও কুমন্ত্রণা মানুষের অন্তরে প্রবেশের দরজা হলো কান।

 

সূরা শোয়ারার ২২৪ থেকে ২২৭ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

وَالشُّعَرَاءُ يَتَّبِعُهُمُ الْغَاوُونَ (224) أَلَمْ تَرَ أَنَّهُمْ فِي كُلِّ وَادٍ يَهِيمُونَ (225) وَأَنَّهُمْ يَقُولُونَ مَا لَا يَفْعَلُونَ (226) إِلَّا الَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ وَذَكَرُوا اللَّهَ كَثِيرًا وَانْتَصَرُوا مِنْ بَعْدِ مَا ظُلِمُوا وَسَيَعْلَمُ الَّذِينَ ظَلَمُوا أَيَّ مُنْقَلَبٍ يَنْقَلِبُونَ (227)

 

“(রাসূল কবি নন, কারণ) কবিদের অনুসরণ করে তারাই- যারা বিভ্রান্ত।” (২৬:২২৪)

“তুমি কি দেখো না, ওরা লক্ষ্যহীনভাবে সব বিষয়ে অলীক কল্পনায় মেতে থাকে?” (২৬:২২৫)

“এবং ওরা যা বলে তা করে না?” (২৬:২২৬)

“তবে তাদের কথা আলাদা যারা (আল্লাহর প্রতি) ঈমান এনেছে ও সৎকাজ করে এবং আল্লাহকে বারবার স্মরণ করে ও অত্যাচারিত হওয়ার পর (আল্লাহর) সাহায্য চায়। অত্যাচারীরা শিগগিরই জানবে তাদের গন্তব্যস্থল কোথায়।” (২৬:২২৭)

 

সূরা শোয়ারার সর্বশেষ এই চার আয়াতে অবিশ্বাসী কাফিরদের আরেকটি অপবাদের জবাব দিয়ে বলা হয়েছে: বিশ্বনবী (সা.) কবি নন বরং তার মুখ থেকে নিঃসৃত বাণী মহাসত্য ও বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে লেখা হয়েছে। এগুলো কবি-মনের অলীক কল্পনা নয়। রাসূলুল্লাহ (সা.)এর সময়ে হিজাযে বা বর্তমান সৌদি আরবে বহু কবির বাস ছিল। মধ্যযুগের কুসংস্কার, অবৈধ প্রেম, যৌনাচার, মাতলামি, গোত্রীয় সংঘর্ষের মতো বিষয় ছিল এসব কবিদের কবিতার মূল প্রতিপাদ্য। এ ধরনের বিষয়ে যে কবি যত বেশি কল্পনার ফানুস উড়াতে পারতো মক্কার বার্ষিক কবিতা উৎসবে তার কবিতা তত বেশি দামী হিসেবে বিবেচিত হতো এবং কাবাঘরের দেয়ালে সে কবিতা সেঁটে দেয়া হতো। স্বাভাবিকভাবেই, সেই সব মানুষ এ ধরনের কবিতার পেছনে ছুটতো যারা আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে অলীক কল্পনার জগতে বাস করতো ও চরম বস্তুবাদীতায় অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল।

 

কবিতার ভাষা সাধারণত যুক্তি-বুদ্ধি নির্ভর নয়। বরং কবির কল্পনার মানসপটে আঁকা চিত্রই কবিতার ছত্রে ছত্রে ফুটে ওঠে। কবিরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপরের প্রশংসা বা নিন্দা করার ক্ষেত্রে চরম পন্থা অবলম্বন করে এবং ভাষার নানামুখী প্রয়োগ ঘটিয়ে অবাস্তব সব ঘটনাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলার চেষ্টা করে।

 

অবশ্য কবিদের মধ্যেও যে ভালো মানুষ নেই তা নয়। এসব কবি বাস্তবতানির্ভর কবিতা লেখেন এবং চিন্তা ও গবেষণালব্ধ ফলাফলই কবিতায় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেন। পবিত্র কুরআনে এ ধরনের কবিদের আলাদা করে বলা হয়েছে: আল্লাহর নেক বান্দা ও মুমিন কবিদের কবিতা মানুষের মনে আল্লাহর স্মরণকে জাগিয়ে তোলে এবং নির্যাতিত জনগোষ্ঠীকে জুলুম ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে উৎসাহিত করে। এ ধরনের কবিতা পড়ে অত্যাচারী ও জালেম ব্যক্তিরা বুঝতে পারে, তাদের শোষণের দিন শেষ হয়ে এসেছে এবং শিগগিরই মুমিনরা তাদের উপর বিজয়ী হবে।#

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন