এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla

হিজরি জিলক্বাদ মাসের শেষ দিন নবীজীর আহলে বাইতের ইমাম হযরত জাওয়াদ (আ) এর শাহাদাতবার্ষিকী। ২২০ হিজরির এই দিনে ইমাম জাওয়াদ (আ) খোদার দিদারে চলে যান আর সমগ্র মুসলিম বিশ্ব ইমামকে হারানোর ব্যথায় শোকাভিভূত হয়ে পড়ে। নবীজীকে রেসালাতের যে মহান দায়িত্ব দিয়ে আল্লাহ পৃথিবীতে পাঠিয়েছিলেন, নবীজীর অবর্তমানে সেই মহান দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতায় তাঁর আহলে বাইত ব্যাপক চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালান। নবীজীর চিন্তার সেই গভীর জ্ঞানের আলো দিয়ে তাঁরা মুসলিম উম্মাহর সামাজিক-সাংস্কৃতিক চিন্তা-চেতনায়ও ব্যাপক প্রভাব ফেলেন। আমরা যদি একবার নবীজীর আহলে বাইতের জীবনেতিহাস পর্যালোচনা করি, তাহলে দেখতে পাবো ইসলামের মৌলিক ভিত্তিকে সংরক্ষণ করার ক্ষেত্রে তাঁরা মূল্যবান অবদান রেখে গেছেন।

 

তাঁরা সবসময় কায়েমি স্বার্থবাদীদের জুলুম-নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন যাতে ইসলামের মহান স্বরূপ সর্বদা অটুট থাকে। ইমাম জাওয়াদ (আ) নবীজীর আহলে বাইতের একজন ইমাম যিনি তাঁর ১৭ বছরের ইমামতিকালে সবসময় ইসলামের প্রচার-প্রসারে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। মহান এই ইমামের বেদনাঘন শাহাদাতবার্ষিকীতে তাই আপনাদের জানাচ্ছি আন্তরিক শোক ও সমবেদনা। তাঁর জীবন থেকে খানিকটা আলোচনা করে আমরা সমৃদ্ধ করবো আমাদের জীবন।

 

ইমাম জাওয়াদ (আ) তাঁর এক বক্তৃতায় বলেছেন,'মানুষ যদি তিনটি বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে পারে তাহলে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করতে পারে। একটি হলো-আল্লাহর কাছে বেশি বেশি ক্ষমা প্রার্থনা করা। দুই,মানুষের সাথে নম্র আচরণ করা এবং তিন,বেশি বেশি দান-সদকা করা।' ইমাম জাওয়াদ (আ) মানুষের সেবা করাকে আল্লাহর রহমত অবতীর্ণ হবার কারণ বলে মনে করেন। এ ব্যাপারে কেউ যদি কৃপণতা করে তাহলে তাহলে আল্লাহর নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হবার সম্ভাবনা থাকে। এ ব্যাপারে তিনি বলেন: আল্লাহর নিয়ামত যখন কারো ওপর নাযিল হয়, তার কাছে মানুষের প্রয়োজনীয়তাও বেড়ে যায়। মানুষের এই প্রয়োজনীয়তা মেটানোর চেষ্টা যে না করে,সে নিজেকে আল্লাহর নিয়ামত হারানোর আশঙ্কার মুখে ঠেলে দেয়।

 

ইমাম জাওয়াদ (আ) ইমাম রেযা (আ) এর সন্তান ছিলেন। ১৯৫ হিজরিতে তিনি মদিনা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রায় ২৫ বছর জীবনযাপন করেন। এই স্বল্পকালীন জীবনে তিনি মানুষের চিন্তা-চেতনার বিকাশ ও উন্নয়নে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখেন। ইমাম জাওয়াদ (আ) মাত্র আট বছর বয়সে ইমামতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এতো অল্প বয়সে তাঁর ইমামতিত্বের বিষয়টি ছিল যথেষ্ট বিস্ময়কর ও সন্দেহজনক। এই সন্দেহের কারণ হলো বহু মানুষ বিশ্বের বিভিন্ন বিষয়কে কেবল তার বাহ্যিক এবং বস্তুগত মানদণ্ডেই বিচার-বিবেচনা করে থাকে। অথচ আল্লাহর তো এই শক্তি আছে যে তিনি মানুষকে তার বয়সের স্বল্পতা সত্ত্বেও পরিপূর্ণ বিবেক-বুদ্ধির পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেন। কোরানের আয়াতের ভিত্তিতে পূর্ববর্তী উম্মতের মধ্যেও এরকম উদাহরণ বহু আছে। যেমন শিশুকালে হযরত ইয়াহিয়া (আ) এর নবুয়্যত প্রাপ্তি, মায়ের কোলে নবজাতক ঈসা (আ) এর কথা বলা ইত্যাদি আল্লাহর সর্বশক্তিমান ক্ষমতারই নিদর্শন।

 

ইমাম জাওয়াদ (আ) শৈশব-কৈশোরেই ছিলেন জ্ঞানে-গুণে, ধৈর্য ও সহনশীলতায়, ইবাদত-বন্দেগিতে, সচেতনতায়, কথাবার্তায় বিস্ময়কর উন্নত পর্যায়ের। ইতিহাসে এসেছে একবার হজ্জ্বের সময় বাগদাদ এবং অন্যান্য শহরের বিখ্যাত ফকীহদের মধ্য থেকে আশি জন মদিনায় ইমাম জাওয়াদ (আ) এর কাছে গিয়েছিলেন। তাঁরা ইমামকে বহু বিষয়ে জিজ্ঞেস করে অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত ও সন্তোষজনক জবাব পেলেন। এরকম জবাব পাবার ফলে জাওয়াদ (আ) এর ইমামতিত্বের ব্যাপারে তাদের মনে যেসব সন্দেহ ছিল-তা দূর হয়ে গেল। ইমাম জাওয়াদ (আ) বড়ো বড়ো পণ্ডিতদের সাথে এমন এমন তর্ক-বাহাসে অংশ নিতেন যা কিনা ছিল রীতিমতো বিস্ময়কর। এসব বিতর্কে তাঁর জ্ঞানের গভীরতার বিষয়টি প্রমাণিত হয়ে যেত। কেবল তাই নয় তাঁর দেওয়া যুক্তির ফলে জ্ঞানের বহু জটিল বিষয়ও সহজ হয়ে যেত।

 

এ কারণে জ্ঞানীজনেরা এমনকি তাঁর বিরোধীরাও তাঁর জ্ঞানের গভীরতার বিষয়টি এবং তাঁর উন্নত আধ্যাত্মিক সত্ত্বার বিষয়টি অস্বীকার করতেন না। একদিন আব্বাসীয় খলিফা মামুন ইমাম জাওয়াদ (আ) এর জ্ঞানের গভীরতা পরীক্ষা করার জন্যে একটি মজলিসের আয়োজন করে। সেখানে তৎকালীন জ্ঞানী-গুণীজনদেরকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ঐ মজলিসে তৎকালীন নামকরা পণ্ডিত ইয়াহিয়া ইবনে আকসাম ইমামকে একটি প্রশ্ন করেন। প্রশ্নটি ছিল এই: যে ব্যক্তি হজ্জ্ব পালনের জন্যে এহরাম বেঁধেছে,সে যদি কোনো প্রাণী শিকার করে,তাহলে এর কী বিধান হবে? ইমাম জাওয়াদ (আ) এই প্রশ্নটিকে বিভিন্ন ভাগে ভাগ করে মূল প্রশ্নের সাথে সংশ্লিষ্ট ২২টি দিক তুলে ধরে উত্তরের উপসংহার টানেন। উত্তর দেওয়ার এরকম স্টাইল ছিল তাঁর জ্ঞানের বিস্ময়কর গভীরতার নিদর্শন। উত্তর পেয়ে উপস্থিত জ্ঞানীজনেরা ইমামের জ্ঞানের বিষয়টি কেবল স্বীকারই করলেন না বরং তাঁর জ্ঞানের প্রশংসাও করলেন।

 

২০৩ হিজরি থেকে ২২০ হিজরি পর্যন্ত মোট সতেরো বছরের ইমামতিকালে শাসক ছিলেন দুইজন আব্বাসীয় খলিফা। একজন হলেন মামুন আরেকজন মু'তাসিম। এরা আল্লাহর বিধি-নিষেধগুলোকে তেমন একটা মানতেন না এবং অনেক সময় ইসলামকে নিজেদের স্বার্থানুকূলে ব্যবহার করতেন। ইমাম জাওয়াদ (আ) এসব দেখে চুপ করে থাকতে পারলেন না।তিনি সেসবের বিরোধিতা করলেন। সমাজে তাঁর এই বিরোধিতার ব্যাপক প্রভাব পড়ে। এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় আব্বাসীয় খলিফারা ইমামকে হয়রানীর মাত্রা বাড়িয়ে দেয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে অবরোধ কঠোরতরো করে। ইমাম মামুনের পীড়াপীড়িতে মদিনা ছেড়ে আব্বাসীয় খিলাফতের তৎকালীন মূল কেন্দ্র বাগদাদে যেতে বাধ্য হন। তা সত্ত্বেও ইমাম জনগণের সাথে বিভিন্ন কৌশলে যোগাযোগ রক্ষা করে তাঁর সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তো বটেই এমনকি স্বয়ং আব্বাসীয়দের হুকুমতের ভেতরেই আহলে বাইতের প্রতি বহু ভক্ত অনুরক্ত ছিল। ইমাম তাদেরকে অত্যাচারের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যে অনেক অবদান রেখেছিলেন।

 

জাওয়াদ শব্দের অর্থ হলো দয়ালু বা উদার। এই উপাধিটি থেকেই প্রমাণিত হয় যে ইমাম জাওয়াদ ছিলেন অসম্ভব উদার বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। তাঁর আসল নাম ছিল মুহাম্মাদ তাকি। তাঁর পিতা ইমাম রেযা (আ) জনগণের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করার স্বার্থে যেসব উপদেশ দিয়েছিলেন,সেসবের মধ্যে একটি ছিল নিজের কাছে কিছু টাকা-পয়সা রাখা যাতে মানুষের প্রয়োজনে দান করতে পারেন। বাবার এই উপদেশ পালন করতে গিয়েই তিনি জাওয়াদ উপাধিতে ভূষিত হন। একবার একটি কাফেলা অনেক দূর থেকে ইমামের জন্যে বহু উপহার নিয়ে আসছিলো। পথিমধ্যে সেগুলো চুরি হয়ে গেল। কাফেলার পক্ষ থেকে ঘটনাটা ইমামকে লিখে জানানো হলো। ইমাম উত্তরে লিখলেন: আমাদের জান এবং মাল আল্লাহর দেওয়া আমানত। এসব থেকে যদি উপকৃত হওয়া যায় তো ভালো, আর যদি এগুলো হারিয়ে যায় তাহলে আমাদের ধৈর্য ধারণ করা উচিত।কেননা তাতে সওয়াব রয়েছে। সঙ্কটে যে ভেঙ্গে পড়ে তার প্রতিফল বিফলে যায়।

 

ইমামের জীবনের শেষ দু'বছরে আব্বাসীয় শাসক ছিলো মুতাসিম। মুতাসিম জনগণের মাঝে ইমামের জনপ্রিয়তায় উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়ে। বিশেষ করে ইমামের বক্তব্যে জনগণের মাঝে এক ধরনের জাগরণ সৃষ্টি হয়। যার ফলে মুতাসিমের ভেতর ঈর্ষার আগুণ জ্বলতে থাকে। তাই ইমামের বিরুদ্ধে শুরু করে বিচিত্র ষড়যন্ত্র। এই ষড়যন্ত্রের ফলেই মাত্র ২৫ বছর বয়সে ইমাম শাহাদাতবরণ করেন। তাঁর শাহাদাতবার্ষিকীতে তাই আবারো আপনাদের প্রতি রইলো আন্তরিক সমবেদনা। ইমামের একটি বাণী উচ্চারণ করে শেষ করবো আজকের আলোচনা।

 

"বাজে লোকের বন্ধুত্ব থেকে দূরে থাকো, কেননা তার বন্ধুত্ব হলো তলোয়ারের মতো, যার বাহ্যিক দিকটা বেশ চকচকে আর কাজটি খুবই জঘন্য।" 

“আমার বয়স যখন চার বছর তখন বাবা-মা’র মধ্যে বিবাহ-বিচ্ছেদ ঘটেছিল। বাবা অন্য শহরে চলে যান। তিনি আমাকে, আমার যমজ ভাই ও আমার ছোট বোনকে মায়ের কাছে রেখে যান। আমার মা কঠোর পরিশ্রম করে আমাদের জীবিকা নির্বাহের চেষ্টা করতেন। কিন্তু উচ্চতর শিক্ষার সনদ ও পেশাগত দক্ষতা না থাকায় খুব কম বেতনে সন্তুষ্ট থাকতে হত তাকে। এ অবস্থা বেশি দিন সহ্য করা সম্ভব হয়নি। ফলে জীবনের চাকা সচল রাখতে আমরা দাদার বাড়িতে গেলাম।” বলছিলেন মার্কিন নও-মুসলিম আবু হাদি।

 

আবু হাদি যখন খ্রিস্টান ছিলেন তখন পারিবারিক ঝগড়া-বিবাদ থেকে দূরে থাকার জন্য নিজের জগত ও সঙ্গীতের মধ্যে ডুবে থাকতেন। ক্লাসিক্যাল ও জাজ সঙ্গীত শুনতে শুনতে সঙ্গীতজ্ঞ হতে আগ্রহী হন তিনি। হাদি ১২ বছর বয়সে প্রথমবারের মত গিটার কেনেন। গিটার বাজানোর অনুশীলন করতে করতে তার আঙ্গুলে ব্যথা অনুভব করতেন।

 

গিটারের প্রতি হাদির উন্মাদনাময় আকর্ষণ দেখে তা থেকে মুক্ত করতে এগিয়ে আসেন তার দাদা। রোববার ভোরে তাকে ঘুম থেকে জাগিয়ে নিয়ে যেতেন গির্জায়। গির্জায় যেতে তার ভালোই লাগতো। সেখানে তিনি অনেক বন্ধু পেয়ে যান এবং দীর্ঘ আলোচনা হত খ্রিস্ট ধর্ম ও দর্শন নিয়ে। গির্জার পাদ্রি ছিলেন স্রস্টা তত্ত্ব বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রিধারী। এ ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো কিছু সনদ তার ছিল। আলোচনার মধ্য দিয়ে হাদি এটা বুঝতে পারেন যে খ্রিস্ট ধর্মের মাধ্যমে নতুন কিছু জানা সম্ভব নয় এবং তার মনের নানা প্রশ্নের উত্তরও দিতে পারছে না এই ধর্ম। হাদি গির্জায় যাওয়া অব্যাহত রাখলেও সঙ্গীতের প্রতি তার আকর্ষণ তাতে কমেনি। অবশেষে তিনি বন্ধুদের নিয়ে গঠন করেন একটি সঙ্গীত-গ্রুপ। এরপরের ঘটনা সম্পর্কে মার্কিন নওমুসলিম আবু হাদি বলেছেন:

 

 "সঙ্গীত গ্রুপের সদস্য হওয়ার পর গির্জা ও ধর্মের কথা মন থেকে মুছে ফেললাম। স্থানীয় পার্টিগুলোতে গিটার বাজাতাম। এইসব পার্টিতে মদ ও মাদকদ্রব্যের মত কিছু নিষিদ্ধ বিষয়েরও চর্চা হত। আমি পরে আমার গ্রুপের সদস্য বা বন্ধুদের আচরণ বিশ্লেষণ করতাম। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম যে কোথাও যেন ভুল হচ্ছে। এই পরিবেশকে হজম করতে পারছিলাম না ও নিজেকে গ্রুপের মধ্যে একা বা বিচ্ছিন্ন বলে অনুভব করছিলাম। অনুভব করছিলাম যে রসাতলে যাচ্ছি বা ধ্বংস হয়ে যাচ্ছি।"

 

মিউজিক গ্রুপের সদস্য হওয়া ছিল আবু হাদির একটি বড় স্বপ্ন। কিন্তু এই স্বপ্ন পূরণ হওয়ার পরও আত্মিক প্রশান্তির অভাব অনুভব করতেন তিনি। বস্তুগত সমৃদ্ধি আর কামনা-বাসনার মধ্যে ডুবে থেকেও তার মনের শূন্যতা ও অন্ধকার দিকটি তাকে পীড়া দিচ্ছিল। বস্তুগত সব সুখ তার কাছে মরীচিকার মতই ঠেকছিল। এইসব অতৃপ্তিকে ভুলে থাকার জন্য তিনি বেশি বেশি মদ পান করার, আমোদ-ফুর্তি করার ও গান-বাজনায় ডুবে থাকার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হল না। সেই সময়ের মানসিক অবস্থা তুলে ধরতে গিয়ে মার্কিন নও-মুসলিম হাদি বলেছেন:

 

 "সব কিছুই আমার কাছে অর্থহীন হয়ে পড়েছিল। বন্ধুদের সঙ্গে খোশালাপ, সঙ্গীত চর্চা ও নতুন নতুন  সঙ্গীত বা সুর রচনায় আর আগের মত আনন্দ পেতাম না। বেশিরভাগ সময় চিন্তাভাবনায় ডুবে থাকলাম। সেই সময়কার শেষের দিকে একদিন হাঁটু গেড়ে বসে প্রার্থনা বা দোয়ায় মশগুল হলাম।  প্রায় দুই বছর ধরে এভাবে প্রার্থনা করেছি। স্রস্টাকে বললাম: আমি জানি না, কিসে আমার মঙ্গল? তাঁর কাছে চাইলাম তিনি যেন আমাকে সঠিক পথ দেখান ও এমন পথ দেখান যা আমার বিষণ্ণতাকে দূর করবে এবং আমাকে এই ইহ-জগতে ও মৃত্যুর পর সফল করবে।"

 

এভাবে আবু হাদি সঠিক পথ পাওয়ার জন্য প্রচেষ্টা শুরু করেন। এরিমধ্যে তার মায়ের মুসলমান হওয়ার খবর তার জন্য নতুন পথ খুলে দেয়। ফলে হাদি শুরু করেন ইসলাম সম্পর্কে গবেষণা। তিনি এ প্রসঙ্গে বলেছেন:

"আমার বয়স যখন ১৫ বছর তখন আমার মা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলাম সম্পর্কিত কয়েকটি ক্লাসে অংশ নিয়েছিলেন। এর কিছুকাল পর তিনি মুসলমান হয়ে যান। তিনি দুই-তিন বার আমার সঙ্গেও ইসলাম সম্পর্কে কথা বলেছিলেন। কিন্তু মা মুসলমান হওয়ার পর তার যে দিকগুলো আমার দৃষ্টিকে বেশি আকৃষ্ট করে তা হল, তার অমায়িক আচার-আচরণ এবং অত্যন্ত কঠিন পরিস্থিতিতেও নিজের বিশ্বাস বা ঈমানের ওপর অবিচল থাকা। তার ওই পরিবর্তনই আমার মনের মধ্যে ইসলামের বীজ বপন করেছিল যা আমি তখনও জানতাম না। মুসলমান হওয়ার তিন বছর পর মা হিজাব পরতে থাকেন। এ বিষয়টিও ছিল আমার জন্য খুবই লক্ষণীয়। কারণ, আমাদের অঞ্চলে তখনও হিজাব পরিহিতা নারীর সংখ্যা ছিল খুবই কম। মা ছিলেন একটি বড় ও বিখ্যাত হাসপাতালের নার্স। তাকে এই হিজাবের ব্যাপারে সহকর্মীদের প্রতিক্রিয়া সহ্য করতে হয়েছে। এ অবস্থায় আমি ইসলাম নিয়ে গবেষণা শুরু করি।"

 

মুসলমান হওয়ার আগ পর্যন্ত আবু হাদি নানা ধর্ম নিয়ে পড়াশুনা ও গবেষণা করতে থাকেন। আর ইসলাম ধর্ম নিয়ে পড়াশুনা করতে গিয়ে ইসলামের সৌন্দর্যে অভিভূত হন তিনি। ফলে তিনি এ বিষয়ে মায়ের সাহায্য চাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। হাদি এ সম্পর্কে বলেছেন: ইসলামকে বোঝার ব্যাপারে মায়ের সাহায্য চাওয়ায় তিনি তার পরিচিত এক মুসলমানের কাছে আমাকে নিয়ে যান। ওই মুসলিম ভদ্রলোকের নাম হল মুহাম্মাদ। তিনি সিরিয়ার অধিবাসী হওয়া সত্ত্বেও ইংরেজির ওপর তার পুরোপুরি দখল ছিল। প্রায় শতভাগ বিশুদ্ধ উচ্চারণে ইংরেজি বলতে পারতেন জনাব মুহাম্মাদ। তিনি আমায় প্রশ্ন করেন: আপনি কি আল্লাহ বা স্রস্টায় বিশ্বাস করেন? আমি বললাম: জি। তিনি বললেন: আপনি কোন ধর্মে বিশ্বাসী? বললাম: আমি খ্রিস্টান পরিবারে জন্ম নিয়েছি তবে এখন আর গির্জায় যাই না। প্রশ্ন করলেন: কেন যান না? আমি ভেবেছিলাম গির্জায় যাই না শুনে মুসলিম ব্যক্তি হিসেবে তিনি খুশি হবেন। কিন্তু তিনি সেরকম প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে এর কারণ জানতে চাওয়ায় আমি ব্যাখ্যা দিয়ে জানাই যে খ্রিস্ট ধর্মের কোনো কোনো বিশ্বাস যেমন, তিন স্রস্টার অস্তিত্ব বা ত্রিত্ববাদ এবং জন্মগতভাবেই মানুষের পাপী হওয়ার বিষয় সম্পর্কে আমার আপত্তি বা প্রশ্নের কোনো সদুত্তর কারো কাছ থেকে পাইনি। এ ছাড়াও খ্রিস্ট ধর্মের অনুসরণ আমার প্রাত্যহিক জীবনের ওপর কোনো প্রভাব রাখেনি। তাই একটি সঙ্গীত গ্রুপের সদস্য হয়েছি এবং গির্জায় আর যাচ্ছি না। ত্রিত্ববাদসহ বাইবেলের অনেক কিছুর ওপরই আমার বিশ্বাস না থাকার কথাও তাকে জানাই। তিনি বললেন:

 

'আপনার বাপদাদার ধর্মই আল্লাহকে পাওয়ার একমাত্র পথ নয়। তাকে পাওয়ার অন্য পথও রয়েছে। আমি ইসলাম সম্পর্কে আপনার সঙ্গে কথা বলব। আপনার দৃষ্টিতে এ ধর্ম যদি যৌক্তিক বলে মনে হয় এবং এতে কোনো দুর্বল দিক না দেখে থাকেন তাহলে এ ধর্ম সম্পর্কে আরো গভীরভাবে ভেবে দেখবেন।' 

 

জনাব মুহাম্মাদের সঙ্গে আলোচনার পর আবু হাদি ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে আরো আগ্রহী হয়ে ওঠেন। আবু হাদি মুসলমান হওয়ার আগ পর্যন্ত একত্ববাদ বা তাওহিদ, নবুওয়্যাত, নামাজ ও অন্য অনেক ইসলামী বিষয় নিয়ে মুহাম্মাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। তাদের আলোচনা পরদিন ভোর চারটা পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। অনেক চেষ্টা করেও হাদি ইসলামের কোনো দুর্বল দিক আবিষ্কার করতে ব্যর্থ হন। হাদি এ প্রসঙ্গে বলেছেন: "মুহাম্মাদ খুবই সহজ ও স্পষ্ট কথা বলছিলেন। তার সব কথাই ছিল যৌক্তিক। তার বক্তব্যের মধ্যে খ্রিস্ট ধর্ম সম্পর্কিত সব সমস্যা বা প্রশ্নগুলোর সমাধান পেলাম। ফলে আমার আর কোনো প্রশ্ন ছিল না। সেই রাতের আলোচনার পর আরো গভীরভাবে গবেষণা করে শেষ পর্যন্ত ইসলামকে সত্য ধর্ম হিসেবে চিনতে সক্ষম হই এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণের জন্য শাহাদাতাইন পাঠ করি। এরপর স্টুডিওতে ফিরে যাই।

 

সেখানে আমার সহযোগীদের বললাম,আমি আর ফিরে আসব না, তোমরা  অন্য একজন গিটারবাদক খুঁজে নাও। এরপর থেকে আর কখনও স্টুডিওমুখি হইনি। সেই ঘটনার পর থেকে আজ পর্যন্ত আমার ঈমান আরো শক্তিশালী হয়েছে। আলহামদুল্লিাহ (মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি)। #                              

 

১১ ই জিলকাদ ইসলামের ইতিহাসের এক মহা-খুশির দিন। কারণ, ১৪৮ হিজরির এই দিনে  মদিনায় ইমাম মুসা ইবনে জাফর সাদিক (আ.)'র ঘরে জন্ম নিয়েছিলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের অন্যতম সদস্য হযরত ইমাম রেজা (আ.)।

 

 তাঁর পবিত্র ও কল্যাণময়ী মায়ের নাম ছিল উম্মুল বানিন নাজমা। ১৮৩ হিজরিতে খলিফা হারুনের কারাগারে পিতা ইমাম কাজিম (আ.)'র শাহাদতের পর পঁয়ত্রিশ বছর বয়সে মুসলিম উম্মাহর ইমামতের ঐশী দায়িত্ব গ্রহণ করেন ইমাম রেজা (আ.)। এই মহান

 

ইমামের জন্মদিন উপলক্ষে সবাইকে ইমাম রেজা (আ.)'র জন্মদিনের তাবাররুক হিসেবে তাঁর জীবনের প্রধান কিছু ঘটনা ও প্রকৃত ইসলামের প্রচার-প্রসারে তাঁর অমর অবদান তুলে ধরার চেষ্টা করব আজকের এই বিশেষ আলোচনায়।

 

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইত তথা মাসুম বংশধররা ছিলেন খোদায়ী নানা গুণ ও সৌন্দর্যের প্রকাশ। তাঁরা ছিলেন মানব জাতির জন্য পূর্ণাঙ্গ বা পরিপূর্ণ আদর্শ। তাঁদের মহত গুণ ও যোগ্যতাগুলো সত্য-সন্ধানী এবং খোদা-প্রেমিকদের জন্য অফুরন্ত শিক্ষা ও প্রেরণার উতস হয়ে আছে।

 

শেখ সাদুক ইমাম রেজা (আ.) সম্পর্কে এক বইয়ে লিখেছেন,  অসাধারণ নানা গুণ ও যোগ্যতার জন্য আলী ইবনে মুসা রেজা (আ.) রেজা বা সন্তুষ্ট, সাদিক বা সত্যবাদী, ফাজেল বা গুণধর, মু'মিনদের চোখের প্রশান্তি বা আলো ও কাফির বা অবিশ্বাসীদের ক্ষোভের উতস প্রভৃতি উপাধিতে ভূষিত হয়েছিলেন।

 

তবে আলী ইবনে মুসা রেজা (আ.)'র একটি বড় উপাধি হল 'আলেমে আ'লে মুহাম্মাদ' বা মুহাম্মাদ (সা.)'র আহলে বাইতের আলেম।

 

ইমাম রেজা (আ.)'র পিতা ইমাম মুসা কাজিম (আ.) হতে বর্ণিত হয়েছে যে, তিনি বলেছেন, আমার বাবা ইমাম জাফর সাদিক (আ.) আমাকে বার বার বলতেন যে, আলে মুহাম্মাদের আলেম বা জ্ঞানী হবে তোমার বংশধর। আহা! আমি যদি তাঁকে দেখতে পেতাম!তাঁর নামও হবে আমিরুল মু'মিনিন (আ.)'র নাম তথা আলী।

 

প্রায় হাজার বছর আগে লিখিত 'শাওয়াহেদুন্নবুওয়াত' নামক বইয়ে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, যারা ইরানের খোরাসানে অবস্থিত (যার বর্তমান নাম মাশহাদ) ইমাম রেজা (আ.)'র মাজার জিয়ারত করবে তারা বেহেশতবাসী হবে। বিশিষ্ট কবি ও আধ্যাত্মিক সাধক মাওলানা আবদুর রহমান জামির লিখিত এই বইটি বহু বছর আগে বাংলা ভাষায়ও অনূদিত হয়েছে (মাওলানা মহিউদ্দিনের মাধ্যমে) (পৃ.১৪৩-১৪৪)। [এ বইয়ের ২৭২ পৃষ্ঠায় পবিত্র কোম শহরে অবস্থিত হযরত ফাতিমা মাসুমা (সা.)’র পবিত্র মাজার জিয়ারত সম্পর্কেও একই কথা বলা হয়েছে। এই ফাতিমা মাসুমা ছিলেন ইমাম রেজা-আ.’র ছোট বোন।  মাসুমা বা নিষ্পাপ ছিল তাঁর উপাধি।]

 

বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ইরানের খোরাসানে তাঁর শরীরের একটি অংশকে তথা তাঁর পবিত্র বংশধারা বা আহলে বাইতের একজন সদস্যকে দাফন করা হবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন।

 

নবীবংশের প্রত্যেক ইমামের জীবনই যেন মহাসাগরের মতই মহত গুণ, জ্ঞান, আর কল্যাণের নানা ঐশ্বর্যে কুল-কিনারাহীন এবং  শাহাদাতের স্বর্গীয় মহিমায় সমুজ্জ্বল। ইরানের সর্বোচ্চ নেতার ভাষ্য অনুযায়ী ইমামদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো রাজনৈতিক সংগ্রাম। ইসলামের মধ্যে নানা বিকৃতি চাপিয়ে দেয়ার বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই সোচ্চার ছিলেন বিশ্বনবী (সা.)’র পবিত্র আহলে বাইতের ইমামগণ।

 

হিজরি প্রথম শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে ইসলামি খেলাফত যখন সুস্পষ্টভাবেই রাজতন্ত্রের রূপ নেয় এবং ইসলামী নেতৃত্ব জোর- জুলুমপূর্ণ বাদশাহিতে রূপান্তরিত হয়, তখন থেকেই আহলে বাইতের সম্মানিত ইমামগণ সময়োপযোগী পদ্ধতিতে বিদ্যমান সকল অব্যবস্থা বা অসঙ্গতির বিরুদ্ধে তাঁদের রাজনৈতিক সংগ্রাম চালাতে থাকেন। তাঁদের এইসব রাজনীতির বৃহত্তর লক্ষ্য ছিল প্রকৃত ইসলামি সরকার ব্যবস্থা প্রণয়ন এবং ইমামতের ভিত্তিতে হুকুমাত প্রতিষ্ঠা করা।

 

কায়েমি স্বার্থবাদী মহলের সব ধরনের চরম অত্যাচার-নিপীড়নের মুখেও তাঁরা তাঁদের এই ইমামতের গুরুদায়িত্ব পালন করে গেছেন। তাঁদের শাহাদাতের পবিত্র রক্ত থেকে জন্ম দিয়েছে খাঁটি মুহাম্মাদী ইসলামের লক্ষ-কোটি অনুসারী। শাহাদতের  বেহেশতি গুল বাগিচার পথ ধরে ইমামতের সেই ধারা আজো অব্যাহত রয়েছে এবং তাঁদের সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য-উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে তাঁদের যোগ্য উত্তরসূরিগণ পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে আজো তৎপর রয়েছে। ইমামতের নুরানি জ্যোতিতে অলোকময় পৃথিবী তাঁদের নির্ভুল দিক-নির্দেশনায় খুঁজে পাচ্ছে প্রকৃত ইসলামের সঠিক দিশা। ইমামের পবিত্র জন্মবার্ষিকী তাই গোটা মুসলিম উম্মাহর মুক্তির স্মারক।

 

ইমাম রেজা (আ.)'র  ইমামতির সময়কাল ছিল বিশ বছর। এই বিশ বছরে আব্বাসীয় তিনজন শাসক যথাক্রমে বাদশাহ হারুন এবং তার দুই পুত্র আমিন ও মামুনের শাসনকাল অতিক্রান্ত হয়েছিল। ইমাম রেজা (আ.) তাঁর পিতা ইমাম মূসা কাজিম ( আ. )’র নীতি-আদর্শকে অব্যাহত গতি দান করেন। ফলে ইমাম মূসা কাজিম (আ.)’র শাহাদাতের পেছনে যেই কারণগুলো দেখা দিয়েছিল, স্বাভাবিকভাবেই ইমাম রেজা (আ.)ও সেই কারণগুলোর মুখোমুখি হন। অর্থাৎ কায়েমি স্বার্থবাদি মহলের নেপথ্য রোষের মুখে পড়েন তিনি। আব্বাসীয় রাজবংশে বাদশা হারূন এবং মামুনই ছিল সবচে পরাক্রমশালী এবং দোর্দণ্ড প্রতাপশালী। তারা প্রকাশ্যে ইমামদের প্রতি শ্রদ্ধা-ভক্তির কথা বলে বেড়াতেন কিন্তু ভেতরে ভেতরে ইমামদের রক্তের তৃষ্ণায় তৃষিত ছিলেন।

 

ইমামদের প্রতি তাঁদের এ ধরনের আচরণের উদ্দেশ্য ছিল দুটো। এক, আহলে বাইত প্রেমিক বা নবীবংশ প্রেমিকদের আন্দোলনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া, এবং দুই শিয়া মুসলমানদের মন জয় করা। ইমামদের সাথে সম্পর্ক থাকার প্রমাণ থাকলে  জনগণের কাছে তাদের শাসনও বৈধ বলে গৃহীত হবে-এ ধরনের চিন্তাও ছিল তাদের মনে। কারণ, মুসলমানরা যদি দেখে যে,  বিশ্বনবী (সা.)’র নিষ্পাপ বংশধরগণ তথা হযরত আলীর (আ) পরিবারবর্গের প্রতি বাদশাহর সম্পর্ক বা যোগাযোগ রয়েছে, তাহলে তারা আব্বাসীয়দের শাসনকে বৈধ মনে করে খুশি হবে , ফলে তারা আর বিরোধিতা করবে না। এরফলে তাদের শাসনকার্য পরিচালনা নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ হবে।

 

ইমাম রেজা (আ.) শাসকদের এই দুরভিসন্ধিমূলক রাজনীতি বুঝতে পেরে তাদের বিরুদ্ধে অভূতপূর্ব একটি কৌশল অবলম্বন করেন। তাঁর কৌশলটি ছিল এমন, যার ফলে একদিকে বাদশা মামুনের উদ্দেশ্যও ব্যর্থ হয়, অপরদিকে মুসলিম বিশ্বের জনগণও প্রকৃত সত্য উপলব্ধি করতে পারে। আর সেই সত্য হলো এই যে, আল্লাহর বিধান অনুযায়ী ইসলামী খেলাফতের প্রকৃত উত্তরাধিকার কেবলমাত্র নবী পরিবারের নিষ্পাপ বা পবিত্র ইমামগণের ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং তাঁরা ছাড়া কেউ ঐ পদের যোগ্য নয়। জনগণের মাঝে এই সত্য প্রচারিত হলে স্বাভাবিকভাবেই তারা বাদশার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে উঠবে-এই আশঙ্কায় ধূর্ত মামুন ইমাম রেজাকে (আ) সবসময়ই জনগণের কাছ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করে। শুধু ইমাম রেজা (আ.) নন প্রায় সকল ইমামকেই এভাবে গণ-বিচ্ছিন্ন করে রাখার জন্যে উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসকরা তাঁদেরকে গৃহবন্দী করাসহ কঠোর প্রহরার মধ্যে রাখার ষড়যন্ত্র করে। কিন্তু তারপরও নিষ্পাপ ইমামদের সুকৌশলের কারণে তাঁদের বার্তা জনগণের কাছে ঠিকই পৌঁছে যায়।

 

আর জনগণের কাছে মহান ইমামগণের বার্তা পৌঁছে যাবার ফলে জনগণ প্রকৃত সত্য বুঝতে পারে, এবং নবীবংশের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে থাকে। বিশেষ করে বাদশাহ মামুনের অপততপরতার বিরুদ্ধে ইমাম রেজা (আ.) যখন দাঁড়িয়ে গেলেন, তখন ইরাকের অধিকাংশ জনগণ মামুনের বিরুদ্ধে চলে গিয়েছিল। হযরত আলী(আ.)’র  পবিত্র খান্দানের কেউ বাদশাহর বিরুদ্ধে গেলে বাদশাহি যে হারাতে হবে-এই আশঙ্কা মামুনের মধ্যে ছিল। যার ফলে মামুন একটা আপোষ-নীতির কৌশল গ্রহণ করে। বাদশাহ মামুন ইমামকে খোরাসানে আসার আমন্ত্রণ জানায়। ইমাম প্রথমত রাজি হন নি, কিন্তু পরবর্তীকালে তাঁকে আমন্ত্রণ গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়েছে । বাধ্য হয়ে শেষ পর্যন্ত তিনি বসরা অভিমুখে যাত্রা করেন। কিন্তু পথিমধ্যে তিনি তাঁর গতিপথ পরিবর্তন করে ইরানের দিকে পাড়ি দেন। উল্লেখ্য যে, নবীবংশের মধ্যে ইমাম রেজা(আ.)ই প্রথম ইরান সফর করেন। যাই হোক, যাত্রাপথে তিনি যেখানেই গেছেন জনগণ তাঁকে সাদরে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করে। ইমামও নবী করিম (সা.), তাঁর আহলে বাইত ও নিষ্পাপ ইমামদের চরিত্র-বৈশিষ্ট্য এবং ইসলামের সঠিক বিধি-বিধান সম্পর্কে জনগণকে অবহিত করেন। সেইসাথে তাঁর সফরের উদ্দেশ্য অর্থাৎ বাদশাহর আমন্ত্রণের কথাও তাদেরকে জানান।

 

চতুর বাদশাহ মামুন ইমামের আগমনে তার সকল সভাসদ এবং অন্যান্য লোকজনকে সমবেত করে বলেন, হে লোকেরা ! আমি আব্বাস এবং আলীর বংশধরদের মধ্যে অনুসন্ধান করে দেখেছি , আলী বিন মূসা বিন রেজার মতো উত্তম লোক দ্বিতীয় কেউ নেই। তাই আমি চাচ্ছি যে , খেলাফতের দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দেব এবং এই দায়িত্ব তাঁর ওপর ন্যস্ত করবো। ইমাম, মামুনের রাজনৈতিক এই দুরভিসন্ধি সম্পর্কে জানতেন। তাই তিনি জবাবে বললেন, মহান আল্লাহ যদি খিলাফত তোমার জন্যে নির্ধারিত করে থাকেন, তাহলে তা অন্যকে দান করা উচিত হবে না। আর যদি তুমি আল্লাহর পক্ষ থেকে খেলাফতের অধিকারী না হয়ে থাক, তাহলে আল্লাহর খেলাফতের দায়িত্ব কারো উপর ন্যস্ত করার কোনো অধিকার তোমার নেই। ইমাম শেষ পর্যন্ত মামুনের কথায় খেলাফতের দায়িত্ব নিতে অস্বীকার করায় মামুন ইমামকে তার ভবিষ্যৎ উত্তরাধিকারী হতে বাধ্য করে। ইমাম রেজা (আ.) শেষ পর্যন্ত নিরুপায় হয়ে কিছু শর্তসাপেক্ষে তা গ্রহণ করেন।

 

শর্তগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ দুটি ছিল এরকম-এক, তিনি প্রশাসনিক কোনো দায়িত্ব পালন করবেন না। দূরে থেকে তিনি খেলাফতের সম্পর্ক রক্ষা করবেন। তিনি কেন এ ধরনের শর্তারোপ করেছিলেন , তার কারণ দায়িত্ব গ্রহণকালে প্রদত্ত তাঁর মোনাজাত থেকেই সুস্পষ্ট হয়ে যায়। তিনি মুনাজাতে বলেছিলেন - হে খোদা ! তুমি ভালো করেই জানো , আমি বাধ্য হয়ে এই দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। সুতরাং আমাকে এজন্যে পাকড়াও করো না। যেমনিভাবে তুমি ইউসূফ ও দানিয়েল ( আ ) কে পাকড়াও করো নি। হে আল্লাহ ! তোমার পক্ষ থেকে কোনো দায়িত্ব ও কর্তব্য ছাড়া আর কোনো কর্তৃত্ব হতে পারে না। আমি যেন তোমার দ্বীনকে সমুন্নত রাখতে পারি, তোমার নবীর সুন্নতকে যথার্থভাবে বাস্তবায়ন করতে পারি।

 

 ইমাম রেজা র এই দায়িত্ব গ্রহণের খবর সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে আব্বাসীয়রা ভীষণ দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। তারা ভেবেছিল, খেলাফত বুঝি চিরদিনের জন্যে আব্বাসীয়দের হাত থেকে আলীর (আ) বংশধরদের হাতে চলে গেল। তাদের দুশ্চিন্তার জবাবে বাদশা মামুন তার আসল উদ্দেশ্যের কথা তাদেরকে খুলে বলে। তা থেকেই বোঝা যায়, যেমনটি আয়াতুল্লাহিল উজমা খামেনেয়ী বলেছেন, ইমামকে খোরাসানে আমন্ত্রণ জানানো এবং তাঁর পরবর্তী বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের পেছনে মামুনের মূল উদ্দেশ্য ছিল, শিয়াদের বৈপ্লবিক সংগ্রামকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করা। যাতে তাদের উত্তাল রাজনীতিতে ভাটা পড়ে যায়। দ্বিতীয় উদ্দেশ্যটি ছিল আব্বাসীয় খেলাফতকে বৈধ বলে প্রমাণ করা। তৃতীয়ত, ইমামকে উত্তরাধিকার বানানোর মাধ্যমে নিজেকে একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ও মহান উদার হিসেবে প্রমাণ করা।

 

 তো মামুনের এই অশুভ উদ্দেশ্যের কথা জানার পর আব্বাসীয়রা ইমামকে বিভিন্নভাবে হেয় ও মর্যাদাহীন করে তোলার চেষ্টা চালায়। কিন্তু জ্ঞান ও প্রজ্ঞায় সমৃদ্ধ ইমামকে তারা কিছুতেই অপদস্থ করতে পারে নি। যেমন, বিভিন্ন ধর্মের জ্ঞানী ও পণ্ডিতদের মাধ্যমে জটিল প্রশ্নের অবতারণা করে ইমাম রেজা (আ.)-কে জব্দ করার চেষ্টা, কিংবা ক্ষরা-পীড়িত অঞ্চলে বৃষ্টি বর্ষণের জন্য ইমামকে দিয়ে এই আশায় দোয়া করানো যে দোয়া কবুল না হলে ইমামের মর্যাদা ধূলিসাৎ হবে। কিন্তু ইমাম প্রতিটি জ্ঞানগত বিতর্কে বিজয়ী হতেন এবং বৃষ্টির জন্য করা তাঁর দোয়াও কবুল হয়েছিল।

 

 বাদশাহ মামুন একবার তার সাপ্তাহিক প্রশ্নোত্তরের আসরে ইমামকে আমন্ত্রণ জানালেন। সেখানে ইমাম কোনো এক প্রেক্ষাপটে মামুনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অভিমত দেন। এতে বাদশা ভীষণ ক্ষেপে যান এবং ইমামের বিরুদ্ধে অন্তরে ভীষণ বিদ্বেষ পোষণ করতে থাকেন। এইভাবে   ইমামত, জনপ্রিয়তা, খেলাফত, আলীর বংশধর প্রভৃতি বিচিত্র কারণে বাদশাহ ইমামের বিরুদ্ধে শত্রুতা করতে থাকে। অন্যদিকে জনগণ বুঝতে পারে যে, খেলাফতের জন্যে মামুনের চেয়ে ইমামই বেশি উপযুক্ত। ফলে ইমামের বিরুদ্ধে মামুনের ক্রোধ এবং হিংসা বাড়তেই থাকে।

 

আর ইমামও মামুনের বিরুদ্ধে অকপট সত্য বলার ক্ষেত্রে নির্ভীক ছিলেন। কোনোভাবেই যখন ইমামকে পরাস্ত করা গেল না, তখন মার্ভ থেকে বাগদাদে ফেরার পথে ইরানের বর্তমান মাশহাদ প্রদেশের তূস নামক অঞ্চলে মামুন ইমামকে ডালিমের রস বা আঙ্গুরের সাথে বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করে হৃদয়-জ্বালা মেটাবার উদ্যোগ নেয়। ২০৩ হিজরির ১৭ই সফরে এই হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। তখন ইমামের বয়স ছিল পঞ্চান্ন বছর। আসলে বিষ প্রয়োগে ইমামের সাময়িক মৃত্যু ঘটলেও আসল মৃত্যু ঘটেছিল মামুনেরই। পক্ষান্তরে ইমাম শাহাদাতের পেয়ালা পান করে যেন অমর হয়ে গেলেন চিরকালের জন্যে। তার প্রমাণ মেলে মাশহাদে তাঁর পবিত্র সমাধিস্থলে গেলে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইমামের জন্মদিনে কাতারে কাতারে মানুষ আসে তাঁর প্রতি আন্তরিক শ্রদ্ধা নিবেদন করতে। সোনালি রঙ্গের সমাধি-ভবনের চারপাশ জাঁকজমক আর অপূর্ব ঐশ্বর্যে কোলাহল-মুখর হয়ে ওঠে নিমেষেই। যুগ যুগ ধরে মানুষের নেক-বাসনা পূরণের উসিলা হিসেবে কিংবদন্তীতুল্য খ্যাতি রয়েছে নবীবংশের ইমামগণের। ইমাম রেজা (আ.) ও তাঁর পবিত্র মাজারও এর ব্যতিক্রম নয়।

 

কেনো ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা ইমামের মাযারে এসে ভিড় জমান? এ সম্পর্কে যিয়ারতকারীগণ বিভিন্নভাবে তাঁদের আবেগ-অনুভূতি জানিয়েছেন। একজন বলেছেন, আমি যখনই বা যেখানেই কোনো সমস্যার সম্মুখীন হই, তখনই ইমাম রেজা (আ.)’র  মাজারে চলে আসি। এখানে এসে আল্লাহর দরবারে সমস্যার সমাধান চেয়ে দোয়া করি। আমি বহুবার লক্ষ্য করেছি , ধর্মীয় এবং পবিত্র স্থানসমূহ বিশেষ করে ইমাম রেজা (আ.)’র পবিত্র মাযারে এলে মনোবেদনা ও সকল দুঃখ-কষ্ট দূর হয়ে যায় এবং এক ধরনের মানসিক প্রশান্তিতে অন্তর ভরে যায়। মনের ভেতর নবীন আশার আলো জেগে ওঠে। এভাবে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে তাঁদের অভিজ্ঞতা ও আন্তরিক প্রশান্তির কথা বলেছেন। জীবিতাবস্থায় যিনি মানুষের কল্যাণে ছিলেন আত্মনিবেদিত, শহীদ হয়েও তিনি যে অমরত্মের আধ্যাত্মিক শক্তিবলে একইভাবে মানব-কল্যাণ করে যাবেন-তাতে আর বিস্ময়ের কী আছে!

 

ইমাম রেজা (আ.)'র যুগে মুসলমানরা গ্রিক দর্শনসহ ইসলাম-বিরোধী নানা মতবাদের দিকে ঝুঁকে পড়েছিল। এ সময় মুসলমানদের শাসক ছিলেন আব্বাসিয় খলিফা মামুন। সে ছিল আব্বাসিয় শাসকদের মধ্যে সবচেয়ে ধূর্ত ও জ্ঞানী। সমসাময়িক নানা বিষয়ে তাঁর জ্ঞান ছিল। আমরা আগেই বলেছি মামুন ইমাম রেজা (আ.)-কে ইরানের মার্ভ অঞ্চলে নিয়ে এসেছিলেন। মার্ভ শহর ছিল মামুনের রাজধানী। সে এই মহান ইমামের উপস্থিতিতে বিভিন্ন অঞ্চলের জ্ঞানী-গুণীদের নিয়ে জ্ঞানের নানা বিষয়ে অনেক বৈঠক করতেন। বিশেষজ্ঞ বা পণ্ডিতদের দিয়ে ইমাম রেজা (আ.)-কে জব্দ করাই ছিল এইসব বৈঠকের আসল উদ্দেশ্য। কিন্তু ইমাম রেজা (আ.) নানা ধরনের কঠিন প্রশ্ন ও জটিল বিতর্কের এইসব আসরে বিজয়ী হতেন এবং বিতর্ক শেষে ওইসব পণ্ডিত ও জ্ঞানীরা ইমামের শ্রেষ্ঠত্বও অকাট্য যুক্তির কথা স্বীকার করে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করতেন।

 

খলিফা মামুন হযরত ইয়াহিয়া (আ.)'র অনুসারী হওয়ার দাবিদার তথা সাবেয়ি ধর্মের এক  বিখ্যাত পণ্ডিতকে একবার নিয়ে আসেন এ ধরনের এক বিতর্কের আসরে। সেখানে ইহুদি, খ্রিস্টান ও অগ্নি-উপাসকদের পণ্ডিতরাও উপস্থিতি ছিল। এই আসরে ইমাম রেজা (আ.) ইসলামের বিরোধিতা সম্পর্কে কারো কোনো বক্তব্য, যুক্তি বা প্রশ্ন থাকলে তা তুলে ধরার আহ্বান জানান এবং তিনি এর জবাব দেবেন বলে ঘোষণা করেন। ইমরান নামের ওই সাবেয়ি পণ্ডিত অবজ্ঞাভরে বলল: "তুমি যদি না চাইতে তবে তোমার কাছে আমি প্রশ্ন করতাম না। আমি কুফা, বসরা, সিরিয়া ও আরব দেশে গিয়েছি এবং তাদের সব দার্শনিক বা যুক্তিবাদীদের সঙ্গে বিতর্ক করেছি। কিন্তু তাদের কেউই প্রমাণ করতে পারেনি যে আল্লাহ এক ও তিনি ছাড়া অন্য কোনো খোদা নেই এবং তিনি এই একত্বের মধ্যে বহাল রয়েছেন। এ অবস্থায় আমি কি তোমার কাছে প্রশ্ন করতে পারি? ইমাম রেজা (আ.) বললেন, যত খুশি প্রশ্ন করতে পার। ফলে সে ইমামকে বিভিন্ন ধরনের বেশ কিছু প্রশ্ন করে। ইমাম রেজা (আ.)ও বহু সংখ্যক পণ্ডিত ও বিপুল দর্শকদের উপস্থিতিতে একে-একে ইমরানের সব প্রশ্নের এত সুন্দর জবাব দিলেন যে ওই সাবেয়ি পণ্ডিত সেখানেই মুসলমান হয়ে যান।

 

ইমাম রেজা (আ.) বিতর্কে অংশগ্রহণকারী পণ্ডিতদের ধর্ম-বিশ্বাস ও মতবাদে উল্লেখিত দলিল-প্রমাণের আলোকেই তাদের প্রশ্নের জবাব দিতেন। একবার খলিফা মামুন বিখ্যাত খ্রিস্টান পণ্ডিত জাসলিককে বললেন ইমাম রেজা (আ.)’র সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হতে। জাসলিক বললেন, আমি কিভাবে তাঁর সঙ্গে বিতর্কে লিপ্ত হব যখন তাঁর ধর্মগ্রন্থ তথা কুরআন ও এর দলিল-প্রমাণের প্রতি আমার বিশ্বাস নেই এবং তিনি যেই নবীর বক্তব্যকে দলিল-প্রমাণ হিসেবে পেশ করবেন তাঁর প্রতিও আমার ঈমান নেই। ইমাম রেজা (আ.) বললেন, যদি ইঞ্জিল তথা বাইবেল থেকে দলিল-প্রমাণ তুলে ধরি তাহলে কি আপনি তা গ্রহণ করবেন? জাসলিক বললেন, হ্যাঁ। আসলে ইমাম উভয়-পক্ষের কাছে গ্রহণযোগ্য দলিল-প্রমাণের ভিত্তিতে জাসলিকের সঙ্গে বিতর্ক করলেন। বিতর্কে জাসলিক এতটা প্রভাবিত হলেন যে তিনি বললেন: খ্রিস্ট বা ঈসার কসম, আমি কখনও ভাবিনি যে মুসলমানদের মধ্যে আপনার মত কেউ থাকতে পারেন।

 

ইমাম রেজা (আ.)ইহুদি সর্দার ও পণ্ডিত রাস উল জালুত-এর কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে, মুসা (আ.)’র নবী হওয়ার দলিল বা প্রমাণ কী? রাস উল জালুত বললেন,

তিনি এমন মু’জিজা বা অলৌকিক নিদর্শন এনেছেন যে তাঁর আগে আর কেউই তেমনটি আনতে পারেনি। ইমাম প্রশ্ন করলেন: কেমন সেই মো’জেজা? জালুত বললেন: যেমন, সাগরকে দুই ভাগকরে মাঝখানে পথ সৃষ্টি করা, হাতের লাঠিকে সাপে পরিণত করা, পাথরে ওই লাঠি দিয়ে আঘাত করে কয়েকটি ঝর্ণা বইয়ে দেয়া, হাত সাদা করা এবং এ রকম আরো অনেক মু’জিজাবা অলৌকিক নিদর্শন; আর অন্যরা এর মোকাবেলায় কিছু করতে পারত না ও এখনও তার চেয়ে বেশি ক্ষমতা কারো নেই।

 

জবাবে ইমাম রেজা (আ.) বললেন,  এটা ঠিকই বলেছেন যে, হযরত মুসা (আ.)’র আহ্বানের সত্যতার প্রমাণ হল, তিনি এমন কিছু কাজ করেছেন যা অন্যরা করতে পারেনি; তাই কেউ যদি নবুওতের দাবিদার হনও এমন কিছু কাজ করেন যা অন্যরা করতে পারেন না, এ অবস্থায় তাঁর দাবিকে মেনে নেয়া কি আপনার জন্য ওয়াজিব বা অপরিহার্য নয়?

 

ইহুদি আলেম বললেন: না, কারণ আল্লাহর কাছে উচ্চ অবস্থান ও নৈকট্যের দিক থেকে কেউই মুসা নবীর সমকক্ষ নয়। তাই কেউ যদি মুসা নবীর মত মু’জিজা বা অলৌকিক নিদর্শন দেখাতে না পারেন তাহলে তাকে নবী হিসেবে মেনে নেয়া আমাদের তথা ইহুদিদের জন্য ওয়াজিব নয়।

 

ইমাম রেজা (আ.) বললেন,  তাহলে মুসা নবী (আ.)’র আগে যে নবী-রাসূলবৃন্দ এসেছেন তাঁদের প্রতি কিভাবে ঈমান রাখছেন? তাঁরা তো মুসা (আ.)’র অনুরূপ মু’জিজা আনেননি। 

 

রাস উল জালুত  এবার বললেন, ওই নবী-রাসূলবৃন্দ যদি তাঁদের নবুওতের সপক্ষে মুসা নবীর মু’জেজার চেয়ে ভিন্ন ধরনের মু’জিজা দেখাতে পারেন তাহলে তাদের নবুওতকে স্বীকৃতি দেয়ায়ও ওয়াজিব বা জরুরি।

 

ইমাম রেজা (আ.) বললেন,  তাহলে ঈসা ইবনে মরিয়ম (আ.)’র প্রতি কেন ঈমান আনছেন না? অথচ তিনি তো মৃতকে জীবিত করতে পারতেন, অন্ধকে দৃষ্টি দান করতেন, চর্ম রোগ সারিয়ে দিতেন, কাদা দিয়ে পাখি বানিয়ে তাতে ফু দিয়ে জীবন্ত পাখিতে পরিণত করতেন। 

 

রাস উল জালুত এবার বললেন, তিনি এইসব কাজ করতেন বলে বলা হয়ে থাকে, তবে আমরা তো দেখিনি।

ইমাম রেজা (আ.) বললেন, আপনারা কি মুসা নবী (আ.)’রমু’জিজা দেখেছেন? এইসব মু’জিজার খবর কি আপনাদের কাছে নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিদের মাধ্যমে পৌঁছেনি?

-   জি হ্যাঁ, ঠিক তাই। বললেন রাস উল জালুত

-   ইমাম রেজা (আ.) বললেন, "ভালো কথা, তাহলে ঈসা (আ.)’র মু’জিজাগুলোর  নির্ভরযোগ্য খবরও তো আপনাদের কাছে বলা হয়েছে। কিন্তু এ অবস্থায় আপনারা মুসা নবী (আ.)-কে নবী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে তাঁর প্রতি ঈমান আনলেও  ঈসা (আ.)’র প্রতি ঈমান আনছেন না। "তিনি আরো বললেন, "বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র নবুওতসহ অন্যান্য নবী-রাসূলদের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। আমাদের নবী (সা.)র অন্যতম মু’জিজা হল এটা যে তিনি ছিলেন একজন দরিদ্র ইয়াতিম ও রাখালের কাজ করে পারিশ্রমিক নিতেন। তিনি কোনো পড়াশুনা করেননি এবং কোনো শিক্ষকের কাছেও আসা-যাওয়া করেননি। কিন্তু তারপরও তিনি এমন এক বই এনেছেন যাতে রয়েছে অতীতের নবী-রাসূলদের কাহিনী ও ঘটনাগুলোর হুবহু বিবরণ। এতে রয়েছে অতীতের লোকদের খবর এবং কিয়ামত পর্যন্ত সুদূর ভবিষ্যতের খবর। এ বই  অনেক নিদর্শন ও  অলৌকিক ঘটনা তুলে ধরেছে।"

 

এভাবে রাস উল জালুতের সঙ্গে ইমাম রেজা (আ.)’র আলোচনা চলতে থাকে। সংলাপ এমন পর্যায়ে উপনীত হয় যে ইহুদি সর্দার ও পণ্ডিত রাস উল জালুত ইমাম রেজা (আ.)-কে বললেন: 

"আল্লাহর কসম! হে মুহাম্মদের সন্তান (বংশধর)! ইহুদি জাতির ওপর আমার নেতৃত্বের পথে যদি বাধা হয়ে না দাঁড়াত তাহলে আপনার নির্দেশই মান্য করতাম। সেই খোদার কসম দিয়ে বলছি, যে খোদা মুসার ওপর নাজেল করেছেন তাওরাত ও দাউদের ওপর নাজেল করেছি যাবুর। এমন কাউকে দেখিনি যিনি তাওরাত ও ইঞ্জিল আপনার চেয়ে ভালো তিলাওয়াত করেন এবং আপনার চেয়ে ভালোভাবে ও মধুরভাবে এইসব ধর্মগ্রন্থের তাফসির করেন।"

 

এভাবে ইমাম রেজা (আ.) তাঁর অকাট্য যুক্তির মাধ্যমে সবার জন্য সর্বোত্তম ও বোধগম্যভাবে ইসলামের বিশ্বাসগুলো তুলে ধরেছিলেন। আর তিনি এত গভীর ও ব্যাপক জ্ঞানের অধিকারী এবং সেসবের প্রচারক ও বিকাশক  ছিলেন বলেই  তাঁকে ‘আলেমে আলে মুহাম্মাদ’ বা বিশ্বনবী (সা.)’র আহলে বাইতের আলেম শীর্ষক উপাধি দেয়া হয়েছিল।

 

এই মহাপুরুষের কয়েকটি বাণী শুনিয়ে ও সবাইকে আবারও শুভেচ্ছা জানিয়ে শেষ করব তাঁর জন্মদিনের আলোচনা। ইমাম রেজা (আ.) বলেছেন,

 

১."জ্ঞান ও প্রজ্ঞা হচ্ছে এমন এক গচ্ছিত সম্পদের মত যার চাবি হল, প্রশ্ন। আল্লাহর রহমত তোমাদের ওপর বর্ষিত হোক, কারণ প্রশ্নের মাধ্যমে চার গ্রুপ তথা প্রশ্নকারী, শিক্ষার্থী, শ্রবণকারী ও প্রশ্নের উত্তর-দাতা সবাই-ই সাওয়াব বা পুরস্কার লাভ করেন।"

২।মুমিন ক্রোধান্বিত হলেও, ক্রোধ তাকে অপরের অধিকার সংরক্ষণ থেকে বিরত করে না।
৩। কিয়ামতে সেই ব্যক্তি আমাদের সর্বাধিক নিকটবর্তী হবে, যে সদাচরণ করে এবং তার পরিবারের সাথে সদ্ব্যবহার করে।
৪। যদি কেউ কোন মুসলমানকে প্রতারণা করে, তবে সে আমাদের কেউ নয়।
৫। তিনটি কাজ সবচেয়ে কঠিন : 
এক. ন্যায়-পরায়নতা ও সত্যবাদিতা যদিও এর ফল নিজের বিরুদ্ধে যেয়ে থাকে। দুই. সর্বাবস্থায় আল্লাহর স্মরণে থাকা।
তিন. ঈমানদার ভাইকে নিজ সম্পদের অংশীদার করা।#

 

রেডিও তেহরান/এএইচ/১৫

 

 

 

"এক দুপুর বেলায় সূর্য যখন মধ্য গগণে শোভা পাচ্ছিল তখন বাগানের বা ফসলের ক্ষেতের করিডোর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ কানে ভেসে এল একই তাল ও ছন্দের এক মধুর ধ্বনি। এগিয়ে গিয়ে দেখলাম এক অপূর্ব ও মনোহর দৃশ্য।  সদ্য-স্থাপিত একটি কাঠের টাওয়ারের ওপর দাঁড়ানো এক মুসলমান উপহার দিচ্ছিলেন এই মধুর সুর। কানে আসছিল কতগুলো আরবি শব্দ। যেমন, আল্লাহু আকবার বা আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ... লাইলাহা ইল্লাল্লাহ বা আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই ইত্যাদি। কি ঘটতে যাচ্ছে সে সম্পর্কে কোনো ধারণাই ছিল না। ধীরে ধীরে আমার চারদিকে জড় হচ্ছিলেন নানা অঞ্চলের ও নানা বয়সের মানুষ। তারা অত্যন্ত প্রশান্ত চিত্তে ও সশ্রদ্ধ ভঙ্গিতে পরস্পরের পাশে দাঁড়ালেন। প্রত্যেকের হাতেই রয়েছে মাদুরের তৈরি একটি জায়নামাজ। তারা সেগুলোকে সবুজ ঘাসের ওপর বিছিয়ে দিচ্ছিলেন। ক্রমেই তাদের সংখ্যা বাড়ছিল। ঠিক কতজন শেষ পর্যন্ত এভাবে একসঙ্গে জড়ো হলেন তা বুঝতে পারিনি। তারা পায়ের জুতোগুলো খুলে কয়েকটি লম্বা ও সুশৃঙ্খল সারিতে দাঁড়িয়ে গেলেন। নীরবে দেখছিলাম এই দৃশ্য। বিস্মিত হচ্ছিলাম এটা দেখে যে সেখানে কারো ওপর অন্য কারো কোনো ধরণের অগ্রাধিকার ছিল না। তাদের মধ্যে কেউ ছিলেন শ্বেতাঙ্গ, কেউ কৃষ্ণাঙ্গ ও কেউবা হলুদ বা বাদামি বর্ণের।" - বলছিলেন মার্কিন নও-মুসলিম 'থমাস ক্লেয়টন'।

 

মার্কিন নও-মুসলিম ক্লেয়টন  আরো বলেন: "এই সমাবেশে ভ্রাতৃত্বের যে চিত্র ও পরিবেশ দেখেছিলাম তার প্রভাব কখনও বিলুপ্ত হবে না। সেই থেকে অনেক বছর কেটে গেছে। আমি সেই বছরই ইসলামের ছায়াতালে আশ্রয় নেই এবং নিজের জন্য মুহাম্মাদ নাম বেছে নেই।"

 

মানবীয় প্রকৃতির ধর্ম ইসলাম মানুষকে প্রকৃত সৌভাগ্যের পথ দেখায় বলে অমুসলিম বিশ্বেও দিনকে দিন এ ধর্মের প্রতি বাড়ছে মানুষের আকর্ষণ।  আধ্যাত্মিক শূন্যতার কারণে মানুষ এখন ধর্মের দিকে ফিরে যেতে চাইছে। আর ইসলামের মধ্যেই তারা পাচ্ছেন অবিকৃত ধর্ম ও প্রকৃত আধ্যাত্মিকতার স্বাদ এবং পরিপূর্ণ জীবন বিধান। মুসলমানদের নামাজের জামায়াতে ফুটে উঠে এক আদর্শ সমাজ তথা ইসলামী সমাজের চিত্র যেখানে কোনো ভেদাভেদ নেই এবং সবাই একই দেহ ও একই হৃদয় নিয়ে একই লক্ষ্যে আল্লাহর দিকে মনোনিবেশ করেন। আর তাই এ ধরনের ইবাদতের দৃশ্য সত্য-সন্ধানী মানুষকে আকৃষ্ট করে ইসলামের দিকে; থমাস ক্লেয়টনের মত মার্কিন নাগরিক হচ্ছেন এমনই সৌভাগ্যবানদের একজন। প্রকৃত নামাজির মত কোনো সমাজের সদস্যরা যদি সব অবস্থায় আল্লাহকে হাজির নাজির জানেন তাহলে সেখানে অনৈতিক আচরণ, পাপাচার, দুর্নীতি ও অন্যায়ের কোনো সুযোগ থাকে না।

 

 মার্কিন নও-মুসলিম 'থমাস ক্লেয়টন' আরো বলেছেন: "ইসলাম মানুষকে  দায়িত্বশীলতা, কল্যাণকামীতা ও সততার মত পছন্দনীয় গুণের অধিকারী হতে বলে। এ ধর্ম অন্যের সম্পদ ও জীবনের ওপর জুলুম করতে নিষেধ করে এবং নিজের অধিকার রক্ষার কথা বলে। যেসব কাজ সমাজ ও নিজের জন্য কল্যাণকর তা করার এবং যেসব কাজ সমাজের জন্য ক্ষতি ও দুর্নীতি ডেকে আনে তা থেকে দূরে থাকার কথা বলে ইসলাম। নামাজের মত যেসব ইবাদত আল্লাহর দাসত্ব ও আনুগত্যের প্রতীক সেইসব ইবাদতে শামিল হতে বলে এই মহান ধর্ম।"

 

ইসলাম ছাড়া অন্যান্য বিধানে কেবল বস্তুগত চাহিদাকে অথবা কেবল আধ্যাত্মিক চাহিদাকেই গুরুত্ব দেয়া হয়। এই একদেশদর্শিতার কারণে রোমান সভ্যতাসহ অতীতের অনেক সভ্যতা ধ্বংস হয়ে গেছে এবং পাশ্চাত্য এখনও সেই ধ্বংসের পথেই এগুচ্ছে বলে মনে করেন অ্যাশ্পেঙ্গলারের মত পশ্চিমা চিন্তাবিদরাও। কিন্তু ইসলাম এই উভয় চাহিদাকেও পর্যাপ্ত মাত্রায় গুরুত্ব দিয়েছে। তাই ব্যক্তি ও সমাজের কল্যাণে ইসলামের কোনো বিকল্প নেই।

মার্কিন নও-মুসলিম 'থমাস ক্লেয়টন' সবশেষে আরো বলেছেন:

 

"আমি এখন আল্লাহ ছাড়া কোনো মা'বুদ বা উপাস্য নেই- এই বাক্যে আন্তরিকভাবে বিশ্বাসী এবং এই সত্যকে আমার সমগ্র অস্তিত্ব দিয়ে অনুভব করছি। আমি এই ধর্মকে আমার প্রকৃতির ইচ্ছাগুলোর সঙ্গে মানানসই হিসেবে দেখতে পাচ্ছি।  আর তাই মুসলমান হয়েছি। সেই থেকে এ পর্যন্ত আমার স্রস্টার প্রতি এক বিশেষ ভালবাসা অনুভব করছি। যখন মুসলমান ছিলাম না তখন কেন এই অনুভূতি ছিল না তা জানি না। আল্লাহর ওপর আমার রয়েছে গভীর বিশ্বাস। আশা করছি এই ঈমানকে সব সময় রক্ষা করতে পারব। যখন কেউ আল্লাহর ওপর ঈমান আনেন আল্লাহ তাকে নিরাশ করেন না; তিনি সব সময়ই বান্দার ডাকে সাড়া দেন। কখনও কখনও বান্দা হতাশ হয়ে পড়েন ও ভাবেন যে আল্লাহ তার ওপর অসন্তুষ্ট হয়ে তাকে পরিত্যাগ করেছেন। আমি তাদেরকে বলতে চাই, কখনও দয়ালু আল্লাহ সম্পর্কে আশা ছাড়বেন না। আল্লাহ সব অবস্থায় আমাদের দেখছেন।  সঠিক পথ নির্বাচনে ও ভালো কাজ করার ক্ষেত্রে সাফল্য দানে তিনিই আমাদের সহায়তা করবেন। একমাত্র ঈমানই জীবনের সব ক্ষেত্রে মানুষকে সফল করে। নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রতি আমাদের ভালবাসা একতরফা নয়। আমরা যেমন আল্লাহকে ভালবাসি, তেমনি আল্লাহও তাঁর বান্দাদের ভালবাসেন।" #

১৪৮ হিজরির ২৫ শাওয়াল ইসলামের ইতিহাসে এক গভীর শোকাবহ দিন। কারণ, এই দিনে শাহাদত বরণ করেন মুসলিম বিশ্বের প্রাণপ্রিয় প্রবাদপুরুষ ইমাম আবু আব্দুল্লাহ জাফর আস সাদিক (আ.)। ইসলাম ও এর প্রকৃত শিক্ষা তাঁর কাছে চিরঋণী। 

 

ইমাম সাদিক (আ.) আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ানের শাসনামলে ৮২ হিজরির ১৭ই রবিউল আউয়ালে মদিনায় জন্ম গ্রহণ করেন। সে সময় মুসলিম বিশ্বে চলছিল নিষ্ঠুর ও স্বৈরাচারী শাসকদের রাজত্ব। ইসলামী ভূখণ্ডের যে প্রান্তেই তাদের অপকর্মের প্রতিবাদ করা হত সেখানেই উম্মতের নিরীহ ও নিরপরাধ মানুষদের নির্দ্বিধায় হত্যা করা হত। এ সময় ইসলামের প্রকৃত বাণী তুলে ধরাই ছিল অত্যন্ত কঠিন কাজ। 

 

কিন্তু ইসলামের সেই মহাদুর্দিনে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির পুনরুজ্জীবন, সংরক্ষণ, বিকাশ এবং মুসলিম সমাজের সংস্কারের ক্ষেত্রে কাণ্ডারি হিসেবে আবির্ভূত হন বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের সদস্য ইমাম জাফর সাদিক (আ.)। তাঁর মহান আত্মার প্রতি অশেষ দরুদ ও সালাম পেশের পাশাপাশি সবাইকে জানাচ্ছি গভীর শোক ও সমবেদনা। এই মহান ইমামের কিছু অমূল্য অবদান ও তাঁর অনুপম চরিত্রের নানা দিক তুলে ধরব এ প্রবন্ধে।  

   

ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.) মুসলমানদের সব মাজহাবের কাছেই বরেণ্য ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব হওয়ায় তাঁর আদর্শ হতে পারে মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের সূত্র। চারজন সুন্নি ইমামের মধ্যে একজন তাঁর প্রত্যক্ষ ছাত্র এবং আরো দুই জন সুন্নি ইমাম তাঁর পরোক্ষ ছাত্র ছিলেন। উল্লেখ্য শিয়া মাজহাব ইমাম জাফর সাদেক (আ) এর জ্ঞান থেকে বিরতিহীনভাবে গ্রহণ করে হৃষ্টপুষ্ট ও সমৃদ্ধ হয়েছে, যে কারণে শিয়া মাজহাব 'জাফরি মাজহাব' হিসেবেও খ্যাত। 

 

শেইখ আব্দুর রহমান নাকশবান্দি তার ‘আল ইকদুল ওয়াহদি’ গ্রন্থে আহলে বাইতকে স্মরণ করে বলেছেন: তাঁরা হলেন আমাদের ধর্মের তরিকা, আমাদের শরীয়তের উৎস এবং সাহাবীদের মধ্যে দৃঢ়-স্তম্ভ স্বরূপ। ইসলাম তাঁদের মধ্যে আবির্ভূত ও প্রকাশিত হয়েছে।  ইসলামের ভিত্তি তাদের মাধ্যমে সুপ্রতিষ্ঠিত ও বিস্তার লাভ করছে। এ কারণেইে মহানবী (সা.) বলেছেন: নিশ্চয়ই আমি তোমাদের মধ্যে এমন কিছু রেখে যাচ্ছি যা তোমরা আঁকড়ে ধরলে কখনও বিপথগামী হবে না : আল্লাহর কিতাব ও আমার বংশধর আহলে বাইত। সুতরাং লক্ষ্য রাখ আমার পর কিভাবে এ দু'য়ের সাথে আচরণ করছ। তিনি আরো বলেন, দরুদ ও সালাম পড়ার সময় যে পূর্ণ মাত্রায় সাওয়াব লাভে সন্তুষ্ট হতে চায় সে যেন বলে: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ ওয়া আলিহি, অর্থাৎ হে আল্লাহ, মুহাম্মাদ ও তাঁর বংশধরদের ওপর দরুদ বর্ষিত হোক। ইমাম শাফেয়ী থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, নামাজের শেষ রাকাতের তাশাহুদ শেষে দরুদ পড়া ওয়াজিব। 

 

রাসুলের  আহলে বাইত বা পবিত্র বংশধরের মর্যাদা এত  বেশি যে, সুন্নি ইমাম শাফেয়ী তার প্রসিদ্ধ কবিতায় বলেছেন:

 “হে মহানবী (স.) এর বংশধর! আপনাদের প্রতি ভালোবাসা একটি ফরজ কাজ যা মহান আল্লাহ কুরআনে অবতীর্ণ করেছেন। আপনাদের মাহাত্ম্য প্রমাণের ক্ষেত্রে এতটুকুই যথেষ্ট যে,  যে ব্যক্তি তোমাদের ওপর দরুদ পড়বে না তাঁর (আল্লাহর রাসূলের) জন্যও  সে দরুদ পড়েনি।”

 

 ইমাম সাদিক (আ.) রিসালাতের কোলে তথা রাসূলের বংশ-ধারায় জন্ম নেন এবং বিশ্বনবী (সা.)'র আহলে বাইতের ঘরেই বেড়ে ওঠেন। তিনি নিজ দাদা ও বনি হাশিমের শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি ইমাম আলী ইবনে হুসাইন জাইনুল আবেদীন (আ.) এবং পিতা ইমাম মুহাম্মাদ বাকির (আ.)-এর মাধ্যমে প্রশিক্ষিত হন। তিনি বারো বছর ধরে (অন্যান্য বর্ণনামতে ১৫ বছর বা  ১৬ বছর) দাদার সান্নিধ্য এবং শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর ইমাম সাদিক (আ.) নিজ পিতা ইমাম বাকির (আ.)-এর তত্ত্বাবধানে উনিশ বছর শিক্ষা গ্রহণ করেন এবং অবশেষে তাঁর মৃত্যুর পর ইমামতের মহান দায়িত্ব গ্রহণ করেন। 

 

ইমাম সাদিক (আ.) এমন এক সমাজে বড় হন যেখানে মানুষ কেবল অত্যন্ত গোপনে ও সতর্কতা অবলম্বন করে বিশ্বনবী (সা.)'র আহলে বাইতের সাথে যোগাযোগ করতে পারত। 

 

ইমাম সাদিক (আ.) যখন যুবক ছিলেন তখন পারস্পরিক চাওয়া-পাওয়া এবং চিন্তাধারাগুলোর মধ্যে তীব্র দ্বন্দ্ব-সংঘাত ছিল এবং হিংসা-বিদ্বেষ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল। মানুষের জীবনের কোন মূল্য ছিল না এবং ধর্মকেও অবমাননা করা হত। আর জনগণ ছিল কেবলই শাসকদের লক্ষ্যে পৌঁছার হাতিয়ার।

 

সবচেয়ে বেশী যাদের ওপর দমন নিপীড়ন চালানো হতো তারা হল রাসূল (সা.)-এর আহলে বাইতের সমর্থক ও অনুসারীরা। আলী (আ.)-কে গালি দেয়া ছিল আহলে বাইতের শত্রুদের কাছে ফরজ আমলের পূর্ণতাদায়ক মুস্তাহাব! আর এ বিষয়টি ছিল মহানবী (সা.)-এর আহলে বাইতের জন্য চরম মর্মবেদনার কারণ। কিন্তু তাঁরা ধৈর্যশীলদের জন্য মহান আল্লাহর মহাপুরস্কারের প্রতিশ্রুতির কারণে এই কষ্ট সহ্য করতেন। ইমাম সাদিক (আ.) তাঁর কৈশোর ও যৌবনে এ ঘটনা প্রবাহের সাক্ষী ছিলেন এবং তাঁর বাবার কাছ থেকে এ ধরনের বাস্তবতাকে মোকাবিলার শিক্ষা পেয়েছিলেন। যখন তাঁকে তার বাবা ইমাম বাকির (আ.)-এর সঙ্গে সব অন্যায় ও অবিচারের কেন্দ্র সিরিয়ায় জোর কোরে নিয়ে যাওয়া হয় তখন থেকে তাঁর ওপরও বনি উমাইয়ার শত্রুতার ঝড় বইতে থাকে। 

 

পরিবেশ এতটা প্রতিকূল হওয়া সত্ত্বেও ইমাম সাদিক (আ.) সত্য বলতে কুণ্ঠিত হতেন না এবং মানুষকে সঠিক পথের দিক নির্দেশনা দান থেকে বিরত থাকতেন না। তিনি তাদেরকে সবসময় জালিম শাসককে সহযোগিতা করা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিতেন, শাসকদের পক্ষ থেকে নিয়োজিত বিচারকদের শরণাপন্ন হতে নিষেধ করতেন এবং সরকারী যে কোন পদ গ্রহণে নিরুৎসাহিত করতেন। ইমাম সাদিক (আ.)-এর সময় যাইদ ইবনে আলী (আ.) উমাইয়া শাসক গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। যখন যাইদ শহীদ হন ইমাম (আ.) প্রকাশ্যে তাঁর প্রশংসা ও তাঁর হত্যাকারীদের লানত করেন। যাইদ ইবনে আলীকে হত্যার পর হিশাম ইবনে আব্দুল মালিক হযরত আলী (আ.)-এর বংশধরদের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ করতে থাকে। এ ছাড়াও সে নানা পন্থায় ইমাম সাদিক (আ.)-এর ওপর সংকীর্ণতা আরোপ করে। কিন্তু মহান আল্লাহর কৃপায় বনি উমাইয়াদের এইসব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মহানবী (সা.)-এর আহলে বাইতের প্রতি জনগণের ভালবাসা বাড়তেই থাকে।

 

বনি উমাইয়াদের মধ্যে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব জোরদার হওয়ার সুযোগে আব্বাসীয়রা ১৩২ হিজরিতে উমাইয়া শাসনের পতন ঘটায়। তারা জনগণকে এ কথা বলে আন্দোলনে শামিল করেছিল যে, উমাইয়াদের পতন ঘটলে তারা নবী(সা.)'র বংশকেই তথা আহলে বাইতকে ক্ষমতায় বসাবে ও কারবালার ঘটনার প্রতিশোধ নেবে। কিন্তু উমাইয়াদের পতনের পর তারা নিজেরাই ক্ষমতা দখল করে এবং নবী-বংশের কাছে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেব দেব করে বহু বছর পার করার পর এটা বলে যে নবী বংশ বলতে তারা নিজেদের তথা বনি-আব্বাসকেই বুঝিয়েছিল। 

 

 জনগণ বুঝতে পারে যে তারা প্রতারিত হয়েছে। প্রথম আব্বাসিয় শাসক সাফফাহ তার ক্ষমতা কিছুটা সংহত করার পর নিজের ভাই মনসুর দাওয়ানিকির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে।

 

বনি উমাইয়ার শক্তির ভিত দুর্বল হওয়া ও অন্যরা পর্যাপ্ত শক্তি ও ক্ষমতার অধিকারী না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তী এ অবস্থাটি  ইমাম সাদিক (আ.)-এর জন্য সুবর্ণ এক সুযোগ এনে দেয়। ইমাম এ বিষয়টি পূর্ণরূপে অনুভব করে তীব্র কষ্ট পেতেন যে, দীর্ঘ দিনের বিচ্যুতি ও অনাচার ইসলামকে এতোই বদলে দিয়েছে যে তা অন্তঃসারশূন্য ও আচারসর্বস্ব এক ধর্মে পরিণত হয়েছে। এ কারণে তিনি মানুষকে হেদায়াত এবং ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা ও বিধিবিধান প্রচারের লক্ষ্যে তাঁর শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দ্বার উন্মোচন করেন। 

 

এ সময়ে ইমাম সাদিক (আ.)-এর ঘর ছিল একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মত ছিল যেখানে বড় বড় মনীষীরা তাঁর কাছে হাদিস, তাফসির, দর্শন ও কালাম শাস্ত্র শিখতেন। তাঁর ক্লাসে সাধারণত দুই হাজার প্রসিদ্ধ আলেম অংশ নিতেন। কখনও কখনও এ সংখ্যা চার হাজারে পৌঁছাত।  হাদিস বর্ণনাকারী এবং জ্ঞান পিপাসুরা তাঁর কাছ থেকে শেখার জন্য দূর দূরান্ত থেকে মদীনায় আসত। কারণ ঐ সময় তিনি সতর্ক প্রহরা ও নজরবন্দী অবস্থায় ছিলেন না। তাঁর বিশেষ ছাত্রদের মধ্যে ছিলেন বনি হারিস ইবনে আব্দুল মুত্তালিব ও বনি হাসান ইবনে হাসান ইবনে আলী (আ.)। 

 

ফিকাহ শাস্ত্র ও হাদিস বিষয়ক জ্ঞানের বিশিষ্ট ও প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের অনেকেই তাঁর কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। যেমন, ইয়াহিয়া ইবনে সাঈদ আনসারী, ইবনে জারিহ, মালিক ইবনে আনাস, সুফিয়ান সওরী, ইবনে উয়াইনা, আবু হানিফা, শোবা, আইয়ুব সাজেস্তানি ও অন্যান্যরা। তাঁরা সবাই ইমাম সাদিক (আ.)-এর ছাত্র হওয়ার কারণে গর্ব করতেন। ইমাম সাদিক (আ.)-এর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রসিদ্ধি লাভ করেছিল। কারণ তিনি তাঁর সময়ে শিক্ষা ও চিন্তার বিকাশ আন্দোলনের পুরোধা ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে তিনিই প্রথম ব্যক্তি হিসাবে ইসলামে দর্শন শাস্ত্রের প্রবর্তন করেন। তাঁর ছাত্রদের মধ্যে কেবল ফিকাহ শাস্ত্রের বিভিন্ন মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতারাই ছিলেন না বরং হিকমত ও দর্শনের অনুরাগীরাও ইসলামী বিশ্বের সকল প্রান্ত থেকে তাঁর কাছে আসতেন। 

 

হাদিস শাস্ত্রে ইমামের অবস্থান এত উচ্চে ছিল যে, যে কোন হাদিসের বর্ণনায় তাঁর নামের উল্লেখই ঐ হাদিসটির বিশুদ্ধতার প্রমাণ বলে বিবেচিত হত।  এক ব্যক্তি বর্ণনা করেছেন যে, তিনি কুফার মসজিদে নয়শত ধর্মীয় পণ্ডিত ও ধর্ম প্রাণ ব্যক্তিকে দেখেছেন যে তারা সকলে বলছিল : জাফর ইবনে মুহাম্মাদ আমাকে এটা বলেছেন।

 

সাফফাহর পর তার ভাই মনসুর দাওয়ানিকি ক্ষমতা গ্রহণ করলেও জনগণ নবী-বংশকেই শাসন-ক্ষমতার জন্য প্রকৃত যোগ্যতার অধিকারী বলে মনে করতো।

তাছাড়া মদীনার আলেমরাও প্রকাশ্যে আব্বাসীয়দের হাতে বাইয়াত করা হারাম বলে ফতোয়া দিতেন। তবে যে বিষয়টি মানসুরকে বেশি উদ্বিগ্ন করেছিল তা হল আলী (আ.)'র বংশধরদের কার্যক্রম বিশেষত তাদের শীর্ষ ব্যক্তি জাফর ইবনে মুহাম্মাদ আস সাদিক (আ.)-এর ভূমিকা। মানসুর ইমামকে জব্দ করা ও দমিয়ে রাখার জন্য সব ক্ষমতার অপব্যবহার ও বল প্রয়োগ করা ছাড়াও সব ধরনের প্রতারণার আশ্রয় নিত। 

 

মানসুর যখন চাইত কোন লোককে গোপনে হত্যা করবে তখন তার সাথে এক খৃষ্টান চিকিৎসককে সঙ্গে নিয়ে যেত যে ছিল সম্পূর্ণ নাস্তিক এবং ন্যায়-অন্যায়ের ধার ধারত না। মানসুর যাকেই হত্যার নির্দেশ দিত সে তার পানীয়তে বিশ মিশিয়ে তাকে পরিবেশন করত। মানসুর যদি কাউকে নিজের কব্জায় আনতে পারত তবে তাকে জীবন্ত অবস্থায় দুই দেয়ালের মধ্যে আটকে ঢালাই করে বন্ধ করে দিত। হাশেমিয়া ও বাগদাদের দেয়ালগুলো যদি কথা বলতে পারত তবে তারা সাক্ষ্য দিত যে, কত নিরপরাধ লোককে মানসুর দেয়ালগুলোর মধ্যে জীবন্ত সমাধিস্থ করেছে। একবার মানসুর হজ্বে গেলে। আব্দুল্লাহ ইবনে হাসানের কন্যা তার কাছে এসে তার বৃদ্ধ বন্দী পিতার মুক্তির আকুল আবেদন জানিয়ে একটি কবিতা পাঠ করে যাতে মানসুরের সঙ্গে তাদের পরিবারের আত্মীয়তার সম্পর্কের দোহাইও ছিল। 

 

কিন্তু এ কবিতার জবাবে মানসুর তার বাবাকে হত্যার নির্দেশ দিয়ে তার বিচ্ছিন্ন মাথাটি মেয়ের সামনেই প্রদর্শন করে। এ ঘটনাটি মানসুরের পাষাণ হৃদয় ও অত্যাচারের একটা খণ্ডচিত্র মাত্র। 

 

ইমাম সাদিক (আ.) সাফফাহর শাসনামলের বিশেষ অবস্থার কারণে শান্তি ও নিরাপত্তার মধ্যে ছিলেন। কারণ রাজনৈতিক নাজুক অবস্থার কারণে সাফফাহ বিরাজমান পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে চলতে বাধ্য ছিল। কিন্তু মানসুরের সময় ইমাম সাদিক (আ.)-এর সামনে বিভিন্ন সমস্যা উদ্ভূত হওয়ায় পূর্বের অবস্থার অবনতি ঘটে। ইমাম সাদিক (আ.)-এর সামাজিক মর্যাদা ও জনসাধারণের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তার বিষয়টি মানসুরের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর ছিল। সে ইমামকেই তার সবচেয়ে বড় শত্রু বলে মনে করত। 

 

ইমাম সাদিক (আ.)-এর বিরুদ্ধে মানসুরের বানোয়াট অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছিল ও বাড়ছিল গুপ্তচরদের প্রচারণা। এ অবস্থায় মানসুর ১৪৭ হিজরিতে হজ্বের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে মদীনায় পৌঁছায়। সে রাবি নামক এক ব্যক্তিকে ইমামের কাছে পাঠিয়ে তাঁকে তার সামনে হাজির করার নির্দেশ দিল। মানসুর তাকে বলল, আল্লাহ আমাকে হত্যা করুন যদি তাঁকে হত্যা না করি। রাবি প্রথমে মানসুরের নির্দেশকে না শোনার ভান করল যাতে হয়তো মানসুর তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে অথবা বিষয়টি একেবারে ভুলে যায়। কিন্তু মানসুর তার নির্দেশের পুনরাবৃত্তি করে বলে, তাঁকে কষ্ট দিয়ে অপমানজনক অবস্থায় আমার সামনে উপস্থিত কর। যখন ইমাম তার কাছে গেলেন সে তাঁর সঙ্গে অত্যন্ত রূঢ় আচরণ করে এবং অশোভনীয় ভঙ্গিতে বলে যে, ইরাকের লোকেরা তোমাকে নিজেদের ইমাম মনে করে এবং তোমার কাছে তাদের সম্পদের জাকাত পাঠায়। আর তাই পূর্ণশক্তি নিয়ে আমার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছো এবং সংঘাত সৃষ্টি করছো। আল্লাহ আমাকে হত্যা করুন যদি আমি তোমাকে হত্যা না করি। ইমাম সাদিক (আ.) বললেন : হে আমির (শাসক)! আল্লাহ সুলাইমান (আ.) কে নিয়ামত দিয়েছিলেন। আর তিনি তার শোকর আদায় করেছিলেন। তিনি আইয়ুব (আ.)কে বিপদাপদ দিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন। আর তিনি তাতে ধৈর্য ধধারণ করেছিলেন। হযরত ইউসুফ (আ.) এর প্রতি জুলুম করা হয়েছিল। আর তিনি তাঁর ওপর অবিচারকারীদের ক্ষমা করেছিলেন। মানসুর তখন বলল, "আমার কাছে আস। তুমি নিরপরাধ প্রমাণিত হয়েছো। তাই তোমাকে নিরাপত্তা দিচ্ছি। তুমি আমার জন্য কোন সমস্যা নও। এক আত্মীয় তার আত্মীয়দের থেকে যা নিয়েছে আল্লাহ তার থেকে অনেক বেশী তোমাকে দান করুন।" এরপর সে ইমামের হাত ধরে টেনে নিয়ে নিজের পাশে বসাল এবং বলল, উপহারের বক্সটি আমার কাছে নিয়ে এস। সুগন্ধি আতরের পাত্র আনা হলে মানসুর নিজের হাতে ইমামকে তা মাখিয়ে দিল ও বলল, আল্লাহর আশ্রয় ও সংরক্ষণে থাক। অতঃপর রাবিকে বলল, হে রাবি! আবা আব্দিল্লাহর উপহার ও জোব্বা তার ঘরে পৌঁছে দিয়ে এস। রাবি ইমামের কাছ জিনিসগুলো পৌঁছে দিয়ে বলল, আমি আপনার কাছে প্রথমবার আসার পূর্বে যা দেখেছিলাম আপনি তা দেখেননি। আর তারপর যা দেখলাম তা আপনি জানেন। হে আবা আব্দিল্লাহ, আপনি মানসূরের কাছে গিয়ে কি বলেছিলেন। ইমাম বললেন, "(মনে মনে এ দোয়া করেছিলাম) হে আল্লাহ, আপনি আমাকে আপনার সেই চোখ দিয়ে হেফাজত করুন যা কখনও নিদ্রা যায় না এবং আপনার অপরাজেয় দুর্গে আমাকে আশ্রয় দিন। আমার ওপর আপনার অসীম ক্ষমতা দিয়ে আমাকে ক্ষমা করুন। কারণ আপনিই আমার সেই আশার স্থল যা আমাকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করবে। হে আল্লাহ! আপনি ঐ ব্যক্তি হতে মহান ও শ্রেষ্ঠ যাকে আমি আমার জন্য অনিষ্টকারী বলে ভয় করি। হে আমার প্রতিপালক! তার রক্তপাতের ইচ্ছাকে আপনার মাধ্যমে প্রতিরোধ করছি এবং তার কাঙ্ক্ষিত মন্দ থেকে আপনার আশ্রয় চাইছি।" 

 

ইমাম সাদিক (আ.)-কে অসহনীয় এক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসাবে দেখার বিষয়টি মানসুরের মনে দৃঢ়ভাবে গেঁথে গিয়েছিল। কারণ সে জানত যে, লক্ষ লক্ষ মানুষ তাঁকে ইমাম হিসাবে মানে, তাঁর কাছে খোমস ও যাকাতের অর্থ পাঠায় এবং তাঁকে বিশেষ শ্রদ্ধার চোখে দেখে। এমনকি মানসুরের ঘনিষ্ঠ সহযোগীদেরও বেশিরভাগই তাঁর প্রতি দুর্বল। 

 

 ইমাম সাদিক (আ.) মানসুরের সমালোচনা থেকে রক্ষা পেতে যে কৌশল অবলম্বন করতেন এবং যেসব সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিতেন সেগুলো উদঘাটন করতে মানসুরকে গলদঘর্ম হতে হত। মানসুর তা জানার জন্য সব ধরনের ষড়যন্ত্র করত এবং কোন কৌশলই বাদ রাখত না। কখনও কখনও শিয়াদের নামে মিথ্যা চিঠি দিয়ে ইমামকে নিজের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের আহবান জানাতো এবং লক্ষ্য করত ইমাম কি করেন। কখনও আবার তার বিশ্বস্ত অনুচরদের হাতে প্রচুর অর্থ দিয়ে ইমামের কাছে পাঠিয়ে পরীক্ষা করত। এগুলো তার ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনার কিছু নমুনা। সে আশা করত এভাবে সে তার লক্ষ্যে পৌঁছাবে। যদি ইমাম ঐ পত্রগুলোর জবাব দিতেন অথবা তাদের পাঠানো অর্থ গ্রহণ করতেন তাহলে এভাবে সে ইমামের ওপর চড়াও হওয়ার সুযোগ পেত। কিন্তু তার এইসব প্রচেষ্টা ও ষড়যন্ত্র বিফল হত। 

 

ইমাম সাদিক (আ.) এমন এক ব্যক্তিত্ব ছিলেন যিনি জ্ঞানের আন্দোলনের সূর্যোদয় ঘটিয়ে মানুষকে তার আলো দিয়ে উদ্ভাসিত করেছেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিশ্ব বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম অত্যন্ত ব্যাপক ছিল এবং তাঁর অধীনে বিদ্যার্থীরা ভিড় জমিয়েছিল। তিনি এ বিষয়ে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। তিনি ব্যক্তির চিন্তা ও মতের অনুসরণ (কিয়াস) ও আহলে হাদিসের (হাদিসের অনুসারী) দ্বন্দ্বে আহলে হাদিস ধারার নেতৃত্ব দান করেন। 

 

 মানসুর ইমামের এই সুপরিচিতিকে ভয় করত এবং আতঙ্কিত থাকত যে, হয়তো বা আলাভীরা (আলীর বংশধররা) হঠাৎ করে তাদের অধিকার নিয়ে বিপ্লবের ঘোষণা দিবে ও বিদ্রোহ করে বসবে। মুসলিম উম্মাহর মনীষীরা জাফর ইবনে মুহাম্মাদ (আ.)-এর সঙ্গে সম্পর্ক রাখতেন এবং আহলে বাইতের মর্যাদা সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। তাই মানসুর আশঙ্কা করতো হয়তো তারাও ইমামের সাথে যোগ দিবেন। মানসুর আলাভীদের ওপর ইমাম সাদিক (আ.)-এর প্রভাবকে নব্য প্রতিষ্ঠিত আব্বাসীয়দের খেলাফতের জন্য বিপজ্জনক মনে করত। অন্যদিকে ইমাম সাদিক (আ.) তাঁর দূরদর্শী চিন্তা ও তীক্ষ্ম দৃষ্টির আলোকে গৃহীত পরিকল্পনার মাধ্যমে মানসুরের ষড়যন্ত্রগুলোকে একের পর এক নস্যাৎ করে তাঁর লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে অগ্রসর হচ্ছিলেন। কারণ তিনি ভবিষ্যতে যা ঘটতে পারে সে সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। ফলে তা ঘটার আগেই তিনি খবর দিতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন তৎকালীন পরিস্থিতিতে ক্ষমতার জন্য কোন পদক্ষেপ নেয়া ঠিক হবে না, এবং তিনি নিজ আত্মীয়-স্বজনদেরও বিপ্লবী তৎপরতা চালাতে নিষেধ করতেন। তাদের সবসময় উপদেশ দিতেন সরকারী পদ গ্রহণে বিরত থাকতে। উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সেনাপতি আবু সালমা খাল্লাল যিনি আলে মুহাম্মাদের (সা.) উজির বা পরামর্শদাতা বলে বিবেচিত হতেন বিপ্লবের শুরুতেই ও তার সেনাদল তার সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগেই ইমাম সাদিক (আ.)-এর কাছে গিয়ে তাঁকে খিলাফতের পদ গ্রহণের প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ইমাম তা প্রত্যাখ্যান করেন। আবু সালমা এতে না দমে যে কোনভাবেই হোক ইমামকে রাজী করানোর চেষ্টায় রত হয়। যখন ৭০ হাজার সেনা তার সাথে এসে যোগ দেয় তখন সে ইমামকে এ মর্মে চিঠি লিখে যে, আমার সঙ্গে এখন ৭০ হাজার যোদ্ধা রয়েছে আপনার মত কি? ইমাম নেতিবাচক উত্তর দিয়ে বলেন, তোমার পর সাফফাহ ও মানসুর ক্ষমতা লাভ করবে। 

 

অনুরূপভাবে বিপ্লবের অপর সেনাপতি আবু মুসলিম খোরাসানী যার ওপর ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলের দায়িত্বভার ন্যস্ত ছিল তিনিও ইমাম সাদিক (আ.)-কে ক্ষমতা গ্রহণের আহবান জানিয়েছিল। কিন্তু ইমাম তার প্রস্তাবকেও প্রত্যাখ্যান করেন। আবু মুসলিম জনগণকে মহানবী  (সা.)-এর বংশের সর্বমান্য এক ব্যক্তির দিকে আহবান জানাচ্ছিল। সে আহলে বাইতের ওপর বনি উমাইয়া যে অবিচার চালিয়েছিল এবং তাদের অনেককে হত্যা করেছিল এর বিরুদ্ধে ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করত। সে চাচ্ছিল খিলাফতকে হযরত আলী (আ.)-এর বংশধর কোন ব্যক্তির হাতে অর্পণ করবে। কারণ তাঁরা এ পদের জন্য অগ্রগণ্য ও সবচেয়ে উপযুক্ত ছিলেন। এ জন্য সে ইমাম সাদিক (আ.)-যিনি আহলে বাইতের নেতা ও প্রধান ব্যক্তি বলে গণ‍্য হতেন-তার  উদ্দেশ্যে একটি চিঠি পাঠায়। 

 

সে চিঠিতে উল্লেখ করেছিল, সবাই আপনার দিকে তাকিয়ে রয়েছে এবং তারা অন্তর থেকে আপনাকে চায়। আমি আন্দোলন শুরু করেছি এবং জনগণকে বনি উমাইয়ার আনুগত্য ত্যাগ করে আহলে বাইতের অনুসরণের দিকে আহবান জানিয়েছি। আপনি শুধু সম্মতি দিন, বাকি কাজ আমিই করব। কিন্তু ইমাম সাদিক (আ.) তার উত্তরে বললেন, তুমি আমার অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত নও, আর সময়ও আমার অনুকূলে নয়।  ইমাম তাঁর দিব্যদৃষ্টি  এবং পর্দার অন্তরালের ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে তাঁর পূর্ণ অবহিতির কারণে নিশ্চিত জানতেন যে, এ আহবান ও বিপ্লবের উদ্দেশ্য মুসলিম উম্মাহর মুক্তি এবং অনাচার ও বিশৃঙ্খলার মূলোৎপাটন নয়। তাই তিনি এ ডাকে সাড়া দেয়া ঠিক হবে না বলে মনে করেছেন। 

 

ইমাম স্পষ্টভাবে অবগত ছিলেন যে, যারা এ বিপ্লবের পতাকা উত্তোলন করেছে তারা কেউই সত্যনিষ্ঠ নয়। তারা এমন এক লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নেমেছে যে, ইমাম এতে তাদের সমর্থন করতে পারেন না। ইমাম বাস্তব দৃষ্টিতে সবকিছু বিবেচনা করতেন এবং বিচক্ষণতার সঙ্গে তৎকালীন পরিস্থিতিকে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নিতেন। 

 

ইমাম সাদিক (আ.) ইতোপূর্বে বনি আব্বাসের ক্ষমতাসীন হওয়ার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। এর ভিত্তিতেই তিনি মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে হাসান (নাফসে যাকিয়া)-এর হাতে বাইয়াতের বিরোধিতা করেছিলেন যা একশভাগ সঠিক ও যথার্থ ছিল। প্রকৃতপক্ষে ইমাম সাদিক (আ.)-এর পূর্বের ইমামরাও (আ.) বনি হাশিমের মধ্যে থেকে আব্বাসীয়দের খেলাফত লাভের বিষয়টি বারংবার ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। তাঁরা আগেই এ ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, বনি আব্বাস ক্ষমতা লাভ করে লোকদের হত্যা করবে, পূর্ব ও পশ্চিমের ভূখণ্ডগুলো তাদের পদানত হবে এবং তারা এতটা সম্পদ হস্তগত করবে যে পূর্ববর্তী কোন শাসক তা অর্জন করতে পারে নি। তাদের শাসনকালও দীর্ঘ হবে এবং বনি উমাইয়ার থেকে কয়েকগুণ বেশি সময় ধরে তারা ক্ষমতায় থাকবে। ইমামগণ অনেক আগ থেকেই এরূপ ঘটবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। 

 

উপরন্ত ইমামদের রাজনৈতিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতাও তাদের বিশেষ  সচেতনতা দিয়েছিল যার কারণে তারা বংশীয় ও গোত্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ইসলামী বিশ্বের শাসন-ক্ষমতাকে হস্তগত করার লক্ষ্যে সংঘটিত বিপ্লবগুলোর জটিলতা সম্পর্কে পুরোপুরি অবহিত ছিলেন।

যাই হোক, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ও ইসলামী ভূখণ্ডগুলোতে ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.)’র ইমামতের প্রভাব ও সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ায় ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছিল আব্বাসিয় জালিম শাসক মনসুর দাওয়ানিকি। দাওয়ানিকি বলেছিল:

 "জাফর ইবনে মুহাম্মাদ যদিও তরবারি দিয়ে সংগ্রাম করছে না, কিন্তু তার পদক্ষেপগুলো আমার কাছে একটি অভ্যুত্থানের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ এবং কঠিন বলে মনে হয়।" 

 

 অবশেষে দাওয়ানিকির নির্দেশে (১৪৭ বা ১৪৮ হিজরির ২৫ শে শাওয়াল) বিষ প্রয়োগ করে শহীদ করা হয় ইসলামের এই চির-প্রদীপ্ত সূর্য ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.)কে। কিন্তু শাহাদাতের পর ইমামের নুরানি ব্যক্তিত্বের ঔজ্জ্বল্য বরং বহুগুণ বেড়ে যায়। ৬৫ বছর বয়স্ক ইমামের লাশ দাফন করার সময় ইমাম-প্রেমিক আবু হুরাইরা আজালি নিজেকে বলছিলেন:

"তুমি কি জানো কোন মহামানবের লাশ নিয়ে যাচ্ছ মাটি দিতে? তাঁর আগে ও পরে যদি ইমাম না থাকত তাহলে অবশ্যই বলতাম, কাল কিয়ামত পর্যন্ত এ পৃথিবী এমন মহামানব তৈরিতে অপারগ। " 

 

মানসুর দাওয়ানিকি নিজেও ইমাম সম্পর্কে বলেছিল: 

 

"জাফর (ইবনে মুহাম্মাদ) হলেন সেই ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত যাদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন, 'অতঃপর আমরা আমাদের বান্দাদের থেকে মনোনীতদের কিতাবের উত্তরাধিকারী করলাম।'  মহান আল্লাহ যাদের মনোনীত করেছেন এবং সৎকর্মে অগ্রগামী করেছেন তিনি তাদের অন্যতম।  তিনি ঐ পরিবারের অন্তর্গত যাদের মধ্যে এমন ব্যক্তি রয়েছেন যার সঙ্গে ফেরেশতারা কথা বলে (মুহাদ্দাস)। বর্তমান যুগে আমাদের মধ্যে যে ব্যক্তির সঙ্গে ফেরেশতারা কথা বলেন তিনি হলেন জাফর ইবনে মুহাম্মাদ।" 

 

আহলে সুন্নাতের মালিকি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা মালিক ইবনে আনাস বলেছেন.

"এক সময় আমি জাফর ইবনে মুহাম্মাদের কাছে যাওয়া-আসা করতাম। যখনই আমি তাঁর সাক্ষাতে যেতাম তখন আমি তাকে এ তিন অবস্থার যে কোন এক অবস্থায় পেতাম, হয় তিনি নামাজ পড়ছেন অথবা রোজা রেখেছেন অথবা কুরআন তিলাওয়াত করছেন।  জ্ঞান, ইবাদত ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে জাফর ইবনে মুহাম্মাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ কোনো ব্যক্তিকে কোনো চোখই দেখেনি, কোনো কানই শোনেনি এবং কোনো মানুষই কল্পনা করেনি।" মালিক ইমামের কাছ থেকে হাদিসও বর্ণনা করেছেন। 

 

আহলে সুন্নাতের হানাফি মাজহাবের প্রতিষ্ঠাতা আবু হানিফা বলেছেন,

"আমি জাফর ইবেন মুহাম্মাদ থেকে বড় কোন ফকিহকে দেখিনি। সবচেয়ে জ্ঞানী হল সেই ব্যক্তি যে মানুষের মধ্যে (মত) পার্থক্যের বিষয়গুলো সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি জ্ঞান রাখেন। (আর জাফর ইবেন মুহাম্মাদ হলেন সেই জ্ঞানের অধিকারী।)

যদি (জাফর ইবনে মুহাম্মাদের সান্নিধ্যের তথা ক্লাসের) ঐ দু’বছর না থাকত তবে নোমান তথা আবু হানিফা ধ্বংস হয়ে যেত।"

ইমামের সামনে বিশ্বনবী (সা.)’র নাম উচ্চারিত হলে তাঁর চেহারার রং পাল্টে যেত। হজের ইহরাম বাধার পর ইমাম আল্লাহর ভয়ে এতটা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়তেন যে লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক শীর্ষক তালবিয়া উচ্চারণকে ঔদ্ধত্য বলে মনে করতেন। 

 

ইমাম জাফর সাদিক (আ.) থেকে অসংখ্য কারামাত বা অলৌকিক ঘটনা দেখা গেছে এবং প্রসিদ্ধ অনেক মুকাশাফা (অন্তরে আধ্যাত্মিকভাবে প্রতিফলিত অদৃশ্য জগতের সত্য ঘটনাগুলো) বর্ণিত হয়েছে। এরূপ একটি ঘটনা হল একবার এক ব্যক্তি খলিফা মানসূরের কাছে তাঁর সম্পর্কে মিথ্যা রটনা করল (যে ইমাম সাদিক মানসূরের বিরুদ্ধে কথা বলেছেন)। অতঃপর মানসুর যখন হজ্বে আসল যে ব্যক্তি অপবাদ দিয়েছিল তাকে ডেকে পাঠাল এবং জাফর সাদিকের সামনে তাকে বলল, তুমি যা বলেছিলে তা সত্য প্রমাণের জন্য আল্লাহর নামে কসম করতে রাজি আছ? সে বলল, হ্যাঁ।  ইমাম জাফর সাদিক মানসুরকে বললেন, ঠিক আছে, সে যা দাবি করছে সে অনুযায়ী তাকে কসম করতে বল। মানসুর তাকে বলল, তাঁর সামনে কসম কর। জাফর সাদিক ঐ ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে বললেন এভাবে কসম কর, ‘আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতা থেকে আমি বিচ্ছিন্ন হই এবং আমার শক্তি ও ক্ষমতার আশ্রয় চাই। সত্যিই জাফর এমন বলেছেন ও এমন করেছেন।’ ঐ ব্যক্তি প্রথমে এরূপে কসম করতে রাজী হল না। পরে তা করলো। তার কসম খাওয়া সমাপ্ত হওয়া মাত্রই ঐ লোকটি মানসূরের সামনে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। অন্য একটি ঘটনা এরূপ বর্ণিত হয়েছে যে, এক জালেম ব্যক্তি তাঁর দাসকে হত্যা করে। তিনি ভোর রাত্রিতে নামাজ পড়ে তার প্রতি অভিশাপ বর্ষণ করেন। তিনি এরূপ করার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঐ জালেম ব্যক্তির মৃত্যুও কারণে তার ঘর থেকে কান্নার ধ্বনি শোনা গেল। 

 

বর্ণিত হয়েছে, যখন তাঁর কাছে এ সংবাদ পৌঁছল যে, হাকাম ইবনে আব্বাস কালবি ইমামের চাচা যাইদ (ইবনে আলী) সম্পর্কে এ কবিতাটি (ব্যঙ্গ করে) পাঠ করেছে :

আপনাদের কারণেই আমরা যাইদকে খেজুর গাছে ঝুলিয়ে হত্যা করেছি। আমরা কখনও দেখিনি কোন সৎপথপ্রাপ্ত ব্যক্তিকে খেজুর গাছের কাণ্ডে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। তখন ইমাম তাকে অভিশাপ দিয়ে বললেন, হে আল্লাহ আপনার কুকুরগুলো থেকে একটি কুকুরকে তার ওপর প্রবল করে দিন। কিছুদিন অতিবাহিত না হতেই একটি সিংহ তাকে ছিন্ন ভিন্ন করে (খায়)। 

 

তাঁর অন্যতম কারামত তাশরী ইবনে ওয়াহাব বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, লাইস ইবনে সাদকে বলতে শুনেছি, আমি ১১৩ হিজরিতে হজ্বে গিয়েছিলাম। যখন আসরের নামাজ শেষ করে আবু কুবাইস পাহাড়ে উঠলাম সেখানে এ ব্যক্তিকে বসে দোয়া করতে দেখলাম। তিনি ‘ইয়া রাব’ ‘ইয়া রাব’ বললেন ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণ তাঁর নিশ্বাসের টান ছিল। এরপর ‘ইয়া হাইয়ু’ বলা শুরু করলেন যতক্ষণ তার দম থাকে। এরপর বললেন, হে আল্লাহ আমি আঙ্গুর খেতে চাই। আমাকে আঙ্গুর দিন। আমার গায়ের চাদরও ছিঁড়ে গেছে, আমাকে বস্ত্র দান করুন। তখনও তাঁর দোয়া শেষ হয়নি দেখলাম তাঁর সামনে এক ঝুড়ি আঙ্গুর উপস্থিত দেখলাম... 

 

একবার মানসুর ইমামকে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল এ উদ্দেশ্যে যেন তাঁর ওপর এই অজুহাতে কঠোরতা আরোপ করা যায়। এ লক্ষ্যে ইবনে মুহাজিরকে ডেকে বলল: এ অর্থ নিয়ে মদীনায় যাও। আব্দুল্লাহ ইবনে হাসান, জাফর ইবনে মুহাম্মাদ ও তাদের পরিবারবর্গের কাছে গিয়ে বলল, আমি খোরাসান থেকে মদীনায় এসেছি। এখানে আমি অপরিচিত। আর আমি আপনাদের এক অনুসারী। খোরাসানের লোকেরা এ অর্থ আপনাদের জন্য পাঠিয়েছেন। এরপর তাদের প্রত্যেককে আমি যেভাবে নির্ধারণ করেছি সেভাবে অর্থ দান কর। কিন্তু দেয়ার সময় শর্ত করবে যে, যেহেতু আমি অন্যদের প্রেরিত সেহেতু অনুরোধ হল যে পরিমাণ অর্থ আপনি গ্রহণ করলেন তা একটি কাগজে লিখে দিন। ইবনে মুহাজির মদীনায় গিয়ে তার দায়িত্ব সম্পন্ন করে ফিরে আসলে মানসুর তাকে জিজ্ঞেস করল: তুমি কি করে এসেছো তার বর্ণনা দাও। ইবনে মুহাজির বলল, তাদের কাছে গিয়েছি এবং তাদের নির্ধারিত অর্থ দিয়ে লিখিত রসিদ নিয়ে এসেছি। কিন্তু জাফর ইবনে মুহাম্মাদ তা গ্রহণ করেননি। যখন আমি তাঁর কাছে যাই তখন তিনি মসজিদুন্নবীতে নামাজ পড়ছিলেন। আমি তাঁর পেছনে গিয়ে বসলাম। মনে মনে ভাবলাম, যখন তিনি নামাজ শেষ করবেন তখন আমার কথা তাকে বলব। তিনি নামাজ শেষ করা মাত্রই আমার দিকে ঘুরে বললেন: হে লোক, আল্লাহকে ভয় কর এবং মুহাম্মাদ (সা.)-এর আহলে বাইতের সাথে প্রতারণার চেষ্টা কর না। আর তোমার বন্ধুকেও (মানসুর) যেয়ে বল, সেও যেন আল্লাহকে ভয় করে এবং মুহাম্মাদ (সা.)-এর আহলে বাইতের সাথে যেন প্রতারণার চেষ্টা না করে। তাদের (বনি আব্বাস) সাথে বনি উমাইয়ার কোন পার্থক্য নেই। তারা উভয়েই অভাবী। আমি (হতচকিত হলেও স্বাভাবিক ভঙ্গিতে) বললাম, ‘আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুন। আমি আপনার উদ্দেশ্য বুঝতে পারি নি।’ তিনি বললেন, আমার আরো কাছে আস। আমি তার কাছে গেলে তিনি আমার ও তোমার মধ্যে যা কথোপকথন হয়েছিল তা হুবহু বর্ণনা করলেন যেন তিনি আমাদের সঙ্গে তৃতীয় ব্যক্তি হিসাবে ছিলেন। মানসুর (একথা শুনে) বলল ইবনে মুহাজির, নিঃসন্দেহে আল্লাহর রাসূলের আহলে বাইতের মধ্যে একজন অবশ্যই মুহাদ্দাস (যার সঙ্গে ফেরেশতারা কথা বলেন) রয়েছে যার কাছে ইলহাম (গায়েবীভাবে খবর) হয়। নিশ্চয়ই বর্তমানে জাফর ইবনে মুহাম্মাদ আমাদের মধ্যকার সেই ব্যক্তি। 

 

বিশ্বনবী (সা.) পবিত্র আহলে বাইতের অন্য অনেক সদস্যের মত ইমাম জাফর সাদিক (আ.)’র মহিমান্বিত জীবনও এটা প্রমাণ করে যে, সমাজের কাছে নিজেকে গ্রহণযোগ্য করার পথ ক্ষমতা দখল, ভয়-ভীতি সৃষ্টি ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়া নয় বরং এর সর্বোত্তম পথ হল নিজের মধ্যে বিদ্যমান গুণাবলীর (জ্ঞান, চরিত্র ও কর্ম) পূর্ণতা দান।

তিনি এ আদর্শ তুলে ধরেছিলেন যে, সমাজের সার্বিক সংস্কারকামী ব্যক্তিকে অবশ্যই তার সব যোগ্যতা ও প্রতিভাকে কাজে লাগিয়ে জ্ঞান অর্জন করতে হবে। ক্ষমতার প্রয়োগের মাধ্যমে নয় বরং নিজের মধ্যে আত্মিক ও ব্যক্তিত্ব গঠনমূলক মূল্যবোধগুলোর বিকাশ ঘটিয়ে সমাজের ওপর (নৈতিকভাবে) প্রভাব বিস্তার করতে হবে। 

 

ইমাম জা’ফর আস সাদিক (আ.)’র কয়েকটি অমূল্য বাণী শুনিয়ে শেষ করব আজকের আলোচনা:

যারা নামাজকে গুরুত্বহীন মনে করবে আমাদের তথা বিশ্বনবী (সা.)’র আহলে বাইতের শাফায়াত তাদের ভাগ্যে জুটবে না।

ইমাম বলেছেন, কোনো বান্দাই পরিপূর্ণভাবে প্রকৃত ঈমানে পৌঁছাতে পারবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে এই তিনটি বৈশিষ্ট্য অর্জিত হবে: পুরোপুরি ধর্মকে বুঝতে পারা, সঠিক পদ্ধতিতে জীবন যাপন করা এবং দুঃখ-কষ্টে ধৈর্য ধারণ করা।

তিনটি বিষয়ের পরিচয় পাওয়া যায় এ তিন ক্ষেত্রে: রাগের মুহূর্তে ধৈর্যের পরিচয়, যুদ্ধের সময় বীরত্বের পরিচয় ও অভাবের সময় ভাইয়ের পরিচয়। # 

 

রেডিও তেহরান/২০