এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla

“তীব্র ব্যথায় ঢেকে ফেলে মুখ দিনের সূর্য অস্তাচলে

ডোবে ইসলাম –রবি এজিদের আঘাতে অতল তিমির তলে,

কলিজা কাঁপায়ে কারবালা মাঠে ওঠে ক্রন্দন লোহু সফেন

ওঠে আসমান জমিনে মাতম ; কাঁদে মানবতা হায় হোসেন” 

 

নিঃসন্দেহে কারবালার মর্ম বিদারী ঘটনা মানব ইতিহাসের দীর্ঘ পরিক্রমায় ঘটে যাওয়া অজস্র ঘটনাবলীর মধ্যে  শিক্ষা ও গুরুত্বের দিক থেকে অনন্য। এটা এমন এক মহা-বিস্ময়কর ঘটনা, যার সামনে মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষ বিশ্বের মহান চিন্তাবিদরা থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হয়েছেন,পরম বিস্ময়ে অভিভূত হয়ে তারা স্তুতি-বন্দনায় মুখরিত হয়েছেন এই নজিরবিহীন আত্মত্যাগের। কারণ, কারবালার কালজয়ী বিপ্লবের মহানায়করা ‘অপমান আমাদের সয় না’ -এই স্লোগান ধ্বনিত করে ন্যায় ও সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য সংখ্যায় হাতে গোনা হওয়া সত্ত্বেও খোদায়ী প্রেম ও শৌর্যে পূর্ণ টগবগে অন্তর নিয়ে জিহাদ ও শাহাদাতের ময়দানে আবির্ভূত হন এবং প্রতারণা ও প্রবঞ্চনার অধঃজগতকে পেছনে ফেলে উর্ধ্বজগতে মহান আল্লাহর সনে পাড়ি জমান। তারা নিজ কথা ও কাজের মাধ্যমে জগতবাসীকে জানিয়ে দিয়ে যান যে,‘‘ যে মৃত্যু সত্যের পথে হয়, তা মধুর চেয়েও সুধাময়।’’

কিংবা কবির ভাষায়: 

                          জীবনের চেয়ে দৃপ্ত মৃত্যু তখনি জানি

                        শহীদী রক্তে হেসে ওঠে যবে জিন্দেগানি।

 

কারবালা ঘটনার একপিঠে রয়েছে পাশবিক নৃশংসতা ও নরপিশাচের কাহিনী এবং এ কাহিনীর হোতা ছিল ইয়াজিদ, ইবনে সা’দ, ইবনে  জিয়াদ  এবং শিমাররা। আর অপর পিঠে ছিল একত্ববাদ, দৃঢ় ঈমান, মানবতা, সাহসিকতা, সহানুভূতি ও সহমর্মিতা এবং সত্য প্রতিষ্ঠায় আত্মদানের কাহিনী। আর এ কাহিনীর হোতা আর ইয়াজিদরা নয়, বরং এ পিঠের নায়ক হলেন শহীদ সম্রাট ইমাম হুসাইন (আ.),তার ভগ্নি হযরত জাইনাব এবং তার ভাই হযরত আব্বাসরা,যাদেরকে নিয়ে বিশ্বমানবতা গৌরব করতে পারে। তাই কারবালা ঘটনার সমস্তটাই ট্রাজেডি বা বিষাদময় নয়।

 

কারবালা বিপ্লবের বহু বিষাদময় ও তিক্ত ঘটনা এবং অসহনীয় যাতনা সয়ে ইমাম হুসাইন (আ)'র বোন ধৈর্যের অবিচল পাহাড়ের মত মনোবল নিয়েই নবী পরিবারের ধৈর্য ও মহান আল্লাহর প্রতি সর্বাবস্থায় সন্তুষ্টির পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে  বলেছিলেন, এইসব ঘটনায় ইমাম শিবিরের দিক থেকে আমি বা আমরা সৌন্দর্য ছাড়া আর কিছুই দেখিনি।

মহান বীর হলো সেই ব্যক্তি  সমস্ত মনুষ্যত্বও মানবতার জন্যে নিজের সাহস প্রয়োগ করে ঠিক যেভাবে সূর্য তার আলো দিয়ে সমস্ত জাতি ও সব মানুষকেই উপকার প্রদান করে।

 

কারবালা বিপ্লবের আরেকটি মহান বৈশিষ্ট্য হল এ বিপ্লব যে অনুষ্ঠিত হবে তা ছিল  মানুষের ধারণাতীত। এ ছিল ঘন অন্ধকারের মধ্যে এক খণ্ড আলোর ঝলকানি, ব্যাপক জুলুম-স্বৈরাচারের মধ্যে ন্যায়পরায়ণতার বজ্র আওয়াজ, চরম স্থবিরতার মধ্যে প্রকাণ্ড ধাক্কায় নিস্তব্ধ নীরবতার মধ্যে হঠাৎ গর্জে ওঠা। ঠিক যেভাবে  নমরুদের মতো একজন অত্যাচারী শোষক পৃথিবীকে গ্রাস করার পর হঠাৎ একজন ইবরাহীমের (আ.) আবির্ভাব ঘটে ও নমরুদের কাল হয়ে দাঁড়ায়।

 

আর আজ স্বৈরাচারী উমাইয়া সরকার স্বীয় স্বার্থসিদ্ধির জন্যে সকল সাজ-সরঞ্জামে সজ্জিত হয়ে উঠে পড়ে লেগেছে। এমন কি ধর্মকে ভাঙ্গিয়েও স্বৈরতন্ত্রের ভিত গাড়তে উদ্যত হয়েছে, দুনিয়ালোভী হাদিস বর্ণনাকারীদেরকে টাকা দিয়ে কিনে তাদের সপক্ষে হাদিস জাল করার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।

 বনি উমাইয়ার কেউ কেউ ইমাম হুসাইনকে (আ.) হত্যা করতে পারার জন্যে শোকর আদায়স্বরূপ একাধিক মসজিদ নির্মাণ করেছিল। মানুষকে কতো জঘন্য মাত্রায় বিভ্রান্ত করা হয়েছিল।

 

এ রকম এক বিপর্যয়ের মুহূর্তে ইমাম হুসাইন (আ.) মুক্তির মশাল জ্বালিয়ে এগিয়ে এলেন। যখন মানুষের বাক স্বাধীনতা কেড়ে নেয়া হয়েছিল, মানুষের মতামত প্রকাশের কোনো সাহস ছিল না। কোনো সত্যি কথা বলাও যখন কারও সাহসে কুলাতো না,এমন কি এর কোনো প্রতিরোধ অবাস্তবে পরিণত হয়-ঠিক সে মুহূর্তে ইমাম হুসাইন (আ.) বীরদর্পে বিরোধিতায় নামলেন, বজ্রকন্ঠে সত্যবাণীর স্লোগান তুলে দুনিয়া কাঁপিয়ে দিলেন। খোদাদ্রোহী স্বৈরাচারীর মেরুদণ্ড গুঁড়িয়ে দিলেন। আর এ কারণেই তার আন্দোলন মহিমা লাভ করেছে। তার আন্দোলন কালের গণ্ডী ছাড়িয়ে যুগ-যুগান্তরের মুক্তিকামী ও সত্যান্বেষী মানুষের জন্যে অনুকরণীয় আদর্শে পরিণত হয়েছে। 

 

তৃতীয় যে বৈশিষ্ট্যটি হুসাইনী আন্দোলনকে মহতী ও পবিত্র করেছে তা হলো ইমাম হুসাইনের (আ.) দূরদর্শিতা ও উন্নত চিন্তাধারা। অর্থাৎ এ আন্দোলন এ কারণেই মহান যে, আন্দোলনকারী যা বুঝতে ও দেখতে পারছেন তা অন্য কেউ দেখতে পাচ্ছে না। ঐ প্রবাদ বাক্যটির মতো বলতে হয় যে,অন্যরা আয়নায় যা দেখতে পাচ্ছে না তিনি খড়কুটোর মধ্যেই তা দেখছেন। তিনি তার একাজের সুদূর প্রসারী ভাব দেখতে পাচ্ছেন। তার চিন্তাধারা ছিল সমসাময়িক যে কানো চিন্তাশীল লোকের ঊর্ধ্বে। 

 

 ইবনে আব্বাস, ইবনে হানাফিয়া,ইবনে উমর প্রমুখ হয়তো পুরোপুরি নিষ্ঠার সাথে ইমামকে (আ.) কারবালায় যেতে নিষেধ করেছিলেন। তাদের চিন্তার মান অনুযায়ী ইমামকে বাধা দেয়াই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু হুসাইন (আ.) যা দেখেছিলেন তারা তা দেখতে পাচ্ছিলেন না। তারা অত্যাসন্ন বিপদকেও যেমন অনুভব করছিলেন না তেমনি এ ধরনের আন্দোলন ও বিদ্রোহের সুদূরপ্রসারী ভাবকেও অনুধাবন করতে পারছিলেন না। কিন্তু ইমাম হুসাইন (আ.) সবকিছুই দিনের আলোর মতো দেখছিলেন। তিনি একাধিকবার বলেছেনঃ ওরা আমাকে হত্যা করবেই;আর আল্লাহর শপথ করে বলছি যে, আমাকে হত্যার পর ওদের অবস্থা বিপন্ন হবে। এ ছিল ইমাম হুসাইনের (আ.) তীক্ষ্ণ দূরদর্শিতা।

 

ইমাম হুসাইন (আ.) এক মহান ও পবিত্র আত্মার নাম। মূলত যখন কোন আত্মা মহান হয় তখন তা বেশী কষ্টের সম্মুখীন হয়। কিন্তু ছোট আত্মা বেশি নির্ঝঞ্জাটে থাকে। এ এক সার্বিক নিয়ম। ইবনে আব্বাসরা যদি ইমাম হুসাইনকে (আ.) বাধাও দেয় তবুও কি তিনি বিরত হতে পারেন! আরবের খ্যাতনামা কবি ‘মোতানাববী’ এ প্রসঙ্গে সুন্দর একটি উক্তি করেছেন, তিনি বলেন :

 

 ‘‘যখন কোনো আত্মা মহান হয় তখন স্বাভাবিকভাবেই সে অন্যদের পরিত্রাণে ছোটে,অন্যদের জন্যে কষ্ট ও যন্ত্রণা বরণ করে নেয়। কিন্তু যার আত্মা ছোট সে কেবল নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য নিয়েই ব্যস্ত থাকে।’’ (দিওয়ানে মোতানাববীঃ ২/২৬৭) ছোট আত্মা একটু ভাল খাবারের জন্যে চাটুকারও হতে রাজি। ছোট আত্মা ক্ষমতা বা খ্যাতির লোভে হত্যা-লুণ্ঠনও করতে রাজি। কিন্তু যার রয়েছে মহান আত্মা, সে শুকনো রুটি খেয়ে তৃপ্ত হয়,তারপর ঐ সামান্য আহার শেষে সারারাত জেগে আল্লাহর স্মরণে নিমগ্ন হয়। নিজের দায়িত্ব পালনে বিন্দুমাত্র গাফলতি করলে ভয়ে তাঁর শরীর কাপতে থাকে। যার আত্মা মহান সে আল্লাহর পথে ও স্বীয় মহান লক্ষ্যে নিজের জীবন বিলিয়ে দিতে চায়। আর এ পথে যখন সফলকাম হয় তখন আল্লাহকে শোকর করে। আত্মা মহান হলে আশুরার দিনে,এক শরীরে তিনশ’ ক্ষত সহ্য করতে হয়। যে শরীর ঘোড়ার পায়ে পিষ্ট হয় সে একটি মহান আত্মার অধিকারী হওয়ার অপরাধেই জরিমানা দেয়, বীরত্ব,সত্য-প্রেম এবং শহীদী আত্মার জন্যই জরিমানা দেয়।

 

ইমাম হুসাইনের মত মহাপুরুষের মহান আত্মা বলে ওঠে: আমি আমার রক্তের মূল্য দিতে চাই। শহীদ সে ব্যক্তি যে নিজ ঈমান ও আকীদা রক্ষায় প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে, যে নিজের জন্যে তো নয়ই বরং মনুষ্যত্ব ও মানবতার স্বার্থে, সত্য ও হাকিকতের স্বার্থে মহান আল্লাহর পথে  চরম দুঃখ-দুর্দশা এমন কি মৃত্যুকেও সাদরে বরণ করে নেয়। শহীদ তার বুকের রক্ত দিতে চায় যেমনভাবে একজন ধনী তার ধনকে ব্যাংক বন্দী না করে তা সৎপথে দান-খয়রাত করে নিজ ধনের মূল্য দিতে চায়। সৎপথে ব্যয়িত প্রতিটি পয়সা যেমন লক্ষ -কোটি পয়সার মতো মূল্য লাভ করে তেমনি শহীদের প্রতি ফোটা রক্ত লক্ষ-কোটি ফোটায় পরিণত হয়।

 

অনেকে হয়তো ধারণা করতে পারে যে, একজন লেখক বা একজন ধনী কিংবা একজন শিল্পীর সেবাই সবচেয়ে বেশী। কিন্তু আসলে এ ধারণা একবারেই ভুল। শহীদদের মতো কেউই মানুষকে তথা মানবতাকে সেবা করতে পারে না। শহীদরাই সমস্ত কণ্টকময় পথ পেরিয়ে মানবতার মুক্তি ও স্বাধীনতাকে বয়ে নিয়ে আসে। তারাই ন্যায়-নীতিবান ও শান্ত সমাজ গড়ে দিয়ে যায় যাতে জ্ঞানীর জ্ঞান, লেখকের কলম, ধনীর ধন, শিল্পীর শিল্প সুস্থ পরিবেশে বিনা বাধায় বিকাশ লাভ করতে পারে এবং মানবতা নিশ্চিন্তে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যেতে পারে। শহীদরাই প্রদীপের মতো একটি পরিবেশকে আলোকিত করে রাখে যাতে সবাই অনায়াসে পথ চলতে পারে।

 

পবিত্র কোরআন রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে একটি প্রদীপের সাথে তুলনা করেছে।

 

আজকে ইবনে সিনা-ইবনে সিনা হতো না, শেখ সাদী-শেখ সাদী হতো না, জাকারিয়া রাজী-জাকারিয়া রাজী হতে পারতো না যদি শহীদরা তাজা রক্ত খরচ করে ইসলামের চারাগাছকে সজীব না করতেন, ইসলামী সভ্যতাকে বাঁচিয়ে না রাখতেন। তাদের সমস্ত অস্তিত্বে একত্ববাদ, খোদাভীতি,ন্যায়পরায়ণতা,সৎসাহস আর বীরত্বে ভরপুর। তাই আমরা আজ যারা মুসলমান হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছি তারা সবাই এ শহীদদের প্রতি ঋণী। ইমাম হোসাইনের (আ.) রক্তের প্রতি নবীজীর (সা.) উম্মত ঋণী।

 

ইমাম হোসাইনের (আ.) প্রতিটি কথায় মনুষ্যত্ব ও মানবতার ইজ্জত সম্মান এবং মর্যাদা প্রতিফলিত হয়েছে। -

অর্থাৎ,‘‘সম্মানের মৃত্যু অপমানের জীবনের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।’’

 

অন্য এক বাণীতে ইমাম হুসাইন বলেছেন : যারা দুনিয়া নিয়ে মত্ত এবং দুনিয়ার দাসত্ব করে তারা আসলে জানে না যে, এসব কিছু‘লুমাযাহ’র মতো। মানুষের দাঁতের ফাঁকে গোস্ত কিংবা বেঁধে যাওয়া খাদ্য টুকরোকেই ‘লুমাযাহ’ বলে।  ইমাম হোসাইনের (আ.) চোখে ইয়াজিদ, ইয়াজিদের হুকুমত, ইয়াজিদের দুনিয়া সবকিছুই ঐ এক টুকরো লুমাযাহর মতো।

 

কারবালার পথে অনেকেই ইমাম হুসাইনকে (আ.) বলেছে যে, এ পথ বিপজ্জনক? আপনি বরং ফিরে যান। ইমাম হুসাইন (আ.) তাদের জবাবে এ কবিতা পড়েনঃ

 ‘‘আমাকে যেতে নিষেধ করছো? কিন্তু আমি অবশ্যই যাবো। আমাকে মৃত্যুর ভয় দেখাও? ... শ্রেষ্ঠতম কাজ অর্থাৎ সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে যে মৃত্যু ঘটে তা অপমানের হতে পারে না! ... কিন্তু জেনে রেখো যে জীবনের জন্যে সবচেয়ে অপমান হলো কেউ বেঁচে থাকবে বটে, কিন্তু লোকে তার কান ধরে উঠাবে আর বসাবে।’’  ‘তোমরা চোখে দেখছো না যে সত্যকে মেনে চলা হচ্ছে না ও বাতিলের বিরুদ্ধেও কেউ কিছু বলছে না?’  ‘‘আমি মৃত্যুকেই আমার জন্যে কল্যাণকর এবং জালেমদের সাথে বেঁচে থাকাকে অপমানজনক ও লজ্জাজনক বলে মনে করি।’’

 

ইমাম হুসাইন (আ)'র শাহাদতের মুহূর্ত যতই ঘনিয়ে আসছিল ততই তাঁর চেহারা আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। ইয়াজিদ বাহিনীর এক ঘাতক সেনা বলেছিল, জীবনের শেষ মুহূর্তে ইমামের চেহারায় প্রশান্তি ও ঔজ্জ্বল্যের দীপ্তি আমাকে অনেকক্ষণ উদাসীন করে রেখেছিল। 

 

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব ও মানব জাতির মুক্তির দিশারী বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন,  হুসাইন আমা থেকে ও আমি হুসাইন থেকে। বিশ্বনবী (সা.) আরো  বলেছেন, তাঁকে মহান আল্লাহ ওহির মাধ্যমে জানিয়েছেন যে শাহাদতের মাধ্যমে হুসাইন (আ.) এমন এক মর্যাদা পাবেন যে তার কাছাকাছি যাওয়া অন্য কারো জন্য সম্ভব হবে না"।মহানবী (সা.) আরো বলেছেন, নিশ্চয়ই প্রত্যেক মুমিনের হৃদয়ে হুসাইনের (আ.) শাহাদতের ব্যাপারে এমন ভালবাসা আছে যে, তার উত্তাপ কখনও প্রশমিত হবে না।" যারা হুসাইনের জন্য কাঁদবে তাদের জন্য জান্নাতের সুসংবাদও দিয়ে গেছেন বিশ্বনবী (সা.)।

 

ইমাম হুসাইনের জন্য সর্বপ্রথম শোকগাথা রচনা করেছিলেন হযরত জাইনাব (সা.)। ইমামের শাহাদত ও  নবী-পরিবারের সদস্যদের তাবুতে আগুন দেয়া এবং শহীদদের লাশের ওপর ঘোড়া দাবড়ানোর ঘটনার পর তিনি বলেছিলেন:

 “ হে মুহাম্মাদ (সা.)! হে মুহাম্মাদ(সা.)! আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা তোমার ওপর দরুদ ও সালাম পাঠায়। আর এই তোমার আদরের হুসাইন, কী ভীষণভাবে লাঞ্ছিত, অবহেলিত, রক্তাপ্লুত খণ্ডিত লাশ হয়ে আছে!  আল্লাহর কাছে নালিশ জানাচ্ছি। হে মুহাম্মাদ (সা.)! তোমার কন্যারা আজ বন্দিনী, তোমার জবাই করা পরিবার আজ অপেক্ষা করছে পূবের হাওয়ার জন্য, কখন ধুলো এসে তাঁদের ঢেকে দেবে!”

 

হযরত জাইনাব (সালামুল্লাহি আলাইহার) মর্মভেদী বিলাপ শত্রু-মিত্র সবাইকে অশ্রু-সজল করে তুলেছিল। হযরত যেইনাব (সা.)’র বিলাপ ও বাগ্মীতাপূর্ণ ভাষণ কাঁপিয়ে তুলেছিল কুফায় ইবনে জিয়াদের দরবার এবং দামেস্কে ইয়াজিদের দরবার। তাঁর ভাষণ জনগণের ঘুমিয়ে পড়া চেতনায় বিদ্যুতের প্রবাহ ছড়িয়ে দেয়। ফলে ভীত-সন্ত্রস্ত ইয়াজিদ নবী-(সা.)’র পরিবারকে মুক্তি দেয়ার নির্দেশ দেয়।

 

নীল সিয়া আসমান লালে লাল দুনিয়া -

আম্মা লাল তেরি খুন কিয়া খুনিয়া,

কাঁদে কোন ক্রন্দসী কারবালা ফোরাতে?

সে কাঁদনে আঁসু আনে সিমারেরও ছোরাতে।

রুদ্র মাতম ওঠে দুনিয়া দামেস্কে -

জয়নালে পরালো এ খুনিয়ারা বেশ কে ?

হায় হায় হোসেনা ওঠে রোল ঝঞ্ঝায়,

তলোয়ার কেঁপে ওঠে এজিদের পঞ্জায়

উন্মাদ দুল দুল ছুটে ফেরে মদিনায়

আলীজাদা হোসেনের

দেখা হেথা যদি পায়।

মা ফাতিমা আসমানে কাঁদি খুলি

কেশপাশ

বেটাদের লাশ নিয়ে বধূদের

শ্বেতবাস

রণে যায় কাসিম ঐ দু'ঘড়ির নওশা

মেহেদির রঙটুকু মুছে গেল সহসা !

‘হায় হায়’ কাঁদে বায় পূরবী ও দখিনা----

‘কঙ্কণ পঁইচি খুলে ফেল সকীনা !’

কাঁদে কে রে কোলে ক’রে কাসিমের কাটা-শির ?

খান্ খান্ হয়ে ক্ষরে বুক-ফাটা নীর !

কেঁদে গেছে থামি’ হেথা মৃত্যু ও রুদ্র,

বিশ্বের ব্যথা যেন বালিকা এ ক্ষুদ্র !

গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে কচি মেয়ে ফাতিমা,

“আম্মা গো পানি দাও ফেটে গেল ছাতি মা !”

নিয়ে তৃষা সাহারার, দুনিয়ার হাহাকার,

কারবালা-প্রান্তরে কাঁদে বাছা আহা কার !

দুই হাত কাটা তবু শের-নর আব্বাস,

পানি আনে মুখে, হাঁকে দুশ্ মনও ‘সাব্বাস্’ !

দ্রিম্ দ্রিম্ বাজে ঘন দুন্দুভি দামামা,

হাঁকে বীর “শির দেগা, নেহি দেগা আমামা ! #

 

রেডিও তেহরান

 

 

 

মহান আল্লাহর অশেষ প্রশংসা করছি যিনি আমাদের  কালজয়ী কারবালা বিপ্লবের মহান তাসুয়াকে স্মরণ করার তৌফিক দিয়েছেন। একইসঙ্গে অশেষ দরুদ পেশ করছি বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত এবং বিশেষ করে কারবালার মহান শহীদদের শানে।

 

আজ মহান তাসুয়া বা আশুরার পূর্ব দিন। ১৩৭৬ বছর আগে এই দিনে অর্থাৎ ৬১ হিজরির নয়ই মহররম কুফায় ইয়াজিদের নিযুক্ত কুখ্যাত গভর্নর ইবনে জিয়াদ  ইমাম হুসাইন (আ.)’র ছোট্ট শিবিরের ওপর অবরোধ জোরদারের ও হামলার নির্দেশ দেয়। এর আগেই আরোপ করা হয়েছিল অমানবিক পানি-অবরোধ। পশু-পাখী ও অন্য সবার জন্য ফোরাতের পানি ব্যবহার বৈধ হলেও এ অবরোধের কারণে কেবল নবী-পরিবারের জন্য নিষিদ্ধ করা হয় এই নদীর পানি।ইয়াজিদ বাহিনীর সেনা সংখ্যাও ক্রমেই বাড়তে থাকে এবং দশই মহররমের দিনে তা প্রায় বিশ বা ত্রিশ হাজারে উন্নীত হয়।

 

ইমাম হুসাইন (আ.) নয়ই মহররমের বিকালের দিকে এক দিনের জন্য যুদ্ধ পিছিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেন যাতে দশই মহররমের রাতটি শেষবারের মত ইবাদত বন্দেগিতে কাটানো যায়। ইয়াজিদ বাহিনীর প্রধান প্রথমে রাজি না হলেও পরে এ প্রস্তাবে রাজি হয়। বিকালেই হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) নিজ সঙ্গীদের উদ্দেশ্যে বক্তৃতা দেন। সঙ্গীরা আবারও তাঁর প্রতি আনুগত্যের অঙ্গীকার করেন।

 

নয়ই মহররম কালজয়ী কারবালা বিপ্লবের চূড়ান্ত প্রস্তুতি ও পরিণতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার দিন। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার প্রস্তুতি অর্জনের সর্বশেষ দিন। এই পরীক্ষায় সফল হয়েছিলেন  ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর প্রায় ১০০ জন সহযোগী। আর এ জন্যই তাঁরা  ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করেছেন।

 

কারবালা বিপ্লব মানব সভ্যতা ও ইতিহাসের এক অনন্য বিপ্লব। এ বিপ্লবে একদিকে যেমন ফুটে উঠেছে মানুষের শ্রেষ্ঠ কিছু গুণের সর্বোত্তম প্রকাশ এবং বীরত্ব ও ন্যায়নীতির পরিপূর্ণ সৌন্দর্য, তেমনি অন্যদিকে ফুটে উঠেছে শয়তান ও পশু-শক্তির দানবিকতা আর পাশবিকতার চরম প্রকাশ। একদিকে ফুটে উঠেছে খোদা-প্রেমের চরম প্রকাশ আর অন্য দিকে কুপ্রবৃত্তির দাসত্ব তথা অধঃপতন আর বিবেকহীনতার সর্বগ্রাসী সয়লাবের নিদর্শন।

 

কারবালার কালজয়ী মহা-বিপ্লব নানা শিক্ষার এক বিশাল সূতিকাগার ও মানুষ হিসেবে তথা খোদার প্রতিনিধি বা শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি  (আশরাফুল মাখলুকাত) হিসেবে নিজেকে পরিপূর্ণভাবে বিকশিত করার শিক্ষা লাভের এক অনন্য বিশ্ববিদ্যালয়।

 

খোদাপ্রেম, ইমামের আনুগত্য, আন্তরিকতা, মানবতা, নৈতিকতা, সাম্য ও ভ্রাতৃত্ব, সৎ-কাজের আদেশ, অসৎ কাজে নিষেধ, আত্মত্যাগ,মুক্তিকামীতা, দায়িত্বশীলতা, আল্লাহর ওপর নির্ভরতা, সময়োচিত পদক্ষেপ বা সুযোগের সর্বোত্তম ব্যবহারের মত বিষয়গুলো কারবালার কালজয়ী বিপ্লবে প্রবাদতুল্য আদর্শ বা শিক্ষা হিসেবে ফুটে উঠেছে।

 

সুখে ও দুঃখে সব সময় মহান আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট থাকা কারবালা বিপ্লবের মহানায়কদের রেখে যাওয়া একটি বড় শিক্ষা।  ইমাম হুসাইন (আ) জীবনের শেষ রাত্রে স্মরণ করলেন সেই সময়ের কথা যখন মুসলিম বিশ্বে তিনি ও তাঁর ভাই হাসান (আ) ছিলেন সবচেয়ে জনপ্রিয় ও সবার আদরের শিশু।

 

ধর্মে ও জিহাদে যে জোর-জবরদস্তি নেই তাও ইমাম শিখিয়ে গেছেন কারবালায়।

 

আজ আশুরার পূর্ব রাত। যেন মহাপ্রলয়ের পূর্ব রাত। কারবালা প্রান্তরের বাতাসেও আজ শোকের পূর্বাভাস। বোবা পশুরাও টের পেয়ে গেছে তাদের মধ্যেও অস্বাভাবিক অস্থিরতা। আজ আকাশের তারাগুলোর কোন ঝিকিমিকি নেই, নিস্প্রভ। তাদের মধ্যেও মেঘের আড়ালে লুকাবার প্রচেষ্টা । ফোরাত নদীর পানির প্রবাহ আজ বারবার থমকে দাড়াচ্ছে । বোবা পরিবেশ আর পশুগুলোর বুক ফাটা আর্তনাদে কি যেন বলতে চাইছে । কিন্তু হায়! আমরা তাদের ভাষা বুঝি না। শুধু বাতাসের দীর্ঘশ্বাস আমাদের কানে এসে বাজছে । হ্যাঁ , আগামীকাল রাসুলের কলিজার টুকরো খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমার নয়নমনি ইমাম হোসেন ( আ. ) শহীদ হবেন । নবীজী যে গলদেশে চুম্বন করেছেন সেখানে ছুরি চালানো হবে; যে দেহে তিনি তার অসংখ্য পবিত্র চুম্বনের পরশ বুলিয়েছেন সেই মোবারক দেহের উপর দিয়ে দশটি ঘোড়া দাবড়ানো হবে। হায় কারবালা! হায় হোসেন!

 

আগামীকাল সারা বিশ্ব শোকে দুলে উঠবে। স্বয়ং রাসুল এই শোকের স্বত্বাধিকারী। সাত আসমানের ফেরেশতারাও শোকের পোষাক পড়েছেন। ইমাম হোসেন (আ.) এর বোন জয়নাবের কান্নায় ফেরেশতাদের অশ্রুর বাঁধ ভেঙে গেছে। তাদের ব্যাথা ভরা আহাজারীতে খোদার আরশ আজ কেঁপে উঠেছে। খাতুনে জান্নাত হযরত ফাতেমাও অশ্রু সজল চোখে শরীক হয়েছেন এ মাতমে। কারবালার উষর প্রান্তরে নবী পরিবারের সদস্যদেরকে এজিদের সৈন্যরা পরিবেষ্টন করে রাখার নয় দিন অতিক্রান্ত হয়েছে। এ নয় দিন ইমাম হোসেন (আ.) এজিদের বাহিনীকে উদ্দেশ্য করে বহু নসিহত করেন। তারা যে জঘণ্য পাপ করতে উদ্যত হয়েছে তিনি সে সম্পর্কে তাদেরকে বুঝানোর চেষ্টা করেন। এজিদ নিযুক্ত কুফার শাসনকর্তা উবাইদুল্লাহ বিন জিয়াদ ক্রমেই শঙ্কিত হয়ে ওঠে। সে ওমর ইবনে সাদের নেতৃত্বে কারবালায় হাজার হাজার সৈন্য প্রেরণ করতে থাকে। এই সৈন্য সংখ্যা অচিরেই বিশ হাজার ছাড়িয়ে যায়। ইমাম হোসেন (আ.) তারপরও হাল ছাড়েন না। তার অন্তর যে দয়ায় আপ্লুত। তিনি যে বিশ্ববাসীর জন্য রহমত, নবীজীর দৌহিত্র তার দেহে প্রকৃত বীর হযরত আলীর রক্ত প্রবাহিত।

 

তিনি শেষ মুহূর্তে তৃষ্ণার্ত অবস্থায় শত্রু সেনাদেরকে উদ্দেশ্য করে বললেন, "তোমরা কি আমাকে চেন না? তোমরা কি জাননা যে আমার নানা ছিলেন রাসুলে খোদা (সা.)? তোমরা কি জান আমার পিতা আলী বিন আবু তালিব? তোমরা কি জাননা আমার মা হযরত ফাতেমা জাহরা (সা.) হলেন মোহাম্মদ মোস্তফা (সা.) এর কন্যা? তোমরা কি জান আমার নানী ছিলেন ইসলাম গ্রহণকরী প্রথম মহিলা হযরত খাদিজা (রা.)? তোমরা কি জান না যে সাইয়্যেদুস শোহাদা হযরত হামজা (রা.) ছিলেন আমার পিতার চাচা? তোমরা কি জান না হযরত জাফর তাইয়াব (রা.) ছিলেন আমার চাচা? তোমরা কি জানো রাসুলেখোদার পবিত্র তরবারী আমার হাতে রয়েছে? তোমরা কি জান আমার মাথার এ পাগড়িটি মহানবী (সা.) এর। তোমাদের কি জানা নেই আমার পিতা হযরত আলী (আ.) প্রথম ব্যাক্তি যিনি ইসলাম গ্রহণ করেছেন এবং জ্ঞান ও ধৈর্যের ক্ষেত্রে অতুলনীয়? আমার রক্ত তোমরা কি করে হালাল মনে করেছো, অথচ আমার বাবা হাউজে কাউসারের পানি পান করাবেন। কিয়ামতের দিন হামদের পতাকা তারই হাতে থাকবে।"

 

পাপে যখন মানুষের অন্তর সম্পূর্ণ কলুষিত হয়ে যায় তখন কোন নূরই তাদেরকে হেদায়েত করতে পারে না। ইমাম হোসেন (আ.) এর এই বলিষ্ঠ ও আবেগময়ী ভাষণেও এজিদের বিভ্রান্ত সৈনিকদের মনে কোন পরিবর্তন এলো না। ইবনে জিয়াদ যুদ্ধ শুরুর জন্য তার সেনাপতি ইবনে সাদকে চরম পত্র দিল। হয় আমিরুল মোমেনিন হিসেবে এজিদের আনুগত্য স্বীকার করতে হবে নতুবা মৃত্যু। এছাড়া আর কোন পথ ইমামের সামনে খোলা রইল না। ইমাম এজিদের আনুগত্যের পরিবর্তে আল্লাহর আনুগত্যকেই বেছে নিলেন। কারণ তিনি নিজেই দোয়া করতেন, "হে আল্লাহ! যতদিন পর্যন্ত আমি তোমার আনুগত্য করি অনুসরণ করি, ততদিন আমার হায়াত বাড়িয়ে দিও। আর যদি তা শয়তানের চারণভূমিতে পরিণত হয় তাহলে আমাকে তোমার কাছে তুলে নিও।"

 

ইমাম হুসাইন (আ.)’র জীবনের সবচেয়ে বড় আকাঙ্ক্ষা ছিল শাহাদত। কারণ, রাসুলে খোদা স্বয়ং বলেছেন, শাহাদাত হচ্ছে সবচেয়ে বড় পুণ্য। মনে পড়ে গেল তাঁর মহান পিতার শাহাদতের সময়কার কথাটি, সেটি হলো, কাবার প্রভুর কসম আমি সফল হয়েছি। তিনি বলেছিলেন খোদার কসম, অনাকাঙ্ক্ষিত কিছুই ঘটেনি। মনে পড়ে গেল  নানাজী রাসূল (সা.)’র কথা। তিনি আধ্যাত্মিক জগতে তাঁর উচ্চ মর্যাদার সুসংবাদ তাঁকে দিয়েছিলেন।

 

এসব ভাবতে ভাবতে তাঁর ক্লান্ত অবসন্ন চোখে তন্দ্রা চলে এলো। স্বপ্নে দেখলেন নানাজান রাসুলে খোদাকে, পিতা হযরত আলীকে, স্নেহময়ী মা ফাতিমাকে, আর ভাই ইমাম হাসানকে (তাদের সবার ওপর মহান আল্লাহর অশেষ রহমত ও দরুদ বর্ষিত হোক)। তাঁরা বললেন, হে হুসাইন! তুমি আগামীকালই আমাদের সাথে মিলিত হবে। এর পরপরই তার তন্দ্রা ভেঙ্গে গেল। ইমাম তাঁর বোন বিবি যেইনাবকে স্বপ্নের কথা খুলে বললেন। ভাইয়ের নিশ্চিত শাহাদাতের কথা শুনে বোনের মন কি আর মানে? যেইনাব (সা.) চিৎকার করে কেঁদে উঠলেন। ইমাম তাঁকে সান্ত্বনা দিলেন।

 

ইমাম  (আ.) পরদিনের মহাকুরবানির জন্য প্রস্তুত হলেন। এই কুরবানি হবে সম্পূর্ণ নিষ্কলুষ ও আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। এতে তিল পরিমাণ খাঁদ থাকতে পারবে না। কারণ, আগামীকাল যারা আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হবেন তাঁদের প্রতিটি রক্ত বিন্দু শত সহস্র রক্ত বিন্দুতে নয় বরং লক্ষ-কোটি রক্ত বিন্দুতে পরিণত হয়ে সমাজ-দেহে সঞ্চালিত হবে। শহীদের খুন রক্তশূন্যতায় আক্রান্ত সমাজ-দেহে নতুন রক্ত প্রবাহ দান করে। তাঁদের ব্যক্তিত্ব ও স্মৃতি যুগযুগ ধরে মানুষকে মুক্তির প্রেরণা যোগায়। তাদেরকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর সাহস ও চেতনা দান করে। শহীদরা কিয়ামত পর্যন্ত অমর থাকবেন এবং শেষ বিচারের দিন আল্লাহ তাঁদেরকে এমন জৌলুসসহ হাজির করবেন যে স্বর্গীয় বাহনে উপবিষ্ট নবী-রাসূলরাও তাঁদেরকে সম্মান দেখানোর জন্য নীচে অবতরণ করবেন।

 

তাই ইমাম তাঁর কাফেলার মধ্যে যাদের নিয়্যতে বিন্দু পরিমাণ গোলমাল আছে তাদের কাছ থেকে মুক্ত হতে চাইলেন। তিনি সবাইকে একস্থানে সমবেত করলেন এবং শাহাদাতের ইতিহাসে সবচেয়ে স্মরণীয় ভাষণ দিলেন। তিনি মহান আল্লাহর প্রশংসা করে বললেন, "আমি আমার সঙ্গী সাথীদের চেয়ে কোন সাথীকে বেশি নেককার এবং আমার আহলে বাইতের চেয়ে কোন পরিবারকে বেশি উত্তম মনে করি না। মহান আল্লাহ তোমাদের সবাইকে উত্তম প্রতিদান দিন।"

 

ভয়াবহ আশুরার পূর্বাভাস নিয়ে ঘনিয়ে এলো অন্ধকার। ধৈর্য্যের মূর্ত প্রতীক ইমাম হুসাইন (আ.) সকলকে কাছে ডাকলেন। বললেন, "ভায়েরা আমার! জেনে রাখো আজকের এই রাত হবে তোমাদের শেষ রাত। আমার সাথে থাকলে তোমরা কেউ রেহাই পাবে না। আগামীকালই আমাকে ও আমার পরিবার পরিজনকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হবে। এমনকি আমার দুধের বাচ্চাকেও এরা রেহাই দেবে না। ভাইসব, তোমরা ইচ্ছে করলে চলে যেতে পারো। আমার হাতে তোমরা যে বায়াত করেছো, তা আমি ফিরিয়ে নিলাম। তোমরা এখন মুক্ত। আমার জন্যে শুধু শুধু তোমরা কেন প্রাণ দেবে? শত্রুরা শুধু আমাকে চায়, তোমাদেরকে নয়। এখন অন্ধকার রাত। যার ইচ্ছা চলে যাও, কেউ দেখতে পাবে না।"

 

ইমাম ভাষণ শেষ করে তাঁর ভাই আব্বাসকে প্রদীপ নিভিয়ে দিতে বললেন। যখন অন্ধকার হয়ে এলো তখন ইমামের সাথে আসা অনেক লোক সঙ্গোপনে ইমাম বাহিনী ত্যাগ করে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে গেল। এদের সবাই পার্থিব লাভের আশায় মক্কা থেকে ইমামের সাথে যোগ দিয়েছিল। যখন আলো জালানো হল তখন দেখা গেল মুষ্টিমেয় কিছু লোক মাত্র রয়ে গেছেন। এদের সংখ্যা একশো জনেরও কম।

 

আত্মত্যাগের আদর্শে বলীয়ান বিশুদ্ধ অন্তরের এই মর্দে মুমিনদের দিকে তাকিয়ে ইমামের প্রশান্ত মুখটা উজ্জ্বল দীপ্তিমান হয়ে উঠল। মহাকালের মহাত্যাগের জন্যে এরকম বিশুদ্ধ হৃদয়গুলোই তাঁর প্রয়োজন ছিল। তবুও তিনি তাঁর সাথীদের জিজ্ঞেস করলেন, "তোমরা কেন গেলে না?" এ প্রশ্ন শুনে আহলে বাইতের সদস্যরা বলে উঠলেন, "একি বলছেন হযরত! আমরা আপনাকে একা ফেলে কিভাবে চলে যাব? লোকের কাছে গিয়ে কীভাবে মুখ দেখাব? আমরা কি বলব মহানবী (সা.) এর সন্তানকে আমরা একা ফেলে চলে এসেছি। তা কখনো হবে না। নিজের জীবন দিয়ে দেব তবুও আপনাকে ছেড়ে যাব না। আপনার সাথে থেকে শহীদ হব।"

 

বীরত্ব ও সাহসিকতার অনন্য পরাকাষ্ঠা ইমাম হোসাইন ( আ ) এর ভাই আব্বাস সবার আগে এগিয়ে এসে বললেন , 'আমরা তোমাকে একা রেখে নিজ নিজ শহরে ফিরে যাবো-এরকম কোনো দিন যেন না আসে ৷'

  মুসলিম বিন আউসাজা দাঁড়িয়ে বললেন, "প্রিয় ইমাম একি বলছেন আপনি! আপনাকে দুশমনদের হাতে ফেলে রেখে পালিয়ে যাব? খোদা আপনার পরে যেন আমাদের জীবিত না রাখেন। আমরা যুদ্ধ করব। গায়ে শক্তি থাকা পর্যন্ত দুশমনের গায়ে তলোয়ার চালাব, বর্শা চালব। ওগুলো ভেঙে গেলে পাথর মেরে মেরে যুদ্ধ করব।"

 

সাঈদ বিন আবদুল্লাহ হানাফী বললেন, প্রিয় ইমাম ! খোদার কসম আপনাকে রেখে আমরা কোথাও যাবো না। আপনার জন্যে যদি নিহত হই এবং জীবন্ত দগ্ধ হই এবং তা যদি ৭০ বারও হয় তবুও আমি আপনাকে ছেড়ে যাব না। আপনি মরে যাবেন আর আমরা বেচে থাকব এ কি করে হয়? যুহাইর ইবনে কাইন উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, হে মহানবীর প্রিয় সন্তান, খোদার শপথ, আপনি ও আপনার পরিবারকে রক্ষার জন্যে ইচ্ছে করে একবার মরে আবার জীবিত হই,  আবার মরে আবার জীবিত হই-এভাবে হাজারবার মরে বেঁচেও চাই নবীজীর খান্দান এবং এই যুবকদের জীবন সকল প্রকার বালা-মুসিবত্‍ থেকে রক্ষা পাক ৷'

 

ইমাম হাসানের ইয়াতিম পুত্র  তেরো বছরের সুদর্শন কাসেম (আ)ইমামের পাশে চীত্কার করে বললেন, চাচাজান ! আমিও কি এই যুদ্ধক্ষেত্রে মারা যাবো ? ইমাম তাঁর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, মৃত্যুকে তুমি কীভাবে চিন্তা করো ? কাসেম বললেন, 'চাচাজান! আল্লাহর দ্বীনের সহযোগিতা করতে গিয়ে এবং জুলুম-অত্যাচার দূর করতে গিয়ে যেই মৃত্যু ঘটে তাকে আমি মধুর চেয়েওমিষ্টি বলে মনে করি ৷'   ইমাম এবার দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন ,হ্যাঁ , ভাতিজা আমার,তুমিও শহীদ হবে ৷ একথা শুনে এই কিশোর তখনই অস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত হতে লাগলেন ৷ আর ইমাম হোসাইন ( আ ) চাঁদের রূপালি জ্যোত্স্নায় তাঁর সঙ্গী-সাথীদের জন্যে দোয়া করলেন ৷ অবজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টিতে তিনি শত্রুদের শিবিরগুলোর দিকে তাকিয়ে পবিত্র কোরআনের সূরা আল-ইমরানের ১৭৮ এবং ১৭৯ নম্বর আয়াত দুটি তিলাওয়াত করলেনঃ ‘কাফেররা যেন এই চিন্তা না করে যে,তাদের আমরা যে অবকাশ দিয়েছি তা তাদের মঙ্গলের জন্যে ৷ আমরা তাদেরকে অবকাশ দেই এইজন্যে যে,যাতে তারা তাদের গুনাহের পরিমাণ আরো বাড়িয়ে তোলে,তাদের জন্যে রয়েছে লাঞ্ছনাদায়ক শাস্তি ৷ এটা সম্ভব নয় যে , আল্লাহ মুমিনদেরকে তাদের অবস্থার মধ্যে ফেলে রাখবেন, তবে যে পর্যন্ত না ভালো থেকে মন্দ আলাদা হয়।    

সঙ্গী-সাথীদের এরকম দৃঢ়তা দেখে ইমামের চেহারা মুবারক এক অভূতপূর্ব প্রফুল্লতায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। তিনি মহান আল্লাহকে ধন্যবাদ জানালেন। ইমাম হুসাইন (আ.)’র ভাষণের পর সবাই ছত্রভঙ্গ হয়ে মশগুল হলেন ইবাদতে। কেউ সিজদায়, কেউ নামাজে, কেউ মুনাজাতে। কারবালার প্রান্তর সিক্ত হয়ে উঠল বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শহীদদের অশ্রুতে। দুনিয়ার সব ফেরেশতা যোগ দিলেন তাদের এই প্রার্থনায়।#

 

রেডিও তেহরান

 

 

 

 

 

 

মহান আল্লাহর অশেষ প্রশংসা করছি যিনি আমাদের  কালজয়ী কারবালা বিপ্লবের মহান আশুরাকে স্মরণ করার তৌফিক দিয়েছেন। একইসঙ্গে অশেষ দরুদ পেশ করছি বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত এবং বিশেষ করে কারবালার মহান শহীদদের শানে। 

 

মহাপুরুষ, মহাসত্য, মহা-সুন্দর, মহাবীর –এইসব এমনই কিছু বিশেষণ যা স্থান-কাল-পাত্র ও মানুষের সাধারণ জ্ঞানের সীমানা ছাড়িয়ে প্রায় ক্ষেত্রেই হয়ে পড়ে বর্ণনাতীত এবং ধারণাতীত। ‘আকাশের উদারতা’ ও ‘স্বর্গীয় মহত্ত্ব’ বলে মানুষ যা কিছু বলতে চায় এইসব বিষয়ে- তাও  এসবের আসল পরিচয় পুরোপুরি তুলে ধরতে অক্ষম। 

মহা-সুন্দরের নানা দিক দেখে কবিরা হয়তো বলে ওঠেন: সুন্দর তুমি কতরূপে কতভাবে প্রকাশিছ আপনারে! 

 হযরত ইমাম হুসাইন (আ) ও আশুরার মহা-বিপ্লবও মহাকালের পাখায় চির-দেদীপ্যমান এমনই এক বিষয়। আপনি যতই বাক্যবাগীশ বা উঁচু মানের গবেষক কিংবা বিশ্লেষক হন না কেন কারবালার মহাবিপ্লব এবং এর রূপকার ও তাঁর অমর সঙ্গীদের মহত্ত্ব আর গুণ-কীর্তন পুরোপুরি তুলে ধরতে পারবেন না কখনও। তাই যুগের পর যুগ ধরে তাঁদের গুণ আর অশেষ অবদানের নানা দিক নিত্য-নতুনরূপে অশেষ সৌন্দর্যের আলো হয়ে চিরকাল প্রকাশিত হতেই থাকবে। কবির ভাষায়: যতদিন এ দুনিয়া রবে, চাঁদ সুরুজ আকাশে বইবে, তোমাদের নামের বাঁশী বাজিতে রইবে ভবে। 

 

 শহীদ সম্রাট ইমাম হুসাইন (আ)’র মত এক অত্যুজ্জ্বল নক্ষত্রের অনুগত ও ন্যায়নিষ্ঠ সঙ্গী হওয়ার মত গৌরবময় আলোক-স্পর্শ যারা পেয়েছিলেন তারাও ইসলাম এবং মানবতার ইতিহাসে উজ্জ্বল হীরক-খণ্ডের মতই অমর হয়ে আছেন। মুষ্টিমেয় সেইসব সঙ্গীদের মর্যাদা তুলে ধরতে গিয়ে স্বয়ং ইমাম বলেছিলেন সেই ঐতিহাসিক উক্তি:

 

‘‘আমি পৃথিবীতে তোমাদের চেয়ে বিশ্বস্ত ও উত্তম কোনো সহযোগীর সন্ধান পাইনি।’’ (দ্রঃ তারিখে তাবারীঃ ৬/২৩৮-৯,তারিখে কামেলঃ ৪/২৪,)

পবিত্র কুরআনে বলা হচ্ছেঃ

 

 ‘‘কত নবী যুদ্ধ করেছেন, তাদের সাথে বহু আল্লাহ-ওয়ালা ছিল। আল্লাহর পথে তাদের যে বিপর্যয় ঘটেছিল তাতে তারা হীনবল হয়নি ও নতি স্বীকার করেনি। আল্লাহ ধৈর্যশীলদেরকে পছন্দ করেন।’’ (আল ইমরানঃ ১৪৬)

 

অথচ ইমাম হুসাইন (আ.) প্রকারান্তরে তার সহযোগীদেরকে আম্বিয়া কেরামের এ সকল সহযোগীদের চেয়েও মর্যাদাসম্পন্ন বলে ঘোষণা দিয়েছেন।

ইমামের সঙ্গে কয়েক মাস পর্যন্ত ছিল কয়েক হাজার সঙ্গী। তাদের অনেকেই খুব ভাল প্রকৃতির মানুষও ছিলেন। তবে এদের বেশিরভাগই শেষ মুহূর্তে তাদের ইমাম তথা নেতাকে পরিত্যাগ করেন যদিও এ সময় ইমামের প্রতি তাদের সাহায্য ছিল জরুরি। যারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ইমামের পাশে থেকেছেন তারা কেন সুযোগ পেয়েও ইমামকে ত্যাগ করেননি?

 আসলে এরা ছিলেন ঈমানের কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার যোগ্য ব্যক্তিত্ব। ইমামের প্রতি তাদের মধ্যে গভীর ভালবাসা ছিল কিংবা গভীর ইমাম-প্রেমের একটা পটভূমি তাদের হৃদয়ে তৈরি হয়েই ছিল। তাই মহান আল্লাহর পরিচালিত আত্মত্যাগের নানা কঠিন পরীক্ষায় তারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অবিচল থাকেন। তারা দুর্বল ঈমানদারদের চিন্তার বিপরীতে  বিপদের কঠিন পাহাড় ও অনিবার্য মৃত্যু দেখেও একজন শ্রেষ্ঠ ও পরিপূর্ণ মানুষের পৌরুষোচিত সংগ্রামে অংশগ্রহণের গৌরব হাতছাড়া করতে চাননি। খোদা-প্রেমের ক্ষেত্রে একনিষ্ঠতাই তাদেরকে শেষ পর্যন্ত মহান সংগ্রামের পথে অবিচল রেখেছে। ইসলাম ও এর কর্ণধার ইমামের প্রতি তাদের ভালবাসা ছিল কিংবদন্তীতুল্য।

 

দৃষ্টান্ত হিসেবে ইমামের আহলে বাইত তথা নবী-পরিবারের সদস্যদের কথা বাদ দিয়েও স্মরণ করা যায়  ইমাম-প্রেমিক আমর ইবনে জুনাদে, হাবিব মাজাহের, সাইদ, আসলান এবং আবেস ও সওজাবদের কথা। নবীজির আহলে বাইতের প্রতি গভীর ভালবাসায় তাঁরা যেন ছিলেন আত্মহারা। তাই সে সময় শত্রুদেরকে হতভম্ব-করা তাদের অসীম সাহস, প্রজ্ঞা,বুদ্ধি ও মহাত্যাগের মনোভাব ইতিহাসে হয়ে আছে অমর।   

 

 ইমাম-প্রেমিক আবেস ছিলেন একজন খ্যাতনামা পাহলোয়ান। সওজাব ছিলেন তার অতি ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ইমাম ও নিজের পরিবারের পর এতো ঘনিষ্ঠ আর কেউই ছিল না তাঁর। কে আগে ইমামের জন্য প্রাণ বিলিয়ে দিতে যাবে এ নিয়ে যখন ইমামের সঙ্গীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা তখন এমন বীর পাহলোয়ান  যুদ্ধে যাওয়ার ক্ষেত্রে আগে বন্ধু সওজাবকে  রণাঙ্গনে যেতে বললেন। সওজাব এর কারণ জিজ্ঞেস করলে তিনি জানান যে, আমি তোমার মৃত্যু আগে দেখতে চাই এ কারণে যে ইমাম তার অতি প্রিয়জনদের হারানোর সময় যে বেদনা অনুভব করেছেন সেই বেদনার খানিকটা আমিও অনুভব করতে চাই।

 

বন্ধুর শাহাদতের পর যখন তার নিজের পালা এলো তখন আবেসকে দেখে তার সঙ্গে মল্ল যুদ্ধে  অংশ নিতে ইয়াজিদ বাহিনীর কেউই ভয়ে অগ্রসর হচ্ছিল না। আবেস শত্রুদের সাহসহীনতা দেখে ক্রুদ্ধ হলেন। তিনি নেমে এলেন ঘোড়া থেকে। বললেন, এবার আস। কিন্তু কেউ সাহস করলো না। এরপর আবেস তরবারিও ছুঁড়ে ফেলে দেন। তবুও কেউ এলো না তার সঙ্গে লড়াই করতে।  এরপর আবেস গায়ের বর্ম খুলে খালি গায়ে অগ্রসর হয়ে বললেন: এবার আস, আমাকে হত্যা কর! তার হাতে রইল শুধু একটি বর্শা! তবুও ভীর কাপুরুষ ইয়াজিদ সেনারা তখনও এগুনোর সাহস করলো না তাঁর দিকে।  এ সময় ইয়াজিদ বাহিনীর সেনারা বলছিল: আবেস তুমি পাগল হয়ে গেছ!  আবেস বলছিলেন: আমি পাগল আমি  হুসাইনের পাগল!  

 

আমর ইবনে জুনাদ নামের আরেক ইমাম প্রেমিক অনুমতি চান যুদ্ধের জন্য। ইমাম হুসাইন (আ) বললেন, তোমার বাবা কিছুক্ষণ আগে শহীদ হয়েছেন। তাই তুমি যুদ্ধে যেও না, তোমার মায়ের সেবার জন্য বেঁচে থাক। অনুমতি পাওয়ার জন্য ব্যাকুল  জুনাদ কেঁদে কেঁদে বললেন, আমার মা-ই আমাকে পাঠিয়েছেন এবং তিনি চান যে আমি আপনার জন্য এখানেই শহীদ হই, তিনি কিছুতেই আমাকে ফিরতে দেবেন না। কেমন ইমাম-প্রেমিক ছিলেন এই মা?  মল্ল যুদ্ধের সময় জুনাদ আবৃত্তি করছিল স্বরচিত সেই বিখ্যাত কবিতা: ‘আমার নেতা হুসাইন (আ), কতো উত্তম নেতা! হৃদয়ে আনন্দের মাধ্যম। তিনি পুরস্কারের সুসংবাদদাতা ও খোদায়ী শাস্তির ভীতি প্রদর্শনকারী। হযরত আলী (আ) ও ফাতিমা সালামুল্লাহি আলাইহা তাঁর বাবা ও মা। হুসাইনের সঙ্গে তুলনা করার মতো কেউ কি আছে?  যেন মধ্যাহ্নের উজ্জ্বল সূর্যের মত তাঁর চেহারা ....’

 

আসলান নামের এক কৃষ্ণকায় ব্যক্তি ছিলেন ইমামের সেবক। তিনি যুদ্ধে যাওয়ার অনুমতি আদায় করে ছাড়েন তাঁর প্রাণপ্রিয় নেতার কাছ থেকে। বীরের মত লড়াইয়ের পর আসলান ইয়াজিদ বাহিনীর আঘাতে ধরাশায়ী হলে ইমাম নিজে এসে তাঁর গালে নিজের মুখ রাখেন স্লেহভরে। এ সময় শাহাদতের আগ মুহূর্তে আসলান বার বার বলছিলেন: আমার মত সৌভাগ্যবান কে আছে পৃথিবীতে? ফাতিমার ছেলে আমার মুখে মুখ রেখেছেন! 

 

সাইদ নামের আরেক ইমাম প্রেমিক ১৩ টি তিরের আঘাত সহ্য করেন ইমামের জন্য। ইমাম যাতে নির্বিঘ্নে আশুরার দিনে যুদ্ধক্ষেত্রেই জোহরের নামাজ আদায় করতে পারেন সে জন্য সাইদ এতগুলো তীর বুকে পেতে নেন। সাধারণত মানুষ তিনটি বা বড় জোর ৫ টি  বিষাক্ত তিরের আঘাত সইতে পারে। কিন্তু সাইদ কঠিন বেদনা সয়ে একে একে ১৩টি তিরের আঘাত সহ্য করেন! ১৩তম তিরের আঘাতে যখন লুটিয়ে পড়েন সাইদ ততক্ষণে ইমামের নামাজ শেষ হয়েছে। এ সময়ও সাইদ হাসিমুখে বলছিলেন, ইমাম আপনি কী আমার প্রতি সন্তুষ্ট হয়েছেন?

 

এই ছিল ইমামের ৭২ জন শহীদ সঙ্গীর এক-একজনের অবস্থা। ইয়াজিদ বাহিনীর প্রাথমিক হামলার মূল ধকলটা যেন ইমামের পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়দের ওপর না পড়ে সে জন্য সচেষ্ট ছিলেন ইমামের পরিবারের বাইরের সঙ্গীরা।   তারা যেন ছিলেন ইমামের প্রতি ভালবাসায় কুরআনে বর্ণিত শিশা ঢালা প্রাচীর।

 

এখানে আমরা স্মরণ করতে পারি সেই হোর ইবনে রিয়াহির কথা যিনি কারবালা অঞ্চলের কাছে প্রথম ইমামকে বাধা দিয়েছিলেন। ইয়াজিদ বাহিনীর বড় মাপের সেনা কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও হোর যখন বুঝলেন যে ইয়াজিদ বাহিনী ইমামের সঙ্গে যুদ্ধ করবে এবং এমনকি তাঁকে হত্যা করতেও দ্বিধা বোধ করবে না। তখন তার মধ্যে জেগে উঠলো ঈমান ও ইমাম-প্রেমের সুপ্ত চেতনা। তীব্র অনুশোচনা নিয়ে তিনি ইমামের কাছে ক্ষমা চাইলেন। এ সময় হোর তাঁর মাথা নিচু করে রেখেছিলেন। ইমাম তাঁকে কেবল ক্ষমাই করলেন না, তাঁকে মাথা উঁচু করতে বললেন। হোর ইমামের পক্ষে যুদ্ধ করে শহীদ হলেন। ইমাম হুসাইন (আ) বলেছিলেন হোর নামের অর্থ মুক্তি এবং তাঁর ওই নাম সার্থক হয়েছিল।  ইমামের নসিহত শুনে আশুরার দিনে ইয়াজিদ বাহিনীর আরও কয়েকজন দলত্যাগ করে ইমামের শিবিরে যোগ দিয়েছিলেন।

 

আশুরার দিন নবী পরিবারের নুরানি সদস্যদের একে একে শাহাদত বরণও ছিল ইতিহাসের অনন্য দৃশ্য। ইমামের ৬ মাসের শিশুও রেহাই পায়নি ইয়াজিদ বাহিনীর বর্বরতা থেকে। হযরত আলী আকবর (আ) ছিলেন ইমামের বড় ছেলে। ১৯ বা ২১ বছর বয়সের এই তরুণ জোহরের নামাজের সময় কারবালায় আজান দিয়েছিলেন। তার আযানের কণ্ঠ শুনে চমকে যায় শত্রু  শিবিরের অনেকে। ঠিক যেন মহানবীর (সা) কণ্ঠস্বর! চেহারাও ছিল অবিকল মহানবীর যুব-বয়সের সেই চেহারা। চাল-চলনও ছিল অবিকল মহানবীর মত! তাকে যুদ্ধে পাঠাতে ইমামের কতই না কষ্ট হচ্ছিল। নবী-পরিবারের সদস্যরা  বলতেন, মহানবীর জন্য যখন প্রাণ কাঁদতো তখন মাঝে মধ্যে তাঁকে  স্মরণ করে আমরা আলী আকবরের  দিকে তাকাতাম!

 

১৩ বা ১৬ বছরের তরুণ হযরত কাসেম  ইবনে হাসানের (আ) বীরত্বও ইতিহাসে অমর হয়ে আছে। শত্রুর আঘাতে ধরাশায়ী হয়ে তিনি আর্তনাদ করে ওঠেন: চাচাজান! এ সময় ইমাম হুসাইন বিদ্যুতের গতিতে এগিয়ে আসেন। কিন্তু ভাতিজার জন্য কিছুই করতে না পেরে ইমামের হৃদয়টা যেন ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যায়!

প্রিয় ভাই ও ভাইয়ের ছেলেদের মৃত্যুতে অশেষ শোকে বেদনার্ত হয়েছিলেন হযরত জাইনাব সালামুল্লাহি আলাইহা। কিন্তু জাইনাবের দুই শিশু পুত্রও যে বীরের মত লড়াই করে শহীদ হয়েছিলেন সেদিকে তাঁর যেন ভ্রক্ষেপও ছিল না। অশেষ ধৈর্যের প্রতীক হযরত জাইনাব বলেছিলেন, "কারবালায় যা কিছু দেখেছি (ইমাম শিবিরের দিক থেকে ও ইয়াজিদ শিবিরের মোকাবেলায়) তাতে সৌন্দর্য ছাড়া অন্য কিছু দেখিনি।" 

 

ইমামের প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্যের কিংবদন্তীতুল্য প্রতীক হযরত আবুল ফজল আব্বাস (আ) ছিলেন ইমাম শিবিরের অন্যতম প্রধান সেনাপতি ও যুদ্ধের সময় পতাকা রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত। এই আব্বাসের বীরত্ব দেখে শত্রুদেরও কেউ কেউ যেন গৌরব অনুভব করছিল। ইমাম শিবিরের পিপাসার্ত শিশুদের জন্য পানি আনতে গিয়ে তিনি রক্তাক্ত হন। অবশেষে ফোরাতের তীরে গিয়ে পানির সন্ধানও পান। এ সময় প্রচণ্ড তৃষ্ণার্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি ইমাম শিবিরের তৃষ্ণার্তদের কথা ভেবে পানি পানি বিরত থাকেন।

 

হযরত আবুল ফজল আব্বাস (আ)  ইমাম শিবিরের জন্য পানি বয়ে আনতে গিয়ে একে-একে তাঁর দুই হারান শত্রুদের তরবারির আঘাতে। কিন্তু তবুও তিনি মুখে কামড়ে ধরে পানির মশক বয়ে আনছিলেন। অবশেষে  ইয়াজিদ বাহিনীর তীরের আঘাতে মশক ছিন্ন হয়ে গেলে তিনি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন এবং নির্মমভাবে  শহীদ হন শত্রুর তীর-বৃষ্টি ও তরবারির অসংখ্য আঘাতে!

 

ইমাম হুসাইন (আ) নিজে এবং তাঁর পুত্র আলী আকবর ও ভাই আবুল ফজল আব্বাস শহীদ হওয়ার আগে বহু শত্রু সেনাকে নিধন করেছিলেন।  তাদের হাতে কয়েক হাজার বা অন্তত এক হাজারেরও বেশি ইয়াজিদি সেনা নিহত হয়েছিলেন বলে বর্ণনা রয়েছে।

‌ইমাম হুসাইনের (আ.) ব্যক্তিত্বের  কিছু মহান দিক হল পৌরুষত্ব,  বীরত্ব, বিচক্ষণতা, মহত্ত্ব, দৃঢ়তা, অবিচলতা এবং সত্য-প্রেম।  

ইমাম হুসাইন (আ.) বলেছেন, আমি নিজ কানে রাসূলুল্লাহর (সা.) মুখ থেকে যা শুনেছি তা হলোঃ

 ‘‘আল্লাহ বড় ও মহান কাজকে পছন্দ করেন এবং নীচ কাজকে তিনি ঘৃণা করেন।’’ (জামিউস সাগীর ১/৭৫) #

 

রেডিও তেহরান

 

  

 

 

 

 

২৪ অক্টোবর (রেডিও তেহরান):

হোক্ দুশমন অগণন তবু হে সেনানী! আজ দাও হুকুম/মৃত্যু সাগরে ঝাঁপ দিয়ে মোরা ভাঙ্গবো ক্লান্ত প্রাণের ঘুম! হবে কারবালা মরু ময়দান শহীদ সেনার শয্যা শেষ/হে সিপাহসালার! জঙ্গী ইমাম আজ আমাদের দাও আদেশ! ...

 

আজ হতে ১৩৭৬ চন্দ্র-বছর আগে ৬১ হিজরির এই দিনে সংঘটিত হয়েছিল বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বিয়োগান্তক ঘটনা বা ট্র্যাজেডি। 

 

ইরাকের কারবালায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র প্রায় ১০০ জন সঙ্গী মৃত্যু ও রক্তের সাগরে ভেসে ইসলামকে দিয়ে গেছেন পরমাণু শক্তির চেয়েও লক্ষ কোটি গুণ বেশি শক্তিশালী বিপ্লবের তথা শাহাদতের সংস্কৃতির বাস্তব শিক্ষা। কারবালার এ বিপ্লব  আধুনিক যুগে সংঘটিত ইরানের ইসলামী বিপ্লবসহ যুগে যুগে সব মহতী বিপ্লবে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

 

জালিম ও দুরাচারী পাপিষ্ঠ ইয়াজিদকে মুসলিম বিশ্বের খলিফা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করায় হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর পরিবারের সব পুরুষ সদস্যসহ (কেবল ইমাম যেইনুল আবিদিন আ. ছাড়া)  ইমামের একনিষ্ঠ সমর্থক এবং নবী-পরিবারের প্রেমিক একদল মুমিন মুসলমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল কারবালায়।

 

ইয়াজিদের আনুগত্য করতে  ইমামের অস্বীকৃতির  খবর জানার পর কুফার প্রায় এক লাখ নাগরিক চিঠি ও প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল ইমাম (আ.)-কে যাতে তারা প্রকৃত ইসলামী শাসনের স্বাদ পেতে পারে এবং মুক্ত হয় ইয়াজিদের কলঙ্কিত  শাসনের নাগপাশ থেকে।  তাই ইমাম (আ.)ও মক্কা থেকে রওনা হয়েছিলেন কুফার উদ্দেশ্যে যাতে তাদের সহযোগিতায় ইয়াজিদের রাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা যায়। কিন্তু ইয়াজিদের গভর্নর ও প্রশাসনের নানা ধরনের ভয়-ভীতি এবং প্রলোভনের মুখে কুফায় ইমামপন্থী জনগণ ইমামের প্রতিনিধিকেই সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয় এবং ইমামের প্রতিনিধি মুসলিম ইবনে আকিল (রা.) নির্মমভাবে শহীদ হন।

 

এ অবস্থায় ইমাম কুফার জনগণের সহায়তার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেলেও প্রতিশ্রুতি পালনের জন্য  কুফার দিকে যাত্রা অব্যাহত রাখেন যাতে কেউ তাকে ভীতু, কাপুরুষ ও আপোসকামী বলে অভিযোগ করতে না পারেন। যদিও তিনি জানতেন কুফায় তাঁকে ও তাঁর পরিবার এবং সঙ্গীদেরকে শহীদ করা হতে পারে, তবুও তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মৃতপ্রায় ইসলামকে জীবিত করার স্বার্থে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার তথা শাহাদতের জন্যও প্রস্তুত ছিলেন।

 

ইমাম দূরদর্শিতার মাধ্যমে বুঝতে পেরেছিলেন যে নবী-পরিবারের রক্তদান বৃথা যাবে না এবং একদিন জনগণ জেগে উঠবে।

 

কুফায় পৌঁছার আগেই কারবালায় ইমামকে তাঁর পরিবার-পরিজন ও সঙ্গীসহ ঘেরাও করে ইয়াজিদ-বাহিনী। হয় ইয়াজিদের আনুগত্য নতুবা মৃত্যু –এ দুয়ের যে কোনো একটি পথ বেছে নিতে বলা হয়েছিল তাঁদেরকে। কিন্তু তাঁরা বীরোচিতভাবে লড়াই করে শহীদ হওয়ার পথই বেছে নিয়েছিলেন।  ইমাম যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। আর এ জন্যই তিনি তাঁর পরিবারের শিশু ও নারীদেরও সঙ্গে  নিয়ে এসেছিলেন।

 

দশই মহররম যুদ্ধ যখন অনিবার্য তখনও ইমাম (আ.) ইয়াজিদ বাহিনীকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে তারা এক অন্যায় যুদ্ধ শুরু করতে যাচ্ছে নবী-পরিবারের নিষ্পাপ সদস্য ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে। কিন্তু অর্থ লোভী ও হারাম খাদ্য খেতে অভ্যস্ত ইয়াজিদ বাহিনীর নেতা-কর্মীদের মনে কোনো উপদেশই প্রভাব ফেলছিল না। অবশ্য  হোর ইবনে ইয়াজিদ (রা.) নামক ইয়াজিদ বাহিনীর একজন কর্মকর্তা  তার ভুল বুঝতে পেরেছিলেন এবং তিনি তার কয়েকজন আত্মীয় ও সঙ্গীসহ ইমামের শিবিরে যোগ দেন ও শেষ পর্যন্ত বীরের মত লড়াই করে শহীদ হয়েছিলেন।

 

ইমামের দিকে সর্ব প্রথম তীর নিক্ষেপ করেছিল ইয়াজিদ বাহিনীর সেনাপতি ওমর ইবনে সাদ। ইমামের জন্য জান-কুরবান করতে প্রস্তুত পুরুষ সঙ্গীদের প্রায় সবাই ত্রিশ হাজার মুনাফিক সেনার বিরুদ্ধে মহাবীরের মত লড়াই করেন এবং বহু মুনাফিক সেনাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে একে-একে শহীদ হন। ইমামের  প্রায় ১৮ বছর বয়সী সুদর্শন যুবক পুত্র হযরত আলী আকবর-রা.(যিনি ছিলেন দেখতে এবং আচার-আচরণে অবিকল রাসূল-সা. সদৃশ। এমনকি তাঁর কণ্ঠও ছিল রাসূল সা.-এর কণ্ঠের অনুরূপ। কারবালা ময়দানে তাঁর আজান শুনে অনেক বয়স্ক  শত্রুও চমকে উঠেছিল ) বহু মুনাফিককে জাহান্নামে পাঠিয়ে শহীদ হন। একইভাবে শহীদ হন ইমাম হাসান (আ.)’র পুত্র হযরত কাসিম (রা.)। সম্মুখ যুদ্ধে তাঁদের সঙ্গে কেউই পারছিলেন না। শত্রুরা যখন দেখত যে ইমাম শিবিরের প্রত্যেক পিপাসার্ত বীর সেনা তাদের বহু সেনাকে হত্যা করতে সক্ষম হচ্ছেন তখন তারা ওই বীর সেনাকে ঘেরাও করে ফেলত এবং দূর থেকে বহু তীর বা বর্শা নিক্ষেপ করে কাবু করে ফেলত।  

 

ফোরাতের পানি ইমাম শিবিরের জন্য কয়েকদিন ধরে নিষিদ্ধ থাকায় নবী-পরিবারের সদস্যরাসহ ইমাম শিবিরের সবাই ছিলেন পিপাসায় কাতর। প্রচণ্ড গরমে শিশুদের অবস্থা হয়ে পড়ে শোচনীয়।

 

এ অবস্থায় ইমাম তাঁর দুধের শিশু আলী আসগর (রা.)’র জন্য শত্রুদের কাছে পানি চাইলে ওই নিষ্পাপ শিশুর গলায় তীর নিক্ষেপ করে তাঁকে শহীদ করে। শিশুদের জন্য পানি আনতে গিয়ে বীরের মত লড়াই করে ও দুই হাত হারিয়ে নির্মমভাবে শহীদ হন ইমামের সত ভাই হযরত আবুল ফজল আব্বাস (রা.)। তিনি ছিলেন ইমাম বাহিনীর অন্যতম সেনাপতি এবং বহু শত্রুকে জাহান্নামে পাঠিয়েছিলেন । নবী পরিবারের কয়েকজন শিশুও বীরের মত লড়াই করে শহীদ হয়েছিলেন। নবী (সা.)’র পরিবারের সদস্যরা বাহ্যিক ও আত্মিক সৌন্দর্যে ছিলেন অনন্য। অর্থাত তারা দেখতে যেমন অপরূপ সুন্দর ছিলেন তেমনি আচার-আচরণেও ছিলেন শ্রেষ্ঠ চরিত্রের অধিকারী।

 

সন্তান, ভাই, ভাতিজা ও সঙ্গীরা সবাই শহীদ হওয়ার পর যুদ্ধে নামেন আল্লাহর সিংহ হযরত আলী (আ.)’র পুত্র হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)।  (তাঁর আগে তিনি যদিও জানতেন যে  তাঁর ডাকে সাড়া দেয়ার  মত কেউ নেই। তবুও তিনি বলেন, কেউ কি আছ আমাকে সাহায্য করার? অথবা, আমার সাহায্যের ডাকে কেউ কি সাড়া দেবে?-এ কথা তিনি চার বার বলেছিলেন। অনেকেই মনে করেন আসলে কিয়ামত পর্যন্ত তিনি তাঁর আদর্শের পথে  সহায়তা করতেই মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন ওই আহ্বানের মাধ্যমে।) তিনি একাই প্রায় দুই হাজার মুনাফিক সেনাকে জাহান্নামে পাঠিয়েছিলেন। তাঁর আঘাতে আহত হয়েছিল আরও বেশি সংখ্যক মুনাফিক। কিন্তু এক সময় তিনিও চরম পিপাসায় ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে পড়েন।  এ সময় তাঁকে ঘিরে ফেলে মুনাফিক সেনারা। পাথর ও অনেক বিষাক্ত তীর মারে তারা বেহেশতী যুবকদের অন্যতম সর্দারের গায়ে। একটি তীর ছিল তিন শাখা-বিশিষ্ট। এরপর এক নরাধম মারে একটি বর্শা। ফলে অশ্বারোহী ইমাম (আ.) ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে পড়ে যান।  এরপর আরেক নরাধম শিমার অথবা সিনান জীবন্ত অবস্থায় ইমামের মস্তক মুবারক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। (এই নরাধমদের উপর অনন্তকাল ধরে আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক। ) ইমামের গায়ে বর্শা, তীর ও তরবারির অন্তত তিনশ ষাটটি আঘাত ছিল। কোনো কোনো বর্ণনা অনুযায়ী আঘাতের সংখ্যা এক হাজার তিনশ। সেদিন ছিল শুক্রবার এবং ইমামের বয়স ছিল ৫৭ বছর।

 

ইমামের মাথা মুবারক বর্শার আগায় বিদ্ধ করেছিল নরাধমরা। শুধু তাই নয় ইমামের লাশসহ শহীদদের লাশগুলোর ওপর ঘোড়া দাবিয়ে পবিত্র লাশগুলোকে  দলিত-মথিত করেছিল নরপশুরা। বলা হয় শাহাদতের সময় যতই ঘনিয়ে আসছিল আল্লাহর দিদার ও শাহাদত-প্রেমিক ইমামের চেহারা ততই উজ্জ্বল বা নূরানি হচ্ছিল স্বর্গীয় আনন্দে।  যোহর ও আসরের নামাজের মধ্যবর্তী সময়ে তাঁকে শহীদ করা হয়। এর আগে তিনি সঙ্গীদের নিয়ে সালাতুল খওফ তথা যুদ্ধ বা ভয়ের সময়কার (সংক্ষিপ্ত পদ্ধতির)  জামায়াতে নামাজ পড়েছিলেন।

 

ইয়াজিদ সেনারা ইমাম শিবিরের তাবুগুলোতে আগুন দিয়েছিল এবং নারীদের অলঙ্কার ছিনিয়ে নেয়াসহ লুট-পাট চালায়। তারা  ইমামের জিনিসপত্র ও উটগুলো লুট করে। এমনকি নবী-পরিবারের মহিলাদের বোরকাগুলোও লুট করেছিল নরাধমরা। তাঁদেরকে খালি পায়ে হাঁটিয়ে বন্দীদের মত সারি বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় কুফা বা দামেস্কের দিকে।

 

একটি বর্ণনায় এসেছে ইমামকে নির্মমভাবে শহীদ করার পর কুফার এক  ইয়াজিদি সেনা উচ্চস্বরে কেঁদে ওঠে। তাকে তিরস্কার করা হলে সে বলে, আমি কাঁদছি এ জন্য যে রাসূল (সা.)-কে  দেখলাম তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি একবার পৃথিবীর দিকে দেখছেন একবার তোমাদের যুদ্ধের দিকে। আমি ভয় পাচ্ছি তিনি পৃথিবীর ওপর অভিশাপ দেবেন এবং তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে।

 

ইয়াজিদি সেনারা বলল, লোকটি পাগল। কিন্তু তাদের মধ্যে অনুতপ্ত কেউ কেউ বলল: আল্লাহর শপথ, আমরা বেহেশতের যুবকদের সর্দারকে হত্যা করেছি সুমাইয়্যার সন্তানের জন্য।  এরপর তারা বিদ্রোহ করে ইবনে জিয়াদের প্রতি।

 

ইমামের শাহাদতের পর বিশ্বনবী (সা.)’র  স্ত্রী উম্মে সালামাহ (আ.)-কে কাঁদতে দেখে  তাঁকে প্রশ্ন করা হয় এর কারণ সম্পর্কে। তিনি বলেন, স্বপ্নে দেখলাম আল্লাহর রাসূল (সা.)-কে, তাঁর মাথা ও দাড়ি ধুলায় মাখা।  এ ব্যাপারে রাসূলকে (সা.) প্রশ্ন করায় তিনি বলেন, এইমাত্র আমি আমার হুসাইনের হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছি।

 

আশুরার দিন সূর্য কালো হয়ে গিয়েছিল। লাল আকাশে তারা দেখা যাচ্ছিল দিনের বেলায়। অনেকেই ভয় পাচ্ছিল যে হয়তো কিয়ামত শুরু হয়েছে। যে কোনো পাথর তুললে তার নিচে তাজা রক্ত দেখা যেত। বহু অঞ্চলে রক্ত-বৃষ্টি বর্ষিত হয় এবং পানি লাল বর্ণ ধারণ করে। এমনকি ঐতিহাসিক সাক্ষ্য অনুযায়ী ব্রিটেনেও রক্ত-বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছিল। দেখুন লিংক: http://bangla.irib.ir/moharam/item/55635-

 

ইসলামী বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (সা.) নিজে অলৌকিকভাবে ইমাম হুসাইন (আ.)’র পবিত্র খুন সংগ্রহ করেছেন এবং আল্লাহর দরবারে বিচার দিয়েছেন। আশুরার দিন কেঁদেছিল ফেরেশতাকুলও।  মহান আল্লাহ এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেয়া হবে বলে ফেরেশতাদের সান্ত্বনা দিয়েছেন।

 

বলা হয় জিন ও ফেরেশতারা ইমাম হুসাইন (আ)-কে ইয়াজিদ বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাহায্য করার প্রস্তাব দিয়েছিল। কিন্তু ইমাম অসহায় অবস্থায় শহীদ হওয়ার জন্য অবিচল ছিলেন। তিনি দোয়া করলে জিন ও ফেরেশতাদের সাহায্য ছাড়াই ইয়াজিদ বাহিনী মাটিতে দেবে ধ্বংস হয়ে যেত। 

 

কারবালায় নবী-পরিবারের বিরুদ্ধে নৃশংস হত্যাযজ্ঞে ও বর্বরতায় শরিক সবাই কঠিন শাস্তি দুনিয়াতেই পেয়েছিল। মহামতি মুখতার সাকাফি (র.) অধিকাংশ ঘাতককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন।  অন্যদিকে যুগ  ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর মহান সঙ্গীদের জন্য যুগ ধরে কাঁদছে নবী-পরিবার-প্রেমিক মুসলমানরা এবং এই শোক ইসলামের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছে। মানবতার অশ্রুর মহাসাগরে ও মুসলমানদের হৃদয়-রাজ্যে চির-অধিপতি হয়ে আছেন কারবালার বীর শহীদরা।

 

উতারো সামান, দাঁড়াও সেনানী নির্ভিক-সিনা বাঘের মত/আজ এজিদের কঠিন জুলুমে হয়েছে এ প্রাণ ওষ্ঠাগত,

কওমি ঝাণ্ডা ঢাকা পড়ে গেছে স্বৈরাচারের কালো ছায়ায়, /পাপের নিশানি রাজার নিশান জেগে ওঠে অজ নভঃনীলায় ...

হেরার রশ্মি কেঁপে কেঁপে ওঠে ফারানের রবি অস্ত যায়! /কাঁদে মুখ ঢেকে মানবতা আজ পশু শক্তির রাজসভায়!...

হোক্ দুশমন অগণন তবু হে সেনানী! আজ দাও হুকুম/মৃত্যু সাগরে ঝাঁপ দিয়ে মোরা ভাঙ্গবো ক্লান্ত প্রাণের ঘুম!

হবে কারবালা মরু ময়দান শহীদ সেনার শয্যা শেষ/হে সিপাহসালার! জঙ্গী ইমাম আজ আমাদের দাও আদেশ! ...

হে ইমাম! দেখ বিস্মিত রবি তোমার শৌর্য দেখ্ ছে আজ/তোমার দীপ্ত পৌরুষে ম্লান শত্রু সেনার জরিন তাজ!

ভীরু বুজদিল পারে না সইতে তোমার যুদ্ধ আমন্ত্রণ /তীর ছুঁড়ে ছুঁড়ে বহুদূর হতে শত্রু বাহিনী দেখায় রণ। ...

জীবন দিয়ে যে রাখলো বাঁচায়ে দ্বীনি ইজ্জত বীর জাতির/দিন শেষে হায় কাটলো শত্রু সীমার সে মৃত বাঘের শির।

তীব্র ব্যথায় ঢেকে ফেলে মুখ দিনের সূর্য অস্তাচলে,/ডোবে ইসলাম-রবি এজিদের আঘাতে অতল তিমির তলে,

কলিজা কাঁপায়ে কারবালা মাঠে ওঠে ক্রন্দন লোহু সফেন ওঠে আসমান জমিনে মাতম; কাঁদে মানবতা: হায় হোসেন। হায় হোসেন। (কবি ফররুখ আহমদের ‘শহীদে কারবালা ‘থেকে)# 

 

 রেডিও তেহরান/এএইচ

 

 

 

 

 

 

 

২৪ অক্টোবর (রেডিও তেহরান): আজ হতে ১৩৭৬ চন্দ্র-বছর আগে ৬১ হিজরির এই দিনে সংঘটিত হয়েছিল বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বিয়োগান্তক ঘটনা বা ট্র্যাজেডি। 

 

ইরাকের কারবালায় হযরত ইমাম হুসাইন (আর) ও তাঁর ৭২ জন সঙ্গী মৃত্যু ও রক্তের সাগরে ভেসে ইসলামকে দিয়ে গেছেন পরমাণু শক্তির চেয়েও লক্ষ কোটি গুণ বেশি শক্তিশালী বিপ্লবের তথা শাহাদতের সংস্কৃতির বাস্তব শিক্ষা। কারবালার এ বিপ্লব  আধুনিক যুগে সংঘটিত ইরানের ইসলামী বিপ্লবসহ যুগে যুগে সব মহতী বিপ্লবে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছে।

 

জালিম ও দুরাচারী পাপিষ্ঠ ইয়াজিদকে মুসলিম বিশ্বের খলিফা হিসেবে মেনে নিতে অস্বীকার করায় হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর পরিবারের সব পুরুষ সদস্যসহ (কেবল ইমাম যেইনুল আবিদিন আ. ছাড়া)  ইমামের একনিষ্ঠ সমর্থক এবং নবী-পরিবারের প্রেমিক একদল মুমিন মুসলমানকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল কারবালায়।

 

ইয়াজিদের আনুগত্য করতে  ইমামের অস্বীকৃতির  খবর জানার পর কুফার প্রায় এক লাখ নাগরিক চিঠি ও প্রতিনিধি পাঠিয়েছিল ইমাম (আ.)-কে যাতে তারা প্রকৃত ইসলামী শাসনের স্বাদ পেতে পারে এবং মুক্ত হয় ইয়াজিদের কলঙ্কিত  শাসনের নাগপাশ থেকে।  তাই ইমাম (আ.)ও মক্কা থেকে রওনা হয়েছিলেন কুফার উদ্দেশ্যে যাতে তাদের সহযোগিতায় ইয়াজিদের রাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন গড়ে তোলা যায়। কিন্তু ইয়াজিদের গভর্নর ও প্রশাসনের নানা ধরনের ভয়-ভীতি এবং প্রলোভনের মুখে কুফায় ইমামপন্থী জনগণ ইমামের প্রতিনিধিকেই সহায়তা দিতে ব্যর্থ হয় এবং ইমামের প্রতিনিধি মুসলিম ইবনে আকিল (রা.) নির্মমভাবে শহীদ হন।

 

এ অবস্থায় ইমাম কুফার জনগণের সহায়তার ব্যাপারে নিরাশ হয়ে গেলেও প্রতিশ্রুতি পালনের জন্য  কুফার দিকে যাত্রা অব্যাহত রাখেন যাতে কেউ তাকে ভীতু, কাপুরুষ ও আপোসকামী বলে অভিযোগ করতে না পারেন। যদিও তিনি জানতেন কুফায় তাঁকে ও তাঁর পরিবার এবং সঙ্গীদেরকে শহীদ করা হতে পারে, তবুও তিনি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে মৃতপ্রায় ইসলামকে জীবিত করার স্বার্থে সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার তথা শাহাদতের জন্যও প্রস্তুত ছিলেন।

 

ইমাম দূরদর্শিতার মাধ্যমে বুঝতে পেরেছিলেন যে নবী-পরিবারের রক্তদান বৃথা যাবে না এবং একদিন জনগণ জেগে উঠবে।

 

কুফায় পৌঁছার আগেই কারবালায় ইমামকে তাঁর পরিবার-পরিজন ও সঙ্গীসহ ঘেরাও করে ইয়াজিদ-বাহিনী। হয় ইয়াজিদের আনুগত্য নতুবা মৃত্যু –এ দুয়ের যে কোনো একটি পথ বেছে নিতে বলা হয়েছিল তাঁদেরকে। কিন্তু তাঁরা বীরোচিতভাবে লড়াই করে শহীদ হওয়ার পথই বেছে নিয়েছিলেন।  ইমাম যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত ছিলেন না। আর এ জন্যই তিনি তাঁর পরিবারের শিশু ও নারীদেরও সঙ্গে  নিয়ে এসেছিলেন।

 

দশই মহররম যুদ্ধ যখন অনিবার্য তখনও ইমাম (আ.) ইয়াজিদ বাহিনীকে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে তারা এক অন্যায় যুদ্ধ শুরু করতে যাচ্ছে নবী-পরিবারের নিষ্পাপ সদস্য ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে। কিন্তু অর্থ লোভী ও হারাম খাদ্য খেতে অভ্যস্ত ইয়াজিদ বাহিনীর নেতা-কর্মীদের মনে কোনো উপদেশই প্রভাব ফেলছিল না। অবশ্য  হোর ইবনে ইয়াজিদ (রা.) নামক ইয়াজিদ বাহিনীর একজন কর্মকর্তা  তার ভুল বুঝতে পেরেছিলেন এবং তিনি তার কয়েকজন আত্মীয় ও সঙ্গীসহ ইমামের শিবিরে যোগ দেন ও শেষ পর্যন্ত বীরের মত লড়াই করে শহীদ হয়েছিলেন।

ইমামের দিকে সর্ব প্রথম তীর নিক্ষেপ করেছিল ইয়াজিদ বাহিনীর সেনাপতি ওমর ইবনে সাদ। ইমামের জন্য জান-কুরবান করতে প্রস্তুত পুরুষ সঙ্গীদের প্রায় সবাই ত্রিশ হাজার মুনাফিক সেনার বিরুদ্ধে মহাবীরের মত লড়াই করেন এবং বহু মুনাফিক সেনাকে জাহান্নামে পাঠিয়ে একে-একে শহীদ হন। ইমামের  প্রায় ১৮ বছর বয়সী সুদর্শন যুবক পুত্র হযরত আলী আকবর-রা.(যিনি ছিলেন দেখতে এবং আচার-আচরণে অবিকল রাসূল-সা. সদৃশ। এমনকি তাঁর কণ্ঠও ছিল রাসূল সা.-এর কণ্ঠের অনুরূপ। কারবালা ময়দানে তাঁর আজান শুনে অনেক বয়স্ক  শত্রুও চমকে উঠেছিল ) বহু মুনাফিককে জাহান্নামে পাঠিয়ে শহীদ হন। একইভাবে শহীদ হন ইমাম হাসান (আ.)’র পুত্র হযরত কাসিম (রা.)। সম্মুখ যুদ্ধে তাঁদের সঙ্গে কেউই পারছিলেন না। শত্রুরা যখন দেখত যে ইমাম শিবিরের প্রত্যেক পিপাসার্ত বীর সেনা তাদের বহু সেনাকে হত্যা করতে সক্ষম হচ্ছেন তখন তারা ওই বীর সেনাকে ঘেরাও করে ফেলত এবং দূর থেকে বহু তীর বা বর্শা নিক্ষেপ করে কাবু করে ফেলত।  

ফোরাতের পানি ইমাম শিবিরের জন্য কয়েকদিন ধরে নিষিদ্ধ থাকায় নবী-পরিবারের সদস্যরাসহ ইমাম শিবিরের সবাই ছিলেন পিপাসায় কাতর। প্রচণ্ড গরমে শিশুদের অবস্থা হয়ে পড়ে শোচনীয়।

 

এ অবস্থায় ইমাম তাঁর দুধের শিশু আলী আসগর (রা.)’র জন্য শত্রুদের কাছে পানি চাইলে ওই নিষ্পাপ শিশুর গলায় তীর নিক্ষেপ করে তাঁকে শহীদ করে। শিশুদের জন্য পানি আনতে গিয়ে বীরের মত লড়াই করে ও দুই হাত হারিয়ে নির্মমভাবে শহীদ হন ইমামের সত ভাই হযরত আবুল ফজল আব্বাস (রা.)। তিনি ছিলেন ইমাম বাহিনীর অন্যতম সেনাপতি এবং বহু শত্রুকে জাহান্নামে পাঠিয়েছিলেন । নবী পরিবারের কয়েকজন শিশুও বীরের মত লড়াই করে শহীদ হয়েছিলেন। নবী (সা.)’র পরিবারের সদস্যরা বাহ্যিক ও আত্মিক সৌন্দর্যে ছিলেন অনন্য। অর্থাত তারা দেখতে যেমন অপরূপ সুন্দর ছিলেন তেমনি আচার-আচরণেও ছিলেন শ্রেষ্ঠ চরিত্রের অধিকারী।

 

সন্তান, ভাই, ভাতিজা ও সঙ্গীরা সবাই শহীদ হওয়ার পর যুদ্ধে নামেন আল্লাহর সিংহ হযরত আলী (আ.)’র পুত্র হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)।  (তাঁর আগে তিনি যদিও জানতেন যে  তাঁর ডাকে সাড়া দেয়ার  মত কেউ নেই। তবুও তিনি বলেন, কেউ কি আছ আমাকে সাহায্য করার? অথবা, আমার সাহায্যের ডাকে কেউ কি সাড়া দেবে?-এ কথা তিনি চার বার বলেছিলেন। অনেকেই মনে করেন আসলে কিয়ামত পর্যন্ত তিনি তাঁর আদর্শের পথে  সহায়তা করতেই মুসলমানদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন ওই আহ্বানের মাধ্যমে।) তিনি একাই প্রায় দুই হাজার মুনাফিক সেনাকে জাহান্নামে পাঠিয়েছিলেন। তাঁর আঘাতে আহত হয়েছিল আরও বেশি সংখ্যক মুনাফিক। কিন্তু এক সময় তিনিও চরম পিপাসায় ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে পড়েন।  এ সময় তাঁকে ঘিরে ফেলে মুনাফিক সেনারা। পাথর ও অনেক বিষাক্ত তীর মারে তারা বেহেশতী যুবকদের অন্যতম সর্দারের গায়ে। একটি তীর ছিল তিন শাখা-বিশিষ্ট। এরপর এক নরাধম মারে একটি বর্শা। ফলে অশ্বারোহী ইমাম (আ.) ভারসাম্য হারিয়ে মাটিতে পড়ে যান।  এরপর আরেক নরাধম শিমার অথবা সিনান জীবন্ত অবস্থায় ইমামের মস্তক মুবারক দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন করেছিল। (এই নরাধমদের উপর অনন্তকাল ধরে আল্লাহর অভিশাপ বর্ষিত হোক। ) ইমামের গায়ে বর্শা, তীর ও তরবারির অন্তত তিনশ ষাটটি আঘাত ছিল। কোনো কোনো বর্ণনা অনুযায়ী আঘাতের সংখ্যা এক হাজার তিনশ। সেদিন ছিল শুক্রবার এবং ইমামের বয়স ছিল ৫৭ বছর।

 

ইমামের মাথা মুবারক বর্শার আগায় বিদ্ধ করেছিল নরাধমরা। শুধু তাই নয় ইমামের লাশসহ শহীদদের লাশগুলোর ওপর ঘোড়া দাবিয়ে পবিত্র লাশগুলোকে  দলিত-মথিত করেছিল নরপশুরা। বলা হয় শাহাদতের সময় যতই ঘনিয়ে আসছিল আল্লাহর দিদার ও শাহাদত-প্রেমিক ইমামের চেহারা ততই উজ্জ্বল বা নূরানি হচ্ছিল স্বর্গীয় আনন্দে।  যোহর ও আসরের নামাজের মধ্যবর্তী সময়ে তাঁকে শহীদ করা হয়। এর আগে তিনি সঙ্গীদের নিয়ে সালাতুল খওফ তথা যুদ্ধ বা ভয়ের সময়কার (সংক্ষিপ্ত পদ্ধতির)  জামায়াতে নামাজ পড়েছিলেন।

 

ইয়াজিদ সেনারা ইমাম শিবিরের তাবুগুলোতে আগুন দিয়েছিল এবং নারীদের অলঙ্কার ছিনিয়ে নেয়াসহ লুট-পাট চালায়। তারা  ইমামের জিনিসপত্র ও উটগুলো লুট করে। এমনকি নবী-পরিবারের মহিলাদের বোরকাগুলোও লুট করেছিল নরাধমরা। তাঁদেরকে খালি পায়ে হাঁটিয়ে বন্দীদের মত সারি বেঁধে নিয়ে যাওয়া হয় কুফা বা দামেস্কের দিকে।

একটি বর্ণনায় এসেছে ইমামকে নির্মমভাবে শহীদ করার পর কুফার এক  ইয়াজিদি সেনা উচ্চস্বরে কেঁদে ওঠে। তাকে তিরস্কার করা হলে সে বলে, আমি কাঁদছি এ জন্য যে রাসূল (সা.)-কে  দেখলাম তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি একবার পৃথিবীর দিকে দেখছেন একবার তোমাদের যুদ্ধের দিকে। আমি ভয় পাচ্ছি তিনি পৃথিবীর ওপর অভিশাপ দেবেন এবং তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে।

 

ইয়াজিদি সেনারা বলল, লোকটি পাগল। কিন্তু তাদের মধ্যে অনুতপ্ত কেউ কেউ বলল: আল্লাহর শপথ, আমরা বেহেশতের যুবকদের সর্দারকে হত্যা করেছি সুমাইয়্যার সন্তানের জন্য।  এরপর তারা বিদ্রোহ করে ইবনে জিয়াদের প্রতি।

 

ইমামের শাহাদতের পর বিশ্বনবী (সা.)’র  স্ত্রী উম্মে সালামাহ (আ.)-কে কাঁদতে দেখে  তাঁকে প্রশ্ন করা হয় এর কারণ সম্পর্কে। তিনি বলেন, স্বপ্নে দেখলাম আল্লাহর রাসূল (সা.)-কে, তাঁর মাথা ও দাড়ি ধুলায় মাখা।  এ ব্যাপারে রাসূলকে (সা.) প্রশ্ন করায় তিনি বলেন, এইমাত্র আমি আমার হুসাইনের হত্যাকাণ্ড প্রত্যক্ষ করেছি।

আশুরার দিন সূর্য কালো হয়ে গিয়েছিল। লাল আকাশে তারা দেখা যাচ্ছিল দিনের বেলায়। অনেকেই ভয় পাচ্ছিল যে হয়তো কিয়ামত শুরু হয়েছে। যে কোনো পাথর তুললে তার নিচে তাজা রক্ত দেখা যেত।

 

ইসলামী বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (সা.) নিজে অলৌকিকভাবে ইমাম হুসাইন (আ.)’র পবিত্র খুন সংগ্রহ করেছেন এবং আল্লাহর দরবারে বিচার দিয়েছেন। আশুরার দিন কেঁদেছিল ফেরেশতাকুলও।  মহান আল্লাহ এই হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধ নেয়া হবে বলে ফেরেশতাদের সান্ত্বনা দিয়েছেন।

 

কারবালায় নবী-পরিবারের বিরুদ্ধে নৃশংস হত্যাযজ্ঞে ও বর্বরতায় শরিক সবাই কঠিন শাস্তি দুনিয়াতেই পেয়েছিল। মহামতি মুখতার সাকাফি (র.) অধিকাংশ ঘাতককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন।  অন্যদিকে যুগ  ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর মহান সঙ্গীদের জন্য যুগ ধরে কাঁদছে নবী-পরিবার-প্রেমিক মুসলমানরা এবং এই শোক ইসলামের অন্যতম প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছে। মুসলমানদের হৃদয়-রাজ্যের চির-অধিপতি হয়ে আছেন কারবালার বীর শহীদরা। #

 

রেডিও তেহরান/এএইচ