এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla

মহররমের চাঁদ এলো ওই কাঁদাতে ফের দুনিয়ায়

ওয়া হোসেনা ওয়া হোসেনা তারি মাতম শোনা যায়....


কারবালার মহাবিপ্লব ইসলামী পুনর্জাগরণ ও মৃতপ্রায় ইসলামের প্রাণ-সঞ্জীবনের এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে চির-ভাস্বর হয়ে আছে। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র প্রচারিত মহান ইসলাম ধর্ম এবং উদীয়মান ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র-ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার জন্য শয়তানের দোসর আর শত্রুদের প্রচেষ্টার কখনও কোনো কমতি ছিল না। শত্রুরা যখন প্রকাশ্যে ইসলামকে মোকাবেলা করার সর্বাত্মক চেষ্টায় ব্যর্থ হল তখন তারা বাহ্যিকভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ও মুসলমান সেজেই ভেতর থেকে এই মহান ধর্মের ওপর আঘাত হানতে সচেষ্ট হল যাতে এই ধর্মের মূল শিক্ষা, চেতনা ও সংস্কৃতি ধীরে ধীরে বিকৃত এবং বিলুপ্ত হয়। বৃহত্তর মুসলিম সমাজের নানা উদাসীনতা ও কায়েমি স্বার্থবাদী মহলের চক্রান্তের পরিণতিতে ইসলামের এক সময়কার চরম শত্রু উমাইয়ারা মুসলমানদের নেতৃত্বের পদ দখল করে। তারা পবিত্র ইসলামী সমাজের ওপর চাপিয়ে দেয় রাজতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র।


উমাইয়ারা ইসলামী নেতৃত্বের প্রকৃত হকদার এবং মুসলিম সমাজের সবচেয়ে যোগ্য, জ্ঞানী ও খোদাভীরু ব্যক্তিদের তথা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)’র পবিত্র আহলে বাইতকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য যুদ্ধ ও সংঘাতের পাশাপাশি রাজকীয় কোষাগারের সীমাহীন অপব্যবহারেও অভ্যস্ত ছিল। অর্থ-সম্পদ, ভোগ-বিলাস ও রাজকীয় পদমর্যাদার লালসায় নিমজ্জিত দরবারি আলেমরা বিশ্বনবীর পবিত্র আহলে বাইতকে বিদ্রোহী এবং পথভ্রষ্ট বলে ফতোয়া দিয়েছিল। এর পাশাপাশি তারা উমাইয়া নেতাদের ফজিলত ও মাহাত্ম্য তুলে ধরার জন্য রচনা করেছিল শত-সহস্র বা লক্ষাধিক জাল হাদিস।


সে সময়কার সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থার নানা চিত্র তুলে ধরেছেন ঐতিহাসিকরা নানা বর্ণনায়। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায় বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি কবিতার কয়েকটি লাইন:


ওরে বাংলার মুসলিম তোরা কাঁদ্।..
তখতের লোভে এসেছে এজিদ কমবখতের বেশে !
এসেছে সীমার, এসেছে কুফা'র বিশ্বাসঘাতকতা,
ত্যাগের ধর্মে এসেছে লোভের প্রবল নির্মমতা !
মুসলিমে মুসলিমে আনিয়াছে বিদ্বেষের বিষাদ,
...কাঁদে আসমান জমিন, কাঁদিছে মহররমের চাঁদ।
একদিকে মাতা ফাতেমার বীর দুলাল হোসেনী সেনা,
আর দিকে যত তখত-বিলাসী লোভী এজিদের কেনা।..
এই ধূর্ত ও ভোগীরাই তলোয়ারে বেঁধে কোরআন,
আলী'র সেনারে করেছে সদাই বিব্রত পেরেশান !
এই এজিদের সেনাদল শয়তানের প্ররোচনায়
হাসানে হোসেনে গালি দিতে যেত মক্কা ও মদিনায়।.. …



উল্লেখ্য, উমাইয়া শাসকরা সিরিয়ার জনগণকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)’র পবিত্র আহলে বাইতের বিরুদ্ধে বিদ্বেষী প্রচারণায় এতোটা প্রভাবিত ও মাতিয়ে রেখেছিল যে আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ) যখন পবিত্র রমজান মাসে কুফার মসজিদে এক ধর্মান্ধ খারিজির সন্ত্রাসী হামলায় শহীদ হন তখন সিরিয়ার অনেকেই বিস্মিত হয়ে বলেছিল: আলী কি মসজিদে যেতো ও নামাজ পড়তো!!? বলা হয় সিরিয়ার জনগণকে শৈশবেই আলী-বিদ্বেষী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য শাসক-গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে শিশুদের জন্য ছাগল-ছানা উপহার হিসেবে পাঠানো হত। আর শিশুরা যখন ওই মেষ শাবক নিয়ে খেলাধুলায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠার কারণে এর গভীর অনুরাগী হয়ে উঠত তখন রাজ-দরবারের কর্মীরা এক রাতে ওই ছাগল-ছানা নিয়ে যেত। আর কে ওই ছাগল-ছানা নিয়ে গেছে শিশুরা তা জানতে চাইলে বলা হত আলী ওই ছাগল ছানা নিয়ে গেছে!! ফলে শৈশবেই সিরিয় শিশুদের কচি-মনে জন্ম নিত আলী (আ.) ও আহলেবাইতের প্রতি বিদ্বেষ।

 

৬০ হিজরিতে উমাইয়া শাসক মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর তার পুত্র ইয়াজিদ ক্ষমতার মসনদে আসীন হয়। সে মদীনার গভর্নরের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ নির্দেশ দেয় যে, হুসাইনের কাছ থেকে যে কোনো ভাবেই হোক আনুগত্য আদায়ের ব্যাপারে খুব কড়াকড়ি করবে এবং আনুগত্য এড়ানোর কোনো সুযোগ বা সময় তাকে দেয়া যাবে না। এ নির্দেশ পেয়ে মদীনার গভর্নর ওলিদ বিন উৎবা কুখ্যাত উমাইয়া নেতা মারোয়ান বিন হাকামের পরামর্শ অনুযায়ী সে রাতেই একটি সভার আয়োজন করে ইমাম হুসাইন (আ)-কে সেই সভায় আসতে বলে যাতে মুয়াবিয়ার মৃত্যুর খবর প্রচারিত হওয়ার আগেই ইমামকে ইয়াজিদের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিতে বাধ্য করা যায়। ইমাম হুসাইন (আ) নিরাপত্তার খাতিরে তাঁর অতি ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত ত্রিশ জনের সশস্ত্র এক গ্রুপকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়ে ওই সভায় যোগ দেন। ওলিদ মুয়াবিয়ার মৃত্যুর সংবাদ জানিয়ে ইয়াজিদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে ইমামকে আহ্বান জানান। ইমাম তাকে জানান যে:


'হে ওলিদ! আমাদের বংশ হল নবুওত ও রেসালতের খনি এবং ফেরেশতাদের আসা-যাওয়ার স্থান ও খোদায়ী রহমতের স্থান। মহান আল্লাহ নবী-পরিবারের মাধ্যমে ইসলামকে উদ্বোধন করেছেন এবং এই বংশকে সঙ্গে নিয়েই ইসলামকে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নেবেন। আর ইয়াজিদ যার আনুগত্য করতে তুমি আমায় বলছ সে হচ্ছে এমন এক মদখোর ও খুনি যার হাত নিরপরাধ মানুষের রক্তে রঞ্জিত। সে হচ্ছে এমন এক ব্যক্তি যে আল্লাহর বিধি-বিধানের সীমানা লণ্ডভণ্ড করেছে এবং জনগণের সামনেই নানা অশ্লীল কাজ ও পাপাচারে লিপ্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় অমন উজ্জ্বল রেকর্ড ও উন্নত পারিবারিক ঐতিহ্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আমার মত একজন ব্যক্তি কী এই পাপিষ্ঠের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবে বা তার নেতৃত্ব মেনে নেবে? তোমার ও আমার উচিত এ বিষয়ে ভবিষ্যতের দিকে নজর দেয়া এবং তাহলে দেখতে পাবে যে খেলাফত বা মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব দেয়ার জন্য আমাদের মধ্যে কে বেশি উপযুক্ত?'

 


এভাবে ইসলামের সেই চরম দুর্দিনে নানার ধর্ম ও সম্মান রক্ষার জন্য এগিয়ে আসেন তাঁরই সুযোগ্য নাতি হযরত ইমাম হুসাইন (অ)। মহানবী (সা) তাঁকে উম্মতের নাজাতের তরী ও হেদায়াতের প্রদীপ বলে উল্লেখ করেছিলেন। এর অর্থ ইমাম হুসাইনের (আ) দেখানো পথ ও আদর্শ অনুসরণ ছাড়া মুসলমানরা তাদের ঈমান ও পবিত্র ধর্মকে রক্ষা করতে পারবে না। বিশ্বনবী (সা) গোটা আহলে বাইতকে (আ) নুহের নৌকার সঙ্গে তুলনা করলেও ইমাম হুসাইনের (অ) ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ওই বিশেষণ যুক্ত করেছেন যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একজন ডুবন্ত বা আহত ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য দ্রুত গতিশীল বাহন বা গাড়ি দরকার। অন্যদিকে সাধারণ রোগীকে ধীরে-সুস্থে বা কিছুটা পরেও সাধারণ কোনো গাড়িতে চড়িয়ে হাসপাতালে নেয়া যায়। কারবালার মহাবিপ্লবের আদর্শ ও ইমাম হুসাইনের (আ) ভূমিকা মৃতপ্রায় ইসলামকে বাঁচানোর জন্য দ্রুত গতিশীল নৌকা বা বাহনের ভূমিকাই পালন করেছিল। #

 

রেডিও তেহরান/এএইচ

 

 

 

 

বৃহস্পতিবার, 15 অক্টোবার 2015 16:20

চির-ভাস্বর কারবালার মহাবিপ্লব - (এক)

মহররমের চাঁদ এলো ওই কাঁদাতে ফের দুনিয়ায়

ওয়া হোসেনা ওয়া হোসেনা তারি মাতম শোনা যায়....


কারবালার মহাবিপ্লব ইসলামী পুনর্জাগরণ ও মৃতপ্রায় ইসলামের প্রাণ-সঞ্জীবনের এক অনন্য অধ্যায় হিসেবে ইতিহাসে চির-ভাস্বর হয়ে আছে। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র প্রচারিত মহান ইসলাম ধর্ম এবং উদীয়মান ইসলামী সমাজ ও রাষ্ট্র-ব্যবস্থাকে ধ্বংস করার জন্য শয়তানের দোসর আর শত্রুদের প্রচেষ্টার কখনও কোনো কমতি ছিল না। শত্রুরা যখন প্রকাশ্যে ইসলামকে মোকাবেলা করার সর্বাত্মক চেষ্টায় ব্যর্থ হল তখন তারা বাহ্যিকভাবে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ও মুসলমান সেজেই ভেতর থেকে এই মহান ধর্মের ওপর আঘাত হানতে সচেষ্ট হল যাতে এই ধর্মের মূল শিক্ষা, চেতনা ও সংস্কৃতি ধীরে ধীরে বিকৃত এবং বিলুপ্ত হয়। বৃহত্তর মুসলিম সমাজের নানা উদাসীনতা ও কায়েমি স্বার্থবাদী মহলের চক্রান্তের পরিণতিতে ইসলামের এক সময়কার চরম শত্রু উমাইয়ারা মুসলমানদের নেতৃত্বের পদ দখল করে। তারা পবিত্র ইসলামী সমাজের ওপর চাপিয়ে দেয় রাজতন্ত্র ও স্বৈরতন্ত্র।


উমাইয়ারা ইসলামী নেতৃত্বের প্রকৃত হকদার এবং মুসলিম সমাজের সবচেয়ে যোগ্য, জ্ঞানী ও খোদাভীরু ব্যক্তিদের তথা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)’র পবিত্র আহলে বাইতকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য যুদ্ধ ও সংঘাতের পাশাপাশি রাজকীয় কোষাগারের সীমাহীন অপব্যবহারেও অভ্যস্ত ছিল। অর্থ-সম্পদ, ভোগ-বিলাস ও রাজকীয় পদমর্যাদার লালসায় নিমজ্জিত দরবারি আলেমরা বিশ্বনবীর পবিত্র আহলে বাইতকে বিদ্রোহী এবং পথভ্রষ্ট বলে ফতোয়া দিয়েছিল। এর পাশাপাশি তারা উমাইয়া নেতাদের ফজিলত ও মাহাত্ম্য তুলে ধরার জন্য রচনা করেছিল শত-সহস্র বা লক্ষাধিক জাল হাদিস।


সে সময়কার সামাজিক-রাজনৈতিক অবস্থার নানা চিত্র তুলে ধরেছেন ঐতিহাসিকরা নানা বর্ণনায়। এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায় বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি কবিতার কয়েকটি লাইন:


ওরে বাংলার মুসলিম তোরা কাঁদ্।..
তখতের লোভে এসেছে এজিদ কমবখতের বেশে !
এসেছে সীমার, এসেছে কুফা'র বিশ্বাসঘাতকতা,
ত্যাগের ধর্মে এসেছে লোভের প্রবল নির্মমতা !
মুসলিমে মুসলিমে আনিয়াছে বিদ্বেষের বিষাদ,
...কাঁদে আসমান জমিন, কাঁদিছে মহররমের চাঁদ।
একদিকে মাতা ফাতেমার বীর দুলাল হোসেনী সেনা,
আর দিকে যত তখত-বিলাসী লোভী এজিদের কেনা।..
এই ধূর্ত ও ভোগীরাই তলোয়ারে বেঁধে কোরআন,
আলী'র সেনারে করেছে সদাই বিব্রত পেরেশান !
এই এজিদের সেনাদল শয়তানের প্ররোচনায়
হাসানে হোসেনে গালি দিতে যেত মক্কা ও মদিনায়।.. …



উল্লেখ্য, উমাইয়া শাসকরা সিরিয়ার জনগণকে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা)’র পবিত্র আহলে বাইতের বিরুদ্ধে বিদ্বেষী প্রচারণায় এতোটা প্রভাবিত ও মাতিয়ে রেখেছিল যে আমিরুল মু’মিনিন হযরত আলী (আ) যখন পবিত্র রমজান মাসে কুফার মসজিদে এক ধর্মান্ধ খারিজির সন্ত্রাসী হামলায় শহীদ হন তখন সিরিয়ার অনেকেই বিস্মিত হয়ে বলেছিল: আলী কি মসজিদে যেতো ও নামাজ পড়তো!!? বলা হয় সিরিয়ার জনগণকে শৈশবেই আলী-বিদ্বেষী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য শাসক-গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে শিশুদের জন্য ছাগল-ছানা উপহার হিসেবে পাঠানো হত। আর শিশুরা যখন ওই মেষ শাবক নিয়ে খেলাধুলায় অভ্যস্ত হয়ে ওঠার কারণে এর গভীর অনুরাগী হয়ে উঠত তখন রাজ-দরবারের কর্মীরা এক রাতে ওই ছাগল-ছানা নিয়ে যেত। আর কে ওই ছাগল-ছানা নিয়ে গেছে শিশুরা তা জানতে চাইলে বলা হত আলী ওই ছাগল ছানা নিয়ে গেছে!! ফলে শৈশবেই সিরিয় শিশুদের কচি-মনে জন্ম নিত আলী (আ.) ও আহলেবাইতের প্রতি বিদ্বেষ।

 

৬০ হিজরিতে উমাইয়া শাসক মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর তার পুত্র ইয়াজিদ ক্ষমতার মসনদে আসীন হয়। সে মদীনার গভর্নরের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এ নির্দেশ দেয় যে, হুসাইনের কাছ থেকে যে কোনো ভাবেই হোক আনুগত্য আদায়ের ব্যাপারে খুব কড়াকড়ি করবে এবং আনুগত্য এড়ানোর কোনো সুযোগ বা সময় তাকে দেয়া যাবে না। এ নির্দেশ পেয়ে মদীনার গভর্নর ওলিদ বিন উৎবা কুখ্যাত উমাইয়া নেতা মারোয়ান বিন হাকামের পরামর্শ অনুযায়ী সে রাতেই একটি সভার আয়োজন করে ইমাম হুসাইন (আ)-কে সেই সভায় আসতে বলে যাতে মুয়াবিয়ার মৃত্যুর খবর প্রচারিত হওয়ার আগেই ইমামকে ইয়াজিদের প্রতি আনুগত্যের শপথ নিতে বাধ্য করা যায়। ইমাম হুসাইন (আ) নিরাপত্তার খাতিরে তাঁর অতি ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের নিয়ে গঠিত ত্রিশ জনের সশস্ত্র এক গ্রুপকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়ে ওই সভায় যোগ দেন। ওলিদ মুয়াবিয়ার মৃত্যুর সংবাদ জানিয়ে ইয়াজিদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে ইমামকে আহ্বান জানান। ইমাম তাকে জানান যে:


'হে ওলিদ! আমাদের বংশ হল নবুওত ও রেসালতের খনি এবং ফেরেশতাদের আসা-যাওয়ার স্থান ও খোদায়ী রহমতের স্থান। মহান আল্লাহ নবী-পরিবারের মাধ্যমে ইসলামকে উদ্বোধন করেছেন এবং এই বংশকে সঙ্গে নিয়েই ইসলামকে শেষ পর্যন্ত এগিয়ে নেবেন। আর ইয়াজিদ যার আনুগত্য করতে তুমি আমায় বলছ সে হচ্ছে এমন এক মদখোর ও খুনি যার হাত নিরপরাধ মানুষের রক্তে রঞ্জিত। সে হচ্ছে এমন এক ব্যক্তি যে আল্লাহর বিধি-বিধানের সীমানা লণ্ডভণ্ড করেছে এবং জনগণের সামনেই নানা অশ্লীল কাজ ও পাপাচারে লিপ্ত হচ্ছে। এ অবস্থায় অমন উজ্জ্বল রেকর্ড ও উন্নত পারিবারিক ঐতিহ্যের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আমার মত একজন ব্যক্তি কী এই পাপিষ্ঠের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করবে বা তার নেতৃত্ব মেনে নেবে? তোমার ও আমার উচিত এ বিষয়ে ভবিষ্যতের দিকে নজর দেয়া এবং তাহলে দেখতে পাবে যে খেলাফত বা মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্ব দেয়ার জন্য আমাদের মধ্যে কে বেশি উপযুক্ত?'

 


এভাবে ইসলামের সেই চরম দুর্দিনে নানার ধর্ম ও সম্মান রক্ষার জন্য এগিয়ে আসেন তাঁরই সুযোগ্য নাতি হযরত ইমাম হুসাইন (অ)। মহানবী (সা) তাঁকে উম্মতের নাজাতের তরী ও হেদায়াতের প্রদীপ বলে উল্লেখ করেছিলেন। এর অর্থ ইমাম হুসাইনের (আ) দেখানো পথ ও আদর্শ অনুসরণ ছাড়া মুসলমানরা তাদের ঈমান ও পবিত্র ধর্মকে রক্ষা করতে পারবে না। বিশ্বনবী (সা) গোটা আহলে বাইতকে (আ) নুহের নৌকার সঙ্গে তুলনা করলেও ইমাম হুসাইনের (অ) ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ওই বিশেষণ যুক্ত করেছেন যা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একজন ডুবন্ত বা আহত ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য দ্রুত গতিশীল বাহন বা গাড়ি দরকার। অন্যদিকে সাধারণ রোগীকে ধীরে-সুস্থে বা কিছুটা পরেও সাধারণ কোনো গাড়িতে চড়িয়ে হাসপাতালে নেয়া যায়। কারবালার মহাবিপ্লবের আদর্শ ও ইমাম হুসাইনের (আ) ভূমিকা মৃতপ্রায় ইসলামকে বাঁচানোর জন্য দ্রুত গতিশীল নৌকা বা বাহনের ভূমিকাই পালন করেছিল। #

 

রেডিও তেহরান/এএইচ

 

 

 

 

প্রশ্ন: কেন শিয়া মুসলমানরা অধিকাংশ মুসলমানের মতাদর্শের অনুসরণ করেন না? অথচ মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি (যা বর্তমান যুগেও) সবচেয়ে বেশি জরুরি এবং মুসলমানদের মধ্যে বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতা দূর করার একমাত্র পথ হল অধিকাংশের মতাদর্শকে গ্রহণ। অধিকাংশ মুসলমানের মতাদর্শ বলতে আকীদার ক্ষেত্রে আশা’আরী মতবাদ(*১) ও ফিকাহর ক্ষেত্রে আহলে সুন্নাত আল জামাআত তথা সুন্নি মুসলমানদের মাজহাবকেই(*২) বোঝানো হয় সাধারণত। 

 

উত্তর: প্রথমত: শিয়া মুসলমানরা মনে করেন শরীয়ত-সম্মত দলিল-প্রমাণই নবী (সাঃ)-এর আহলে বাইতের অনুসরণকে অপরিহার্যতা দান করেছে। যেহেতু তাঁরা নবুওয়াতের ছায়ায় প্রশিক্ষিত হয়েছেন, তাঁদের ঘরে ফেরেশতাদের আসা-যাওয়া ছিল, সেখানে আল্লাহ্ ওহী ও কোরআন অবতীর্ণ করেছেন তাই শিয়ারা আকীদা-বিশ্বাস, ফিকাহ্ ও শরীয়তের আহ্কাম কোরআন ও সুন্নাহর জ্ঞান, চারিত্রিক গুণ ও বৈশিষ্ট্য এবং সামাজিক আচরণের ক্ষেত্রে তাঁদের অনুসারী হয়েছেন। শিয়ারা এটি করেন কেবল যুক্তি-প্রমাণের প্রতি আত্মসমর্পণের কারণে। আল্লাহর রাসূলের সুন্নাহর প্রতি বিশ্বাসের কারণেই শিয়া মুসলমানরা এ পথকে বেছে নিয়েছেন।

 

দ্বিতীয়ত: শিয়া মাজহাবের দৃষ্টিতে সুন্নি মাজহাব অন্য মাজহাবের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য কোন যুক্তি উপস্থাপনে সক্ষম নয় বলে কিরূপে এর অনুসরণ অপরিহার্য  বা ফরজ হতে পারে? শিয়া মুসলমানরা মুসলমানদের প্রদর্শিত যুক্তিগুলোর ওপর পরিপূর্ণ ও যথার্থ দৃষ্টি দিয়ে পর্যালোচনা ও গবেষণা চালিয়েছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা আহলে সুন্নাহর অনুসরণের পক্ষে উপযুক্ত কোন দলিল পাননি। আহলে সুন্নাতের অনুসরণের সপক্ষে যুক্তি হিসেবে অনেকেই তাদের ইমামদের নানা গুণ আর যোগ্যতা যেমন- আমানতদারী, ন্যায়পরায়ণতা, ইজতিহাদের ক্ষমতা, মর্যাদা প্রভৃতির কথা বলেন। কিন্তু এসব বিষয় শুধু তাঁদের মধ্যেই ছিল না, অন্যরাও এর অধিকারী ছিলেন। তাই শুধু তাঁদের মাজহাবের অনুসরণ কিভাবে ওয়াজিব বলে গণ্য হবে?

 

শিয়া মুসলমানরা এটাও মনে করেন না যে জ্ঞান ও কাজের দিক থেকে সুন্নি মাজহাবের শ্রদ্ধেয় ইমামগণ শিয়া মাজহাবের ইমামদের চেয়েও উত্তম। বরং নবী (সাঃ)-এর পবিত্র বংশধর যাঁরা হলেন উম্মতের মুক্তির তরণী, ক্ষমার দ্বার(*৩), ধর্মীয় বিভক্তির ফেতনা হতে রক্ষার কেন্দ্র, হেদায়েতের পতাকাবাহী, রাসূলের রেখে যাওয়া সম্পদ এবং ইসলামী উম্মতের মাঝে রাসূলের স্মৃতিচিহ্ন- তাঁরা অবশ্যই সর্বোত্তম। কারণ তাঁদের সম্পর্কে রাসূল (সাঃ) বলেছেন, “তাদের থেকে তোমরা অগ্রগামী হয়ো না তাহলে তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে, তাঁদের সঙ্গে সংযুক্ত হবার ক্ষেত্রে অবজ্ঞার পথ বেছে নিও না তাহলেও তোমরা ধ্বংস হয়ে যাবে, তাঁদেরকে কোন কিছু শিক্ষা দিতে যেও না কারণ তাঁরা তোমাদের  চেয়ে বেশি জ্ঞানী।”

 

কিন্তু রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের কারণে অন্যরা তাঁদের অগ্রগামী হয়েছেন। সুন্নি ভাইদের অনেকেই এ বিষয়ে অবহিত নন যে, পূর্ববর্তী সৎ কর্মশীলগণ ও পরবর্তীতে যাঁরা এসেছিলেন তাঁদের মধ্যে রাসূলের বংশধরদের অনুসারীগণ তথা শিয়া মুসলমানরা প্রকৃতপক্ষে মুসলিম উম্মাহর অর্ধেক ছিলেন এবং তারা আহলে বাইতের ইমামগণ ও রাসূলুল্লাহর রেখে যাওয়া দ্বিতীয় ثقل বা ভারী বস্তুর প্রতি ঈমান রাখতেন (প্রথমটি কুরআন ও দ্বিতীয়টি মহানবী-সা.’র পবিত্র বংশধর বা আহলে বাইত)। এ জনগোষ্ঠীর মধ্যে এ বিষয়ে বিন্দুমাত্র বিচ্যুতি দেখা যায় নি এবং তাঁরা হযরত আলী (আঃ) ও ফাতিমা (আঃ)-এর সময়কাল হতে এখন পর্যন্ত এ প্রথানুযায়ী আমল করেছেন। সে সময়ে আশা’আরী, চার মাজহাবের ইমামগণ বা তাঁদের পিতৃকুলেরও কেউই ছিলেন না।

 

তৃতীয়ত:  হিজরি প্রথম তিন শতাব্দীতে মুসলমানরা সুন্নি মাজহাবগুলোর কোনটিরই অনুসারী ছিলেন না। প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতাব্দীর মুসলমানদের অবস্থান কোথায় আর এ মাজহাবগুলোরই বা অবস্থান কোথায়? অথচ সে সময়কাল ইসলামের জন্য শ্রেষ্ঠ সময় ছিল বলে সুন্নি আলেমগণই স্বীকার করে থাকেন। আশা’আরী ২৭০ হিজরিতে জন্মগ্রহণ করেন ও ৩৩৫ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। আহমদ ইবনে হাম্বল ১৩৪ হিজরিতে জন্ম ও ২৪১ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন। শাফেয়ী ১৫০ হিজরিতে জন্মগ্রহণ ও ২০৪ হিজরিতে ইন্তেকাল করেন। মালিক ৯৫ হিজরিতে জন্ম ও ১৭৯ হিজরিতে ওফাত প্রাপ্ত হন। আবু হানীফা ৮০ হিজরিতে জন্ম ও ১৫০ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন।

 

কিন্তু শিয়ারা ইসলামের প্রাথমিক যুগ হতে নবী (সাঃ)-এর আহলে বাইতের প্রতি অনুগত ছিলেন কারণ আহলে বাইত নবুওয়াতের ঘরের বিষয়ে বেশি জানতেন অথচ অন্যরা তখন সাহাবী ও তাবেয়ীদের অনুসরণ করতেন।(*৪)

 

তাই কোন্ যুক্তিতে সব মুসলমানকে তিন শতাব্দী পর(*৫) যেসব মাজহাবের উৎপত্তি হয়েছে সেগুলোর প্রতি আনুগত্যের শপথ দেয়া হয় অথচ প্রথম তিন শতাব্দীর অনুসৃত পথের কথা বলা হয় না? কি কারণে তাঁরা মহান আল্লাহর গ্রন্থ কোরআনের সমকক্ষ অপর ’ভারী বস্তু’ তথা মহানবীর (সা) রক্তজ বংশধর, তাঁর জ্ঞানের দ্বার, মুক্তি-তরণী, পথ-প্রদর্শক, উম্মতের রক্ষা পাবার পথ হতে নিজেদের সরিয়ে নিয়েছেন?

 

চতুর্থত: কেন ইজতিহাদের যে পথটি তিন শতাব্দী ধরে মুসলমানদের জন্য উন্মুক্ত ছিল হঠাৎ করে তা চিরতরে বন্ধ করে দেয়া হল? এটি অক্ষমতার আশ্রয় গ্রহণ, আস্থা হতে অনাস্থা ও অলসতার দিকে প্রত্যাবর্তন বৈ কিছু নয়। এটি কি অজ্ঞতায় সন্তুষ্টি ও বঞ্চনায় তুষ্টতার নামান্তর নয়?

 

কোন্ ব্যক্তি জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে নিজেকে এ বাস্তবতার প্রতি সন্তুষ্ট মনে করতে পারে এবং বলতে পারে?

 

মহান আল্লাহ্ তাঁর প্রেরিত নবী ও রাসূলদের সর্বশেষ এবং সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিকে সর্বোত্তম গ্রন্থ যা চূড়ান্ত জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও আইনের সমষ্টি তা দিয়ে প্রেরণ করেছেন যাতে করে তাঁর দীন পূর্ণাঙ্গ ও নিয়ামত সম্পূর্ণ হয় এবং কিয়ামত পর্যন্ত সব কিছুর সমাধান তা থেকে পাওয়া যায়। অথচ তা চার মাজহাবের ইমামের মধ্য দিয়ে পরিসমাপ্তি ঘটবে এবং তাঁরা সকল জ্ঞানকে সমবেত করবেন এমনরূপে যে অন্যদের অর্জন করার মত কিছু অবশিষ্ট থাকবে না যেন কোরআন, সুন্নাহ্ ও ইসলামের বিধি-বিধান এবং অন্যান্য দলিল-প্রমাণ কেবল তাঁদেরই মালিকানা ও সত্তায় দেয়া হয়েছে অন্যরা এ সকল বিষয়ে মত প্রকাশের কোন অধিকার রাখেন না। তবে কি তাঁরাই নবীগণের উত্তরাধিকারী ছিলেন? কিংবা এমন যে মহান আল্লাহ্ তাঁর নেতৃত্ব ও প্রতিনিধিত্বের সিলসিলা তাঁদের মাধ্যমে সমাপ্ত করেছেন, এমন কি অতীত ও ভবিষ্যতের জ্ঞানও তাঁদের দেয়া হয়েছে এবং তাঁদের এমন কিছু দেয়া হয়েছে যা বিশ্বজগতের কাউকে দেয়া হয় নি? না, কখনোই নয়, বরং তাঁরাও অন্য জ্ঞানী ব্যক্তিবর্গের মত ইসলামের খেদমতকারী ও ইসলামের প্রতি আহ্বানকারী ছিলেন এবং দীনের আহ্বানকারীগণ জ্ঞান ভাণ্ডারের দ্বারকে কখনো বন্ধ করেন না, তার পথকেও কখনো রুদ্ধ করেন না। তাঁদেরকে কখনো এজন্য সৃষ্টি করা হয় নি যে, বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তিকে অবরুদ্ধ করবেন বা মানব জাতির চক্ষুকে বেঁধে রাখবেন। তাঁরা মানুষের হৃদয়কে তালাবদ্ধ, কানকে বধীর, চোখকে পর্দাবৃত ও মুখকে তালাবদ্ধ করতে আসেন নি। তাঁরা হাত, পা বা গর্দানেও কখনো শেকল পরাতে চান না। মিথ্যাবাদী ছাড়া কেউই তাঁদের প্রতি এরূপ অপবাদ আরোপ করতে পারে না। তাঁদের নিজেদের কথাই এর সর্বোত্তম প্রমাণ।(*৬)

 

পঞ্চমত: মুসলমানদের মুক্তি ও ঐক্যের প্রসঙ্গে শিয়া আলেমগণ মনে করেন মুসলমানদের ঐক্যের বিষয়টি সুন্নি হয়ে যাওয়া বা সুন্নি সম্প্রদায়ের শিয়া হবার ওপর নির্ভরশীল নয়, এজন্যই শিয়াদের ওপরও এমন কোনো দায়িত্ব বর্তায় না যে, নিজের মাজহাব থেকে সরে আসবে। যেহেতু এটি যুক্তিহীন তেমনি বাস্তবে এটি সম্ভবও নয় যা পূর্ববর্তী আলোচনা থেকে মোটামুটি বোঝা যায়।

 

তাই মুসলমানদের ঐক্য যেখানে সম্ভব তা হল সুন্নি ভাইয়েরা আহলে বাইতের পথকে একটি স্বতন্ত্র ও স্বাধীন মাজহাব বলে স্বীকৃতি দান করুন এবং মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত মাজহাবগুলো একে অপরকে যে দৃষ্টিতে দেখে তদ্রুপ আহলে বাইতের অনুসারী মাজহাবকেও তথা শিয়াদেরকেও দেখুন। যে কোন মুসলমানই যেরূপ স্বাধীনভাবে হানাফি, শাফেয়ী, মালিকী ও হাম্বলী মাজহাবের অনুসরণ করতে পারেন সেরূপ যেন আহলে বাইতের মতানুসারেও আমল করতে পারেন।

 

এ পদ্ধতিতে মুসলমানদের বিচ্ছিন্নতা ও বিভেদ একাত্মতায় পরিণত হবে এবং এ ঐক্য সুশৃঙ্খল ও সংহতও হবে। (উল্লেখ্য, মিশরের প্রখ্যাত সুন্নি আলেম আলআজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান মরহুম শেইখ মাহমুদ শালতুত এক ঐতিহাসিক ফতোয়ায় শিয়া মাজহাবকে মুসলমানদের পঞ্চম মাজহাব বলে স্বীকৃতি দিয়ে আধুনিক যুগেও ইসলামী-ঐক্যের দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ১৯৫৯ সালের সেই ঐতিহাসিক ফতোয়ার পরও মিশরের আলআজহার বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত সুন্নি আলেমদের অনেকেই এই একই মত প্রকাশ করে আসছেন। এখানে শেইখ শালতুতের সেই ঐতিহাসিক ফতোয়ার ছবি দেয়া হল।)

 

(শেইখ শালতুতকে প্রশ্ন করা হয়েছিল ধর্মীয় দায়িত্ব ও বিধি-বিধান পালনের ক্ষেত্রে মুসলমানদেরকে যে কোনো একটি মাজহাবের বিধি-বিধান অনুসরণ করতে হয়। কিন্তু শিয়া ইসনা আশারিয়া বা বারো ইমামী শিয়া মাজহাব সুন্নি মাজহাবগুলোর অন্তর্ভুক্ত নয়। তদ্রুপ জাইদি শিয়া মাজহাবও নয়। এ অবস্থায় শিয়া ইসনা আশারিয়া মাজহাবের বিধি-বিধানের অনুসরণ কী ইসলামের সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ বা ইসলাম-বিরোধী নয়?

 

জবাবে শেইখ শালতুত তাঁর এই লিখিত ফতোয়ায় বলেছেন: ইসলাম তো মুসলমানদের জন্য কোনো একটি বিশেষ মাজহাবের অনুসরণকে বাধ্যতামূলক করেনি। বরং যে কোনো মুসলমান ইসলামের যে কোনো মাজহাব বা যে কোনো ধারা থেকে সঠিকভাবে বর্ণিত বিধানের- যা ওই মাজহাব বা ধারার নির্দিষ্ট বইয়ে সংকলিত হয়েছে-অনুসরণ করতে পারেন। যারা (সুন্নিদের) চার মাজহাবের অনুসারী তারা (এর বাইরেও) অন্য যে কোনো মাজহাবের বা ধারার অনুসারী হতে পারেন তথা আগের মাজহাবের অনুসরণ ছেড়ে দিয়ে ভিন্ন মাজহাবেরও অনুসারী হতে পারেন।

 

জাফরি মাজহাব যা ইমামী ইসনা আশারী (বারো ইমামী) মাজহাব নামেও খ্যাত তা এমন এক মাজহাব যার অনুসরণ আহলে সুন্নাতের মাজহাবগুলোর অনুসরণের মতই বৈধ। তাই মুসলমানদের উচিত এ বাস্তবতাটিকে উপলব্ধি করা এবং কোনো একটি মাজহাব সম্পর্কে অন্যায্য সংকীর্ণতা বা বিদ্বেষ হতে দূরে থাকা। কারণ, আল্লাহর দীন ও শরিয়ত কোনো মাজহাবের অনুসারী ছিল না এবং তা কোনো বিশেষ মাজহাবের একচেটিয়া আধিপত্য বা একক কর্তৃত্বের আওতায়ও থাকবে না। বরং সব মাজহাবের নেতা বা ইমামরাই ছিলেন মুজতাহিদ বা ধর্মীয় আইন-বিশেষজ্ঞ। তাঁদের গবেষণা-লব্ধ বিধান বা মতগুলো আল্লাহর দরবারে কবুল হয়েছে। আর যারা বিশেষজ্ঞ বা মুজতাহিদ নন তারা তাদের পছন্দের যে কোনো মাজহাবের অনুসরণ করতে পারেন। ইবাদত ও লেন-দেন বা নানা কাজকারবারের ক্ষেত্রেও এই নীতি বা সত্যটি প্রযোজ্য। মাহমুদ শালতুতের স্বাক্ষর।) 

 

আর এটাও সবাই জানেন যে, চার মাজহাবের মধ্যে বিদ্যমান অনৈক্য শিয়া ও সুন্নির মধ্যকার বিদ্যমান অনৈক্য হতে কম নয়। এই মাজহাবগুলোর (ধর্মীয় মৌল ও শাখাগত বিষয়ে) প্রকাশিত হাজারো গ্রন্থ এর সপক্ষে প্রমাণ হিসেবে রয়েছে। তাই কেন সুন্নিদের অনেকেই এ গুজব ছড়ান যে শিয়ারা আহলে সুন্নাহর বিরোধী? বরং তারা  কেনো এ কথা বলেন না আহলে সুন্নাহ্ তথা সুন্নিরা শিয়া বিরোধী? কেন তাঁরা এটাও বলেন না  যে আহলে সুন্নাতেরই তথা সুন্নিদেরই এক দল  তাদের অন্যদলের বিরোধী? যদি চারটি মাজহাব থাকা জায়েজ হয় তবে কেন পঞ্চম মাজহাব জায়েজ হবে না? যদি চার মাজহাব ঐক্য ও সমঝোতার কারণ হয় কেন পাঁচ মাজহাবে পৌঁছলে তা বিভেদ ও বিচ্ছিন্নতার কারণ হবে? প্রকৃতপক্ষে মুসলমানদের প্রত্যেকের এক এক পথে গমন করা পরস্পর থেকে দূরে সরে যাবার কারণ নয় কি?

 

উত্তম হত কোনো কোনো সুন্নি ভাই যেমনভাবে আমাদের ঐক্যের দিকে ডাক দিচ্ছেন তেমনিভাবে চার মাজহাবের অনুসারীদেরও সেই দিকে ডাক দিতেন। সুন্নি মুসলমানদের জন্য চার মাজহাবের মধ্যে ঐক্য স্থাপন  বেশি সহজ নয় কি? কেন ঐক্যের বিষয়টিতে কেবল শিয়াদের প্রতি বিশেষভাবে আহ্বান রাখা হবে?

 

কেনো সুন্নি ভাইদের কেউ কেউ একজন লোকের আহলে বাইতের অনুসারী হওয়াকে ইসলামী সমাজের ঐক্য ও সংহতির পরিপন্থী মনে করছেন, অথচ সুন্নি মাজহাবগুলোর দৃষ্টিভঙ্গি, পথ ও চাওয়া-পাওয়ার হাজারো পার্থক্য সত্ত্বেও তাকে চার মাজহাবের ঐক্যের জন্য অন্তরায় মনে করছেন না?!!

 

(বি. দ্র: *১।         আহলে সুন্নাহ’র ভাইয়েরা উসুলে দীনের ক্ষেত্রে দু’টি প্রধান ধারার অনুসারী : মু’তাযিলা ও আশা’ইরা। তবে এ দু’টি ছাড়াও অন্যান্য মতবাদ রয়েছে, তবুও তাদের বেশিরভাগই এ দু’য়েরই বেশি অনুসারী।

আশা’ইরা মতবাদের প্রবক্তা আবুল হাসান আলী ইবনে ইসমাঈল আশা’আরী ছিলেন সাহাবী আবু মুসা আশা’আরীর বংশের লোক। তাই কখনো কখনো এ মাজহাবকে আশা’আরী মাজহাবও বলা হয়। 

*২।       আহলে সুন্নাহ্ ওয়াল জামাআহ্ ফুরুয়ে দীন অর্থাৎ ফেকাহগত বিধিবিধানের ক্ষেত্রে চার মাজহাবের অনুসারী অর্থাৎ হানাফি, মালিকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী পর্যায়ক্রমে আবু হানিফা, মালিক ইবনে আনাস, মুহাম্মদ ইবনে ইদরিস শাফেয়ী এবং আহমাদ ইবনে হাম্বলের নামে পরিচিত। আহলে সুন্নাহর এ চার মাজহাবকে একত্রে ‘মাজাহিব-ই আরবাআহ্’ বলা হয়।) #

 

প্রাসঙ্গিক আলোচনা:

 

আহলে বাইতের অনুসরণ ফরজ হবার সপক্ষে কিছু প্রমাণ:

 

 আহলে বাইতের ইমামগণ অন্যদের থেকে উচ্চ পর্যায়ের এবং একক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ছিলেন। কারণ পূর্ববর্তী নবীগণের জ্ঞান তাঁরা রাসূল (সাঃ)-এর মাধ্যমে অর্জন করেছিলেন এবং দীন ও দুনিয়ার বিধি-বিধান ও আহকাম তাঁর থেকেই শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন।

 

১। এ কারণেই রাসূল (সাঃ) আল্লাহর মহান গ্রন্থের পাশাপাশি তাঁদের স্থান দিয়েছেন এবং জ্ঞানবানদের পথপ্রদর্শক বলে তাঁদের পরিচিত করিয়েছেন। শুধু তাই নয়, নিফাক ও দ্বিমুখিতার সময় তাঁদেরকে মুক্তির তরণী হিসেবে এবং বিভেদ-বিচ্ছিন্নতার প্রতিকূল বায়ুপ্রবাহে নিরাপদ আশ্রয় বলেছেন। আরো বলেছেন তাঁরা ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের ক্ষমা প্রাপ্তির পথ এবং এমন এক শক্তিশালী রজ্জু যা ছিন্ন হবার নয়। 

 

২। আমীরুল মুমিনীন আলী (আঃ) বলেছেন, “তোমরা কোথায় চলেছো,  কোন্ দিকে যাত্রা করছো অথচ সত্যের ধ্বজা উত্তোলিত হয়েছে, তার চি‎হ্নগুলো প্রকাশিত হয়েছে, হেদায়েতের আলো প্রজ্জ্বলিত হয়েছে, এমতাবস্থায় অজ্ঞতার সাথে কোন্ দিকে যাত্রা করছ? কিরূপে ভ্রান্তিতে ঘুরপাক খাচ্ছ? অথচ নবীর আহলে বাইত তোমাদের সাথে রয়েছে, যারা সত্যের লাগাম, ধর্মের ধ্বজাধারী এবং সত্যের মুখপাত্র, তাই তাদের সেখানে স্থান দাও যেখানে কোরআনকে সংরক্ষণ কর (অর্থাৎ তোমাদের হৃদয় ও অন্তঃকরণ) ও তৃষ্ণার্তরা যেরূপ পিপাসা নিবারণের জন্য উদগ্রীব তেমনি তাদের জ্ঞানের সুপেয় ঝরনার পানি পানে তৃষ্ণা নিবারণের উদ্দেশ্যে তাদের দিকে ধেয়ে যাও।

 

হে লোকসকল! রাসূল (সাঃ) থেকে এ সত্যকে শিক্ষালাভ কর। তিনি বলেছেন : আমাদের মধ্য হতে কেউ মৃত্যুবরণ করলে প্রকৃতই সে মৃত্যুবরণ করে না এবং আমাদের কেউই পুরাতন ও পশ্চাৎপদ হতে পারে না, সুতরাং যা জানো না তা বলো না। অসংখ্য সত্য সেখানেই লুকিয়ে রয়েছে যাকে তোমরা অস্বীকার কর। ঐ ব্যক্তি যার বিপক্ষে তোমাদের কাছে কোন সাক্ষ্যপ্রমাণ নেই তার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করো। আমি তাদেরই (আহলে বাইতের) অন্তর্ভুক্ত। আমি কি তোমাদের মাঝে কোরআন (প্রথম ভারী বস্তু) অনুযায়ী আমল করি নি এবং আমার আহলে বাইতকে (দ্বিতীয় ভারী বস্তু) তোমাদের মাঝে রেখে যাচ্ছি না? আমি কি ঈমানের পতাকাকে তোমাদের মাঝে উড্ডীন করিনি?”১(*৭)

 

অন্যত্র তিনি বলেছেন, “তোমাদের দৃষ্টি তোমাদের নবীর আহলে বাইতের প্রতি নিবদ্ধ করো। তারা যেদিকে যায় সেদিকে যাও, তাদের পদানুসরণ করো। তারা তোমাদের সত্য ও হেদায়েতের পথ হতে কখনো পথভ্রষ্ট করবে না এবং অধঃপতনের দিকে পরিচালিত করবে না। যদি তারা নীরবতা পালন করে তোমরাও নীরবতা পালন করবে, যখন সংগ্রামে লিপ্ত হয় সংগ্রামে লিপ্ত হবে, তাদের থেকে অগ্রগামী হয়ো না, তাহলে পথভ্রষ্ট হবে। তাদের থেকে পিছিয়ে পড়ো না, তাহলে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে।”২ 

 

অন্য এক স্থানে মানুষকে আহলে বাইতের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, “তারা জ্ঞানের প্রাণ ও অজ্ঞতার মৃত্যুদাতা, তাদের সহনশীলতা তোমাকে তাদের জ্ঞান সম্পর্কে, তাদের বাহ্যিক ব্যবহার ও আচরণ তোমাকে তাদের অন্তরের পরিচ্ছন্নতা সম্পর্কে এবং নীরবতা তোমাকে তাদের যুক্তির গভীরতা সম্পর্কে অবহিত করবে। তারা কখনোই সত্যের বিরোধিতা করে না এবং এ বিষয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বে পতিত হয় না, তারা ইসলামের ভিত্তি এবং নিরাপত্তাদাতা, তাদের মাধ্যমেই সত্য তার প্রকৃত স্থানে সমাসীন হয় এবং বাতিল স্থানচ্যুত ও তার জিহ্বা কর্তিত হয়। তারা আল্লাহর আইন ও বিধি-বিধান সঠিকভাবে অনুসরণ করেছে ও তার ওপর আমল করেছে। ধর্মের বর্ণনা ও প্রচারকারী কত বেশি কিন্তু ধর্মকে সঠিকভাবে বুঝেছে এমন মানুষের সংখ্যা কত কম!”৩ 

 

অন্য একটি খুতবায় বলেছেন, “নবীর বংশধর সর্বোত্তম বংশধর, তাঁর পরিবারও সর্বোত্তম পরিবার, তাঁর আগমন সর্বোত্তম বংশ হতে, তাঁর জন্ম সেই বৃক্ষ হতে যা আল্লাহর ঘরে জন্মেছে এবং সম্মান ও মর্যাদার মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে। এ বৃক্ষের শাখা সমুচ্চ ও প্রসারিত এবং এর ফলও অগণিত।”৪

 

অন্যত্র বলেছেন, “আমরা নবী করিম (সাঃ)-এর জ্ঞানের ধারায় ইসলামী জ্ঞানের মানদণ্ড, গুপ্তভাণ্ডার ও দরজা। দরজা ছাড়া অন্য কোনো স্থান দিয়ে ঘরে প্রবেশ অবৈধ। যে দরজা ছাড়া অন্য মাধ্যম দিয়ে ঘরে প্রবেশ করবে তাকে চোর বলা হয়।’ এ খুতবারই অন্য অংশে বলেছেন, “তাঁদের বিষয়ে কোরআনের আয়াত নাযিল হয়েছে। তাঁরা আল্লাহ্ পাকের প্রেরিত জ্ঞানভাণ্ডার। তাই যখন তাঁরা কথা বলেন সত্য বলেন। যখন নীরবতা পালন করেন কেউ তাঁদের অগ্রগামী হতে পারে না। দীনের অগ্রদূত ও পতাকাধারীরা কখনোই তাঁদের অনুসারীদের মিথ্যা বলতে পারে না, বরং অন্যদের বিবেক ও মন-মানসিকতাকে দীনের জন্য উপযোগী করে তোলাই তাঁদের দায়িত্ব।”১

 

আবার বলেছেন, “তোমরা কখনোই সত্য ও হেদায়েতের পথকে চিনতে পারবে না যতক্ষণ না এ পথ পরিত্যাগকারীদের চিনবে এবং কোরআনের যুক্তি ও মানদণ্ডকে কখনোই বুঝতে সক্ষম হবে না যতক্ষণ না এর বিরোধী ও লঙ্ঘনকারীদের চিনবে, কোরআনের সঙ্গে ততক্ষণ পর্যন্ত সংযুক্ত হতে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না ঐ ব্যক্তিবর্গকে চিনবে যারা কোরআনকে পেছনে নিক্ষেপ করেছে। তাই কোরআনকে এর প্রকৃত ব্যাখ্যাকারীদের কাছ থেকে গ্রহণ কর (কারণ এ সকল বিচ্যুত ব্যক্তিবর্গকে তাঁরাই সঠিকভাবে চিনেন) যাঁরা জ্ঞানের প্রাণ ও অজ্ঞতার মৃত্যুদানকারী। তাঁরা এমন ব্যক্তিবর্গ (আহলে বাইত) যাঁদের বিচার ও ফয়সালা তোমাদেরকে তাঁদের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা সম্পর্কে অবহিত করবে, তাঁদের নীরবতা তোমাদেরকে তাঁদের যুক্তির ক্ষুরধারতা সম্পর্কে এবং তাঁদের বাহ্যিক আচরণ তোমাদের তাঁদের অন্তরের বিশুদ্ধতা সম্পর্কে জানাবে। তাঁরা দীনের বিরোধিতা করতে পারেন না এবং এ বিষয়ে দ্বিধা-দ্বন্দ্বেও পতিত হন না। কোরআন তাঁদের কাছে প্রত্যক্ষ সাক্ষীরূপে নীরব বর্ণনাকারী।”২

 

এ খুতবাগুলো ছাড়াও এ মহান ব্যক্তির অন্য অনেক বক্তব্য আমাদের কথার সত্যতা প্রমাণ করে। এরকম একটি বক্তব্য হল, “আমাদের মাধ্যমেই তোমরা অজ্ঞতা ও পথভ্রষ্টতার অন্ধকার হতে মুক্তি পেয়েছ, আমাদের সাহায্যেই তোমরা উন্নতির শিখরে আরোহণ করেছ, তোমাদের সৌভাগ্যের সকাল আমাদের আলোকরশ্মিতে উদ্ভাসিত হয়েছে।”৩

অন্যত্র বলেছেন, “হে লোকসকল! সত্যপথের আহ্বানকারী ও সদুপদেশদাতা যিনি সৎ কর্মশীল অর্থাৎ কর্মের মধ্যে তার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন তাঁর অস্তিত্বের প্রদীপরূপ আলোর মাধ্যমে নিজেদের আলোকিত করো, সেই পরিচ্ছন্ন ও সুপেয় ঝরণা যার মধ্যে কোন দূষণ ও আবর্জনার অস্তিত্ব নেই তা থেকে পানি গ্রহণ কর।”৪ 

 

অন্য একস্থানে নিজেদের পরিচয় এভাবে দিয়েছেন, “আমরা নবুওয়াতের বৃক্ষ, রেসালতের ভিত্তি, ফেরেশতাদের গমনাগমনের স্থান, জ্ঞানের খনি ও প্রজ্ঞার উৎসস্থল। আমাদের বন্ধু ও সাহায্যকারীরা রহমতের প্রতীক্ষায় রয়েছে, আর আমাদের শত্রু ও বিদ্বেষীরা আল্লাহর শাস্তি ও গজবের অপেক্ষায়।”৫

 

আবার বলেছেন, “আমরা ভিন্ন তারা কোথায় যারা নিজেদেরকে মিথ্যা ও অন্যায়ভাবে জ্ঞানের প্রতিভূ ভেবেছিল? তারা লক্ষ্য করুক, মহান আল্লাহ্ আমাদের কিরূপ উচ্চ মর্যাদা দান করেছেন ও তাদের বঞ্চিত করেছেন। আমাদের দিয়েছেন ও তাদের বঞ্চিত করেছেন। আমাদের তাঁর রহমতের ছায়ায় আশ্রয় দিয়েছেন ও তাদের বহিষ্কার করেছেন। আমাদের মাধ্যমেই মানুষ হেদায়েতপ্রাপ্ত হবে ও অন্ধকার হৃদয়ের অধিকারীরা আলোকিত হবে। ইমাম ও নেতা কুরাইশ হতে এবং তাদের অস্তিত্বের এ পবিত্র বৃক্ষের উৎপত্তি বনু হাশিম থেকে। তাই অন্যরা ইমামতের যোগ্য নয় এবং তারা ছাড়া অন্যরা নেতৃত্ব লাভ করতে পারে না।”

 

যারা ইমামগণের বিরোধী তাদের সম্পর্কে একই খুতবায় বলেছেন, “তারা এ পৃথিবীর জীবনকে গ্রহণ করেছে ও পরকালীন অনন্ত জীবনকে অগ্রাহ্য করেছে। তারা সুপেয় পানি ত্যাগ করে নিকৃষ্ট ও দুর্গন্ধযুক্ত পানি পান করেছে।”১

 

অন্য খুতবাতে এ সম্পর্কে আলোচনা করেছেন। যেমন বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে যে কেউ এ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে যে, আল্লাহ্, তাঁর রাসূল ও তাঁর আহলে বাইতকে সত্য ও সঠিকভাবে চিনেছে সে শহীদ হয়েছে এবং তার বিনিময় আল্লাহর কাছে এবং ঐ কর্মেরও তারা পুরস্কার পাবে যে কর্মের সিদ্ধান্ত তারা গ্রহণ করেছিল। সৎ কর্ম করার আগ্রহ ও ইচ্ছা, মহানবীর (সা) আহলে বাইতের পক্ষে অস্ত্রধারণ সংগ্রাম ও জিহাদের সমান ও সমকক্ষ বলে গণ্য হবে।”২

 

উপরোক্ত খুতবার মত অন্যত্র বলেছেন, “আমরা পবিত্র, সম্মানিত ও আদর্শ মানব। আমাদের প্রতীক ও চি‎হ্ন নবী-রাসূলগণেরই প্রতীক‎চি‎হ্ন, আমাদের দল আল্লাহরই দল, আমাদের বিরুদ্ধাচারণকারীরা শয়তানের অনুসারী ও অনুচর। যারা আমাদের ও আমাদের শত্রু দেরকে সমান বলে জানে তারা আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।”৩

 

ইমাম হাসান (আ.) যিনি রাসূলের দৌহিত্র ও বেহেশতের যুবকদের নেতা তিনি এক খুতবায় বলেছেন, “আমাদের বিষয়ে আল্লাহকে ভয় কর, আমরা তোমাদের ইমাম ও নেতা।”৪

 

৩। ইমাম আলী ইবনুল হুসাইন আসসাজ্জাদ (আঃ) যখনই يا أيّها الّذين آمنوا اتّقوا الله و كونوا مع الصّادقين ‘হে ঈমানদারগণ, আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্যপন্থীদের সঙ্গে থাক’ এ আয়াতটি তিলাওয়াত করতেন তখন তিনি বেশি দোয়া করতেন। তিনি এ দোয়ায় সত্যপন্থীদের স্তরে পৌঁছার ও তাঁদের সঙ্গে মিলিত হবার জন্য প্রার্থনা করতেন। সে সাথে আহলে বাইতের শত্রুরা দীনের নেতৃবর্গ ও নবুওয়াতের বৃক্ষসমূহের ওপর যে অত্যাচার ও নির্যাতন চালিয়েছিল এবং যে সকল বিদআতের প্রচলন ঘটিয়েছিল সে বিষয়গুলো এ দোয়ায় উল্লেখ করে তা থেকে আল্লাহর কাছে মুক্তি চাইতেন। অতঃপর এর সঙ্গে নিম্নোক্ত কথাগুলো যোগ করেছেন, “অন্যরা আমাদের বিষয়ে কর্তব্যে অবহেলা করেছে আর এ অপকর্মের ব্যাখ্যা প্রমাণের জন্য কোরআনের রূপক (মুতাশাবিহ) আয়াতসমূহের ভিত্তিতে যুক্তি প্রদর্শন করেছে। তাদের নিজেদের মনগড়া মতে এ আয়াতগুলোকে ব্যাখ্যা ও তাফসীর করেছে এবং আমাদের বিষয়ে নবী করীম (সাঃ)-এর প্রতিষ্ঠিত কথা ও হাদীসকে অস্বীকার করেছে। সুতরাং ভবিষ্যতের মুসলমানরা আমাদের ছাড়া কার আশ্রয় গ্রহণ করবে?! এ জাতি অতীতের দিকে ফিরে গেছে এবং এ উম্মত বিভক্তিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে, একে অপরকে মিথ্যুক ও কাফের বলছে অথচ মহান আল্লাহ্ বলেছেন: তাদের মত হয়ো না যারা স্পষ্ট সাক্ষ্য ও প্রমাণ জানার পরও পরস্পর বিচ্ছিন্ন ও বিভক্ত হয়ে পড়েছে।১ অতএব, কার ওপর মানুষ বিশ্বাস করে আল্লাহর বাণীর সত্যতার প্রমাণ পেশ করবে, আল্লাহর বিধানের ব্যাখ্যা প্রদান করবে! এক্ষেত্রে কোরআনের সম্মান ও মর্যাদার অধিকারী হেদায়াতপ্রাপ্ত ইমামগণের সন্তানগণ যাঁরা উজ্জ্বল প্রদীপস্বরূপ তাঁরা ছাড়া কাউকে তোমরা পাবে কি? কেননা মহান আল্লাহ্ তাঁদের মাধ্যমেই তাঁর বান্দাদের ওপর প্রমাণ উপস্থাপন করেন। আল্লাহ্ তাঁর বান্দাদের মধ্যে অবশ্যই স্পষ্ট নিদর্শন পাঠিয়েছেন। তোমরা কি তাঁদের পরিচয় জানো? এ স্পষ্ট নিদর্শন রেসালতের পবিত্র বৃক্ষ হতে উৎসারিত নবীর বংশধর যাঁদের মহান আল্লাহ্ সব অপবিত্রতা ও কলুষতা হতে মুক্ত করেছেন ও পবিত্ররূপে ঘোষণা করেছেন, তাঁরা ছাড়া অন্য কেউ হতে পারে কি? যাঁদের মহান আল্লাহ্ অপবিত্রতা হতে সংরক্ষণ করেছেন এবং যাদের ভালবাসা ও বন্ধুত্বকে কুরআনে ফরয ও অপরিহার্য বলে ঘোষণা করেছেন। তাঁরা ছাড়া অন্য কেউ আল্লাহর নিদর্শন হতে পারে না।”২ ইমাম সাজ্জাদের এ বক্তব্যটি এবং আমীরুল মুমিনীন আলী (আঃ)-এর খুতবাগুলোর বিভিন্ন অংশ যথার্থভাবে লক্ষ্য করলে যে কেউ ভালভাবেই বুঝতে পারবেন যে শিয়া মাজহাবকে এ বাণীগুলো কিরূপ স্পষ্টভাবে উপস্থাপিত করে। এ বক্তব্যগুলোকে অন্যান্য ইমামদের বক্তব্যসমূহের নমুনা হিসেবেও গ্রহণ করা যায়। কারণ এ বিষয়ে তাঁদের মধ্যে ঐকমত্য রয়েছে এবং এসব বিষয়ে বর্ণিত হাদীসগুলো বহুল বর্ণিত ও মুতাওয়াতির। 

 

(বি. দ্র: সূত্র- ১। নাহজুল বালাগাহ্, খুতবা নং ৮৭  ২। নাহজুল বালাগাহ্, খুতবা নং ৯৭। ৩। নাহজুল বালাগাহ্, বাণী ২৩৯ (সুবহি সালিহ্) ৪।  নাহজুল বালাগাহ্, বাণী ৯৪ (সুবহি সালিহ্) এবং ১- নাহজুল বালাগাহ্, খুতবা নং ১৫৪; ২। নাহজুল বালাগাহ্, খুতবা নং ১৪৭; ৩। নাহজুল বালাগাহ্, খুতবা নং ৪; ৪। নাহজুল বালাগাহ্, খুতবা নং ১০৫; ৫। নাহজুল বালাগাহ্, খুতবা নং ১০৯;১। নাহজুল বালাগাহ্, খুতবা নং ১৪৪; ২। নাহজুল বালাগাহ্, ১৯০ নং খুতবার অংশ; ৩। আস্সাওয়ায়েক- ইবনে হাজার, পৃষ্ঠা ১৪২; ৪। আস্সাওয়ায়েক- ইবনে হাজার, পৃষ্ঠা ১৩৭।) 

 

মূল উৎস:  আল্লামাহ সাইয়্যেদ আবদুল হুসাইন শারাফুদ্দিন আল মুসাভীর লেখা বই  'আলমুরাজাআত' ও শেইখ শালতুতের ফতোয়া। #

 

 

 

৮ অক্টোবর (রেডিও তেহরান) : আজ হতে ১৪২৭ চন্দ্র-বছর আগে নবম হিজরির এই দিনে তথা ২৪ শে জিলহজ মদীনায় বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও নাজরানের খ্রিস্টান প্রতিনিধি দলের মধ্যে ঐতিহাসিক ‘মুবাহিলা’ হওয়ার কথা ছিল।

 

‘মুবাহিলা’ বলতে মিথ্যাবাদী কে তা প্রমাণের লক্ষ্যে মিথ্যাবাদীর ওপর আল্লাহর অভিশাপ বর্ষণের জন্য দোয়া বা প্রার্থনা করাকে বোঝায়। পবিত্র কুরআনের সুরা আলে ইমরানের ৬১ নম্বর আয়াতে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:

 

“অতঃপর তোমার কাছে জ্ঞান (কুরআন) এসে যাওয়ার পরও যদি কেউ (খ্রিস্টান) তোমার সঙ্গে তার (ঈসা)সম্পর্কে তর্ক-বিতর্ক করে, তাহলে বল- (আচ্ছা ময়দানে)এসো, আমরা আহ্বান করি আমাদের পুত্রদের এবং তোমাদের পুত্রদের এবং আমাদের নারীদের ও তোমাদের নারীদের এবং আমাদের নিজেদের বা (ঘনিষ্ঠ পুরুষ) সত্তাদের ও তোমাদের নিজেদের বা (ঘনিষ্ঠ পুরুষ) সত্তাদের; আর তারপর চল আমরা সবাই মিলে (আল্লাহর দরবারে) প্রার্থনা করি এবং মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর অভিসম্পাত বর্ষণ করি ।”

 

এই ঘটনাটি ঘটেছিল খ্রিস্টানদের সঙ্গে তিন দিন ধরে বিতর্ক চলার পর। রাসূল (সা.)’র মুখে মানুষের সঙ্গে সাদৃশ্যহীন আল্লাহর পরিচয় সম্পর্কে অকাট্য যুক্তি (হযরত আদম-আ.’র উদাহরণসহ) শোনার পরও নাজরানের খ্রিস্টান প্রতিনিধিরা ঈসা (আ.)-কে আল্লাহর পুত্র বা পুত্র-আল্লাহ বলার মত অদ্ভুত বিশ্বাসের ওপর অবিচল ছিল এবং বিশ্বনবী (সা.)-কে সত্য নবী হিসেবে মানতে অস্বীকার করছিল। (খ্রিস্টান পাদ্রিরা এ বিতর্কের সময় বলছিল যে হযরত ঈসা নবী-আ. যেহেতু পিতা ছাড়াই জন্ম নিয়েছেন তাই তিনি আসলে আল্লাহর পুত্র। জবাবে আল্লাহর রাসূল-সা. বলেছিলেন, আদম-আ. তো পিতা ও মাতা ছাড়াই জন্ম নিয়েছিলেন তাহলে তো আল্লাহর পুত্র হওয়ার সম্ভাবনা-নাউজুবিল্লাহ- তারই বেশি হওয়ার কথা ছিল!)


এ অবস্থায় রাসূল (সা.) মুবাহিলার চ্যালেঞ্জ জানান। অর্থাত যারা মিথ্যাবাদী তাদের ধ্বংসের জন্য উভয় পক্ষ আল্লাহর কাছে প্রার্থনা জানাবে। খ্রিস্টান পাদ্রিরা বেশ সাহস দেখিয়ে এই চ্যালেঞ্জ মেনে নেয়।


এ পরিস্থিতিতে নাজেল হয় পবিত্র কুরআনের ওই আয়াত। যেখানে মহান আল্লাহ উভয় পক্ষকে তাদের নারী, পুত্র, ঘনিষ্ঠ পুরুষ এবং শিশু সন্তানসহ শহরের বাইরে একটি ময়দানে জড় হওয়ার নির্দেশ দেন।


পরের দিন বিশ্বনবী (সা.) শান্তচিত্তে ও অবিচল আস্থা নিয়ে নির্ধারিত স্থানে আসেন। সঙ্গে ছিলেন কন্যা হযরত ফাতিমা জাহরা (সালামুল্লাহি আলাইহা.), জামাতা হযরত আলী (আ.) এবং নাতি হযরত ইমাম হাসান ও হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)। (তাঁদের সবার ওপর মহান আল্লাহর অশেষ দরুদ ও রহমত বর্ষিত হোক)


তাঁদের নুরানি চেহারা ও অভিব্যক্তি দেখেই খ্রিস্টানরা স্তম্ভিত হয়ে পড়ে। ইসলাম যে সত্য ধর্ম তা তারা বুঝতে পারে। তাই তারা মিথ্যাবাদীর ওপর খোদায়ী অভিশাপ বর্ষণের আহ্বান জানানোর চ্যালেঞ্জ প্রত্যাহার করে নেয়।


নাজরানের খ্রিস্টান প্রতিনিধি বা পাদ্রিদের প্রধান তখন তার সঙ্গীদের বলেছিলেন: আমি এমন জ্যোতির্ময় বা পুণ্যবান ব্যক্তিদের চেহারা দেখছি যারা খোদায়ী অভিশাপের জন্য হাত উঠালে পাহাড়গুলো তাদের স্থান থেকে সরে আসবে, তাই মুবাহিলা হতে হাত গুটিয়ে নেয়াই ভাল, নইলে কিয়ামত পর্যন্ত খ্রিস্টানদের নাম-নিশানাও থাকবে না। পরে তারা মুসলমান না হয়েই সন্ধি করে ও জিজিয়া কর দিতে সম্মত হয়।


তখন মহানবী (সা.) বলেন, “ আল্লাহর কসম! এরা যদি মুবাহিলা করত তাহলে আল্লাহ তাদের বানরে বা শুকরে রূপান্তরিত করতেন এবং ময়দান আগুনে পরিণত হত। আর নাজরানের একটি প্রাণীও এমনকি পাখি পর্যন্ত রক্ষা পেত না।”(তাফসিরে জালালালাইন, ১ম খণ্ড, পৃ.৬০, বায়দ্বাভী, ১ম খণ্ড, পৃ.১১৮, তাফসিরে দুররুল মানসুর, ২য় খণ্ড, পৃ.৩৯, মিশর মুদ্রণ)


এভাবে খ্রিস্টানদের সঙ্গে সংলাপে বিশ্বনবী (সা.)’র বিজয় এবং তাঁর পবিত্র আহলে বাইতের উচ্চতর মর্যাদা প্রকাশিত হওয়ার জন্য ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে এই ঘটনা। (কুরআনের আয়াত অনুযায়ী) বিশ্বনবীর (সা.) আহলে বাইত বা তাঁর পরিবারের বিশেষ নিষ্পাপ সদস্যদের প্রতি ভালবাসা ও আনুগত্য প্রদর্শন মুসলমানদের জন্য ফরজ। সুরা আলে ইমরানের ৬১ নম্বর আয়াতের অর্থ ইঙ্গিত করে যে, হযরত ফাতিমা জাহরা (সা.), জামাতা হযরত আলী (আ.) এবং নাতি হযরত ইমাম হাসান ও হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) হলেন রাসূল (সা.)'র পরিবারের বিশেষ মর্যাদার অধিকারী সদস্য তথা আহলে বাইত (আ.) ছিলেন। এ আয়াতে আলী (আ.) ও বিশ্বনবী (সা.) যৌথভাবে উল্লেখিত হয়েছেন 'আমাদের নিজেদের বা নিজ (ঘনিষ্ঠ পুরুষ মানুষ) সত্তাদের' হিসেবে। হাদিসেও (হুবশি ইবনে জানাদাহ থেকে বর্ণিত) এসেছে, বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, "আলী আমা থেকে ও আমি আলী থেকে এবং আলী ছাড়া অন্য কেউ আমাকে প্রতিনিধিত্ব করে না।"



বিশ্বনবী (সা.)'র আহলে বাইতের শানে কুরআনের কয়েকটি আয়াত নাজিল হওয়ার বার্ষিকী



নাজরানের খ্রিস্টান পাদ্রিদের সঙ্গে সংলাপে ও মুবাহিলার ঘটনায় বিশ্বনবী (সা.)'র বিজয়ের ঐতিহাসিক আগের রাতে বিশ্বনবী (সা.)'র আহলে বাইত বা তাঁর পরিবারের বিশেষ সদস্যদের নিষ্পাপ হওয়ার বিষয়ে নাজিল হয়েছিল সুরা আহজাবের ৩৩ নম্বর আয়াত। ওই আয়াতে এসেছে:


" হে নবী পরিবারের সদস্যগণ! আল্লাহ তো শুধু তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে (সব ধরনের ভুল-ত্রুটি ও পাপ থেকে) পূত-পবিত্র রাখতে চান।"


পবিত্র কুরআনে রাসূল (সা.)'র আহলে বাইতের প্রতি ভালবাসার নির্দেশ এসেছে। তাদের আনুগত্যও করতে বলা হয়েছে। যেমন, সুরা শুরার ২৩ নম্বর আয়াতে এসেছে:

 

قُلْ لَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ أَجْرًا إِلَّا الْمَوَدَّةَ فِي الْقُرْبَىٰ


"(হে নবী! আপনি)বলুন, আমি আমার দাওয়াতের জন্যে তোমাদের কাছে কোনো পারিশ্রমিক বা মজুরি চাই না কেবল আমার পরিবারের প্রতি ভালবাসা চাই।"



মহানবী (স.) তাঁর আহলে বাইত বলতে তাঁর নিষ্পাপ ও পবিত্র বংশধরকে বোঝাতেন। যেমন- হযরত ফাতিমা (সা.), ইমাম হাসান ও হুসাইন (সালামুল্লাহি আলাইহিম) ও আলী (আ.)। কেননা মুসলিম নিজের সহীহ হাদিস গ্রন্থে (মুসলিম শরীফ, ৭ম খণ্ড, পৃ-১৩০) এবং তিরমিযী স্বীয় সুনানে বিবি আয়েশা হতে বর্ণনা করেছেন যে,

نزلت هذه الآية علی النبی (صلی الله عليه [وآله] وسلّم)-
إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا
في بيت امّ سلمة، فدعا النبي -صلّی الله عليه [وآله] وسلّم- فاطمة و حسناً و حسيناً فجلّلهم بکساء و علی خلف ظهره فجلّله بکساء ثم قال: الّلهم هولاء أهل بيتی فاذهب عنهم الرجس و طَهّرهم تطهيراً. قلت أمّ سلمة: و انا معهم يا نبی الله؟ قال: أنت علی مکانک و أنت إلی الخير.


" হে নবী পরিবারের সদস্যগণ! আল্লাহ তো শুধু তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে এবং তোমাদেরকে পূর্ণরূপে (সব ধরনের ভুল-ত্রুটি ও পাপ থেকে) পূত-পবিত্র রাখতে চান।"- এই আয়াতটি মহানবী (স.) এর উপর উম্মুল মুমিনিন হযরত উম্মে সালমা (সা.)'র ঘরে অবতীর্ণ হয়। মহানবী (স.), ফাতিমা (সালামুল্লাহি আলাইহা.), হাসান (আ.) ও হুসাইন (আ.)কে নিজের ঢিলেঢালা লম্বা জামা তথা আলখাল্লার মধ্যে নিলেন এমতাবস্থায় আলী (আ.) তাঁর পেছনে অবস্থান করছিলেন। এরপর তাঁদের সবাইকে একটি চাদর দিয়ে ঢেকে এরূপ দোয়া করলেন: "হে আমার প্রতিপালক! এরাই আমার আহলে বাইত। অপবিত্রতাকে এদের হতে দূর করে এদেরকে পবিত্র কর।"

 

উম্মে সালমা বললেন: হে আল্লাহর নবী! আমিও কি তাঁদের অন্তর্ভুক্ত (আমিও কি উক্ত আয়াতে বর্ণিত আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত)? তিনি বললেন: তুমি নিজের স্থানেই থাকো। তুমি সত্য ও কল্যাণের পথেই রয়েছ। এভাবে বিশ্বনবী (সা.) তাঁর কোনো স্ত্রীকে ওই বিশেষ চাদরের নীচে আসার অনুমতি দেননি যেখানে ছিলেন স্বয়ং রাসূল (সা.) এবং কন্যা ফাতিমা, জামাই আলী ও নাতি হাসান-হুসাইন (তাদের সবার ওপর আল্লাহর অশেষ রহমত ও দরুদ বর্ষিত হোক।)


উল্লেখ্য, অন্য এক বছর একই দিনে নাজিল হয়েছিল সুরা মায়েদার ৫৫ ও ৫৬ নম্বর আয়াত। আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)’র অনুপম এক দানের প্রশংসা করতে গিয়ে এই দুই আয়াতে বলা হয়েছে:


হে বিশ্বাসীগণ! তোমাদের অভিভাবক তো কেবল আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং সেই বিশ্বাসীরা যারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করে এবং রুকু অবস্থায় জাকাত দেয়। এবং যে কেউ আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং সেই বিশ্বাসীদের নিজ অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করবে (সে আল্লাহর দলের অন্তর্ভুক্ত হবে এবং) নিশ্চয় আল্লাহর দলই বিজয়ী হবে।


অনেকেই মনে করেন উপরোক্ত ৫৬ নম্বর আয়াতে হযরত আলী (আ.)-কে রাসূল (সা.)’র পর মুমিনদের অভিভাবক হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।


শিয়া ও সুন্নি উভয় মাজহাবের তাফসিরকারকরা একমত যে উপরোক্ত ৫৫ নম্বর আয়াতটি হযরত আলী (আ.)’র শানে নাজিল হয়েছিল। কারণ, হযরত আলী (আ.) রুকু অবস্থায় একজন সাহায্যপ্রার্থীকে হাতের আঙুল থেকে আংটি খুলে দিয়ে যাকাত দিয়েছিলেন। ইবনে মারদুইয়া ও খতিব বাগদাদি ইবনে আব্বাস (রা.) সূত্রে এবং তাবরানি ও ইবনে মারদুইয়া আম্মার ইবনে ইয়াসির (রা.) ও আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে, আয়াতটি আলী ইবনে আবি তালিব (আ.) সম্পর্কে নাজিল হয়েছিল যখন তিনি রুকু অবস্থায় জাকাত দেন। #

 

রেডিও তেহরান/এএইচ/৮

সমস্যা সংকুল এই পৃথিবীতে মানব জাতিকে যারা সঠিক পথের দিশা দিয়ে গেছেন তাদের মধ্যে ইমামগণ অন্যতম। আহলে বাইতের ইমামগণ ছিলেন আল্লাহ মনোনীত, তারা প্রত্যেকেই পরিপূর্ণতম মানুষ। তাঁদের কথাবার্তা, আচার-আচরণ, তাঁদের মন-মানসিকতা, পবিত্র জীবনাদর্শ ও উন্নত মানবিক সত্ত্বাই তা প্রমাণ করে। ইমাম হাদি (আ.) ও ছিলেন এমনই এক মহান ব্যক্তিত্ব।

 

আহলে বাইতের অন্যান্য ইমামের মতো হাদি (আ.) ও ছিলেন রহমতের খনি, জ্ঞানের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার এবং হেদায়েত ও পরহেজগারির মূল কাঠামো। তিনি সব সময় হাসিখুশি থাকতেন। প্রশান্ত চিত্তের অধিকারী ইমাম হাদি (আ.)‘র চাল-চলন ও আচার-আচরণ সবাইকে মুগ্ধ করতো। তিনি খুব সাধারণ পরিচ্ছন্ন পোশাক পরিধান করতেন। ইমামের পোশাক ও জায়নামাজ দেখলেই বোঝা যেত যুগের সর্বোত্তম এই ব্যক্তি কতটা সাদাসিধে জীবনে অভ্যস্ত। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ইবনে শাহ্‌র অশুব, ইমাম হাদি (আ.)  সম্পর্কে বলেছেন, হযরত হাদি ছিলেন একজন পরিপূর্ণতম মানুষ। তিনি যে নবী পরিবারের সন্তান সেই ঐশ্বর্য তাঁর চেহারায় জ্বলজ্বলে ছিল, কেননা তিনি ছিলেন রেসালাতের বৃক্ষেরই ফল এবং নবীজীর খান্দানেরই মনোনীত।

 

পৃথিবীর অনেক ঘটনাকে আপাত দৃষ্টিতে অকল্যাণকর বলে মনে হলেও তা যে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে, সে কথা ইমামের বক্তব্যে সব সময় স্পষ্ট ছিলো।

 

একদিন খুব জটলার মধ্যে আহত এক ব্যক্তির জামা হঠাৎ পাশের একটা শক্ত স্থানে আটকে গিয়ে ছিড়ে গেলো। লোকটির মন-মেজাজ এমনিতে খারাপ ছিলো, জামা ছিড়ে যাওয়ায় তিনি আরও মনঃক্ষুণ্ণ হলেন। তাই তিনি বলে উঠলেন, "আজ দিনটাই খারাপ"। পাশেই ইমাম হাদি(আ.)  ছিলেন। তিনি ঐ ব্যক্তির মন্তব্য শুনে নম্রভাবে জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে? ঐ ব্যক্তি ইমামের কাছে পুরো ঘটনা খুলে বললেন। ইমাম সব শুনে বললেন, আল্লাহতায়ালা কোন দিনকেই খারাপ করে সৃষ্টি করেননি। আল্লাহ মানুষকে তার কৃতকর্মের ভিত্তিতে পুরস্কৃত বা তিরস্কৃত করবেন। ইমামের কথা শুনে ঐ ব্যক্তি তার ভুল বুঝতে পারলো। সে উপলব্ধি করলো, যা ঘটছে তা হয়তো এমন কোন কারণে ঘটানো হচ্ছে, যা চূড়ান্ত কল্যাণ নিশ্চিত করবে।

 

ইমাম হাদি (আ.)’র জীবনকালে মুতাওয়াক্কিলসহ আব্বাসীয় খলিফাদের বেশ কয়েকজনের শাসনকাল অতিবাহিত হয়েছে। চিন্তা ও রাজনৈতিক দিক থেকে সেই সময়টা ভিন্ন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ছিল। সমাজে শ্বাসরুদ্ধকর রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।

 

শাসক গোষ্ঠী ইমাম হাদি (আ.)‘র অস্তিত্বকে মেনে নিতে পাচ্ছিল না। একবার স্বৈরাচারী আব্বাসীয় খলিফা মুতাওয়াক্কিলের একজন ঘনিষ্ঠ সহচর ইমাম হাদি (আ.)‘র বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করলো। খলিফার কাছে আরও বেশি প্রিয় হবার বাসনায় ঐ ব্যক্তি বললো, ইমাম হাদি তার বাসায় অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে এবং তিনি খলিফা মুতাওয়াক্কিলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। খলিফা নিরাপত্তা বাহিনীকে ইমামের বাড়ী-ঘর তল্লাশির নির্দেশ দিলেন। কিন্তু তারা ইমামের বাড়ীতে অস্ত্র খুঁজে না পেয়ে ইমামকে ধরে নিয়ে গেলো। অবশ্য অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মুতাওয়াক্কিল ইমামকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু এ ধরনের যেনতেন অজুহাতে ইমামকে হয়রানি করা হয়েছে, কষ্ট দেয়া হয়েছে।

 

এসব কারণে আব্বাসীয় শাসনের যুগ যতোই অতিক্রান্ত হচ্ছিল ততোই শাসকদের সম্মান ও মর্যাদা হ্রাস পাচ্ছিল। তাদের মর্যাদা হ্রাস পাবার পেছনে কারণ ছিল-সমাজে তাদের দুর্নীতি এবং তাদের শাসক হবার যোগ্যতাহীনতার ব্যাপারে জনতার মুখে মুখে রব ওঠা-যার ফলে মানুষ তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল।

 

অন্যদিকে,নতুন নতুন চিন্তাধারা আর বিকৃত বিশ্বাসের প্রচলনের কারণে মানুষের চিন্তারাজ্যে এবং বোধ ও বিশ্বাসে ভয়াবহ বিকৃতি জেঁকে বসেছিল। ইমাম হাদি (আ.) যদি এই দুঃসময়ে ইসলামের উন্নত নীতি-নৈতিকতার চর্চা ও বিকাশ না ঘটাতেন,তাহলে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও নীতিমালাগুলো বিচ্যুতিতে ডুবে যেত। ইমাম হাদি (আ.) শুরুতে মদিনায় বসবাস করতেন। মদিনা ছিল মুসলিম বিশ্বের জন্যে ইসলামী বিধি-বিধান এবং জ্ঞানের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আর ইমাম জ্ঞানের এই কেন্দ্রটি পরিচালনা বা এর নেতৃত্বের দায়িত্বে ছিলেন।

 

মুতাওয়াক্কিলের শাসনামলে ইমাম হাদি (আ.)  বাধ্য হয়েছিলেন মদিনা ছেড়ে সামেরায় বসবাস করতে। কেননা মুতাওয়াক্কিল জনগণের মাঝে ইমাম হাদি (আ.)‘র প্রভাব প্রতিপত্তিকে ভয় করতো। তাই সে চাইতো ইমামকে জনগণের কাছ থেকে সরিয়ে রাখতে। এ কারণেই ইমামকে সে সামেরায় অর্থাৎ মুতাওয়াক্কিলের হুকুমতের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। সামেরা শহরেও ইমাম হাদি (আ.) কে লোকজন স্বাগত জানায় এবং মুতাওয়াক্কিল শত চেষ্টা চালিয়েও ইমামের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা হ্রাস করতে পারেনি। ইমামের জনপ্রিয়তা হ্রাসের জন্য মুতাওয়াক্কিল নানা কৌশল ব্যবহার করেছ। একদিন মুতাওয়াক্কিলের নির্দেশে ইমাম হাদি (আ.)  কে এমন একটা মজলিসে আনা হলো যেখানে অনেক ধনীলোক এবং রাজদরবারের লোকজন উপস্থিত ছিল।

 

মুতাওয়াক্কিল ইমাম হাদি (আ.)  কে একটা কবিতা আবৃত্তি করতে বললো। ইমাম প্রথমে এ কাজ করতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু মুতাওয়াক্কিল ব্যাপক পীড়াপীড়ি করে। অবশেষে ইমাম মজলিসের অবস্থা এবং সেখানে উপস্থিত লোকজনের বিষয়টি বিবেচনা করে অত্যাচারী শাসকদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতনতামূলক একটি কবিতা পড়েন। মানুষ সে যত বড় শক্তি ও ক্ষমতার অধিকারীই হোক না কেন,তাকে যে মৃত্যুর কাছে পরাজয় মেনে নিতেই হবে, সে কথা ইমাম কবিতার ছন্দে উপস্থিত সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। কাজেই ইমামের অর্থবহ ও শক্তিশালী বক্তব্য মজলিসে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের হৃদয়ের গভীরে নাড়া দেয় এমনকি স্বয়ং স্বৈরাচারী শাসক মুতাওয়াক্কিলও ইমামের কবিতার বক্তব্যে আন্দোলিত হয়। অন্য একদিন মুতাওয়াক্কিল এক বিতর্কের আয়োজন করে। ইমামের সাথে বিতর্কের জন্য সে যুগের দুই বিখ্যাত জ্ঞানী ব্যক্তি ইয়াহিয়া বিন আকসাম ও ইবনে সেক্কিতকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ইয়াহিয়া বিন আকসাম প্রথমেই ইমামকে রাসূলদের মোজেজার ভিন্নতা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেন। ইয়াহিয়া আকসাম বলেন, রাসুলদের মোজেজাগুলোর মধ্যে পার্থক্যের কারণ কি? মুসা (আ.) ‘র মোজেজা কেন লাঠি, ঈসা (আ.) ‘র মোজেজা কেন মানুষকে রোগমুক্ত বা পুনরুজ্জীবিত করা, আর কেনবাই হযরত মোহাম্মদ (আ.) র মোজেজা ছিলো কোরান?

 

ইমাম হাদি (আ.)  উত্তরে বললেন, মূসা (আ.) ‘র মোজেজা ছিলো লাঠি কারণ সে যুগের সমাজে জাদুর প্রভাব ছিলো সবচেয়ে বেশি। কাজেই মূসা (আ.)  তার লাঠি দিয়ে অন্য সকল জাদুকরের জাদুকে অস্তিত্বহীন করে দিয়ে নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পন্ন করেন। ঈসা(আ.) ‘র মোজেজা ছিল বিশেষ রোগে আক্রান্ত রোগীদের রোগমুক্ত করা বা মৃত ব্যক্তিকে পুনরায় জীবিত করা,কারণ সে সময় চিকিৎসা ক্ষেত্রে যে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছিল, তা সে যুগের মানুষকে বিস্মিত করেছিল। সে কারণে ঈসা (আ.)  আল্লাহর নির্দেশে মৃত মানুষকে জীবিত করে এবং দুরারোগ্য ব্যাধি সারিয়ে তুলে মানুষকে আল্লাহর ক্ষমতার কিয়দংশ প্রদর্শন করেছেন। আর হযরত মোহাম্মদ (সা:)র সময় কবিতা ও সাহিত্য মানুষের চিন্তা-চেতনায় প্রাধান্য বিস্তার করেছিল সে কারণে তিনি তার মোজেজা পবিত্র কোরানের মাধ্যমে তাদের চিন্তা-চেতনার উপর প্রভাব বিস্তার করেন এবং নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব সুচারু ভাবে পালন করেন। ইমামের এই উত্তর শুনে উপস্থিত সবাই মুগ্ধ হয়। এরপর ইবনে সেক্কিত ইমামকে প্রশ্ন করেন। ইমাম ধৈর্যের সাথে সেসব প্রশ্নেরও উত্তর দেন এবং ঐ বিতর্কে বিজয় লাভ করেন।

 

ইমামের উপস্থিতিতে এ ধরনের প্রতিটি বিতর্কই পরিণত হতো মানুষের জন্য মূল্যবান শিক্ষার আসর। কাজেই ইমামের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা ক্রমেই আরও বাড়তে থাকে। ফলে আরও ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে আব্বাসীয়রা। এরই এক পর্যায়ে আব্বাসীয় খলিফার নির্দেশে ইমামকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। ইমামের শাহাদাতের খবরে গোটা মুসলিম বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে আসে। ইমাম হাদি (আ.)‘র জানাজা নামাজে ব্যাপক সংখ্যক মানুষ অংশ নিয়েছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। ইরাকের সামেরায় অবস্থিত ইমাম হাদি (আ.)‘র মাজারে আজও প্রতিদিনই মানুষের ঢল নামে। মুসলমানরা মাজারে গিয়ে আত্মিক প্রশান্তি অনুভব করে, অনুপ্রাণিত হয় রাসূল ও তার আহলে বাইতের পথ অনুসরণ করতে। আমরা সবাই ইমাম হাদি (আ.)‘র জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে সফল হবো-এই প্রত্যাশা রইল। #