এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
সমস্যা সংকুল এই পৃথিবীতে মানব জাতিকে যারা সঠিক পথের দিশা দিয়ে গেছেন তাদের মধ্যে ইমামগণ অন্যতম। আহলে বাইতের ইমামগণ ছিলেন আল্লাহ মনোনীত, তারা প্রত্যেকেই পরিপূর্ণতম মানুষ। তাদেঁর কথাবার্তা, আচার-আচরণ, তাদেঁর মন-মানসিকতা, পবিত্র জীবনাদর্শ ও উন্নত মানবিক সত্ত্বাই তা প্রমাণ করে। ইমাম হাদি (আঃ)ও ছিলেন এমনই এক মহান ব্যক্তিত্ব। এই মহান মনীষীর শাহাদাৎবার্ষিকী উপলক্ষ্যে আজ আমরা তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করবো।

আহলে বাইতের অন্যান্য ইমামের মতো হাদি (আঃ)ও ছিলেন রহমতের খনি, জ্ঞানের সমৃদ্ধ ভাণ্ডার এবং হেদায়েত ও পরহেজগারীর মূল কাঠামো। তিনি সব সময় হাসিখুশী থাকতেন। প্রশান্ত চিত্তের অধিকারী ইমাম হাদি (আঃ) এর চাল-চলন ও আচার-আচরণ সবাইকে মুগ্ধ করতো। তিনি খুব সাধারণতবে পরিচ্ছন্ন পোষাক পরিধান করতেন। ইমামের পোশাক ও জায়নামাজ দেখলেই বোঝা যেত যুগের সর্বোত্তম এই ব্যক্তি কতটা সাদাসিধে জীবনে অভ্যস্ত। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ইবনে শাহ্‌র অশুব, ইমাম হাদি (আঃ) সম্পর্কে বলেছেন, হযরত হাদি ছিলেন একজন পরিপূর্ণতম মানুষ। তিনি যে নবী পরিবারের সন্তান সেই ঐশ্বর্য তাঁর চেহারায় জ্বলজ্বলে ছিল, কেননা তিনি ছিলেন রেসালাতের বৃক্ষেরই ফল এবং নবীজীর খান্দানেরই মনোনীত।

 

পৃথিবীর অনেক ঘটনাকে আপাত দৃষ্টিতে অকল্যাণকর বলে মনে হলেও তা যে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে সহায়ক হতে পারে, সে কথা ইমামের বক্তব্যে সব সময় স্পষ্ট ছিলো।
একদিন খুব জটলার মধ্যে আহত এক ব্যক্তির জামা হঠাৎ পাশের একটা শক্ত স্থানে আটকে গিয়ে ছিড়ে গেলো। লোকটির মন-মেজাজ এমনিতে খারাপ ছিলো, জামা ছিড়ে যাওয়ায় তিনি আরও মনোক্ষুন্ন হলেন। তাই তিনি বলে উঠলেন, "আজ দিনটাই খারাপ"। পাশেই ইমাম হাদি(আঃ) ছিলেন। তিনি ঐ ব্যক্তির মন্তব্য শুনে নম্রভাবে জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে? ঐ ব্যক্তি ইমামের কাছে পুরো ঘটনা খুলে বললেন। ইমাম সব শুনে বললেন, আল্লাহতায়ালা কোন দিনকেই খারাপ করে সৃষ্টি করেননি। আল্লাহ মানুষকে তার কৃতকর্মের ভিত্তিতে পুরস্কৃত বা তিরস্কৃত করবেন। ইমামের কথা শুনে ঐ ব্যক্তি তার ভুল বুঝতে পারলো। সে উপলব্ধি করলো, যা ঘটছে তা হয়তো এমন কোন কারণে ঘটানো হচ্ছে, যা চূড়ান্ত কল্যাণ নিশ্চিত করবে।
ইমাম হাদি (আঃ) এর জীবনকালে মুতাওয়াক্কিলসহ আব্বাসীয় খলিফাদের বেশ কয়েকজনের শাসনকাল অতিবাহিত হয়েছে। চিন্তা ও রাজনৈতিক দিক থেকে সেই সময়টা ভিন্ন বৈশিষ্ট্যপূর্ণ ছিল। সমাজে শ্বাসরুদ্ধকর রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল।

শাসক গোষ্ঠী ইমাম হাদি (আঃ)এর অস্তিত্বকে মেনে নিতে পাচ্ছিল না। একবার স্বৈরাচারী আব্বাসীয় খলিফা মুতাওয়াক্কিলের একজন ঘনিষ্ট সহচর ইমাম হাদি (আঃ)এর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ উত্থাপন করলো। খলিফার কাছে আরও বেশি প্রিয় হবার বাসনায় ঐ ব্যক্তি বললো, ইমাম হাদি তার বাসায় অস্ত্র লুকিয়ে রেখেছে এবং তিনি খলিফা মুতাওয়াক্কিলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। খলিফা নিরাপত্তা বাহিনীকে ইমামের বাড়ী-ঘর তল্লাশির নির্দেশ দিলেন। কিন্তু তারা ইমামের বাড়ীতে অস্ত্র খুজে না পেয়ে ইমামকে ধরে নিয়ে গেলো। অবশ্য অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মুতাওয়াক্কিল ইমামকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু এ ধরনের যেনতেন অজুহাতে ইমামকে হয়রানি করা হয়েছে, কষ্ট দেয়া হয়েছে।
এসব কারণে আব্বাসীয় শাসনের যুগ যতোই অতিক্রান্ত হচ্ছিল ততোই শাসকদের সম্মান ও মর্যাদা হ্রাস পাচ্ছিল। তাদের মর্যাদা হ্রাস পাবার পেছনে কারণ ছিল-সমাজে তাদের দুর্নীতি এবং তাদের শাসক হবার যোগ্যতাহীনতার ব্যাপারে জনতার মুখে মুখে রব ওঠা-যার ফলে মানুষ তাদের প্রতি অসন্তুষ্ট ছিল।


অন্যদিকে,নতুন নতুন চিন্তাধারা আর বিকৃত বিশ্বাসের প্রচলনের কারণে মানুষের চিন্তারাজ্যে এবং বোধ ও বিশ্বাসে ভয়াবহ বিকৃতি জেঁকে বসেছিল। ইমাম হাদি (আঃ) যদি এই দুঃসময়ে ইসলামের উন্নত নীতি-নৈতিকতার চর্চা ও বিকাশ না ঘটাতেন,তাহলে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও নীতিমালাগুলো বিচ্যুতিতে ডুবে যেত। ইমাম হাদি (আঃ) শুরুতে মদীনায় বসবাস করতেন। মদীনা ছিল মুসলিম বিশ্বের জন্যে ইসলামী বিধি-বিধান এবং জ্ঞানের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। আর ইমাম জ্ঞানের এই কেন্দ্রটি পরিচালনা বা এর নেতৃত্বের দায়িত্বে ছিলেন।

 

মুতাওয়াক্কিলের শাসনামলে ইমাম হাদি (আঃ) বাধ্য হয়েছিলেন মদীনা ছেড়ে সামেরায় বসবাস করতে। কেননা মুতাওয়াক্কিল জনগণের মাঝে ইমাম হাদি (আঃ) এর প্রভাব প্রতিপত্তিকে ভয় করতো। তাই সে চাইতো ইমামকে জনগণের কাছ থেকে সরিয়ে রাখতে। এ কারণেই ইমামকে সে সামেরায় অর্থাৎ মুতাওয়াক্কিলের হুকুমাতের কেন্দ্রে নিয়ে আসে। সামেরা শহরেও ইমাম হাদি (আঃ)কে লোকজন স্বাগত জানায় এবং মুতাওয়াক্কিল শত চেষ্টা চালিয়েও ইমামের ক্রমবর্ধমান জনপ্রিয়তা হ্রাস করতে পারেনি। ইমামের জনপ্রিয়তা হ্রাসের জন্য মুতাওয়াক্কিল নানা কৌশল ব্যবহার করেছ। একদিন মুতাওয়াক্কিলের নির্দেশে ইমাম হাদি (আঃ) কে এমন একটা মজলিসে আনা হলো যেখানে অনেক ধনীলোক এবং রাজদরবারের লোকজন উপস্থিত ছিল। মুতাওয়াক্কিল ইমাম হাদি (আঃ) কে একটা কবিতা আবৃত্তি করতে বললো। ইমাম প্রথমে এ কাজ করতে অস্বীকৃতি জানান। কিন্তু মুতাওয়াক্কিল ব্যাপক পীড়াপীড়ি করে। অবশেষে ইমাম মজলিসের অবস্থা এবং সেখানে উপস্থিত লোকজনের বিষয়টি বিবেচনা করে অত্যাচারী শাসকদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতনতামূলক একটি কবিতা পড়েন। মানুষ সে যত বড় শক্তি ও ক্ষমতার অধিকারীই হোক না কেন,তাকে যে মৃত্যুর কাছে পরাজয় মেনে নিতেই হবে, সে কথা ইমাম কবিতার ছন্দে উপস্থিত সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। কাজেই ইমামের অর্থবহ ও শক্তিশালী বক্তব্য মজলিসে উপস্থিত ব্যক্তিবর্গের হৃদয়ের গভীরে নাড়া দেয় এমনকি স্বয়ং স্বৈরাচারী শাসক মুতাওয়াক্কিলও ইমামের কবিতার বক্তব্যে আন্দোলিত হয়। অন্য একদিন মুতাওয়াক্কিল এক বিতর্কের আয়োজন করে। ইমামের সাথে বিতর্কের জন্য সে যুগের দুই বিখ্যাত জ্ঞানী ব্যক্তি ইয়াহিয়া বিন আকসাম ও ইবনে সেক্কিতকে আমন্ত্রন জানানো হয়। ইয়াহিয়া বিন আকসাম প্রথমেই ইমামকে রাসূলদের মোজাজের ভিন্নতা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করেন। ইয়াহিয়া আকসাম বলেন, রাসুলদের মোজেজাগুলোর মধ্যে পার্থক্যের কারণ কি? মূসা (আঃ)র মোজেজা কেন লাঠি, ঈসা (আঃ)র মোজেজা কেন মানুষকে রোগমুক্ত বা পুনরুর্জ্জীবিত করা, আর কেনবাই হযরত মোহাম্মদ (আঃ)র মোজেজা ছিলো কোরান?


ইমাম হাদি (আঃ) উত্তরে বললেন, মূসা (আঃ)র মোজেজা ছিলো লাঠি কারণ সে যুগের সমাজে জাদুর প্রভাব ছিলো সবচেয়ে বেশি। কাজেই মূসা (আঃ) তার লাঠি দিয়ে অন্য সকল জাদুকরের জাদুকে অস্তিত্বহীন করে দিয়ে নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব সম্পন্ন করেন। ঈসা(আঃ)এর মোজেজা ছিল বিশেষ রোগে আক্রান্ত রোগীদের রোগমুক্ত করা বা মৃত ব্যক্তিকে পুণরায় জীবীত করা,কারণ সে সময় চিকিৎসা ক্ষেত্রে যে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়েছিল,তা সে যুগের মানুষকে বিস্মিত করেছিল। সে কারণে ঈসা (আঃ) আল্লাহর নির্দেশে মৃত মানুষকে জীবীত করে এবং দূরারোগ্য ব্যাধি সারিয়ে তুলে মানুষকে আল্লাহর ক্ষমতার কিয়দাংশ প্রদর্শন করেছেন। আর হযরত মোহাম্মদ (সাঃ)র সময় কবিতা ও সাহিত্য মানুষের চিন্তা-চেতনায় প্রাধান্য বিস্তার করেছিল সে কারণে তিনি তার মোজেজা পবিত্র কোরানের মাধ্যমে তাদের চিন্তা-চেতনার উপর প্রভাব বিস্তার করেন এবং নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব সুচারু ভাবে পালন করেন। ইমামের এই উত্তর শুনে উপস্থিত সবাই মুগ্ধ হয়। এরপর ইবনে সেক্কিত ইমামকে প্রশ্ন করেন। ইমাম ধৈর্য্যের সাথে সেসব প্রশ্নেরও উত্তর দেন এবং ঐ বিতর্কে বিজয় লাভ করেন। ইমামের উপস্থিতিতে এ ধরনের প্রতিটি বিতর্কই পরিণত হতো মানুষের জন্য মুল্যবান শিক্ষার আসর। কাজেই ইমামের জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা ক্রমেই আরও বাড়তে থাকে। ফলে আরও ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে আব্বাসীয়রা। এরই এক পর্যায়ে আব্বাসীয় খলিফার নির্দেশে ইমামকে বিষ প্রয়োগে হত্যা করা হয়। ইমামের শাহাদাতের খবরে গোটা মুসলিম বিশ্বে শোকের ছায়া নেমে আসে। ইমাম হাদি (আঃ)এর জানাজা নামাজে ব্যাপক সংখ্যক মানুষ অংশ নিয়েছিল বলে ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে। ইরাকের সামেরায় অবস্থিত ইমাম হাদি (আঃ)এর মাজারে আজও প্রতিদিনই মানুষের ঢল নামে। মুসলমানরা মাজারে গিয়ে আত্মিক প্রশান্তি অনুভব করে, অনুপ্রাণিত হয় রাসূল ও তার আহলে বাইতের পথ অনুসরণ করতে। আমরা সবাই ইমাম হাদি(আঃ)এর জীবন ও কর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনে সফল হবো-এই প্রত্যাশা রইল। #

লেবাননের জন-নন্দিত ইসলামী গণ-প্রতিরোধ আন্দোলন হিজবুল্লাহর মহাসচিব সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ বলেছেন, ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ সৌদি আরবে প্রবেশ করতে ও সৌদি সরকারকে ধুলোয় মিশিয়ে দিতে প্রস্তুত রয়েছে। 

 

জনাব নাসরুল্লাহ সম্প্রতি ইয়েমেনি জাতির প্রতি সংহতি ঘোষণার এক অনুষ্ঠানে এই মন্তব্য করেছেন।


তিনি ইয়েমেনে সৌদি ও মার্কিন আগ্রাসনের নিন্দা জানিয়েছে বলেছেন, (আগ্রাসনের শিকার) ইয়েমেনের মজলুম জনগণের প্রতি সমর্থন ঘোষণা করা মানবীয়, নৈতিক ও ইসলামী দায়িত্ব। 


ইয়েমেনের বিপ্লবী ও প্রতিরোধকামী জাতির প্রতি সব সময় সমর্থন দেয়ার জন্য গর্ব প্রকাশ করে জনাব নাসরুল্লাহ বলেন, কারণ, এ বিষয়ে কিয়ামতের দিন প্রশ্ন করা হবে। 
তিনি ইয়েমেনে হামলার ব্যাপারে সৌদি সরকারের নানা ধরনের ভিত্তিহীন অজুহাতের কথা তুলে ধরে বলেন, ইয়েমেনের জনগণের ওপর মার্কিন-সৌদি কর্তৃত্ব ফিরিয়ে আনাই এই আগ্রাসনের আসল লক্ষ্য; কারণ, ইয়েমেনের জনগণ ক্ষমতা নিজের হাতে আনতে সক্ষম হয়েছে। ইয়েমেনে হামলার কারণ হিসেবে সৌদি সরকারের বিরুদ্ধে ইয়েমেনিদের হুমকি হয়ে ওঠা ও এমনকি ইরানি প্রভাব ক্ষুণ্ণ করতে চাওয়ার সৌদি দাবিকে তিনি ভিত্তিহীন বলে মন্তব্য করেন।


হিজবুল্লাহর প্রধান সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ এই যুদ্ধকে আরব ও অনারবের যুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরার প্রচেষ্টার নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, 'ইয়েমেনিরা ইসলাম-পূর্ব যুগ থেকেই আরব সভ্যতার অধিকারী, আরব উপদ্বীপের অধিবাসীরা যখন পড়তে জানতো না তখনও ইয়েমেনে সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল, দেশটির রাজারা ছিলেন আরব। তিনি জিহাদে ও সংগ্রামের ক্ষেত্রে ইয়েমেনিদের মহত্ত্ব ও গুণগুলোর খ্যাতি থাকার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, সবগুলো মুসলিম দেশই এ বিষয়ে অবহিত।'  


হিজবুল্লাহর প্রধান ইয়েমেনের যুদ্ধকে সাম্প্রদায়িক বা গোত্রীয় যুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরার অপচেষ্টার কথা তুলে ধরে বলেছেন, 'বলা হচ্ছে এটা শিয়া-সুন্নি সংঘাত, কিন্তু আসলে এ সংঘাতের লক্ষ্য রাজনৈতিক। এ যুদ্ধকে পবিত্র মক্কা ও মদিনাকে রক্ষার যুদ্ধ বলেও দাবি করছে আগ্রাসীরা, অথচ ইয়েমেনিরা ও তাদের সশস্ত্র বাহিনী কী এ দুই পবিত্র স্থানের বিরুদ্ধে হুমকি দিয়েছিল? ইয়েমেনিরা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) ও তাঁর পবিত্র আহলে বাইত বা বংশধারার প্রেমিক; তবে এটা ঠিক যে এ দুই পবিত্র স্থানের বিরুদ্ধে হুমকি সৃষ্টি করেছে ওয়াহাবি-তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসআইএল। এই গোষ্ঠী কাবা ঘর ধ্বংসের হুমকি দিয়ে বলেছিল, এই ঘরে আল্লাহর ইবাদতের পরিবর্তে কিছু পাথরের পূজা করা হয়, তাই তা তাওহিদের বিরোধী। মদিনায় বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র রওজা মুবারক হুমকির মুখে রয়েছে ওয়াহাবি চিন্তাধারা ও সংস্কৃতির কারণে এবং ঐতিহাসিক বহু বই এ বিষয়ের সাক্ষ্য দিচ্ছে।'


সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ এ প্রসঙ্গে আরও বলেছেন, 'হিজাজের (সৌদি আরবের আসল ও পুরনো নাম) ওপর আবদুল আজিজ আলে সৌদ বা সৌদ বংশের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ওয়াহাবিরা ধর্মীয় নানা নিদর্শন ও বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র স্মৃতি-বিজড়িত নানা নিদর্শন ধ্বংসের উদ্যোগ নেয়। তারা ঐতিহাসিক বাড়ী-ঘর, কেল্লা ও কবর বা মাজার ধ্বংস করেছে। এমনকি তারা মহানবী (সা.)'র পবিত্র মাজারও ধ্বংসের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। আর এ বিষয়গুলো ইতিহাসের বইয়েও স্থান পেয়েছে। ওয়াহাবিরা বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র মাজার ধ্বংস করতে চেয়েছিল, কিন্তু মিশর, ভারত, ইরান, ইরাক, সিরিয়া, তুরস্ক ও আফ্রিকাসহ মুসলিম বিশ্বের চিন্তাবিদ ও জ্ঞানীরা প্রতিবাদে সোচ্চার হওয়ায় ওয়াহাবিরা তা করতে সাহস পায়নি। ১৯২৬ সালের এই মাসেই মিশরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয় ও মুসলিম বিশ্বের আলেম সমাজের পক্ষ থেকে মহানবী (সা.)'র পবিত্র মাজার শরিফ ধ্বংসের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি প্রভাব সৃষ্টি হয়েছিল। আর তাই তৎকালীন সৌদি বাদশাহ বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র মাজার ধ্বংসের সিদ্ধান্ত পরিত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিলেন এবং এখনও মহানবীর (সা.) পবিত্র মাজার বজায় রয়েছে। অথচ ওয়াহাবিরা এখন পর্যন্ত এই পবিত্র মাজারের কাছে কাউকে যেতে দিচ্ছে না। মহান ইসলাম ও বিশ্বনবী (সা.)'র কারণেই অতীতে আরবদের সম্মান করা হত।' 


সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ এ প্রসঙ্গে আরও বলেছেন, 'তাই আমি ঘোষণা করছি যে মহানবী (সা.)'র পবিত্র হারাম বা রওজা শরিফ হুমকির মুখে রয়েছে, আমি জানি না ওয়াহাবিরা কবে এই পবিত্র মাজারে বিস্ফোরণ ঘটাবে।' 


হিজবুল্লাহর প্রধান সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ আরও বলেছেন, 'সৌদি সরকার ইয়েমেনে হামলার অজুহাত হিসেবে এও বলছে যে, তারা দুই কোটি ৪০ লাখ জনসংখ্যার ইয়েমেনি জাতিকে রক্ষা করছে! আর তা করছে (বোমা ফেলে ও) অবরোধ আরোপের মাধ্যমে যাতে তারা খাদ্য ও চিকিৎসা সামগ্রী না পায়! সৌদিরা বলছে যে, ইয়েমেনিদের মধ্যে সশস্ত্র ব্যক্তি রয়েছে!'


তিনি আরও বলেছেন, 'সৌদিরা বোমা মেরে বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও হাসপাতাল এবং খাদ্যের গুদামগুলো ধ্বংস করে দিয়েছে। এভাবে ইয়েমেনিদের ওপর গণহত্যা চালিয়ে এই জাতিকে রক্ষার মিথ্যা দাবি করছে সৌদি সরকার। আর এইসব ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর পর কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষ কী এটা দাবি করতে পারে যে আবদে মানসুর হাদিকে ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার জন্যই এতোসব অপরাধ চালানো হচ্ছে? '  


হিজবুল্লাহর প্রধান সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ আরও বলেছেন, 'গত ২২ দিন ধরে আকাশ ও সাগর থেকে ইয়েমেনে বোমা ও ক্ষেপণাস্ত্র বর্ষিত হয়েছে মার্কিন সরকারের গোয়েন্দা বিভাগের ব্যাপক সহায়তা নিয়ে। সৌদি সরকার ইয়েমেনে আইএসআইএল-এর প্রতি সহায়তা দিচ্ছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও মানসুর হাদি এডেন ও সান্আতে ফিরে আসতে পারেননি। বরং সৌদিদের ব্যর্থতার ফলে হাদি এখন ক্ষমতা ফিরে পাওয়ার ব্যাপারে হতাশ হয়ে পড়েছেন এবং সৌদি সরকারও এখন এই বাস্তবতা বুঝতে পারছে। আর হয়তো এ জন্যই তারা ইয়েমেনের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে খালেদ বহাহ-কে বেছে নিয়েছে। ইয়েমেনের জনগণ ঘরোয়া দ্বন্দ্বকে শিয়া-সুন্নির ও উত্তর-দক্ষিণের সংঘাতে পরিণত করার অনুমতি দেবে না, ইয়েমেনে এতদিন যারা চুপ করেছিলেন তারাও এখনও প্রতিবাদে সরব হচ্ছেন। এটাও সৌদি আগ্রাসনের ব্যর্থতার অন্যতম প্রমাণ।' 


ইয়েমেনের জনগণের শক্তিশালী ও কঠোর স্বভাবের কথা তুলে ধরে হিজবুল্লাহর প্রধান সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ আরও বলেছেন, 'ইয়েমেনের গোত্রগুলো কখনও তাদের নিহত ব্যক্তিদের ভুলে যাবেন না। সৌদি আরবে ইয়েমেনিদের সম্ভাব্য হামলা প্রতিরোধের জন্য আগেভাগেই ইয়েমেনে হামলা চালানো হয়েছে বলে যদি ধরে নেয়া হয় তাহলে এটা স্পষ্ট যে এ ধরনের হুমকি অতীতে না থাকলেও এখনই বরং এই হুমকি সৃষ্টি হয়েছে স্পষ্টভাবে। যাদেরকে হুমকি বলে অপবাদ দেয়া হয়েছে সেই আনসারুল্লাহর নেতারা এখনও ধৈর্যশীল এবং তাদের প্রধান কমান্ডার হলেন আবদুল মালিক হুথি। এখন সৌদি আরবে হামলার ও দেশটিতে ঢুকে পড়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ইয়েমেনের গোত্রগুলো ও ইয়েমেনি জাতি জবাব দেয়ার দাবি জানাচ্ছে। অবশ্য এ বিষয়ে কৌশলগত ধৈর্য ধারণ জরুরি। মোটকথা যে হুমকি আদৌ ছিল না তা এখন বাস্তব হুমকির রূপ নিয়েছে।'


হিজবুল্লাহর প্রধান সাইয়্যেদ হাসান নাসরুল্লাহ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের কঠোর সমালোচনা করে বলেছেন, 'এই পরিষদের উচিত ছিল যুদ্ধ বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া, কিন্তু পরিষদ জল্লাদদেরকে সমর্থন দিয়ে ও বলি বা কুরবানি হওয়া মজলুমকে উপেক্ষা করেছে এবং জল্লাদকেই অধিকার দিয়েছে। লেবানন ও ফিলিস্তিনিদের ক্ষেত্রেও আমরা একই ঘটনা দেখছি। তাই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিসদের এই প্রস্তাব অন্য অনেক আন্তর্জাতিক ইশতিহার বা প্রস্তাবের মতোই মূল্যহীন। এখন এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, বিমান হামলা চালিয়ে যুদ্ধের ভাগ্য নির্ধারণ করা সম্ভব হবে না। আর স্থল আগ্রাসন হবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল (এ জন্য চড়া মূল্য দিতে হবে)। এ অবস্থায় ইয়েমেনি জনগণের জন্য প্রতিরোধের পথ ছাড়া অন্য কোনো পথ খোলা নেই। অবশ্য তারা রাজনৈতিক সমাধানের জন্যও প্রস্তুত রয়েছে।'


সৌদি সরকার ও তার মিত্র কয়েকটি দেশ গত ২৬ মার্চ থেকে ইয়েমেনে বিমান হামলা শুরু করেছে। এইসব বিমান হামলায় বহু শিশু ও নারীসহ ২৬০০ জনেরও বেশি ইয়েমেনি প্রাণ হারিয়েছে এবং আহত হয়েছে কয়েক গুণ। লাখ লাখ মানুষ পরিণত হয়েছে শরণার্থীতে। ধ্বংস হয়েছে হাজার হাজার বাড়ি-ঘর, স্কুল, হাসপাতাল, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ ও পানি-সরবরাহ কেন্দ্র, বাজার ও অন্যান্য জরুরি স্থাপনা। #

 

রেডিও তেহরান/এএইচ

 

১৯ এপ্রিল (রেডিও তেহরান): রাসূলে কারিমের পবিত্র আহলে বাইতের মহান ইমাম হযরত বাকের (আ) এর পবিত্র জন্মবার্ষিকীতে আপনাদের সবার প্রতি রইলো প্রাণঢালা অভিনন্দন ও মোবারকবাদ। শুভ এই দিনে নবীজী গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা বলেছিলেন। সম্ভবত আর কখনোই নবীজীর বক্তব্যের গুরুত্বটা এরচেয়ে বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে নি। তিনি বলেছিলেন-'হে জনগণ! আমি দুটি মূল্যবান জিনিস তোমাদের জন্যে রেখে গেলামঃ একটি আল্লাহর কিতাব কোরআন এবং অপরটি আমার আহলে বাইত।যতোদিন তোমরা তাদের দৃঢ়ভাবে ধারণ করবে ততোদিন তোমরা গোমরাহ হবে না।'এই দুটি মৌলিক বিষয় আজকের দিনে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যের মাপকাঠি হিসেবে ইসলামী উম্মাতের তরী-কে মুক্তির উপকূলে পৌঁছাতে পারে। যাই হোক আহলে বাইতের এই মহান ইমামের জন্মদিনে তাঁরি জীবনাদর্শ থেকে খানিকটা আলোকপাত করে নিজেদের ধন্য করার চেষ্টা করবো।

 

ইমাম বাকের (আ) ৫৭ হিজরীতে মদীনা শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছিলেন ইমাম সাজ্জাদ (আ)।তাঁর জন্মের বহু বছর আগে নবীজী জাবের ইবনে আব্দুল্লাহ আনসারী নামে তাঁর এক সঙ্গীকে বলেছিলেন-'হে জাবের! তুমি আমার পরে জীবিত থাকবে এবং আমার এক উত্তর প্রজন্ম দেখতে ঠিক আমার মতো হবে,তার নামও হবে আমার নামে,তুমি তাকে দেখতে পাবে। যেখানেই তুমি তাকে দেখতে পাও আমার সালাম পৌঁছে দিও।' বহু বছর পর জাবের শেষ পর্যন্ত ইমাম বাকের (আ) এর খেদমতে হাজির হয়ে রাসূলে খোদার সালাম তাঁকে পৌঁছে দেন।
হিজরী প্রথম শতাব্দির শেষের বছরগুলোতে একদিকে উমাইয়া শাসকদের অত্যাচার, জুলুম নিপীড়ন এবং অন্যদিকে তাদের বিরোধীদের সাথে সংঘর্ষের ঘটনা ব্যাপক মাত্রায় বেড়ে যায়। এ কারণে জনগণ দ্বীনি জ্ঞান চর্চায় মনোনিবেশ করতে পারছিলো না ঠিকমতো।

 

ইতিহাসের পাতায় এমন বহু প্রমাণপঞ্জী রয়েছে যে তখন বহু মানুষ গুরুত্বপূর্ণ অনেক ধর্মীয় বিধি-বিধান সম্পর্কেও জানতো না। যেমন কীভাবে নামায পড়তে হয় জানতো না। হজ্বের ব্যাপারেও তারা ছিল উদাসীন। খেলাফত ব্যবস্থা এ সময় দিন দিন দুর্বল থেকে দুর্বলতরো এবং অক্ষম থেকে অক্ষমতরো হয়ে পড়ছিলো। নবীজীর আহলে বাইতের সম্মানিত ইমামগণ হলেন মুসলমানদের নেতৃত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে উপযুক্ত ও যোগ্যতম। তাঁদের উপস্থিতি সত্ত্বেও সে সময় মানুষ খেলাফত এবং শাসনকার্য সংক্রান্ত বিষয়ে মতপার্থক্যে ভুগছিল। কেউ কেউ খেলাফতকে উমাইয়াদের অধিকার বলে মনে করতো,আবার অনেকেই আহলে বাইতের অবস্থান ও ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে বক্র চিন্তা তথা অনেকটা বাড়াবাড়ি পর্যায়ে ভাবতো।

 

এ রকম একটি সময়ে উজ্জ্বল সর্যের মতো আবির্ভূত হন ইমাম বাকের (আ)। তাঁর আগমনে অজ্ঞতার আঁধারের সকল পর্দা সরে যায়। ধর্মের প্রকৃত শিক্ষার আলোকে তিনি মুসলমানদেরকে ইসলামের সঠিক পথ দেখান এবং সর্বপ্রকার বক্র চিন্তা,কু-সংস্কার আর অজ্ঞতার অভিশাপ থেকে মুসলমানদেরকে মুক্তি দেন। নবীজীর আহলে বাইতের মর্যাদা এবং ইমামতের অবস্থান সম্পর্কে তিনি জনগণকে সচেতন করে তোলেন। রাসূলে খোদার পর আহলে বাইতের নেতৃত্বকেই ইসলামী উম্মাহর মুক্তির সবচেয়ে উত্তম পথ বলে তিনি মনে করতেন। কেননা তিনি বিশ্বাস করতেন,বিশ্বাস ও চিন্তাগত বিভিন্ন বিষয়ে সমাধান দেওয়ার ক্ষেত্রে একমাত্র আহলে বাইতই হলো সবচেয়ে উপযুক্ত। তিনি বলেছেন-রাসূলে খোদার সন্তানেরা হলেন আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যে ঐশী জ্ঞানের দরোজা এবং জান্নাতের দিকে আহ্বানকারী।

 

জ্ঞান ও বিজ্ঞানের উন্নতি এবং চিন্তাশীল ব্যক্তিত্বদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্যে ইমাম বাকের (আ) শিক্ষা ও সংস্কৃতির বহু কেন্দ্র স্থাপন করেন। তাঁর পরে তাঁরি উত্তরসূরি স্বীয় সন্তান ইমাম সাদেক (আ) বিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। হিজরী প্রথম শতাব্দির শেষের দিকে জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ইমাম বাকের (আ) এর চেষ্টা-প্রচেষ্টা সত্যিকার অর্থেই জনগণের মাঝে ইসলামী চিন্তা ও মূল্যবোধের প্রাণ সঞ্চারের ক্ষেত্রে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। জাবের ইবনে ইয়াযিদ যোড়ফি ইমাম বাকের (আ) এর একজন ছাত্র ছিলেন। তিনি ইমামের কাছ থেকে অন্তত সত্তুর হাজার হাদিস বর্ণনা করেছেন। জাবের বলেছেন-আঠারো বছর ইমাম বাকের (আ) এর খেদমতে উপস্থিত ছিলাম। যখন তাঁর কাছ থেকে চলে আসতে চেয়েছি,তাঁকে বলেছি, হে রাসূলের সন্তান! আমাকে জ্ঞানে পরিতৃপ্ত করুন! ইমাম বাকের (আ) বললেন-'হে জাবের! আঠারো বছর পরও কি তুমি জ্ঞানে পরিতৃপ্ত হও নি? বললাম-আপনি হলেন অসীম এক ঝর্ণাধারা, এই ঝর্ণাধারার তো শেষ নেই।'


ইমাম বাকের (আ) এর অস্তিত্ব ঝর্ণার জলের মতো ইসলামী চিন্তাবিদদের এমনকি ধর্মের অনুসারীদেরও আধ্যাত্মিক তৃষ্ণা মেটাতো। জ্ঞানের ভাণ্ডার হবার কারণে বহু অজানা বিষয়ে জানার জন্যে ইমামের কাছে ভিড় করতো জ্ঞান অন্বেষীগণ। যারা তাঁর কাছে আসতো তারা ইমামের প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলো। মুসলিম ইতিহাসবিদ ইবনে হাজার হিসামি ইমাম বাকের (আ) এর জ্ঞান,চরিত্র , অন্তরের পবিত্রতা এবং আল্লাহর ইবাদাত-বন্দেগির ক্ষেত্রে তাঁর একাগ্রতার উল্লেখ করে বলেন- তিনি যতোটা উচ্চ মর্যাদার ব্যক্তিত্ব ছিলেন তাঁর সেই ব্যক্তিত্বকে উপলব্ধি করা এবং তাঁর প্রশংসা করার যোগ্যতা অনেকেরই নেই।
অত্যাচারী এবং তাদের অনুসারীদের প্রসঙ্গে ইমামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণী ছিল এ রকম-জুলুম-নির্যাতনকারী নেতৃবৃন্দ এবং তাদের অনুসারীরা আল্লাহর দ্বীনের বাইরে অবস্থান করে।

 

ইমাম বাকের (আ) এর জীবনের শেষ এগারোটি বছরে উমাইয়া শাসক হিশাম বিন আব্দুল মালেকের শাসন চলছিল। হিশাম ছিল বখিল,রূঢ় এবং নির্যাতনকারী শাসক। তার শাসনকালে মানুষের জীবন একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। সেজন্যে জনগণ আগের তুলনায় আরো বেশি ইমামের শরণাপন্ন হতে লাগলো। হিশাম এমনিতেই ইমামের বিপুল জনপ্রিয়তার কারণে সবসময় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে থাকতো। তাই চেষ্টা করতো তাঁর আধ্যাত্মিক প্রভাব বিস্তারের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে। একবার হজ্জ্বের সময় ইমাম বাকের (আ) এবং তাঁর সন্তান ইমাম সাদেক (আ) এর প্রতি জনগণের ব্যাপক আকর্ষণ ও শ্রদ্ধাবোধ দেখে হিশাম উদ্বিগ্ন ও রুষ্ট হয়ে পড়ে। তাই হজ্জ্ব থেকে ফেরার পর তাঁদের দু'জনকেই মদীনা থেকে সিরিয়ায় তলব করা হয়। কিন্তু এই ঘটনায় জনগণের কাছে তাঁদের জনপ্রিয়তা তো কমেই নি বরং মুসলমানদের মাঝে বিশেষ করে সিরিয়াবাসীদের কাছে নবীজীর সন্তান হিসেবে তাঁদের পরিচিতি আরো বৃদ্ধি পায়। উপায়ন্তর না দেখে হিশাম তাঁদেরকে পুনরায় মদীনায় ফেরৎ পাঠায়।

 

ইমাম বাকের (আ) ছিলেন একজন দানবীর ও পরোপকারী। তিনি নিজের জমিজমাতে নিজেই চাষবাস করতেন এবং উৎপাদিত পণ্য সামগ্রি দিয়ে গরীবদের সাহায্য করতেন। আসওয়াদ ইবনে কাসির নামে এক ব্যক্তি বলেছেন-আমি আমার অভাব-অনটন এবং আমার ভাইয়ের নির্দয়তার কথা ইমামকে জানাই। ইমাম তখন বলেন-সক্ষমতা এবং ধন-সম্পদ থাকাকালে যে তোমার সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক বজায় রাখে অথচ অভাব-অনটনের সময় তোমার কাছ থেকে দূরে সরে যায়,এই ভ্রাতৃত্ব একেবারেই হীন ও মন্দ। এটা বলে তিনি আমাকে সাতশ দিরহাম দেওয়ার আদেশ দিয়ে বললেন-এটা তুমি খরচ করো এবং যখনি প্রয়োজন পড়বে আমাকে তোমার অবস্থা সম্পর্কে জানাবে।

 

আজকের আলোচনা শেষ করার আগে ইমামের আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ বাণীর উদ্ধৃতি দিচ্ছি।
ইমাম বাকের (আ) বলেছেন, সর্বোৎকৃষ্ট পুঁজি হলো আল্লাহর ওপর বিশ্বাস।
তিনি আরো বলেছেন,সর্বোৎকৃষ্ট পূর্ণতা হলো দ্বীন সম্পর্কে জানা ও সচেতন হওয়া,দুঃসময়ে ধৈর্য ধারণ করা এবং জীবন যাপনে শৃঙ্খলা বিধান করা।#

২০ জমাদিউসসানি একটি ঐতিহাসিক দিন। রাসূলে খোদার নব্যুয়ত লাভের পাঁচ বছর পর আজকের এই দিনে উম্মুল মোমেনীন হয়রত খাদিজার গৃহ আলোকিত করে পৃথিবীতে আগমন করেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নারী হযরত ফাতেমাতুয যাহরা (সা.)। হযরত ফাতেমা ছিলেন মানুষের ব্যক্তি কিংবা সমাজ জীবন সর্বক্ষেত্রেই অনুকরণীয় আদর্শ ও দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ মাতা, একজন আদর্শ স্ত্রী বা গৃহিনী এবং একজন আদর্শ সমাজ-সেবিকা।


হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.) ছিলেন এমন এক মহামানবী যার তুলনা কেবল তিনি নিজেই। অতুলনীয় এই নারী কেবল নারী জাতিরই শ্রেষ্ঠ আদর্শ নন, একইসঙ্গে তিনি গোটা মানব জাতিরই শীর্ষস্থানীয় আদর্শ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, বিশ্বের অনেকেই এই মহীয়সী নারীর পবিত্র জীবন ও আদর্শ সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না। আর এজন্যই ইরানের ইসলামী বিপ্লবের নেতা মরহুম ইমাম খোমেনী (রহঃ) হযরত ফাতিমার জন্মদিনকে ইরানে মা ও নারী দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেন।

 

হযরত ফাতেমা (সা) এর মর্যাদা ছিল অনেক উর্ধ্বে। স্বয়ং নবীজী (সা.) ফাতেমাকে সম্মান করতেন। জন্মের পর থেকেই নবীজী তাঁর এই কন্যার সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করে বিশ্বে নারীর মূল্যবোধ এবং তাঁদের অবস্থান যে কতোটা মর্যাদাসম্পন্ন তা বাস্তবে দেখিয়ে গেছেন। মহানবী (সা.) বলেছেন, "ফাতেমা আমার দেহের অংশ, যা কিছু তাকে সন্তুষ্ট করে তা আমাকে সন্তুষ্ট করে এবং যা কিছু আমাকে সন্তুষ্ট করে তা আল্লাহকেও সন্তুষ্ট করে, আর যা কিছু ফাতেমাকে কষ্ট দেয়, তা আমাকে কষ্ট দেয়, আর যা আমাকে কষ্ট দেয়, তা আল্লাহকেও কষ্ট দেয়।" নবীজী আরো বলেছেন, "ফাতেমা আমার দেহের অঙ্গ, চোখের জ্যোতি, অন্তরের ফল এবং আমার রূহস্বরূপ। সে হচ্ছে মানুষরূপী স্বর্গীয় হুর।" হযরত ফাতেমা (সা.) বেহেশতে সর্ব প্রথম প্রবেশ করবেন বলেও বিশ্বনবী (সা.) উল্লেখ করেছেন।

 

সত্যি বলতে কী, হযরত ফাতেমা (সা.) নারীদের ব্যাপারে জাহেলি যুগের চিন্তাভাবনাগুলোকে পাল্টে দিয়ে সমাজে নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক অবস্থান, সমাজে তাদের প্রশিক্ষণমূলক ভূমিকা, তাদের আত্মিক ও মানসিক বৈশিষ্ট্য ইত্যাদি তুলে ধরেছেন। হযরত ফাতেমা (সা.) এর জীবন কেটেছে এমন এক গৃহে যেটি ছিল মোনাফেকি, শিরক এবং কুফরির বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংগ্রামের প্রাণকেন্দ্র। তাঁর পিতা হযরত মুহাম্মদ এবং স্বামী-হযরত আলী (আ.)-কুফরির বিরুদ্ধে সংগ্রাম ও জিহাদে বীরত্বের সাথে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং ফাতেমা (সা) সবসময় তাঁদের সহযোগী ছিলেন। পিতা এবং স্বামীর সঙ্গে জেহাদে অংশ নেওয়া থেকেই তাঁর সামাজিক ভূমিকার বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়। ছোট্টবেলা থেকেই তৎকালীন বিচিত্র প্রতিকূল অবস্থা তিনি স্বচক্ষে দেখেছেন এবং কী করে সেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে নিজেদের উপস্থিতি বজায় রাখা যায় সেসব জীবন বাস্তবতার আলোকে শিখেছেন।

 

হযরত ফাতেমা যাহরা (সা.) ছিলেন গোটা মানব জাতির জন্য অসাধারণ ত্যাগ, বিশ্বস্ততা,সততা,দানশীলতা, ধৈর্য, পবিত্রতা, আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্টিসহ অনেক স্বর্গীয় গুণের আদর্শ। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.) তাঁকে সকল যুগের নারীর মধ্যে শ্রেষ্ঠ বলে উল্লেখ করেছেন।

 

আমরা আগেই বলেছি, হযরত ফাতেমা ছিলেন একজন আদর্শ জননী, একজন আদর্শ স্ত্রী এবং একজন আদর্শ কন্যা। তিনি জন্ম নিয়েছিলেন এমন এক যুগে যখন নারীর জন্মকে আরবরা কলঙ্ক বলে মনে করতো। বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও নারীরা ছিল অবহেলিত ও উপেক্ষিত এবং এমনকি মানবিক মর্যাদা থেকে বঞ্চিত। বিশ্বনবী (সা.)'র কোনো পুত্র সন্তান না থাকায় মক্কার মুশরিক আরবরা তাঁকে নির্বংশ বা আবতার বলে উপহাস করত। কিন্তু মহান আল্লাহ এসব উপহাসের জবাব দিয়েছেন সূরা কাওসারে। এ সূরায় হযরত ফাতেমা (সা.)কে কাওসার বা প্রাচুর্য্য বলে উল্লেখ করে মহান আল্লাহ কাফেররাই নির্বংশ হবে বলে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন।

 

নারীরা যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে সে দৃষ্টান্ত দেখিয়ে গেছেন হযরত ফাতেমা (সা.)। তিনি ইমামত বা বেলায়েতের দায়িত্বপ্রাপ্ত না হলেও হযরত আলী (আঃ) ছাড়া আহলে বাইতের অন্য ১১ জন সদস্য বা ইমামের জন্য তিনি ছিলেন আদর্শিক পূর্বসূরী। বিশ্বনবী (সা.)'র ওফাতের পরও তিনি মুসলমানদেরকে পথ-নির্দেশনা দান অব্যাহত রেখেছিলেন। পবিত্র কোরআন ও রাসূল (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতকে অনুসরণ করার জন্য বিশ্বনবীর তাগিদ সত্ত্বেও পিতার ওফাতের পর সৃষ্ট জটিল ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি দেখতে পেয়ে তিনি পিতার উম্মতকে পথ নির্দেশনা দেয়ার জন্য বলেছিলেন, তোমরা কেন বিপথে যাচ্ছ? অথচ তোমাদের মধ্যে কোরআন রয়েছে। কোরআনের বক্তব্য ও বিধি-বিধান সুস্পষ্ট। এ মহাগ্রন্থের দেখানো পথ-নির্দেশনাগুলো স্পষ্ট এবং সতর্কবাণীগুলোও স্পষ্ট।

 

হযরত ফাতেমা (সা.) নিজ জীবনে পবিত্র কোরআনের শিক্ষা বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। তাঁর মাত্র প্রায় ১৮ বছরের জীবন এ ধরনের অনেক বরকতময় ঘটনায় ভরপুর। যেমন, আমীরুল মুমিনিন হযরত আলী (আঃ)'র সঙ্গে তাঁর বিয়ের অনুষ্ঠানের প্রাক্কালে এক দরিদ্র মহিলা তাঁর কাছে পোশাক চাইলে তিনি তার বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য কেনা নতুন জামাটি উপহার দেন। তিনি ইচ্ছে করলে তার পুরনো জামাও দিতে পারতেন। কিন্তু নবীনন্দিনী এ প্রসঙ্গে পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতের কথা স্মরণ করেন, যাতে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোনো কিছু দান করার ক্ষেত্রে ও তা কবুল হবার জন্য সবচেয়ে প্রিয় বস্তুটি দান করার কথা বলা হয়েছে। অনেক সময় দেখা গেছে ঘরে খাদ্যের অভাব থাকা সত্ত্বেও স্বামী যাতে বিব্রত না হন বা গুরুত্বপূর্ণ অন্য কাজে বাধাগ্রস্ত না হন সে জন্য তিনি সে অভাবের কথা তাঁকে জানাননি।

 

ফাতেমা (সা) এমন এক ঘরে ছিলেন যে ঘরের নিকটতম প্রতিবেশী ছিল দারিদ্র্য। তারপরেও দান-খয়রাতের ক্ষেত্রে ঐ ঘরটি কখনোই পিছিয়ে ছিল না। ইবনে শাহর অশুব বলেছেনঃ একদিন আলী (আ.) ফাতেমা (সা.) কে বলেছেন, 'ঘরে খাবার-দাবার কিছু আছে'? ফাতেমা জবাব দিলেনঃ না,গত দু'দিন ধরে বাচ্চা-কাচ্চারাসহ না খেয়ে আছি। আলী বললেনঃ আমাকে কেন বলনি? কিছু একটা ব্যবস্থা করতাম!ফাতেমা বললেনঃ লজ্জা পাচ্ছিলাম এই ভেবে যে, এমন কিছু আমি চাই যা তুমি ব্যবস্থা করতে পারবে না। আলী (আ.) ঘর থেকে বেরিয়ে এসে এক দিনার ঋণ করলেন স্ত্রী-পুত্রদের জন্যে খাবারের ব্যবস্থা করতে। পথেই একজনকে দেখলেন ভীষণ মন খারাপ। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন ক্ষুধার্ত বাচ্চাদের কান্নাকাটি সহ্য হচ্ছে না,তাই মন খারাপ। আলী (আ) যেই এক দিনার ঋণ করেছিলেন তা লোকটিকে দিয়ে দিলেন।



হযরত আলী যেমন নিজ স্ত্রী-পুত্রদের চেয়ে অভাবীদের অভাব মোচনের দিকে গুরুত্ব দিতেন তেমনি হযরত ফাতিমাও নিজ পরিবারের চেয়েও প্রতিবেশীদের বেশী গুরুত্ব দিতেন। ইমাম হাসান মুজতাবা (আঃ) এ সম্পর্কে বলেছেন,এক রাতে দেখলাম মা এবাদতে মগ্ন। একটানা রূকু ও আর সেজদায় থাকতে থাকতে ভোরের আলো ফুটে উঠলো। আমি শুনতে পেলাম তিনি প্রতিবেশীদের জন্য অনেক দোয়া করছেন,কিন্তু নিজের জন্য কোনো দোয়াই করলেন না। আমি প্রশ্ন করলাম, "মা, মোনাজাতের সময় তুমি কেবল পাড়া-প্রতিবেশীর মঙ্গল কামনা করো। তোমার নিজের জন্য বা আমাদের কারও জন্য তো দোয়া কর না! এর কারণ কি? "


স্নেহময়ী মা এবার ছেলেকে আদর করে বুকে টেনে নিয়ে বললেন, বাছা আমার! আমি কেন ও রকম করি? তুমি জেনে রেখো, প্রতিবেশীর হক আগে। প্রতিবেশীর মঙ্গল কামনা করলে, তাদের খোঁজখবর নিলে আল্লাহ তায়ালা খুব খুশী হন। তাই আমি তাদের জন্য দোয়া করি। তবে তোমাদের জন্যও দোয়া করি। তবে প্রতিবেশীর অধিকার আগে,এটা মনে রাখবে-কেমন ?



হযরত ফাতেমার যাহরার জীবনজুড়ে ছিলো সত্যের পথে দৃঢ়তা ও সংগ্রাম। এজন্য ওবীজীর ওফাতের পর ফাতেমা (সা.) ইসলামের শিক্ষাগুলো রক্ষা করা এবং ইসলামী সমাজের বিচ্যুতির বিপদ সম্পর্কে সবাইকে সতর্ক করেছিলেন। এই সতর্ক করার পেছনে তাঁর কোনো খ্যাতি, মর্যাদা আর সম্পদের লোভ ছিল না, বরং ইসলামকে বিদয়াত আর বিচ্যুতি থেকে বিশেষ করে কোরআনের আয়াত বা ঐশী বিধি-বিধানগুলোকে বিকৃতি থেকে রক্ষা করাই ছিল একমাত্র লক্ষ্য। দৈহিক কষ্ট, মানসিক চাপ ইত্যাদি সত্ত্বেও তিনি ধাপে ধাপে তাঁর লক্ষ্য বাস্তবায়নে সচেষ্ট হয়েছিলেন। তাঁর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি বর্তমান বিশ্বের নারীদের জন্যে আদর্শস্থানীয় তাহলো সামাজিক, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তো বটেই এমনকি মূল্যবোধ রক্ষার্থে সংগ্রাম করার ক্ষেত্রেও তৎপর ভূমিকা রাখা নারীর দায়িত্ব।

 

আজও যদি আমরা হযরত ফাতেমার জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে নারী মুক্তির জন্য চেষ্টা করি তাহলে অনেকাংশে সফলতা দেখতে পাব। আজকাল যারা পশ্চিমা নারীদের অনুসরণকেই নারীর মুক্তি ও প্রগতির পথ বলে মনে করছেন তারাও যদি নিজ জীবনে হযরত ফাতেমা (সা.)'র আদর্শ অনুসরণের চেষ্টা করতেন এবং তার সাদা-সিধে ও অনাড়ম্বর জীবন থেকে শিক্ষা নিতেন তাহলে আজকের যুগে তালাক প্রবণতা বৃদ্ধিসহ যেসব জটিল পারিবারিক সমস্যা দেখা যায় সেগুলোর সমাধান সহজ হয়ে যেত।

 

অবশ্য হযরত ফাতেমার আদর্শকে যে একেবারে অনুসরণ করা হচ্ছে না তা কিন্তু নয়, উত্তর আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য থেকে শুরু করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পর্যন্ত সর্বত্র আজ মুসলিম নারীরা নিজেদের আত্মবিশ্বাস ও ইসলামী পরিচয়ের সন্ধানে পুনরায় জেগে উঠেছে। ইরানে ইসলামী বিপ্লবের বিজয়ের পর নারীদের মর্যাদা, অবস্থান ও অধিকারের ব্যাপারে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। স্ময়ং ইমাম খোমেনী (রহ.) এ বিষয়টির ওপর ব্যাপক গুরুত্ব দিয়েছেন। তার ফল এখন ইরানের সর্বত্র বিরাজমান। ইরানের এখন শিক্ষা, চিকিৎসা, ব্যবসা, প্রশিক্ষণ, রাজনীতি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীদের ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে। এমনকি পার্লামেন্টেও নারীদের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে।

 

ইরানসহ বিশ্ব মুসলিম নারীরা হযরত ফাতেমা (সা) এর জীবনাদর্শ অনুযায়ী সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আগের তুলনায় আরো বেশি বেশি নিজেদের অস্তিত্বের স্বাক্ষর রাখবে-এই আশাবাদ ব্যক্ত করে এ আলোচনার ইতি টানছি।#

২৪ মার্চ (রেডিও তেহরান): আজ থেকে ১৪২৫ চন্দ্র-বছর আগে ১১ হিজরির এই দিনে অর্থাৎ তেসরা জমাদিউস সানি শাহাদত বরণ করেছিলেন বেহেশতি নারীকুলের সম্রাজ্ঞী নবী-নন্দিনী হযরত ফাতিমা জাহরা (সালামুল্লাহি আলাইহা)। তিনি জন্ম নিয়েছিলেন আজ হতে ১৪৪৪ বছর আগে (২০ শে জমাদিউসসানি)। অর্থাৎ মাত্র ১৯ বছর বয়সে শাহাদত বরণ করতে হয়েছিল তাঁকে।

 

ইরানসহ বিশ্বব্যাপী পালিত হচ্ছে মহাশোকের এই দিবস। রেডিও তেহরানের পক্ষ থেকে এ উপলক্ষে জানাচ্ছি গভীর শোক ও সমবেদনা।


বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র পুত্র সন্তানগণ শৈশবেই ইন্তিকাল করায় মক্কার কাফিররা যখন মহানবী (সা.)-কে আবতার বা নির্বংশ বলে বিদ্রূপ করতো তখন মহান আল্লাহ তাঁকে দান করেন হযরত ফাতিমা জাহরা (সা.আ.)। পবিত্র কুরআনে তাকে উল্লেখ করা হয়েছে 'কাওসার' হিসেবে যার অর্থ মহত্ত্ব আর নেয়ামতের চির-প্রবহমান ঝর্ণা।  


ফাতিমা জাহরা (সা. আ.)'র 'ফাতিমা' শব্দের অর্থ পাপ বা মন্দের দহনকারী, আর 'জাহরা' শব্দের অর্থ আলোকোজ্জ্বল। বলা হয় তিনি বিচার দিবসে পাপী উম্মতের মধ্য হতে যারা বিশ্বনবী (সা.) ও তাঁর পবিত্র বংশ বা আহলে বাইতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল তাঁদের মুক্তির জন্য শাফায়াৎ বা সুপারিশ করবেন। 

 

খোদাভীরুতা, আত্মত্যাগ, বাগ্মিতা ও সাহিত্য-প্রতিভাসহ সমস্ত মানবীয় মহৎ গুণে পূর্ণতার অধিকারী এই মহীয়সী নারীর আলোকোজ্জ্বল অস্তিত্ব কেবল নারী জাতি নয় গোটা মানব জাতির জন্যই চিরন্তন গৌরবের উৎস।

 

ফাতিমা জাহরা (সা. আ.)-কে দেখলে বিশ্বনবী (সা.) বসা অবস্থায় থাকলে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে সালাম করতেন। তিনি তাঁর বংশধারা রক্ষাকারী একমাত্র এই কন্যার মর্যাদা প্রসঙ্গে বলেছেন, যা ফাতিমাকে কষ্ট দেয়, তা আমাকে কষ্ট দেয় এবং যা আমাকে কষ্ট দেয় তা আল্লাহকেও কষ্ট দেয়। বিশ্বনবী (সা.)'র বিপদ ও দুঃখ বেদনায় মাতৃসুলভ সেবার জন্য ফাতিমা (সা.আ.)-কে বলা হত উম্মে আবিহা বা নিজ পিতার মাতা।

 

ফাতিমা(সা.আ.)'র পর বিশ্বের তিনজন শ্রেষ্ঠ নারী হলেন তাঁরই মা হযরত খাদিজা (সা.আ.), হযরত মারিয়াম (সা. আ.) ও ফেরাউনের স্ত্রী তথা মুসা নবী (আ.)'র পালক-মাতা বিবি আসিয়া (সা. আ.)। এই তিন মহীয়সী নারীও ফাতিমা (সা.আ.)'র জন্য গর্ব অনুভব করতেন।

 

হযরত খাদিজা (সা. আ.) নিজের গর্ভে থাকাকালে কন্যা ফাতিমা (সা. আ.)'র সঙ্গে কথা বলেছেন বলে বর্ণনা রয়েছে।


ফাতিমা জাহরা (সা.আ.) দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছিলেন বিশ্বনবী (সা.)'র চিরবিদায়ের মাত্র ৭৫ দিন পর। রাসুল (সা.)'র বিয়োগ-ব্যথায় অত্যন্ত ব্যথিত নবী-নন্দিনীকে সান্ত্বনা দিতে আসতেন ওহীর ফেরেশতা হযরত জিবরাইল (আ.)। মাসহাফই ফাতিমা' নামে খ্যাত গ্রন্থটির সমস্ত তথ্য সন্নিবেশিত হয়েছে জিবরাইল ফেরেশতার সঙ্গে ফাতিমা (সা. আ.)'র কথোপকথনের মাধ্যমে যা লিখে গেছেন হযরত আলী (আ.)। মহানবী (সা.) তাঁর বাবা ছিলেন বলে তাঁর বিয়োগ-ব্যথায় তিনি খুব বেশি কাতর হয়ে পড়েছিলেন তা নয়, বরং পরিপূর্ণ মহামানবী হিসেবে বিশ্বনবী (সা.)'র পরিপূর্ণ মানবতা ও শ্রেষ্ঠত্বকে উপলব্ধি করতেন বলেই তিনি বাবার বিদায়ে এতোটা দুঃখ-ভারাক্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন।

 

ফাতিমা সিদ্দিকা (সা. আ.) ঐশী পন্থায় অনেক জ্ঞান অর্জন করেছিলেন। তিনি নিজের মৃত্যু কবে হবে এবং তাঁর দুই প্রিয় সন্তান হাসান ও হুসাইন (আ.) কিভাবে মারা যাবেন সেই তথ্যসহ ভবিষ্যৎ ইতিহাসের অনেক খবর রাখতেন। হুসাইন (আ.)'র হত্যাকারীদের অভিশাপ দিয়ে গেছেন তিনি। মদিনার নারী সমাজ ধর্মীয় বিষয়সহ নানা বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করত ফাতিমা (সা.আ.)'র কাছ থেকে।

 


জগত-বিখ্যাত ইমাম হযরত হাসান ও হুসাইন (আ.) এবং মানবজাতির শেষ ত্রাণকর্তা হযরত ইমাম মাহদী (আ.)সহ আহলে বাইতের পবিত্র ধারার ১১ জন ইমাম ছিলেন তাঁরই বংশধর। এই নয় জন ইমামের দৃষ্টিতে ফাতিমা জাহরা (সা. আ.) ছিলেন তাঁদেরও আদর্শ। এই মহান ইমামগণই প্রকৃত ইসলাম বা মুহাম্মাদী ইসলামকে সংরক্ষণ করেছেন মানবজাতির জন্য।

 

ফাদাক ও মানজিল শীর্ষক তাঁর ভাষণ এই মহামানবীর অতুল জ্ঞান, খোদাভীরুতা এবং দূরদর্শিতাকেই তুলে ধরে। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, মহান আল্লাহ আলী, তাঁর স্ত্রী ও তাঁদের সন্তানদেরকে মানুষের জন্য হুজ্জাত বা দলিল করেছেন এবং তাঁরা হল জ্ঞানের দরজা।

 


নবীজী (সা.) মৃত্যুকালে বলেছিলেন: "কন্যা আমার! আমার পরে আমার খান্দান থেকে তুমিই সর্বপ্রথম আমার কাছে আসবে (তথা দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে)"- এ কথা শুনে হযরত ফাতিমা (সা. আ.) আনন্দিত হয়েছিলেন। 

 

হযরত ফাতিমা জাহরা (সা.আ.)'র নামেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন ইসলামী বিদ্যাপীঠ মিশরের আলআজহার বিশ্ববিদ্যালয়। 


হযরত ফাতিমা (সা. আ.)-'র নুরানি ও আধ্যাত্মিক (আলোকিত অবয়ব) উপস্থিতি দেখেছিলেন এখন থেকে প্রায় ৯৮ বছর আগে পর্তুগালের ফাতিমা শহরের তিন শিশু। বিশ্বের আরো কয়েকটি দেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে বলে শোনা যায়। পর্তুগালের ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনার জন্য দেখুন রেডিও তেহরানের "১৯১৭ সালে পর্তুগালে মা মেরি, না ফাতিমা (সা.) এসেছিলেন?"শীর্ষক সংবাদ।

 

মহান আল্লাহর অশেষ দরুদ বর্ষিত হোক এই মহামানবী, তাঁর পিতা এবং তাঁদের পবিত্র  বংশধর তথা আহলে বাইতের ওপর। # 

 

রেডিও তেহরান/এএইচ/২৪