এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla

‘তাহেরা’র জন্ম হয়েছিল নিউইয়র্কে এক খ্রিস্টান পরিবারে। তিনি ২০০৭ সালে মুসলমান হন এবং এর এক বছর পর হন শিয়া মুসলমান। বর্তমানে তিনি হাফিজ নামের এক ছেলে ও সাবেরাহ নামের এক মেয়ের মা। ‘তাহেরা’ আমেরিকার স্বাস্থ্য বিভাগে চাকরির সুবাদে নানা মহাদেশ সফর করেছেন। ইসলামের সঙ্গে পরিচয় সম্পর্কে তিনি বলেছেন: “আমেরিকার শিক্ষা বিভাগ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিশ্বের প্রধান ধর্মগুলোর পরিচয় শিক্ষার্থীদের কাছে তুলে ধরেছে। তারা ইসলামের মূল নীতির নামে আমাকে যা শিখিয়েছে আমার কাছে তা খুবই কষ্টসাধ্য মনে হয়েছে।  আমি ছিলাম গোঁড়া খ্রিস্টান। বাবা আমাকে খ্রিস্ট ধর্মের সব বিধি-বিধান শিখিয়েছিলেন। আমি ২০০৭ সালে উত্তর আফ্রিকা সফরে যাই। সেই সময়টা ছিল রোজার মাস এবং আমি সোমালিয়া, জিবুতি ও ইরিত্রিয়ায় স্বাস্থ্য-কর্মী হিসেবে কাজ করতাম। ইসলামী বিশ্বাসের প্রতি এইসব দরিদ্র দেশের মুসলমানদের গভীর অঙ্গীকার ও দৃঢ়তা আমাকে অভিভুত করতো। এই দেশগুলোর আবহাওয়া বেশ গরম ও ভেজা হওয়া সত্ত্বেও  মুসলমানরা পুরো রমজান মাসেই রোজা রাখতো ও নামাজ আদায় করতো। এমন কঠিন পরিস্থিতিতেও ইসলামের মূল নীতির প্রতি তাদের গভীর ভালবাসা দেখে আমি এই ধর্ম সম্পর্কে জানতে আগ্রহী হই।”  

 

মার্কিন নওমুসলিম নারী তাহেরা আরো বলেছেন: 'ইসলামের ব্যাপারে মুসলমানদের নিষ্ঠা ও গভীর মমত্ববোধে প্রভাবিত হওয়ার কারণে আমেরিকায় ফিরে এসে ইসলাম সম্পর্কিত বই-পুস্তক পড়া শুরু করি। এ সময় একজন মুসলমানের সঙ্গে পরিচিত হওয়ায় ইসলামী বিধি-বিধান ও শিক্ষা সম্পর্কে বেশ ধারণা অর্জনে সক্ষম হই। ইসলাম ও এর শিক্ষাগুলো আমার কাছে খুবই আকর্ষণীয় মনে হয়েছে। এ ধর্মের মধ্যে পাচ্ছিলাম আমার মনের অনেক প্রশ্নের জবাব। আমি মসজিদে যেতাম ও আরবি এতটা শেখার চেষ্টা করি যাতে কুরআন পড়া আমার জন্য সহজ হয়। এইসব গবেষণা ও অনুসন্ধানের ফলে আমি ইসলামের দিকে আরো আকৃষ্ট হচ্ছিলাম। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম যে ইসলামই শ্রেষ্ঠ ও পূর্ণাঙ্গ ধর্ম। তাই মুসলমান হওয়ার সিদ্ধান্ত নেই।'

 

মার্কিন নওমুসলিম নারী তাহেরা আরো বলেছেন:

 

 'ইবাদতের বিধি-বিধানগুলো লিখে রাখতাম ও সেসব মুখস্থ রাখার চেষ্টা করতাম। অবশ্য কর্মস্থলে ইসলামী ইবাদত-বন্দেগি করতাম মানুষের দৃষ্টির আড়ালে। নামাজের কিবলার জন্য সব সময়ই দিগদর্শন যন্ত্র ব্যবহার করতাম। দীর্ঘ দিন ধরে আমার বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমার মুসলমান হওয়ার ও ইবাদতে লিপ্ত হওয়ার বিষয়টি টের পাননি। এরপর যখন জানতে পারলেন যে আমি মুসলমান হয়ে গেছি তখন খুবই বিস্মিত হলেন। কারণ, একজন শ্বেতাঙ্গ মার্কিন নারী  ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন-এটা ছিল তার ধারণাতীত বিষয়। তিনি ভুলবশত মনে করতেন যে ইসলাম এমন এক ধর্ম যেখানে পুরুষরা নারীদের কোনো কারণ ছাড়াই মারধোর করে। তাই তিনি আমার ইবাদত-বন্দেগির বিরোধিতা করেন। সৌভাগ্যবশত: এরপর এমন এক ব্যক্তি আমার বিভাগের প্রধান হন যিনি ছিলেন যুক্তির প্রতি বেশি শ্রদ্ধাশীল ও  আমার অবস্থা বুঝতে সক্ষম হন। ফলে তিনি আমাকে ইবাদত-বন্দেগি করার জন্য সময় দিতেন।'

 

 তাহেরা আরো বলেছেন: 'আমি বহুদিন হিজাবও করিনি। কারণ, আমি যে পেশায় ছিলাম সেই পেশার কাজের সুবিধার জন্য চুল ঢাকার সুযোগ ছিল না। এ ছাড়াও আমার ইউনিফর্মের জামার হাতা ছিল সংক্ষিপ্ত। কিন্তু যখন হিজাব পরার মূল কারণ ও লক্ষ্য বুঝতে পারলাম তখন এ দিকে আকৃষ্ট হলাম ও হিজাব করতে লাগলাম।'

 

পবিত্র কুরআন ও বিশ্বনবী(সা.) ইসলামের দুই প্রধান আকর্ষণ। বিশ্বনবীর মহত্ত্ব যেন এমন এক সমৃদ্ধ ছায়াপথ যাতে রয়েছে লক্ষ কোটি গ্রহ-তারা। যেমন, মহানবীর মধ্যে ছিল নৈতিকতায় ভরপুর জ্ঞান, তাঁর রাষ্ট্রীয় ও শাসন-দক্ষতার মধ্যে ছিল ন্যায়বিচার ও প্রজ্ঞার মিশ্রণ এবং মর্যাদার সঙ্গে বিনম্রতর সমন্বয়ের মত অসংখ্য মহতী দিক। আর এ জন্যই যুগে যুগে সত্য-সন্ধানীরা ইসলামের দিকে আকৃষ্ট হচ্ছেন বিশ্বনবী (সা.)'র অতুল মহত্ত্বের কারণে।

 

মার্কিন নওমুসলিম নারী তাহেরা এ প্রসঙ্গে বলেছেন:

 

'বিশ্বনবী (সা.)'র আদর্শ ব্যক্তিত্ব আমাকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করেছে। তাঁর মহামহিম ব্যক্তিত্বের পরতে পরতে রয়েছে মানবজাতির জন্য অমূল্য শিক্ষা। তৎকালীন ইহুদিদের প্রতি মহানবীর ন্যায়বিচার আমাকে খুবই প্রভাবিত করেছে। তিনি প্রতি বছর এক মাস হেরা গুহায় ইবাদত-সাধনা করেছেন।' 

 

তাহেরার দৃষ্টিতে ইসলামী চিন্তাধারার সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এ ধর্মের আরেকটি বড় আকর্ষণ। তার মতে পাশ্চাত্য যে বিষয়ে জানে না সে বিষয়ে ভীত-সন্ত্রস্ত থাকে এবং অন্যদের আদর্শকে তুচ্ছ জ্ঞান করে নিজ মতবাদকেই শ্রেষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরে। অবশ্য সব পশ্চিমারাই এমন নন বলে তাহেরা মনে করেন। চাকরির দায়িত্ব পালন উপলক্ষে ইউরোপে সফরের সময় তাহেরা তুর্কি, ইরাকি ও মরক্কোর মুসলমানদের সঙ্গে পরিচিত হন এবং এ সময় তিনি তাদের ধর্মীয় আচার-আচরণ ও ইসলামের সমৃদ্ধ সংস্কৃতি দেখে মুগ্ধ হন। তাহেরার মতে পশ্চিমাদের জীবনধারা থেকে যা হারিয়ে গেছে তা হল নিজের সম্পর্কে আধ্যাত্মিক উপলব্ধি এবং অদৃশ্যের প্রতি বিশ্বাসের গুরুত্ব।

 

 

ইসলাম ধর্ম গ্রহণের পর  মার্কিন নারী তাহেরা একজন মুসলমানকে বিয়ে করেন এবং ইসলাম সম্পর্কে দিনকে দিন তার তথ্য-ব্যাংক সমৃদ্ধ কোরে তোলেন। এরপর তিনি বিশ্বনবী (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইতের সমৃদ্ধ সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন ও আহলে বাইতকে বিশুদ্ধ ইসলামী জীবনধারার জন্য আদর্শ হিসেবে দেখতে পান যে আদর্শ বিচ্যুতি ও কুসংস্কার থেকে মুক্ত। 

 

শিয়া মুসলমান হিসেবে নিজের অনুভূতি তুলে ধরতে গিয়ে তিনি হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)'র জন্য আয়োজিত শোকের অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার কথা স্মরণ করে বলেছেন: 'আমার জীবনে আর কখনও এমন মধুর অভিজ্ঞতা ছিল না। আহলে বাইতের সদস্যদের জীবন-ধারা ও তাঁদের  আচার-আচরণ আমার জন্য শ্রেষ্ঠ আদর্শ। তাঁদের জীবনী পড়ে আমি ইসলামের বাস্তবতা সম্পর্কে আরো বেশি বুঝতে সক্ষম হই এবং আমার সিদ্ধান্তে আরো অবিচল হই। শিয়া মাজহাবের আত্মত্যাগের সংস্কৃতিই আমাকে এই মাজহাবের দিকে বেশি আকৃষ্ট করেছে। ইমামগণ ছিলেন এই সংস্কৃতির অলঙ্কার। শাহাদতের সংস্কৃতি হচ্ছে স্বার্থপরতা ও লোভের সম্পূর্ণ বিপরীত।'

 

মার্কিন নওমুসলিম নারী তাহেরা ইসলামের প্রধান নীতিমালা, বিশ্বাস, নৈতিকতা, আইন ও ইতিহাস এবং কুরআনের জ্ঞান অর্জনের সিদ্ধান্ত নেন। আর এ লক্ষ্যেই সংগ্রহ করেন আয়াতুল্লাহ সিস্তানির লেখা বই ' ইসলামী বিধানমালা', ইমাম গাজ্জালির বই 'ধর্মীয় জ্ঞানের পুনরুজ্জীবন' শীর্ষক বই, আয়াতুল্লাহ আমিনির লেখা 'আত্মগঠন' শীর্ষক বই এবং আহলে বাইতের জীবনী সংক্রান্ত শেখ মুফিদের লেখা বই 'কিতাবুল ইরশাদ' ইত্যাদি। তাহেরা মুসলমান হওয়ার আগেই মৌলানা রুমি, আত্তার, হাফেজ ও সাদি'র কবিতা পড়েছিলেন। তাদের লেখা ফার্সি কবিতার আধ্যাত্মিক সৌন্দর্য তাহেরাকে অভিভুত করেছে। আর এরই প্রভাবে তিনি নিজ সন্তানের নাম রেখেছেন হাফিজ। #

হযরত ইমাম মুসা কাযিম (আ.)'র জন্ম বার্ষিকী উপলক্ষে তাঁর মহান আত্মার প্রতি জানাচ্ছি অশেষ দরুদ ও সালাম এবং সবাইকে জানাচ্ছি মুবারকবাদ। 

 

হযরত ইমাম মুসা কাযিম (আ.) ছিলেন এমন একজন ব্যক্তিত্ব যিনি ছিলেন আল্লাহর শীর্ষস্থানীয় বন্ধু, মানবজাতির জন্য খোদায়ী ধর্ম ও সত্যের প্রকাশ, বিশ্বজুড়ে অজ্ঞতা ও নৈরাজ্যের কালো আঁধারে আল্লাহর নূরের প্রতিফলন এবং মানবজাতিকে সুপথ দেখানোর মিশনে ছিলেন ত্রুটি-বিহীন ও নিবেদিত-প্রাণ। তিনি আল্লাহর পথে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা, ত্যাগ-তিতিক্ষা ও সংগ্রাম উপহার দিয়েছেন এবং এই পথে অসংখ্য বাধা-বিঘ্ন আর জুলুমের শিকার হয়ে শাহাদত বরণ করেছেন। আমাদের এই আলোচ্য মহাপুরুষ ছিলেন বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)'র পবিত্র আহলে বাইত (আ.) ও নিষ্পাপ ইমামকুলের সদস্য, সতকর্মশীলদের অন্যতম নেতা, নবী-রাসূলদের উত্তরসূরি ও  একজন পরিপূর্ণ মহামানব।


ইমাম মুসা কাযিম (আ.) ছিলেন ইসলামের অত্যন্ত দুর্যোগপূর্ণ সময়ে প্রকৃত ইসলামের প্রদীপকে জিইয়ে রাখার ও আরো বিকশিত করার অন্যতম কাণ্ডারি। বিশ্বনবী (সা.)'র আহলে বাইতের এই সদস্য ছিলেন অজস্র মহত গুণের আধার এবং যোগ্য মু'মিন গড়ে তোলার অনন্য এক শিক্ষক। আজ আমরা এ মহামানবের পবিত্র জন্মদিন উপলক্ষে তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী এবং ইসলামী জ্ঞান ও সংস্কৃতি জোরদারে তার বিশেষ অবদানের কথা বিশেষভাবে আলোচনা করব।

 

ইমাম মুসা ইবনে জাফর আল কাযিম (আ.)'র জন্ম হয়েছিল ১১৯ হিজরির সাতই সফর। তাঁর পিতা ছিলেন বিশ্ববিশ্রুত ইমাম হযরত জাফর সাদিক (আ.)। রাগ সংবরণে অশেষ ধৈর্যের জন্যই এই মহান ইমামকে বল হত কাযিম। তিনি ছিলেন পিতা ইমাম জাফর সাদিক (আ.)'র মতই নির্ভীক ও ন্যায়পরায়ণ এবং জুলুমের বিরুদ্ধে সোচ্চার। পিতার মহত গুণগুলোর সবই অর্জন করেছিলেন ইমাম মুসা কাযিম (আ.)। তাঁর ৩৫ বছরের ইমামটির জীবনের প্রায় পুরোটাই কেটেছে কারাগারে ও নির্বাসনে।


ইমাম মুসা কাযিম (আ.) আব্বাসীয় শাসকদের শত অত্যাচার ও নিপীড়ন এবং কারাদণ্ড ও নির্বাসন সত্ত্বেও ইসলামের সঠিক শিক্ষা প্রচারের আন্দোলন অব্যাহত রাখেন।


এ আন্দোলনের যে বিশেষ ধারা তাঁর মহান পিতা ইমাম জাফর সাদিক (আ.) শুরু করেছিলেন তা আরও বিকশিত হয়েছিল পুত্রের প্রজ্ঞা, কৌশল ও ত্যাগ-তিতিক্ষাপূর্ণ অধ্যবসায়ের সুবাদে। বিশেষ করে পবিত্র কুরআনের প্রকৃত তাফসির ও হাদীস বর্ণনা তাঁর মাধ্যমে আরও বিকশিত হয়।ইমাম তাঁর অনুসারীদেরকে জ্ঞান অর্জনের জন্য অশেষ অনুপ্রেরণা যোগাতেন। তিনি বলতেন, জ্ঞান মৃত আত্মাকে জীবিত করে যেমনটি বৃষ্টি জীবিত করে মৃত ভূমিকে।


ইমাম মুসা কাযিম (আ.) বিভ্রান্ত ব্যক্তিদের সঙ্গ ত্যাগ করতে নিজ অনুসারীদের তাগিদ দিতেন। মানুষ কখনও বিভ্রান্ত ব্যক্তির কুপ্রভাব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখতে পারে না এবং যখন মন্দ ব্যক্তির ওপর আল্লাহর শাস্তি নাজেল হয় তখন তার সঙ্গে থাকা সত ব্যক্তিও সেই শাস্তি এড়াতে পারে না বলে এই মহান ইমাম উল্লেখ করেছেন।


আব্বাসীয় শাসকদের বিভ্রান্ত ও দুর্নীতিগ্রস্ত চাল-চলন যে ইসলামের সম্পূর্ণ বিপরীত ধারা পিতার মতই তা তুলে ধরেছিলেন ইমাম মুসা কাযিম (আ.) । তাই আব্বাসীয় শাসকরা চাইতেন না জনগণের সঙ্গে ইমামের যোগাযোগ বৃদ্ধি পাক। তারা জনগণের ওপর নবী বংশের ক্রমবর্ধমান প্রভাব ঠেকানোর জন্য যে কোনো ধরনের প্রতারণ, প্রচারণা, বর্বরতা ও নৃশংসতার আশ্রয় নিতে দ্বিধা বোধ করত না। এমনকি বিশ্বনবী (সা.)'র আহলে বাইত এবং তাঁদের অনুসারীদের ওপর জুলুম ও নৃশংস আচরণের ক্ষেত্রে আব্বাসীয়রা উমাইয়াদের চেয়েও বেশি অগ্রসর হয়েছিল, যদিও তাদের নেতৃত্বে সংঘটিত উমাইয়া বিরোধী আন্দোলন জন-সমর্থন পেয়েছিল এই প্রতিশ্রুতির কারণে যে ইসলামী খেলাফতে সমাসীন করা হবে বিশ্বনবী (সা.)'র আহলে বাইতকে। কিন্তু তারা সেই ওয়াদা লঙ্ঘন করে নিজেরাই অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে। আব্বাসীয়রা ইমাম জাফর সাদিক ও ইমাম মুসা কাযিম (আ.) সহ নবী বংশের বেশ কয়েকজন ইমামকে শহীদ করেছিল।


হযরত ইমাম মুসা কাযিম (আ.) তাঁর বন্দী অবস্থার নিকৃষ্টতম সময়েও বিচক্ষণতা, বীরত্ব এবং সংগ্রামী ও আপোষহীন মনোভাব ত্যাগ করেননি।



ইমাম এক চিঠিতে হারুনের কাছে লিখেছিলেন: এমন কোনো দিন নেই যে আমি কষ্টে কাটাইনি অথচ এমন কোনো দিন নেই যে তুমি সুখ-স্বচ্ছন্দে কাটাওনি। কিন্তু, ওই দিন পর্যন্ত আরাম আয়েশে লিপ্ত থাক যেদিন আমরা উভয়ই এমন এক জগতে পদার্পণ করব যার কোনো শেষ নেই এবং ওই দিন অত্যাচারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইমামের আধ্যাত্মিক খ্যাতি, জ্বালাময়ী বক্তব্য ও দৃঢ় মনোবল ছিল আব্বাসীয় শাসক হারুনের কাছে অসহনীয়।


ইমাম মুসা ইবনে জাফর (আ.)’র অনুসারীদের সঙ্গে তাঁর সার্বক্ষণিক যোগাযোগের কথাও হারুন তার গোয়েন্দা বাহিনীর মাধ্যমে জানতে পেরেছিল। হারুন এটাও বুঝতে পেরেছিল যে ইমাম যখনই উপযুক্ত সুযোগ পাবেন তখনই স্বয়ং বিপ্লব করবেন কিংবা তাঁর সঙ্গীদেরকে আন্দোলনের নির্দেশ দেবেন, ফলে তার হুকুমতের পতন হবে অনিবার্য। তাই হারুন বিষ প্রয়োগ করে আপোষহীন ৫৫ বছর বয়স্ক এই ইমামকে শহীদ করার সিদ্ধান্ত নেয়।


হারুন খেলাফতকে রাজতন্ত্রে পরিণত করা ও জনগণের সম্পদ লুটের জন্য লজ্জিত ছিল না। উপরন্তু সে জনগণকে ধোঁকা দেয়ার জন্য বিশ্বনবী (সা.)’র রওজায় গিয়ে রাসূল (সা.)-কে উদ্দেশ করে বলে: হে আল্লাহর রাসূল! আমি আপনার সন্তান মুসা ইবনে জাফরের ব্যাপারে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছি সেজন্য দুঃখ প্রকাশ করছি। আমি আন্তরিকভাবে তাঁকে বন্দী করতে চাইনি। বরং আপনার উম্মতের মধ্যে যুদ্ধ ও বিরোধ সৃষ্টি হবে এ ভয়েই আমি এ কাজ করেছি।


ইমাম মুসা ইবনে জাফর (আ.)-কে বসরায় ঈসা ইবনে জাফর নামক এক জল্লাদের কারাগারে এক বছর বন্দী রাখা হয়। সেখানে ইমামের উত্তম চরিত্র জাফরের ওপর এমন প্রভাব রাখে যে ওই জল্লাদ হারুনের কাছে এক লিখিত বার্তায় জানিয়ে দেয় যে: তাঁকে আমার কাছ থেকে ফিরিয়ে নাও, নতুবা আমি তাঁকে মুক্ত করে দেব। এরপর হারুনের নির্দেশে ইমাম মুসা ইবনে জাফর (আ.)-কে বাগদাদে ফাযল ইবনে রাবির কাছে কারারুদ্ধ করা হয়। এর কিছু দিন পর ফাযল ইবনে ইয়াহিয়ার কাছে হস্তান্তর করা হয় এই মহান ইমামকে। কয়েক দিন পর সেখান থেকেও তাঁকে পাঠানো হয় কুখ্যাত জল্লাদ সানদি ইবনে শাহাকের কারাগারে।


ইমাম কাযিম (আ.)-কে এক কারাগার থেকে বার বার অন্য কারাগারে স্থানান্তরের কারণ ছিল এটাই যে হারুন প্রতিবারই কারা প্রহরীকে নির্দেশ দিত ইমামকে গোপনে হত্যা করার। কিন্তু তাদের কেউই রাজি হয়নি এ কাজ করতে। অবশেষে সানদি ইমামকে বিষ প্রয়োগ করতে রাজি হয়। বিষ প্রয়োগের তিন দিন পর ১৮৩ হিজরির এমন দিনে তিনি শাহাদত বরণ করেন।


হারুন ইমামকে শহীদ করার আগে একদল গণ্যমান্য ব্যক্তিকে কারাগারে উপস্থিত করেছিল যাতে তারা সাক্ষ্য দেয় যে ইমাম কাযিম (আ.) স্বাভাবিকভাবেই মারা গেছেন। এভাবে সে আব্বাসীয় শাসনযন্ত্রকে ইমাম (আ.)কে হত্যার দায়িত্বভার থেকে মুক্ত রাখতে ও ইমামের অনুসারীদের সম্ভাব্য আন্দোলন প্রতিরোধ করতে চেয়েছিল। কিন্তু ইমামের প্রজ্ঞা সেই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেয়। কারণ, ওই সাক্ষীরা যখন ইমামের দিকে তাকিয়েছিল তখন তিনি বিষের তীব্রতা ও বিপন্ন অবস্থা সত্ত্বেও তাদেরকে বললেন: আমাকে নয়টি বিষযুক্ত খুরমা দিয়ে বিষ প্রয়োগ করা হয়েছে, আগামীকাল আমার শরীর সবুজ হয়ে যাবে এবং তার পরদিন আমি ইহজগত থেকে বিদায় নেব।


ইমাম মুসা কাযিম (আ.)’র মহানুভবতা, প্রেমময় ইবাদত, নম্রতা, সহিষ্ণুতা, তত্ত্বীয় ও জ্ঞানগর্ভ বিতর্কে ইমামের ঐশী জ্ঞান এবং দানশীলতা ছিল শত্রুদের কাছেও সুবিদিত। তত্ত্বীয় ও জ্ঞানগর্ভ বিতর্কে ইমামের ঐশী জ্ঞান, বিস্তৃত চিন্তাশক্তি ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ওপর পরিপূর্ণ দখল ফুটে উঠত। তিনি যে কোনো প্রশ্নের সঠিক, পরিপূর্ণ এবং প্রশ্নকারীর বোধগম্যতার আলোকে জবাব দিতেন। তাঁর প্রেমময় ইবাদত ছিল সাধকদের জন্য আদর্শ।


মদীনার অধিবাসীরা ইমাম মুসা কাযিম (আ.)-কে যাইনুল মুতাহাজ্জেদীন অর্থাত রাত্রি জাগরণকারীদের সৌন্দর্য উপাধিতে ভূষিত করেছিল। এই মহান ইমাম এত সুন্দর ও সুললিত কণ্ঠে কুরআন তিলাওয়াত করতেন যে, যে কেউ তা শুনে কেঁদে ফেলত।


এবারে বুদ্ধিমত্তা বা আকল সম্পর্কে ইমামের বক্তব্যের কিছু অংশ তুলে ধরছি:


"নিশ্চয় মহান আল্লাহ বুদ্ধিমান ও বুঝসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিজ কিতাবে সুসংবাদ দিয়েছেন এবং বলেছেন : “অতঃপর সুসংবাদ দিন বান্দাদেরকে, যারা নানা বক্তব্য শোনে তা থেকে উত্তম বক্তব্যকে অনুসরণ করে। তারা হলো যাদেরকে আল্লাহ পথ প্রদর্শন করেছেন এবং তারাই হলো জ্ঞানী।” (যুমার:১৭-১৮) নিশ্চয় আল্লাহ মানুষের বুদ্ধির মাধ্যমেই তাদের ওপরে হুজ্জাত বা নিজ দলিলগুলো পূর্ণ করেছেন এবং সত্যের বর্ণনাকে তাদের প্রতি ন্যস্ত করেছেন এবং প্রমাণ দিয়ে তাদেরকে নিজ প্রতিপালকের প্রতি পথ নির্দেশনা দিয়েছেন।


আল্লাহ ইরশাদ করেন: “নিশ্চয় আকাশগুলো ও পৃথিবী সৃষ্টির আর দিবারাত্রির আগমনের মধ্যে ... বুদ্ধিমান সম্প্রদায়ের জন্যে নিদর্শন নিহিত রয়েছে।” (বাকারা:১৬৩-১৬৪)


ইমাম মুসা কাযিম (আ.) আরো বলেছেন: নিশ্চয় মহান আল্লাহ এ সমস্ত বিষয়কে নিজ পরিচয়ের দলিল হিসাবে উপস্থাপন করেছেন যাতে তারা বোঝে এসবের এক পরিচালক রয়েছেন। আল্লাহ বলেছেন: “এবং তিনি রাত ও দিনকে এবং সূর্য ও চন্দ্রকে তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন এবং নক্ষত্রপুঞ্জও তাঁরই আদেশে তোমাদের সেবায় নিয়োজিত; নিশ্চয় এতে বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে বহু নিদর্শন।” (সূরা নাহল:১২) তিনি আরও ইরশাদ করেন : “হা-মীম। স্পষ্ট কিতাবের শপথ! নিশ্চয় আমরা একে অবতীর্ণ করেছি আরবি কোরআন হিসাবে যাতে তোমরা বুদ্ধি প্রয়োগ কর।” (যুখরুফ:১-৩) আল্লাহ আরও ইরশাদ করেন : “আর তাঁর নিদর্শনসমূহের মধ্যে হলো তোমাদেরকে বজ্র প্রদর্শন করান তোমাদের মনে ভয় এবং আশা জাগ্রত করার জন্য। আর আকাশ থেকে বারি বর্ষণ করেন যাতে মৃত ভূমিকে জীবন্ত করেন। নিশ্চয় এর মধ্যে বুদ্ধিমান লোকদের জন্য রয়েছে নিদর্শন।” (রূম:২৪)


ইমাম মুসা কাযিম (আ.) আরো বলেছেন, আল্লাহ এরপর বুদ্ধিমানদেরকে উপদেশ দিয়েছেন এবং তাদেরকে পরকালের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। ইরশাদ করেন : “পার্থিব জীবন নিছক ক্রীড়া ও কৌতুক বৈ কিছু নয়। আর পারলৌকিক আলয় বা আবাসই হলো তাদের জন্য উত্তম, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, তোমরা কি বুদ্ধি খাটাও না?” (আনআম:৩২) আল্লাহ আরো ইরশাদ করেন : “তোমাদের যা দান করা হয়েছে তা পার্থিব জীবনের ভোগবিলাস ও এর শোভামাত্র এবং যা আল্লাহর কাছে আছে তা উৎকৃষ্ট ও স্থায়ী; তোমরা কি বোঝো না?” (কাসাস:৬০)

 
ইমাম মুসা কাযিম (আ.) আরো বলেছেন, "আল্লাহ এরপর ভয় প্রদর্শন করেছেন তাদেরকে যারা তাঁর আযাব সম্পর্কে বিবেকবান হয় না। আল্লাহ ইরশাদ করেন:


“অতঃপর অন্যদেরকে উৎখাত করেছি আর তোমরা প্রত্যুষে ও সন্ধ্যায় তাদের ওপর দিয়ে অতিক্রম করো। তোমরা কি বুদ্ধি খাটাও না?” (সাফফাত:১৩৬-১৩৮) এরপর বর্ণনা করেছেন যে, বিবেক আছে জ্ঞানের সাথে। আল্লাহ ইরশাদ করেন: “এই দৃষ্টান্তগুলো তুলে ধরেছি সব মানুষের জন্য, তবে সেগুলো সম্পর্কে বুদ্ধি খাটায় না জ্ঞানীরা ব্যতীত।” (আনকাবুত:৪৩) আল্লাহ এরপর ভর্ৎসনা করেছেন যারা বুদ্ধি প্রয়োগ করে না তাদেরকে, ইরশাদ করেছেন: “এবং যখনই তাদেরকে বলা হয় আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তা তোমরা অনুসরণ করো তখন তারা বলে, বরং আমরা অনুসরণ করবো সেটার যার ওপর আমাদের পিতৃ পুরুষদের পেয়েছি। যদিও তাদের পিতৃপুরুষরা এমন ছিল যে বুদ্ধি খাটাতো না এবং সুপথ প্রাপ্ত হত না।” (বাকারা:১৭০) মহান আল্লাহ আরও ইরশাদ করেন : “নিশ্চয় আল্লাহর কাছে সবচেয়ে নিকৃষ্ট জন্তু হলো বধির ও বোবারা, যারা বুদ্ধি খাটায় না।” (আনফাল:২২)আল্লাহ এরপর ইরশাদ করেন : “যদি তাদেরকে জিজ্ঞেস করো কে আকাশগুলো ও পৃথিবীকে সৃষ্টি করেছে, তারা বলবে আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন। বলুন প্রশংসা আল্লাহরই। বরং তাদের অধিকাংশই জানে না তথা বুদ্ধি খাটায় না।” (লুকমান:২৫) আল্লাহ এরপর অধিকাংশকে ভর্ৎসনা করেছেন।

আল্লাহ ইরশাদ করেন: “যদি পৃথিবীর অধিবাসীদের মধ্যে অধিকাংশের অনুসরণ করেন তাহলে তারা আপনাকে আল্লাহর পথ থেকে বিপথে পরিচালিত করবে।” (আনআম:১১৬) আরও ইরশাদ করেন “তবে তাদের অধিকাংশই জানে না।” (আনআম:৩৭) আর তাদের অধিকাংশেরই চেতনা নেই। আল্লাহ এরপর স্বল্প সংখ্যককে প্রশংসা করেছেন, ইরশাদ করেন : “আর আমার বান্দাদের কম সংখ্যকই অধিক কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপনকারী।” (সাবা:১৩) আরও ইরশাদ করেন : “কতই না কম তারা?” (সাদ:২৪) আরও ইরশাদ করেন: “তাঁর তথা নবীর ওপর বিশ্বাস আনেনি কমসংখ্যক ব্যতীত।” (হুদ:৪০)


ইমাম মুসা কাযিম (আ.) আরো বলেছেন,” আল্লাহ এরপর প্রজ্ঞাবানদের সম্পর্কে ইরশাদ করেন : “তিনি যাকে চান প্রজ্ঞা দান করেন। আর যাকে প্রজ্ঞা দেয়া হয় অনেক কল্যাণ তাকে দেয়া হয়েছে এবং উপদেশ গ্রহণ করে না বোধশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তি ব্যতীত।” (বাকারা:২৬৯) নিশ্চয় আল্লাহ বলেন : “সত্যই এতে (এই কোরআনে) স্মরণ রয়েছে তাদের জন্য যারা বোধশক্তি সম্পন্ন ব্যক্তি।” (ক্বাফ:৩৭) (লুকমান:১২) আল্লাহ আরও ইরশাদ করেন : “অবশ্য আমরা লোকমানকে দিয়েছি প্রজ্ঞা।”


ইমাম মুসা কাযিম (আ.) আরো বলেছেন: প্রজ্ঞা দিয়েছি অর্থ উপলব্ধি ও বিবেক (চিন্তাশক্তি ও অনুধাবন ক্ষমতা) দিয়েছি। নিশ্চয় লোকমান নিজ পুত্রকে বললেন : সত্যের আজ্ঞাধীন হও তাহলে মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান হবে। পুত্র আমার দুনিয়া হলো একটা অতল সমুদ্র, তার মধ্যে অনেক ব্যক্তি ডুবে গেছে। তার মধ্যে তোমার নৌকা হলো আল্লাহ ভীতি (তাকওয়া), এর দাঁড় হলো ঈমান, এর পাল হলো তাওয়াক্কুল (আল্লাহর ওপর ভরসা), এর মাঝি হলো বিবেক, এর পথ নির্দেশক হলো জ্ঞান আর এর নোঙ্গর হলো ধৈর্য। প্রত্যেক জিনিসের একটি প্রমাণ থাকে। বুদ্ধিমানের প্রমাণ হলো চিন্তা অনুধ্যান। আর চিন্তা অনুধ্যানের প্রমাণ হলো নীরবতা। আর প্রত্যেক জিনিসের একটি বাহন থাকতে হয়। আর বুদ্ধিমানের বাহন হলো বিনয়। আর তোমার মূর্খতার জন্য এটুকুই যথেষ্ট যে এমন বাহনে আরোহণ করবে যা তোমার জন্য নিষিদ্ধ। 

 

ইমাম মুসা কাযিম (আ.) আরো বলেছেন : যদি তোমার হাতে থাকে একটি আখরোট আর লোকেরা বলে এটা মাণিক্য, এতে তোমার কোন লাভ নেই যখন তুমি জান যে সেটা আখরোট। আর যদি তোমার হাতে থাকে মাণিক্য এবং লোকেরা বলে এটা আখরোট তাহলেও তোমার কোন ক্ষতি নেই যখন তুমি জানো যে এটা মাণিক্য।

 

আল্লাহ নবী ও রসুলদেরকে তাঁর বান্দাদের কাছে প্রেরণ করেননি কেবল এজন্য ছাড়া যে আল্লাহর সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করবে। আর তাদের মধ্যে উত্তম সাড়াদানকারী হলো আল্লাহর অধিকতর পরিচয় অর্জনকারী। আর তাদের মধ্যে আল্লাহর নির্দেশের প্রতি অধিকতর জ্ঞানী হলো তাদের মধ্যে উত্তম বিবেকবান। আর তাদের মধ্যে অধিকতর বিবেকবান হলো যাদের মর্যাদা দুনিয়া ও পরকালে উচ্চতর। এমন কোন বান্দা নেই যার জন্য একজন লাগামধারী ফেরেশতা নেই। আর সে ফেরেশতার কাজ হলো আল্লাহর জন্য বিনয়াবনত ব্যক্তিকে উচ্চে তুলে ধরা আর আত্মগর্বীকে নীচ ও হীন করা।

 

নিশ্চয় মানুষের ওপর আল্লাহর জন্য রয়েছে দুটি হুজ্জাত (প্রমাণ) বাহ্যিক হুজ্জাত আর অভ্যন্তরীণ হুজ্জাত। বাহ্যিক হুজ্জাত হলো রসুল, নবী ও ইমামগণ আর অভ্যন্তরীণ হুজ্জাত হলো বিবেকসমূহ। বুদ্ধিমান হলো সেই ব্যক্তি হালাল যাকে কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন থেকে বিরত করে না আর হারাম তার ধৈর্যের ওপর জয়ী হয় না।


যে ব্যক্তি তিনটা জিনিসকে তিনটা জিনিসের ওপর কর্তৃত্ব প্রদান করে সে যেন তার কু প্রবৃত্তিকে তার বুদ্ধি ধ্বংস করার কাজে সহায়তা দিল। যে ব্যক্তি দীর্ঘ প্রত্যাশা দিয়ে নিজ বুদ্ধির আলোকে আঁধার করে দেয় এবং বেশি কথা বলার মাধ্যমে বিরল প্রজ্ঞাকে মুছে ফেলে আর প্রবৃত্তির কামনা দিয়ে শিক্ষার আলোকে নিভিয়ে ফেলে। সে যেন বুদ্ধির ধ্বংস করার জন্য কু প্রবৃত্তিকে সহায়তা দিল। আর যে তার বুদ্ধিকে ধ্বংস করলো সে তার দীন ও দুনিয়াকে ধ্বংস করলো। কীভাবে তোমার আমল আল্লাহর কাছে পবিত্র হবে যখন তুমি নিজ বুদ্ধিকে আল্লাহর নির্দেশ থেকে বিরত রেখেছ এবং তোমার বুদ্ধির ওপর বিজয়ী করার জন্যে তোমার কু প্রবৃত্তির আজ্ঞাবাহী হয়েছ। একাকীত্বের ওপরে ধৈর্যধারণ বুদ্ধির শক্তির পরিচায়ক। যে ব্যক্তি মহামহিম আল্লাহর সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করে সে দুনিয়াপন্থী ও এর প্রতি আসক্তদের থেকে দূরে থাকে এবং তাঁর প্রতিপালকের কাছে যা রয়েছে তার প্রতি আসক্ত হয়ে ওঠে। আর আল্লাহ তার ভয়ের সময় তার সঙ্গী এবং একাকীত্বে তার সহায় হন। তিনিই তার অসামর্থের সময়ে সক্ষমতার এবং বংশের সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষকতা থেকে বঞ্চিত থাকার ক্ষেত্রে তার সম্মানের কারণ হন।


এই মহান ইমামের প্রতি অজস্র সালাম ও দরুদ পাঠিয়ে এবং সবাইকে অভিনন্দন জানিয়ে শেষ করছি আজকের এই আলোচনা। তবে তাঁর আগে তুলে ধরছি ইমাম মুসা কাযিম (আ.)’র বরকতময় কয়েকটি সংক্ষিপ্ত বাণী: 

 

১. খোদা পরিচিতির পরই আল্লাহর নৈকট্য লাভের সর্বোত্তম পন্থা হল নামাজ, বাবা মায়ের প্রতি সদাচরণ এবং হিংসা, স্বেচ্ছাচার, অহংকার ও দাম্ভিকতা পরিহার করা। 

২.বিনয়ের অর্থ হল, মানুষের সঙ্গে সেরকম আচরণ কর যেরূপ তুমি মানুষের কাছে আশা কর।
৩. যদি কেউ পার্থিব জীবনের প্রতি আকৃষ্ট হয়, তবে তার হৃদয় থেকে আখিরাতের ভয় বিদায় নেয়।#

বিশ্বনবী (সা.)’র নাতি ও নিষ্পাপ ইমাম হযরত ইমাম হুসাইনের (আ.)’র ঘাতকদের সবাইকে কঠিন শাস্তি বা পরিণতি ভোগ করতে হয়েছিল। তাদের ওপর একের পর এক দুনিয়াবি ও আসমানি শাস্তি আসতে থাকে।

 

যেমন, তাদের বেশিরভাগই প্রাণ হারায়, কারো মুখ কৃষ্ণ বর্ণ হয়ে যায়, কারো চেহারা বিকৃত হয়ে যায়, কেউ রাজ্য হারায় ইত্যাদি।

 

ইমামের সঙ্গে বেয়াদবির পরিণাম:

 

যুদ্ধের প্রথম দিকে তামিম গোত্রের আবদুল্লাহ ইবনু হাউজা নামের এক পাষণ্ড ব্যক্তি ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে ইমাম হুসাইন (আ.)-কে খুঁজতে আসে। লোকটি ও হুসাইন! ও হুসাইন বলে চিতকার দিচ্ছিল। ইমাম (আ.) বললেন, কি চাও? লোকটি বলে: দোযখের সুসংবাদ নাও। ইমাম হুসাইন (আ.) বললেন: আমি তো দয়ালু প্রতিপালক ও বাধ্য শাফাআতকারীর কাছে যাচ্ছি।

 

পরে ইমাম বলেন, লোকটি কে? সঙ্গীরা বললেন: ইবনু হাউজা। ইমাম অভিশাপ দিয়ে বললেন: হে আমার প্রতিপালক তাকে দোযখে স্থানান্তরিত করুন।

বর্ণনাকারী বলেন: লোকটির ঘোড়া তাকে নিয়ে খালের মধ্যে পড়ে তার আয়ত্তের বাইরে চলে যায়। সে নিচে পড়ে যায়। আর তার বাম পা রেকাবিতে আটকে থাকে। ঘোড়া দৌড়াতে থাকে। আর লোকটির মাথা পাথরের মধ্যে বার বার ধাক্কা খেতে থাকে। ফলে লোকটির মাথার মগজ বেরিয়ে যায়। এভাবে যুদ্ধের  শুরুতেই লোকটি জাহান্নামে চলে যায়। (তাবারি, পঞ্চম খণ্ড, ২৫৫ পৃ.)

 

কারবালায় যে অসম যুদ্ধ শুরু হয়েছিল তাতে ইমাম হুসাইন (আ.)সহ তাঁর  প্রায়৭২ জন সঙ্গী প্রথম দিকে জয়ী হচ্ছিলেন। কারণ, প্রথম দিকে হচ্ছিল দ্বৈত বা মল্ল যুদ্ধ। কিন্তু এইসব যুদ্ধে প্রতিপক্ষ খুব সহজেই ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ মুমিন ও  বীরদের দৃঢ় আঘাতে কুপোকাত হয়ে জাহান্নামবাসী হচ্ছে দেখে ইবনে জিয়াদের নেতৃত্বাধীন প্রায় ত্রিশ হাজার সেনার ইয়াজিদ বাহিনী ইমাম শিবিরের প্রত্যেক বীরের ওপর সম্মিলিত হামলার নির্দেশ দেয়। ফলে ইমাম শিবিরের প্রত্যেক যোদ্ধা বীর-বিক্রমে জিহাদ করে বহু সংখ্যক মুনাফিক সেনাকে জাহান্নামে পাঠালেও শেষ পর্যন্ত বিপুল সংখ্যক তির, বর্শা ও তরবারির আঘাতে  মারাত্মকভাবে আহত ও বিপর্যস্ত হয়ে শহীদ হন। ইমাম নিজে প্রায় দুই হাজার ইয়াজিদ সেনাকে জাহান্নামে পাঠিয়েছিলেন এবং আরো বেশি সংখ্যককে আহত করেছিলেন।

 

অশ্ব-খুরে ইমামের দেহ দলিত-মথিত করার শাস্তি

 

হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)-কে শহীদ করেই ইয়াজিদের লোকজন ক্ষান্ত হয়নি। ইবনে জিয়াদের নির্দেশে ইমামের লাশের ওপর ঘোড়া দাবড়ানো হয়। এই কাজে নেতৃত্ব দেয় ইবনু হায়াত হাজরামি ও আহবাশ ইবনু মারসাদ নামের দুই পাষণ্ড। 

 

এ প্রসঙ্গে ইবনে জারির তাবারি লিখেছেন, ঘোটক বাহিনী আসল। তারা ইমাম হুসাইন (আ.)’র লাশের ওপর ঘোড়গুলো দাবড়িয়ে তার পিঠের হাড় ও বুকের পাঁজর ভেঙ্গে দেয়। এ কাজে নেতৃত্ব দানকারী আহবাশ ইবনু মারসাদ কিছু দিন পর এক অজানা তিরের আঘাতে নিহত হয়। তিরটি তার বুক ভেদ করে চলে গিয়েছিল। (তাবারি, পঞ্চম খণ্ড, ২৬০ পৃ.)

 

ইমামের শির মুবারকের কুরআন তিলাওয়াত

 

ইমাম হুসাইন (আ.)-কে শহীদ করার পর কুফার গভর্নর ইবনে জিয়াদ  যখন মিম্বরে উঠে বলেছিল যে,’আল্লাহর প্রশংসা করছি যিনি মিথ্যাবাদী ও তার সন্তানকে তথা আলী (আ.) ও তাঁর সন্তান হুসাইন (আ.)-কে হত্যা করেছেন’ তখন আযদ গোত্রের আবদুল্লাহ ইবনে আফিফ আজদি (যিনি সিফফিন ও জামাল যুদ্ধে  আমিরুল মুমিনিন হযরত আলী (আ.)’র পক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন )  ইবনে জিয়াদের সামনেই ঘোষণা করেন যে,  নবী-পরিবারকে স্বয়ং আল্লাহ  সব অপবিত্রতা থেকে দূরে রেখেছেন আর ইয়াজিদ ও তার বাবা (মুয়াবিয়া) আল্লাহর রাসূল (সা.)’র মাধ্যমে অভিশপ্ত হয়েছে এবং জিয়াদ আল্লাহর শত্রু  ও হুসাইন (আ.)-কে হত্যার পরও সে (জিয়াদ) নিজেকে আর মুসলমান বলে দাবি করতে পারে না।  তিনি জিয়াদকে মিথ্যাবাদী ও মিথ্যাবাদীর সন্তান এবং যে(ইয়াজিদ) তাকে নিয়োগ দিয়েছে সে ও তার পিতাও (মুয়াবিয়া)  মিথ্যাবাদীর সন্তান বলে উল্লেখ করেন। এসব কথা শুনে ইবনে জিয়াদ ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে হত্যার নির্দেশ দেয়। কিন্তু আযদির গোত্রের লোকেরা তাকে রক্ষা করেন এবং এমনকি এ জন্য ছোটোখাটো যুদ্ধও সংঘটিত হয়। কিন্তু পরে জিয়াদের সেনারা গভীর রাতে আযদিকে ঘর থেকে ধরে এনে হত্যা করে এবং তাঁর মাথা ঝুলিয়ে রাখে একটি লবনের জলাশয়ের পাশে। এর পরের দিন ভোরে জিয়াদ ইমাম হুসাইন (আ.)’র পবিত্র শির মুবারকটি আনতে বলে ও এই পবিত্র মাথাকে কুফার রাস্তাগুলোয় সবগুলো গোত্রের জনগণের মধ্যে প্রদর্শনের নির্দেশ দেয়। যাইদ বিন আরক্বাম বলেন, আমি আমার বারান্দায় ছিলাম যখন  বর্শায় বিদ্ধ ইমামের মাথাটি আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছিল ও আমার খুব কাছে এসে গিয়েছিল তখন আমি ওই পবিত্র মাথাকে তিলাওয়াত করতে শুনলাম:

أَمْ حَسِبْتَ أَنَّ أَصْحَابَ الْكَهْفِ وَالرَّقِيمِ كَانُوا مِنْ آيَاتِنَا عَجَبًا [١٨:٩]

আপনি কি ধারণা করেন যে, আসহাবে কাহাফ তথা গুহার (৩০৯ বছর পর জীবিত হওয়া) অধিবাসীরা  এবং লেখাগুলো আমার নিদর্শনাবলীর মধ্যে বিস্ময়কর ছিল ? (সুরা কাহাফ-৯)

 

যাইদ বিন আরক্বাম বলেন, “আমার চামড়ার লোম দাঁড়িয়ে গেল এবং আমি বললাম, হে রাসূলুল্লাহর সন্তান, আপনার রহস্য ও আপনার কাজও সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং হ্যাঁ, সবচেয়ে বিস্ময়কর।”

(সূত্র,  শেইখ আব্বাস কুমির লেখা নাফাসুল মাহমুম বা ‘শোকার্তের দীর্ঘশ্বাস’, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃ-৩৮)

 

 এক ঘাতক অন্ধ হয়ে যায়

 

সিবত ইবনে জাওজি বর্ণনা করেছেন: এক বৃদ্ধ ব্যক্তি ইমাম হুসাইন (আ.) হত্যায় শরিক ছিল। লোকটি একদিন হঠাত অন্ধ হয়ে যায়। লোকেরা এর কারণ জানতে চাইলে বৃদ্ধ বলল: আমি রাসূল (সা.)-কে স্বপ্নে দেখি যে তিনি হাতের কাপড় ঘুটিয়ে আছেন। তাঁর হাতে তলোয়ার। সামনে একটি বিছানায় হুসাইন (আ.)’র দশ ঘাতকের মাথা কাটা লাশ পড়ে আছে। এরপর রাসূল (সা.) আমাকে ধমক দিলেন। আর হুসাইন (আ.)’র রক্ত-মাখা একটি শলাকা আমার চোখে লাগিয়ে দিলেন। সকালে উঠে দেখি আমার চোখ অন্ধ।

 

 এক ঘাতকের মুখ আলকাতরার মত কালো হয়ে যায়

 

সিবত ইবনে জাওজি আরো বর্ণনা করেছেন: যে পাষণ্ড লোকটি ইমাম হুসাইন (আ.)’র খণ্ডিত মস্তক ঘোড়ার গলায় লটকিয়ে রেখেছিল তার মুখ কালো আলকাতরার মত রং ধারণ করে। লোকেরা তাকে বলল: তুমি সমস্ত আরবে সুন্দর চেহারার মানুষ ছিলে, তোমার এ অবস্থা কেন হল? সে বলল: যেদিন আমি ইমাম হুসাইন (আ.)’র মাথা ঘোড়ার গলায় ঝুলিয়েছিলাম সেদিন থেকে একটু ঘুমালেই দুই ব্যক্তি এসে আমার দুই বাহু ধরে আমাকে জ্বলন্ত আগুনে নিয়ে যায়। তারা আমাকে আগুনে ফেলে দেয়। আগুনে পুড়ে পুড়ে আমার এ দশা হয়েছে। কিছু দিন পর লোকটি মারা যায়। 

 

আরেক ঘাতক আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে যায় 

 

সিবত ইবনে জাওজি আরো বর্ণনা করেছেন: প্রসিদ্ধ তাফসিরকার সুদ্দি বলেছেন, তিনি একদিন লোকজনকে দাওয়াত করেন। মজলিসে আলোচিত হল যে, যারা ইমাম হুসাইন (আ.)’র হত্যাকাণ্ডে শরিক ছিল দুনিয়াতে তাদের শাস্তি হয়ে গেছে। এক ব্যক্তি বলে: এটা একেবারে মিথ্যা কথা। সে নিজে এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিল, কিন্তু তার কিছুই হয়নি। লোকটি মজলিস থেকে উঠে বাড়ীতে পৌঁছায় এবং তার প্রদীপ জ্বালানোর চেষ্টা করে। প্রদীপ বা চেরাগের শলতা ঠিক করতে গিয়ে তার কাপড়ে আগুন লেগে যায়। আর সেই আগুনে জ্বলেই লোকটি কয়লা হয়ে যায়। সুদ্দি নিজে সকাল বেলা খবর পেয়ে তাকে কালো কয়লা অবস্থায় দেখতে পান।

 

ইমামের প্রতি তির নিক্ষেপকারীর পানির পিপাসা

 

ফুরাত নদীর কুলে চরম পিপাসার্ত অবস্থায় ইমাম হুসাইন (আ.) পানি পানের চেষ্টা করলে ইয়াজিদ বাহিনীর এক পাষণ্ড তাঁর গলায় তির ছোঁড়ায় তিনি আর পানি পান করতে পারেননি। পাষণ্ড ওই লোকটি সব সময় পানি বা শরবত পান করলেও তার পিপাসা মিটতো না। অবশেষে তার পেট ফুলে যায় ও তীব্র পানির পিপাসায় কাতরাতে কাতরাতে সে জাহান্নামবাসী হয়।

 

আরেক ঘাতকের শাস্তি 

 

ইমাম হুসাইন (আ.)’র মাথার ওপর তরবারির আঘাত হেনেছিল জালিম বুরনস এবং ইমামের আহত অবস্থায় তাঁর টুপিও উঠিয়ে নিয়ে যায় সে। লোকটি ওই টুপি দেখিয়ে ইয়াজিদের কাছ থেকে পুরস্কার পাওয়ার আশা করছিল। ইমাম তা বুঝতে পেরে অভিশাপ দিয়ে বলেছিলেন, ‘এ আঘাতের বিনিময়ে তুমি যেন পানাহারের ব্যবস্থা করতে না পার। আর আল্লাহ যেন তোমাকে জালিমদের সঙ্গে হাশর করেন।’

 

লোকটি আজীবন আর্থিক অনটনে ভুগেছে এবং দারিদ্রের মধ্য দিয়েই তার মৃত্যু ঘটেছিল। 

 

ইমাম হুসাইন (আ.)’র শাহাদতের ৫ বছর পর মুখতার সাকাফি ঘাতকদের শাস্তি দেয়ার জন্য  জনপ্রিয় গণ-আন্দোলন গড়ে তুলেন এবং কুফা ও ইরাকে তাঁর শাসন-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি হুসাইন (আ.) হত্যায় জড়িত প্রত্যেক ঘাতককে খুঁজে বের করে একের পর এক হত্যা করেন। বেশ কয়েক দিন ধরে এই কিসাস অব্যাহত ছিল। হুসাইন (আ.) হত্যাকাণ্ডে জড়িতদের মধ্য থেকে গড়ে প্রতিদিন ২৪৮ জনকে হত্যা করেন মুখতার। 

 

যেমন, আমর ইবনে হাজ্জাজ পিপাসার্ত অবস্থায় মরুভূমির উত্তপ্ত হাওয়ার মধ্যে পালাতে গিয়ে বেহুশ হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় জনগণ তাকে হত্যা করে। 

 

শিমারকে ধরে এনে তাকে হত্যা করা হয় এবং তার শরীরের গোশত কুকুরকে খাওয়ানো হয়।

 

আবদুল্লাহ ইবনে উসাইদ, মালিক ইবনে বশির ও হামল ইবনে মালিকসহ কয়েকজন ঘাতককে ঘেরাও করা হলে তারা ক্ষমা চায়। মুখতার বলে: তোরা ইমাম হুসাইন (আ.)’র প্রতি দয়া দেখাতে পারলি না, তোদের আবার ক্ষমা কিসের? তাদেরকে ধরে এনে হত্যা করা হয়।

 

ইমামের টুপি হরণকারী মালিক ইবনে বশিরের হাত ও পাগুলো কেটে ফেলেন বিপ্লবীরা। ফলে সে তড়পাতে তড়পাতে মারা যায়। 

 

ওসমান ইবনে খালিদ ও বিশর ইবনে শুমহিত কুফায় ইমাম হুসাইন (আ.)’র দূত বা প্রতিনিধি তথা তাঁরই চাচাতো ভাই মুসলিম ইবনে আকিল (আ.) হত্যায় জড়িত ছিল।  এ দুই ঘাতককে হত্যার পর  তাদের লাশ পুড়িয়ে ফেলা হয়।

 

ইয়াজিদ বাহিনীর সেনাপতি ওমর ইবনে সাদ ও তার ছেলেকেও ধরে এনে হত্যা করেন বিপ্লবীরা।

 

ইমাম হুসাইন (আ.)’র প্রতি তির নিক্ষেপকারী হাকিম ইবনে তোফায়েলকে তির মেরে হত্যা করেন বিপ্লবীরা।

 

ইমাম হুসাইন (আ.)’র ভাতিজা আবদুল্লাহ ইবনে হাসান (আ.)’র হত্যাকারী জায়েদ ইবনে রিফাদকে তির ও পাথর ছুড়ে আহত করেন বিপ্লবীরা এবং এরপর তারা তাকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করেন। পাষণ্ড রিফাদ ইমাম হাসানের পুত্রের কপালের ওপর তির নিক্ষেপ করেছিল। এ অবস্থায় কপাল রক্ষার চেষ্টা করায় রিফাদ আরেকটি তির ছুঁড়ে  আবদুল্লাহ (আ.)’র হাতকে কপালের সঙ্গে গেঁথে ফেলে।

 

ঘাতক সিনান ইবনে আনাস কুফা ছেড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। মুখতার তার ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেন। 

 

মুখতার বলেছিলেন, চার ভাগের তিন ভাগ কুরাইশকে হত্যা করলেও  তা ইমাম হুসাইন (আ.)’র একটি আঙ্গুলের বদলার সমান হবে না।

 

হুসাইন (আ.)’র ঘাতকদের ভয়াবহ পরিণতি দেখে মনে করা যায় পবিত্র কুরআনের এই আয়াত: ‘শাস্তি এমনই হয়ে থাকে। তবে আখিরাতের শাস্তি আরো কঠিন, যদি তারা জানতো।’

 

 রেডিও তেহরান

 

 

২৯ বছর বয়স্ক সারা ট্রাস ছিলেন একজন চিকিৎসক। তিনি ও তার বাবা ছিলেন খ্রিস্টান। আর মা ছিলেন ইহুদি। ট্রাস ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আগের কথা তুলে ধরে বলেছেন: 'আমি কৈশোরেই ইসলাম সম্পর্কে কিছু না জানা সত্ত্বেও উৎসব অনুষ্ঠানগুলোতে শালীন পোশাক পরার চেষ্টা করতাম। কারণ, তাতে আমি প্রশান্তি পেতাম। সে সময় পর্যন্ত কখনও কোনো মুসলমানকে কাছ থেকে দেখিনি। আর ইসলাম সম্পর্কেও তেমন কিছুই জানতাম না। আশপাশের লোকদের কাছ থেকে কেবল এটা শুনেছিলাম যে ইসলাম নারীদের সঙ্গে সহিংস আচরণ করে। মুসলমানদের কাছে নারী হল দাসী-বাঁদীর মত। কিন্তু ব্যাপক গবেষণার পর এখন এটা বুঝতে পেরেছি যে এ সম্পর্কে আমি যা শুনেছিলাম তা ছিল ভুল। আমি সৌভাগ্যবান যে সত্যকে জানতে পেরেছি।'

 

কৈশোরেই ধর্ম সম্পর্কে সারার আগ্রহ ছিল ক্রমবর্ধমান। ধর্ম সম্পর্কে নানা প্রশ্ন ও অস্পষ্টতা  তার জীবনের এক বড় উৎকণ্ঠা হয়ে দাঁড়ায়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেছেন:

 

'আমার ও সব মানুষের প্রকৃতিই হল খোদায়ী। তাই সব মানুষের মধ্যেই রয়েছে ধর্মের প্রতি আকর্ষণ। আসলে ধর্ম ও আল্লাহতে বিশ্বাস হচ্ছে মানুষের এমন এক চাহিদা যা মানুষকে দেয় নিরাপত্তা ও প্রশান্তি। তাই প্রকৃতিগত এই চাহিদা পূরণের জন্য চেষ্টা করতাম। আর এ জন্য নানা ধর্ম সম্পর্কে জানার চেষ্টা করতাম। কিন্তু যতই জানার চেষ্টা করতাম ততই প্রশ্ন ও অস্পষ্টতা বাড়তেই থাকে।' 

 

সারা ট্রাস তার ইসলাম ধর্ম গ্রহণের প্রাথমিক আগ্রহের উন্মেষ প্রসঙ্গে বলেছেন: 'আমার আশপাশে কোনো মুসলমান ছিল না। এমন কেউ ছিল না যিনি ইসলাম সম্পর্কে আমার মনে আগ্রহের আলো জ্বেলে দিতে পারেন ও ইসলামের পরিচয় তুলে ধরতে পারেন। যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম সেখানে নানা ধর্মের অনুসারীদের দেখতে পেতাম। বিষয়টা আমার কাছে ছিল বেশ আকর্ষণীয়। তাদের কারো কারো সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর তাদের আচার-আচরণ এবং দৃষ্টিভঙ্গি বা মন-মানসিকতায় আমি অভিভূত হই। বিশেষ করে, এক ব্যক্তির আচার-আচরণ ও মন-মানসিকতা আমার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়েছে। তিনি ছিলেন অন্যদের চেয়ে ভিন্ন ধরনের। তার ইবাদত-বন্দেগি, খোদাভীতি, সততা ও চারিত্রিক পবিত্রতা আমাকে বেশ আকৃষ্ট করে।'

 

মার্কিন নও-মুসলিম সারা ট্রাস এ প্রসঙ্গে আরো বলেছেন:

'অবশ্য আমি ও অন্য কেউই জানতাম না যে তিনি ছিলেন মুসলমান। তার আচার-আচরণ আমার কাছে ছিল আদর্শ স্থানীয়। যখন বুঝলাম যে তিনি মুসলমান তখন অনেকেই তার কাছ থেকে আমাকে দূরে থাকার পরামর্শ দেন। কিন্তু আমি এর পেছনে কোনো যুক্তি দেখলাম না। কারণ, তিনি ছিলেন সেই সময় পর্যন্ত আমার দেখা লোকদের মধ্যে অন্য সবার চেয়ে পবিত্র ও সর্বোত্তম। আমি তাকে তার কোনো কোনো বিশেষ চিন্তা-ভাবনা ও আচরণ সম্পর্কে প্রশ্ন করলে তিনি জানান যে ধর্মই এর কারণ। তার কথাবার্তা ও আচার-আচরণ ইসলাম সম্পর্কে আমার এতদিনের ভুল ধারণা ভেঙ্গে দেয়। আমি তার কাছে ইসলাম সম্পর্কে জানানোর অনুরোধ করি এবং এভাবেই ইসলামের সঙ্গে গভীরভাবে পরিচিত হই।'

মার্কিন নও-মুসলিম সারা ট্রাস আরো বলেছেন:  'ইসলাম এমন এক ধর্ম যা মানুষের প্রকৃতির সঙ্গে মানানসই। কেউ যদি প্রকৃত অর্থেই সত্যের সন্ধান করেন মহান আল্লাহ তাকে পথ দেখাবেন। ঠিক যেমনটি আমি মহান আল্লাহর দয়ায় ইসলামের মধ্যেই আমার প্রকৃত সত্ত্বাকে খুঁজে পেয়েছি, যা হারিয়ে গিয়েছিল।'

 

ইসলাম গ্রহণের সিদ্ধান্তের কারণে কখনও অনুতপ্ত হয়েছেন কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে সারা ট্রাস দৃঢ়তার সঙ্গে বলেছেন, না তিনি কখনও তা অনুভব করেননি, বরং ইসলাম গ্রহণের পর নবজন্মের অনুভূতি ও প্রশান্তি লাভ করেছেন তিনি। এখন নতুন করে আল্লাহর অসন্তুষ্টি জাগানোর ভয় ছাড়া কোনো ভয় তার মধ্যে নেই। সারা আরো জানান, পবিত্র কুরআনের তিলাওয়াতও তাকে প্রশান্তি দেয়। কারণ, কুরআন তার প্রশ্নগুলোর জবাব দেয় এবং তাকে ইসলামের আরো কাছে নিয়ে যায়।

 

উল্লেখ্য, ইউরোপ-আমেরিকায় খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে ইসলাম। বিশেষ করে সেখানকার নারী সমাজ ব্যাপক হারে আকৃষ্ট হচ্ছে এ ধর্মের দিকে। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞ মনে করেন পশ্চিমে আধ্যাত্মিক শূন্যতা, আত্মপরিচয়হীনতা ও নৈতিক অধঃপতনের প্রতি বিতৃষ্ণার কারণেই ইসলামের দিকে ঝুঁকছেন সেখানকার জনগণ। নারীরা যত্ন, সম্মান ও সুরক্ষার মত যা যা পছন্দ করেন ইসলামের মধ্যে তা পাচ্ছেন বলেও এই বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। নারী ও পুরুষের বৈশিষ্ট্য যে ভিন্ন- ইসলামে এর স্বীকৃতি এবং এ ধর্মে পরিবার ও মায়ের প্রতি অফুরন্ত সম্মানও পশ্চিমা নারীদের মন জয় করছে।

 

 পশ্চিমা নারীরা ক্রমেই এটাও বুঝতে পারছেন যে পাশ্চাত্য নারীকে একটি পণ্য হিসেবে দেখে থাকে। তাই মর্যাদাহীন এই জীবনের মোকাবেলায় ইসলামের হিজাব, শালীনতা ও আধ্যাত্মিকতা তাদেরকে দিচ্ছে সার্বিক নিরাপত্তার সুদৃঢ় আশ্রয়।

 

শহীদ অধ্যাপক আয়াতুল্লাহ মুর্তাজা মুতাহহারির মতে ইসলাম নারী ও পুরুষের সৃষ্টিশীলতা বা প্রতিভা বিকাশের ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্র সম্পর্কে সচেতন। নারী ও পুরুষের সুস্থ প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং পবিত্র ও যৌক্তিক সম্পর্ক সমাজকে সব ধরনের বিচ্যুতি আর প্রবৃত্তি-পূজা থেকে রক্ষার মাধ্যমে তাদেরকে দেয় প্রকৃত সৌভাগ্য।

 

মার্কিন নও-মুসলিম সারা ট্রাস ঘরের বাইরে হিজাব পরে বের হন। তার মতে, ইসলাম তার সামাজিক তৎপরতার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি, বরং তিনি এখনও তার পছন্দের কাজগুলো হিজাব পরে অব্যাহত রাখছেন। সারা মনে করেন হিজাব মানুষের আত্মিক পবিত্রতা ও সমাজকে অধঃপতন থেকে রক্ষার মাধ্যম। অথচ  তার মতে এটা খুবই লজ্জাজনক যে পশ্চিমা সমাজপতিদের অনেকেই এমন একটি জরুরি বা অপরিহার্য বাস্তবতাকে অন্ধের মত চোখ বুজে নিষিদ্ধ ঘোষণা করছেন। ট্রাস আরো বলেছেন:

 

'কখনও এটা ভাবিনি যে একদিন মুসলমান হব। এখন এটা বুঝি যে মুসলমানদের সম্পর্কে আমার আগের ধারণা ছিল পুরোপুরি ভুল। পশ্চিমা গণমাধ্যমের কারণেই এ ধরনের ভুল ধারণা জন্মেছিল আমার মধ্যে। সে সময় পর্যন্ত পশ্চিমা গণমাধ্যম যা-ই বলতো আমি তাই বিশ্বাস করতাম। যে মুসলমানদের আমি পছন্দ করতাম না একদিন সেই মুসলিম সমাজেরই সদস্য হব তা কখনও ভাবিনি। কিন্তু আজ মুসলমান হতে পারার জন্য আমি গর্বিত এবং এ জন্য আমি খুবই আনন্দিত।' #

৫ নভেম্বর (রেডিও তেহরান): আজ ১১ ই মহররম। ১৩৭৫ বছর আগে ৬১ হিজরির এই দিনে হযরত ইমাম হুসাইন (আ.)’র একমাত্র জীবিত পুত্র  হযরত ইমাম জাইনুল আবেদিন(আ.)সহ  ইমাম শিবিরের সব জীবিত ব্যক্তিদের বন্দী করে  ইয়াজিদ বাহিনী। বন্দীদের প্রায় সবাই ছিলেন নারী ও শিশু। তাঁদের পায়ে পরানো হয়েছিল লোহার শিকল ও হাতে পরানো হয়েছিল হাতকড়া।

 

আগের দিন  কারবালায় নবী বংশের নিষ্পাপ ইমাম হযরত ইমাম হুসাইন (আ.), তাঁর পরিবার ও সঙ্গীদের ওপর নির্মম হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় ইমাম জাইনুল আবেদিন (আ.) ছাড়া সব পুরুষ সদস্য শাহাদত বরণ করেছিলেন। ইমাম হুসাইন (আ.)’র পরিবারের সদস্য ও সঙ্গীসহ ৭২ জন বিপ্লবী ও নির্ভিক মুসলমানকে নৃশংসভাবে শহীদ করার পর ইমামের মাথা মুবারক বর্শার আগায় বিদ্ধ করেছিল নরাধমরা। শুধু তাই নয় ইমামের লাশসহ শহীদদের লাশগুলোর ওপর ঘোড়া দাবিয়ে পবিত্র লাশগুলোকে দলিত-মথিত করেছিল নরপশুরা। ইমাম শিবিরের আতঙ্কগ্রস্ত কয়েক শিশু ঘোড়ার পায়ে পিষ্ট হয়ে মারা যায়।   

 

ইয়াজিদ সেনারা ইমাম শিবিরের তাঁবুগুলোতে আগুন দিয়েছিল এবং নারীদের অলঙ্কার ছিনিয়ে নেয়াসহ লুটপাট চালায়। কান্নারত শিশুদের মারধোর করে। তারা  ইমামের জিনিসপত্র ও উটগুলো লুট করে। এমনকি নবী-পরিবারের মহিলাদের বোরকাগুলোও লুট করেছিল নরাধমরা এবং তাঁদেরকে খালি পায়ে হাঁটিয়ে বন্দীদের মত সারি বেঁধে নিয়ে যায় হয় কুফা ও দামেস্কের দিকে। তারা ৭২টি বর্ষার আগায় বিদ্ধ করে ৭২ জন শহীদের ছিন্ন মস্তক।

 

নবী-পরিবারসহ সব বন্দীকে কারবালার ময়দান ঘুরিয়ে কুফার দিকে নেয়া হয়েছিল যাতে তাঁরা ময়দানে পড়ে থাকা নিজ পরিবার ও আপনজনদের মস্তকবিহীন এবং ছিন্ন-ভিন্ন লাশ দেখে মানসিক কষ্ট পান। (আল্লাহর চির-অভিশাপ বর্ষিত হতে থাকুক সেইসব খোদাদ্রোহী মুনাফিকদের ওপর যারা নবী-পরিবারের ওপর সব ধরনের কষ্ট দেয়ার পাশাপাশি তাঁদের নারী ও শিশুদের ওপরও এইভাবে মানসিক কষ্ট দেয়ার চেষ্টা করেছিল)।

 

কুফায় ইবনে জিয়াদের দরবারসহ নানা স্থানে এবং দামেস্কে ইয়াজিদের দরবারে বন্দী অবস্থায়  ইমাম হুসাইন (আ.)’র বোন হযরত জাইনাব (সা.) যেসব সাহসী বক্তব্য রেখেছিলেন তা ইতিহাসে অমর হয়ে আছে।

 

কুফায় তাঁর ভাষণ শ্রবণকারী একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেছিল, আল্লাহর শপথ, "এমন আর কোনো লজ্জাশীলা নারীকে কখনও এমন ভাষণ দিতে শুনিনি।" তাঁর ভাষণে ছিল পিতা হযরত আলী (আ.)'র বীরত্ব, বাগ্মিতা ও নারীসুলভ লজ্জাশীলতা।

 

কুফা নগরীর প্রবেশ-দ্বারের কাছে মাত্র দশ-বারোটি বাক্যে তিনি তাঁর ভাষণ শেষ করেছিলেন। কুফাবাসীরা তাদের প্রতি জাইনাব(সা.)'র যৌক্তিক ও মর্মস্পর্শী তিরস্কার শুনে অনুশোচনা ও বিবেকের দংশনের তীব্রতায় নিজেদের আঙুলগুলো মুখে ঢুকিয়ে কামড়াচ্ছিল। এখানে নারীসুলভ মর্যাদা বজায় রেখে সাহসী বীর নারী ইমাম হুসাইন (আ.)'র কন্যা ফাতিমা (সা. আ.) একটি সংক্ষিপ্ত ভাষণ দিয়েছিলেন। সে সময়ও সবাই অশ্রু-সজল হয়ে পড়ে।

 

হযরত জাইনাব (সা.) কুফাবাসিকে তিরস্কার করে বলেছিলেন, " তোমরা নিজেদের জন্য চিরন্তন অপরাধ ও লজ্জা রেখে এসেছ এবং চিরন্তন লাঞ্ছনা খরিদ করেছ। তোমরা কোনোদিনই এ লাঞ্ছনা দূর করতে সক্ষম হবে না। আর কোনো পানি দিয়েই তা ধুয়ে ফেলতে পারবে না। কারণ, তোমরা হত্যা করেছ হুসাইনকে যিনি হচ্ছেন খাতামুন্নাবিয়্যিনের(সা.)'র কলিজার টুকরা, বেহেশতে যুবকদের নেতা।"

 

জাইনাব (সালামুল্লাহি আলাইহা)সহ নবী পরিবারের বন্দীদেরকে কুফায় ইবনে জিয়াদের দরবারে নিয়ে আনা হলে জিয়াদ তাঁকে বিদ্রূপ করে বলেছিল: সকল প্রশংসা আল্লাহর যিনি তোমাদের লাঞ্ছিত করেছেন, তোমাদের পুরুষদের হত্যা করেছেন এবং তোমাদের বাগাড়ম্বরকে মিথ্যা প্রমাণ করেছেন। সঙ্গে সঙ্গে জাইনাব (সা.) জবাব দিয়েছিলেন: "সব প্রশংসা আল্লাহর যিনি নবী মুহাম্মাদ(সা.)'র বদৌলতে আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন এবং আমাদেরকে সব অপবিত্রতা থেকে মুক্ত করেছেন। অবশ্যই ফাসেক লাঞ্ছিত হবে এবং ফাজের বা পাপাচারী মিথ্যা বলছে, (যার বাগাড়ম্বরের কথা সে বলছে) সে ব্যক্তি আমরা ছাড়া অন্য কেউ। তাই সব প্রশংসা আল্লাহর।"

 

ইবনে জিয়াদ এবার বিদ্রূপ করে বলল: আল্লাহ তোমার ভাইয়ের সাথে যে আচরণ করলেন তা কেমন দেখলে? সে খলিফা ইয়াজিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিল ও প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, তাই আল্লাহ তাকে হতাশ করলেন এবং ইয়াজিদকে সাহায্য করলেন।

 

জবাবে জাইনাব (সা.) বলেছিলেন, " আমরা এতে উত্তম ছাড়া অন্য কিছু দেখিনি। আল্লাহ আমার ভাইকে শাহাদতের মর্যাদা দিয়ে সম্মানিত করেছেন, এটা তথা আল্লাহর রাস্তায় নিহত হওয়া সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য।...আল্লাহ তোমাকে এবং তুমি যাদের হত্যা করেছ তাঁদের সবাইকে খুব শিগগিরই বিচারের জন্য নিজ দরবারে হাজির করবেন, সেদিনের জন্য প্রস্তুত হও তুমি, সেদিন কী জবাব দিবে তুমি, সেদিনের জন্য উদ্বিগ্ন হও। কে সেদিন বিজয়ী ও সফল হবে, হে যেনাকারিণীর পুত্র?" 

 

এরপর নেকড়ের মত ক্ষিপ্ত হয়েও নির্লজ্জের মত জিয়াদ বলে, " আমি খুশি হয়েছি, কারণ, যা চেয়েছি তা পেয়েছি। "

 

জবাবে জাইনাব (সা.) বলেছিলেন," তুমি দুনিয়ার মাধ্যমে নেশাগ্রস্ত, প্রতারিত ও ফিতনাগ্রস্ত। তুমি কি মনে করেছ হুসাইনের পরে তুমি আনন্দের সঙ্গে পৃথিবীতে চিরদিন টিকে থাকবে? স্বস্তিতে থাকবে? কখনও না, তুমি স্বস্তির মুখ দেখবে না। তুমি কখনও তোমার অভীষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হতে পারবে না। হে ইবনে জিয়াদ! তুমি নিজের হাতে নিজের ওপর যে কলঙ্ক লেপন করেছ তা অনন্তকাল পর্যন্ত থেকে যাবে।"

 

এতে  দিশেহারা, অস্থির ও ক্ষিপ্ত হয়ে ইবনে জিয়াদ চিৎকার করে বলে: " আমাকে এ নারীর হাত থেকে মুক্তি দাও; ওদেরকে কারাগারে নিয়ে যাও।"

 

ইবনে জিয়াদ ও তার দলবল জনগণের প্রতিক্রিয়া ও বিদ্রোহের আশঙ্কায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। তাই তারা জনগণের সম্ভাব্য প্রতিরোধ ও ক্ষোভ এড়ানোর জন্য নবী-পরিবারসহ কারবালার সব বন্দীদেরকে দামেস্কে পাঠানোর জন্য জনমানবহীন অচেনা পথগুলো ব্যবহার করতে তাদের সেনাদের নির্দেশ দেয়।

 

মহাপাপিষ্ঠ ও নরাধম ইয়াজিদের দরবারে উপনীত হলে তার বেয়াদবিপূর্ণ নানা কথা ও বিদ্রূপের জবাবে হযরত জাইনাব (সা.) এক দীর্ঘ ও ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন। সে ভাষণের একাংশে তিনি বলেছিলেন: "আমাদের শাসন-কর্তৃত্ব (তোমার হাতে পড়ায়) তুমি মহিমান্বিত আল্লাহর সেই বাণী ভুলে গিয়েছ: 'কাফেররা যেন মনে না করে যে আমরা তাদের যে অবকাশ দান করি, তা নিজেদের জন্য কল্যাণকর।  বরং আমরা তো তাদেরকে  এ জন্যই অবকাশ দেই যাতে করে তাদের  পাপগুলো বাড়তে থাকে এবং তাদের জন্য অপমানজনক শাস্তি অবধারিত।" # 

 

রেডিও তেহরান/