এই ওয়েবসাইটে আর আপডেট হবে না। আমাদের নতুন সাইট Parstoday Bangla
রবিবার, 08 নভেম্বর 2015 15:12

দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে দুই পরাশক্তি, শেষ কোথায়?

আনোয়ারুল হক আনোয়ার: আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়া ও ইয়েমেন যুদ্ধের পর ইউক্রেন ইস্যুতে কোনঠাসা আমেরিকা এবার দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যু নিয়ে চীনের সাথে প্রকাশ্যে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে। ফলে হঠাৎ করে বিশ্ব রাজনীতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। অন্যের মালিকানা দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করতে আমেরিকা বড় ভাইয়ের ভূমিকায় মঞ্চে অবতীর্ণ হয়েছে। অপরদিকে চীন ঐতিহাসিকভাবে এলাকাটি তার ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে আসছে। কেউ কাউকে ন্যূনতম ছাড় না দেয়ার মনোভাব নিয়ে স্থল ও আকাশ পথে সমরসজ্জা বৃদ্ধি করেছে চলেছে। যে কোনো পক্ষ থেকে প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে মাত্র একটি গুলি বেরিয়ে আসলে ভয়াবহ সংঘর্ষের সূত্রপাত ঘটবে। একে অন্যকে ঘায়েল করতে মারাত্মক সমরাস্ত্রের সমাবেশ ঘটিয়েছে এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলটিতে। দক্ষিণ চীন সাগরের কয়েকটি ক্ষুদ্র দ্বীপের মালিকানা দাবি করে আসছে চীন, ব্রুনাই, তাইওয়ান, ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া। আমেরিকার সাথে এসব দেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। অর্থাৎ এশিয়ায় আধিপত্য বিস্তারের লক্ষে উল্লেখিত কয়েকটি দেশ আমেরিকার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাঁধ সেধেছে শক্তিশালী চীনের অবস্থানকে কেন্দ্র করে। তাই যে কোনো উপায়ে চীনের আধিপত্য খর্ব করতে আমেরিকা বড় ভাই হিসেবে আগ বাড়িয়ে চীনের উপর চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছে।

 

বিরোধপূর্ণ অঞ্চলটি নিয়ে দ্বন্দ্বের কারণ

দক্ষিণ চীন সাগরের তলদেশে কমপক্ষে ২১৫ বিলিয়ন ব্যারেল খনিজ তেল এবং ২ হাজার ট্রিলিয়ন কিউবিক ফুট হাইড্রো-কার্বন প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদ মজুত রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। অপরদিকে সৌদি আরবের মজুত তেলের পরিমাণ ২৬৪ বিলিয়ন ব্যারেল। অর্থাৎ দক্ষিণ চীন সাগরের এ অংশটি নিজের কর্তৃত্বে রাখতে পারলে বিশ্বে দ্বিতীয় তেল উৎপাদক দেশ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে চীন। এছাড়া এলাকাটির মাধ্যমে বিশ্বের অধিকাংশ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে থাকে উপরন্তু মৎসের অভয়ারণ্য হিসেবেও এলাকাটির খ্যাতি রয়েছে। আমেরিকাসহ বিরোধপূর্ণ ৬টি দেশের আশঙ্কা অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে দ্রুত অগ্রসরমান দেশটি দক্ষিণ চীন সাগরের এ অঞ্চটি নিজের কব্জায় নিতে পারলে প্রাকৃতিক সম্পদে শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন ছাড়াও বিশাল নৌপথের একক কর্তৃত্ব লাভ করবে। এতে প্রতিবেশী দেশগুলো ছাড়াও আমেরিকার জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি হতে পারে। স্বরনীয় যে, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় প্রতিবেশীদের সাথে সমঝোতার প্রেক্ষিতে ১৯৪০ সালে চীন একটি মানচিত্র প্রস্তুত করে। এ মানচিত্র অনুসারে দক্ষিণ চীন সাগরে চীন তার প্রভাব বৃদ্ধি করে। তখন থেকে বিরোধের সূত্রপাত। অঞ্চলটিকে কেন্দ্র করে ইন্দোনেশিয়া ও জাপান চীনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

 

আমেরিকার লাভ-ক্ষতির হিসাব

বিরোধপূর্ণ যে অঞ্চলটিকে চীন তার অংশ হিসেবে দাবি করে আসছে  সে এলাকায় গত দেড় বছর যাবত কৃত্রিম দ্বীপ সৃষ্টির মাধ্যমে অবকাঠামো নির্মাণ করছে চীন। বিষয়টি আমেরিকারসহ প্রতিবেশী দেশগুলো অবগত রয়েছে। কিন্তু হঠাৎ করে আমেরিকা-চীনের মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়, সমরসজ্জা শেষতক রণপ্রস্তুতি বিশ্বের সচেতন মহলকে বিস্মিত করেছে। অনেকে আবার ভাবতে শুরু করেছে, এটা তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের আলামত কিনা? এ বিষয়ে কয়েকজন আন্তর্জাতিক গবেষক ভিন্নমত পোষণ করে উল্লেখ করেন যে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আমেরিকা বিশ্বে একচেটিয়া কর্তৃত্বের স্বাদ গ্রহণ করে। এরমধ্যে তৎকালীন সৌভিয়েত ইউনিয়ন আমেরিকার বিপরীতে একাধিকবার শক্তিশালী অবস্থান গ্রহণ করলেও শেষতক টিকতে পারেনি। সৌভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার সূবাদে শক্তিশালী প্রতিপক্ষবিহীন আমেরিকা অর্থনৈতিক ও সামরিক ক্ষেত্রে আরো শক্তিশালী অবস্থানে উপনীত হয় এমনকি বিশ্বের অনেক দেশের ভাগ্য মার্কিন প্রশাসন কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত হতো। কয়েক যুগ ধরে একচেটিয়া মোড়লগিরির পর অবশেষে ইরাক ও আফগানিস্থানে আগ্রাসন চালাতে গিয়ে আমেরিকা ব্যাপকভাবে মার খায়। অসংখ্য সৈন্য হতাহত ছাড়াও হাজার হাজার কোটি ডলারের সামরিক সরঞ্জাম খোয়াতে হয়েছে দেশটিকে। যুদ্ধে আমেরিকার টিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের অপচয় ঘটে। ইরাক ও আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট আগ্রাসন চালাতে গিয়ে কয়েক লক্ষাধিক নিরীহ মানুষকে হতাহত করা ছাড়াও ৮০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস করা হয়েছে। আগ্রাসন চালিয়ে এটাই তাদের লাভের খতিয়ান। অপরদিকে যুদ্ধ পরিচালনা করতে গিয়ে মার্কিন কোষাগার প্রায় শূন্য করে ফেলেছিল তৎকালীন যুদ্ধবাজ নেতা জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসন। জর্জ বুশকে আগ্রাসনে মদদ জুগিয়েছিল কট্টর মুসলিম বিরোধী ব্রিটেনের সাবেক যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। সে সময় আগ্রাসন বন্ধের দাবিতে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনে ব্যাপক বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। যুদ্ধে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন বহুজাতিক বাহিনী শেষতক সৈন্য প্রত্যাহারে বাধ্য হয়। কিন্তু যুদ্ধে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির ক্ষত মার্কিন সরকারকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তোলে।  এসময় বিশ্বে মারাত্মক অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দেয়। যার সামাল দিতে আমেরিকাসহ বিশ্বের অনেক দেশকে প্রচুর কাঠখড় পোহাতে হয়েছে। এতে বিশ্বে আমেরিকার প্রভাব অনেকখানি হ্রাস পায়। ইরাক ও আফগানিস্তানে যুদ্ধের রেশ কাটতে না কাটতে ইরাকে সশস্ত্র বিদ্রোহীদের তৎপরতা বৃদ্ধি, লিবিয়ায় আগ্রাসন এবং সিরিয়ায় যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়া হয়। এসবের নেপথ্যে আমেরিকা মূল ভূমিকা পালন করে।

 

ইরাক ও সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের দমনের নামে আমেরিকার নেতৃত্বে কয়েকটি পশ্চিমা দেশ দেড় বছর ধরে অভিযান পরিচালনা করে আসছে। কিন্তু সফলতা পায়নি। অভিযোগ রয়েছে, বিদ্রোহী দমনের নামে এ দু’টি দেশে বিদ্রোহীদের অস্ত্রশস্ত্র প্রদানসহ সর্বাত্মক সহযোগিতা প্রদান করা হয়। সিরিয়া-ইরাকে সশস্ত্র বিদ্রোহীরা বিশাল অঞ্চল দখল ও নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদ এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে বিদ্রোহীদের দমনে বন্ধু দেশ রাশিয়ার সহযোগিতা কামনা করে। যেমন অনুরোধ তেমন কাজ। বন্ধু দেশ সিরিয়ার অনুরোধে তাৎক্ষণিক সাড়া দেয় বিশ্বের প্রভাবশালী দেশ রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লামিদির পুতিন। শুরু হয় রুশ বাহিনীর সাঁড়াশি বিমান হামলা। নয়শ মাইল দূর থেকে নিখুঁত ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে আমেরিকাকে সতর্ক করে দেয় ভ্লাদিমির পুতিন। মাত্র এক মাসের অভিযানে সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। হিরো বনে যান ভ্লাদিমির পুতিন। মধ্যপ্রাচ্যে রাতারাতি গুরুত্বহীন হয়ে পড়ে আমেরিকা। মধ্যপ্রাচ্যের রাজা বাদশা এবং তাদের বিশেষ দূতরা মস্কো যাতায়াত বৃদ্ধি করে। এর মধ্যে সৌদি আরবসহ কয়েকটি দেশ রাশিয়ার সাথে শত শত কোটি ডলারের অস্ত্র ক্রয় চুক্তি সম্পন্ন করে ফেলে। সিরিয়ায় সাফল্য দেখে রাশিয়ার সাহায্য কামনা করে আমেরিকার মিত্র ইরাক। আর তখনই আমেরিকার প্রসব বেদনা শুরু হয়। এসময় আমেরিকা একজন মার্কিন বিশেষ দূত এবং সামরিক বাহিনীর একজন উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে তড়িঘড়ি করে ইরাকে প্রেরণ করা হয়। যাতে ইরাক রাশিয়ার সামরিক সহযোগিতা কামনা না করে।

 

ইউক্রেন ইস্যুতে এমনিতেই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে রয়েছে আমেরিকা। রাশিয়ার কঠোর পদক্ষেপে পরাভূত আমেরিকা পশ্চিমাদেশের সমালোচনা সম্মুখীন হয়। ক্রিমিয়ায় গণভোটের মাধ্যমে রাশিয়া ভূখণ্ডে অন্তর্ভূক্ত ছিল আমেরিকার জন্য চরম লজ্জাকর ঘটনা। ইউক্রেন ইস্যুতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমেরিকার ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়।

 

সমাজতান্ত্রিক সরকার শাসিত দেশ উত্তর কোরিয়া ইস্যুতেও আমেরিকা বড় ধরনের হোঁচট খেয়েছে। উত্তর কোরিয়া সরকারের পতন তৎসহ পারমানবিক কর্মসূচি বন্ধের লক্ষে নানা ফন্দি ফিকির এমনকি আন্তর্জাতিক অবরোধ আরোপ করা হয় গরীব দেশটির উপর। কিন্তু কম্যুনিস্ট শাসিত উত্তর কোরিয়া মার্কিন কিংবা পশ্চিমা বলয়ের কোন উদ্যোগকে পাত্তাই দিচ্ছে না বরং পারমানবিক কর্মসূচি বেগবান করার পাশাপাশি খোদ আমেরিকার ভূখণ্ডে আঘাত হানার রসদ আয়ত্ব করে ফেলেছে। ফলে এক সময়ের মোড়ল আমেরিকাকে এখন বাধ্য হয়ে পারমানবিক শক্তিধর কয়েকটি শত্রু  দেশের হুমকি নীরবে হজম করতে হচ্ছে। উত্তর কোরিয়া ইস্যুতে আমেরিকার প্রভাব ও শক্তি সামর্থ নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রভাবশালী দেশ দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের সমন্বয়ে উত্তর কেরিয়াকে দমাতে না পারায় খোদ মার্কিন মিত্ররা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভূগছে। এশিয়ায় আধিপত্য হ্রাস পেলে সেটা হবে আমেরিকার জন্য মারাত্মক আঘাত। একদিকে চীন ও উত্তর কোরিয়া অপরদিকে বৃহৎ শক্তি রাশিয়া। ইরানের সাথে পারমাবিক চুক্তি সম্পাদিত হওয়ায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন গুরুত্বও হ্রাস পায়। ইরান কর্তৃক কথিত পারমানবিক বোমা তৈরির অজুহাতসহ বিভিন্ন কারণে দীর্ঘ তিন দশক দেশটির উপর আন্তর্জাতিক অবরোধের খড়গ ঝুলছিল। কিন্তু ইরান সাহসের সাথে বিরোধটি মিটিয়ে ফেলায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে এমনকি ইরানের সাথে ব্যবসা বাণিজ্যে উদগ্রীব দেশগুলো তেহরানে হুমকি খেয়ে পড়ছে। সবকিছু মিলিয়ে আমেরিকা এখন কঠির চাপের মুখোমুখি। নিজের আধিপত্য হাতছাড়া হবার উপক্রম। ফলে বিরোধপূর্ণ দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুতে এবার আগ বাড়িয়ে এসেছে। এখানে ব্যর্থ হলে আমেরিকার শ্রেষ্ঠত্ব আর থাকবে না। তাই দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যুটি কাজে লাগাতে চায় দেশটি।

 

চীন-মার্কিন যুদ্ধ কি অত্যাসন?

আমেরিকা ভালো করে জানে, চীনকে এক চড় মারলে চীনও পাল্টা চড় মারবে। ইরাক, আফগান, লিবিয়া ও সিরিয়ায় যুদ্ধের ভয়াবহতা সম্পর্কে আমেরিকানরা ওয়াকিবহাল। অন্য দেশে আগ্রাসন চালাতে গিয়ে সৃষ্ট ক্ষত এখনো সারতে পারেনি আমেরিকা। সামরিক ক্ষেত্রে দুর্বল এবং পারমানবিক বোমাবিহীন এসব দেশে যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা রয়েছে আমেরিকার। অপরদিকে চীনের সামরিক শক্তি সম্পর্কে আমেরিকানদের খুব একটা ধারনা নেই। এটা মার্কিন নীতি নির্ধারকরাও একবাক্যে স্বীকার করেন। উপগ্রহ কিংবা বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত থেকে সংগৃহীত বিষয়ের উপর নির্ভর করতে হয় দেশটিকে। এছাড়া পারমানবিক শক্তিধর চীন একনাগাড়ে কয়েক বছর যুদ্ধ চালিয়ে যাবার ক্ষমতা রাখে। বিষয়টি আমেরিকা ভালো করেই জানে। চীনের সাথে আমেরিকার অর্থনৈতিক সম্পর্ক হিমালয় সমতুল্য। আমেরিকার বহু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের মালিক চীনা কোম্পানি। আবার চীনা পণ্যের ওপর নির্ভরশীল আমেরিকার শত শত প্রতিষ্ঠান। আমেরিকায় চীনের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ রয়েছে। আবার চীনেও আমেরিকার বিনিয়োগ রয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উভয়েই প্রায় এক সূতোয় আবদ্ধ। কিন্তু বাঁধ সেধেছে দক্ষিণ চীন সাগর ইস্যু। এখন আমেরিকা কোন্ দিকে অগ্রসর হবে সেটাই বিবেচ্য বিষয়। একদিকে বন্ধু দেশের স্বার্থ অপরদিকে বৃহৎ শক্তি চীনের সাথে বৈরিতা। আবার পিছু হটে গেলেও আমেরিকার জন্য মহাবিপদ। ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া, ফিলিস্তিন ও সিরিয়া ইস্যুতে  মধ্যপ্রাচ্যের রাজা বাদশা শাসিত কয়েক দেশ ব্যতীত অধিকাংশ মুসলিম দেশ এখন আর আমেরিকাকে বিশ্বাস করে না। আবার চীনের সাথে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ব্রুনাইয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিমগোষ্ঠী আমেরিকাকে সমর্থন করবে না। এটাও মার্কিনীরা ভালো করে জানে। তাই উভয় সংকটে নিমজ্জিত দেশটি। এসব বিষয় বিবেচনা করে আমেরিকা চীনের সাথে যুদ্ধে জড়াতে চাইবে না বলে আমার ধারণা।

 

সমস্যার সমাধান কোথায়?

হিসাবটা খুবই সহজ। প্রাচীন যুগে দেশে দেশে রাজা বাদশারা ঘোষণা দিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হত। তখন উভয় পক্ষের সৈন্য সামন্ত একটি বিশাল ময়দানে দুই পার্শ্বে অবস্থানের মাধ্যমে মুখোমুখি হয়। এরপর হুইসেল কিংবা একটা প্রচণ্ড শব্দের সাথে সাথে যুদ্ধ শুরু হয়ে যেত। বর্তমান যুদ্ধে সে নিয়ম এখন অচল। এখন পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই কয়েক ঘণ্টা কিংবা কয়েক দিনের ব্যবধানে হামলা পাল্টা হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু হয়। এক্ষেত্রে ইরাক,আফগানিস্তান, লিবিয়া প্রকৃত উদাহরণ। কারণ এসব দেশ সামরিক শক্তিতে বেশ দুর্বল থাকায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট ঘোষণা দিয়ে আগ্রাসন শুরু করে। তবে চীনের বেলায় এমন ঝুঁকি নিতে চাইবে না আমেরিকা। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, চীনের সাথে যুদ্ধ করার মানসিকতা থাকলেও আমেরিকা গোপনে সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বিরোধপূর্ণ দ্বীপে প্রতি মাসে দুইবার নৌ-টহল দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে আমেরিকা। অর্থাৎ উপরে যেটাই প্রকাশ করুক না কেন, তলে তলে চীনের সাথে সমঝোতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আমেরিকা। যাতে একটা সম্মানজনক পন্থায় বিরোধের নিস্পত্তি ঘটে। এতে আমেরিকারও মুখ রক্ষা হবে।

 

আমেরিকা চীনের উপর আক্রমন করলে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান আমেরিকাকে সহায়তা করবে। এর পরই চীনের বিস্বস্ত বন্ধু ও পারমানবিক শক্তিধর উত্তর কোরিয়া তাৎক্ষনিকভাবে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা শুরু করবে এবং রাশিয়া প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে চীন-উত্তর কোরিয়াকে সমর্থন যোগাবে। এ নিয়ে আমেরিকানরা দারুণ উদ্বিগ্ন। কেননা একবার যুদ্ধের দামামা বেজে উঠলে শুধু কোরীয় উপদ্বীপ নয় বরং এশিয়া জুড়ে এর বিস্মৃতি ঘটবে। যুদ্ধ না হলে সমঝোতা হতে পারে (১) বিতর্কিত দ্বীপে চীনের অবকাঠামো নির্মাণসহ সামরিক তৎপরতা বন্ধ করা (২) দক্ষিণ চীন সাগর থেকে উভয় দেশের যুদ্ধ জাহাজ প্রত্যাহার করা (৩) জাতিসংঘ কিংবা এতদ্বসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সালিশি সংস্থার দারস্থ হতে পারে উভয় পক্ষ (৪) বিরোধপূর্ণ পক্ষগুলোর মধ্যে পূণরায় বৈঠকের পদক্ষেপ গ্রহণ (৫) চীন কর্তৃক বিরোধীয় কিছু অংশের দাবি পরিত্যাগ করা। যদি কোন পক্ষই এসব সিদ্ধান্তে রাজি না হয় এবং ঘটনাক্রমে যদি যুদ্ধ বেঁধে যায় তাহলে এশিয়া মহাদেশে ব্যাপক জানমালহানি ছাড়াও কোনো কোনো দেশের মানচিত্রও পাল্টে যেতে পারে।#

 

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক এবং আন্তর্জাতিক গবেষক

 

(মতামত প্রকাশিত বক্তব্য লেখকের একান্ত নিজস্ব,  রেডিও তেহরানের সম্পাদকীয় বিভাগের আওতাভূক্ত নয়।)

 

 

 

 

মন্তব্য লিখুন


Security code
রিফ্রেস দিন